শিরোনাম পড়ে অনেকে নিশ্চয়ই ভাবছেন, আরজ আলীর রচনায় নারীর অবস্থান খোঁজা কেন? তিনি তো বিজ্ঞান, বিশ্বাস,আধ্যাত্মিকতা,লৌকিক জীবন ইত্যাদি নিয়ে ভেবেছেন,লিখেছেন। তাঁর লেখায় আস্তিক্যবাদ আর নাস্তিক্যবাদ নিয়ে আলোচনা না করে নারী বিষয় কেন? কিন্তু এসব বিষয়ের সাথে তো মানব জীবনকে টেনেছেন আর মানবের একটা অংশ তো নারী। নারী অবস্থান তার চেতনার কোথায় নাড়া দিয়েছিল সে কৌতূহল মেটাতেই আরজ আলী মাতুব্বর পুনঃপাঠ। আর পুনঃপাঠের প্রকাশই এ লেখা।
প্রথমে নারীপ্রেম থেকেই আরজ আলী মাতুব্বরের গতানুগতিক পথের বাইরে বিকল্প পথের সন্ধান। সে নারী তার মা। তার মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের ছবি তোলার অপরাধে (?) মৃতদেহ দাফন সহ জানাযায় নিজ বাড়ির লোকজন ছাড়া অন্য কেউ আসতে রাজি হয়নি।
জন্মদাত্রী মা নামক নারীর মুখচ্ছবি ধরে রাখতে গিয়ে সামাজিকভাবে তাকে বিপর্যয়ের সন্মুখীন হতে হলেও মানসিকভাবে তার বিপর্যয় কাটিয়ে উঠা শুরু। শুরু আলোর পথে যাত্রা। তার চেতনায় লাগে নতুন মাত্রা।

কথায় আছে জন্ম মৃত্যু বিয়ে তিন বিধাতা নিয়ে। এ তিনটি বিষয় বিধাতা নির্ভর বলে বিধাতা একই ধর্মের নারী পুরুষে বিয়ে হওয়া ভালবাসেন। এমন বিধানও দিয়েছেন। আরজ আলী মা্তুব্বর নির্দ্বিধায় স্বামী স্ত্রীর ভিন্ন ধর্মের বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। তিনি ‘সত্যের সন্ধান” নামক বইয়ে বলেছেন,“ এই কল্পিত ধর্মের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই দেখা দিল উহাতে মতভেদ। ফলে পিতা-পুত্রে, ভাইয়ে-ভাইয়ে, এমনকি স্বামী-স্ত্রীতেও এই কল্পিত ধর্ম নিয়া মতভেদের কথা শোনা যায়। শেষ পর্যন্ত যে কত রক্তপাত হইয়া গিয়াছে, ইতিহাসই তাহার সাক্ষী।”(মূল কথা/ প্রশ্নের কারণ)
তিনি ইঙ্গিতে ঘোষণা করেছেন যে, স্বামী ও স্ত্রী মাত্র একই ধর্মের হয় না, বা হওয়া লাগবেই এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এজন্য রক্তপাতের মত ঘটনাও ঐতিহাসিক সত্য। স্বামী স্ত্রীর যে ধর্ম নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে তা ধর্মপ্রাণ মানুষমাত্রই অস্বীকার করবেন। স্বামীর ধর্মই স্ত্রীর ধর্ম। ইসলাম ধর্মমতে,কোন মুসলিম নারীর স্বামী হতে হলে কোন পুরুষকে স্বামী হওয়ার আগে ইসলামধর্ম গ্রহণ করতে হবে। আর মুসলিম পুরুষ আহলে কিতাব ( অর্থাৎ যাহারা বাইবেল, তোউরাত, এবং যবুর গ্রন্থে বিঃশ্বাসী) অনুসারী মহিলাকে বিয়ে করতে পারে। কিন্তু এতে ধর্মপ্রাণ সমাজে বসবাস কঠিন হয়ে যায়। তা ছাড়া সন্তানদের ধর্ম নিয়ে তখন টানা হেঁচড়া করা লাগে বলে বিধর্মী প্রেমিক প্রমিকারা ধর্মান্তরিত হয়ে তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীরও যে আলাদা ধর্ম হতে পারে তা বলার মত সততা ও সাহস আরজ আলী মাতুব্বরের ছিল।

স্বামী ও স্ত্রীর যে আলাদা ধর্ম থাকতে পারে এ তথ্যটি বলাও অনেক মৌলবাদীর কাছে গর্হিত অপরাধ। আরজ আলী মাতুব্বর এ সত্য প্রকাশে দ্বিধান্বিত নন। নারীর ধর্মীয় স্বাধীনতা চর্চা করতে গিয়ে রক্তপাতের ঘটনাও যে স্বাভাবিক তা তিনি অবলীলায় বলতে পারেন। এখানেই তার নারী প্রতি আধুনিকতম দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ।

১৯২৯ সালের বাল্য বিবাহ আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে কোন মেয়ের বিয়েকে বলে বাল্য বিবাহ। আর ইদানিংকালে আধুনিক চেতনার উন্নয়নবিদরা, উন্নয়নকর্মীরা বলে শিশু বিয়ে। বাল্য বিয়ে আর শিশু বিয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে কি? আছে। বাল্য বিয়ে ইংরেজি early marriage আর শিশু বিয়ে ইংরেজি child marriage. সমাজের চেতনাকে নাড়া দিতে শিশু বিয়ে শব্দটি বেশি লাগসই। বাল্য বিয়ে আইনগত ভিত্তি আর শিশু বিয়ে সামাজিক প্রেক্ষাপট ও মানবিক আবেদন।

তাছাড়া, আইনে ১৮ বছরের নিচে কোন মেয়ের বিয়েকে বাল্য বিয়ে বললেও আধুনিক চেতনায় বিশ্বাসী অনেকেই লেখাপড়া শেষ না করে বা প্রতিষ্ঠিত না হয়ে বিয়ে করাকে বলে বাল্য বিয়ে। আর সমাজের আবেগকে নাড়া দিতে ১৮ বছরের নীচের বয়সী মেয়ের বিয়েকে বলে শিশু বিয়ে। এ নিয়ে ইউনিসেফ এর সাথে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রকল্পও রয়েছে। যে প্রকল্প 3C নিয়ে কাজ করছে। C তিনটি হল child marriage, child labour ও corporal punishment.

আরজ আলী মাতুব্বর কিন্তু বহু বছর আগে বাল্য নয়, শিশু বিয়ে শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন। তিনি ‘সত্যের সন্ধান” নামক বইয়ে ‘মূলকথা’ পরিচ্ছেদে বলেছেন, “আমাদের দেশে জন্মহার অত্যধিক। জনসংখ্যা অস্বাভাবিকরূপে বৃদ্ধি পাইতেছে —-শিশু, বিধবা ও বহুবিবাহে।” ”(মূলকথা/প্রশ্নের কারণ)
অনায়াসে বাল্য বিবাহ শব্দটি ব্যবহার করতে পারতেন। সচেতনভাবেই অনুপ্রাস সৃষ্টির সুযোগ এড়িয়ে গেছেন। কারণ শিশু বিবাহের সাথে নারী অধিকার সম্পর্কিত, শিশু অধিকার তো বটেই। তিনি অনেক আগেই শিশু বিয়ে ও বহু বিয়ের কুফল নিয়ে লিখেছেন যা নিয়ে বাংলাদেশের নারীবাদীরা এখনও আন্দোলন করছে ।

যদিও তিনি সবশেষে বলেছেন, “ সুখের বিষয় এই যে, সরকারী নির্দেশে শিশু-বিবাহ বর্তমানে কমিয়াছে।’ ”(মূলকথা/প্রশ্নের কারণ)তবে কমে যাওয়ার গতি খুবই ধীর। নারীর যাপিত জীবনের জাগতিক যন্ত্রণায় শিশু বিয়ে ও বহু বিয়ের মত দুটো প্রথারই নেতিবাচক প্রভাব যে অসহণীয় তা তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন।

যুক্তি দেখাতে বাস্তব জীবন থেকে উদাহরণ লাগে। চাক্ষুষ ঘটনার উপস্থাপন যুক্তিকে শাণিত করে। বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের দ্বন্দ্বে নির্ভরশীলতা, আস্থা ও জীবনরক্ষাকারী পথ হিসেবে মানুষ বিজ্ঞানকেই বেছে নেয়। তবে বিশ্বাসের বলি তো সমাজে যুগ যুগ ধরে নারীরাই হয়ে আসছে। আর আরজ আলী মাতুব্বর তা জানেন ও মানেন বলেই উদাহরণ এনেছেন গর্ভবতী নারীর সন্তান জন্মদানের মত ঘটনাকে। “গর্ভিনীর সন্তান প্রসব যখন অস্বাভাবিক হইয়া পড়ে, তখন পানি পড়ার চেয়ে লোকে বেবী ক্লিনিকের (baby clinic) উপর ভরসা রাখে বেশী।”(মূলকথা/প্রশ্নের কারণ। এ তার চারপাশের নারীর জীবন চক্র পর্যবেক্ষণের ফল।

নারী পুরুষ বিভাজন নিয়ে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে আপত্তিকর, বিভ্রান্তিকর, বৈষম্যমূলক, বিসদৃশ্য এবং জেন্ডার অসংবেদনশীল বক্তব্য আছে। তাই ধর্মীয় প্রভাবে প্রভাবিত সমাজে ও পরিবারে নারীমুক্তি বিষয়টি গুরুত্ব পায় না।ধর্মের মূলসুর ইহজগতকে গৌণ করে পরকালের জীবনকে মূখ্য করে তোলা; নারী পুরুষের লিঙ্গজ, জৈবিক, প্রাকৃতিকভাবে দৈহিক পার্থক্যকে বড় করে দেখিয়ে নারীকে সামাজিকভাবে অধঃস্তন করে রাখায় ধর্মের ভূমিকা ও অবদান প্রত্যক্ষভাবেই দায়ী। বিষয়টি নিয়ে নারীবাদীরা সংগ্রাম করছেন। নারীর দৈহিক কাঠমোকে ভিত্তি করে সমাজ ও রাষ্ট্র তার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে। আর নারীর এ অধঃস্তন অবস্থা থেকে মুক্তির জন্যই নারী আন্দোলন। আর নারী পুরুষের মধ্যে প্রাকৃতিক ও সামাজিক পার্থক্য নিয়ে উন্নয়ন জগতে gender নামে বহুল আলোচিত একটি ক্ষেত্র রয়েছে।

পরকালে নারীর অবস্থান অধঃস্তন ও কোথাও কোথাও অস্পষ্ট বলে ইহজাগতিক জীবনে নারী বৈষম্যের শিকার হয়। কিন্তু পরকালে নারী পুরুষের লিঙ্গভিত্তিক অস্তিত্ব নিয়েই আরজ আলী মাতুব্বরের প্রশ্ন যা নারী পুরুষের বৈষম্যের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেয়। তিনি প্রাণের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করে একটি মৌলিক প্রশ্ন উপস্থাপন করেছেন,“কেঁচো ও শামুকাদি ভিন্ন যাবতীয় উন্নত জীবেরই নারী-পুরুষ ভেদ আছে, কৃচিৎ নপুংসকও দেখা যায়। কিন্তু জীবজগতে নারী ও পুরুষ, এই দুই জাতিই প্রাধান্য লাভ করিয়াছে। প্রতিটি জীব বা মানুষ জন্মিবার পূর্বেই যদি তাহার স্বতন্ত্র সত্ত্বাবিশিষ্ট প্রাণ সৃষ্টি হইয়া থাকে, তাহা সেই প্রাণেও লিঙ্গভেদ আছে কি? যদি থাকেই, তাহা হইলে অশরীরী নিরাকার প্রাণের নারী, পুরুষ এবং ক্লীবের চিহ্ন কি? আর যদি প্রাণের কোন লিঙ্গভেদ না থাকে, তাহা হইলে এক জাতীয় প্রাণ হইতে ত্রিজাতীয় প্রাণী জন্মে কিরূপে? লিঙ্গভেদ কি শুধু জীবের দৈহিক রূপায়ণ মাত্র? তাহাই যদি হয়, তবে পরলোকে মাতা-পিতা, ভাই-ভগিনী ইত্যাদি নারী-পুরুষভেদ থাকিবে কিরূপে?পরলাকেও কি লিঙ্গজ দেহ থাকিবে?”(প্রথম প্রস্তাব/ আত্মা বিষয়ক)।

কাজেই ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে ভিত্তি করে নারীর প্রতি যে বৈষম্য তা এ প্রশ্নের কাছে খড়কুটোর মতই উড়ে যায়। আর এখানেই তিনি নারী মুক্তি আন্দোলনের একজন সহযোগী হিসেবে স্বীকৃত হন।
( চলবে)

[346 বার পঠিত]