উৎসর্গঃ সিড ব্যারেট, তাঁর চোখ এবং তাঁর চোখের মতো চোখের অধিকারী সকল মানুষ এবং মানুষীদের

সাক্ষাৎকারটা অনুবাদ করা হয়েছে পল রাবিনোর ‘The Foucault Reader’ বই থেকে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন পল রাবিনো, চার্লস টেইলর, মার্টিন জে, রিচার্ড ররটি এবং লিও লয়েনথল

স্থানঃ বার্কলে, এপ্রিল ১৯৮৩

রাজনীতি এবং নৈতিকতাঃ সাক্ষাৎকার

প্রশ্নঃ আমেরিকাতে আজকাল আপনার কাজকে প্রায়ই হ্যাবারমাসের কাজের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। বলা হয়, হ্যাবারমাসের কাজের ক্ষেত্র হচ্ছে রাজনীতি এবং আপনার ক্ষেত্র নৈতিকতা। যেমন হ্যাবারমাস হাইডেগারকে বিবেচনা করেন নিতশের বিধ্বংসী রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিশেবে। তাঁর মতে, জর্মন নব্য রক্ষণশীলতাবাদ হাইডেগারের সাথে সম্বন্ধীয়। তিনি তাদের নিতশের রক্ষণশীল উত্তরাধিকারী ও আপনাকে নিতশের নৈরাজ্যবাদীতার উত্তরাধিকারী বলে মনে করেন। আপনি তো মনে হয় দার্শনিক ধারাকে এভাবে দেখছেন না?

ফুকোঃ সেটা ঠিক। হ্যাবারমাস যখন প্যারিসে ছিলেন, আমাদের সাথে কিছু আলাপ হয়। হাইডেগারের সমস্যা ও রাজনৈতিক ইঙ্গিত বিষয়ক চিন্তা তাঁর কাছে পীড়নমূলক ছিল। তিনি এইসব চিন্তাকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছিলেন, তা আমাকে আলোড়িত করে এবং বেশ চিন্তায় ফেলে দেয়। এ ব্যাপারে আমাকে নতুন করে ভাবতে হবে। হাইডেগারের চিন্তা কীভাবে রাজনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করতে পারে এটা ব্যাখ্যা করার পর হ্যাবারমাস তিরিশের দশকের সুপরিচিত তাঁর একজন কান্টবাদী প্রফেসরের কথা উল্লেখ করেছিলেন। একদিন তিনি কার্ড ক্যাটালগে ১৯৩৪ এর দিকের কিছু লেখা পান যেখানে এই প্রসিদ্ধ কান্টবাদীকে আবিষ্কার করেন আগাগোড়া একজন নাজি হিশেবে। এই ঘটনায় তিনি বিস্মিত এবং হতবাক হয়ে যান।

সম্প্রতি একই ধরণের অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে ম্যাক্স পোলেঞ্জের সাথে। ম্যাক্স পোলেঞ্জ সারাজীবন ছিলেন স্টয়িকবাদের বৈশ্বিক মূল্যবোধের সমর্থক। ১৯৩৪ সালে স্টয়িকবাদের ফিরেটাম বিষয়ক তাঁর একটা লেখা পড়েছিলাম। এই বইয়ের সূচনা, ফিরেসাইডিয়েল নিয়ে সমাপনি এবং নাজিদের গুরুর নির্দেশনায় সত্যিকার মানবতাবাদের ধারণাটা আপনি আবার পড়তে পারেন। হাইডেগার এমন আপত্তিকর কিছু লেখেন নি। আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ঘটনা মোটেই কান্টবাদ বা স্টয়িকবাদকে অভিযুক্ত করে না।

কিন্তু আমি মনে করি আমাদের কিছু ব্যাপার বিবেচনায় আনা উচিত; দার্শনিক ধারণা এবং আসল রাজনৈতিক মনোভাবের প্রবণতার মধ্যে সূক্ষ্ম একটা ‘বৈশ্লেষিক’ যোগসূত্র আছে। ‘শ্রেষ্ঠ’ তত্ত্বগুলো কখনোই খুব কার্যকরভাবে বিধ্বংসী রাজনৈতিক পথ থেকে বাঁচার সুরক্ষা দিতে পারে না। মানবতার মতো কিছু মহৎ বিষয় যে কোনভাবে, যে কোন খাতিরে ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে পোলেঞ্জের হিটলারতোষণের কথাই বলতে পারি।

তবে আমি এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে আসছি না যে একজন তত্ত্বের দোহাই দিয়ে যা খুশী বলতে পারেন। কিন্তু অন্যভাবে বলতে গেলে, প্রতিটা মুহূর্তে ধাপে ধাপে একজন কী চিন্তা করছে এবং বলছে তাঁর সাথে সে কী করছে এবং সে আসলে কী- এসব ব্যাপারে কাউকে তাঁর সম্মুখীন করানো দরকার। অর্থাৎ দায়সম্মত, বিচক্ষণ এবং ‘পরীক্ষামূলক’ মনোভাব খুব জরুরি। কেউ যখন আমাকে বলে ‘আমি নিতশে থেকে ধার করছি, আর নাজিরা নিতশেকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে’- সে কথায় আমি খুব একটা গুরুত্ব দেই না। অন্যদিকে, আমি সবসময়ই চেষ্টা করেছি ক্ষমতা সম্পর্কগুলোর ঐতিহাসিক এবং তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, প্রতিষ্ঠান এবং জ্ঞান, আন্দোলন, সমালোচনা ব্যাপারগুলোকে যতটা সম্ভব একসাথে সম্পর্কিত করে বাস্তবিক কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি করতে। আমি যদি এই সবকিছুর ‘অনুশীলন’ এর ওপর জোর দিয়ে থাকি, তাঁর কারণ এই না যে এগুলো ‘প্রয়োগ’ করতে হবে বরং এগুলোকে পরীক্ষা এবং সংশোধন করাই উদ্দেশ্য। কোন দার্শনিকের ব্যক্তিগত কাব্যিক মনোভাবের চাবিকাঠি যুক্তিগত ভাবে তাঁর চিন্তায় অন্বেষণ না করে তাঁর দর্শন হিশেবে জীবন, দার্শনিক জীবন এবং বৈশিষ্ট্য থেকেই আবিষ্কার করা উচিত।

যুদ্ধের সময় যেসব ফরাসি দার্শনিকেরা প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে ক্যাভালিস অন্যতম। গণিতের ইতিহাসিবিদ হিশেবে তিনি এর অন্তর্গত কাঠামোর বিকাশ সম্বন্ধে আগ্রহী ছিলেন। সেই সময় সার্ত্রে, সিমন দা বুভুয়া, মার্ল পন্টি- ‘এঙ্গেইজমেন্ট’ দর্শনের কেউই কিছু করেন নি।

প্রশ্নঃ এটা কি আপনার ঐতিহাসিক কাজেও প্রয়োগযোগ্য? আমার কাছে মনে হয় আপনি যতটা চান তার থেকেও বহুলভাবে রাজনৈতিক চিন্তাবিদ হিশেবে আপনার পাঠ নেয়া হচ্ছে। নাকি আরও বেশী? আপনাকে নিতশের নৈরাজ্যবাদী উত্তরাধিকারী বলে চিহ্নিত করা সম্পূর্ণই ভুল ধারণা। এটা আপনার কাজকে ভুল খাতে নিয়ে যাচ্ছে।

ফুকোঃ আমি এটার সাথে কমবেশী একমত হবো যে রাজনীতির থেকে নৈতিকতার দিকেই আমার আগ্রহ অথবা যে কোন ক্ষেত্রে, নৈতিকতা হিশেবে রাজনীতি।

প্রশ্নঃ এই কথা কী আপনার পাঁচ-দশ বছর আগের কাজে, যখন আপনাকে সেলফ কিংবা সাবজেক্টের ইতিহাসবিদের থেকে ক্ষমতার ইতিহাসবিদ বলে বিবেচনা করা হতো, সেগুলোর জন্যেও গ্রহণযোগ্য? আসলে এসব কারণেই আপনাকে একজন বিকল্প রাজনৈতিক দ্রষ্টার প্রবক্তার থেকে রাজনৈতিক দর্শনহীন হিশেবে দেখা হয়েছে কিংবা মার্ক্সবাদী আর হ্যাবারমাসবাদীরা তাঁদের প্রতিপক্ষ বলে বিবেচনা করেছেন।

ফুকোঃ প্রথম থেকেই মার্ক্সসিস্ট, ডানপন্থী কিংবা মধ্যপন্থি সবাই আমাকে শত্রু মনে করেছে। আমি মনে করি আমার কাজ যদি রাজনৈতিক হয়, তাহল এটা শেষমেশ কোথাও নিজের জায়গা খুঁজে নেবে।

প্রশ্নঃ কোথায়?

ফুকোঃ জানি না। রাজনৈতিক হলে অবশ্যই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্থান করে নিবে। আমার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ক্ষেত্রকে সামনে নিয়ে এসে ইতিহাস কিংবা দর্শনের মতো তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা; এমন কিছু সমস্যা যেগুলোকে পূর্বে কখনোই গণনার আওতায় আনা হয় নি। যে প্রশ্নগুলো করতে চাচ্ছি তাঁর কোন কিছুই কোন পূর্বসিদ্ধ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা নির্ধারিত নয় এবং নির্দিষ্ট কোন রাজনৈতিক প্রকল্পের দিকেও তা ইঙ্গিত দেয় না।

মানুষ আমাকে অভিযুক্ত করে কারণ আমি সামগ্রিক কোন তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড়া করাই নি। এই অভিযোগ কী অর্থ প্রকাশ করে তা জানি, কিন্তু আমি জোরালোভাবেই বিশ্বাস করি রাজনীতি যে সামগ্রিক তত্ত্বের কথা বলে সেটা খুবই সীমাবদ্ধ। ‘বিমূর্ত’ এবং ‘সীমাবদ্ধ’ সামগ্রিকতার বদলে আমি চাই সমস্যাগুলো নিয়ে যতটা সম্ভব ‘নিরেট’ এবং ‘সাধারণভাবে’ আলোচনা করতে। সেইসব সমস্যা যার পশ্চাতে তির্যকভাবে রাজনীতি কাজ করে, বা সেসব সমস্যা যেগুলো একেবারেই আমাদের ইতিহাসের উপাদান এবং সেই ইতিহাস দ্বারাই নির্মিত। যেমন প্রকৃতিস্থতা এবং অপ্রকৃতস্থতার সমস্যার মধ্যসম্পর্ক, অসুস্থতার প্রশ্ন, অপরাধের প্রশ্ন, যৌনতার প্রশ্ন। ঐতিহাসিক, নৈতিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক অথবা বর্তমান সময়ের প্রশ্ন হিশেবে- যেকোন দিক থেকেই এই প্রশ্নগুলোকে তুলে ধরা উচিত।

প্রশ্নঃ এবং এমন কোন স্রোতের মধ্যে কোথাও অবস্থান নেয়া দুরূহ ব্যাপার, কারণ এগুলো নির্ধারিত হচ্ছে অন্যদের দ্বারা…

ফুকোঃ আমার মনে হয়, এই ধরণের বহুমাত্রিকএবং নানামুখী প্রশ্নগুলোকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জায়গা থেকে নির্ধারণ করা কষ্টকর। এমনও মার্ক্সসিস্ট আছে যারা আমাকে বলেছেন আমি পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের জন্যে হুমকিস্বরূপ। একজন সাম্যবাদী আমাকে বলেছেন আমার সাথে সবচেয়ে বেশী সাদৃশ্য আছে মেইন ক্যাম্ফের হিটলারের। উদারনৈতিকদের কাছে আমি আমি বিবেচিত হয়েছি টেকনোক্র্যাট বলে, যে কী না ফরাসি দেশের একজন এজেন্ট বৈ কিছু নয়। মানুষ আমাকে ডানপন্থী, গউলিস্ট হিশেবে বিবেচনা করেছে অথবা একজন ভয়ংকর বামপন্থি নৈরাজ্যবাদী হিশেবে। একজন আমেরিকান অধ্যাপক বলেছে আমার মতো একজন গুপ্ত মার্ক্সবাদীকে কেন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এরকম বহু কথাই শুনেছি। খুব ভালো, এসবের কোনকিছুতেই কিছু আসে যায় না। আমি মনে করি আমরা একইভাবে গণ্য হয়েছি। আপনিও। এটা কোনভাবেই নিজের অবস্থার জন্যে সৃষ্ট কোন ব্যাপার না। কিন্তু ধরে নিতে পারো, এই ধরণের নীত-জ্ঞানতত্ত্বীয়- রাজনৈতিক প্রশ্ন করলে কেউই কোন সুনির্দিষ্ট অবস্থান গ্রহণ করবে না।

প্রশ্নঃ নৈতিকতার লেবেল লাগানোটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে, কিন্তু একটা কথা বলতেই হবে আপনি সেভাবে গভীর দূরদর্শী নন। ফরাসি সমাজের খুব নির্দিষ্ট একটা অংশ নিয়ে আপনি কাজ করছেন। আপনার কাজগুলো কৌতূহলোদ্দীপক এবং সম্ভবত যেভাবে আপনি কাজগুলো করেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সেটা খুবই চ্যালেঞ্জিং একটা বিষয়। সেটা হচ্ছে, একটা অ্যানালাইসিসকে এমন একটা প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করেছেন, যেটা নিজে আদর্শিক না এবং নামকরণেও বেশ কষ্টসাধ্য। আপনি অন্য লোকদের সাহায্য করছেন তাদের সংগ্রামকে একটা সুনির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিতে। এটা নিশ্চিতভাবেই নীতির প্রশ্ন। আমি যদি সেভাবে বলি, তাহলে ‘থিওরি’ এবং ‘প্র্যাক্টিসের’ যে সংযোগটা- যেটা গড়ে ওঠে এই দুটার সংযোগে। চিন্তা এবং ক্রিয়া নৈতিকতার দিক থেকে সংযুক্ত, কিন্তু যেটার ফলাফল আছে সেটা নিশ্চয়ই রাজনৈতিক।

ফুকোঃ হ্যাঁ, কিন্তু আমি মনে করি নীতিশাস্ত্রও একটা চর্চা। আচ্ছা এমন একটা উদাহরণ নেয়া যাক যেটা সবাই বুঝতে পারবে। এক্ষেত্রে পোল্যান্ডের উদাহরণটার কথা বলা যায়। আমরা যদি পোল্যান্ডের প্রশ্নটা রাজনৈতিকভাবে উত্থাপন করি, তাহলে খুব সহজেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতে পারি যে আমাদের কিছু করার নেই। ওয়ারশকে মুক্ত করতে ইচ্ছা করলেই আমরা সেখানে প্যরাট্রুপার কিংবা সাঁজোয়া যান পাঠাতে পারি না। আমাদের এটাকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করতে হবে। কিন্তু আমি এটাও মনে করি, নৈতিক কারণেই সেখানকার অগ্রহণযোগ্য অবস্থার বিরুদ্ধে এবং আমাদের নিজেদের সরকারের নীরবতার বিরুদ্ধে সরব হতে হবে। এটা নৈতিকতার উদাহরণ, এবং একই সাথে রাজনৈতিক। শুধু বললেই হবে না ‘আমি প্রতিবাদ করছি’ কিন্তু সেই দাবিটাকে একটা রাজনৈতিক রূপ দিতে হবে যাতে সেই প্রতিবাদটা ফলপ্রসূ হয়। যারা এখানে কিংবা ওখানে সরকার নিয়ন্ত্রণ করে, তখন সেটাকে আমলে নিতে বাধ্য হবে।

প্রশ্নঃ হানা আরেন্ডট আর হ্যাবারমাসের একটা রাজনৈতিক দর্শন আছে, যেখানে ক্ষমতার সম্ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণের সম্পর্কের থেকে সমাবেশ, সংগঠিত হওয়ার ক্রিয়া হিশেবে দেখা হয়। ক্ষমতা সেখানে ঐকমত্য, আন্তবিষয়ক ক্ষেত্র কিংবা সাধারণ ক্রিয়া বলে বিবেচিত যেটা আপনার কাজকে অস্বীকার করে। এটাতে বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। সম্ভবত, এই জায়গা থেকে আপনাকে রাজনীতিবিরোধী বলা যায়।

ফুকোঃ আচ্ছা, সেক্ষেত্রে কিছু সাধারণ উদাহরণ দেয়া যায় যেগুলো আপনার দেয়া থিমের বাইরে যাবে না। আমরা যদি বিচারব্যবস্থার দিকে তাকাই তাহলে নানারকম প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি ক্রমাগত। আমরা অনেকেই জানি অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই পেনাল জাস্টিসকে অন্য ছাঁচে চালিত করার চেষ্টা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাকে ইউএসএতে বলা হচ্ছে ‘ইনফর্মাল জাস্টিস’, ফ্রান্সে বলা হছে ‘সোসাইটাল জাস্টিস’। এটার মানে দাঁড়াচ্ছে এটা বাস্তব যে কিছু গোষ্ঠী এবং গোষ্ঠীনেতাকে আসলেই কর্তৃত্বের ভার দেয়া হচ্ছে। এই কর্তৃপক্ষ অন্যান্য আইন মানে এবং তাদের অন্যান্য চলকও দরকার কিন্তু সাধারণভাবে দেখলে তারা কিছু ক্ষমতার প্রভাবও সৃষ্টি করে যেটা সঙ্গত না এবং রাষ্ট্র দ্বারা অনুমোদিতও নয়, এবং তারা একই কর্তৃত্বের আওতাধীন নয়। এখন আপনার প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা নির্দিষ্ট একটা সময়ে অন্যান্য রাজনৈতিক ধারার নিয়ন্ত্রক নীতি কিংবা সমালোচনামূলক নীতি হিশেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না সেটা ক্ষমতার সম্পর্কওগুলোর সমাধান দিয়ে দেয়।

প্রশ্নঃ কিন্তু আমি এই বিষয়ে হানা আরেন্ডট থেকে শুরু করে একটা প্রশ্ন করতে পারি? আরেন্ডট ‘ক্ষমতা’ শব্দকে রেখেছিল দুই দিকের এক দিককে মনে রেখে। কিন্তু এই টার্মটাকে আরও বৃহৎ প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা যাক। বলতে পারি, সে ক্ষমতার দুই দিকের সম্ভাবনাই দেখেছিল। মানুষের কিছু সম্পর্ক আছে যেগুলো ছাড়া কিছু ব্যাপার অন্য কোনভাবে সমাধান করা যেত না; কিছু জায়গায় জনমানুষ এমনভাবে ক্ষমতা সম্পর্ক দ্বারা সংযুক্ত, যেটা তাদের বেশ কিছু ব্যাপারে সম্পাদন করতে সমর্থ করে। এটা অন্য কোনভাবেই সম্ভব না। এই সামর্থ্য তাদের একটা নির্দিষ্ট সাধারণ সিদ্ধান্তের আস্থা দেয়; যেখানে অধীনতার সম্পর্কও আছে। আর তার কারণ সেই সাধারণ প্রক্রিয়ায় পৌঁছাতে নেতার দরকার। কিন্তু আরেন্ডটের মতে, এটা কোনভাবেই আধিপত্যের সম্পর্ক না। এবং ক্ষমতার আরেকটা দিক আছে, যেখানে কিছু মানুষের ওপর আধিপত্যের সম্পর্কটাই প্রধান হয়ে দেখা দেয়। আপনি কি ক্ষমতার এই দুই দিকের স্বীকৃতি দিন? নাকি দ্বিতীয় দিকটার ওপরই বেশি জোর দিতে আগ্রহী?

ফুকোঃ ক্ষমতার আধিপত্যের ব্যাপারটা উল্লেখ করে আপনি মূল ব্যাপারটাকে তুলে এনেছেন। এমনকী আমি মনে করি, আরেন্ডেটের অনেক বিশ্লেষণ কিংবা তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সম্পর্কের আধিপত্যের ব্যাপারটা ক্ষমতার আধিপত্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে মনে হয়- যদিও আমি বিস্মিত হই এই পার্থক্যটা কী শুধুই মৌখিক কী না; যার জন্যে আমরা স্বীকার করি নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা সম্পর্ক এমনভাবে প্রোথিত যে বৈশ্বিকভাবে আধিপত্যের একটা প্রভাব তৈরি করে। কিন্তু ক্ষমতার এই অন্তর্জাল কোন নিষ্পত্তিমূলক পার্থক্যে খুব কমই পৌঁছায়।

আমার মনে হয়, এই সাধারণ থিম থেকে আমাদের প্রখর বিবেচক এবং পরীক্ষামূলক হতে হবে। যেমন শিক্ষাবিজ্ঞানবিষয়ক সম্পর্কে, মানে শিক্ষার সম্পর্কে; সবচেয়ে বেশি জানাশোনা ব্যক্তি থেকে কম জানাশোনা ব্যক্তির যে ধারা সেটা শুধু আত্ম পরিচালনার শ্রেষ্ঠ ফলাফল থেকে তৈরি হয় না। এমন কোন প্রমাণ নেই। অন্যভাবে, সেই পথ কোন বাঁধাও না। আমি শুধু বলতে চাই, সার্বিকভাবে আমাদের সব খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

প্রশ্নঃ যদি কেউ মনে করে ঐকমত্যের কাঠামো একটা কল্পকাহিনীমূলক সম্ভাব্যতা, মানুষ তবু তাহলে সেই কল্পকাহিনীর মতো কাজ করতে পারে যেখানে ফলাফল ক্রিয়ার থেকে বড় হতে যাবে। সেটা রাজনীতির স্তিমিত মূল্যায়নের আধিপত্য এবং বঞ্চনার ক্ষেত্র থেকেই ঘটবে। পরীক্ষামূলক পথেও সেটা ঠিক হতে পারে কিন্তু ইউটোপিয়ান বাস্তবতা কখনই অর্জন সম্ভব না। কিন্তু প্রায়োগিকভাবে এটা কিছুটা ভালো, সুস্থ, মুক্ত তথা যে কোন ধরণের ধনাত্মক মূল্যবোধের হাতিয়ার হতে পারে, যদি আমরা মনে করি ঐকমত্য একটা লক্ষ যেটাকে আমরা অসম্ভব বলে ছুড়ে ফেলার থেকে আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ বলে চালিয়ে দেয়া যায়।

ফুকোঃ হ্যাঁ, ঠিক, আমরা সেটাকে বলতে পারি, সমালোচনামূলক নীতি…

প্রশ্নঃ নিয়ন্ত্রক নীতি হিশেবে?

ফুকোঃ আমি সম্ভবত নিয়ন্ত্রক নীতি বলবো না। সেটা খুব বেশি দূরে চলে যাচ্ছে। কারণ আপনি যখনই বলছেন ‘নিয়ন্ত্রক নীতি’, আপনার বিবেচনা হচ্ছে ঘটনাটা সংগঠিতভাবে এই কর্তৃত্বের মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতার সাথে নিহিত যেটাকে অভিজ্ঞতা কিংবা পরিপ্রেক্ষিতের বিচারে সংজ্ঞায়িত করা যায়। আমি আমার কাজকে সমালোচনামূলক চিন্তার একটা ধারা বলে মনে করি; মানে একজনকে জিজ্ঞেস করা কোন ক্ষমতা-সম্পর্কে কতো অনুপাতে ভিন্নমতের আভাস বিদ্যমান এবং এই ভিন্নমতের মাত্রা কী প্রয়োজনীয় না অপ্রয়োজনীয়। এবং তারপর একজন কেউ সব ধরণের ক্ষমতা সম্পর্ককে প্রশ্ন করতে পারে। আমি এতদূর বলতে পারি, সম্ভবত কারো অবস্থান ঐকমত্যের জন্যে না হয়ে ভিন্নমতের বিরুদ্ধে হওয়া উচিত।

প্রশ্নঃ অধীনতার সমস্যা আর বিন্যাসের সমস্যা তো এক না। বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়ই মতৈক্য, স্বাধীনতা, আত্মপ্রকাশের নাম করে পুরো ভিন্ন একটা ক্ষমতার প্রান্তর দেখতে পাই , যেটা খুব কঠোরভাবে আধিপত্য না, কিন্তু খুব আকর্ষণীয়ও নয়। আমার মতে ক্ষমতা বিশ্লেষণী ধারার একটা বড় অগ্রসরতা ছিল আধিপত্যের কিছু পরিকল্পনাকে দেখানো, যেগুলো খুব সাজানো নয় বলে বিপদজনকও নয়।

ফুকোঃ শৃঙ্খলিত ক্ষমতা হচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠানে যেটা চর্চা করা হয়, চর্চা করা হয়েছে। মূলত যেটাকে ইর্ভিং গফম্যান বলেন সামগ্রিক প্রতিষ্ঠান- এই ধরণের ক্ষমতা সম্পূর্ণই নির্দিষ্ট। এটা একটা সূত্র যেটা আবিষ্কৃত হয়েছে একটা নির্দিষ্ট সময়ে কীভাবে এটা কিছু ফলাফল দিয়েছে, যার কিছুটা সম্পূর্ণই অসহনীয় অথবা কিছুটা অসহনীয় ইত্যাদি। কিন্তু পরিষ্কারভাবেই বলা যায়, এই কাঠামো সব ধরণের ক্ষমতা সম্পর্কগুলো এবং তার সম্ভাবনাগুলোকে উপস্থাপন করতে পারে না। ক্ষমতা কোন শৃঙ্খলা না, কিন্তু শৃঙ্খলা হচ্ছে ক্ষমতার সম্ভাব্য প্রক্রিয়া।

প্রশ্নঃ কিন্তু যেটা একেবারে আধিপত্যের সম্পর্ক না, সেখানে কি শৃঙ্খলার কোন সম্পর্ক নেই?

ফুকোঃ অবশ্যই, ঐকমত্যের শৃঙ্খলা অবশ্যই আছে। আমি যা অর্জনের চেষ্টা করেছি যা অর্জন করতে চেয়েছিলাম, তার সীমা নির্দেশ করতে। সেটা হচ্ছে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের বিশ্লেষণ, কিংবা আত্মচালিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ কর্তৃত্বের কৌশল বিশ্লেষণ এবং আরও। এই বিশ্লেষণগুলো আমার মনে হয়, কোন ভাবেই সম্ভাব্য সকল ক্ষমতা সম্পর্কের কোন সাধারণ বিশ্লেষকের সাথে তুলনা করা যাবে না।

[267 বার পঠিত]