[পর্ব-১]
[পর্ব-২]

ফাইনম্যান বুঝতে পারলো আরলিন তাকে কী বলবে। যাবার আগে ওয়ালেটটা দেখে নিল চিঠিটি আছে কি না। অন্তত আরলিনকে পুরো ব্যাপারটা বুঝানো যাবে।

আরলিনদের বাড়িতে গিয়ে সোজা আরলিনের ঘরে চলে গেল ফাইনম্যান। আরলিন বললো, “বসো এখানে।”

ফাইনম্যান বসলো তার বিছানায়। আরলিন বসলো ফাইনম্যানের সামনে। চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, “এবার বলো, আমার কি আসলেই গ্ল্যান্ডুলার ফিভার হয়েছে নাকি হড্‌জকিন্স ডিজিজ?”
“হড্‌জকিন্স ডিজিজ” বলেই ওয়ালেট খুলে চিঠিটা হাতে নিল ফাইনম্যান।
“ওহ্‌ মাই গড” আরলিন আর্তনাদ করে উঠলো।
“তোমাকে তো নরকে যেতে হবে রিচার্ড।”

আরলিন বিশ্বাস করে মিথ্যে বললে নরকে যেতে হয়। সে ফাইনম্যানের জন্য চিন্তা করছে, অথচ রিচার্ড তার বিশ্বাসভঙ্গ করেছে।

আরলিনকে সব বলল ফাইনম্যান। তাকে চিঠিটা দিয়ে বললো, “আরলিন, তোমার কাছে মিথ্যে বলতে আমি বাধ্য হয়েছি। কিন্তু তারপর থেকে আমি শান্তি পাচ্ছি না।”
“তুমি এটা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছো আমি বুঝি। যা হবার হয়েছে। কিন্তু আর কখনো আমাকে মিথ্যা কথা বলো না প্লিজ।”

হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসা অবধি আরলিন দোতলার ঘরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বুঝতে চেষ্টা করতো নিচে কে কী করছে। সে দেখলো তার মা ভীষণ কান্নাকাটি করছে।

সে ভাবতে লাগলো, “আমার যদি গ্ল্যান্ডুলার ফিভারই হয়ে থাকে তাহলে মা এত কাঁদছে কেন? তবে কি আমার হড্‌জকিন্স ডিজিজ হয়েছে? কিন্তু রিচার্ড তো বলেছে আমার গ্ল্যান্ডুলার ফিভার। তবে কি রিচার্ড মিথ্যা কথা বলেছে? তা কীভাবে হবে? তবে কি এমন কিছু হয়েছে যে রিচার্ড মিথ্যে বলতে বাধ্য হয়েছে?” এরকম ভাবতে ভাবতে ফাইনম্যানকে ডেকে এনেছে সে।

আরলিনকে এখন অনেক শান্ত দেখাচ্ছে। খুবই শান্তভাবে আরলিন এবার প্রশ্ন করলো ফাইনম্যানকে, “ওকে, আমার হড্‌জকিন্স ডিজিজ। এখন তুমি কী করবে?”

তাদের দু’জনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কী হবে জানতে চাচ্ছে আরলিন।
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির একটি স্কলারশিপ আছে ফাইনম্যানের। কিন্তু ওটা থাকবে না যদি তারা এখন বিয়ে করে।

তারা দু’জনই জানে অসুখটার রকম-সকম। মাস দুয়েক ভাল থাকবে, তখন বাসায় থাকতে পারবে। কিন্তু ক’মাস পরেই অবস্থা খারাপ হবে, তখন হাসপাতালে থাকতে হবে। এভাবে টানা-হ্যাঁচড়ার মধ্যে থাকতে হবে যতদিন বাঁচে। বড়জোর আর দু’বছর বাঁচবে আরলিন।

ফাইনম্যানের পিএইচডি তখন মাঝপথে। এসময় চেষ্টা করলে বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিতে একটা রিসার্চের চাকরি হয়তো পেতে পারে সে। তখন হয়তো কুইন্সে একটা এপার্টমেন্ট ভাড়া করে থাকতে পারবে যা তার ল্যাবরেটরি আর আরলিনের হাসপাতাল থেকে কাছে হবে। প্রিন্সটনের স্কলারশিপটা গেলেও মোটামুটি চলতে পারবে।

ফাইনম্যান সিদ্ধান্ত নিলো কয়েক মাসের মধ্যেই সে আরলিনকে বিয়ে করবে। সেই বিকেলেই সে আর আরলিন তাদের ভবিষ্যতের ছক এঁকে ফেলল অনেকদূর।

বেশ কিছুদিন থেকেই ডাক্তাররা চাচ্ছিলেন আরলিনের টিউমারটার একটা বায়োপ্‌সি করতে। কিন্তু আরলিনের বাবা-মা রাজি হচ্ছিলেন না। তাঁদের কথা হলো, “কেন শুধু শুধু কষ্ট দেবে মেয়েটাকে? যে ক’দিন বাঁচে শান্তিতে বাঁচতে দাও।”

কিন্তু ফাইনম্যান চাচ্ছিল যত বেশি তথ্য পাওয়া যায় ততই ভাল। আরলিনকে বুঝিয়ে আরলিনের সাহায্যেই তার বাবা-মাকে রাজি করালো।

এর কয়েকদিন পর আরলিন ফোন করে ফাইনম্যানকে বললো, “আমার বায়োপ্‌সি রিপোর্ট এসেছে।”
“ভাল না খারাপ?”
“বুঝতে পারছি না। তুমি এসে দেখে যাও।”
ফাইনম্যান আরলিনের বাড়িতে গিয়ে রিপোর্ট দেখল। রিপোর্টে লেখা আছে – tuberculosis of the lymphatic glands.

আরে এটাতো লিম্ফেটিক গ্ল্যান্ডের অসুখগুলির তালিকার শুরুতেই ছিল যেটা সহজে নির্ণয় করা যায়। অথচ ডাক্তাররা নির্ণয় করতে পারছিল না বলে ফাইনম্যান ভেবেছিল আরলিনের ওটা হয়নি। ফাইনম্যান নিজেও তেমন গুরুত্ব দেয়নি সেটাকে। যে ডাক্তারটা ছুটে এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন থুতুর সাথে রক্ত যায় কিনা তিনি সঠিক প্রশ্নই করেছিলেন। লিম্ফেটিক গ্ল্যান্ডের টিউবারকিউলোসিসের লক্ষণ ওটা। ঐ ডাক্তারটা হয়তো সঠিক অনুমান করেছিলেন।

আরলিন বললো, “তাহলে আমার মেয়দা দু’বছর থেকে সাত বছর পর্যন্ত বাড়লো। এমনকি তার চেয়ে বেশিও বাঁচতে পারি।”
“অথচ তুমি বলছ ভালো কি মন্দ বুঝতে পারছো না!”
“এখন তো আর আমরা বিয়ে করতে পারছি না” – বিমর্ষভাবে বললো আরলিন।

আর মাত্র দু’বছর বাঁচবে জানার পর আরলিনের দিকটা বিবেচনা করে তড়িঘড়ি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা। এখন আরলিন ভাবছে তার মৃত্যুটা যেমন সাময়িকভাবে পিছিয়েছে বিয়েটাও যদি পিছিয়ে যায়!”

ফাইনম্যান আরলিনকে বোঝাল, “এটা আরো ভালোই হল। বিয়ে আমরা এখনই করবো। তুমি আমার হয়ে আরো কয়েক বছর আমার কাছে থাকবে এটা তো আমার উপরি পাওনা।”

তারা জানতো যে কোন সমস্যার মোকাবেলা করার মতো মানসিক শক্তি তারা অর্জন করেছে। মৃত্যুকে যেখানে মেনে নিয়েছে সেখানে অন্য সমস্যাগুলো কোন সমস্যাই নয়।

তখন বিশ্বযুদ্ধের সময়। আমেরিকার সবচেয়ে মেধাবী বিজ্ঞানীদের নিয়ে শুরু হয়েছে প্রথম পারমাণবিক বোমা প্রকল্প ‘ম্যানহাটান প্রজেক্ট’। পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট উইলসনের আহ্বানে প্রজেক্টের কাজে যোগ দিতে হলো ফাইনম্যানকে। প্রকল্পের তত্ত্বীয় বিভাগের প্রধান ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী হ্যান্স বেথে। টেকনিক্যাল কম্পিউটেশান গ্রুপের লিডার নির্বাচিত হল রিচার্ড ফাইনম্যান। তখন তার বয়স মাত্র তেইশ।

প্রজেক্ট থেকে কিছুদিনের ছুটি নিয়ে পিএইচডি থিসিসটা লিখে ফেললো ফাইনম্যান। পিএইচডি ডিগ্রি পাবার সাথে সাথে সে বাড়িতে জানিয়ে দিল “আরলিনকে আমি বিয়ে করছি”।

সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া হলো ফাইনম্যানের বাবার। ফাইনম্যানকে নিজের হাতে মানুষ করেছেন তিনি। তাঁর আশা আকাঙ্খা হলো একদিন সফল বিজ্ঞানী হবে ফাইনম্যান। তাঁর ধারণা – এসময় বিয়ে করলে ক্যারিয়ারের ক্ষতি হবে। তাছাড়া তেইশ বছর বয়সটা বিয়ের জন্য খুবই অল্প বয়স।

ফাইনম্যানের বাবার অনেক আজেবাজে ধারণা ছিলো মেয়েদের ব্যাপারে। কোন মানুষ বিপদে পড়লে তিনি সবসময় বলতেন – “ঘটনার পেছনের মেয়েটাকে খুঁজে বের কর। পুরুষ মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হল স্ত্রীলোক। স্ত্রীলোকের ব্যাপারে পুরুষ মানুষ শক্ত না হলে জীবনে উন্নতি সম্ভব নয়।”

বাবা যাই বলুন, কোন কিছুই শুনতে রাজি নয় ফাইনম্যান।

এতকিছু যুক্তির পরেও ফাইনম্যানের বাবার আসল কথা হলো একজন টিউবারকিউলোসিসের রোগীকে বিয়ে করার অর্থ হলো নিজেও অসুস্থ হয়ে যাওয়া। তাদের পুরো পরিবার আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠলো। কাকা-কাকী, মামা-মামী সবাই। তারা তাদের পারিবারিক ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে এলো।

ডাক্তার ফাইনম্যানকে বুঝাতে লাগলেন, “টিউবারকিউলোসিস মারাত্মক রোগ বাপু। এর কাছে এলে তোমারও ওই রোগ হতে বাধ্য। তুমি তো জানো না – আমি ডাক্তার।” ইত্যাদি ইত্যাদি।

ফাইনম্যান বললো, “ঠিক আছে, আমাকে বলুন রোগটা একজনের কাছ থেকে অন্যজনে সংক্রামিত হবে কীভাবে? এটা জানার পরে আমরা দেখবো কী করা যায়।”

ফাইনম্যান ও আরলিন শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারে তখন থেকেই খুব সতর্ক। তারা দু’জনই জানে যে তারা কখনো গভীরভাবে চুমুও খেতে পারবে না।

ডাক্তার বিদায় নিলেন। এবার ফাইনম্যানের মাসীরা তাকে বোঝাতে লাগলেন।
“দেখো, তুমি যখন আরলিনকে কথা দিয়েছিলে তখন তো তুমি জানতে না যে এরকম কিছু হবে। এখন তুমি যদি তাকে বিয়ে না কর তাতে তোমার কোন দোষ হবে না। কথা না রাখার দায়ে কেউ তোমাকে দোষী করতে পারবে না।”
“শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে আরলিনকে বিয়ে করছি এরকম বাজে ধারণা আমার মনেও আসেনি। আমরা পরস্পর ভালবাসি। বিয়েটা তো জাস্ট ফর্মালিটি। মানসিকভাবে তো আমরা বহু আগেই পরস্পর বিবাহিত।”

মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো ফাইনম্যানের। বললো – “কোন স্বামী যদি জানতে পারে তার স্ত্রীর টিউবারকিউলোসিস হয়েছে তখন তোমরা কি স্বামীটাকে বলবে স্ত্রীকে ত্যাগ করতে? ওটাই কি তোমরা চাও?”

ফাইনম্যানের এক মাসী ছাড়া আর কেউ তার পক্ষে ছিলো না। কিন্তু এসময় পরিবারের সবাই যে পরামর্শগুলো দিচ্ছিলো তার কোন মূল্য ছিল না ফাইনম্যানের কাছে। নিজের অবস্থান থেকে একটুও সরলো না ফাইনম্যান।
তার কথা হলো, “আমার সমস্যা আমি ভাল বুঝি। আরলিন এবং আমি ভালভাবেই জানি যে আমরা কী করছি আর কী করবো।”

আরলিনকে সাথে নিয়ে সব পরিকল্পনা করে ফেলল ফাইনম্যান। নিউ জার্সিতে ফোর্ট ডিক্সের ঠিক দক্ষিণ পাশে একটি হাসপাতাল আছে। ফাইনম্যান যখন প্রিন্সটনে কাজ করবে তখন আরলিন থাকবে ঐ হাসপাতালে।

হাসপাতালটি অনেকটা দাতব্য হাসপাতাল। নাম ডেবোরাহ্‌ হসপিটাল। নিউইয়র্কের গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ওম্যান ইউনিয়নের অর্থ সাহায্যে পরিচালিত হতো হাসপাতালটি। আরলিন যদিও গার্মেন্টস ওয়ার্কার ছিলো না তবুও অসুবিধে হলো না ভর্তি হতে।

ফাইনম্যান তখন মাত্র পোস্ট-ডক্টরেট ফেলো। সরকারী একটা প্রজেক্টে খুব কম বেতনে কাজ করছে। তার পক্ষে দামী হাসপাতালের ব্যবস্থা করা তো সম্ভব নয় যেখানে অন্তত শেষ পর্যন্ত আরলিনের দেখাশোনা করতে পারবে ফাইনম্যান।

বাসা থেকে হাসপাতালে যাবার পথে কোথাও তারা বিয়েটা করে ফেলবে এরকম সিদ্ধান্ত পাকা হলো। ফাইনম্যান প্রিন্সটনে গেল কোন গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় কিনা দেখতে।

প্রিন্সটনের গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট বিল উডওয়ার্ড তার স্টেশান-ওয়াগনটা ধার দিতে রাজি হলো। গাড়িটার পেছনের সিটে একটা বিছানা পেতে অনেকটা অ্যাম্বুলেন্সের মতো করা হলো যেন আরলিন ক্লান্ত হলে শুয়ে থাকতে পারে।

সেই সময়টা আরলিনের মোটামুটি একটু ভাল থাকার কথা। মাসখানেক ভালো থাকবে। তারপর আবার খারাপ হবে। তখন হাসপাতালে থাকতে হবে।

অ্যাম্বুলেন্স কাম বিয়ের গাড়ি নিয়ে ফাইনম্যান তার কনেকে আনতে গেল। ফাইনম্যানের মা-বাবা ফাইনম্যানের বিয়ে সমর্থন করেন নি। ফাইনম্যানও ঘর ছেড়ে চলে এসেছে। তার ছোটবোন জোয়ান তখন মাত্র চৌদ্দ বছরের কিশোরী। তার পক্ষে তার ভাইকে সমর্থন করা সম্ভব ছিলো না। ফাইনম্যানের বন্ধুবান্ধবদের খবর দেয়ার সময় নেই। একাই এসেছে আরলিনকে নিয়ে যেতে।

আরলিনের মা-বাবা আরলিনকে গাড়িতে তুলে দিলেন। তাদের গাড়ি যতক্ষণ পর্যন্ত চোখের আড়াল না হচ্ছে ততক্ষণ হাত নেড়ে বিদায় জানালেন তারা।

দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছে ফাইনম্যান। কুইন্স পেরিয়ে ব্রুকলিন হয়ে স্টেনেন আইল্যান্ডের ফেরিতে চাপলো তারা। ফেরিটাকেই তারা ধরে নিলো তাদের রোমান্টিক বোটিং। তারপর রিচমন্ডে গিয়ে ম্যারেজ রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে গাড়ি থামালো ফাইনম্যান।

অফিসটা দোতলা। সিঁড়ি বেয়ে খুব আস্তে আস্তে আরলিনকে নিয়ে উপরে উঠল ফাইনম্যান। রেজিস্ট্রার ভদ্রলোক খুবই ভালমানুষ। সবকিছু দ্রুত করে ফেললেন।

আইনে যা যা লাগে সব লিখে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের কোন সাক্ষী নেই?”
দু’জনেই না সূচক মাথা নাড়ল। ভদ্রলোক পাশের অফিস থেকে দু’জন অফিসার ডেকে নিয়ে এলেন। একজন একাউন্ট্যান্ট, অন্যজন বুককিপার।

২৯শে জুন ১৯৪২ তারিখে নিউইয়র্কের আইন অনুযায়ী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলো আরলিন ও রিচার্ড ফাইনম্যান।
খুব আনন্দ হচ্ছিলো তাদের। বুককিপার ভদ্রলোক ফাইনম্যানকে বললেন, “আপনি এখন বিবাহিত। আপনার স্ত্রীকে এখন চুম্বন করাই নিয়ম।”
খুব সাবধানে আরলিনের চিবুকে ঠোঁট ছোঁয়ালো ফাইনম্যান। তারপর ধীরে ধীরে গাড়ি চালিয়ে তাকে রেখে এলো ডেবোরাহ হসপিটালে।

প্রত্যেক উইক-এন্ডে প্রিন্সটন থেকে আরলিনকে দেখতে যায় ফাইনম্যান। একদিন বাস পৌঁছতে দেরি করলো। ঠিক সময়ে হাসপাতালে যেতে না পারাতে ভেতরে ঢুকতে পারল না ফাইনম্যান। চিন্তায় পড়ে গেল সে। আশেপাশে কোন হোটেলও নেই। ফিরে যাবার কোন বাসও নেই। এখন ঘুমাতে তো হবে।

ভাবল কোন খালি জায়গায় শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দেবে। হাসপাতালের বাইরের বেঞ্চে শুতে গিয়ে ভাবল সকালে লোকজন তাকে ওভাবে দেখলে কী ভাববে? তারচেয়ে বাড়িঘর থেকে দূরে কোথাও গিয়ে ঘুমিয়ে নিলে বেশ হয়।

হাঁটতে হাঁটতে বেশ নির্জনে চলে গেল সে। ঘরবাড়ি নেই আশেপাশে, জায়গাটা ভালো লাগলো। একটা গাছের নিচে শুয়ে ওভারকোটটা জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ক্লান্ত ছিল, তাই ঘুম আসতে দেরি হলো না।

খুব ভোরে ঘুম ভাঙলে দেখে – সে ঘুমিয়ে আছে ময়লার ডিপোতে। ঐ অঞ্চলের সব ময়লা ফেলা হয় সেখানে। তার খুব হাসি পাচ্ছিলো আর নিজেকে খুব পাগল পাগল লাগছিলো।

আরলিনের ডাক্তারটি বেশ ভালো। হাসিখুশি চমৎকার মানুষ। কিন্তু যখন মাসের শেষে ফাইনম্যান আঠারো ডলারের একটা চেক তাঁর হাতে দিত খুব রেগে যেতেন তিনি। বলতেন – “মিস্টার ফাইনম্যান, হাসপাতালে আপনাদের কিছুই দেয়ার দরকার নেই।”

তাদের অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কথা তিনি জানতেন। জানতেন বলেই হাসপাতালের জন্য তার চেক নিতে চাইতেন না। ফাইনম্যান তবুও প্রত্যেক মাসের শেষে চেকটা দিয়ে দেয় হাসপাতালের একাউন্টে। এর বেশি কিছু তো দেয়ার সামর্থ্য তাদের নেই তখন।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে সারা সপ্তাহ কিছুই করার থাকে না আরলিনের। সুস্থ থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, কিন্তু শরীর তার ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। একটু ভাল লাগলেই চিঠি লেখে ফাইনম্যানকে। নানারকম মজা করে তার রিচার্ডের সাথে।

একদিন প্রিন্সটনে ফাইনম্যানের কাছে এক বাক্স পেন্সিল এলো বাই পোস্ট। ঘন সবুজ রঙের পেন্সিলগুলো। গায়ে সোনালী রঙে লেখা আছে “RICHARD DARLING, I LOVE YOU! PUTSY”

পুটসি হলো আরলিনের আদরের নাম।

খুব খুশি হওয়া উচিত ফাইনম্যানের। এটা খুবই ভাল উপহার। আর আরলিনকে সেও খুব ভালবাসে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পেন্সিলগুলো সে ব্যবহার করবে কীভাবে!

ফাইনম্যান ভাবনায় পড়ে গেলো। হয়তো সে প্রফেসর বিগনারকে (Eugene Wigner) একটা ফর্মুলা দেখাতে গেছে বা অন্যকিছু নিয়ে আলোচনা করছে। করার পরে পেন্সিলটা তাঁর টেবিলেই যদি ফেলে আসে পেন্সিলটা পেয়ে কী ভাববেন প্রফেসর বিগনার? আবার এতগুলো পেন্সিল নষ্ট করার মতো অবস্থাও তার নয়। সুতরাং সে একটা ব্লেড নিয়ে পেন্সিলের গায়ের সোনালী অক্ষরগুলো ছেঁচে ফেলে দিল।

আরলিন জানে রিচার্ড কী করতে পারে। পরদিন আরলিনের চিঠি এলো। চিঠিটা শুরুই হয়েছে এভাবে, “পেন্সিল থেকে নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করছো, এটা কি ভাল হচ্ছে রিচার্ড? আমি যে তোমাকে ভালবাসি তারজন্য কি তুমি লজ্জা পাও? তুমি না বলো – what do you care what other people think?”

তারপর একটা দীর্ঘ কবিতা। কবিতার বিষয়বস্তু হলো “আমার ভালোবাসায় যদি তুমি লজ্জা পাও তাহলে তোমাকে মজা দেখাবো ইত্যাদি ইত্যাদি যতরকম মৃদু হুমকি দেয়া যায়।

এর কিছুদিন পরে ম্যানহাটান প্রজেক্টের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ চলে গেলো লস আলামোসের গোপন ল্যাবরেটরিতে। ফাইনম্যানকেও যেতে হল সেখানে।

পারমাণবিক বোমা প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহেইমার সবার ব্যাপারেই সব খবর রাখেন। তিনি জানেন ফাইনম্যানের স্ত্রী খুব অসুস্থ। তিনি আরলিনকে লস আলামোসের সবচেয়ে কাছের হাসপাতালে রাখার ব্যবস্থা করে দিলেন।

এই সবচেয়ে কাছের হাসপাতালটি হলো ফাইনম্যানের অফিস থেকে একশ মাইল দূরে আলবুকারকিতে।

উইকএন্ডে ছুটি থাকে ফাইনম্যানের। আরলিনকে দেখতে যাবার সময় পায় তখন। শনিবার সকালবেলা আলবুকারকির পথে কোন গাড়িকে হাত দেখিয়ে লিফ্‌ট নেয়। বিকেলটা আরলিনের সাথে কাটায়। রাতটা কাটায় আলবুকারকির কোন হোটেলে। রোববার সকালে আবার আরলিনকে দেখে বিকেলে অন্য কারো গাড়িতে চেপে ফিরে আসে লস আলামোসে।

প্রতি সপ্তাহে আরলিনের চিঠি পায় ফাইনম্যান। বেশ মজা করে চিঠি লেখে আরলিন।

একবার একটা পুরনো ওয়ার্ড ওয়ার্ড-পাজল দু’টুকরো করে একটা এনভেলাপে ঢুকিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে ফাইনম্যানকে। ফাইনম্যান দেখলো চিঠিটার সাথে প্রজেক্টের মিলিটারি সিকিউরিটি অফিসারের নোট – “দয়া করে আপনার স্ত্রীকে বলবেন এখানে ধাঁধার খেলা খেলার সময় আমাদের নেই।”

পারমাণবিক বোমা প্রকল্পের পুরো নিরাপত্তা মিলিটারিদের হাতে। তারা সব চিঠিই সেন্সর করে। আরলিনের পাজলগুলো পেয়ে আর্মি অফিসারদের ঘাম বেরিয়ে গেল তার অর্থ বের করতে। শত্রুপক্ষের কোন গোপন সংকেত যে নয় তা প্রমাণ করতে অনেক সময় লেগেছে তাদের। তাই অফিসিয়াল সতর্ক-বার্তা।

ফাইনম্যান পছন্দ করে প্র্যাকটিক্যাল জোক্‌স। মিলিটারিদের বুদ্ধির মাত্রা সম্পর্কে তার খুব একটা শ্রদ্ধা নেই। তাই সে আরলিনকে কিছুই বললো না এ ব্যাপারে।

আরলিনের এরকম পাগলামী চলতে থাকলো। ফাইনম্যানের ভালো লাগে তা, যদিও তার জন্য মাঝে মাঝে তাকে অপ্রস্তুত হতে হয়।

একদিন মে মাসের শুরুতে হঠাৎ দেখা গেলো লস আলামোসে ফাইনম্যানের অফিসের প্রত্যেকের মেইলবক্সেই একটা করে সংবাদপত্র চলে এসেছে। শত শত নিউজপেপার। অথচ কেউই পত্রিকার গ্রাহক নয়।

পত্রিকা খোলার পরেই বিশাল হেডিং “সারা জাতি যথাযোগ্য মর্যাদায় ফাইনম্যানের জন্মদিন পালন করছে”। আলবুকারকির স্থানীয় প্রেস থেকে পত্রিকার মত করে কাগজগুলো ছাপিয়ে আনিয়েছে সে ফাইনম্যানের জন্মদিনের উপহার হিসেবে।

আরলিন সারা পৃথিবীর সাথে খেলতে শুরু করেছে। সারাদিন হাসপাতালে শুয়ে সে আর করবেই বা কী। মাঝে মাঝে ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টায়। আর রাজ্যের যত আইডিয়া মাথায় ভর করে। আর ফাইনম্যানকে লেখে।

একদিন ফাইনম্যানকে পাঠালো রান্নার সামগ্রীর এক বিশাল ক্যাটালগ। যে বস্তুগুলো লাগে বিশাল বিশাল রান্নাঘরে – জেলখানায় বা মিলিটারি ব্যারাকে যেখানে হাজার হাজার মানুষের রান্না হয় এক সাথে।

এই ক্যাটালগ দিয়ে ফাইনম্যান কী করবে বুঝতে পারছিল না। বিশাল বিশাল ডেকচি-পাতিল দিয়ে কী করবে আরলিন?

এর আগেও একবার এরকম করেছিল আরলিন। এম-আই-টিতে পড়ার সময়। তখন পাঠিয়েছিল বিশাল যুদ্ধজাহাজের ক্যাটালগ। ফাইনম্যান জানতে চেয়েছিল, “জাহাজের ব্যাপারটা কী?”
“আমি ভাবছিলাম আমরা বিয়ের পর এরকম একটা জাহাজ কিনবো।”
“তুমি কি পাগল হয়েছো? জাহাজের দাম জানো?”

উত্তরে অন্য একটা ক্যাটালগ এসে পৌঁছালো। এটা একটা লম্বা নৌকা। চল্লিশজনের মত মানুষের জন্য। ধনীলোকের প্রমোদতরী।
আরলিন লিখেছে, “জাহাজ কিনতে না পারলেও এরকম একটা নৌকা আমরা সম্ভবত কিনতে পারি।”
“দেখো তুমি আমাদের সামর্থ্যের বাইরে চিন্তা করছো”
খুব শীঘ্র আরেকটা ক্যাটালগ হাজির। এটা বিভিন্ন রকম ইঞ্জিন চালিত ছোট্ট নৌকা এবং এটা সেটা।
“এগুলোর দামও কিন্তু অনেক বেশি”

এবার এলো ছোট্ট একটা চিরকূট। আরলিন লিখেছে – “তুমি সব সময় ‘না’ বলছো রিচার্ড। এটা কিন্তু তোমার শেষ সুযোগ।”

শেষ সুযোগটা হলো আরলিনের এক বান্ধবীর একটা দাঁড়টানা নৌকা আছে। সে ওটা বিক্রি করবে। দাম পনের ডলার। পুরনো হলেও এখনো সচল। সামারে হয়তো তারা ওটা নিয়ে একটু নৌকাভ্রমণও করতে পারবে। ফাইনম্যানকে নৌকাটা কিনতে হয়েছিল।

এখন এই রান্নাঘরের জিনিসপত্রের আইডিয়াটা আরলিনের মাথায় কেন এলো তা নিয়ে ভাবছে ফাইনম্যান। এরমধ্যেই দ্বিতীয় ক্যাটালগ উপস্থিত। এটা একটা হোটেলের রেস্টুরেন্টের ক্যাটালগ। এর কয়েকদিন পরে যে ক্যাটালগটা এলো তা হলো একটা নতুন সংসারের রান্নাঘরের জিনিসপত্রের ফর্দ।

পরের শনিবারে আরলিনকে দেখতে যখন হাসপাতালে গেল তখন ফাইনম্যান বুঝল আসল ব্যাপারটা কী। আরলিনের রুমে ছোট্ট একটা কয়লার চুলা এসেছে। আঠারো ইঞ্চির মত চওড়া। আরলিন চুলাটা কিনেছে। খুব উৎসাহ নিয়ে বললো সে, “আমি ভাবলাম আমরা ওটাতে রাঁধতে পারবো।”
“এখানে? পাগল হয়েছো? কয়লার ধোঁয়া কী জিনিস জানো?”
“আরে না। এই রুমের ভেতর না। আসলে কী করতে হবে জানো – চুলাটা নিয়ে আমরা সামনের লনে চলে যাবো। প্রত্যেক রবিবার তুমি বাইরে বসে রান্না করবে।”

হাসপাতালটি একদম রাস্তার পাশে। আমেরিকার ইন্টারস্টেট হাইওয়ে রোড সিক্সটি সিক্স চলে গেছে হাসপাতালের সামনে দিয়ে। ফাইনম্যান বললো, “অসম্ভব। আমি পারবো না। রাজ্যের যত ট্রাক গাড়ি দিনরাত চলছে রাস্তায়। লোকজন লনের পাশ দিয়ে সারাক্ষণ আসা যাওয়া করছে। আর আমি সেখানে বসে তোমার জন্য মাংস ভাজবো না? লোকে কী ভাববে বলো?”
“what do you care what other people think?”

ফাইনম্যানের কথা দিয়ে ফাইনম্যানকে খোঁচা দেয় আরলিন। একটা ড্রয়ার খুলতে খুলতে বললো, “ঠিক আছে, তোমাকে এই শেফের টুপি পরতে হবে না। আর গ্লাভসও পরতে হবে না।”
আরলিনের হাতে পুরোদস্তুর হোটেলের শেফের ইউনিফর্ম।
“দেখো তো এই এপ্রোনটা তোমাকে কেমন মানায়?”
ফাইনম্যান দেখলো এপ্রোনের গায়ে লেখা আছে – বারবিকিউ কিং।
আতঙ্কিত গলায় ফাইনম্যান বললো, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, এসব লাগবে না। আমি লনে বসে রাঁধবো।”
এরপর থেকে প্রত্যেক শনিবার বা রবিবার রাজপথের ধারে ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে রাঁধতে লাগল ফাইনম্যান।

ক্রিস্টমাস কার্ড পাঠাবার সময় হয়ে এসেছে ফাইনম্যানের লস আলামোসে আসার কয়েক সপ্তাহ পরেই। আরলিন লিখলো – “চলো আমরা সবাইকে ক্রিস্টমাস কার্ড পাঠাই। আমি কার্ড রেডি করে রেখেছি।”

ফাইনম্যান দেখলো কার্ডগুলো খুবই সুন্দর। কিন্তু তাতে লেখা আছে – ‘মেরি ক্রিস্টমাস ফ্রম রিচার্ড এন্ড পুটসি’।
“এগুলো সবাইকে পাঠানো যাবে না। আমি এনরিকো ফার্মি বা হ্যান্স বেথেকে এগুলো পাঠাতে পারবো না। তাদেরকে আমি এখনো এত বেশি চিনি না যে ডাকনামে কার্ড পাঠানো যায়। তাঁরা এগুলো পেলে কী বলবেন আমাকে?”
“what do you care what other people think?”
সুতরাং ঐ কার্ডগুলোই পাঠানো হলো।

পরের বছর ক্রিস্টমাস আসছে। এর মধ্যে এনরিকো ফার্মি আর হ্যান্স বেথের সাথে ফাইনম্যানের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। তাঁদের বাসায় যায় ফাইনম্যান। তাঁদের ছেলেমেয়েদের সাথেও তার দারুণ বন্ধুত্ব।
এবারের ক্রিস্টমাস কার্ডে আরলিন লিখেছে অত্যন্ত ফর্মাল ভঙ্গিতে – ‘মেরি ক্রিস্টমাস এন্ড হ্যাপি নিউ ইয়ার ফ্রম রিচার্ড এন্ড আরলিন ফাইনম্যান’।
“চমৎকার হয়েছে। এগুলো আমরা সবাইকে পাঠাতে পারবো” বললো ফাইনম্যান।
“আরে না না” প্রতিবাদ করলো আরলিন। “ওগুলো সবার জন্য নয়। ফার্মি বা বেথের মত বিখ্যাত যারা আছেন তাদের জন্য অন্যরকম কার্ড।”

বিখ্যাত ব্যক্তিদের কার্ডে ফর্মাল কথাবার্তার পরে লেখা আছে – “ফ্রম ডক্টর এন্ড মিসেস আর পি ফাইনম্যান।”। সুতরাং বিখ্যাত ব্যাক্তিরা পেলেন সেগুলো। ফাইনম্যানের কাছ থেকে এরকম ফর্মাল কার্ড পেয়ে তাঁরা তো অবাক। এনরিকো ফার্মি ফাইনম্যানকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “এসমস্ত ফর্মালিটি কখন থেকে শুরু হলো ডিক?”

আরলিন শুধু এরকম মজা করেই ব্যস্ত থাকত না। ইতোমধ্যে সে ‘সাউন্ড এন্ড সিম্বল ইন চায়নিজ’ নামে একটা বড় বই জোগাড় করেছে। বইটা খুব চমৎকার। প্রায় পঞ্চাশ রকমের চায়নিজ চিহ্নের ক্যালিগ্রাফি করা আছে উদাহরণ ও ব্যাখ্যা সহ।

আরলিন বইটা থেকে ক্যালিগ্রাফি করতে শুরু করলো। কাগজ ব্রাশ কালি সব জোগাড় করেছে। এমন কি একটা চায়নিজ টু ইংলিশ ডিকশনারিও কিনেছে।

এক শনিবারে ফাইনম্যান এসে দেখে আরলিন ক্যালিগ্রাফি প্র্যাকটিস করছে। কাগজে গভীর মনযোগে একটা একটা চিহ্ন ফুটিয়ে তুলছে। আবার আপন মনেই বলছে – ‘না ঠিক হয়নি, হচ্ছেনা, ভুল হয়েছে’ ইত্যাদি।

এতক্ষণ চুপ করে দেখছিল ফাইনম্যান। আরলিনের কথা শুনে বললো, “ভুল হয়েছে বলতে কী বোঝাচ্ছ? এটা তো মানুষের তৈরি কিছু চিহ্ন। জাস্ট ভাব বিনিময়ের কিছু ভাষা। ঠিক এভাবেই চিহ্নটা প্রকাশ করতে হবে এমন কোন নিয়ম কি আছে প্রকৃতিতে? তোমার যেমন খুশি তেমন চিহ্ন দিয়েই তো তুমি ভাবটা প্রকাশ করতে পারো।”
“সব কিছুর একটা শৈল্পিক দিক থাকে রিচার্ড। আমি ভুল বলতে বোঝাতে চাচ্ছি শিল্পমান সম্মত হয়নি। ক্যানভাসে ব্যালান্সিং বলে একটা ব্যাপার আছে। শুধু শুদ্ধ হলেই চলে না। দেখতে কেমন লাগছে তাও দেখতে হয়।”
“কিন্তু যে কোন ভাবেই হোক, হয়েছে তো চিহ্নটা। এটা হয়তো অন্যরকম সুন্দর।”

আরলিন ফাইনম্যানের হাতে তুলি ধরিয়ে দিয়ে বললো, “এই নাও, নিজে করে দেখাও একটা। তারপর কথা বলও আর্ট সম্পর্কে।”

আর কী করা। বই দেখে দেখে একটা চিহ্ন আঁকলো ফাইনম্যান। কিন্তু মনে হলো ঠিক হয়নি। বললো, “দাঁড়াও এক মিনিট। আরেকটা করতে দাও। এটা একটু মোটা দাগের হয়েছে। মানে সামান্য হিবিজিবি।” ‘ভুল হয়েছ’ বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয় ফাইনম্যান।
“তুমি কীভাবে জানো যে এটা হিবিজিবি হয়েছে? কতটুকু হিজিবিজি হওয়া দরকার তা কি তুমি জানো?

আরলিনের কাছে ফাইনম্যান শিখলো আর্টের বিভিন্ন দিক। আসলে আর্ট একটা আশ্চর্য জিনিস। কোন কিছুর ঠিক নিয়ম নেই, আবার আছেও। এটা গণিত নয়, আবার কোথাও যেন সূক্ষ্ম একটা গাণিতিক মাত্রা আছে। আর্টের প্রতি গভীর ভালোবাসা না থাকলে তা বোঝা যায় না। ফাইনম্যান ক্যালিগ্রাফির প্রতি আকর্ষণ অনুভব করলো।

আরলিনের কাছ থেকে ফাইনম্যান এমন অনেক কিছুই শিখেছে তা তার ভাষায় ঠিক বিজ্ঞান নয়, কিন্তু আকর্ষণীয়। ফাইনম্যান পরবর্তী জীবনে অনেকবার স্বীকার করেছে যে আরলিন তার ভেতর মানবিক গুণাবলী বাড়িয়ে দিয়েছে।

আরলিনের অবস্থা খারাপ থেকে খারাপ হচ্ছে দিনের পর দিন। আরলিনের বাবা নিউইয়র্ক থেকে এসেছেন আরলিনকে দেখতে। যুদ্ধের সময়ে এতদূরে আসা সহজ নয়। আবার খরচও কম নয়। তবুও তিনি এসেছেন। আরলিনের কাছে থাকলেন ক’দিন। ফাইনম্যান তখন লস আলামোসে।

একদিন হঠাৎ আরলিনের বাবার ফোন – “রিচার্ড তুমি এখনি চলে এসো।”

এই সময়টার জন্য মোটামুটি প্রস্তুত ছিল ফাইনম্যান। লস আলামোসে তার বন্ধু ক্লস ফাসকে বলে রেখেছিল যেন তার গাড়িটি ধার দেয়। টেলিফোন পাবার সাথে সাথে ফাইনম্যান গাড়িটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো আরলিনের হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।

পথে দু’জন মানুষ হাত দেখালে ফাইনম্যান গাড়িতে তুলে নেয় তাদের। প্রতি সপ্তাহেই তো সে অন্যের গাড়িতে যায়। আর পথে গাড়ির কিছু হলে তারা সাহায্যও করতে পারবে। সান্টা ফে-র কাছে যেতেই গাড়ির একটা চাকা পাংকচার হয়ে গেলো। সঙ্গী দুজনের সাহায্যে চাকাটা বদলে আবার দ্রুত ছুটল।

কিছুদূর যেতেই আরেকটা চাকা ফেটে গেলো সশব্দে। কাছেই একটা পেট্রোল স্টেশন ছিলো। মেকানিকরা আগের একটা গাড়ি মেরামত করছিল। ফাইনম্যান চুপচাপ অপেক্ষা করছিল কখন তার গাড়িটা ঠিক করার সময় হবে মেকানিকদের। কিন্তু ফাইনম্যানের গাড়ি-সঙ্গীরা এতক্ষণে জেনে গেছে ফাইনম্যানের স্ত্রীর কথা। তারা ওয়ার্কম্যানকে গিয়ে বললো যে তার কত দ্রুত যাওয়া দরকার। তারা দ্রুত এসে তার গাড়ির চাকা বদলে দিলো। পাংকচার হয়ে যাওয়া চাকাটা রেখেই তারা চলে গেল। ওটার জন্য অপেক্ষা করতে গেলে সময় নষ্ট হবে।

আবার ছুটল তারা। ফাইনম্যান এমন হতভম্ব হয়ে গেছে যে মেকানিককে একটা ধন্যবাদ জানাতেও ভুলে গেছে। হাসপাতাল থেকে মাত্র ত্রিশ মাইল দূরে এসে গাড়ির আরেকটা চাকার হাওয়াও চলে গেল। এখন আর করার কিছু নেই। গাড়িটাকে ওখানেই রেখে তারা অন্য গাড়িকে হাত দেখাল। টেলিফোন বুথ থেকে একটা ওয়ার্কশপে ফোন করে জানালো অবস্থা। তারা যেন এসে গাড়িটা ওয়ার্কশপে নিয়ে যায়।

হাসপাতালে ঢুকতেই আরলিনের বাবার সাথে দেখা হলো। তিনি তিন দিন ধরে আছেন এখানে। আরলিনের শেষ অবস্থা। তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না। ফাইনম্যানকে কোনরকমে বললেন, “আমি আর সহ্য করতে পারছি না মেয়েটার কষ্ট। আমি চলে যাচ্ছি।”

শেষবারের মত আরলিনকে দেখল ফাইনম্যান। ভীষণ দুর্বল, কেমন যেন ফ্যাকাশে সাদা। পৃথিবীর কোন কিছু সম্পর্কে যেন তার কোন অনুভূতি নেই। বিছানায় শুয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হা করে শ্বাস নিচ্ছে। বাতাস গিলতে চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। গলায় গব্‌ গব্‌ শব্দ হচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখ দুটো উল্টে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। এভাবে ঘন্টা দুয়েক চেষ্টার পর আরলিন আর পারলো না।

আরলিনের কেবিন থেকে বেরিয়ে হাসপাতালের লনে কিছুক্ষণ অস্থির ভাবে হাঁটাহাঁটি করল ফাইনম্যান। তার খুব আশ্চর্য লাগছিলো। মৃত্যু সম্পর্কে, আপনজনের মৃত্যু ঘটলে আপনজনের অনুভূতি সম্পর্কে তার যে ধারণা ছিলো তার বেলায় তার কিছুই ঘটলো না। খারাপ লাগছিলো ঠিকই কিন্তু তা ভীষণ মারাত্মক রকমের ছিলো না। হয়তো তারা আগে থেকেই ব্যাপারটা জানত বা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল বলেই হয়তো।

ফাইনম্যানের কেমন লাগছিলো বোঝানো মুশকিল। সে ভাবছিল – “আমরা মানুষেরা জানি বাঁচবো বড় জোর সত্তর কি আশি বছর। মরতে তো হবেই। তবুও আমরা হাসি, আনন্দ করি, ভালবাসি। আমরা বেঁচে থাকি। অনেকে হয়তো ভালবেসে একসাথে পঞ্চাশ বছর বেঁচে থাকে। আমি আর আরলিন না হয় মাত্র পাঁচ বছর একসাথে বাঁচলাম। এত গাণিতিক পার্থক্যটা ছাড়া মানসিকভাবে আর তো কোন পার্থক্য নেই। আমরা পরস্পরকে জড়িয়ে এই ক’টা বছর তো অত্যন্ত ভালো সময় কাটিয়েছি।”

আবার আরলিনের কেবিনে এলো ফাইনম্যান। আরলিনের শেষ সময়টা আবার মনে করতে চাই্ল। বুঝতে চাইল তার শেষ শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনটা। আরলিনের ফুসফুস ঠিকমত অক্সিজেন নিতে পারছিল না। রক্তে ঠিকমত অক্সিজেনের জোগান না থাকাতে মস্তিষ্ক কাজ করছিল না। হৃৎপিন্ড দুর্বল হয়ে যাচ্ছিলো – তখন শ্বাস নেয়া আরো কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিল। আরলিন খুব আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলো এবং কোন এক সময় তার শেষ নিঃশ্বাসটা বের হয়ে যাবার পর তার ফুসফুস আর কোন বাতাস টেনে নিতে পারেনি ভেতরে।

আরলিনের নার্সটা এসে নিশ্চিত হয়ে গেলো যে আরলিন মারা গেছে। ফাইনম্যানের দিকে তাকিয়ে দেখলো একটু। তারপরে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

ফাইনম্যান কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিল। তারপর উঠে আরলিনের ঠোঁটে একটা চুমু খেল, শেষ চুম্বন।

আরলিনের চুলের গন্ধ ঠিক আগের মতই আছে, মিষ্টি। হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে গেল ফাইনম্যান। মনে হলো আরলিন মরেনি। কিন্তু পর মুহূর্তেই বুঝতে পারলো মৃত্যুর এত কম সময়ের মধ্যে চুলের গন্ধ পরিবর্তন হওয়া তো সম্ভব নয়।

টেবিল ঘড়িটার দিকে চোখ গেলে চমকে উঠলো সে। ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে নয়টা একুশ মিনিটে। আরলিনের মৃত্যুর পরপরই ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে! এটা কি অলৌকিক কোন কিছু?

ফাইনম্যান দেখলো এত শোকেও তার যুক্তির মৃত্যু ঘটেনি। ঘড়িটা অনেক দিন থেকেই গোলমাল করছিল। ফাইনম্যান নিজেই বেশ কয়েকবার ওটা ঠিক করেছে। এখন আরলিনের মৃত্যুর পর নার্স যখন কেবিনে এসেছিল মৃত্যুর সময় লেখার জন্য ঘড়িটা হাতে নিয়ে দেখছিল। সে সময় হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে পুরনো ঘড়িটা।

পরদিন আরলিনের শেষকৃত্য। মৃতদেহ সৎকার করে যে কোম্পানি তাদের লোকজন এসে আরলিনের কয়েকটি আংটি দিয়ে গেল ফাইনম্যানকে। একজন জিজ্ঞেস করলো সে আরলিনকে আবার দেখতে চায় কিনা।
ফাইনম্যান বললো, ” না। আমি দেখেছি তাকে গতকাল।”

গাড়ির ওয়ার্কশপে ফোন করল ফাইনম্যান। আগের দিন তারা গাড়িটি রাস্তা থেকে তুলে এনে মেরামত করে রেখেছে। গাড়িটি ওয়ার্কশপ থেকে নিয়ে এসে আরলিনের জিনিসপত্র যা ছিল গাড়ির বুটে চাপিয়ে রওনা দিল লস আলামোসের দিকে। এবারো একজন মানুষকে তুলে নিল রাস্তা থেকে।

হাসপাতাল থেকে পাঁচ মাইলও যায়নি – ফটাস্‌স্‌সসসস্‌। গাড়ির অবশিষ্ট চাকা যেটা গতকাল রক্ষা পেয়েছিল সেটা পাংকচার। ফাইনম্যান এমন জোরে চিৎকার করে উঠল যে তার সহযাত্রী তার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিলো যেন সে মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ।
“এটা তো সামান্য একটা টায়ার, ম্যান”
“হ্যাঁ এখন একটা, একটু পরে আরেকটা। তারপরে আরেকটা” – গলায় প্রচন্ড ক্ষোভ ফাইনম্যানের।

কোনরকমে চাকাটা বদলে খুব আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে লস আলামোসে ফিরলো ফাইনম্যান।
সে চাচ্ছিল না তাকে কেউ আরলিনের কথা জিজ্ঞেস করুক বা সান্ত্বনা বাক্য শোনাক। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেই সে খুব সহজভাবে বলছে, “আরলিন মারা গেছে। তা তোমার প্রজেক্টের কাজ কতদূর? ফর্মুলাটা দেখেছিলে?”

সবাই বুঝতে পারলো তার আঘাতটা কত গুরুতর। ফাইনম্যান যন্ত্রের মত তার নোটবই বের করলো যেখানে আরলিনের মেডিকেল কন্ডিশান লিখে রাখতো। লিখলো – ১৬ জুন, ১৯৪৫, আরলিনের মৃত্যু হয়েছে।

১৯৪২ সালের ২৯ জুন বিয়ে হয়েছিল তাদের। আরলিনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো তাদের তিন বছরের অনন্য বিবাহিত জীবন।

লস আলামোসে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে ফাইনম্যান। কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টাটা না বোঝার মত যান্ত্রিক নন ম্যানহাটান প্রজেক্টের বিজ্ঞানীরা। হ্যান্স বেথে জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন ফাইনম্যানকে।
আরলিনকে বিয়ের পর একদিনের জন্যও বাড়ি যায়নি ফাইনম্যান। মা-বাবা আরলিনের সাথে তার বিয়েটা সহজভাবে মেনে নেননি বলে ফাইনম্যানের অভিমান ছিল ভীষণ। এবার আরলিনের মৃত্যুর পর বাড়িতে যেতে হলেও বেশির ভাগ সময় সে দূরে দূরে থাকলো বাড়ির সবার কাছ থেকে। বন্ধুদের সাথে জোর করে হৈ চৈ করে সময় কাটালো।

ক’দিন পরেই ফাইনম্যানকে ফিরতে হলো লস আলামোসে। প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। ১৬ জুলাই ১৯৪৫ ইতিহাস সৃষ্টি হলো পৃথিবীতে। সর্বপ্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হলো – যার নাম দেয়া হলো প্রথম ট্রিনিটি টেস্ট।

আরিজোনার মরুভূমির গ্রাউন্ড জিরো থেকে বিশ মাইল দূরে একটা ট্রাকের ভেতর বসে ফাইনম্যান দেখলো গত কয়েক বছরের মেধা, গবেষণা ও প্রচন্ড পরিশ্রমে যে পারমাণবিক দানব তারা তৈরি করেছে কী প্রচন্ড শক্তি তার।

কয়েক সপ্তাহ পরেই আগস্টের ছয় ও নয় তারিখে জাপানের হিরোশিমা ও নাকাসাকি শহর সমস্ত নাগরিক সহ ধ্বংস করে দেয়া হলো পারমাণবিক বোমা ফেলে।

বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো। কিন্তু সারা বিশ্বের উপর রেখে গেল একটি বিরাট পারমাণবিক কলঙ্কের ছাপ। সেই কলঙ্ক তৈরির দায় এড়াতে পারে না ফাইনম্যান। আরলিনের মৃত্যু এবং তার পরপর এতগুলো ঘটনা ফাইনম্যানকে উদাসীন করে তোলে। তার কেবলই মনে হচ্ছে কী দরকার এসব নগর সভ্যতার। সবই তো এক মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দেবার ক্ষমতা মানুষ একবার যখন অর্জন করে ফেলেছে সে দানবীয় ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটাবে সুযোগ পেলেই।

এসময় এক রাতে আরলিনকে স্বপ্ন দেখল ফাইনম্যান। স্বপ্নে সে এসেছে। ফাইনম্যান স্বপ্নেই তাকে বললো, “তুমি মরে গেছো আরলিন। স্বপ্নেও তোমার আসা ঠিক নয়।”

পরের রাতে আবার স্বপ্ন। এবার সে বললো – “আমি আসলে তোমার উপর বিরক্ত হয়েছিলাম। এখন আবার তোমাকে পছন্দ করতে শুরু করেছি। আমি ফিরে এসেছি।”

মাথা কাজ করছিলো না ফাইনম্যানের। এই স্বপ্ন দেখার কারণ কী? মাথার ভেতর আরলিন থাকবে কেন? কেন সে স্বপ্নে আসা যাওয়া করবে? নিশ্চয়ই সে অবচেতন মনে কিছু একটা করেছে। ভাবতে থাকে ফাইনম্যান।

আরলিনের মৃত্যুর পর এক মাস কেটে গেছে, কান্না আসেনি একবারও। কিন্তু সেদিন ওক রিজের রাস্তায় একটা ডিপার্টমেন্ট স্টোরের পাশ দিয়ে যাবার সময় ফাইনম্যানের চোখে পড়লো চমৎকার একটি ড্রেস, শো কেসে সাজানো।
হঠাৎ মনে হলো আরলিন খুব পছন্দ করতো এটা। খুব আটপৌরে ভাবনা। কিন্তু ফাইনম্যানের চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগলো। আরলিনের মৃত্যুতে ফাইনম্যান কাঁদলো, প্রথম এবং শেষবার।

[পর্ব-৪]

[117 বার পঠিত]