মুক্তিযুদ্ধ।

যে কোনো বিচারেই বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ইতিহাস। বাঙালি তাঁর আত্মোৎসর্গের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শনের মধ্য দিয়ে পেয়েছে তাঁর স্বাধীনতা; যে স্বাধীনতা কেবল একটি ভূ-খণ্ডেরই নয়, যে স্বাধীনতা সামগ্রিক অর্থে তাঁর অবিনাশী মুক্তির চিহ্নমালা। উনিশশো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তাই কেবল নয় মাসের ঘটনাই নয়, এর সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে তেইশ বছরের পাকিস্তানি শাসনের ক্ষত-বিক্ষত আখ্যান, জড়িয়ে আছে বাঙালির উদ্বেল মুক্তি-আকাঙ্ক্ষা।

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি অঙশগ্রহণ করেছিলো কেবল চেতনার আলোতে দাঁড়িয়েই নয়, এর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলো বছরের পর বছর বাঙালির লাঞ্ছনার ইতিহাস। নয়মাসের গেরিলা যুদ্ধ তাই কেবল পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যা-নারী নির্যাতন আর বর্বরতার বিরুদ্ধেই ছিলো না, ছিলো ‘পাকিস্তানি ভূত দর্শন’- এর বিরুদ্ধে এবঙ আরও মোটা দাগে বললে, সাতচল্লিশে যে ধর্মভিত্তিক দ্বি-জাতিতত্ত্বে দেশভাগ হয়েছিলো- তার বিরুদ্ধে। সাঙস্কৃতিক-সামাজিক কিঙবা রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য ছাড়াই পূর্ব-পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান একই অঙশে থাকলো, কেবল ধর্মের ভিত্তিতে। তাই একাত্তরের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির যে বিজয়, তা কেবল পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেই বিজয় নয়; সামগ্রিকভাবেই এ বিজয় ‘পাকিস্তানি অপ-আদর্শ’-এর বিরুদ্ধে এবঙ ধর্মের ভিত্তিকে জাতিগত বিভাজনের বিরুদ্ধে।

একাত্তর পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বাঙালি দেশ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে। কিন্তু একাত্তরে তো কেবল অবকাঠামোরই ধ্বঙস হয়নি, নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে বুদ্ধিজীবী বাঙালিদের যাঁদের মেধার আলো অত্যন্ত প্রয়োজন ছিলো মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশে। বাহাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হলো সঙবিধান, যার পবিত্র স্পর্শে ফুটে উঠলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সূর্য। কিন্তু পঁচাত্তরের পরই দৃশ্যপট বদলে গেলো। এরপর দীর্ঘ সময় বাঙলাদেশ ছিলো সামরিকতন্ত্র ও মোল্লাতন্ত্রের ভয়াল মেঘমালার নিচে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচিত হয়েছে নানাভাবে। তথ্যকেন্দ্রীক এবঙ তত্ত্বকেন্দ্রীক। কিন্তু একটি প্রশ্ন উঠতেই পারে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে কতোটুকু মূল প্রেক্ষাপটকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বা যেটুকু দেযা প্রয়োজন ছিলো, তা উঠে এসেছে। বাঙলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান নানাভাবে আলোচনায় এলেও তা কতোটুকু নারীর গৌরবকে তুলে এনেছে এবঙ কতোটুকু তুলে এনেছে নারীর লাঞ্ছনার ইতিহাস, তা বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ সামগ্রিক প্রশ্নেই একটি যুদ্ধ, যার মধ্যে রয়েছে নারীর গৌরবোজ্জ্বল অঙশগ্রহণের সাতকাহন। অনেকে জীবন বাজি রেখে সশস্ত্র যুদ্ধ করেছেন। ফিরে নাও আসতে পারে জেনেও সন্তানকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দেন। ধরা পড়লে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও অস্ত্র পাচার করেন, অস্ত্র লুকিয়ে রাখেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দান করেন। সাঙগঠনিক কাজে যুক্ত থেকে ঝুঁকি নিয়ে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করেন। ভিক্ষুক সেজে পাক-হানাদারদের ক্যাম্পের তথ্য সঙগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসক দলে, ক্যাম্পে ক্যাম্পে, ফিল্ড হাসপাতালে সেবিকার কাজ করেন। অনেকে ফাস্ট এইড ট্রেনিঙসহ অস্ত্র চালনা ট্রেনিঙ ও গেরিলা ট্রেনিঙ নেন। অনেক নারীই সেদিন বিভিন্ন শিবিরে রান্না-বান্নার দায়িত্ব পালন করেন, কেউবা নিয়োজিত থাকেন জনমত সঙগঠনে ও যুদ্ধের জন্য অর্থ সঙগ্রহ করতে আবার কেউবা গানের স্কোয়াডে অঙশ নিয়ে, স্বাধীন বাঙলা বেতার কেন্দ্রে অঙশগ্রহণ করে শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্লান্তি ভুলিয়ে তাঁদেরকে উজ্জীবিত করতে তৎপর থাকেন। মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে এই নারীদের সাহসী তৎপরতা, উৎসাহ, উদ্দীপনা ও অনুপ্রেরণার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

কিন্তু ১৯৭১ সালের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের উপর সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন গ্রন্থাবলী রচিত হলেও মুক্তিযুদ্ধে নারীদের গৌরবময় অবদানের উপর সুস্পষ্ট তেমন কোনো গ্রন্থ আমার চোখে পড়েনি। এটা আমার ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতাও হতে পারে। তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে গ্রন্থগুলোর সন্ধান লাভ আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে, তার অধিকাঙশই বর্ণনামূলক, যার মূলে রয়েছে স্মৃতিচারণ, ধারাবর্ণনা, সমকালীন রাজনীতি, যুদ্ধের অবস্থা, সাঙগঠনিক দিকের বর্ণনা ও বিশ্লেষণ। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তাঁর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থপঞ্জিতে [১] মুক্তিযুদ্ধের বইকে কতোগুলো বিষয়ভিত্তিক শিরোনামে ভাগ করেছেন, সেগুলো হলো:

ক. মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার প্রয়াস ও মূল্যায়ন;
খ. অবরুদ্ধ দেশ;
গ. প্রবাসী সরকার ও সঙগঠন ইত্যাদি;
ঘ. বিদেশীর দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ;
ঙ. মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন;
চ. জেলা বা শহর পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ;
ছ. গণহত্যা;
জ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন এসব বিভাজন পূর্ণাঙ্গ নয় বলে আরও কিছু সঙযোজন এনে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থপঞ্জি প্রণয়নের চেষ্টা করেছেন [২]। তা হলো:

ক. মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি
খ. মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক ইতিহাস রচনার প্রয়াস বা মূল্যায়ন;
গ. প্রবাসী সরকার ও প্রবাসে বাঙালির প্রতিক্রিয়া;
ঘ. মুক্তিযুদ্ধে বৈদেশিক প্রতিক্রিয়া;
ঙ. পাকিস্তানি ও পাকিস্তনপন্থীদের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ
চ. মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গন বা সশস্ত্র সঙগ্রাম;
ছ. অবরুদ্ধ বাঙলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ;
জ. দলিলপত্র ও আলোকচিত্র;
ঝ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ;
ঞ. সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ;
ট. মুক্তিযুদ্ধে অন্যান্য বই ইত্যাদি।

এ সমস্ত বিভাজনে মুক্তিযুদ্ধে নারী সমাজের অবদানের কোনো উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা গ্রন্থসমূহ শ্রেণীবিন্যাস করতে গিয়ে মুনতাসীর মামুন এবঙ দেলোয়ার হোসেন এমন কোনো গ্রন্থ পাননি, যা মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান বিষয়ক। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখাগুলি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৯৭২-৭৫ সময়কালে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিছু লেখালেখি হলেও ১৯৭৫-৯০ সাল পর্যন্ত এ বিষয়ে খুবই কম লেখালেখি হয়েছে। ১৯৯০ সালের পর পুনরায় লেখালেখি শুরু হয় এবঙ ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতিদিনই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখা বের হচ্ছে। কিন্তু এ সকল লেখাতেও নারী মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় অনুপস্থিত। এ পর্যন্ত রচিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ (যেগুলো পাঠের সুযোগ হয়েছে) নারীর ভূমিকা যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তা নিম্নরূপ:

ক. কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত পনেরো খণ্ডের দলিলপত্রের [৩] তের হাজার পৃষ্ঠা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের উপর তেমেন কোনো আলোচনা স্থান লাভ করেনি। শুধু অষ্টম খণ্ডে কিছু নির্যাতিতা নারীর সাক্ষাৎকার রয়েছে, যা থেকে পাকহানাদার বাহিনী কর্তৃক সুদীর্ঘ নয় মাসব্যাপী এদেশের নারী সমাজের উপর যে বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা ও পৈশাচিক অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ড সঙঘটিত হয়েছে তার বিবরণ পাওয়া যায়।

খ. ফোরকান বেগম তাঁর রচিত গ্রন্থে [৪] তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধে অঙশগ্রহণের মাধ্যমে যে অবদান রেখেছেন, তা মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন। তবে এ গ্রন্থটি মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়িত না হলেও মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান মূল্যায়নের প্রাথমিক প্রয়াস বলা যায়।

গ. তপন কুমার দে তাঁর রচিত গ্রন্থে [৫] বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো, তা কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

ঘ. শহিদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর রচিত গ্রন্থে [৬] মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ঢাকার ঘটনাবলী দিনলিপি আকারে উপস্থাপন করেছেন। পহেলা মার্চ, ১৯৭১ থেকে শুরু করে ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১ পর্যন্ত তিনি ঘটনাবলী তুলে ধরেছেন। এই গ্রন্থটিতে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ফ্রেমের প্রাধান্য থাকলেও গেরিলা অপারেশন, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব ও পাকবাহিনীর অমানবিক নির্যাতন নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। তবে তাঁর গ্রন্থে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বা মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের কথা বিশদভাবে উঠে আসেনি।

ঙ. বেগম সুফিয়া কামাল তাঁর রচিত গ্রন্থে [৭] দেশের ভিতর থেকে মুক্তিযুদ্ধকে প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। আলাদা শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধে নারী সমাজের অঙশগ্রহণের কথা বর্ণনা না করলেও তাঁর ডায়রিতে মুক্তিযুদ্ধে নারী সমাজের সক্রিয় অঙশগ্রহণের চিত্র তুলে ধরেছেন।

চ. বেগম মুশতারী শফী তাঁর রচিত গ্রন্থে [৮] চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধ সঙগঠিত হবার প্রাক্কালের ইতিহাস তুলে ধরেছেন গুরুত্বপূর্ণ দিকের অবলোকনে। ব্যক্তিগত জীবনের আখ্যান পেরিয়ে মুজিবনগর সরকার ও স্বাধীন বাঙলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে সঙশ্লিষ্ট নারী-পুরুষের মুক্তিযুদ্ধে অঙশগ্রহণের নিরপেক্ষ বিবরণ দিয়েছেন। এছাড়া এখানে ভারতের শরণার্থী ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

ছ. বেগম মুশতারী শফী রচিত অপর গ্রন্থে [৯] মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের সঙগ্রামী নারীদের সাহসী অবদানের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। যদিও চট্টগ্রামের গ্রামগঞ্জের নারীদের নানা ভূমিকা থাকলেও সবকিছু এই গ্রন্থে লেখকের পক্ষে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। তারপরও তাঁর এই অঞ্চলভিত্তিক লেখা গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধে নারীর সাহসী অবদানের মূল্যায়ন করা হয়েছে।

জ. সাইদুজ্জামান রওশন, তুষার আবদুল্লাহ সম্পাদিত গ্রন্থে [১০] মুক্তিযুদ্ধে অঙশগ্রহণকারী কিছু নারীর স্মৃতিচারণমূলক অভিজ্ঞতার বর্ণনা থাকলেও এখানে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

ঝ. ফরিদা আক্তার সম্পাদিত গ্রন্থটি [১১] তার নামকরণেই গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। তবে এই গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এ গ্রন্থের আলোকেই মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের ক্ষীণ উপস্থাপনের একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। আশ্চর্য হলেও সত্য, ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত গ্রন্থেও তিনি কী যুক্তিতে ‘মহিলা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তা আমার বোধগম্য নয়। স্মৃতিচারণমূলক অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত এ গ্রন্থে কতিপয় নারী মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকা ফুটে উঠলেও, তা কোনো সামগ্রিক রূপ ধারণ করেনি।

উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধে নারীরা যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, সে বিষয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ কিঙবা প্রবন্ধসমূহের কোনোটিতেই সামগ্রিক অর্থে গবেষণা বিচারে নারীর ভূমিকা উঠে আসেনি। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের প্রশ্নে অধিকাঙশ ক্ষেত্রেই সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে বিক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে, কিন্তু গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে গৃহীত হয়নি তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো সিদ্ধান্ত। ২০০৭ সালে বাঙলা একাডেমি শাহনাজ পারভিনের একটি গ্রন্থ [১২] প্রকাশ করে, যেখানে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আন্দোলনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অবদানের আলোচনা করা হয়, এবঙ তার আলোকেই আসে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের বিষয়টি। সন্দেহ নেই, লেখক যথেষ্ঠ পরিশ্রম করেছেন এবঙ চেষ্টা করেছেন যথাসাধ্য মূল বিষয়গুলো তুলে আনতে, কিন্তু এর জন্য গ্রন্থটির আকার যা হবার কথা ছিলো, তা হয়নি। ফলে অনেকক্ষেত্রেই লেখককে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে নয়, লেখককের বিবেচনাবোধের জায়গা থেকে। ফলে সম্পূর্ণ না হলেও আঙশিক, কখনও কখনও খাপছাড়া ইতিহাস উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান সম্বন্ধে।

মুক্তিযুদ্ধে নারীর কী অবদান, এবঙ কোন কোন ক্ষেত্রে তা কীভাবে প্রভাব ফেলেছিলো, তার একটি বিস্তারিত লেখা তৈরি করাই এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্য। ঠিক কী কী বিষয় নিয়ে সামনে আলোচনা করবো, তা এখনই ঠিক উল্লেখ করা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ- পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে তথ্য ও গবেষণালব্ধ গ্রন্থের উপর।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেমন আলোকোজ্জ্বল এবঙ বর্ণিল আখ্যানে আকাশমুখী, তেমনি এ মহাসঙগ্রামে নারীর অঙশগ্রহণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট ও সুলিখিত গবেষণা না থাকায়, তার আভার খামতি থেকে যায়, সন্দেহ নেই। সেই তাড়না থেকেই এ যাত্রা; জানি না কতোদূর যেতে পারবে লেখাটি।

তথ্যসূত্র

১. মুনতাসীর মামুন, ‘মুক্তিযুদ্ধের বই’, একুশের প্রবন্ধ ৯০ (ঢাকা: বাঙলা একাডেমি, ১৯৯০), পৃষ্ঠা: ২২-৪১
২. আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থপঞ্জী (ঢাকা: মূলধারা, ১৯৯১), পৃষ্ঠা: ১৬-১৭
৩. হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (ঢাকা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তথ্য মন্ত্রণলালয়, ১৯৮৪)
৪. ফোরকান বেগম, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নারী, (ঢাকা: সুমি প্রিন্টিঙ প্রেস এন্ড প্যাকেজিঙ, ১৯৯৮)।
৫. তপন কুমার দে, ‘মুক্তিযুদ্ধে নারী সমাজ’, (ঢাকা: নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ১৯৯৮)
৬. জাহানারা ইমাম, ‘একাত্তরের দিনগুলি’ (ঢাকা: সন্ধানী প্রকাশনী, ১৯৮৬)
৭. সুফিয়া কামাল, একাত্তরের ডায়রী, (ঢাকা: জ্ঞান প্রকাশন, ১৯৮৯)
৮. বেগম মুশতারী শফী, স্বাধীনতা আমার রক্ত ঝরা দিন (ঢাকা: অনুপম প্রকাশনী, ১৯৯২)
৯. বেগম মুশতারী শফী, মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী (চট্টগ্রাম: প্রিয়ম প্রকাশনী, ১৯৯২)
১০. সাইদুজ্জামান রওশন, তুষার আবদুল্লাহ (সম্পাদিত), একাত্তরের অগ্নিকন্যা, (ঢাকা: অনুপম প্রকাশনী, ১৯৯৭)
১১. ফরিদা আক্তার সম্পাদিত, ‘মহিলা মুক্তিযোদ্ধা’, (ঢাকা: নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা, ১৯৯৪)

২৫ আশ্বিন, ১৪২০

[768 বার পঠিত]