নীপা ও শাহেদের বিয়ের দুই বছর কেটে গেল। কী চমৎকার যে কেটেছে দুটি বছর! মনে হয় যেন কেবল দুটি ক্ষণ। এত আনন্দ, এত হাসি, এত প্রেম, এত সুখের দুটি বছর জীবনের উপর দিয়ে যেন মুহূর্তেই ফুড়ুৎ করে উড়াল দিয়ে চলে গেল। আসলে অত্যন্ত আনন্দের সময়গুলির মনে হয় ডানা আছে। ওরা অতি দ্রুত উড়ে যায়। নীপা-শাহেদের প্রেমের বিয়ে। পাঁচ বছর গভীর প্রণয় ছিল দু’জনের মধ্যে। পরে দুই পরিবারের সম্মতিতে খুব ধুমধাম করে অনুষ্ঠান করে বিয়ে হয় তাদের। ছোট্ট একটি ছিমছাম পরিবার তাদের। ছোটবেলায় শাহেদের বাবা মারা যান। মা আছেন। আর আছে শায়ান। শাহেদের একমাত্র ছোটভাই। অত্যন্ত আদরের ভাই তার। যখন বাবা মারা যান শাহেদ তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। আর শায়ান একেবারেই শিশু তখন। কত কষ্টে যে কেটেছে বাবা মারা যাবার পরে তাদের দিনগুলি। কত কষ্টে ছোটবেলা থেকেই সে ছাত্র পড়িয়ে নিজের ও শায়ানের পড়ার খরচ জোগাড় করেছে। না খেয়ে থেকেছে কতবেলা। অফ, সেসকল দিনের কথা মনে পড়লে তার এখনও কলিজায় মোচড় দিয়ে ওঠে।এখন তাদের চারজন সদস্যের ছোট্ট সুখের সংসার। শাহেদ একটি এনজিওতে চাকরি করে। ভালই বেতন। শায়ান বিএ ক্লাসে পড়ে। মফস্বল শহরে থাকে ওরা পৈত্রিক বাড়িতে।

কয়েকদিন ধরে নীপার কী যেন হয়েছে। সে বায়না ধরেছে শাহেদকে বিদেশে পাঠাবে আরো বেশি অর্থ উপার্জন করতে। এ বায়না শুনে শাহেদের মনে হলো, তার মাথায় যেন চাঁদ ছিঁড়ে পড়েছে। বলো কী তুমি নীপা? কোন দুঃখে আমি তোমাদের ছেড়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে গিয়ে পড়ে থাকবো? আমাদের কি খাওয়া-পরার অভাব আছে?
নীপা বলে, শুধু খাওয়া-পরাই জীবনের সবকিছু? আমাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ নয়। তবে মানুষে কি নিজের অবস্থা দিনদিন ভালো করবার চেষ্টা করে না?
তোমার কি মনে পড়ে না নীপা, আমাদের বিয়ের আগের সেই সকল উত্তাল দিনগুলির কথা? যখন আমাদের একদিন দেখা না হলেই আমরা দু’জনে দুদিকে অস্থির হয়ে পড়ে থাকতাম। আমাদের পৃথিবী অর্থহীন হয়ে যেত। আমাদের বিয়েতে আমাদের দুপক্ষের পরিবার রাজি হবে কিনা, আমরা পরস্পরকে পাবো কিনা এ চিন্তায় আমাদের বুক ঝড়ো হাওয়ায় বাসা থেকে পড়ে যাওয়া ভীরু পাখির বাচ্চার মতন দুরুদুরু কাঁপতো। আজ আমরা দুজন দুজনাকে পেয়েছি। আমাদের প্রেম সার্থক। আমাদের জীবন শান্তিতে ভরে রয়েছে। আর আজ তুমিই আমায় তোমার কাছ থেকে সুদূর অজানায়, অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিতে চাইছ নিঠুরের মতো?
চোখের আড়াল হলেই কি মনের আড়াল হয়, বলো শাহেদ? বিয়ের আগে আমরা দু’জন যখন দু’বাড়িতে থাকতাম তখন কি আমাদের মনের দূরত্ব ছিল? আমাদের মন কি সে সময় একাকার হয়ে ছিল না, শারীরিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও? আমাদের শরীর সীমিত। শরীরর সাধ্য সীমিত। কিন্তু মন অসীম। মনের সাধ্যও অসীম। মন সব দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে নিমেষেই। তাছাড়া পৃথিবী ত এখন হাতের মুঠোয়। কোনো দূরত্বই এখন আর দূর নয়। আমরা ফোনে কথা বলতে পারবো যখন তখন। স্কাইপে দেখতে পারবো দুজন দুজনাকে। আর তুমি ত আসবেই কিছুদিন পর পর।
কিন্তু আমার জন্য ঘর হতে অঙিনাই যে বিদেশ নীপা। তুমি যে আমার নীপছায়া। তোমার আঁচলের সুশীতল ছায়ার তলেই আমি আজীবন থাকতে চাই। তোমার পরশ পাবো না আমি! তোমার স্নিগ্ধ নিঃশ্বাস পড়বে না আমার বুকে! তোমার চুলের, তোমার গায়ের মিষ্টি ঘ্রাণ পাবো না আমি! এই শিশিরভেজা চোখগুলি আমার দিকে অমন আকুল করে তাকিয়ে থাকবে না!চাইলেই আমি আলিঙ্গনে একাকার হতে পারবো না আমার প্রিয়ার সাথে! তোমার মৃদু মৃদু হৃৎ-স্পন্দন শুনতে শুনতে ঘুমবো না আমি! এই সদ্যফোটা গোলাপের পাপড়ির মতন ঠোঁটগুলি আমি চাইলেই ছুঁতে পাবো না! তাছাড়া এই গোলাপি ওষ্ঠাধারে লালনীল পদ্মই বা এঁকে দেবে কে শুনি।
সবই হবে শাহেদ। আমরা পরস্পরকে হৃদয় দিয়ে সর্বক্ষণ অনুভব করবো। আমার হৃদয়ে যে হাজার রঙের পদ্ম তুমি এঁকে দিয়েছ তোমার প্রগাঢ় ভালোবাসা দিয়ে তা কি কোনোদিন মুছে যাবার, বলো? আজকাল অনেকেই ত বিদেশে যায় উন্নত জীবন গড়তে। আমার দুলাভাই গেল। পরে আপাকেও নিয়ে গেল। আমার বান্ধবীদের অনেকের বরই ত বিদেশে থাকে। কতো ভালো আছে ওরা দেখো। একদিন আমাদের সন্তান হবে। ওরা অনেক ভালো স্কুলে পড়বে। বড় হয়ে বিদেশে পড়তে যাবে। শহরে আমাদের নিজেদের সুন্দর একটা বাড়ি হবে। এমন সুন্দর, সাজানো স্বপ্ন কে না দেখে বলো? তোমার এনজিও’র চাকরিতে আমরা খাচ্ছি পরছি। কিন্তু শুধু খেয়ে পরেই কি আমাদের সারাটি জীবন যাবে? মানুষ কি নিজের অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করে না? আমাদের কি স্বপ্নও দেখতে নেই? কষ্ট তো আমারও হবে তোমার কাছ থেকে দূরে থাকতে। তবে এই কষ্ট যে সাময়িক। একদিন হয়ত তুমি আমাকেও নিয়ে যাবে তোমার কাছে। অথবা কয়েক বছরের মধ্যে দেশে কোনো ব্যবসা শুরু করে চলে আসবে দেশে।

শেষ পর্যন্ত শাহেদকে রাজি হতেই হলো। নীপার যুক্তির কাছে শাহেদের আবেগ হার মানলো। শাহেদ মালয়েশিয়া যাবার জোগাড়-যন্ত্র করতে শুরু করলো। প্লেনের টিকেট, ভিসার মূল্য মিলিয়ে অনেক টাকার অংক। তার কিছু জমানো টাকা ছিল। বাকি টাকা জোগাড় করলো কিছু জমি বন্ধক দিয়ে। নীপা বলেছিল, আমার গয়না বেচে দাও। শাহেদ বলেছে, আমার প্রাণ থাকতে যেন আমি তোমার গয়নায় হাত না দেই। তার বিদেশে যাবার দিন হাজির হলো। সবার মন ভার, চোখ ভেজা, কণ্ঠ জড়ানো। তবুও বিদায় দিতে হয়। চলে যেতে দিতে হয়। শাহেদকে নিয়ে প্লেন উড়ে গেল পাখির মতন। আস্তে আস্তে ক্ষুদ্র হতে হতে শূন্যে মিলিয়ে গেল ছোট্ট পাখিটি। নীপা, মা, শায়ান এরা তিনজন মলিন মুখে ঘরে ফিরে এলো শাহেদকে বিদায় দিয়ে। বিদেশ বিভূঁইয়ে শাহেদের শুরু হলো এক অপরিচিত অন্য রকম জীবন। হাহাকারপূর্ণ, শূন্য, ধূধূময়, বিরহকাতর জীবন। যে কোম্পানিতে কাজ দেবার নিশ্চয়তা দিয়ে তার কাছে ভিসা বিক্রি করা হয়েছিল, সে গিয়ে দেখল সেখানে তার জন্য কোনো কাজ নেই। ছোট একটা বাসায় তাকে গাদাগাদি করে কয়েকজনের সাথে থাকতে হচ্ছে। দিনে সবাই কাজে চলে যায়। ফিরে রাতে। সে সারাদিন কয়েদীর মতন একা বাসায় পড়ে থাকে। সবাইকেই রান্না করতে হয়। শাহেদ রান্না করবে কী করে? জীবনে ত কোনোদিন রাঁধেনি সে। তবুও রাঁধতে হয়। নিজের রান্না মুখে দিয়ে তার নিজেরই চোখ মুখ বিকৃত আকার ধারণ করে। অন্যেরা খাবে কিকরে? রাস্তা চেনে না। ভাষা জানে না। কারুর সময় নেই তাকে নিয়ে বেরুবার। সবাই ব্যস্ত। সে কাজের খোঁজে বের হয়। নিরাশ হয়ে মলিন মুখে ফিরে আসে। একমাস পরে কারখানায় একটি কাজ পেলো শাহেদ। রাতের শিফটে কাজ। সন্ধ্যায় কাজে চলে যায় সে। ফেরে ভোররাতে। এসে রান্না করে খেয়ে সকালে ঘুমুতে যায়। রোবটের মত কাজ করে চলেছে শাহেদ। কাজ আর ঘুম। ঘুম আর কাজ। এইই তার জীবন। সময় পেলেই দেশে ফোন দেয় শাহেদ। সবার সাথে কথা বললে মনটা একটু শীতল হয়। প্রবাসে তার কষ্টের কথা ভুলক্রমেও সে কারুকে জানতে দেয় না। সে বলে, এখানে সে খুব ভালো আছে। বেতন পেলেই দেশে পাঠিয়ে দেয়।

ওদিকে বাড়িতে চারিদেকে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের মাত্রা বেড়ে চলেছে। তাদের পোশাক-আশাক, চাল-চলনে আভিজাত্য বেড়েছে। নতুন আসবাব, নতুন টিভি ইত্যাদি নিত্যনতুন দ্রব্যসামগ্রীর আগমন ঘটছে। আহা পরিবারের কেউ বিদেশে থাকলে কত সুখ! নীপার মাঝে মাঝে শাহেদের জন্য মন খারাপ লাগে অবশ্য। তবে শাহেদ প্রতিদিনই একাধিকবার কল করে। বলতে গেলে মন খারাপ করার অবকাশই দেয় না সে। শায়ানের সাথেও তার এখন বেশ ভালো সময় কাটছে। শায়ান ভাবীকে সিনেমায় নিয়ে যায়। ভাবীর সাথে বসে ছক্কা ও দাবা খেলে, গল্প করে। ভাবীর মুখ গোমরা দেখলে তার ভালো লাগে না। শাহেদ মালেশিয়া যাবার ৮মাস পরে একটি সোনার গয়নার সেট কিনে পাঠিয়েছে নীপার জন্য। খুব সুন্দর দেখতে। চকচকে কাঁচা সোনা। সুন্দর ডিজাইন। এত চমক, এত আনন্দ অপেক্ষা করছিল তার জন্য! খুশিতে নীপার চোখ ছলছল করতে লাগলো। আহা, জীবন কতো সুন্দর! দেখতে দেখতে আড়াই বছর কেটে গেল। শাহেদ এখনও বাড়িতে এলো না। বাড়িতে টাকা পাঠানোর পর তার হাতে আর তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না। বাড়িতে আসা বিরাট খরচান্ত ব্যাপার। সে অল্প অল্প করে টাকা জমাচ্ছে বাড়ি আসবার জন্য।

নীপা আর শায়ান দাবা খেলছে একদিন। হঠাৎ ভাবীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে শায়ান বলল, কী ব্যাপার রঙ্গিলা ভাবী, তোমার শরীরের ভূগোল যে বিস্তৃতি লাভ করছে দিনদিন! ইন্ডিয়া দখল করে নেবে নাকি? নীপার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কী যা-তা বলছ? সত্যিই কি তাই? নয় তো কি? কোনো খবর নেই তোমার নিজের শরীরের? নীপা অস্থির হয়ে উঠল। কেঁদে দিলো আষাঢ়ের বৃষ্টির মত ঝুম ঝুম করে। আমি ত কিছুই বুঝতে পারিনি। আমি ত কিছুই জানি না। তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো আমায়। একটা ব্যবস্থা করো। ভাবীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো শায়ান। মাকে বলে গেল, ভাবীর প্রেসার বেড়ে গেছে, তাই ডাক্তার দেখানো দরকার। ডাক্তার সবকিছু পরীক্ষা করে বললেন, নীপা ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শুনে নীপার মগজ ভনভন করতে লাগলো। বললো, ডাক্তার যে করেই হোক, যত টাকাই লাগুক ব্যবস্থা করুন। আমি এই বাচ্চা চাই না। ডাক্তার বললেন, বড্ড দেরী হয়ে গিয়েছে। সন্তান জন্ম দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। নীপা আগের চেয়ে একটু মুটিয়ে গেছে। সে মনে করেছিল পেটটা তাই একটু বেড়ে গেছে। ওটা চোখে পড়ার মতনও নয় অবশ্য। তাছাড়া প্রেগনেন্সির কোনো লক্ষণই খাওয়াদাওয়া বা অন্য কিছুতে আসেনি। হায় হায় কী হয়ে গেল। কী হবে এখন? সারা পথে শায়ান নীপাকে গঞ্জনা করল। বাড়িতে এসে শায়ানের দু’পা জড়িয়ে ধরে হাহাকার করে কাঁদতে লাগলো নীপা। চলো শায়ান, আমরা দূরে কোথাও চলে যাই। যেখানে আমাদেরকে কেউ চিনবে না। এ সন্তান আমাদের দুজনের। ওর দিকে আমরা মানুষের ঘৃণার দৃষ্টি পড়তে দেবো না। মানুষের ঘৃণার বাক্য শুনতে দেবো না আমরা ওকে। আমরা দুজনে মিলে আমাদের সন্তানকে মানুষ করবো। শায়ান লাথি মেরে নীপাকে ফেলে দিয়ে বললো, কোথায় গিয়ে অপকর্ম করে পাপের বোঝা বাঁধিয়েছিস পেটে। সেই পাপের বোঝা এখন আমার উপর চাপাতে চাইছিস মাগী? মা শুনতে পেলেন তাদের সব কথোপকথন। বুঝতে পারলেন সবকিছু। ঝাড়ু হাতে নিয়ে তেড়ে এলেন নীপার দিকে। বললেন, খবরদার মাগী। আমার নিস্পাপ ছেলেকে কলঙ্ক দিবি তো। তুই দূর হয়ে যা আমার বাড়ি থেকে। নইলে গলায় দড়ি দিয়ে মর। আমার বাড়ি অপবিত্র করেছিস তুই। নীপা ছিন্নলতার মতন লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। জ্ঞান হারালো। দুই ঘণ্টা পরে জ্ঞান ফিরে এলো তার। উঠে বললো, আম্মা দেখুন জ্বীনভাই আমার জন্য আপেল-কমলা নিয়ে এসেছে। আপনাদেরও দিতে বলেছে। নিজের আলমারি থেকে শাড়ি,গয়না, পারফিউম ইত্যাদি জিনিস এনে একে একে দেখিয়ে বলছে, দেখুন সে আমার জন্য কতকিছু এনেছে। শাশুড়ির চোখ তো ছানাবড়া নীপার কথা শুনে। কী যা-তা বকছিস। নষ্টামিতে ধরা পড়ে পাগল হয়ে গেলি নাকি? না আম্মা, বেশ কিছুদিন যাবত জ্বীনভাইটা আমার পিছু নিয়েছে। সে আমাকে ভালোবাসে। আমাকে বিয়ে করে জ্বীনরাজ্যে নিয়ে যেতে চায়।। দেখুন না, এই যে সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেখুন, আকাশ-পাতাল লম্বা সে। তার চোখ থেকে নূর বেরুচ্ছে। কেমন সুন্দর তার গায়ের গন্ধ। আমার প্রেমে সে হাবুডুবু খাচ্ছে আকাশে পাতালে। আমার পেটের সন্তান তো তারই। মা বললেন, আরে ঠিকই তো। মা এগিয়ে গিয়ে নীপাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ভালো বুদ্ধিই তো বের করেছিস। নইলে এই কলঙ্ক থেকে আমার নিষ্পাপ শায়ানকে কি করে বাঁচাতাম? শাহেদকেই বা বোঝাতাম কী বলে? এবার মা দৌড়ে গিয়ে কয়েকজন প্রতিবেশিনীকে ডেকে আনলেন। দেখাতে লাগলেন জ্বীনের দেওয়া সমস্ত বিরল উপহার ও খাদ্য সামগ্রী। দেখোই না বুবু, এই রকম আপেল কি এই দুনিয়ায় পাওয়া যায়? এই রকম শাড়ি-গয়না-পারফিউম কি এই জগতে পাওয়া যায়? জ্বীনবাবাজি আমার বৌমাকে ভালোবেসে ফেলেছে। বড়ই ভদ্র ঘরের সন্তান। আমাকে পায়ে ধরে সালাম করে। সবাই বললো, সত্যিই তো। এই রকম জিনিসপত্র এই দুনিয়ায় থাকতেই পারে না। তা আমরাও একটু জ্বীনবাবাকে চোখে দেখতে চাই। না না, তা হবার নয়। আমাদের পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কাউকে দেখা দিলে তার জ্বীনত্ব নষ্ট হয়ে যাবে। তবে তোমরা কিছু আপেল-কমলা নিয়ে যেতে পারো। সবাই আপেল-কমলা নিয়ে খুশিমনে বাড়ি ফিরে গেল।

শাহেদের কানে গেলো জ্বীনের গল্প। সে গল্প শুনে হাসে। ভাবে সবাই মজা করছে তার সাথে। একদিন জ্বীনের ঔরষজাত একটি শিশুপুত্র জন্ম নিলো নীপার গর্ভ থেকে। শাহেদের কাছে এই খবর গেল। তার মনে হলো তার মাথায় সূর্য ছিঁড়ে পড়েছে। সে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। এদিকে মহাধুমধামে জ্বীনপুত্রের নাম রাখার অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। জ্বীনবাবা তার পুত্রের জন্য জান কোরবান করতে প্রস্তুত। সবার জন্য উপহার এনে ভরিয়ে ফেলেছে সে ঘরদোর। তার পুত্রের নাম রেখেছে সে ওমর ফারুক।
জ্বলন্ত মন নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতন শাহেদ বাড়িতে ছুটে এলো। ময়লা জামা, উস্কোখুস্কো ময়লা চুলদাড়ি, ফ্যাকাশে মুখ, পাথর চোখ নিয়ে পাগলবেশে সে ঘরে ঢুকলো। তখন জ্বীনপুত্রকে নিয়ে সবাই আনন্দরত। শাহেদ বলতে লাগলো যন্ত্রের মতো, আমি রোবটের মতো খেটে টাকা পাঠাচ্ছি তোমাদের সুখের জন্য। বাবা মারা যাবার পর থেকে নিজের চিন্তা না করে মা-ভাইয়ের চিন্তা করেছি। আমি ছেঁড়া জামা পরে শায়ানকে নতুন জামা পরিয়েছি। আর তোমরা সবাই মিলে আমাকে এতবড় ধোঁকা দিতে পারলে? তারপর আবার নাটকও করছ। মা তুমিও কী করে পারলে এ নাটকে অংশ নিতে? নীপার দিকে তাকাতে বা তার সাথে কথা বলতে শাহেদের ঘেন্না হচ্ছে। সে মাকে বললো, মা ওকে বলো সব গুছিয়ে নিতে। আমি আজকের মধ্যেই তালাকের ব্যবস্থা করছি। নীপা দৌড়ে এসে বলল, দ্যাখো এই বাচ্চা জ্বীনের। আল্লাপাক সাক্ষী। আমি মিথ্যে বললে এই মুহূর্তেই আমার মাথায় সাত আসমান ভেঙে পড়বে। শাহেদ বললো, জ্বীনের সাথে শুয়ে যখন বাচ্চা পয়দা করেছ তখন জ্বীনের সাথেই সুখের সংসার পাতো গিয়ে। শাহেদের ইচ্ছে করছে জীবন্ত মাটির নিচে ঢুকে যেতে। এই লজ্জাবনত মুখ সে কি করে মানুষকে দেখাবে। দু’পক্ষের কয়েকজন লোক ডাকলো সে আজকে বিকেলে। সে আজই সব চুকিয়ে দিতে চায়। যার দেহমনে অন্য পুরুষ, তার সাথে অপ্রোয়জনীয় কাগুজে সম্পর্ক যত তাড়াতাড়ি ছিন্ন করা যায় তত তাড়াতাড়ি মুক্তি। বৈঠক বসেছে। একই নাটক চলছে এখনও। জ্বীনের দেওয়া সমস্ত উপহার এনে দেখাচ্ছে নীপা লোকজনদের। শাহেদ দেখে চিনতে পারে এসব তার পাঠানো জিনিস। সে চুপ করে থাকে। তার খুব ঘেন্না হচ্ছে এ বিষয়ে কথা বলতে। বিজ্ঞ বিচারকরা বলছেন, তুমি যখন এই নিষ্পাপ মেয়েটিকে কলঙ্ক দিলে, তাকে যখন তুমি রাখবেই না, তোমাদের বিয়ের কাবিন তো ৬ লক্ষ ১টাকা। পুরো টাকাটা এখনই গুনে নীপার হাতে দিয়ে তাকে বিদায় দাও। শাহেদ বললো, এত টাকা এখন আমার হাতে নেই। আমার কাছে ২লাখ টাকা আছে। বাকি টাকা আমি আস্তে আস্তে দিয়ে দেবো। সবাই বললো, না। এই মেয়েটিকে তোমার ঠকানো চলবে না। এটা তার পাওনা। তাকে নগদ দিয়ে দিতে হবে। আমার কাছে যে এখন ২লাখের বেশি এক টাকাও নেই। তাহলে তুমি বরং নীপার কাছে মাফ চাও। সে দয়া করে মাফ করলেই মাফ। আমাদের কিচ্ছু করার নেই। শরিয়তী ব্যাপারে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে গুনাহগার হতে পারবো না বাপু। শাহেদ বললো, মাফ চাইছি না আমি, শুধু সময় চাইছি। নীপা বললো, আমার পাওনা আমি ছাড়বো কেন? আমি তো কারুর দয়া-দাক্ষিণ্য চাইছি না। এটা আমার অধিকার। আমার পাওনা। এক পয়সাও মাফ করবো না। শাহেদ বেরিয়ে গেল টাকা জোগাড় করতে। যে করেই হোক তাকে টাকা জোগাড় করতেই হবে আজ রাতের মধ্যে। বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করলো সে। বাকি টাকা জোগাড় করল রাতারাতি কম দামে পৈত্রিক জমি বিক্রির বায়না করে। সে গুনে গুনে ৬লাখ ১টাকা বিচারকমণ্ডলীর হাতে তুলে দিলো। বিচারকরা তুলে দিলেন নীপার হাতে। বললেন, গুনে নাও। নীপা টাকা গুনতে গুনতে উদ্ধতকণ্ঠে বলতে লাগলো, এ আমার দেনমোহরের টাকা, এ আমার নারীত্বের সম্মান, আমার সম্মানিত অধিকার, আমার পাওনা। কেন ছাড়বো আমি? এক পয়সাও ছাড়বো না।

[1351 বার পঠিত]