সাহিত্যের কাজ অকাজ

By |2013-10-05T01:09:51+00:00সেপ্টেম্বর 19, 2013|Categories: সাহিত্য আলোচনা|12 Comments

ক.
এই প্রবন্ধের শুরুতেই প্রয়োজন পড়ে সাহিত্য কি সেই বিষয়টা আবার একটু নতুন করে খোলসা করার। যদিও এক সিপি নীল জল দিয়ে সমুদ্র চেনানো আর সংজ্ঞা দিয়ে সাহিত্য বোঝানো একই ধরনের ব্যর্থ চেষ্টার নামান্তর। এতে বিষয়টি চেনাতে বা বোঝাতে গিয়ে আরো বিপদে ফেলে দেওয়া হয়। আর ‘না জ্ঞান’ যে ‘উল্টো জ্ঞান’র চেয়ে মঙ্গল সেটা কে না জানে! কাজেই সে পথে না এগিয়ে সাহিত্য নিয়ে একটু আড্ডা দেওয়া চলে। সাহিত্য বোঝার জন্য আমরা সাহিত্যবিদে¦ষী টমাস গ্রাডগ্রিন্ডের কাছে চলে যাবো। চার্লস ডিকেন্স-এর ‘হার্ড টাইম’ উপন্যাসের শুরুর অধ্যায়ে উপযোগবাদী রাজনীতিবিদ টমাস গ্রাডগ্রিন্ড তার আদর্শ স্কুলের শিক্ষকদের বলে দেন যেন, ছাত্ররা তাদের কল্পনাশক্তি ব্যবহার করতে না শেখে। ‘teach these boys and girls nothing but facts. Facts alone are wanted in life’. [‘Hard Time’] গ্রাডগ্রিন্ড সাহেব তার কথার কোথাও সাহিত্য শব্দটা উচ্চারণ না করলেও আমাদের বুঝে নিতে সমস্যা হয় না যে তিনি চরমভাবে সাহিত্য বিদ্বেষী, বিদ্বেষটা তার জীবন সম্পর্কে মাপাজোকা ধারণা থেকেই এসেছে।

গ্রাডগ্রিন্ড-এর ঠিক বিপরীত সত্যটা জানতে এবার আমরা হাজির হবো অন্য একটা স্কুলে। এই স্কুলের (‘ডেড পোয়েটস সোসাইটি’) শিক্ষক-এর ভূমিকায় থাকা রবিন উইলিয়ামস তার ছাত্রদের শোনালেন একেবারে ভিন্ন কথা। তিনি বললেন,
We don’t read and write poetry because it’s cute. We read and write poetry, we are members of the human race. And the human race is filled with passion. Medicine, Law, Business, Engineering; these are Nobel parsuits and nessary to sustain life. But Poetry, Beauty, Romance, Love; these are what we stay alive for.’

এখন এই দুই বায়বীয় স্কুল থেকে আমরা জীবন সম্পর্কে দুটো ধারণা পেলাম, এখান থেকে আমরা অনায়াশে সাহিত্যের প্রাথমিক চরিত্রটা দাড় করাতে পারি। এই চরিত্রের কতগুলো উপাদান বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট আছে। কল্পনাশক্তি তার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে। এরপরেই আসে ভাষা। বায়বীয় গল্প বা কতগুলো বিমূর্ত জীবনকে মূর্ত করে তোলা হয় ভাষার সাহায্যে। ভাষা এখানে ইট-চুন-সুড়কির কাজ করে। কাজেই সাহিত্য হতে হলে তার একটি লিখিত রূপ থাকা অনিবার্য। সাহিত্যের ভাষাটা হতে হবে পাউণ্ড যে রকম বলছেন, Literature is language charged with meaning.’, সে রকম। মানে শব্দগুলোর শরীর বলবে এক কথা, অন্তর আরেক; যাকে বলা হয় ’মেটাফর অব লাঙ্গুয়েজ’। সাহিত্যে এর পরের কলকব্জা হল ফর্ম বা কাঠামো। এর সাথে জড়িয়ে আছে কিছু অনুসঙ্গ; যেমন: প্লট ও সেটিং। যেনতেন করে কোনকিছু প্রকাশ করাটা সাহিত্য না। সাহিত্যে কি প্রকাশ করা হল তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ন কিভাবে প্রকাশ করা হল। স্টপফোর্ড ব্রুক-এর বক্তব্যটা এখানে ধার নেওয়া যায়:
writing is not literature unless it gives to the reader a pleasure which arises not only from the things said, but from the way in which they are said’.

এতক্ষণে কল্পনাশক্তি, ভাষা ও কাঠামো এই তিনটা উপাদানের সম্পর্ক স্থাপনকে আমরা সাহিত্য বলতে পারি। কিংবা অন্যভাবে বললে, এই তিনটা উপাদানের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ঠ তৃতীয় সত্তাকে সাহিত্য বলা চলে।

খ.
প্রত্যেক মানুষের একটা গল্প থাকে—খুব চিরায়ত, চিরন্তন গল্প। মোটাদাগে সেই গল্পটা লিখে ফেলা সাহিত্যের কাজের মধ্যে পড়ে না। যে গল্পটা তৈরি, সেটা সাহিত্য না। মানে দশজন লিখলে যদি দশরকম সম্ভাবনা বের হয়ে না আসে তবে সেটা গল্প বটে কিন্তু সাহিত্য না। অর্থাৎ সাহিত্যের প্রধান কাজ হল ব্যক্তির সম্ভাবনাগুলো খুঁজে খুঁজে বের করা। ব্যক্তির সেই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে বিদ্যমান থাকতেও পারে, নাও পারে। মার্ক টোয়েন যথার্থই বলছেন- Fiction is obliged to stick to possibilities, Truth isn’t.’ সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করার জন্যই রবার্ট ফ্রস্টকে হাঁটতে হয়েছে যে পথে মানুষ কম হেঁটেছে সেই পথে। (Two Roads Diverged in the Wood and I’ I took one less Traveled by. And that has made all the Difference’.)

যদি সম্ভাবনা থেকেই সাহিত্য হয় তাহলে সাহিত্য জীবনের সরাসরি বা হুবহু দর্পণ না। এরিস্টটলের ‘আর্ট ইজ ইমিটেশন অব লাইফ’ এ ইমিটেশনের মাত্রা নিয়ে গ-গল দেখা দেয়। যদি অস্কার ওয়াইল্ড-এর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলি- ‘literature always anticipates life. It does not copy it, but molds it to its purpose’—তাহলে ইমিটেশনের অর্থটা এখানে বুঝে নিতে সমস্যা থাকে না। একটু ভেঙ্গে বললে, সাহিত্য হল অন্য এক বাস্তবতা যেখানে বায়বীয় চরিত্রগুলো বাস্তবের চরিত্রদের পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। তাই ক্ষেত্রবিশেষ বাস্তবের চরিত্ররা হয়ে ওঠে বায়বীয় চরিত্রদের ছায়া বিশেষ। এই অর্থে দুইটা জগত আলাদা আবার অভিন্নও। সাহিত্য ও জীবনের সম্পর্কটা এমনই দ্বন্দ্বমুখর বা প্যারাডোক্সিক্যাল।

সাহিত্য অনেকগুলো আপেক্ষিক সত্যের মাঝে যে অস্পষ্টতার প্রজ্ঞা তা থেকেই নিজের প্রজ্ঞাকে বের করে আনে। সাহিত্য প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করে চলে ব্যক্তির সম্ভাবনাকে। সত্য আবিষ্কার করা সাহিত্যের কাজ না, এখানেই বিজ্ঞানের সাথে সাহিত্যের বিরোধ। যে সাহিত্যে আবিষ্কার নেই তার প্রয়োজন মূল্য নিতান্তই কম। কুন্ডেরা তাকে বলছেন- ‘অনৈতিক সাহিত্য’ (দি আর্ট অব নভেল)। অর্থাৎ নতুন কিছু আবিষ্কার করা সাহিত্যের নৈতিকতার মধ্যে পড়ে। রবার্ট ফ্রস্টও অক্টাভিও পাজকে একই কথা বলছেন- ‘প্রত্যেক কবির জন্মই হয় নিজস্ব কিছু বলবার জন্যে। তার আদি কর্তব্য হল পূর্বজদের অস্বীকার করা…।’ (কবিকে দেখতে যাওয়া) এখন প্রশ্ন হল, সাহিত্যে বিদ্যমান জীবনকে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে? হুবহু জীবন থাকবে নাকি গল্প হবে কল্পনাপ্রসূত? যে কোনো একটির একচেটিয়া আধিপত্য সাহিত্যের জন্যে স্বাস্থ্যকর নয়। দুটোর যথাযথ বা গাণিতিক বিক্রিয়া ঘটাতে হবে। সেই কথায় জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখেছিলেন, “পোস্টমাস্টারটি আমার বজরায় এসে বসে থাকত। ফটিককে দেখেছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখেছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখেছি, কতকটা বানিয়ে নিয়েছি।” অন্যত্রে লিখেছিলেন, ‘আমার গল্পে বাস্তবের অভাব কখন ঘটে নি। যা কিছু লিখেছি, নিজে দেখেছি, মর্মে অনুভব করেছি, সে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।’ ফকনার একই কথা একটু ঘুরিয়ে বলছেন- ‘গল্পটা (‘দ্য রোজ ফর এমিলি’) কল্পনা থেকে এসেছে। কিন্তু ঐ বাস্তবতা চারপাশে বিদ্যমান। গল্পটা নতুন কোনো বাস্তবতাকে আবিষ্কার করেনি। তরুণীরা কাউকে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখে, সংসার চায়, সন্তান চায়, এটা আমার আবিষ্কার না। কিন্তু ঐ মেয়েটির (এমিলি) যে নির্দিষ্ট ট্রাজিক পরিণতি সেটা আমার তৈরি।’ (অনুবাদ: বর্তমান আলোচক)

ফকনার ১৯৫৮ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি আমেরিকান ফিকশনের ওপর গ্রাজুয়েটদের ক্লাসে বলেছিলেন:
‘আমার মতে তুমি যাই অনুধাবন করতে পারো তাই অভিজ্ঞতা। এটা বই থেকেও আসতে পারে। এটা এমন বই, এমন গল্প এবং এতই জীবন্ত যা তোমাকে নাড়িয়ে দেয়। আমার মতে এটা তোমার অভিজ্ঞতা সমুহের একটি। এমন নয় যে ঐ বইয়ের চরিত্রগুলো যা করে তা করে অভিজ্ঞতা নিতে হবে। চরিত্রগুলোর কাজগুলো যদি বাস্তবসম্মত মনে হয়, এবং মনে হয় মানুষ এমনটিই করে তাহলে এটা অভিজ্ঞতার ভেতর পড়ে। তাই আমার কাছে অভিজ্ঞতার সংজ্ঞা এই, অভিজ্ঞতার বাইরে লেখা সম্ভব নয়। কারণ তুমি যা পড়, শুন, অনুভব কর, কল্পনা কর- এ সবই অভিজ্ঞতার অংশ। [তর্জমা: সাবিদিন ইব্রাহিম]

এখানেই স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, অভিজ্ঞতা ও কল্পনা এ-দুটোর বিক্রিয়া ঘটলেই সাহিত্য নামধারী তৃতীয় পক্ষ এসে হাজির হয়। কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক প্রায়ই বলেন যে তিনি দেখার বাইরে কিছু লেখেননি। এই কথা অনেকে বলেছেন। বলছেন। এই দেখা মানেই আক্ষরিক অর্থে সেই জীবনটা যাপন করা নয়। একজন লেখক তাঁর কল্পনাশক্তি বলে অনেকগুলো জীবন যাপন করেন। কাজেই দেখা যায়—একজন রিকশাচালকের জীবন ঐ রিকশাচালকের চেয়ে ভাল বোঝেন একজন লেখক। এজন্যে দেখার অনেকগুলো দৃষ্টি না থাকলে যা লেখা হবে সেটা হবে খবরের কাগজের খোরাক, সাহিত্য না। আবার সব অভিজ্ঞতা আমাদের দৃষ্টি দিয়ে আসে না। যেমন: আমরা কোনোদিন শিকারে যাইনি, শিকার করা দেখিওনি। কিন্তু শিকার করা বিষয়টা ধরতে পারি। ছোটবেলায় মুরব্বীদের কাছে শিকারের গল্প শুনে খানিকটা আন্দাজ করেছি, খানিকটা জীবজগতের স্বাভাবিক প্রবণতা দেখে বুঝে নিয়েছি। কিংবা এক্ষেত্রে ডেকার্তেস যেটা বলছেন—‘our innate ideas form the basis of our experience of reality’—সেটাকেও সত্য বলে ধরে নিতে পারি। ঘটনা যায় হোক—সাহিত্যে প্রত্যক্ষণ অভিজ্ঞতা সবসময় না থাকলেও চলে কিন্তু জ্ঞানটা প্রয়োজন।

চলবে…

জন্ম সন : ১৯৮৬ জন্মস্থান : মেহেরপুর, বাংলাদেশ। মাতা ও পিতা : মোছাঃ মনোয়ারা বেগম, মোঃ আওলাদ হোসেন। পড়াশুনা : প্রাথমিক, শালিকা সর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং শালিকা মাদ্রাসা। মাধ্যমিক, শালিকা মাধ্য বিদ্যালয় এবং মেহেরপুর জেলা স্কুল। কলেজ, কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন। স্নাতক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরেজি অনার্স, ফাইনাল ইয়ার)। লেখালেখি : গল্প, কবিতা ও নাটক। বই : নৈঃশব্দ ও একটি রাতের গল্প (প্রকাশিতব্য)। সম্পাদক : শাশ্বতিকী। প্রিয় লেখক : শেক্সপিয়ার, হেমিংওয়ে, আলবেয়ার কামু, তলস্তয়, মানিক, তারাশঙ্কর প্রিয় কবি : রবীন্দ্রনাথ, জীবননান্দ দাশ, গ্যেটে, রবার্ট ফ্রস্ট, আয়াপ্পা পানিকর, মাহবুব দারবিশ, এলিয়ট... প্রিয় বই : ডেথ অব ইভান ঈলিচ, মেটামরফোসিস, আউটসাইডার, দি হার্ট অব ডার্কনেস, ম্যাকবেথ, ডলস হাউস, অউডিপাস, ফাউস্ট, লা মিজারেবল, গ্যালিভার ট্রাভেলস, ড. হাইড ও জেকিল, মাদার কারেজ, টেস, এ্যনিমাল ফার্ম, মাদার, মা, লাল সালু, পদ্মা নদীর মাঝি, কবি, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিলে কোঠার সেপাই, ভলগা থেকে গঙ্গা, আরন্যক, শেষের কবিতা, আরো অনেক। অবসর : কবিতা পড়া ও সিনেমা দেখা। যোগাযোগ : 01717513023, [email protected]

মন্তব্যসমূহ

  1. গীতা দাস সেপ্টেম্বর 26, 2013 at 6:48 পূর্বাহ্ন - Reply

    ‘কবি তব মনোভূমি

    রামের জন্মস্থান অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।’

    কাজেই, যা ঘটে তা নিয়েও সাহিত্য হয়, যা ঘটতে পারতো তা নিয়েও সাহিত্য হয়।
    খুবই ভাল লাগল আলোচনাটি। সাহিত্যালোচনা অব্যাহত থাকুক।

  2. মাহফুজ সেপ্টেম্বর 20, 2013 at 3:07 অপরাহ্ন - Reply

    একজন রিকশাচালকের জীবন ঐ রিকশাচালকের চেয়ে ভাল বোঝেন একজন লেখক।

    ঠিক তদ্রুপ-
    “একজন ধর্মকর্ম পালনকারী বা মোল্লাপুরুতের জীবন ঐ মোল্লা পুরুতের চেয়ে ভালো বোঝেন একজন ফ্রি থিংকার।”
    আবার-
    “মহান স্রষ্টার জীবন ঐ স্রষ্টার চেয়ে ভালো বোঝেন তার ভক্তরা।”

    কাজ বলুন আর অকাজ বলুন লেখাটা ভালো। পরবর্তী পর্ব পড়ার সুযোগ পেলে অবশ্যই পড়বো।

    • মোজাফফর হোসেন সেপ্টেম্বর 21, 2013 at 1:49 পূর্বাহ্ন - Reply

      @মাহফুজ, ধন্যবাদ আপনাকে। ভাল থাকবেন।

      • আকাশ মালিক সেপ্টেম্বর 23, 2013 at 7:45 পূর্বাহ্ন - Reply

        @মোজাফফর হোসেন,

        আমার পছন্দের বিষয়ের উপর খুব সুন্দর ভাল একটি লেখা পড়লাম। সাহিত্য কী, কোন্ লেখা সাহিত্যের আওতায় পড়ে আর কোনটা পড়েনা, বিজ্ঞান কি সাহিত্য হতে পারে, ভ্রমণ-গাইড যদি সাহিত্য না হয় তাহলে ভ্রমণ বৃত্তান্ত সাহিত্য হয় কেন, সাহিত্য জিনিসটা বিষয়ের উপর বেশি নির্ভর করে না রচনার উপরে? লক্ষ্যের উপরে না লক্ষণের উপরে? এরকম অনেক প্রশ্ন এসেছে সাহিত্যের সংজ্ঞা, রূপ-আকার, ধর্ম-কর্ম, উদ্দেশ্য-লক্ষ্য নিয়ে। আমার সকল বিষয়ে-আসয়ে, আপদে-বিপদে আমি সর্বদাই রবি ঠাকুরের স্মরণাপন্ন হই। কেন জানি মনে হয় এই মানুষটার কাছেই আমার সকল প্রশ্নের উত্তর আছে।

        যাক এবার বলি, সাহিত্যের ওপর কিছু অপবাদও আছে। যেমন- সে সত্যের ধার ধারেনা বরং সত্য ও বাস্তবের সাথে কল্পনার অবাস্তব-অসত্য মিশায়েই সাহিত্য তৈ্রী হয়। শুনতে কেমন লেগেনা? উদাহরণটা দেখুন-

        “কনের বাপ সবুর করিতে পারিতেন কিন্তু বরের বাপ সবুর করিতে চাহিলেন না।”

        আমরা সাধারণত বলি, ব্যাটা চামার। যৌতুক একপয়সাও কম নিতে রাজি না!

        অপবাদকারীর প্রশ্ন হলো, কথাটাকে রবীন্দ্রনাথ কি এ ভাবে বলতে পারতেন না?

        তিনি আরো বলছেন- কিংবা

        “কাদম্বিনী মরিয়া প্রমান করিল যে, সে মরে নাই।”

        আমাদের সমাজে কাদম্বিনীর মত কারো ভাগ্যে ঘটেছে কিনা জানা নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের “জীবিত ও মৃত” গল্পটি পড়লে মনে হয় সত্যি সত্যিই যেন এমন একটি ঘটনা ঘটেছিলো। বাস্তবে কি আদৌ এমন ঘটে? ‘কাদম্বিণী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’। কথাটা কি বাস্তব, সত্যটা কোথায়?

        আরেকজন আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলেছেন-

        বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলতে তার সাথে কিছু রং মেখে উজ্জল করাই সাহিত্য। সাহিত্যের সাথে বাস্তবতার দুরত্ব এখানেই। একটা স্থানকে সাহিত্যিকগন যেভাবে পাঠকদের চোখের সামনে তুলে ধরে, আসলে কি লেখার বর্ণনার সাথে ঐ স্থানের হুবহু মিল পাওয়া যাবে? তো এটাকে এক ধরনের চাপাবাজী বললে অতুক্তি হয় না।

        কি সাংঘাতিক কথা! এক ধরনের চাপাবাজী?

        রবীন্দ্রনাথ এক চীনদেশী কবির কবিতার উদৃতি দিয়ে লিখেছেন-

        পাহাড় একটানা উঠে গেছে বহুশত হাত উচ্চে;
        সরোবর চলে গেছে শত মাইল,
        কোথাও তার ঢেউ নেই;
        বালি ধু ধু করছে নিষ্কলঙ্ক শুভ্র;
        শীতে গ্রীষ্মে সমান অক্ষুণ্ন সবুজ দেওদার-বন
        নদীর ধারা চলেইছে, বিরাম নেই তার;
        গাছগুলো বিশ হাজার বছর
        আপন পণ সমান রক্ষা ক’রে এসেছে—
        হঠাৎ এরা একটি পথিকের মন থেকে
        জুড়িয়ে দিল সব দুঃখবেদনা,
        একটি নতুন গান বানাবার জন্যে
        চালিয়ে দিল তার লেখনীকে।

        মানুষের দুঃখ জুড়িয়ে দিল নদী পর্বত সরোবর। সম্ভব হয় কী ক’রে। নদী পর্বতের অনেক প্রাকৃতিক গুণ আছে কিন্তু সান্ত্বনার মানসিক গুণ তো নেই। মানুষের আপন মন তার মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে নিজের সান্ত্বনা সৃষ্টি করে। যা বস্তুগত জিনিস তা মানুষের মনের স্পর্শে তারই মনের জিনিস হয়ে ওঠে। সেই মনের বিশ্বের সম্মিলনে মানুষের মনের দুঃখ জুড়িয়ে যায়, তখন সেই সাহিত্য থেকে সাহিত্য জাগে। বিশ্বের সঙ্গে এই মিলনটি সম্পূর্ণ অনুভব করার এবং ভোগ করার ক্ষমতা সকলের সমান নয়। কারণ, যে-শক্তির দ্বারা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের মিলনটা কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়ের মিলন না হয়ে মনের মিলন হয়ে ওঠে সে-শক্তি হচ্ছে কল্পনাশক্তি; এই কল্পনাশক্তিতে মিলনের পথকে আমাদের অন্তরের পথ ক’রে তোলে, যা-কিছু আমাদের থেকে পৃথক এই কল্পনার সাহায্যেই তাদের সঙ্গে আমাদের একাত্মতার বোধ সম্ভবপর হয়, যা আমাদের মনের জিনিস নয় তার মধ্যেও মন প্রবেশ ক’রে তাকে মনোময় ক’রে তুলতে পারে। এই লীলা মানুষের, এই লীলায় তার আনন্দ।

        আপনার লেখা থেকে স্টপফোর্ড ব্রুক-এর বক্তব্যটা বেশী পছন্দ হলো-

        writing is not literature unless it gives to the reader a pleasure which arises not only from the things said, but from the way in which they are said’.

        এর সম্পূরক হিসেবে কবিগুরুর ভান্ডার থেকে চুরি করে একটু যোগ করি-

        কেবল রচনার ভঙ্গি নহে, দেখিবার সামগ্রীটাও বিচার্য। এমন-কি, কেবলমাত্র হৃদয়ের ভাবও নহে, কে কোন্‌ জিনিসটাকে বিশেষ করিয়া দেখিতেছে তাহার উপরেও তাহার ব্যক্তিত্ববিকাশ নির্ভর করে। কেমন করিয়া দেখিতেছে এবং কী দেখিতেছে এই দুটা লইয়াই সাহিত্য। কেমন করিয়া দেখিতেছে সেটা হইল হৃদয়ের এলাকা এবং কী দেখিতেছে সেটা হইল জ্ঞানের।

        আপনার এই লেখার শেষাংশের (কল্পনা এবং অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান) বিষয়ক কিছু কথা নিয়ে আমার কিছু বলার ছিল, তা না হয় পরে আলোচনা করা যাবে।

        • মোজাফফর হোসেন সেপ্টেম্বর 23, 2013 at 1:55 অপরাহ্ন - Reply

          @আকাশ মালিক, আপনার দীর্ঘ মন্তব্যটি খুব কাজে দিল। আপনার কিছু বলার থাকলে অবশ্যই বলবেন। এতে আমার বড় উপকার হয়।
          আর পরের অংশে এ নিয়ে আরো আলোচনা থাকছে। সাথে থাকবেন। ধন্যবাদ।

          • আকাশ মালিক সেপ্টেম্বর 23, 2013 at 5:10 অপরাহ্ন - Reply

            @মোজাফফর হোসেন,

            ডেকার্তেস যেটা বলছেন—‘our innate ideas form the basis of our experience of reality’—

            কথাটা সত্য, কিন্তু আইডিয়াটা সত্য নাও হতে পারে। আমার কনফিউশনের মূল পয়েন্টা বলি- অনুমান-আন্দাজ বা কল্পনা কি অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান হতে পারে? আনোয়ার যে চাঁদের দেশ ভ্রমণ করে এসে চাঁদের বুড়ির সাথে দেখা করে তার সুতা কাটার কাহিনি বর্ণনা করলো, সেটা কি অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান? সে ভ্রমণ কাহিনি কি সাহিত্য? জ্ঞান হলেতো বুড়িকে সত্য বলে মেনে নিতে হয়। কল্পবিজ্ঞান কি সাহিত্য? মাসুদ রানা, আরব্য উপন্যাস? অভিজ্ঞতার কথা উঠেছে। প্রেমের বিরহ যন্ত্রণা সর্প দংশনের বিষজ্বালার চেয়েও মারাত্বক। অভিজ্ঞতালব্ধ কথা নয় নিশ্চয়ই। দূর পাহাড়ের চুড়ায় ধোঁয়া দেখেই এর নিচে আগুন আছে অনুমান করা যায় কিন্তু আগুনের দাহক্ষমতা তার ধর্ম বা গুন কি মাপা যায় বা অনুভব করা যায়?

            একজন লেখক তাঁর কল্পনাশক্তি বলে অনেকগুলো জীবন যাপন করেন। কাজেই দেখা যায়—একজন রিকশাচালকের জীবন ঐ রিকশাচালকের চেয়ে ভাল বোঝেন একজন লেখক।

            সমাজ বিশ্লেষকদের অনেকের কাছেই বোধ হয় এ কথা ছাড় পাবেনা। কারণ এই কল্পনাপ্রসুত সিদ্ধান্ত সমাজের জন্যে ক্ষতিকর হতে পারে। মুসলমান মাঝির দাড়ি বেয়ে বৃষ্টির জল শিশুর প্রশ্রাবের মত ঝরে লেখকের দৃষ্টিতে সাহিত্য হতে পারে আর মুসলমানের দৃষ্টিতে চরম সাম্প্রয়ীকতা। আমি মনে করি অনুমানকে সত্য বা কল্পনাকে জ্ঞান বলা যায়না।

            পরের অংশে এ নিয়ে আরো আলোচনা থাকছে। সাথে থাকবেন।

            লেখাটাকে টেনে টেনে খু———-ভ, অনে——–ক লম্বা করে নিবেন। অনন্তকাল চলুক, একেবারেই শেষ না হলে আরো ভাল। আজিকার নিরানন্দের বিষাদভরা জগতে এই জায়গাটাই শুধু বাকি আছে একটু সুখ, আনন্দ, প্রশান্তিতে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার। সুতরাং সাথে আছি, থাকবো সব সময়।

            • মোজাফফর হোসেন সেপ্টেম্বর 25, 2013 at 2:07 পূর্বাহ্ন - Reply

              @আকাশ মালিক, ঠিক আছে, আপনার কথার সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করছি না। সাহিত্য নিয়ে আসলে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আজ আমি এখানে যে কথা বলছি পাঁচ বছর পর সেই আমি ভিন্ন কথা বলবো হয়। এটা প্রতিনিয়ত একটা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। বিজ্ঞান কি বলল কিংবা সমাজ বিশ্লেষকরা কি বললেন তা অনুসরণ করে তো আর সাহিত্য চলে না। তাই এখানে কিছু ভুল-ভ্রান্তি থাকবে এই স্বাভাবিক। তাই সব তর্কই অমীমাংসিত রয়ে যায়। এটাকে এখানে এটাই মজা।
              কতদূর টানতে পারবো জানি না, তবে চলবে আরো কিছুটা।
              আবারো ধন্যবাদ।

    • আকাশ মালিক সেপ্টেম্বর 23, 2013 at 5:17 অপরাহ্ন - Reply

      @মাহফুজ,

      “মহান স্রষ্টার জীবন ঐ স্রষ্টার চেয়ে ভালো বোঝেন তার ভক্তরা।”

      হা, হা, এবার বুঝুন দুনিয়ার শ্রেষ্ট সাহিত্যিক কারা।

      কোথায় থাকেন আজকাল, লেখা টেকা একেবারেই যে নাই বিষয়টা কী? আছেন কেমন, ভাল থাকলেই হলো।

  3. হেলাল সেপ্টেম্বর 20, 2013 at 9:03 পূর্বাহ্ন - Reply

    @ মোজাফ্ফর হোসেন,
    আমি আপনার লেখার অপেক্ষায় থাকি। সাহিত্য নিয়ে আলোচনাটা ভাল লেগেছে। পরের পর্বের অপেক্ষায়।
    ধন্যবাদ

    • মোজাফফর হোসেন সেপ্টেম্বর 20, 2013 at 10:07 পূর্বাহ্ন - Reply

      @হেলাল, ধন্যবাদ হেলাল ভাই। এটা সত্যিই আনন্দের বিষয়। বেশ কিছুদিন মুক্তমনায় উপস্থিত ছিলাম না। আশা করি আবারো নিয়মিত হব।

  4. সুষুপ্ত পাঠক সেপ্টেম্বর 19, 2013 at 4:10 অপরাহ্ন - Reply

    ফকনার ১৯৫৮ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি আমেরিকান ফিকশনের ওপর গ্রাজুয়েটদের ক্লাসে বলেছিলেন:
    ‘আমার মতে তুমি যাই অনুধাবন করতে পারো তাই অভিজ্ঞতা। এটা বই থেকেও আসতে পারে। এটা এমন বই, এমন গল্প এবং এতই জীবন্ত যা তোমাকে নাড়িয়ে দেয়। আমার মতে এটা তোমার অভিজ্ঞতা সমুহের একটি। এমন নয় যে ঐ বইয়ের চরিত্রগুলো যা করে তা করে অভিজ্ঞতা নিতে হবে। চরিত্রগুলোর কাজগুলো যদি বাস্তবসম্মত মনে হয়, এবং মনে হয় মানুষ এমনটিই করে তাহলে এটা অভিজ্ঞতার ভেতর পড়ে। তাই আমার কাছে অভিজ্ঞতার সংজ্ঞা এই, অভিজ্ঞতার বাইরে লেখা সম্ভব নয়। কারণ তুমি যা পড়, শুন, অনুভব কর, কল্পনা কর- এ সবই অভিজ্ঞতার অংশ।

    কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক প্রায়ই বলেন যে তিনি দেখার বাইরে কিছু লেখেননি। এই কথা অনেকে বলেছেন। বলছেন। এই দেখা মানেই আক্ষরিক অর্থে সেই জীবনটা যাপন করা নয়। একজন লেখক তাঁর কল্পনাশক্তি বলে অনেকগুলো জীবন যাপন করেন। কাজেই দেখা যায়—একজন রিকশাচালকের জীবন ঐ রিকশাচালকের চেয়ে ভাল বোঝেন একজন লেখক। এজন্যে দেখার অনেকগুলো দৃষ্টি না থাকলে যা লেখা হবে সেটা হবে খবরের কাগজের খোরাক, সাহিত্য না।

    যেমন: আমরা কোনোদিন শিকারে যাইনি, শিকার করা দেখিওনি। কিন্তু শিকার করা বিষয়টা ধরতে পারি। ছোটবেলায় মুরব্বীদের কাছে শিকারের গল্প শুনে খানিকটা আন্দাজ করেছি, খানিকটা জীবজগতের স্বাভাবিক প্রবণতা দেখে বুঝে নিয়েছি।

    যে চরিত্র কোনদিন দেখিনি তা নিয়ে কি লেখা যায়? যে কোনদিন মদ খায়নি, মদ খেয়ে মাতাল হয়নি সে মাতাল চরিত্র নিয়ে কিভাবে লিখবে? অথচ বস্তিবাসী না হয়েও তো আমরা বস্তিবাসীদের নিয়ে লিখি। দস্তয়ভস্কি নিজে জুয়ারী ছিলেন বলে কি জুয়ারীদের নিয়ে লিখতে পেরেছিলেন? ব্যাশালয়ের অলিগলি না ঘুরলে, সেখানে গিয়ে রাত না কাটালে বুঝি সেখানকার কথা লেখা যাবে না? এক সময় এরকম মনে করা হতো বলে সাহিত্যকরা অভিজ্ঞতার জন্য নিজের ব্যক্তি জীবনকে মদ, ব্যাশ্যা, জুয়ার কাছে বিলিয়ে দিতেন। অতিরিক্ত অনাচারের কারেণ অনেক প্রতিভাবান লেখককে অকালে ঝরে পড়তে হয়েছে সময়ের আগে।
    শক্তি চট্টপাধ্যায়ের বাউন্ডুলেপনাকে নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন, শক্তির বাউন্ডুলেপনাকে অনেকেই নকল করতো। কেউ কেউ শক্তিকে হারও মানাতো। কিন্তু লেখার বেলায় ঠন ঠন…’ তারা হয়ত ভাবতো ভাল লিখতে হলে শক্তির মত হতে হবে! মুজতবা আলী লিখেছিলেন, আগে মাইকেলের মত একটা মহাকাব্য লিখ তারপর যত খুশি মদ খেয়ে লিভার পঁচিয়ে ফেলো কেউ না করবে না…’
    ধারাবাহিক একটা লেখা। অনেক কিছু জানলাম। মোজাফফর হোসেন, আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ লেখাটার জন্য। দ্বিতীয় কিস্তির অপেক্ষায়…।

    • মোজাফফর হোসেন সেপ্টেম্বর 20, 2013 at 12:58 পূর্বাহ্ন - Reply

      @সুষুপ্ত পাঠক,
      ধন্যবাদ জানাই আপনার মতামতের জন্য। লেখাটি একজনেরও যদি কোনো কাজে আসে তাতেই আমি শ্রম সার্থক বলে মনে করবো। শুভেচ্ছা রইল।

মন্তব্য করুন