বম্বে ব্লাড গ্রুপঃ এক বিরল ব্লাড গ্রুপের কথা

ব্লাড গ্রুপ হল কার রক্ত কাকে দান করা যাবে তার উপর নির্ভর করে করা রক্তের প্রকারভেদ। এটি আসলে নির্ভর করে রক্ত কোষগুলির কোষপর্দায় উপস্থিত এন্টিজেনগুলির ধরণের উপর। রক্তের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যায় লোহিত রক্ত কণিকা থাকে বলে তাদের কোষপর্দায় কি কি এন্টিজেন আছে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেক ব্লাডগ্রুপ এন্টিজেনই নানা কোষের কোষপর্দায় থাকে বা অনেকসময় শ্লেষ্মা ইত্যাদির মধ্যে ক্ষরণপদার্থ হিসাবেও থাকে।

একটি লোকাসে (ক্রোমোজোমের উপর জিন গত অবস্থান) অবস্থিত সবকটি সাম্ভাব্য অ্যালিলকে নিয়ে হয় এক একটি ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম এ-বি-ও ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম এবং আরএইচ ডি (Rh D) ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম এই দুটি সবচেয়ে বিখ্যাত ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও মানুষের বেলায় এরকম ২৯টি ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমকে আই এস বি টি (International Society of Blood Transfusion) অনুযায়ী মানা যেতে পারে। এই ২৯টি সিস্টেমে মোট ৬০০রও বেশী অ্যান্টিজেন আছে। তবে এই ৬০০টির অনেকই খুব দুষ্প্রাপ্য বা কোনো বিশেষ জাতির বাইরে দেখা যায় না।


রক্ত দান করার সময় গ্রহীতার রক্তে দাতার রক্ত মেশবার সময় গ্রুপ গ্রহনযোগ্য (কম্প্যাটিবল্ বা ম্যাচিং) হবে না যদি গ্রহীতার রক্তরসে অবস্থিত এন্টিবডি দাতার কোষের উপরস্থ এন্টিজেনকে চিনতে পারে, পারলে গ্রহীতার অ্যান্টিবডির আক্রমণে দাতার রক্তকোষগুলি তাল পাকিয়ে জমাট (হিম-অ্যাগ্লুটিনেশন) বেঁধে যাবে বা ফেটে নষ্ট (হিমো-লাইসিস) হয়ে যাবে। দাতার রক্তের এন্টিবডি ততটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ সাধারণতঃ দাতার এন্টিবডি গ্রহীতার রক্তরসে মিশে গেলে দাতার এন্টিবডির ঘনত্ব গ্রহীতার কোষেগুলির অতটা ক্ষতি করতে সক্ষম হয়না। দাতার কোষগুলি “প্যাকড সেল” হিসাবে দিলে রক্ত রস এমনিতেই কম দেওয়া হচ্ছে। তবে খুব বেশী পরিমাণ দাতার প্লাজমা (রক্তরস) দিতে হলে কিন্তু প্লাসমার গ্রহণযোগ্যতাও দেখতে হবে, এবং ক্ষেত্রে দাতার এন্টিবডি  আর গ্রহীতার এন্টিজেনের মধ্যে মিল থাকলে চলবে না। সাধারণতঃ কোনো নীরোগ ব্যক্তির নিজের রক্তকোষে যে এন্টিজেন থাকে তার বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি হয় না। এ বি ও সিস্টেমের বেলায় নীরোগ ব্যক্তির নিজের রক্তকোষে যে এন্টিজেন থাকে না তার বিরুদ্ধে এন্টিবডি  আগে থেকেই থাকে (দুর্বোধ্য কারণে) এবং সেই এণ্টিজেন ধারী কোষকে দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করে, আর এইচ সিস্টেমের বেলায় এন্টিজেনধারী দাতা কোষ-কে একবার দেখলে তার পরেই এন্টিবডি তৈরি হয় এবং তাই প্রথমবার তেমন অসুবিধা হয় না, কিন্তু পরে (দ্বিতীয়বার) একই রকম দাতা কোষকে দেখলে তখন অসুবিধা করে।[1]

যে নির্দিষ্ট ব্যক্তির রক্তে যে এন্টিজেন নেই, শুধু সেই এন্টিবডি সেখানে পাওয়া যাবে । অর্থাৎ এ গ্রুপে এ এন্টিজেন, বি গ্রুপে বি এন্টিজেন এবং এবি গ্রুপে এ ও বি উভয় এন্টিজেন থাকে । ও গ্রুপের রক্তে কোন এন্টিজেন নেই কিন্তু রক্তরসে এ ও বি দুরকম এন্টিবডিই থাকে । প্রতিটি এন্টবডি তার সমগোত্রীয় এন্টিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে রক্তকে জমাট বাঁধায় অর্থাৎ এন্টিবডি এবং এন্টিজেন এ এর সাথে এবং এন্টিবডি বি, এন্টিজেন বি এর সাথে বিরূপ বিক্রিয়া ঘটায় । একে বলে এগ্লুটিনেশন রিঅ্যাকসন।

 

 

 

এই তো গেল থিউরিটিকাল কথাবার্তা। এবার এক বিরল ব্লাড গ্রুপের কথা বলি আপনাদের। এক নাম বম্বে গ্রুপ। কারণ ১৯৫২ সালে ভারতের বম্বে (বর্তমানে মুম্বাই) শহরে এই ব্লাড গ্রুপ প্রথম আবিষ্কৃত হয়। এটি আবিষ্কার করেন ডা ওয়াই এম বেন্দে। এর আরেক নাম Hh antigen system বা Oh ব্লাড গ্রুপ। এটি পূর্ব ভারতীয়দের ছাড়াও ককেসিয়ান এবং জাপানিদের ভিতর পাওয়া গিয়েছে।[2]

 

এদের লোহিত রক্তকণিকায় এ,বি এবং এইচ এন্টিজেন থাকে না এবং কার্ল ল্যান্ডস্টেইনারের সূত্র অনুযায়ী তাদের রক্তরসে  এন্টি এ,এন্টি বি এবং এন্টি এইচ এন্টিবডি থাকে। এন্টি এইচ সাধারণ এবিও ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমে শনাক্ত করা হয় না। এই ব্লাড গ্রুপের সদস্যরা সাধারণত ও ব্লাড গ্রুপের মত থাকে ব্লাড গ্রুপ পরীক্ষা করার সময়। সমস্যা হয় রক্ত নেওয়ার সময়। আমরা এখন জানি যে যেই প্রোটিন থেকে ব্লাড গ্রুপ এন্টিজেন তৈরি হয় তার নাম এইচ এন্টিজেন। এই এইচ এন্টিজেন  এ এন্টিজেনে রূপান্তর হতে পারে ( এ ব্লাড গ্রুপে), বি এন্টিজেনে রূপান্তর হতে পারে ( বি ব্লাড গ্রুপে),এ এবং বি উভয় এন্টিজেনে রূপান্তর হতে পারে ( এবি ব্লাড গ্রুপে), কিংবা এইচ এন্টিজেনে রয়ে যেতে পারে ( ও ব্লাড গ্রুপে)।  এই এইচ এন্টিজেনই খেল খেলে বম্বে ব্লাড গ্রুপের ব্যক্তি যখন ও ব্লাড গ্রুপের রক্ত গ্রহণ করবে।[3]

 

ও গ্রুপে আছে এইচ এন্টিজেন,  রক্তরসে এ ও বি দুরকম এন্টিবডিই থাকে।

 

বম্বে ব্লাড গ্রুপে আছে রক্তরসে এন্টিবডিই থাকে এ, বি এবং এইচ।

 

বম্বে ব্লাড গ্রুপের ব্যক্তি যখন ও ব্লাড গ্রুপের রক্ত গ্রহণ করবে তখন এইচ এন্টিজেন এবং এইচ এন্টিবডির ভিতর ক্রস রিঅ্যাকশন ঘটবে এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে।

 

তাই বম্বে ব্লাড গ্রুপের মানুষ কেবল বম্বে ব্লাড গ্রুপের রক্তই গ্রহণ করতে পারবে। তারা সার্বজনীন দাতা। তারা সবাইকে রক্তদান করতে পারবে।

 

ভারতীয়রা তাদের দেশে গবেষণা করে দেখে ১২৫ কোটি মানুষের ভিতর মাত্র ১৫৭ জনের এই বিরল ব্লাড গ্রুপ রয়েছে আর এদের ভিতর মাত্র ৪ জন আর এইচ নেগেটিভ।

 

বাংলাদেশে বম্বে ব্লাড গ্রুপ প্রথম শনাক্ত পড়ে ১৯৭৫ সালে। সোনারগাঁওতে এক অভিজাত মিয়াঁর পরিবারে। সেখানে ডাক্তাররা দেখেন ঐ পরিবারের ১৭ জন এই বিরল ব্লাড গ্রুপের অধিকারী। তাদের রক্তগ্রহণের দরকার পড়লে ভারত থেকে রক্ত আনা লাগত। এরপর তারা আমেরিকাতে চলে যান। পরে আরও কিছু বম্বে ব্লাড গ্রুপের সদস্য খুঁজে পাওয়া যায়।

 

কত যে বিস্ময় লুকিয়ে আছে এই পৃথিবীতে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে এই রহস্যগুলো আমাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে।

 

 

 

সূত্রঃ

 

1. উইকিপিডিয়া

 

2.  http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/2096814

 

 

3. http://www.thinkfoundation.org/kc_bombay_blood_groups.htm

মন্তব্যসমূহ

  1. নয়ন আগস্ট 26, 2013 at 1:46 অপরাহ্ন - Reply

    ভালো লেগেছে……এ ধরনের আরও লেখার অপেক্ষায় আছি

  2. এম এস নিলয় জুলাই 31, 2013 at 3:33 পূর্বাহ্ন - Reply

    একটা টাক খেলেই জীবন শেষ 🙁

    সারাদিন সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াই; আমি ভালো আছি আমার ব্লাড গ্রুপ B+। টাক খেলে ভয় নেই; রক্তের অভাব নেই।

    কিন্তু বেচারাদের জন্য ভয় হচ্ছে 😕

    এত্তগুলা অজানা তথ্যের জন্য ধন্যবাদ 🙂

  3. আমি কোন অভ্যাগত নই জুলাই 20, 2013 at 12:31 অপরাহ্ন - Reply

    বাহ! বেশ চমৎকার ব্যাপার জানা গেল!

  4. কেশব অধিকারী জুলাই 19, 2013 at 4:28 অপরাহ্ন - Reply

    সে কি, তা নাকি? এতো দারুন তথ্যবহুল একটা লেখা। এতো জানাই ছিলোনা! এখন তো দেখছি রক্ত দেওয়া নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভালোরকম ঝুঁকি আছে!

    • নিঃসঙ্গ গ্রহচারী জুলাই 19, 2013 at 7:29 অপরাহ্ন - Reply

      @কেশব অধিকারী,

      ধন্যবাদ আপনাকে।

      এখন তো দেখছি রক্ত দেওয়া নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভালোরকম ঝুঁকি আছে!

      এখন ক্রস ম্যাচিং ব্যবস্থা উন্নত। আশা করি কারও বিরল রক্তগ্রুপ থাকলে ধরা পরবে।

  5. আম্মানসুরা জুলাই 19, 2013 at 4:26 অপরাহ্ন - Reply

    এই গ্রুপের রক্ত কি মানব দেহে কোন বাড়তি উপযোগিতা দেয়? নাকি অন্য সব গ্রুপের মতই শুধু এন্টিবডি বেশী

    • নিঃসঙ্গ গ্রহচারী জুলাই 20, 2013 at 12:24 অপরাহ্ন - Reply

      @আম্মানসুরা,

      এই গ্রুপের রক্ত কি মানব দেহে কোন বাড়তি উপযোগিতা দেয়? নাকি অন্য সব গ্রুপের মতই শুধু এন্টিবডি বেশী

      না বাড়তি কোন উপযোগিতা নেই। :guru: :guru: :guru: :guru:

  6. রামগড়ুড়ের ছানা জুলাই 19, 2013 at 1:07 অপরাহ্ন - Reply

    এত ব্লাডগ্রুপ আছে কল্পনাই করিনি, সচরাচর যেগুলো শোনা যায় তার বাইরে জানতামনা। আচ্ছা ব্লাডগ্রুপ ভিন্ন ভিন্ন হবার দরকার কি ছিলো? সবার এক কেন হলোনা?

    • নিঃসঙ্গ গ্রহচারী জুলাই 19, 2013 at 7:28 অপরাহ্ন - Reply

      @রামগড়ুড়ের ছানা,

      আপনি এই লেখাটি পড়তে পারেন।

      • বিপ্লব রহমান জুলাই 20, 2013 at 11:25 পূর্বাহ্ন - Reply

        @নিঃসঙ্গ গ্রহচারী,

        চিন্তাশীল ও তথ্য বহুল নোট। অনেক কিছু জানলাম। শাফায়াত বলেছেন:

        আচ্ছা ব্লাডগ্রুপ ভিন্ন ভিন্ন হবার দরকার কি ছিলো? সবার এক কেন হলোনা?

        এরই পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাই, বেশ আগে কোথাও পড়েছিলাম, বিজ্ঞানীরা নাকি ল্যাবরেটরিতে একটি “কমন ব্লাড গ্রুপ” তৈরি করছেন, এটি সব ব্লাড গ্রুপের ব্যাক্তিরা নিতে পারবেন। এই খবরের সবশেষ আপডেট কি, বলতে পারেন? :-s

        • নিঃসঙ্গ গ্রহচারী জুলাই 20, 2013 at 12:23 অপরাহ্ন - Reply

          @বিপ্লব রহমান,

          এরই পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাই, বেশ আগে কোথাও পড়েছিলাম, বিজ্ঞানীরা নাকি ল্যাবরেটরিতে একটি “কমন ব্লাড গ্রুপ” তৈরি করছেন, এটি সব ব্লাড গ্রুপের ব্যাক্তিরা নিতে পারবেন। এই খবরের সবশেষ আপডেট কি, বলতে পারেন?

          না ভাই এই খবরটা আমার অজানা। নেট ঘেঁটে কিছু পেলাম না। ;-( ;-( ;-( ;-(

  7. তারিক জুলাই 19, 2013 at 1:39 পূর্বাহ্ন - Reply

    তথ্যবহুল লেখা । (Y)
    কত যে বিস্ময় লুকিয়ে আছে এই পৃথিবীতে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে এই রহস্যগুলো আমাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। :clap

মন্তব্য করুন