সমকামিতার পক্ষে-বিপক্ষে : ভূমিকা

সমকামিতা মানুষের সহজাত স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য কিনা তা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয় । একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানুষের অভিভাবকের ভূমিকা নিতে পারে না । একটি রাষ্ট্রকে স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তখনই অভিহিত করা যায় যখন এর নাগরিকেরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেন ।

যেসব রাষ্ট্রে সমলিঙ্গ বিয়ের আইনগত স্বীকৃতি চালু রয়েছে সেগুলো হচ্ছে : Argentina, Brazil, Canada, New Zealand (Niue, The Cook Islands ও Tokelau ব্যতীত New Zealand-এ ১৯শে অগাস্ট ২০১৩ তারিখ থেকে সমলিঙ্গ বিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে), Norway, South Africa, Uruguay (Uruguay-তে ১লা অগাস্ট ২০১৩ তারিখ থেকে সমলিঙ্গ বিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে), ইয়ুরোপিয়ান্ য়্যুনিয়ন্-ভুক্ত দেশগুলোর ভেতর Belgium, Denmark (Faroe Islands ও Greenland ব্যতীত), France, Iceland, Portugal, Spain, Sweden, The Netherlands(Aruba, Curaçao ও St. Maarten ব্যতীত), মেক্সিকোর অঙ্গরাষ্ট্র ও প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোর ভেতর Quintana Roo অঙ্গরাষ্ট্র ও Mexico City Federal District, এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাষ্ট্র ও প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোর ভেতর Connecticut, Delaware, Iowa, Maine, Maryland, Massachusetts, Minnesota, New Hampshire, New York, Rhode Island, Vermont, Washington অঙ্গরাষ্ট্রসমূহ ও The Coquille Indian Tribe, The District of Columbia, The Little Traverse Bay Bands of Odawa Indians ও The Suquamish tribe প্রশাসনসমূহ । প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের যে আধুনিক সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দেশগুলো সমলিঙ্গ বিয়ের সমর্থনে আইন তৈরি করেনি তাদের বিষয়টি এই নয় যে তারা সমকামীদের বিরোধী, বরং উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে সমকামীদের বিরোধিতা করা হয় না । এই দেশগুলোতে বিয়ের আইন তৈরির অর্থ মানে এই নয় যে রাষ্ট্র নাগরিকদের জীবন সংস্কৃতিকে পরিচালিত করছে, বরং এই আইন প্রতিষ্ঠা ও না প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মূলত সম্পদ ও দায়দেনার বণ্টনকেন্দ্রিক । অর্থাত্ সমকামী বিয়ের বিষয়ে আধুনিক পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল মাথাব্যথাটি সমকামী বিয়ে ‘সঠিক নাকি ভুল’ — এটা নয়, বরং মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে উত্তরাধিকার ও তালাকের ক্ষেত্রে সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে, দত্তক সন্তানের বিষয়ে, কোন শিশু (সাধারণভাবে যাকে অসমকামী ধরে নেয়া হচ্ছে) সমকামী দম্পতি পরিবারে বড় হওয়ার বিষয়ে, টেস্ট টিউব শিশু এবং ভাড়া করা গর্ভধারণের বিষয়ে, ক্লোনিং (ক্লোণ্ড শিশু ‘সন্তান’ কিনা তার আইনগত ব্যখ্যার সুরাহা হয়নি), ইত্যাদি । আর বিয়ের আইন না থাকা মানে এই নয় যে সেখানে সমকামিতা অবৈধ, বরং ব্রিটেনের মতো আরও কিছু দেশ ও অঙ্গরাষ্ট্র রক্ষণশীল রাষ্ট্রগুলোর সমকামীদেরকে অভিবাসনের ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ দেয় । অর্থাত্ সমকামী বিয়ের আইনগত স্বীকৃতি না থাকা মানে সমকামীদের অস্বীকৃতি জানানো নয়, সমকামী বিয়ের আইনগত স্বীকৃতি আছে এমন কিছু দেশের থেকে ব্রিটেন বা জার্মানির মতো দেশে সমকামীদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজ অনেক বেশি উদার ।

এক্ষেত্রে অনেকে বলতে চান সমকামীরা একসাথে থাকুক, অধিকার ভোগ করুক, কিন্তু বিয়ের দরকার কি, বিয়ে না করলেও বা কি এসে গেলো, যেখানে ইয়ুরোপে অবিবাহিত হেটারোসেক্সুয়াল্ জুটির সংখ্যা বাড়ছে । তাছাড়া ব্রিটেন বা জার্মানির মতো দেশে সমকামী সম্পর্ক অনেক বেশি স্বাধীন যেখানে তাঁদের শুধু ‘বিবাহিত দম্পতি`-এর অধিকারটুকু দেয়া হয়নি, তাতেও কিছু যায় আসে না কারণ টিন্-এয়িজ্ হেটারোসেক্সুয়াল্-দের সহবাস সংস্কৃতি তো বটেই, বহু পূর্ণবয়ষ্ক দম্পতিও সারা জীবন আইনগত ‘বিয়ে` করেন না । এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে হোমোসেক্সুয়াল্-দের বিবাহ প্রথা, দত্তক সন্তান গ্রহণ, পারিবারিক সম্পদ বণ্টন, এমনকি নিজের (অনেকের ক্ষেত্রে) বায়োলজিক্যাল্ সন্তানের প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সমকামী সঙ্গীর সাথে যৌথভাবে ‘বাবা-মায়ের’ ভূমিকা নেয়া — এই ইচ্ছাগুলোর বিরোধিতা আমরা করতে পারি না । এই পৃথিবীতে আমার পছন্দই ঠিক, অন্যের পছন্দ ঠিক নয় — এরকম রায় দেয়ার অধিকার আমাদের কেউ দেয়নি । নিজেদেরকে নিজেরা অন্যের চেয়ে সেরা ভাবতে পারি বটে, কিন্তু বাস্তবে তা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারি না ।

সমকামিতা স্বাভাবিক না বিকৃতি তা নির্ণয় করার দায়িত্ব আধুনিক রাষ্ট্রের নয় । পূর্ণবয়ষ্ক নাগরিকদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে নাক গলানো তার দায়িত্ব নয় । রাষ্ট্র তখনই নাক গলাতে পারে যখন এক ব্যক্তি কর্তৃক অন্য বা অন্যদিগের শারিরীক, আর্থিক ও সুনামগত ক্ষতির কারণ ঘটতে পারে । রাষ্ট্র কখনোই নাগরিকদের অভিভাবক হতে পারে না, নাগরিকেরাই রাষ্ট্রের অভিভাবক । একটি রাষ্ট্রকে তখনই স্বাধীন বলা চলে যখন তার নাগরিকেরা স্বাধীন হয়, শুধু একারণে একটি রাষ্ট্রকে স্বাধীন বলা যায় না যে এর প্রশাসকেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিভূ কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর স্বজাতীয় । প্রকৃতিজগতে ব্যক্তি একটি স্বাধীন স্বত্ত্বা । রাষ্ট্রীয় আইন ও বিধানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ভেতর একটি ভারসাম্য অবস্থান কাম্য ।

সমকামিতার বিষয়ে একটি ধারাবাহিক রচনা লেখার ইচ্ছায় বক্ষ্যমান নিবন্ধটি লিখছি । মনে রাখতে হবে যে এই লেখায় আমি সমকামিতার পক্ষে ও বিপক্ষে উভয় যুক্তিই প্রদর্শন করবো, তার সাথে সমলিঙ্গ বিয়ের বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গীর সম্পর্ক নেই । আমি আগেই বলে রাখছি যে ব্যক্তিস্বাধিনতার স্বার্থে আমি পূর্ণবয়সীদের সমলিঙ্গ বিয়ের সমর্থক, কিন্তু সমকামিতা প্রাণী-মানবের (প্রাণী হিসেবে মানুষের) সহজাত মৌলিক পরিচয়ের অংশ কিনা সে ব্যাপারে আমি এখনও নিশ্চিত নই ।

প্রচলিত সংজ্ঞানুসারে প্রাণিজগতের কাম বা যৌনতার শ্রেণীবদ্ধকরণের জটিলতা রয়েছে । প্রচলিত সংজ্ঞানুসারে তিন (৩)-টি মতান্তরে চার (৪)-টি সেক্সুয়াল্ অরিয়েণ্টেশন্ (Sexual Orientation)-এর পরিচয় প্রচলিত : (১) অসমকামিতা (Heterosexuality) (২) সমকামিতা (Homosexuality) (৩) উভকামিতা (Bisexuality) এবং অনেকের মতে চতুর্থ (৪র্থ) সেক্সুয়াল্ অরিয়েণ্টেশন্ হচ্ছে নিষ্কামিতা (Asexuality) । এছাড়া অনেক ধরণের কামাচরণ (Sexual Behaviour) ও যৌন পরিচিতি (Sexual Identity)-কে এই সেক্সুয়াল্ অরিয়েণ্টেশন্-গুলোর বাইরে ধরা হয়, যেমন পরাকামিতা (Paraphilia) । এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে পরাকামিতাকে সকলেই (যৌনবিজ্ঞানী, মনোবিদ, যৌনমনোবিদ, মনোসমীক্ষণবিদ, নৃতাত্ত্বিক) কামবিকৃতি (Perversion) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন । পিডোফিলিয়া (Paedophilia), স্বমেহন (Self-abuse), ক্রোণোফিলিয়া (Chronophilia), মৃতকামিতা (Necromancy), পশুগমন (Bestiality বা Zoophilia), সর্বকামিতা (Pansexuality), ইত্যাদি কামাচরণ (Sexual Behaviour) এবং বিভিন্ন প্রকার কাম ফেটিশ্ (Sexual Fetish) ‘পরাকামিতা’ (Paraphilia)-এর অন্তর্ভুক্ত । প্রচলিত সংজ্ঞার দুর্বলতা হচ্ছে কামাচরণ ও যৌন পরিচিতি-গুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে শ্রেণীবদ্ধকরণের জটিলতা এবং পরষ্পর বিরোধী সংজ্ঞা প্রদান । অনেকে শুধুমাত্র অসমকামিতা (Heterosexuality)-কেই সত্যিকার যৌন পরিচয়ের স্বীকৃতি দেন (Straight Sexuality) ।

অনেকে বলতে পারেন সমকামিতা ও নিষ্কামিতা বিতর্কিত বিষয়, এনিয়ে আলোচনার কি আছে, কিন্তু য়্যু.এন্. (United Nations, UN)-এর অঙ্গসংগঠন ডাব্লিয়ু.এয়িচ্.ও. (World Health Organization, WHO)-এর মতে কোন সেক্সুয়াল্ অরিয়েণ্টেশন্-কেই অস্বাভাবিকতা (Disorder) হিসেবে গণ্য করা যাবে না (WHO, ICD-10 Version:2010) । এক্ষেত্রে সেক্সুয়াল্ অরিয়েণ্টেশন্ বলতে প্রচলিত সেক্সুয়াল্ অরিয়েণ্টেশন্-এর ধারণাকেই বোঝানো হচ্ছে, অর্থাত্ Heterosexuality, Homosexuality, Bisexuality ও Asexuality । প্রচলিত এসব সেক্সুয়াল্ অরিয়েণ্টেশন্-গুলোর ভেতর সেসব কামাচরণগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যে আচরণগুলো আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে অন্যের ক্ষতি করে না বা শিশু ও প্রাণীজগত্-সহ কারো অধিকার লঙ্ঘন করে না । সেক্সুয়াল্ অরিয়েণ্টেশন্-এর এই প্রচলিত মতামতে শুধুমাত্র নারী ও পুরুষ — এই দুটি লিঙ্গ পরিচয় এবং Penetrative Sex ও Non-penetrative Sex-কে ধরা হয়েছে । কিন্তু এতে কিছু জটিলতা রয়েছে ।

আমি আলোচনার সুবিধার্থে সর্বসম্মতভাবে প্রাণীজগতের সব ধরণের কাম আচরণের ভেতর পরাকামিতা (Paraphilia)-কে কামবিকৃতি (Perversion) হিসেবে এবং স্ট্রেয়িট্ সেক্সুয়ালিটি (অসমকামিতা বা Heterosexuality)-কে সহজাত (Natural) হিসেবে চিহ্নিত করছি । আমার বাকি আলোচনা হবে বহুলিঙ্গকামিতা (Polysexuality), সমকামিতা (Homosexuality) ও নিষ্কামিতা (Asexuality) প্রাণীর সহজাত (Natural) বৈশিষ্ট্য কিনা তার পক্ষে ও বিপক্ষে যত ধরণের যুক্তি ও উদাহরণ দেয়া সম্ভব তা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করা । তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, কামাচরণগুলোর প্রচলিত সংজ্ঞাগুলোর সাথে আমি একমত এবং এর সাথে আমার কোন দ্বন্দ্ব নেই, কিন্তু প্রচলিত সংজ্ঞাগুলোর সাথে আমার মতানৈক্য হচ্ছে দ্বিলিঙ্গ (Gender Binary) দৃষ্টিভঙ্গীর সেক্সুয়াল্ অরিয়েণ্টেশন্ শ্রেণীকরণ ও সুকৃতি-বিকৃতি (Natural or Perversion) বিবেচনার মানদণ্ড । যেমন, উভকামিতার ক্ষেত্রে ‘ক্লীবলিঙ্গ’-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তেমনি Penetrative Sex ও Non-penetrative Sex-এর বাইরে ‘অস্পর্শ যৌনতা’ নিয়েও কোন সংজ্ঞা নেই । তাছাড়া এসব সেক্সুয়াল্ অরিয়েণ্টেশন্-গুলোর ভেতর সেসব কামাচরণগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যে আচরণগুলো আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে অন্যের ক্ষতি করে না বা শিশু ও প্রাণীজগত্-সহ কারো অধিকার লঙ্ঘন করে না, যেখানে মনোবিদ্যার দৃষ্টিভঙ্গীর চেয়ে ‘রাষ্ট্রনৈতিক’ দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে । যৌনতার ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গ হিসেবে পরিচিত প্রত্যঙ্গগুলোর ব্যবহার থাকতেই হবে এমন নয় । যে প্রক্রিয়া কিংবা চিন্তা মস্তিষ্কের যৌনানুভূতিকে উদ্দীপ্ত করে অর্গ্যাজ়্ম্ (Orgasm) ঘটাতে সক্ষম তাই কাম/যৌনতা বা Sexuality । তবে এক্ষেত্রে প্রাইমারি কিংবা সেকেণ্ডারি যৌন অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গ বলে পরিচিত অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গসমূহের ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে, যখন এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে সরাসরি অংশগ্রহণ না করিয়ে যদি মস্তিষ্ক পুরোপুরি একটি যৌনকার্য সমাধা করতে সক্ষম হয় তবে একে আমরা বলতে পারি অস্পর্শ যৌনতা । মাস্টার্বেশন্ অস্পর্শ যৌনতা নয় । স্বমেহন এবং মাস্টার্বেশন্ এক নয় । মাস্টার্বেশন্ (Masturbation) বলতে Non-penetrative Sex-কে বোঝানো হয়, যার নির্দিষ্ট কোন পদ্ধতি নেই এবং যা নিজে কোন যৌন পরিচিতি নয় । যেমন, নি:সঙ্গ কল্পনাকামিতাকে প্রাইমারি কিংবা সেকেণ্ডারি যৌন অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গ বলে পরিচিত অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গসমূহের ব্যবহারের মাধ্যমে ও ব্যবহার ব্যতিরেকে একাকি কল্পনাকামী রতিক্রিয়াকে উল্লেখ করছি স্বমেহন বা Self-abuse হিসেবে, যদি এটা নিজ যৌনাঙ্গ-স্পর্শে হয় তবে এটা স্পর্শ স্বমেহন (যা মাস্টার্বেশনের মাধ্যমে হচ্ছে), যৌনাঙ্গ-স্পর্শে না হলে অস্পর্শ স্বমেহন । মাস্টার্বেশনের কোন পদ্ধতি যদি একাকি যৌনতায় ব্যবহৃত হয় তবে সেটি স্বমেহন । অন্যদিকে একাধিক সমলিঙ্গের মানুষের ভেতর মিয়ুচুয়াল মাস্টার্বেশন্ (Mutual Masturbation) সমকামিতার অন্তর্ভুক্ত, একাধিক বিপরীতলিঙ্গের মানুষের ভেতর মিয়ুচুয়াল মাস্টার্বেশন্ অসমকামিতার অন্তর্ভুক্ত, একাধিক সম লিঙ্গের ও অসম লিঙ্গের মানুষের ভেতর মিয়ুচুয়াল মাস্টার্বেশন্ উভকামিতার অন্তর্ভুক্ত, তেমনি পশুগামিতার ক্ষেত্রেও মিয়ুচুয়াল মাস্টার্বেশনের প্রচলন রয়েছে । সমকামী, অসমকামী, উভকামী পরিচিতির ক্ষেত্রে Penetrative Sex প্রয়োজনীয় নয় এবং সমলিঙ্গের শিশুর প্রতি যৌনাচরণ প্রদর্শন সমকামিতা নয় বরং লিঙ্গপরিচয় নির্বিশেষে যেকোন শিশুর প্রতি যৌনাচরণ প্রদর্শনই পিডোফিলিয়া (Paedophilia) । কিশোরকামিতা বা Ephebophilia, ক্রোণোফিলিয়া — এগুলো পিডোফিলিয়া নয়, যদিও এগুলোও বিকৃতি এবং পরাকামিতার অন্তর্ভুক্ত (এগুলো ক্রমাণ্বয়ে আলোচিত হবে) ।

নৃতত্ত্ব (Anthropology), মনোবিদ্যা (Psychology), মনোসমীক্ষণবিদ্যা (Psychoanalysis), বায়োলজি অব্ জেণ্ডার্ (Biology of Gender) প্রভৃতি বিষয় সরাসরি বিজ্ঞান (Science)-এর অন্তর্ভুক্ত নয় । কিন্তু এই বিষয়গুলো এবং বিজ্ঞান — উভয়েরই উন্মেষ বস্তুবাদী দর্শন (Materialist Philosophy) থেকে । যে বিষয়গুলো বিজ্ঞান দ্বারা ব্যাখ্যাত হয় না তা এই জাতীয় বিষয়গুলো দ্বারা আমরা ব্যাখ্যার চেষ্টা করি । এক্ষেত্রে যুক্তি প্রদর্শন করা হয় সম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত মত মেনে নিয়ে এবং বিজ্ঞানবিরোধী কোন মতকে গ্রহণ না করে । যেমন, মানুষের নারী ও পুরুষ সমান – এটা বিজ্ঞান দ্বারা সরাসরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, কিন্তু বায়োলজি অব্ জেণ্ডার্ দ্বারা সম্ভব, তাও আবার বিভিন্ন বিষয়ে বায়োলজি বিজ্ঞানের মতামতকে ব্যবহার ক’রে !

ভুয়াপ্রাণবিজ্ঞান বা সিয়ুডোবায়োলজি (Pseudobiology) থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছি । সিয়ুডোবায়োলজিকে এড়ানোর জন্য কতগুলো বিতর্কিত বিষয়কে একদমই গ্রহণ করা হয়নি এবং অন্যের মতামত হিসেবেও গ্রহণযোগ্য হবে না । সমাজভেদে এগুলোর প্রচারণা একেকভাবে হচ্ছে, যেমন :
• মানুষের পুরুষ নারীর চেয়ে উচ্চতায় বড়, নারীর চেয়ে বুদ্ধিমান যা মানুষের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ।
• মানুষের কোন নির্দিষ্ট জেণ্ডার আগে বয়ো:সন্ধিতে পৌঁছে ।
• মানুষের কোন নির্দিষ্ট জেণ্ডার আগে বার্ধক্যে পৌঁছে ।
• পুরুষ সমকামীদের কথিত ‘পুরুষত্ব’ কম বা নারী সমকামীদের গর্ভধারণ ক্ষমতা নেই ।
• সমকামীদের জন্য ‘অমুক-অমুক’ রোগ বিস্তার হয় ।
ইত্যাদি ।
প্রচলিত এরকম কিছু বিষয় একদম ভ্রান্ত । নারীবাদী ও সমকামীরা অনেকদিন ধরেই একশ্রেণীর বিজ্ঞানী কিংবা চিকিত্সা বিজ্ঞানী পরিচয়ে পরিচিত ব্যক্তি কর্তৃক মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার । ব্যক্তি ও রাষ্ট্রভেদে এই মিথ্যাচার প্রবণতাগুলোর অন্যতম হচ্ছে :
• প্রাণীজগতে ঘ’টে চলা সমকামী ও উভকামী আচরণগুলোকে লুকোনো । সমকামী ও উভকামীদের জিন্গত উত্তরাধিকার (Genetic Inheritance)-এর ঘটনা লুকোনো ।
• সুস্পষ্টভাবে পুরুষ শিশুদের কামাচরণ (পুরুষদের Sexual Response Cycle-এর শৈশব বিকাশ) ও বালক বয়সীদের বীর্যোত্পাদনকে লুকোনো এবং নারীর তুলনায় তার বয়ো:সন্ধির বয়সকে দেরিতে দেখানো ।
• পুরুষের এণ্ড্রোপজ়্ (Andropause)-কে লুকোনো ।
• মেনোপজ়্ (Menopause) পরবর্তী নারীর পুরুষের তুলনায় প্রবল যৌনাকাঙ্ক্ষা (সমাজভেদে বয়সী নারীর স্বমেহন কিংবা কিশোরকামী প্রবণতাসহ) ও ভালো স্মৃতিশক্তি) এই বিষয়গুলোকে লুকোনো (নারীর দীর্ঘায়িত Sexual Response Cycle) ।
• যৌনতার বিষয়ে মস্তিষ্কই প্রধান সঞ্চালক – একে গুরুত্বহীনতা দেয়া ।
• মানুষের ভেতর পুরুষের তুলনায় নারীর লম্বা হওয়ার ঘটনা এর বিপরীত অর্থাত্ নারীর তুলনায় পুরুষের লম্বা হওয়ার ঘটনার মতোই স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও পুরুষের নারীর তুলনায় লম্বা হওয়াকে প্রাণী হিসেবে মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রচারণা ।
• এমনকি অতিলৌকিকতা, রোগ সারানোর বা রোগমুক্তির ক্ষেত্রে অলৌকিক (Miracle) বলে প্রচলিত ঘটনাগুলোর সপক্ষে প্রচারণা, কোন প্রাণীর উপাঙ্গে বা শিশুর শরীরে অলৌকিক চিহ্নের সচিত্র প্রচারণা, ইত্যাদি ।
• অনেক সময়ে জরিপ বা Poll-এর দোহাই দিয়ে সংগঠিতভাবেই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গীর প্রচারণা চালানো । বায়োলজি বিজ্ঞানের জগতে স্বীকৃত কিছু জার্ণাল্ও এর বাইরে নয় ।
• সর্বোপরি বিবর্তনবাদ (Theory of Evolution)-কে বিতর্কিত করার চেষ্টা যেখানে বিভিন্ন প্রাণীর ভ্রূণের বিভিন্ন অবস্থার তুলনামূলক বিচার, বিলুপ্ত প্রত্যঙ্গের উপস্থিতির বিদ্যমান চিহ্ন এবং বিভিন্ন প্রাণীর গৃহপালিত স্পেসিসের উত্পত্তি যা মানুষের ইচ্ছায় মানুষের চোখের সামনে ঘটেছে (যেমন গৃহপালিত কুকুর (Domestic dog : Canis lupus familiaris)-এর উত্পত্তি ধূসর নেকড়ে (Grey wolf : Canis lupus lupus) থেকে, গৃহপালিত বিড়াল (Domestic cat : Felis silvestris catus) বনবিড়াল (Wild cat : Felis silvestris silvestris) থেকে, গৃহপালিত গরু (Cattle : Bos primigenius taurusBos primigenius indicus) বণ্য গরু (Aurochs : Bos primigenius primigenius) থেকে, ইত্যাদি) — এগুলো খুব সুস্পষ্টভাবে বিবর্তনবাদকে সমর্থন করে । বিবর্তনবাদ দ্বারাই শুধুমাত্র যৌনতা/কাম-এর বিভিন্ন আচরণের ব্যাখ্যা করা সম্ভব । এখানে বিবর্তনবাদ শুধুমাত্র বায়োলজিস্ট্-দের প্রচলিত মতামত নয় তবে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গী একই ।
• ক্লীব লিঙ্গের সঠিক বায়োলজিক্যাল্ মর্যাদা নিশ্চিত না করা ।
• বংশবৃদ্ধিকে যৌনতা ও ‘যৌনাঙ্গ’-এর একমাত্র কাজ হিসেবে দেখানো ।
• ‘যৌনাঙ্গ’ বলতে শুধুমাত্র প্রজনন অঙ্গগুলোকেই বোঝানো ।
• ‘আনন্দের জন্য যৌনতা শুধুমাত্র মানুষ ও ডল্ফিনের ভেতর প্রচলিত’ — এ ধরণের ডাহা মিথ্যা প্রচার করা ।
ইত্যাদি ।
মানুষের নারী-পুরুষের পার্থক্য হিসেবে শুধুমাত্র সেগুলোকেই ধরা হবে যা সবসময়েই শতকরা একশো ভাগ (১০০%) ক্ষেত্রেই পার্থক্য রূপে থাকে । যেমন, নারী ও পুরুষের বিভিন্ন হর্মোন্ অনুপাতের পার্থক্য, কিছু হাড়ের পার্থক্য, পেশী-চর্বি অনুপাতের পার্থক্য, সর্বোপরি যৌনাঙ্গগুলোর পার্থক্য, ইত্যাদি । কোন প্রাণী-প্রজাতি বা স্পেসিসের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুটো বিষয় মনে রাখা উচিত্ : (১) যে শারীরিক বৈশিষ্ট্য / আচরণ / শারীরক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট স্পেসিসের সকল সদস্যের ক্ষেত্রে শতকরা একশো ভাগ (১০০%) প্রযোজ্য নয়, তা ওই স্পেসিসের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে না । (২) কোন স্পেসিসের কিছু সদস্যের ভেতর যদি ওই স্পেসিসের অন্য সদস্যদের চেয়ে ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য থাকে তবে তা ওই স্পেসিসের অন্য সদস্যদের সাথে প্রজননের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রযোজ্য হওয়া সম্ভব ।

প্রাণবিজ্ঞান মানুষের শুধুমাত্র তিনটি লৈঙ্গিক অবস্থা (Gender)-কে ব্যাখ্যা করতে পারে । মনোদৈহিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বায়োলজি অব্ জেণ্ডার্ আরও বেশি লৈঙ্গিক অবস্থার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম !

[চলবে]

[345 বার পঠিত]