কদিন ধরে আকাশ বাতাস কাপানো দূরাগত গমগমে মশাল মিছিল দেখছিলাম না তাই মন খারাপ। উজ্জল চোখের উদ্ভ্রান্ত বিপ্লবী মানুষগুলো আর আশেপাশের সবাই হঠাৎ করে কদিন ধরে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে আছে। সারাক্ষণ ওরা নিজেদের মধ্যে কি যেন আলাপ করে। আমার কিশোর চোখ বুক মন ভরছে না কিছুতেই। একশন ছাড়া মন ভরছে না। লেখাপড়া তো সারা বছর গোল্লায়। হোমটাস্ক পুরোটা করে না দিলেও স্যারেরা তেমন কিছু বলে না তখন। বাড়িতেও কেউ কিছু বলে না ছোটদের অনেক দিন থেকে। আমরা মিটিং মিছিল দেখে ঘুরে বেড়াই। বেজায় মজা। ফুরফুরে স্বাধীন একটা ভাব। সকাল দুপুর বিকেল রাত্রি; যা ইচ্ছে তাই করে চলছে বেশ। মশাল মিছিল, আলো; আগুন আর আলো। মশালে, ওদের চোখে, চারিদিকে উজ্জল লালচে আলোর আভা। মজা। ভরপুর মজা। পুরোনো ঢাকার রাস্তার দুপাশের সব মুদি দোকানদার যেন ইচ্ছে করেই তেল ভরা কেরোসিনের টিন সাজিয়ে রাখছিলো দোকানের ঠিক সামনেটায়। মিছিল করতে থাকা উজ্জল চোখের ক্ষেপে যাওয়া মানুষগুলো ওদের শার্ট, গেঞ্জি গামছা নিভু নিভু মশালগুলোতে জড়িয়ে ভেজাতো ওই কেরোসিনে। বিনে পয়সায় কেরোসিনের টিনে হঠাৎ মশাল ডুবিয়ে মিছিলে মিশে যাচ্ছে না কেউ। আমিও গুতোগুতি করে মিছিলের ভেতর ঢুকতে পারছি না। মিছিলের ভেতরটায় মিশে গিয়ে পাঁচ দশ মিনিটের গরম গরম উত্তেজনার মজা নিতে পারছি না। কদিন ধরেই মিছিল নেই, সন্ধ্যে বেলার উত্তেজনা নেই, হইচই নেই, ঝিম মারা সন্ধ্যা। ভাল্লাগে না, ধুত্তোরি ঘোড়ার ডিম বলে মন খারাপ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সেদিন, ২৫শে মার্চ। অন্য রাতের চেয়ে একটু আগে আগেই। দোতলার কোনের যে ঘরটা খালি থাকে সেইটায় সোনা ভাই আর আমি, আমরা দু’ভাই আজ শুয়ে পড়েছি। ঘরটার উত্তর আর পশ্চিমের দুটো জানালাই ঢা ঢা করে খোলা। গভীর ঘুম।

জেগে উঠলাম মিছিলের শব্দে। না না গুলির শব্দে। উঁহু না গুলির শব্দ যে কি তাই তো ঠিক করে চিনিনা। খুব দুরে কি সব বিচিত্র শব্দের খিচুড়ি আর ঘরের ভেতর মিছিল? নাহ। কি হচ্ছে এসব? আব্বা, বড়’বু, ছোট’বু, বড় ভাই, মেজ ভাই মানে ভালো ভাই, মা, দাদু, বুয়া, আরো কে কে যেন আমাদের ওই ছোট্ট ঘরটায় কি মিছিল করছে? এই রুমে ঘরের সবাই কেন? ওরা কেমন যেন জড়ানো গলায় অদ্ভুত সব কথা বলছে, এক সাথে প্রায়। ঘুম ভাঙতে ভাঙতে, ধাক্কাধাক্কি করে উত্তরের জানালার কাছে যেতে যেতে শুনলাম আব্বা বলছেন ‘মনে হচ্ছে ওরা সবাইকে মেরে ফেলবে’। দাদু বল্লেন ‘ওরা শেখ মুজিবকে মেরে ফেলছে বোধ হয়’। ভাই বললেন ‘ইউনিভার্সিটির দিকের আকাশ দেখো। আরে সোজা দেখো, মতিঝিলেও আগুন লাগলো নাকি’? এখন আর বুঝতে পারছি না কে কি বলছে। সব কথা, শব্দ, আলো-আঁধার একাকার হয়ে যাচ্ছে। ক’টা বাজে? রাত বারোটা? হবে হয়ত। খালি শুনতে পাচ্ছি, ওদিকটায় ওদিকটায়, এই যে এদিকে, ওরেবাবা আকাশে ও’সব কি? নারিন্দার উঁচু গড়িয়া মঠের জন্য ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছি না। এত গুলি কেন? আমদের কতজনকে মারবে ওরা। রেডিও চালাও। লাইট বন্ধ করো। কি হচ্ছে এসব? কি হচ্ছে? কি হবে? অস্পষ্ট এবং স্পষ্ট চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। মন্ত্রমুগ্ধের মত জমে গেলেও বারবার তাকাচ্ছি উত্তরের আকাশে আর উত্তর-পশ্চিম দিকটায়। ওদিকের আকাশে যেন একের পর এক জলন্ত নারকেলের খোল উড়ে উড়ে ঠিক বিশাল একটা আগুনে মালা তৈরী করছে। ছোট ছোট আগুনে আলো আর সেইমাত্র শেখা অবিরাম প্রায় অনেক রকম গুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। বুয়া চিৎকার করে করে দোয়া আওড়াচ্ছে। বড়’বু আর ছোট’বু ভয়ের চোটে নিজেদের জড়িয়ে এমন ভাবে সেঁটে আছে যে ওদের দু’জনকে মনে হচ্ছে একজন। উত্তেজনার অভাব বোধ করছি না বটে কিন্তু সবার ভয় দেখে বিভ্রান্ত আমি। কিছুই যেন সত্যি মনে হচ্ছে না আমার।

রাত দেড়টা প্রায়। কে যেন ডাকছে। ‘বাবু বাবু সামনের ছাদে এসো। চাচা আমি বটু। সামনের দিকটাতে আসুন। আমার কাছে অনেক খবর আছে’। আমাদের বাড়ির সামনের দিকের রাস্তায় প্রতিবেশী বটু ভাই কাকে নিয়ে যেন উত্তেজিত কন্ঠে ডেকেই চলেছে। বড় ভাই, আব্বা আর আমি ছাদের বারান্দায় যেতেই বটু ভাই হড়বড় করে বলতে লাগলেন, ‘খবর পেয়েছি চাচা। মিলিটারী সবাইকে খুন করা শুরু করেছে। ইউনিভার্সিটি, রাজারবাগ, পিলখানা আর এই দিকে শাখারী পট্টি আর আরো অনেক জায়গাতে অনেক অনেক গুলি করেছে। মেশিনগানের গুলি হয়েছে। মর্টার মারা হয়েছে। অনেক মানুষকে মেরে ফেলেছে। শেখ মুজিবকেও হয়ত এতক্ষণে মেরে ফেলেছে। আমাদেরকেও মারবে। আমাদেরকে কিছু একটা করতে হবে চাচা। আপনাদের বন্দুক দুটো রেডি রাখেন। আমরা পাড়ার ছেলেরা জমা হচ্ছি। আবার আসবো চাচা’। দেখতে পেলাম কজনকে ভুতে পাওয়া মানুষের মত দৌড়ে যেতে। বিচিত্র শব্দ করছে ওরা, ঠিক মানুষের ভাষা যেন নয়। কে যেন বললো ওরা শাখারী পট্টি না সূত্রাপুর থেকে এসেছে। ছুটছে। ওখানেও গুলি হয়েছে বোধহয়।

অনেক রাত। তিনটা, চারটা নাকি পাঁচটা? দাদুর আর আব্বার বন্দুকে লাল রঙের গুলি ভরা হয়েছে। ওগুলো বাঘ আর দাঁতাল শুয়োর মারবার গুলি। নীল টোটায় নাকি কিচ্ছু হবে না। ছররা ওগুলো। পাখি মারার। লাল টোটা দিয়ে হিংস্র জানোয়ার মারতে হয়। ওগুলো বুলেট। ভাই আর আব্বা বসে রয়েছেন বারান্দার ছাদে, কোলে লাল গুলি ভরা দু’নলা বন্দুক। বটু ভাই’রা আর এলোনা সে রাতে। মিলিটারিও আমাদের মারতে এলো না। আমরাও মিলিটারি মারতে পারলাম না। লোকজন এখনো রাস্তায় ছোটাছুটি করছে। ওদের হাতে কাপড়, খালি পা, ট্যাঁট্যাঁ কান্নার বাচ্চা। কারো কারো হাতে হাঁড়িপাতিল। ভোর হয়ে গেল। এখন খুব একটা গোলাগুলির শব্দ পাচ্ছি না আর। শুধু শব্দ পাচ্ছি মানুষের পায়ের, কান্নার, অদ্ভুত ভাষায় সবাই কষ্টের কথা বলছে। বুঝতে পারছি না কিছু। যা বুঝতে পারছি তা হোল; গুলি হয়েছে, অনেক, অনেক অনেক মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে। চারপাশের মানুষ সে কথাই বলে চলেছে। এবার বোধ হয় আমাদেরকে মারবে। সবাই কোথায় যেন ছুটছে। অজানা গন্তব্যে। আমরা বাসায় জমে আছি পাথরের মত। নড়াচড়া করতেও ভয় পাচ্ছি। কি করা দরকার কেউ বলে দিচ্ছে না। ভালোভাই গেটের সামনের রাস্তায় ছুটে চলা মানুষদের সাথে থেকে থেকেই কি যেন বলছে আর শুনছে। আমাদের সবাইকে ধমকে চলেছে। অকারণে। ভেতরে চলে যেতে বলছে।

আলো ফুটেছে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের একটা ভয়ঙ্কর এক গনহত্যা ঘটেছে সারারাত, অন্ধকারে। কারা যেন বলছে কারফিউ। রাস্তায় কাউকে দেখলেই গুলি করে মেরে ফেলবে মিলিটারি। সব জায়গা থেকে ছেঁড়া ছেঁড়া খবর আসছে, মৃত্যুর। হাজার হাজার হাজার ঘুমন্ত মানুষের মৃত্যুর খবর। টিক্কা খাঁন নামের এক বিদেশী মিলিটারী জানোয়ার কয়েক ঘন্টায় হাজার হাজার ঘুমন্ত মানুষকে মেরে ফেলেছে।

কেউ বেরিও না বাইরে। কেউ যেওনা। ওরা মেরে ফেলবে সবাইকে। কিন্তু শোনেনি বাংলা মায়ের সন্তানেরা। বড়ভাই মেজভাইও শোনেনি নিষেধ। বাংলা মায়ের অনেক অনেক সন্তানেরাই বেরিয়ে পড়েছে সে রাতের পর। ন’মাস মুক্তিযুদ্ধ করে বিদেশী জানোয়ার দূর করেছে। স্বাধীন করেছে দেশ। কিন্তু কিছু দেশী জানোয়ার, যারা ন’মাস মিলিটারি দিয়ে আমাদের খুন ধর্ষণ করিয়েছে, নিজেরাও করেছে, মা বোনদের সম্ভ্রম লুটেছে; যুদ্ধাপরাধী; ওরা রয়ে গেল অনেকটা বহাল তবিয়তেই। ওরা’ই আমাদের মা’র দুধ খাওয়া দুগ্ধাপরাধী

[40 বার পঠিত]