অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের নাম আমি শুনি ২০০৫ সালে, আমার ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ বইটি লেখার সময়।  বইটির পঞ্চম অধ্যায়টির উপর কাজ করছিলাম।  অধ্যায়টির শিরোনাম ছিল ‘রহস্যময় জড় পদার্থ, অদৃশ্য শক্তি এবং মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ’।   মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাজকর্মগুলো পড়ার সময়ই আমার নজরে আসে বাংলাদেশের একজন পদার্থবিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম এর উপর উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন, এবং তার একটি চমৎকার বই আছে ইংরেজিতে – ‘The Ultimate Fate of the Universe’। বইটি উনি লিখেছিলেন ১৯৮৩ সালে।  বেরিয়েছিল বিখ্যাত কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে। বইটির পেপারব্যাক বেরোয় ২০০৯ সালে। আমার কাছে অবশ্য বইটির ১৯৮৩ সালের হার্ডকভারের কপিটিই ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বইটি হারিয়ে যায়  যখন আমি সিঙ্গাপুর থেকে আমেরিকায় পাকাপাকিভাবে চলে আসার পায়তারা করছিলাম।  আমার জীবনের এই ক্ষুদ্র  পরিসরে অনেক বইই আমি হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু এই বইটির জন্য যে দুঃখ আমার পুঞ্জিভূত হয়ে ছিল, তা আজও আমার যায়নি।

ছবি – কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের সুপরিচিত ইংরেজী গ্রন্থ ‘দ্য আলটিমেট ফেট অব দ্য ইউনিভার্স’

দুঃখ পাবার যৌক্তিক কারণ তো আছে। আমি ভাবতাম মহাবিশ্বের কপালে ঠিক কি আছে এগুলো নিয়ে  চিন্তাভাবনা আর ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন আইনস্টাইন, স্টিফেন হকিং, পেনরোজ, ফাইনম্যান, অ্যালেন গুথ, মাইকেল টার্নার, পল ডেভিস কিংবা লরেন্স ক্রাউসের মতো দুনিয়া কাঁপানো বিজ্ঞানীরাই।  কিন্তু জামাল নজরুল ইসলামের মত বিজ্ঞানীরাও যে এ নিয়ে কাজ করেছেন, এবং কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের মত প্রকাশনা থেকে বই বের করছেন, সেটা জানা সে সময় শুধু আমাকে আনন্দ দেয়নি, রীতিমত অবাক করে দিয়েছিল। আরো অবাক হলাম যখন জানলাম বইটি নাকি ফরাসি, ইতালীয়, জার্মান, পর্তুগিজ, সার্ব, ক্রোয়েট সহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আমার অবাক হবার পাল্লা বাড়তেই থাকল যখন জানলাম, এই নিভৃতচারী বিজ্ঞানীর কেবল একটি নয় বেশ কয়েকটি ভাল ভাল বই বাজারে আছে। ‘রোটেটিং ফিল্ডস্ ইন রিলেটিভিটি’, ‘ইনট্রোডাক্শন টু ম্যাথমেটিকাল কসমোলজি’, এবং ‘ক্লাসিকাল জেনারেল রিলেটিভিটি’ নামের কঠিন কঠিন সব বই। বইগুলো আমেরিকার বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পড়ানো হয়।  বাংলাতেও উনার একটা বই আছে ‘কৃষ্ণ বিবর’ নামে। বাংলা একাডেমী থেকে একসময় প্রকাশিত হয়েছিল।

ছবি – বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের বাংলা গ্রন্থ ‘কৃষ্ণ বিবর’ ( ছবিটি সুহৃৎ বিজ্ঞান লেখক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর সৌজন্যে প্রাপ্ত)

আমি ততদিনে উনার কাজকর্ম সম্বন্ধে জানতে শুরু করেছি। জানলাম, উনি লণ্ডনস্থ কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়-এর অ্যাপ্লায়েড ম্যাথেমেটিক্স অ্যান্ড থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স বিভাগ থেকে পিএইচডি করেছিলেন ১৯৬৪ সালে।  সাধারণতঃ একাডেমিক লাইনে থাকলে পিএচডি করাই যথেষ্ট, এর বেশি কিছু করার দরকার পড়ে না। পড়ে না যদি না তিনি জামাল নজরুল ইসলামের মতো কেউ না হন। ১৯৮২ সালে অর্জন করেন ডিএসসি বা ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রী, যেই ডিগ্রী সারা পৃথিবীতেই খুব কম সংখ্যক বিজ্ঞানী অর্জন করতে পেরেছেন।  অবশ্য কৃতবিদ্য এই অধ্যাপকের একাডেমিক অঙ্গনে সাফল্যের ব্যাপারটা ধরা পড়েছিল অনেক আগেই। মর্নিং শোজ দ্য ডে। সেই যে, ১৯৫৭ সালে কলকাতা থেকে অনার্স শেষ করে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে গণিতশাস্ত্রে ট্রাইপস করতে গিয়েছিলেন।  তিন বছরের কোর্স, উনি সেটা দুই  বছরেই উনি শেষ করে ফেলেন। ভারতের বিখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী জয়ন্ত নারলিকার যার নাম ফ্রেডরিক হয়েলের সাথে একই সাথে উচ্চারিত হয়  ‘হয়েল নারলিকার তত্ত্ব’-এর কারণে,  তিনি সেখানে নজরুল ইসলামের সহপাঠী ছিলেন। পরবর্তীতে কর্মক্ষেত্রে তার বন্ধু তালিকায় যুক্ত হয়েছিলেন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ব্রায়ান জোসেফসন, স্টিফেন হকিং আব্দুস সালাম এবং রিচার্ড ফাইনমেন এর মত বিজ্ঞানীরা।  ফাইনমেন তাকে তার নিজের বাড়িতে দাওয়াত করেও খাইয়েছিলেন, বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে উপহার দিয়েছিলেন একটা মেক্সিকান নকশিকাঁথাও।

অবশ্য কার সাথে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল আর না ছিল সেটা তাকে পরিচিত করেছে ভাবলে ভুল হবে। তিনি পরিচিত ছিলেন নিজের যোগ্যতাবলেই। পিএইচডি শেষ করে তিনি  দুবছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড-এ কাজ করেন। মাঝে কাজ করেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার বিশ্বখ্যাত ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবেও। ১৯৭৮ সালে লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটিতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরে রিডার পদে উন্নীত হন।

সেভাবেই থাকতে পারতেন। কিন্তু তা না করে ১৯৮৪ সালে তিনি একটা বড় সিদ্ধান্ত নিলেন।  জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি।  বিলেত আমেরিকার লক্ষ টাকা বেতনের লোভনীয় চাকরি, গবেষণার অফুরন্ত সুযোগ, আর নিশ্চিত নিপাট জীবন সব ছেড়ে ছুড়ে  বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিধ্যালয়ে তিন হাজার টাকার প্রফেসর পদে এসে যোগ দিলেন।  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথম দিকে এমনকি এই তিনহাজার টাকা দিতেও গড়িমসি করেছিল।  তারা বেতন সাব্যস্ত করেছিল আটশ টাকা। কিন্তু তারপরেও পাশ্চাত্য চাকচিক্য আর ডলার-পাউণ্ডের মোহকে হেলায় সরিয়ে দিয়ে অধ্যাপক নজরুল বিলেতের বাড়ি ঘর জায়গা জমি বেঁচে চলে আসলেন বাংলাদেশে।  দেশটাকে বড়ই ভালবাসতেন তিনি।  তিনি নিজেই একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকার চিন্তা আমার কখনোই ছিল না। দেশে ফিরে আসার চিন্তাটা প্রথম থেকেই আমার মধ্যে ছিল, এটার ভিন্নতা ঘটে নি কখনোই। আরেকটা দিক হল, বিদেশে আপনি যতই ভালো থাকুন না কেন, নিজের দেশে নিজের মানুষের মধ্যে আপনার যে গ্রহণযোগ্যতা এবং অবস্থান সেটা বিদেশে কখনোই সম্ভব না’। তার দেশপ্রেমের নিদর্শন ১৯৭১ সালেও তিনি দিয়েছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, নির্বিচারে হত্যা খুন ধর্ষণে মত্ত হয়েছিল, তখন পাক-বাহিনীর এই আক্রমণ বন্ধের উদ্যোগ নিতে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠিও লিখেছিলেন।

দেশে ফিরে বিজ্ঞানের উন্নয়নের জন্য অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম কাজ করে গেছেন নিরলসভাবে। শুধু বিজ্ঞানেই তাঁর অবদান ছিল না, তিনি কাজ করেছেন দারিদ্র দূরীকরণে, শিল্প ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করেছেন। তিনি মনে করতেন, আমাদের দেশটা যেহেতু কৃষিনির্ভর, তাই, আমাদের শিল্পনীতি হওয়া চাই ‘কৃষিভিত্তিক, শ্রমঘন, কুটিরশিল্প-প্রধান’ এবং ‘প্রধানত দেশজ কাঁচামাল-নির্ভর’। তিনি বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ-এর ক্ষতিকারক প্রেসক্রিপশন বাদ দিয়ে নিজেদের প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটা সুষ্ঠু শিল্পনীতির প্রতি সবসময় গুরুত্ব দিতেন।  পাশ্চাত্য সাহায্যের ব্যাপারে তার একটি বিখ্যাত উক্তি আছে –

‘তোমরা শুধু আমাদের পথ থেকে সরে দাঁড়াও, আমাদের ভালোমন্দ আমাদেরকেই ভাবতে দাও। আমি মনে করি, এটাই সর্বপ্রথম প্রয়োজনীয়।’

অনেকে আছেন যারা বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার কথা শুনলেই নাক সিটকান। ভাবেন, উচ্চতর গবেষণা হতে পারে কেবল ইংরেজিতেই। জামাল নজরুল ইসলাম সেধরণের মানসিকতা সমর্থন করতেন না। আমি যে উপর বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘কৃষ্ণ বিবর’ বইটার উল্লেখ করেছি, তার বাইরেও তিনি বাংলায় আরো দুটো বই লিখেছেন। একটি হল ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ’ এবং ‘শিল্প সাহিত্য ও সমাজ’ । দুটি বই-ই রাহাত-সিরাজ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত। বইগুলো বাংলা ভাষা এবং বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চার উপর অনুরাগ তুলে ধরে। পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত একটি কলামে তিনি বলেছেন,

“অনেকের ধারণা, ভাল ইংরেজি না জানলে বিজ্ঞানচর্চা করা যাবে না। এটি ভুল ধারণা। মাতৃভাষায়ও ভাল বিজ্ঞান চর্চা ও উচ্চতর গবেষণা হতে পারে… বাংলায় বিজ্ঞানের অনেক ভাল বই রয়েছে। আমি নিজেও বিজ্ঞানের অনেক প্রবন্ধ লিখেছি বাংলায়। এদেশে বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেন এমন অনেকেই বাংলায় বই লিখেছেন এবং লিখছেন। তাদের বই পড়তে তেমন কারও অসুবিধা হয়েছে বলে মনে হয় না। সুতরাং বাংলায় বিজ্ঞানচর্চাটা গুরুত্বপূর্ণ।”

যারা অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের কাজ এবং চিন্তাভাবনা আরো বিস্তৃতভাবে জানতে চান তারা আলম খোরশেদ ও এহসানুল কবিরের নেওয়া বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম-এর সাক্ষাৎকারটি দেখে নিতে পারেন। কিংবা বিবিসিতে শুনতে পারেন অধ্যাপক জাফর ইকবালের স্মৃতিচারণটিও (শুনুনmp3)। সদ্যপ্রয়াত বিজ্ঞানীকে নিয়ে আরেকটি চমৎকার প্রবন্ধ লিখেছেন তাঁর বন্ধু আরেক খ্যাতিমান বিজ্ঞানী অধ্যাপক এ এম হারুন-অর-রশীদ। সেটিও পড়ে নেয়া যেতে পারে।

আইনস্টাইন যেমন বেহালা বাজাতেন, সত্যেন বোস যেমন এস্রাজ, ঠিক তেমনি জামাল নজরুল ইসলাম পছন্দ করতেন পিয়ানো বাজানো (এ ব্যাপারটা আমি হাল্কাভাবে শুনেছিলাম, তবে বিস্তৃতভাবে জানলাম তার ছাত্র প্রিয়ম মজুমদারের ফেসবুকের এই নোট থেকে)। তিনি ছিলেন গজল এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতের বড় ভক্ত, পিয়ানোতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর তুলতে তিনি পছন্দ করতেন। বাড়িতে বন্ধুর ছোট মেয়েটিকে প্রতি শুক্রবার ‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ’ পিয়ানোতে বাজিয়ে  শোনাতেন।

আর ভালবাসতেন স্ত্রী সুরাইয়া ইসলামকে! তার স্ত্রীও ছিলেন ডক্টরেট। একটা কনফারেন্সে তাদের দেখা, প্রেম এবং পরিণয়। শোনা যায়, ৫৩ বছরের দাম্পত্য জীবনে জামাল নজরুল তাঁর স্ত্রীকে ছাড়া কোথাও যেতেন না। কোন অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে চলার সময় সবসময় স্ত্রীর হাত ধরে রাখতেন।

অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ১৬ই মার্চ। তাঁকে নিয়ে আমি বাংলানিউজে একটা লেখা লিখেছি আজ (দেখুন এখানে)। এই নিভৃতচারী কর্মমুখর ক্ষণজন্মা বিজ্ঞানীর প্রতি রইলো সশ্রদ্ধ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মহাবিশ্বের অন্তিম ভবিষ্যৎ বা পরিনতি নিয়ে আমার এই সামান্য লেখাটি অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের স্মৃতির উদ্দশ্যে নিবেদিত।  লেখাটি কয়েকটি পর্বে বিভক্ত থাকবে।  জামাল নজরুলের কাজের  কথা  আনার চেষ্টা হবে, তবে তার আগে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন কি করছিলেন তা জানা দরকার।

:line:

মহাবিশ্বের অধ্যয়ন মোটা দাগে অনন্য এক অভিজ্ঞতা। অন্তত: এক দিক থেকে এটা সামগ্রিকতাকে বোঝার একটা প্রয়াস। আমরা, চিন্তাশীল সত্ত্বার অধিকারীরা নিউট্রন তারকা আর শ্বেত বামনদের নিয়ে গঠিত এই মহাবিশ্বের অংশ, এবং আমাদের গন্তব্য অনুদ্ধরণীয়ভাবে এই মহাবিশ্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম (The Ultimate Fate of the Universe)

ছবি – বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন

১৯২০ সালের দিকে আলবার্ট আইনস্টাইন এক গভীর সমস্যা নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন।  সমস্যাটি মহাবিশ্বের প্রকৃতি এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে। তার মত বিজ্ঞানীর অবশ্য এসব সমস্যা নিয়ে খুব বেশি হাবুডুবু খাওয়ার কথা নয়।  আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব এবং আপেক্ষিকতার সাধারণ বা ব্যাপক তত্ত্ব দুইটিই বিজ্ঞানের জগতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অভিকর্ষ বলের প্রভাবে স্থান-কালের বক্রতা যে আলোর গতিকেও বাঁকিয়ে দিতে পারে, তা এডিংটনের পরীক্ষায় হাতে কলমে প্রমাণিত হয়ে গেছে ১৯১৯ সালের জুনের দুই তারিখে। যে বুধ গ্রহের বিচলন নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ নিয়ম দিয়ে কোনভাবেই মেলানো যাচ্ছিল না, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকত তত্ত্ব  সংক্রান্ত গণনার ছাঁচে ফেলে খাপে খাপ মিলিয়ে দেয়া গেছে। আইনস্টাইন তখন নিজেই রীতিমত এক তারকা।

আইনস্টাইন চাইলে এ সময় একটু সাহসী হতে পারতেন। তার তত্ত্ব থেকেই কিন্তু বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল যে আমাদের মহাবিশ্ব ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে, মানে আকাশের যাবতীয় গ্রহ নক্ষত্র তারকা, গ্যালাক্সিরা সব একে অন্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু আইনস্টাইন নিজেই সেটা বুঝতে পারলেন না। বুঝতে পারলেন না বলাটা বোধ হয় ঠিক হল না। বলা উচিৎ মানতে চাইলেন না। মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে গ্যালাক্সিগুলোর একে অন্যের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি তার গাণিতিক সমীকরণে একটা কাল্পনিক ধ্রুবক যোগ করে দিলেন। তিনি ভেবেছিলেন এতে করে মহাবিশ্ব চুপসে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে ভারসাম্য বা স্থিতাবস্থা প্রাপ্ত হবে। এটাই সেই বিখ্যাত ‘মহাজাগিতিক ধ্রুবক’, গ্রীক অক্ষর ল্যামডা দিয়ে নামাঙ্কিত করে স্থিতিশীল মহাবিশ্বের মডেলের প্রতি আস্থা স্থাপন করেছিলেন আইনস্টাইন। এই ধরণের মহাবিশ্ব সংকুচিতও হয় না প্রসারিতও হয় না। সে সময় অধিকাংশ পদার্থবিজ্ঞানীরাই মহাবিশ্বকে এভাবে দেখতেন।  কিন্তু সবাই দেখলেই আইনস্টাইনকে দেখতে হবে কেন? বহুক্ষেত্রেই তো চিন্তায় চেতনায় তিনি বিপ্লবী।  নিউটনের চীরচেনা পরম মহাবিশ্বের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে বানিয়েছিলেন আপেক্ষিকতার এক নতুন  জগৎ।  অথচ মহাবিশ্বের প্রসারণের বেলায় তিনি ঝাঁকের কই হয়েই রইলেন কেন যেন।

এর প্রায় বারো বছর পর আমেরিকান জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী এডউইন হাবল যখন টেলিস্কোপের সাহায্যে চাক্ষুষ প্রমাণ হাজির করলেন, দেখিয়ে দিলেন যে, মহাবিশ্ব স্থিতিশীল মোটেই নয়, বরং সত্যই প্রসারিত হচ্ছে, তখন আইনস্টাইন মুখ কাচুমাচু করে স্বীকার করে নিলেন যে, সমীকরণের মধ্যে মহাকর্ষীয় ধ্রুবক বসানোটা ‘জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল’ ছিল[1]

যে আইনস্টাইন সবসময়ই স্থবিরতাকে চ্যালেঞ্জ করেছন সারা জীবন ধরে, সেখানে তিনি কেন স্থবির মহাবিশ্বকে সত্য বলে ভেবে নিয়েছিনে তা আমাদের রীতিমত বিস্মিত করে। বিস্মিত করেছিল প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটাস অধ্যাপক জেমস পিবলসকেও। তিনি বলেন, ‘স্ট্যাটিক মহাবিশ্ব তো কাঠামোগতভাবেই স্বসঙ্গতিপূর্ণ নয়। সূর্য তো সারা জীবন ধরে জ্বলে থাকতে পারে না। এ ব্যাপারটা আইনস্টাইন বুঝতে পারেননি, এটা আমাকে অবাক করে দেয়, এখনো’।

অবশ্য কে তখন জানতো আইনস্টাইনের ভুল তো আর যে সে ভুল নয়!  তার সমীকরণে যে মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের আমদানীকে ‘জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন তিনি নিজে, সেই ভুলই আবার সিন্দাবাদের ভুতের মতো কাঁধে সওয়ার হয়ে ফিরে এসেছে নতুন উদ্যমে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে।

 

একটি ধ্রুবকের জন্মকথা

আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব  প্রতিষ্ঠিত হবার আগেই আইনস্টাইন বুঝতে পেরেছিলেন,  মহাকর্ষ এবং সমত্বরণে গতিশীল বস্তু সমতুল্য।  একটি এলিভেটরের g শক্তির অভিকর্ষ ক্ষেত্রের মধ্যে একজন পদার্থবিদের চুপচাপ বসে থাকার সাথে g সমতত্বরণে চলমান একটি রকেটে মহাশূন্যের ভিতর দিয়ে চলার মধ্যে আসলে কোন পার্থক্য নেই।

আইনস্টাইন আরো একটি ব্যাপার ক্রমান্বয়ে বুঝতে পারলেন। নিউটন আমাদের স্থান-কালের জন্য যে পরম কাঠামোর একটা দৃষ্টিনন্দন ছবি বানিয়ে গিয়েছিলেন, সেটা হয়তো পুরোপুরি ঠিক নয়। অবশ্য আইনস্টাইনের এ চিন্তাটা একেবারে মৌলিক ছিল কিনা তা হলফ করে বলা যায় না। অনেকে বলেন এর পেছনে অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ এবং দার্শনিক মাখ (Ernst Mach) এর একটা প্রভাব আছে।  মাখ আইনস্টাইনের আগেই স্থানকালের ক্ষেত্রে  নিউটনীয় পরম কাঠামোর ধারণা পরিত্যাগ করেছিলেন, এবং এর সামালোচনাও করেছিলেন।  ‘বাহ্যিক বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু  চিরকাল স্থির থাকবে আর গতিশীল বস্তু সুষম দ্রুতিতে সরল পথে চলতে থাকবে’ – নিউটনের  এই সূত্রটার সাথে আমরা সবাই আমাদের স্কুল জীবনে পরিচিত হয়েছি। প্রাত্যহিক জীবনেও এর ব্যবহার আমরা দেখি অহরহ। টেবিলের উপর কোন কিছু ফেলে রাখলে সেটা সেভাবেই থাকে।  আপনার টেবিলে রাখা রসালো খাবারগুলো হঠাৎ করে আমার ঘরের টেবিলে এসে উপস্থিত হয় না। এটা হলে কি মজাটাই না হত! ঠিক একই ভাবে একটা বস্তু যখন সমবেগে গতিশীল থাকে তখন সেটা সেভাবেই থাকতে চায়। সেজন্য একটা চলমান বাসের ড্রাইভার হঠাৎ ব্রেক চাপলে আমরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি। কিন্তু এই যে গতি জড়তা বা স্থিতি জড়তার ব্যাপারগুলো ঘটছে সেটা কার সাপেক্ষে? এটা ব্যাখ্যার জন্য নিউটনকে তৈরি করতে হয়েছিল পরম স্থানের ধারণার, যে অনড় কাঠামো সংজ্ঞায়িত করবে সমস্ত স্থানীয় জাড্য কাঠামোকে (local inertial frames) ।  মাখ অবশ্য প্রস্তাব করেছিলেন, পদার্থের এই বন্টন সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে জাড্য কাঠামোর সাপেক্ষে, এবং সেটা কোন পরম স্থান কালের ধারণা আরোপ না করেই। পরবর্তীতে আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের ভিত্তিও কিন্তু গড়ে উঠেছিল অনেকটা এই ধারণার উপরেই।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বই প্রথম বারের মতো মহাবিশ্বের সার্বিক রূপরেখার একটি আশাব্যঞ্জক ছবি আমাদের জন্য আঁকতে সমর্থ হয়েছিল।  তার তত্ত্ব থেকেই আমরা প্রথমবারের মতো জানতে পারলাম, স্থানের মধ্য দিয়ে পদার্থ কিভাবে চলবে; শুধু তাই নয়, কীভাবে স্থান কালের উদ্ভব হতে পারে তারও অভিনব একটা ছবি পেয়ে গেলাম আমরা। কিন্তু পেলে কী হবে আইনস্টাইনের মাথায় ছিল তখন মাখ সাহেবের ভুত। মাখ সাহেব নিউটনের পরম কাঠামো ত্যাগ করতে সমর্থ হলেও তিনি সুস্থিত মহাবিশ্বের ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন, ‘মাখের প্রিন্সিপাল’ বলে একটা নিয়মও তিনি বানিয়েছিলেন নিজের ধারণার সমর্থনে। আইনস্টাইনও একই ভুলের ফাঁদে পা দিলেন।  তিনি এমন একটা মহাবিশ্ব মনে মনে কল্পনা করে ফেললেন, যে মহাবিশ্ব সময়ের সাথে সাথে আকারে বাড়েও না, কমেও না।  একেবারে অনড় অবিচল এবং সুস্থিত মহাবিশ্ব।  আর তা করতে গিয়ে তার চীর চেনা সমীকরণের বাঁ দিকে আমদানী করলেন এক হতচ্ছাড়া ধ্রুবকের, যাকে আমরা ল্যামডা বলে চিনি।

আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে পাওয়া আইনস্টাইনের মূল সমীকরণটি ছিল খুব সোজা, অনকেটা এরকমের –

G_{\mu\nu} = 8\pi GT_{\mu\nu}

যেখানে G_{\mu\nu} স্থানের বক্রতার নির্দেশক, T_{\mu\nu} স্ট্রেস এনার্জি টেনসর এবং   G হচ্ছে নিউটনের মহাকর্ষ ধ্রুবক।

ল্যামডা  বসানোর পর সমীকরণটার চেহারা বদলে গিয়ে দাঁড়ালো এরকমের –

G_{\mu\nu} + \Lambda g_{\mu\nu}= 8\pi GT_{\mu\nu}

 

সমীকরণের বাঁ দিকে এভাবে এই ল্যামডা বসিয়ে দিয়ে আইনস্টাইন ভাবলেন – খুব যাহোক, মহাবিশ্বটাকে অযথা টানাটানির হাত থেকে রক্ষা করা গেছে।

কিন্তু আইনস্টাইনের উৎসাহের বেলুন  ক্রমেই  চুপসে যেতে শুরু করল। বেলুনে প্রথম  সুঁইটা ফোটালেন উইলিয়াম ডি সিটার নামে এক ডাচ জ্যোতির্বিজ্ঞানী।   ১৯১৭ সালে ডি সিটার দেখালেন যে তিনি আইনস্টাইনের মহাকর্ষ ধ্রুবক গোনায় ধরেই তার সমীকরণের এমন একটা সমাধান পাওয়া যায়, যেটা তার উপসংহারের সাথে বেমানান। তার সমাধান থেকে বেরিয়ে এলো –  মহাবিশ্বকে স্থিতিশীল হয়ে বসে থাকতে হবে এমন দিব্যি কেউ দিয়ে দেয় নি, এটি প্রসারিত হতে পারে, এমনকি পদার্থের অনুপস্থিতিতেও।  তবে ডি সিটারের গনিত মেনে নিলেও এই ধরণের মহাবিশ্বের বাস্তবতাকে আইনস্টাইন কখনোই পাত্তা দেননি।  ফলে এই মডেলটি কেবল একাডেমিক আঁতেলদের চিন্তায় খোরাক যোগান ছাড়া আর বাড়তি কিছু করে উঠতে পারেনি।

কিন্তু ১৯২২ সালে আইনস্টাইনের বেলুনে যে খোঁচাটা লাগল তা বেশ বড় সড়। রুশ বিজ্ঞানী আলেকজাণ্ডার ফ্রিডম্যান প্রসারণশীল এবং সংকোচনশীল মহাবিশ্বের মডেল তৈরি করলেন কোন রকম মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের আমদানি ছাড়াই।  ফ্রিডম্যান দেখালেন, মহাবিশ্বের গড় ঘনত্বের উপর ভিত্তি করে মহাবিশ্ব আজীবন প্রসারিত হতে পারে (উন্মুক্ত মহাবিশ্বের মডেল) কিংবা একটা সময় পর সংকুচিত হতে পারে (বদ্ধ মহাবিশ্বের মডেল), কিংবা হতে পারে দু-এর মাঝামাঝি কিছু (সামতলিক মহাবিশ্ব); এবং এর জন্য মহাজাগতিক ধ্রুবক টুবক গোনায় ধরার দরকার নেই।

ছবি – আইনস্টাইনের সমীকরণের সমাধান ফ্রিডম্যান হাজির করলেন মহাজাগতিক ধ্রুবক ছাড়াই।  মহাবিশ্বের গড় ঘনত্বের উপর ভিত্তি করে এর প্রকৃতি হতে পারে বদ্ধ (Closed), উন্মুক্ত (Open) কিংবা সামতলিক (Flat) – এই তিনটির যে কোন একটি।

১৯৩০ সালে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন একটা গবেষণাপত্রে দেখালেন আইনস্টাইন যে মহাবিশ্বকে স্থিতিশীল ধরে নিচ্ছেন সেটা আসলে স্থিতিশীল নয়। আসলে অভিকর্ষ এবং মহাজাগতিক পদটি এত নিঁখুতভাবে সাম্যবস্থায় আছে, যে এ থেকে সামান্য বিচ্যুতি ঘটলেই মহাবিশ্ব হুর হুর করে প্রসারিত হতে থাকবে, নয়তো নিজের মধ্যেই হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

১৯৩১ সালে সাধের বেলুনটা ফাটিয়েই দিলেন জ্যোতির্বিদ এডুইন হাবল। তার পর্যবেক্ষণ থেকে সবাই নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে মহাবিশ্ব আসলে প্রসারিত হচ্ছে।  আইনস্টাইনও তৎক্ষণাৎ তার মহাজাগতিক ধ্রুবককে ‘তাত্ত্বিকভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ’ অভিধায় অভিহিত করে বাতিল করে দিলেন।  অভিহিত করলেন জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে। কিন্তু কে জানতো আইনস্টাইনের সেই ‘মহাভুলের’ও ভুল ধরিয়ে দিয়ে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে ‘কসমোলজিকাল কনস্ট্যান্ট’ আবার নতুন উদ্যমে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে ফিরে আসবে?

[চলবে…]

:line:

তথ্যসূত্র:

[1] রুশ-আমেরিকান বিজ্ঞানী জর্জ গ্যামোর আত্মজীবনীতে এই স্বীকারোক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্যামো বলেছেন, ‘when I was discussing cosmological problems with Einstein, he remarked that the introduction of the cosmological term was the biggest blunder of his life.’ [My World Line (1970)]

[1169 বার পঠিত]