৬ই মার্চ যখন তানভীর মোহাম্মদ ত্বকির নিখোজ হওয়ার খবরটা শুনতে পাই আনুমানিক রাত ১০টায়। বিজ্ঞান বক্তা আসিফের কাছে জানতে পারলাম রাব্বি ভাইয়ের বড় ছেলে ত্বকির ফোন বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার পর থেকে বন্ধ আছে, অর্থাৎ পাওয়া যাচ্ছে না । শুনেই ভীষণ আতঙ্কিত আর অসহায় বোধ করলাম আর সাথে সাথে আমার যত কাছের মানুষজনকে জানাতে লাগলাম এই সংবাদ। তাদের কেউ কেউ আমার উৎকণ্ঠা দেখে বলেছিল কিশোর ছেলে; প্রেমঘটিত ব্যাপার হতে পারে অথবা কাল এ-লেভেল পরীক্ষার ফলাফল দিবে সেজন্য ফলাফল খারাপ হবে ভেবে বাড়ি খেকে চলে যেতে পারে! আমার কিন্তু মনে হয়েছিল এর নেপথ্যে নারায়ণগঞ্জে গড ফাদার নামে যারা পরিচিত তাদের হাত আছে। নারায়ণগঞ্জের সাঙস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব রফিউর রাব্বীর দীর্ঘসময় ধরে সামাজিক কর্মকাণ্ডই গড ফাদারদের কোপানলে রেখেছে তাকে অনেকদিন ধরে। অতএব বিষয়টাকে এত সহজভাবে দেখে দেরি করার অবকাশ নেই। কারণ সে আমাদের প্রিয় রাব্বি ভাইয়ের সন্তান। যিনি জীবনের প্রায় সবটুকু সময় নারায়ণগঞ্জবাসীর সাংস্কৃতিক বোধ জাগিয়ে রাখা আর সন্ত্রাসমুক্ত রাখার স্বার্থে কাজ করেছেন। বিশেষত বাস আন্দোলনে ভাড়া কমানো, এবং মেয়র নির্বাচনে আইভির কোনো জটিলতা ছাড়া জিতে আসার পিছনে তার অবদান অনস্বীকার্য।

আমি পেশাগত কারণে ঢাকায় অবস্থান করলেও নারায়ণগঞ্জে বেড়ে উঠেছি। এখনও মাঝে মাঝে নানা সাংস্কৃতিক আর বিজ্ঞান বিষয়ক অনুষ্ঠানে সক্রিয় অংশগ্র্রহণের চেষ্টা করি। কৈশোর থেকেই তার নাম শুনেছি; তারপর সময়ের সাথে সাথে তার সক্রিয় ভূমিকা, দেশের প্রতি মমত্ববোধ আর আত্মপ্রত্যয়ী পথচলা সামনে থেকে দেখেছি। তার দৃঢ়তা আর ব্যক্তিত্বের সামনে কোন অশুভ শক্তিই নারায়ণগঞ্জ শহরে মাথা চারা দিয়ে উঠতে পারছিল না। এগুলোই তার বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর শক্রুর জন্ম দিয়েছিল সম্ভবত।

পরদিন সকালে কর্মস্থলে চলে যাই। আমার সকল সহকর্মী আর বন্ধুদের জানাই এই উৎকণ্ঠার সংবাদ।বারবার সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম বেশি দেরী হলে ত্বকিকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। দেখতে দেখতে একদিন দুইরাত পার হল। সকলের উৎকণ্ঠা তখন তুমুলে। প্রশাসনও নাকি হন্যে হয়ে খুজছে! কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। শুক্রবার সকালে প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পরিবার নিয়ে চিড়িয়াখানা চলে গেলাম। আমি অনেকবার চিড়িয়াখানা গিয়েছি কিন্তু এবারের মতো অনাসৃষ্টি আর বেহাল অবস্থা কখোনোই দেখিনি। এদিকে ক্যামেরাটাও আনতে ভুলে গিয়েছি। আনতে পারলে অনেক প্রমাণসহ লেখা তৈরি করা সম্ভব হত। প্রতিটা প্রাণীকে দেখে মনে হচ্ছিল অসাড় আর প্রাণহীন। রয়েলবেঙ্গল টেইগার, ওরাং-ওটাং, সিংহ, সারস, সজারু, কুমির সব যেনো চরম নৈরাজ্য আর অবহেলার শিকার। কোনোভাবেই এই সকল আর মেনে নেয়া যায় না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জ থেকে আমার এক পরিচিত মানুষের কাছ থেকে ভয়াবহ সেই সংবাদটি জানলাম। জানাল আমাদের রাব্বি ভাইয়ের ছেলে ত্বকির মৃতদেহ পাওয়া গেছে শীতলক্ষ্যার তীরে, কুমুদীনীর আশেপাশে। কেপে উঠলাম আর হু-হু করে কেঁদে উঠলাম। এই কান্না রক্তপিশাচদের প্রতি ঘৃণা আর প্রতিবাদের; সেইসাথে নিজেদের আত্মগ্লানি আর প্রশাসনের ব্যর্থতার। কীভাবে এই শোকের ভার বয়ে বেড়াবো আমরা; প্রশাসনের এই ব্যর্থতার দায়ভার কার? শৈশব থেকে বয়োজৈষ্ঠদের কাছে শুনে এসেছি একজন বাবার জন্য সবচেয়ে বড় শাস্তি তার কাধে সন্তানের লাশ। আজীবন ভালো কাজের পুরুস্কার হিসেবে নৃশংশভাবে হত্যা করা সন্তানের মৃতদেহ বয়ে বেড়াতে হবে রাব্বী ভাইকে! কী মর্মান্তিক।

একটু পরেই একজন নারী শিক্ষাকর্মী ফোনে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বলে ফেললেন। এটা সেই বিশেষ পরিবারের কাজ, জামাতবাহিনীর নয়। এ থেকেই বোঝা যায় সাধারণ জনতা আর অন্ধ নয়, আর ধোকাবাজী নয়, আর কীসের ভয়। আমরা ভয়ে-আতঙ্কে আর পিছিয়ে থাকতে চাই না। চাই সুবিচার। আমার নিকটজন অনেকেই তাৎক্ষণিক ছুটে গেলেন সেখানে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করে যাচ্ছি দেশের জন্য। এটাকে দুর্বলতা ভাবলে ভুল বোঝা হবে। আমরাও সরব হতে পারি । শাহবাগ প্রজন্মচত্ত্বর বা জাগরণ মঞ্চ এক মুহুর্তের জন্য হলেও আমাদের আঙ্গুল তুলে সেই শিক্ষাই দিয়ে গিয়েছে। ৪২ বছরের বয়ে যাওয়া গ্লানি মুছে ফেলার সময় কেবল শুরু হয়েছে। শেষ হতে তো অনেক পরীক্ষা দিতে হবে আমাদের। সেদিন ছিল ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এদেশের নারীরাও এখন পিছিয়ে নেই; তারাও শতভাগ শক্তি নিয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার।

আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেছে এরপর: এদেশে এরকম ঘটনা গা সওয়া হয়ে গিয়েছে; এরকম মৃত্যুর জন্য আমরা কাউকে শাস্তি পেতে দেখছি না। তারা সকলেই সাগর-রুনী, বিশ্বজিৎ হত্যাসহ সকল নৃশংস হত্যার বিচার চায়। তবে নারায়ণগঞ্জের বিষয়টা একটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। প্রথমে রাব্বি ভাইয়ের ভাগ্নে: তরুণ ব্যবসায়ী আশিক ইসলাম, তারপর সাংস্কৃতিক কর্মী দিদারুল আলম চঞ্চল, তারপর তরুণ ব্যবসায়ী গোবিন্দ সাহা ভুলু অবশেষে আমাদের মেধাবী কিশোর ত্বকী! কোনো রহস্যই আজ অবধি উন্মোচন হয় নি।উত্তর একই প্রশাসন অন্ধকারে।

আমি ত্বকিকে দেখেছি: ৩১ আগস্ট ২০১২ বিজ্ঞান সংগঠন ডিসকাশন প্রজেক্ট ও নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত ব্লু-মুন উৎসবে শীতলক্ষ্যার ৫নং ঘাটে; দেখেছি ৩১ আগস্ট ২০১২। ডিসকাশন প্রজেক্টের বিজ্ঞান বক্তৃতায় সুধীজন পাঠাগারে; সবশেষে দেখেছি ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ টাউ ফিজিক্স বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে সুধীজন পাঠাগারে। সেই স্বপ্রভ মেধাবী কিশোর একজন সংস্কৃতিকর্মীর সন্তান হয়েও বিজ্ঞানকে বেছে নিয়েছিল জীবন চলার পাথেয় হিসেবে। আমরা বিজ্ঞানকর্মীরা যখন লড়াই করছি বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে আমাদের উপলব্ধিকে আর গভীর জায়গায় নেয়ে যাওয়ার জন্য। তখন পিতা-পুত্রের এই সমন্বয় ও স্ফুরণকে আমরা এভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিলাম! এ দেশ হারালো এক প্রতিভাবান সন্তান। এই অসীম দু:খজনক দায়ভারকে আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। তাহলে সবকিছু অর্থহীন হয়ে যায়।

অনেকে জামাত শিবিরের কথা বলেছেন।কিন্তু এভাবে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখবো এক ধরনের সম্পর্ক আছে এই সমস্ত গড ফাদারদের সাথে। সে যেই কারণে হয়ে থাকুক না কেন, যুদ্ধাপরাধিদের বিচার না করাটা হয়েছে দেশের জন্য ল আ্যন্ড অর্ডারের ভায়োলেশন বা আইন এবং জবাবদীহিতা থেকে সরে যাওয়া। আর তা থেকে তৈরি নৈরাজ্য এবং সুবিধাবাদীদের জায়গা দখলের প্রক্রিয়া। এই ল অ্যান্ড অর্ডারের ভায়োলেশন থেকেই সুবিধাবাদীদের কালো টাকার পাহাড় গড়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। কালো টাকা জন্ম দেয় গড ফাদারের, আইন এবং প্রশাসনকে শেষ করে দেয়, বর্বরসব কর্মকাণ্ডের দিকে নিয়ে যায়। নারায়ণগঞ্জে ত্বকি হত্যা তার বর্বতম উদাহরণগুলো একটি।

শুক্রবার ১৫ মার্চ ২০১৩ নারায়ণগঞ্জ শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে ত্বকী হত্যার পিছনে শামীম ওসমানের হাত আছে বলে বক্তারা বলেন।

প্রিয় আইভি আপা, আমরা দেখেছি রাব্বি ভাই কীভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় আপনার পাশে দাড়িয়েছিলে্ন।তখন থেকেই মনে শঙ্কা আর ভয় ছিল রাব্বি ভাইকে নিয়ে! কিন্তু কখনও ভাবিনি এই সকল কাজের খেসারত হিসেবে দিতে হবে নিজের সন্তানকে বিসর্জনের মাধ্যমে। ইতিমধ্যে তার পাশে আপনি আপনার সমগ্র শক্তি নিয়ে দাড়িয়েছেন দেখে আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা আপনার পাশে আছি। আপনি বার্তা পৌছানোর চেষ্টা চালিয়ে যান প্রশাসনকে যে- সকল নৈরাজ্য, অপরাধ আর সন্ত্রাসের একটা শেষ পরিণতি আছে! আমরা সেই পরিণতির দিকেই যাচ্ছি। নারায়ণগঞ্জের সকল সংস্কৃতিকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী আর আমজনতা যেভাবে এগিয়ে এসেছেন সাধুবাদ জানাই তাদের। মশাল মিছিলে নারীরা সাহসের সাথে বলেছে “গডফাদারের কালো হাত/ভেঙ্গে দাও/গুড়িয়ে দাও।” গড আর ফাদার আমাদের দৃষ্টিতে শান্তির দুটো শব্দ। আসুন আমরা বলি: “পিশাচদের আস্তানা ভেঙ্গে দাও; গুড়িয়ে দাও/হত্যাকরীকে জেনেও নিরব; প্রশাসন জবাব দাও।”

[74 বার পঠিত]