(১)

জর্জ ওয়াশিংটনের জীবনী নিয়ে ঘাঁটতে গেলে প্রথমেই যে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়- ” আসলে লোকটা কি ছিল? ” সত্যই কি স্বাধীনতাপ্রেমী বিপ্লবী-বৃটিশদের অত্যাচারে জর্জরিত-প্রতিরোধকামী আমেরিকান জনগণের নেতা? না, অবচেতন মনে নিজের অস্তিত্বের প্রতিষ্ঠার প্রতি বেশি যত্মবান একজন ভার্জিনিয়া খামার মালিক? আমেরিকায় বাক এবং চিন্তার স্বাধীনতাকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারনে, জর্জ ওয়াশিংটনের অধিকাংশ জীবনীকারই চোখ খুলে দেখিয়ে দেন-লোকটা স্বাধীনতার আগুনের থেকেও নিজের নামের প্রতিষ্ঠার জন্যেই স্বাধীনতার যুদ্ধে যোগ দেন। জর্জ ওয়াশিংটনের জীবনী খুব কাছ থেকে দেখলে, এই ব্যাপারে কোন সন্দেহই থাকার কথা না। স্বাধীনতার যুদ্ধের আগে ১৫ বছর তিনি ভার্জিনিয়ার আইনসভাতে ছিলেন-এবং কোন দিনের জন্যেই বৃটিশদের বিরুদ্ধে কলোনীনিস্টদের জন্য একটি কথাও বলেন নি যখন টাক্স বিদ্রোহে গোটা আমেরিকাতে আগুন জ্বলেছে। যদিও এর পরেও, কোন সন্দেহ নেই, তার নেতৃত্বেই আমেরিকা স্বাধীন হয়েছে।

আমেরিকার বাইরে একটা বিশাল সমস্যা হচ্ছে, কোন একজনের জীবনী খুব গভীরে না ঘেঁটে, আমরা তার মিডিয়া প্রচার এবং বহিরাগত রূপেই ডুব মারি। বড় মাপের রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বকে আমরা মানুষ হিসাবে না দেখে, জননেতা হিসাবে না দেখে, জনদেবতা হিসাবে দেখার প্রবণতা আমাদের মধ্যে অত্যাধিক বেশি।

হুগো শাভেজকে নিয়ে খুব সরল সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল। তার গোটা জীবন জুরে অদ্ভুত বৈপরীত্ব-এবং আমার কাছে সেটা মানবিক। আসল হুগো শাভেজকে তার সেই মানসিক দ্বন্দের মধ্যেই খুঁজতে হবে। তাকে আধুনিক সমাজতান্ত্রিক দেবতা বানালে, সমাজতন্ত্র বা হুগো শাভেজ-সবার প্রতি অবিচার হবে।

(২)

শাভেজের সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা, দরিদ্র জীবন থেকে উঠে আসা। শাভেজের সমাজতান্ত্রিক নির্মানের শুরু, ছোট্ট শহর বারিনাসে। সাত সন্তানের দ্বিতীয় সন্তান শাভেজ। এত গরীব যে, তার পিতা দিদিমার কাছে পাঠালেন হুগো আর তার বড় ভাই আদানকে। দিদিমা রোজাও খুব গরীব- ছোট বেলায় অনেক দিনই না খেয়ে থাকতে হয়েছে শাভেজকে। রোমান ক্যাথোলিক চার্চের দয়াতে কোন কোন দিন খাবার জুটত-শিক্ষাও পেয়েছেন চার্চের স্কুলের কাছ থেকেই।

শাভেজ চরিত্রের এক অদ্ভুত গুন হচ্ছে, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা। ছোট বেলায় ক্ষুদার যে যন্ত্রনা তিনি পেয়েছেন- প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর, তার প্রথম এবং সব থেকে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে ভেনেজুয়েলাকে ক্ষুধা মুক্ত করা। না- তিনি লেনিন, মার্ক্স নিয়ে কিছুই জানতেন না। কিন্ত ক্ষুদাকে চিনেছিলেন। ফলে তার অন্যতম কীর্তি মার্কাল নেটোয়ার্ক বলে মুদিখানার চেন দোকান খোলা। এই সরকারি চেনে ছিল ১৬,৬০০ আউটলেট এবং ৮০,০০০ কর্মী। এখান থেকে সস্তায় ১২ টি অত্যাবশ্যক খাদ্য খুব অল্পদামে বিলি করে ভেনেজুয়েলা সরকার। শুধু তাই না, খোলা বাজারে খাদ্যের দামও নিয়ন্ত্রন করত তার সরকার। ভেনেজুয়েলার একটি শিশুও যাতে অপুষ্টিতে না ভোগে- এই ছিল তার অঙ্গীকার। প্রতিটি শিশু এবং মায়েদের জন্য খাদ্যের সংস্থান, হুগো শাভেজের সব থেকে বড় সাফল্য।

কিন্ত এর আসল ফল কি? সাফল্য এখানে মিশ্র। খাদ্যের উৎপাদন ভুমি সংস্কারে ভেনেজুয়েলাতে বেড়েছিল অনেকটাই। কিন্ত মাংস সহ বেশ কিছু প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের উৎপাদন কমে যায়। উনার এখানে ভূমিকা ছিল আমাদের মমতা ব্যানার্জির মতন। খাবারের দাম বেঁধে দেওয়ার জন্য বন্ধ হয়ে যায় অনেক দোকান। মমতা ব্যানার্জি যেমন বাসের ভাড়া বেঁধে দিয়ে অনেক বাসকে অচল করে ছেড়েছেন। ভেনেজুয়েলাতেও খাবারের দোকানগুলির একই হাল হয়েছিল। পরবর্তীকালে ২০০২ সালে এরাই শাভেজ বিরোধি আন্দোলনে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। ২০০২ সালে তার বিরুদ্ধে ক্যারাকাসে যে বিদ্রোহ এবং ক্যু হয়, তার মূলে ছিল ছোট বড় সব ধরনের ব্যাবসায়ী। তবে এই ক্যু থেকে হুগো শাভেজ শিক্ষা নিয়েছিলেন। এরপর থেকে এমন কিছু করেন নি যাতে ছোট ছোট বেনিয়ারা ক্রদ্ধ হয়।

আবার রোমান ক্যাথোলিক চার্চের কৃতজ্ঞতাও তিনি ভোলেন নি। আজন্ম রোমান ক্যাথোলিক ছিলেন। তার কাছে যীশু ছিল সব থেকে বড় সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। চার্চ প্রতিক্রিয়াশীল-লেনিনের এসব তত্ত্বের থেকে তার অবস্থান ছিল অনেক দূরে-কারন তার অভিজ্ঞতার শিক্ষা ছিল সেই নিদারুন দারিদ্র্যের বাল্যে, চার্চই তাকে খাইয়েছে, পড়িয়েছে। কলেকের ভর্তি হওয়ার টাকা ছিল না- মিলিটারি একাডেমিতে ঢুকে ছিলেন সেই আঠারো বছর বয়সে। প্রথাগত শিক্ষা তার ছিল না- ফলে তার জীবনের সব শিক্ষাই ছিল অভিজ্ঞতার আগুন থেকে উঠে আসা।

(৩)
এবার আসা যাক মূল প্রশ্নে। কি ধরনের সমাজতান্ত্রিক ছিলেন হগো শাভেজ? লেনিন স্টালিনকে পছন্দ করতেন? মার্ক্স-লেনিনের ঘোলাজলে মাছ ধরার চেষ্টা করেছেন?

উত্তর খুব স্পষ্ট। এসব তিনি বুঝতেন না। তাই ওই ঘোলা জলে মাছ ও ধরেন নি। এবং সেই জন্যেই খুব সম্ভবত তিনি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে সমাজতান্ত্রিক সাফল্য পেয়েছেন-কারন তত্ত্ব থেকে না, অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে তার বামপন্থা। উনি অনেকবারই বলেছেন-আমি মার্ক্সিস্ট লেনিনিস্ট না-আবার তার বিরোধি ও না। যারা মমতা ব্যানার্জির বামপন্থার সাথে পরিচিত আছেন-তারা এই স্টাইল বিলক্ষন বুঝবেন।

ভেনেজুয়েলার তেলের সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে গরীবদের সাহায্য করা সম্ভব-সেখানেই আটকে ছিল তার অর্জুনচোখ। ফলে খাদ্য থেকে বাসস্থান -সর্বত্র তিনি সরকারি সহায়তা দিয়েছেন কোয়াপরেটিভ তৈরী করে, ছোট গণতান্ত্রিক কমিউন তৈরী করে নিজেদের জন্য নিজেদের ব্যাবসা করতে। তার এই মডেলের সমস্যা হল- আস্তে আস্তে সব কিছুই সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছিল। যদ্দিন তেলের দাম ছিল সেই ২০০৪-২০০৭ সাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ১২% হারে বেড়েছে। কারন তেল বেচার টাকা, ভেনেজুয়েলার মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছিল। তেলের দাম পড়তেই ২০০৮ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি প্রতি বছর ২- ৩% হারে কমেছে।

প্রথমবার যখন উনি প্রেসিডেন্ট হলেন-তখন ধনতন্ত্রের বা বাজারের খুব বিরোধি ছিলেন না। ভেনেজুয়েলাতে বিদেশী বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট উদার অর্থনীতি এবং আই এম ফের বিরোধিতা ১৯৯৮ সালে করেন নি। ২০০২ সালে ক্যু এর পরে উনি আমেরিকারবিরুদ্ধে চলে যান সরাসরি। তবে আইন করে ব্যবসা বন্ধ করাটা উনার পদ্ধতি ছিল না। উনি চাইছিলেন, কোয়াপরেটিভ বানিয়ে সরকারি সাহায্য দিয়ে ব্যাবসার একট অলটারনেটিভ মডেল দাঁড় করাতে। ১৯৯৮ সালের পর থেকে ভেনেজুয়েলাতে ১০০,০০০ কোয়াপরেটিভ এবং ৩০,০০০ কাউন্সিল তৈরী হয়, নানান ছোট ছোট ব্যাবসায়িক উদ্যোগের জন্য। ৩৫০০ টি কোয়াপরেটিভ ব্যাঙ্কও তিনি তৈরী করেন। বাড়ি তৈরী করা থেকে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল খামার সব কিছুই এই উদ্যোগের মধ্যে আছে।

তার এই কাউন্সিল কমিউনিজমের পরীক্ষা কতটা সফল ( কাউন্সিল কমিনিউজম নিয়ে আমার আগের লেখাটি এখানে দেখতে পারেন ) ? উত্তর দেওয়ার সময় আসে নি। তবে, এর দুটি দিক খুবই সত্য। প্রথমত, উৎপাদন ব্যাবস্থার ওপর গরীবদের এই অধিকার, মানুষের সন্মানকে অনেকটাই ফিরিয়ে দিয়েছে ভেনেজুয়েলাতে। কিন্ত এখনো পর্যন্ত এমন কোন তথ্য নেই, যাতে প্রমান করা যায় এই কোয়াপরেটিভ মুভমেন্টের ফলে ভেনেজুয়েলাতে উৎপাদন খুব বেড়েছে। কৃষি উৎপাদন অনেক বেড়েছে। কিন্ত শিল্পের অধোগতিই হয়েছে।

দুটি কথা খুব শোনা যায় শাভেজ সম্মন্ধে। বলিভেরিয়ান আদর্শবাদ এবং একবিংশ শতকের সমাজতন্ত্র। প্রথমটি নেহেরুর মডেলে স্বয়ং সম্পূর্ন এক গণতান্ত্রিক জাতির সাধনা যা বিদেশী শক্তি থেকে সম্পূর্ন মুক্ত থাকবে। এর ল্যাটিন মডেল হচ্ছে ্উনবিংশ শতকে ভেনেজুয়েলার প্রবাদপ্রতিম সেনানায়ক সিমন বলিভার-যিনি দক্ষিন আমেরিকাকে স্প্যানিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত করেছিলেন। দ্বিতীয়টি অনেকটা নোয়াম চমস্কি ধাঁচের সমাজতন্ত্র-যা লেনিনিজম, এবং স্তালিন জাতীয় “জোর” করে, অস্ত্রের মাধ্যমে বিপ্লব ঘটানোর বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ঘোষনা করে। এই ব্লকের প্রথম বক্তব্যই হল জোর করে ঘটানো কমিনিউস্ট বিপ্লব একগাদা ব্যার্থ রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে, যার সাথে সমাজতন্ত্রের কোন সম্পর্ক নেই। এবং জোর করে চাপিয়ে সমাজতন্ত্র হয় না। সম্পূর্ন গণতান্ত্রিক উপায়ে মানুষের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনা জাগ্রত করেই আস্তে আস্তে এগোতে হবে।

লেনিন মার্ক্সিস্ট বিপ্লবী তত্ত্বের বিরুদ্ধে তিনি কিছু বলেন নি ঠিক। কিন্ত তার জীবনচর্চা বলছে, তিনি এদের পাত্তা দেন নি এবং মিলিটারি জেনারেল থাকার সময় এদের উৎখাত করে ছেরেছেন।

এই ধরনের সশস্ত্র বিপ্লবের বিরুদ্ধেও কাজ করে তার অভিজ্ঞতা। আসলে তিনি ছিলেন ভেনেজুয়েলা মিলিটারিতে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত মিলিটারিতে তাকে একটা কাজই করতে হয়েছে। সেটা হচ্ছে ভেনেজুয়েলার সব ধরনের মাওবাদি সংগঠনকে খতম করা। সেটা তিনি সাফল্যের সাথেই করেছেন অস্ত্র হাতে এবং স্থানীয় লোকেদের সাথে মাওবাদি ( ওদের লোকাল নাম রেড ফ্ল্যাগ পার্টি) দের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে। বারিনাস এবং এন্টেজাগুতে এই মার্ক্সিস্ট গেলিরাদের জানে প্রানে খতম করার কৃতিত্ব স্বরুপ তার প্রমোশন হয় ক্যাপ্টেন হিসাবে। এমন নয় এই সময় তিনি ছিলেন এক উদাসীন লয়ালিস্ট জেনারেল। বলিভেরিয়ান বিপ্লবের জন্য তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে ১৯৭৮ সাল থেকে। তখন থেকেই তিনি যোগাযোগ রেখে চলেছেন গণতান্ত্রিক বাম আন্দোলনের সাথে। তার নিজের বয়ানে তিনি ২২-২৩ বছর বয়স থেকেই বামপন্থী। তাহলে সেই দেশে মার্ক্সিস্ট সশস্ত্র বিপ্লবী দমনে তিনিই মিলিটারিতে সব থেকে সফল জেনারেল হলেন কেন?

এর উত্তর ও খুব সহজ। ভেনেজুয়েলার মার্ক্সিস্ট বিপ্লবীদের উদ্দেশ্যের প্রতি তিনি সহানুভূতিশীল ছিলেন-কিন্ত তাদের পথ যে ভেনেজুয়েলাকে আরো ডোবাচ্ছে এবং গরীবদের জন্য তা আরো অন্ধকার গলি, এটা বুঝতে তার অসুবিধা হয় নি। মিলিটারিতে তার কাউন্টার ইনসার্জেন্সি ট্যাকটিস ছিল সদ্য নির্মিত হিন্দি সিনেমা চক্রব্যুহর হিরো আদিলের মতন। স্থানীয় জনগনের জন্য ক্লিনিক খুলে, খাদ্য দিয়ে, আশ্বাস দিয়ে মার্ক্সিস্ট বিপ্লবীদের নেটোয়ার্ক ধ্বংস করে দিতেন। এটা তিনি করেছেন, তার ১৬ বছরের মিলিটারি ক্যারিয়ার জুরে যখন তিনি মিলিটারির মধ্যেই বলিভেরিয়ান বিপ্লবী উইং তৈরি করছেন দেশে বামপন্থী মিলিটারি বিপ্লবের জন্য। সুতরাং কোন সন্দেহ থাকা উচিৎ না, লেনিনিস্ট মার্ক্সিস্ট বিপ্লবীদের প্রতি তার আসল মনোভাব নিয়ে। তিনি বলিভেরিয়ান বিপ্লবী-যার সাথে নেহেরুর মত এবং পথের মিল সর্বাধিক।

(৩)

এর পরে প্রশ্ন উঠবে তাহলে কি করে তিনি ফিদেল কাস্ত্রোকে পিতাসম নেতা হিসাবে মান্য করতেন? এখানেও সেই এক হুগো শাভেজ। যিনি তত্ত্ব না, বাস্তবকেই ধ্যানজ্ঞান করতেন। আমেরিকা তার কাছে ছিল সাম্রাজ্যবাদি শক্তির প্রতিভূ। আমেরিকার বিরুদ্ধে থাকা সব রাষ্ট্র নায়কই তার অতিপ্রিয় ছিল। আহমেদাঞ্জির মতন চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্ব ( যারা ইরাণে মেয়েদের সব অধিকার -সন্তান থেকে শিক্ষা-কোন কিছুতেই আর অধিকার নেই ইরাণের মেয়েদের) সাথেও তার ছিল ঘনিষ্ঠতা এবং তিনি আহেমিদিনাজকে বিরাট ব্যাক্তিত্ব বলে মনে করতেন। এই ধরনের স্ববিরোধিতার কারনেই আমেরিকান বামপন্থীরাও তাকে খুব বেশি পাত্তা দেয় নি। আমেরিকার সব থেকে বড় বামপন্থী টিভি হোস্ট র‍্যাচেল ম্যাডো শোতে, তার মৃত্যুদিনে একটি আলোচনা হয়। তাতে র‍্যাচেল পরিস্কার ভাবেই জানান-তার উদ্দেশ্য যতই সৎ থাকুক না, আমেরিকার বিরোধিতা করতে গিয়ে, ফিদেল বা আহমেদিনাজের মতন স্বৈরাচারী শাসকদের ভগবান বানানো কোন উৎকৃষ্ট বামপন্থার নমুনা না। ফলে আমেরিকানদের কাছে তার ইমেজ আরেকজন আমেরিকান বিরোধি কার্টুন চরিত্রের।

অথচ দারিদ্য এবং অসাম্যের যে উপাদানগুলি তাকে সমাজতান্ত্রিক হিরো বানিয়েছে, তা আমেরিকান সমাজেও সমান ভাবে বিদ্যমান। কর্পরেট অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে, ওবামাও কমিউনিটি ভিত্তিক শিক্ষা, বিমা এবং স্বাস্থ্যের দিকে হাঁটছেন-যা শাভেজের কমিউনিটি ভিত্তিক উৎপাদন মডেল থেকে খুব আলাদা না। আবার টেকনোলজি ব্যাবসার জন্য ওবামা, সরকারি ভিসি ফান্ডিং বাড়াতে চান-একই অবস্থান নিয়েছেন হুগোশাভেজ। ওবামা ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকাকে শত্রু বানানোর কোন দরকার ছিল না । ওবামার সাথে শাভেজের অমিল শুধু মাত্রায়, তালে না। সেটা না করে, সস্তা রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার জন্য হুগো ইরানের মোল্লাতন্ত্রকে স্বাগত জানিয়েছেন, আর আমেরিকাকে বানাতে গেছেন দানব। সস্তার জনপ্রিয়তা সব সময় নেমে যাওয়ার সিঁড়ি। এক্ষেত্রেও তিনিও তার ব্যাতিক্রম না।

(৪)

তাহলে হুগো শাভেজের সমাজতান্ত্রিক পথ থেকে গোটা পৃথিবীর কি অর্জন?

চার্চকে তিনি মাথায় তুলে রেখেছেন। নারীবাদ নিয়ে তার কোন মাথা ব্যাথা ছিল না। অন্যান্য ল্যাটিন আমেরিকান সাধারন মানুষদের মতন চুটিয়ে পরকীয়া উপভোগ করেছেন সাংবাদিকা মারিসাবেলের সাথে।

একটা ব্যাপারেই তার মাথাব্যথা ছিল। কি করে রাষ্ট্রের সম্পদ গরীবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এই ব্যাপারে তিনি চূড়ান্ত সফল। কারন তার ১৩ বছর শাসনকালে দারিদ্র কমেছে, খাদ্য পৌছেছে সবার কাছে, ৯৯% শিক্ষিত হয়েছে ভেনেজুয়েলা।

তার মডেল সাসটেনেবল না। এটা ২০০৮ সালে তেলের দাম পড়তেই পরিস্কার- ভেনেজুয়েলার সরকারি ব্যাবস্থাতে ভাল টান এসেছে। তেল না থাকলে, তার মডেল অচল। যে টাকা সরকার ব্যয় করেছে জনগণের ওপরে, তা কোন সফল ব্যাবসা তৈরী করতে পারে নি-যা নিজের টাকাতে চলে। পশ্চিম বঙ্গে বেনফিস থেকে তঞ্জুজ সমবায়গুলির যা অবস্থা, ভেনেজুয়েলাতেও তাই। হুগো শাভেজ চাইলেও, অধিকাংশ কোয়াপরেটিভ গুলিই ব্যাবসা করতে অক্ষম হয়েছে-তারাও নির্ভরশীল হয়েছে তেলের অনুদানের ওপর।

ফলত শিল্পের ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলাতে বিশেষ কিছুই হয় নি – আগেও ৮৫% তেল নির্ভর অর্থনীতি ছিল; এখনো তাই আছে। আই টি, বায়োটেক ইত্যাদি নব্য শিল্প ভেনেজুয়েলাতে কিছুই হয় নি। কারন সরকারি অত্যাচারে বা অতি পর্যবেক্ষনে কেও ভেনেজুয়েলাতে লগ্নি করতে সাহস পায় না। তেলের দাম পড়লেই সেদেশে ৩০% ইনফ্লেশন দেখা যায়-সরকারি দোকানেও খাবার থাকে না।

হুগো শাভেজের সাথে আমি শুধু একজনের তুলনা টানতে পারি-তিনি হচ্ছেন মমতা ব্যানার্জি। গণতন্ত্র, তত্ত্ব কোন কিছুর দায় নেই তাদের। শুধু একবল্গা পপুলিজম। রাজকোষ উজার করে যিশু খৃষ্টের মতন গরীবলোকেদের মেসিয়া হওয়া এদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। এতে দেশের শিল্পের ভবিষ্যত যেদিকে যায় যাক। এসব নিয়ে এরা ভাবেন না। এরা ভাবেন শুধু গরীব শ্রেণির মধ্যে নিজেদের ভাবমূর্তি এবং জনপ্রিয়তা নিয়ে।

[২০০২-শাভেজ বিরোধি ক্যারাকাস। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নেমেছিল আন্দোলনে। ]

এটা ভাল না খারাপ, তা নিয়ে আমি মন্তব্য করব না। শুধু এটাই বলতে পারি-শিল্পের এবং বাজারের উন্নয়ন হলে দারিদ্র অনেকটাই কমে আসে। এবং সেই দারিদ্র দুরীকরন স্থায়ী। এমন ভাবে তেলের দামের ওপর, সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল না। ফাটকাবাজি বন্ধ করতে হুগো শাভেজ ৪০০ টি জিনিসের দাম বেঁধে দিয়েছিলেন। সেটা নিশ্চয় ভাল পদক্ষেপ। কিন্ত ইতিহাস এও বলে, এর ফলে ওইসব জিনিসের উৎপাদন এবং শিল্প দুটোই মার খেয়েছে। অত্যাবশ্যক পন্যের ফাটকাবাজি নিশ্চয় কাম্য না- কিন্ত দামের ওপর সরকারি অতিনিয়ন্ত্রন ব্যাবসা ও বাজার ধ্বংস করে। সেটা ভেনেজুয়েলাতে হয়েছে।

তার ব্যার্থতা যায় থাক উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। মহৎ উদ্দেশ্যে প্রচলিত অবস্থা থেকে গরিবদের একটু স্বস্তি দিয়েছেন। মান সন্মান ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে তেলের টাকায়। মমতা ব্যানার্জির সেটাও নেই। ফলে তিনি ইচ্ছা থাকলেও গরীবদের স্বস্তি দিতে ব্যার্থ। তেলের টাকা থাকলে সব অর্থে মমতাও আরেক হুগো শাভেজ হয়ে উঠতেন বলে আমার বিশ্বাস।

( আমার এই লেখাতে মমতাপন্থী এবং হুগোপন্থী উভয়েই অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্ত লেখক হিসাবে সৎ থাকতে গেলে, আমাকে বলতেই হয় কর্মপদ্ধতি, রাজনৈতিক আদর্শ এবং ব্যাক্তিগত জীবনে এদের মধ্যে অদ্ভুত মিল। শুধু মমতার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধি সুচিবায়ু নেই। এটুকু বাদ দিলে এদের কর্মপদ্ধতি, স্বৈরাচারিতা এবং পপুলিজম একই মাত্রার। )

[137 বার পঠিত]