বাস্তবতার যাদু (পর্ব-১): বাস্তবতা কি? যাদু কি?
বাস্তবতার যাদু (পর্ব-২): বিজ্ঞান এবং অতিপ্রাকৃতঃ ব্যাখ্যা এবং এর শত্রু
বাস্তবতার যাদু (পর্ব-৩): বিবর্তনের ধীর যাদু

২। প্রথম মানুষ কে ছিল ?

এই বইয়ের বেশীরভাগ অধ্যায়ের শিরোনামে একটা প্রশ্ন থাকবে। আমার উদ্দেশ্য হল সেই প্রশ্নটার উত্তর দেওয়া, অথবা অন্তত সম্ভাব্য সেরা উত্তরটা দেওয়া। একটা বৈজ্ঞানিক উত্তর। কিন্তু সাধারনত কোন পৌরানিক উত্তর দিয়ে শুরু করব কারণ সেগুলো রঙচঙে আর মজার। আর বাস্তবে মানুষ সেগুলো বিশ্বাস করত। কিছু মানুষ এখনো করে।

সারা বিশ্ব জুড়ে সব জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি পুরাণ রয়েছে। তারা কোত্থেকে এসেছে তা বর্ণনা করার জন্যে। অনেক গোত্রের উৎপত্তি বিষয়ক পুরাণ শুধু সেই বিশেষ গোত্র নিয়েই কথা বলে-যেন অন্য গোত্ররা গোনায় ধরার যোগ্য না! একইভাবে, অনেক গোত্রের নীতি আছে যে তারা মানুষ মারতে পারবে না – কিন্তু ‘মানুষ’ বলতে দেখা যায় তারা বোঝাচ্ছে শুধু তাদের নিজেদের গোত্রের অন্যান্যদেরকে। অন্য গোত্রের মানুষ মারা কোন সমস্যা না!

একটা উৎপত্তি পুরাণের কাহিনী বলি, এটা তাসমানিয়ার আদিবাসী গোষ্ঠী থেকে নেওয়া। মৈনী নামে এক দেবতা, তারাদের দেশে এক ভয়ংকর যুদ্ধে ড্রমারডিনার নামে প্রতিদ্বন্দ্বী এক দেবতার কাছে হেরে গেলেন। মৈনী তারার দেশ থেকে তাসমানিয়াতে এসে পড়লেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার জন্য। মারা যাবার আগে তিনি আশির্বাদ দিয়ে যেতে চাইলেন তাঁর চিরশয্যায় শায়িত হবার জায়গাটাকে। তাই মানুষ তৈরী করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। কিন্তু তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে, কারণ জানতেন তিনি মারা যাচ্ছেন, তাদেরকে হাঁটু দিতে ভুলে গেলেন তিনি। আর (নিঃসন্দেহে তাঁর সঙ্কটাপন্ন দশায় বিভ্রান্ত হয়ে) অন্যমনস্কভাবে তাদের ক্যাঙারুর মত ইয়া বড় লেজ দিয়ে দিলেন। মানে তারা ত বসতে পারে না। তারপর মারা গেলেন তিনি। এদিকে মানুষদের ক্যাঙারুর মত লেজ আর হাঁটুহীন অবস্থা অসহ্য লাগতে লাগলো। তারা স্বর্গের দিকে তাকিয়ে সাহায্যের জন্য চেঁচামেচি শুরু করলো ।

শক্তিমান ড্রমারডিনার তখনো তার বিজয় শোভাযাত্রা নিয়ে আকাশে তর্জনগর্জন করে বেড়াচ্ছিলেন। চেঁচামেচি শুনে ব্যাপারটা কি জানার জন্য তাসমানিয়াতে নেমে আসলেন তিনি। মানুষদের অবস্থা দেখে করুনা হলো তাঁর। তিনি তাদের ভাঙা যায় এমন হাঁটু দিলেন। আর তাদের অসুবিধাজনক ক্যাঙারুর লেজ কেটে দিলেন যাতে অবশেষে যেন তারা বসতে পারে। আর তারপর থেকে মনের সুখে দিন গুজরান করতে লাগলো মানুষেরা।

অনেক সময়ই আমরা একই পুরাণের বিভিন্ন সংস্করন পেয়ে থাকি। সেটা আশ্চর্যের কিছু না। কারন মানুষ প্রায়ই খুটিনাটি জিনিস পরিবর্তন করে তাবুর আগুনের পাশে বসে গল্প বলতে বলতে। তাই কাহিনীর স্থানীয় সংস্করনগুলো মূল কাহিনী থেকে একটু দূরে ভেসে যায়। এই তাসমানিয়ার পুরাণের অন্য আরেকটা সংস্করন এরকম -মৈনী আকাশের বুকে প্রথম মানব তৈরী করেন, যার নাম পার্লেভার। পার্লেভার বসতে পারত না কারন তার ছিল ক্যাঙারুর মত লেজ আর বাঁকানো যায় না এমন হাঁটু। আগের মতই, প্রতিদ্বন্দী তারার দেবতা ড্রমারডীনার উদ্ধারে এগিয়ে আসলেন। তিনি পার্লেভারকে ঠিকঠাক হাঁটু দিলেন আর লেজ কেটে দিলেন। চর্বি দিয়ে কাটা জায়গা ভালো করে দিলেন। পার্লেভার তারপর আকাশ-পথ (ছায়াপথ) ধরে হেঁটে তাসমানিয়ায় নেমে আসলো।

মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদি গোত্রদের শুধু একজন দেবতা বা ঈশ্বর ছিলো, তাকে তারা তাদের প্রতিদ্বন্দী গোত্রের দেবতাদের থেকে বড় বলে মনে করত। তাঁর ছিল অনেক নাম, যেগুলোর কোনটাই তাদের উচ্চারন করার অনুমতি ছিল না। তিনি ধুলো থেকে তৈরী করেন প্রথম মানুষ আর তার নাম দেন আদম ( যার মানেই হল ‘মানুষ’ )। তিনি ইচ্ছাকরেই আদমকে তার নিজের মত করে তৈরী করেন। প্রকৃতপক্ষে, ইতিহাসের বেশীরভাগ দেবতাকেই পুরুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে ( বা মাঝে সাঝে নারী হিসেবে)। অনেক সময়ই বিশাল আকারের আর সবসময়ই অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাসহ।

ঈশ্বর তাকে ইডেন নামে এক সুন্দর বাগানে রাখলেন। গাছগাছালীতে পূর্ণ এই বাগানের সব গাছের ফল খেতে আদমকে উৎসাহ দেওয়া হলো, শুধু একটা ছাড়া। এই নিষিদ্ধ গাছটি হলো ‘ভালো আর মন্দের জ্ঞানদানকারী গাছ’। তারপর ঈশ্বর চলে গেলেন। আদমের মনে কোন সন্দেহ ছিলনা যে ওটার ফল তার কখনো খাওয়া উচিত না।

তারপর ঈশ্বরের মনে হল আদমের নিশ্চই নিজে নিজে থাকতে একা লাগে। তাই এ ব্যাপার তিনি কিছু করতে চাইলেন। এই পর্যন্ত এসে – ড্রমারডীনার আর মৈনীর মত – কাহিনীর দুটো সংস্করণ রয়েছে। দুটোই বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব নামের প্রথম গ্রন্থে পাওয়া যায়। কাহিনীর রঙচঙে সংস্করনে ঈশ্বর সব জীবজন্তুকে আদমের সাহায্যকারী বানিয়ে দিলেন। তারপরো তার মনে হলো কিছু একটা নেইঃ একজন নারী! তাই তিনি হাসপাতালে অস্ত্রপচারের মত ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে তার বুক কেটে ফাঁক করলেন, একটা পাঁজরের হাড্ডি খুলে নিয়ে সেলাই করে দিলেন। সেই পাজরের হাড্ডি থেকে নারীর জন্ম দিলেন তিনি, কাটা ডাল থেকে তুমি যেমন করে ফুল গজাও সেভাবে। তিনি তার নাম দিলেন ইভ, আর স্ত্রী হিসেবে তাকে আদমের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

দূর্ভাগ্যজনকভাবে, ওই বাগানে ছিল এক দুষ্ট সাপ। যে ইভের কাছে গিয়ে আদমকে ভালো আর খারাপের জ্ঞানদায়ী বৃক্ষের নিষিদ্ধ ফল দেবার জন্য প্ররোচিত করলো। আদম আর ইভ ফল খেলো আর সাথে সাথে তারা বুঝতে পারলো তারা নগ্ন। বিব্রত হয়ে তারা ডুমুর গাছের পাতা দিয়ে গা ঢাকলো। ঈশ্বর যখন এটা লক্ষ্য করলেন, ফল খেয়ে জ্ঞান লাভ করার জন্য ওদের উপর রেগে অগ্নিশর্মা হলেন তিনি – তাদের নিস্পাপতা হারানোর জন্য মনে হয়। বাগান থেকে তাদেরকে তিনি বের করে দিলেন। আর তাদেরকে এবং তাদের বংশধরদেরকে দূঃখ আর কষ্টের জীবন দিয়ে শাস্তি দিলেন। আজও, আদম আর ইভের ভয়ংকর অবাধ্যতার গল্পটা অনেক মানুষ ‘আদি পাপ’ নামে গুরুত্ব সহকারে নেয়। কিছু মানুষ এও বিশ্বাস করে যে এই ‘আদি পাপ’ আমরা সবাই উত্তরাধিকারসূত্রে আদমের কাছে থেকে পেয়েছি (যদিও তাদের অনেকেই স্বীকার করে যে আদমের কখনো অস্তিত্ব ছিলো না!), এবং তার অপরাধবোধের ভাগীদার তারা।

গ্রীক আর রোমানদের মত অনেক দেবতা ছিল স্ক্যান্ডিনেভিয়ার নরওয়ে দেশের মানুষদের। ভাইকিং নাবিক হিসাবে বিখ্যাত যারা। তাদের প্রধান দেবতার নাম ওডিন, মাঝে মাঝে বলা হয় উওটান বা উওডেন। যার থেকে আমরা পেয়েছি ‘ওয়েডনেস ডে’। (থার্সডে এসেছে আরেক নরওয়ের দেবতা থেকে, থর, বজ্রের দেবতা, তার ক্ষমতাশালী হাতুড়ী দিয়ে যেটা বানাতো সে।)
একদিন ওডিন তার ভাইদের সাথে সমুদ্রের ধার দিয়ে হাঁটছিলেন। তাঁর ভাইরাও দেবতা। হাটতে হাটতে তাঁরা দুটো গাছের গুড়ির সামনে আসলেন।

এদের একটাকে তাঁরা প্রথম পুরুষে পরিণত করলেন। যার নাম দিলেন ‘আস্ক’। আর অন্যটাকে তারা পরিণত করলেন প্রথম মহিলায়। যার নাম দিলেন ‘এম্বলা’। প্রথম পুরুষ আর মহিলার দেহ সৃষ্টি করার পর, তাঁর দেব ভাইয়েরা দিলেন প্রাণবায়ু, তারপর চেতনা, চেহারা আর কথা বলার ক্ষমতা।

গাছের গুঁড়ি থেকে কেন? মনে প্রশ্ন জাগে। সুচালো বরফখন্ড অথবা বালিয়াড়ী থেকে না কেন? ভাবতে অবাক লাগে না যে কে এইসব গল্পগাথা তৈরী করেছিল? কেন করেছিল? ধরে নেওয়া যায় এই সব পৌরানিক কাহিনীর আসল আবিস্কারকরা এসব বানানোর মুহূর্তেই জানত যে এগুলো কল্পকাহিনী। নাকি তোমার মনে হয় বিভিন্ন মানুষেরা, বিভিন্ন সময়ে, গল্পের বিভিন্ন অংশ ফেঁদেছে, আর পরে অন্যান্যরা এগুলো একসাথে করার সময়, এগুলো যে বানানো গল্প তা না জেনেই হয়ত কিছু কিছু অংশ বদলে দিয়েছে?

গল্প মজার। সবাই আমরা সেগুলো বারবার বলতে ভালোবাসি। কিন্তু আমরা যখন একটা রঙচঙে গল্প শুনি, সেটা হতে পারে কোন প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনী অথবা ইন্টারনেটের মধ্যে দিয়ে শোঁ শোঁ করে ছুটে বেড়ানো আধুনিক ‘শহুরে কিংবদন্তী’, আমাদের একটু থেমে চিন্তা করা উচিত যে সেটা – অথবা তার কোন অংশ -আসলেই সত্যি কি না। তাহলে আমরা নিজেদেরকেই সেই প্রশ্ন করি – প্রথম মানুষটা কে ছিল? – আর সত্যিকার, বৈজ্ঞানিক জবাবের দিকে তাকাই।

প্রথম মানুষ আসলেই কে ছিল?

এটা তোমাকে মনে হয় অবাক করে দেবে, কিন্তু প্রথম মানুষ বলে কখনই কেউ ছিল না – কারন প্রত্যেক মানুষের বাবা-মা থাকতে হবে, আর সেই বাবা-মাকেও মানুষই হতে হবে! খরগোশের বেলায় একই ব্যাপার। প্রথম খরগোশ বলে কখনো কিছু ছিল না, না ছিল প্রথম কুমির, না প্রথম গঙ্গাফড়িং। আজ পর্যন্ত জন্ম নেওয়া প্রত্যেকটা প্রাণী তার বাবা-মা যে প্রজাতির ছিল সেই একই প্রজাতীরই অন্তর্ভুক্ত ( হয়ত গুটি কয়েক ব্যতিক্রম ছাড়া, ওগুলো বাদ দিয়ে ধরছি এখানে।) তাহলে তার মানে হচ্ছে আজ পর্যন্ত জন্ম নেওয়া প্রতিটি প্রাণী তার দাদা-দাদী যে প্রজাতী সেই প্রজাতীর অন্তর্ভুক্ত। আর তার দাদার-বাবার। আর তার দাদার-বাবার-বাবার। আর এই ভাবে চলছে চিরকাল ধরে।

চিরকাল? আসলে না। ব্যাপারটা এত সহজ না। ব্যপারটা বুঝতে গেলে একটুখানি ব্যাখ্যার দরকার আছে। ব্যাখ্যাটা আমি শুরু করব মনে মনে করা যায় এমন একটা পরীক্ষা দিয়ে। মনে মনে পরীক্ষা করা বলতে বুঝায় তোমার কল্পনার মধ্যে করা একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আমরা যেটা কল্পনা করব আক্ষরিক অর্থে সেটা করা সম্ভব না কারন সেটা আমাদের অনেক অনেক অতীতে নিয়ে যাবে। আমরা যখন জন্মেছিলাম তার অনেক আগে। কিন্তু এটা কল্পনা করা আমাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিনিস শিখায়। তাহলে শুরু করা যাক মনে মনে পরীক্ষা। তোমাকে শুধু যা করতে হবে তাহলো তুমি মনে মনে ভাববে যে এই নির্দেশগুলো তুমি অনুসরন করছ।

নিজের একটা ছবি খুঁজে বের কর। এখন তোমার বাবার একটা ছবি নিয়ে ওটার উপর রাখো। এখন তার বাবার, মানে তোমার দাদার একটা ছবি খুঁজে বের করে ওটার উপর রাখো। তারপর সেটার উপরে রাখো তোমার দাদার-বাবার ছবি। সেটারো ওপর দাদার-বাবার-বাবার ছবি। তোমার হয়ত কখনো তোমার দাদা-নানাদের বাবা-মার সাথে দেখা হয়নি। আমার কখনো আমার দাদার বাবা-মার সাথে দেখা হয়নি। কিন্তু আমি জানি তাদের একজন ছিল গ্রামের এক স্কুল শিক্ষক, একজন গ্রামের ডাক্তার, আরেকজন ব্রিটিশ ভারতের বনকর্মী, আর আরেকজন ছিলেন উকিল, টাকার কুমির, বুড়ো বয়সে পাহাড় বাইতে গিয়ে মারা যান। তারপরো, যদিও তুমি জান না তোমার বাবার বাবার বাবা দেখতে কেমন ছিলেন , তুমি মনে মনে তাকে ভাবতে পারো অনেকটা আবছা আবছা একজন মানুষ। চামড়া ফ্রেমে বাধানো জীর্ণ বাদামী একটা ফটোর মত হয়ত। এখন তার বাবার ব্যাপারেও একই জিনিস করো, দাদার বাবার বাবা। আর পেছনে যেতে যেতে আরও আরও আরও বাবার বাবার বাবার ফটো একটার উপর আরেকটা স্তুপ করে যেতে থাকো। ফটোগ্রাফি আবিস্কার হবার আগের সময় হলেও তুমি এটা করে যেতে পারো। যাই হোক, এটা তো মনে মনে করারই পরীক্ষা।

আমাদের এই মনে মনে করা পরীক্ষার জন্য কতগুলো বাবা লাগবে? হুম, শুধু ১৮৫ মিলিয়ন হলেই চলবে!

শুধু?

শুধু?

১৮৫ মিলিয়ন ছবির একটা স্তুপ কল্পনা করা সহজ না। কত উঁচু হতে পারে সেটা? হুম, প্রতিটা ছবি যদি সাধারন পোস্টকার্ড ফটো হিসেবে ছাপা হয়ে থাকে, ১৮৫ মিলিয়ন ছবি ১৬,০০০ ফুট উঁচু একটা মিনার তৈরী করবে। ৪০টা নিউ ইয়র্কের গগনচুম্বী অট্টালিকা একটার উপরে আরেকটা রাখালেও সেটার সমান হবে না। ওটা যদি পড়েও না যায় (যাবারই কথা), তারপরো বেয়ে ওঠা সম্ভব না। তাহলে একপাশে ওটাকে সাবধানে কাত করে ফেলে দিই, শুধু একটা বইয়ের তাকে লম্বালম্বিভবে সেগুলো গুছিয়ে রাখি।

বইয়ের তাকটা কত লম্বা হবে?
প্রায় তিন মাইল।

বইয়ের তাকের শেষের কোনায় আছে তোমার ছবি। আর দূরের কোনায় আছে তোমার দাদার-১৮৫-মিলিয়ন-বাবা। তিনি দেখতে কেমন ছিলেন? পাতলা চুল আর সাদা বড় বড় জুলপিওয়ালা? চিতাবাঘের চামড়া পড়া গুহামানব? ওসব চিন্তা ভুলে যাও। কিরকম দেখতে ছিলেন আমরা একদম ঠিক ঠিক জানি না, কিন্তু জীবশ্ম থেকে আমরা বেশ ভালো একটা ধারনা পাই। তোমার দাদার-১৮৫-মিলিয়ন-বাবা দেখতে ছিলেন অনেকটা এরকম =================================>

হ্যাঁ, ঠিক তাই। তোমার দাদার-১৮৫-মিলিয়ন বাবা ছিলেন একটা মাছ। মাছ ছিল তোমার দাদার-১৮৫-মিলিয়ন-মাও। একইরকমের। না হলে তারা একে অপরের মিলিত হতে পারতেন না আর তুমি আজকে এখানে থাকতে না।

চল আমাদের তিন মাইল লম্বা বইয়ের তাকের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা একটা করে ফটো বার করে দেখতে থাকি। দেখব প্রত্যেকটা ছবির প্রাণী আর তার আগের এবং পরের ছবির প্রাণী একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। লাইনে প্রত্যেকেই দেখতে ঠিক তার প্রতিবেশীর মত। অন্তত একজন লোক দেখতে তার বাবা আর তার ছেলের যতটা কাছাকাছি হতে পারে ততটুকু। তারপরো যদি তুমি বইয়ের তাকের একপাশ থেকে আরেকপাশে একভাবে হেঁটে যেতে থাকো, একপ্রান্তে তুমি একজন মানুষ দেখবে আর আরেক প্রান্তে একটা মাছ। আর এদের মাঝখানে আছে আগ্রহ জাগানো অনেকরকম দাদার-বাবার-…-বাবা। যাদের মধ্যে, আমার শিগগীরি দেখব, কেউ দেখতে গরিলার মত, কেউ দেখতে বাঁদরের মত, কেউ দেখতে ছুঁচোর মত আর এরকম আরও হরেক রকম। প্রত্যেকেই দেখতে লাইনে ঠিক তার প্রতিবেশীর মত, তারপরো যদি তুমি লাইনের মধ্যে অনেক দূরে দূরে থাকা দুটো ছবি বেছে নাও দেখবে তারা অনেক ভিন্ন। আর তুমি যদি লাইন ধরে মানুষ থেকে যথেষ্ট পরিমান পিছনে যাও তুমি মাছের কাছে পৌছাবে। এটা কিভাবে সম্ভব?

আসলে, ব্যাপারটা বোঝা তেমন কোন কঠিন কাজ না। ধীরে ধীরে পরিবর্তন হবার সাথে আমরা ভালোভাবেই অভ্যস্ত। যা খুব ছোট ছোট ধাপে, এক পা এক পা করে বদলাতে বদলাতে, বিশাল বড় পরিবর্তন করে ফেলে। তুমি একসময় একটা বাচ্চা ছিলে। এখন আর নও। তুমি যখন অনেক বয়স্ক হবে তখন আবার দেখতে অনেক অন্যরকম লাগবে। তারপরো তোমার জীবনের প্রত্যেক দিনে যখন তুমি ঘুম থেকে জেগে ওঠ, আগের রাতে ঘমাতে যাবার আগে তুমি যেমন ছিলে দেখতে তেমনি লাগে। একটা দুধেরবাচ্চা বদলে গিয়ে হয় সদ্য হাঁটতে শেখা শিশুতে, তারপর বালক, তারপর কিশোর, তারপর যুবক, তারপর মধ্যবয়স্ক, তারপর বৃদ্ধ। পরিবর্তনটা এত ধীরে ধীরা ঘটে যে এমন কোন দিন নেই যে যেদিন তুমি বলতে পারবে,’এই মানুষটা হঠাৎ করে দুধের বাচ্চা হওয়া বন্ধ করেছে আর হাঁটি হাঁটি পা পা করা শিশু হয়ে গেছে’। এর পরেও এমন কোনদিন আসবে না যেদিন তুমি বলতে পারবে, ‘এই মানুষটা শিশু হওয়া বন্ধ করেছে আর কিশোর হয়ে গেছে’। এমন কোনদিন নেই যেদিন তুমি বলতে পারবে, ‘কালকে এই লোকটা মধ্যবয়স্ক ছিলঃ আজকে উনি বৃদ্ধ’।

আমাদের মনে মনে করা পরীক্ষাটা এটা বুঝতে সাহায্য করে। যে পরীক্ষা আমাদেরকে ১৮৫ মিলিয়ন প্রজন্মের বাবা আর দাদা আর দাদার-বাবার ভেতর দিয়ে নিয়ে গেছিল এক মাছের মুখোমুখি । আর উল্টো ফিরে সময়ের সাথে সামনে এগোলে দেখতে পাই তোমার মেছো পূর্বপুরুষ একটা মেছো বাচ্চা জন্ম দিলো, যার একটা মেছো বাচ্চা হলো, যার একটা বাচ্চা হলো…যা ১৮৫ মিলিয়ন (ধীরে ধীরে কম মেছো) প্রজন্ম পরে হয়ে দাঁড়ালো তুমি।

তাহলে পুরো ব্যাপারটাই খুব ধীরে ধীরে – এত ধীরে ধীরে যে এক হাজার বছর পিছনে হাঁটার পরো তোমার চোখে কোন পরিবর্তন চোখে পড়েনি। বা এমনকি দশ হাজার বছর পিছনে হাঁটার পরও। যেখানে তোমাকে তোমার দাদার-৪০০-বাবার আশেপাশে কোথাও নিয়ে আনে। অথবা বরং পুরো পথটাতে হয়ত তুমি ছোট ছোট অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করে থাকবে, কারণ কেউ ত হুবহু তার বাবার মত দেখতে হয়না। কিন্তু তুমি কোন সাধারন প্রবনতা লক্ষ্য করবে না। আধুনিক মানুষ থেকে দশ হাজার বছর অতীত কোন ধরনের প্রবনতা দেখানোর মত যথেষ্ট সময় না। উপরে উপরে জামার আর চুলের আর জুলফির স্টাইলের পার্থক্য বাদ দিলে, তোমার দশ হাজার বছর আগের পূর্বপুরুষের প্রতিকৃতি আধুনিক মানুষ থেকে কোনভাবে ভিন্ন হবে না। একজন আধুনিক মানুষের অন্য আধুনিক মানুষদের থেকে যতটুকু পার্থক্য, তার সাথে তারচেয়ে বেশী পার্থক্য হবে না।

একশ হাজার বছর আগে। যেখানে হয়ত আমরা তোমার দাদার-৪০০০-বাবা কে খুঁজে পেতে পারি। সেখানে গেলে? হুম, এখন হয়ত উল্লেখ করার মত একটা পরিবর্তন পাওয়া যাবে। হয়ত মাথার খুলি ভুরুর নিচে সামান্য একটু মোটা হবে। কিন্তু তারপরও সেটা সামান্য একটু হবে। এখন আরও একটু অতীতের দিকে যাওয়া যাক। তুমি যদি বইয়ের তাক ধরে এক মিলিয়ন বছর হেঁটে যাও, তোমার দাদার-৫০,০০০-বাবার ছবি অন্য একটা প্রজাতি হিসেবে গণ্য হবার মত ভিন্ন হবে। যাকে আমরা বলি হোমো এরেকটাস। তুমি জান আজ আমরা হোমো স্যাপিয়েনস। হোমো এরেকটাস আর হোমো স্যাপিয়েনস সম্ভবত নিজেদের মধ্যে সন্তান জন্ম দেবার জন্য মিলিত হতে পারত না। অথবা যদি তার পারতোও তাদের সন্তান সম্ভবত নিজের সন্তান জন্ম দিতে পারত না। যেভাবে একটা খচ্চর, যার বাবা গাধা আর মা ঘোড়া, প্রায় সবসময়ই সন্তান জন্ম দিতে পারে না। (পরের অধ্যায়ে আমরা দেখবে কেন তা হয়।)

আবারো বলি, সবকিছুই কিন্তু ধীরে ধীরে। তুমি হচ্ছ হোমো স্যাপিয়েনস আর তোমার দাদার-৫০,০০০-বাবা হচ্ছে হোমো এরেকটাস। কিন্তু কখনো এমন কোন হোমো এরেকটাস ছিল না যে হঠাৎ করে হোমো স্যাপিয়েনস সন্তান জন্ম দিয়েছে।

তাই, প্রথম মানুষ কে ছিল আর কোন সময়ে তারা বেঁচে ছিল, এ প্রশ্নের স্পষ্ট কোন উত্তর নেই। জবাবটা একরকম ঝাপসা মতন। ঐ প্রশ্নের উত্তরের মতঃ তুমি কখন দুধের বাচ্চা থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করা শিশুতে পরিণত হলে? সম্ভবত এক মিলিয়ন বছরের কিছু পরে কিন্তু একশ হাজার বছরের বেশী আগের কোন এক নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের পূর্বপুরুষরা আমাদের থেকে এত পরিমান ভিন্ন ছিল যে, একজন আধুনিক মানুষ যদি তাদের সাথে দেখাও করতে পারত তবু তাদের সাথে প্রজনন করতে পারত না।

আমরা হোমো এরেকটাসকে একজন ব্যক্তি, একজন মানুষ, বলব কিনা সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। সেটা তুমি কতগুলো শব্দ ব্যবহারের জন্য কিভাবে বাছবে সেটার প্রশ্ন – যাকে বলা হয় একটা শব্দার্থগত প্রশ্ন। কিছু কিছু মানুষ হয়ত জেবরাকে ডোরাকাটা ঘোড়া বলতে চাইতে পারে, কিন্তু অন্যরা হয়ত যেসব প্রজাতিগুলোতে আমরা চড়ি তাদের জন্য ‘ঘোড়া’ শব্দটা রেখে দিতে চাইবে। ঐটা আরেকটা শব্দার্থগত প্রশ্ন। তুমি হয়ত ‘ব্যক্তি’, ‘লোক’, আর ‘মহিলা’ এই শব্দগুলো হোমো স্যাপিয়েনস এর জন্য রেখে দিতে পছন্দ করবে। সেটা তোমার ব্যাপার। কেউ কিন্তু তোমার মেছো দাদার-১৮৫ মিলিয়ন-বাবাকে একজন লোক বলবে না। সেটা বোকার মত কাজ হবে। যদিও একটা ধারাবাহিক চেইন তোমার সাথে ওকে সংযুক্ত করে আছে। চেইনের প্রত্যেকটা সংযোগ হচ্ছে একেকজন সদস্য যে তার প্রতিবেশীরা যে প্রজাতীর ঠিক সেই প্রজাতীর অন্তর্ভুক্ত।

[372 বার পঠিত]