বাস্তবতার যাদু (পর্ব-১): বাস্তবতা কি? যাদু কি?

বাস্তবতার যাদু (পর্ব-২): বিজ্ঞান এবং অতিপ্রাকৃতঃ ব্যাখ্যা এবং এর শত্রু

বিবর্তনের ধীর যাদু

রূপকথার গল্পের মত একটা জটিল জীবকে আরেকটা জটিল জীবে এক ধাপে রূপান্তরিত করা অবশ্যই বাস্তব সম্ভাবনার জগতের বাইরে। তারপরো জটিল জীবরা আছে। তাহলে তাদের উৎপত্তি হল কোথা থেকে? কিভাবে বাস্তবে, ব্যাঙ আর সিংহ, বেবুন আর বটবৃক্ষ, রাজার কুমার আর কুমড়ো, আমার আর তোমার মত জটিল সব বস্তু অস্তিত্ব লাভ করলো? ইতিহাসের বেশীরভাগ জুড়ে এটা ছিল এক হতবুদ্ধিকর প্রশ্ন, কেউই যার উত্তর ঠিকভাবে দিতে পারতো না। তাই ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লোকজন নানারকম গালগল্প ফেঁদে বসেছিল। কিন্তু তারপর প্রশ্নটার উত্তর এলো – অত্যন্ত প্রতিভা দীপ্ত উত্তর এলো – উনিশ শতকে, সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের একজন, চার্লস ডারউইনের কাছ থেকে। এই অধ্যায়ের বাকী অংশটুকু আমি ব্যবহার করব তার উত্তরকে ব্যাখ্যার জন্য, সংক্ষিপ্তভাবে, আর ডারউইনের থেকে ভিন্ন ভাষায়।
উত্তরটা হল জটিল জীব – যেমন মানুষ, কুমির আর বাঁধাকপি – হঠাৎ করে, এক ছোঁয়ে, আসেনি। বরং এসেছে ক্রমান্বয়ে। এক ধাপ থেকে আরেক ক্ষুদ্র ধাপ এভাবে। এক ধাপ পরে যা আসলো তা আগের ধাপে যা ছিল তার থেকে শুধু অতিক্ষুদ্র ভাবে ভিন্ন। মনে কর তুমি লম্বা পাওয়ালা একটা ব্যাঙ বানাতে চাও। তুমি শুরুটা ভালোভাবে করতে পারো যদি -তুমি যা চাও তার কাছাকাছি -কোন কিছু দিয়ে শুরু কর। যেমন ধর, ছোট পাওয়ালা ব্যাঙ। তুমি তোমার ছোট পাওয়ালা ব্যাঙদের দেখবে। পায়ের দৈর্ঘ্য মাপবে। কিছু পুরুষ আর কিছু মেয়ে বেছে নেবে যাদের পা অন্যদের থেকে সামান্য বড়। তুমি ওদেরকে প্রজনন করতে দেবে। আর ওদের তুলনায় ছোট পাওয়ালাগুলোকে বংশবৃদ্ধি করতে দেবে না।

artificial evo-1

অন্যদের তুলনায় লম্বা পাওয়ালা পুরুষ আর মেয়ে গুলো ব্যাঙাচি জন্ম দেবে। যেগুলোর পরিশেষে পা গজাবে আর ব্যাঙে পরিণত হবে। তারপর তুমি এই নতুন প্রজন্মের ব্যাঙগুলোকে মাপবে। আবার যেগুলো গড়পড়তা থেকে লম্বা পা আছে সেসব পুরুষ আর মেয়ে গুলোকে বেছে নেবে। তাদেরকে প্রজনন করতে দেবে।
এভাবে ১০ প্রজন্ম পরে তুমি হয়ত মজার কিছু একটা লক্ষ করবে। এখনকার ব্যাঙগুলোর গড় পায়ের দৈর্ঘ্য , শুরুর দিকের প্রজন্মের ব্যাঙগুলোর পায়ের দৈর্ঘ্য থেকে চোখে পড়ার মত লম্বা হবে। এমনকি এও হতে পারে যে ১০ম প্রজন্মের সব ব্যাঙগুলোর পা প্রথম প্রজন্মের যেকোনো ব্যাঙের পায়ের চেয়ে লম্বা হবে। কিংবা এই বৈশিষ্ট্য লাভের জন্য ১০ প্রজন্ম যথেষ্ট হবে না। তোমাকে ২০ প্রজন্ম অথবা তারও বেশী যেতে হতে পারে। কিন্তু পরিশেষে তুমি গর্বের সাথে বলতে পারবে, “আমি পুরনোটার চেয়ে লম্বা পাওয়ালা এক নতুন ধরনের ব্যাঙ তৈরি করেছি।”

arti-evo-2

কোন যাদুর-কাঠির দরকার পড়েনি। কোন ধরনের যাদুর প্রয়োজন হয়নি। আমরা এখানে যা করলাম সেই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নির্বাচনী প্রজনন। এটা এই তথ্য ব্যবহার করে যে – ব্যাঙদের নিজেদের মধ্যে পার্থক্য আছে আর এই পার্থক্যগুলো বংশগত। মানে, জিনের মাধ্যমে পিতা-মাতা থেকে সন্তানে প্রদত্ত। শুধুমাত্র কোন ব্যাঙগুলো প্রজনন করবে আর কোনগুলো করবে না এই বাছাবাছির মাধ্যমে আমরা নতুন ধরনের ব্যাঙ তৈরি করতে পারি।
সহজ, তাই না? কিন্তু শুধু পা লম্বা করা তেমন মজার কিছু না। যত যাই হোক না কেন, আমরা তো ব্যাঙ দিয়েই শুরু করেছিলাম – তাও সেগুলো ছিল ছোট পা-ওয়ালা ব্যাঙ। ধর তুমি ছোট পা-ওয়ালা ব্যাঙ দিয়ে শুরু করলে না। বরং এমনকিছু দিয়ে শুরু করলে যা ব্যাঙই না। যেমন গোসাপের মত কিছু। ব্যাঙের সাথে তুলনা করলে গোসাপদের পা খুবি ছোট (অন্ততপক্ষে, পিছনের পা দুটোর জন্য আরকি)। তারা সেগুলো লাফানো নয় বরং হাঁটার জন্য ব্যবহার করে। গোসাপদের আরও আছে লম্বা লেজ, যেখানে ব্যাঙদের কোন লেজই নেই। গোসাপেরা বেশীরভাগ ব্যাঙের থেকে লম্বা আর চিকন। কিন্তু আমার মনে হয় তুমি দেখতে পাচ্ছ যে, কোটি কোটি প্রজন্ম ধরে প্রত্যেকটাতে পুরুষ আর মেয়ে গোসাপ যেগুলো কিছুটা ব্যাঙের মত দেখতে সেগুলোকে প্রজনন করতে দিয়ে, আর একইসাথে তাদের কিছুটা কম ব্যাঙের মত দেখতে বন্ধুদের তা না করতে দিয়ে, শুধুমাত্র ধৈর্যের সাথে বাছার মাধ্যমে, তুমি কিছু সংখ্যক গোসাপকে ব্যাঙে পরিণত করতে পার। এই প্রক্রিয়ার কোন পর্যায়ই তুমি কোন নাটকীয় পরিবর্তন দেখবে না। প্রত্যেকটা প্রজন্মই মোটামুটি আগের প্রজন্মের মতই দেখতে হবে, কিন্তু তারপরও, যথেষ্ট প্রজন্ম পার হবার পর, তুমি লক্ষ্য করবে গড়পড়তায় লেজের দৈর্ঘ্য কিছুটা কম, আর গড়পড়তায় পেছনের পা দুটো কিছুটা লম্বা। এক খুবই বিশাল সংখ্যক প্রজন্ম পরে, লম্বা পাওয়ালা, ছোট লেজ বিশিষ্ট প্রাণীগুলো তাদের লম্বা পাগুলো বুকে হাটার চেয়ে ছোট ছোট লাফ দিয়ে চলাতেই সহজ বোধ করবে। আর এভাবে ব্যাপারটা ঘটে চলবে।
অবশ্যই আমি যে ঘটনাগুলো বর্ণনা করলাম সেখানে আমরা নিজেদেরকে পালক হিসেবে কল্পনা করছি। আমরা যে শেষ ফলাফল পেতে চাই তা পাবার জন্য পুরুষ আর মহিলা বেছে নিচ্ছি। কৃষকরা হাজার বছর ধরে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে, যাতে বেশী উৎপাদনশীল আর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ইত্যাদি সম্পন্ন গবাদি পশু আর ফসল জন্মায়। ডারউইন হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তি যিনি বুঝতে পারলেন কোন পালক যদি বেছে নেবার জন্য নাও থাকে তাহলেও এই পদ্ধতি কাজ করে। ডারউইন দেখলেন পুরো ব্যাপারটা প্রাকৃতিক ভাবে ঘটতে পারে। অবশ্যই সেই সহজসরল কারণে যে, কিছু জীব প্রজনন করতে পারার মত লম্বা সময় বাঁচতে পারে আর অন্যরা পারে না। আর যারা টিকে থাকে তাদের টিকে যাবার কারণ হল টিকে থাকার জন্য তাদের অন্যদের থেকে বেশী উপকরণ রয়েছে। তাই টিকে যাওয়া জীবদের সন্তানরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে যায় সেইসব জিন যা তাদের পিতামাতাদের টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। গোসাপ হোক বা ব্যাঙ, শজারু বা বুনো ড্যান্ডেলিয়ন গাছ, সবসময়ই কিছু স্বতন্ত্র জীব থাকবে যারা অন্যদের থেকে টিকে থাকায় বেশী পারদর্শী। যদি লম্বা পা থাকা বেঁচে থাকতে সাহায্য করে ( যেমন ব্যাঙ বা ঘাসফড়িঙয়ের বিপদ থেকে লাফ দিয়ে পালানোর জন্য, কিংবা চিতাবাঘ হরিণ শিকারের জন্য বা হরিণের চিতাবাঘের কাছে থেকে পালানোর জন্য ), তাহলে যাদের লম্বা পা থাকবে তাদের মারা যাবার সম্ভাবনা কম হবে। তাদের প্রজনন করতে পারার মত লম্বা সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশী হবে। সেইসাথে বাচ্চা দেবার জন্য মিলিত হতে যাদেরকে পাওয়া যাবে তাদের লম্বা পা থাকবে। তাই প্রত্যেক প্রজন্মে লম্বা পায়ের জন্য দায়ী জিনদের পরবর্তী প্রজন্মে অতিবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। যত সময় যাবে আমরা দেখতে পাব জনগোষ্ঠীর আরও আরও জীবের লম্বা পা হবার জিন রয়েছে। তাই ফলাফল দেখে একদম সেইরকম মনে হবে যেন একজন বুদ্ধিমান পরিকল্পক , যেমন একজন পশুপালক, লম্বা পাওয়ালা প্রাণীগুলোকে প্রজননের জন্য বেছে নিয়েছে –পার্থক্য এইটাই যে সেরকম কোন পরিকল্পনাকারীর কোন দরকার নেই। এটা প্রাকৃতিক ভাবে, নিজে নিজে ঘটছে, কারা কারা প্রজনন করা পর্যন্ত টিকে থাকবে আর কারা থাকবে না তার স্বয়ংক্রিয় ফলাফল হিসেবে। এজন্য এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় প্রাকৃতিক নির্বাচন।
যথেষ্ট প্রজন্ম পর্যন্ত যেতে দেওয়া হলে, গোসাপের মত দেখতে পূর্বপুরুষরা ব্যাঙের মত দেখতে বংশধরে পরিবর্তিত হতে পারে। আরও প্রজন্ম যেতে দিলে, মাছের মত দেখতে পূর্বপুরুষেরা বানরের মত দেখতে বংশধরে পরিবর্তিত হতে পারে। এরও বেশী প্রজন্ম যেতে দিলে, ব্যাকটেরিয়ার মত দেখতে পূর্বপুরুষেরা মানুষের মত দেখতে বংশধরে পরিবর্তিত হতে পারে। এবং ঠিক এইটাই ঘটেছে। আজ পর্যন্ত বেঁচে থাকা প্রত্যেকটা প্রাণী আর উদ্ভিদের ইতিহাসে এই ধরনের জিনিস ঘটেছে। এর জন্য যত সংখ্যক প্রজন্ম দরকার তা তোমার আর আমার পক্ষে কল্পনার চাইতেও বেশি, কিন্তু এই বিশ্বের বয়স হাজার কোটি বছর, আর জীবাশ্ম থেকে আমরা জানি প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে আজ থেকে ৩,৫০০ মিলিয়ন (৩.৫ বিলিয়ন) বছর আগে, তাই বিবর্তন ঘটার জন্য অনেক সময় ছিল।

arti-evo-3

এটাই ডারউইনের ধারনা, আর একে বলা হয় প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন। আজ পর্যন্ত মানুষের ভাবনায় আসা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ধারনাগুলোর মধ্যে এটি একটি। যেহেতু এটা এত গুরুত্বপূর্ণ, আমি পরের অধ্যায়গুলোতে এতে ফিরে আসব। আপাতত, এটুকু বোঝাই যথেষ্ট যে বিবর্তন অত্যন্ত ধীর আর ধারাবাহিকভাবে ঘটে। বস্তুত,বিবর্তনের ধারাবাহিকতাই একে ব্যাঙ আর রাজকুমারের মত জটিল জিনিস তৈরি করতে দেয়। একটা ব্যাঙ থেকে রাজকুমারে জাদুকরী পরিবর্তন ধারাবাহিক না। হঠাৎ। আর এই জন্য এরকম সবকিছুকে বাস্তবতার জগত থেকে বাদ দিয়ে দেয়া যায়। বিবর্তন একটা বাস্তব ব্যাখ্যা, যেটা আসলেই কাজ করে। আর এর সত্যতাকে প্রদর্শনের জন্য আসল প্রমাণ রয়েছে। কোনকিছু যদি বাতলায় যে জটিল জীব হঠাৎ করে আবির্ভূত হয়েছে; একদানে (এক ধাপ এক ধাপ করে ধারাবাহিকভাবে না হয়ে), সেটা হবে একটা অলস গল্প – পরীমার যাদুকাঠির কাল্পনিক জাদু থেকে কোন অংশে তা ভালো ব্যাখ্যা নয়।
আর কুমড়োর ঘোড়ায় টানা গাড়ীতে পরিণত হবার ক্ষেত্রে, ব্যাঙ আর রাজকুমারের মত, জাদুমন্ত্র এখানেও বাতিল। ঘোড়ায় টানা গাড়ী বিবর্তিত হয় না – অন্তত, প্রাকৃতিক ভাবে নয়, যেভাবে ব্যাঙ আর রাজকুমার হয়। কিন্তু ঘোড়ায় টানা গাড়ী – যাত্রীবাহী বিমান আর ছোট্ট-কুঠার, কম্পিউটার আর চকমকি পাথর থেকে তৈরি করা তীরের মাথা – এসবের মত মানুষের তৈরি। যে মানুষেরা আসলেই বিবর্তিত হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক আর হাত প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে মাধ্যমে বিবর্তিত হয়েছে, যেরকম নিশ্চিতভাবে বিবর্তিত হয়েছে গোসাপের লেজ, ব্যাঙের পা। আর মানুষের মস্তিষ্ক, একবার বিবর্তিত হবার পর, ঘোড়ার গাড়ী আর মোটরগাড়ি, কাচি আর সুরের সিম্ফনি, কাপড় ধোওয়ার মেশিন আর হাতঘড়ি – এসব নক্সা আর সৃষ্টি করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। আরও একবার, কোন যাদু নয়। আরও একবার, কোন চাতুরী নয়। আরও একবার, সবকিছুর সুন্দর এবং সহজ ব্যাখ্যা রয়েছে।
বইয়ের বাকী অংশে, আমি তোমাদের দেখাতে চাই যে বাস্তব জগত, বৈজ্ঞানিকভাবে যেভাবে বোঝা গেছে, তার নিজস্ব একটা যাদু আছে – যেটাকে আমি বলি কাব্যিক যাদু। এক অনুপ্রেরনাদায়ী সৌন্দর্য যেটা আরও বেশী যাদুকরী কারণ এটা বাস্তব। কারণ এটা কিভাবে কাজ করে তা আমরা বুঝতে পারি। সত্যিকারের সৌন্দর্য আর বাস্তব জগতের যাদুর তুলনায় অতিপ্রাকৃত জাদুমন্ত্র আর রঙ্গমঞ্চের ছলচাতুরী সস্তা আর চটকদার বলে মনে হয়। বাস্তবতার যাদু না অতিপ্রাকৃত, না সেটা কোন চাতুরী। এটা – শুধুমাত্র – বিস্ময়কর। বিস্ময়কর, এবং বাস্তব। বিস্ময়কর কারণ এটা বাস্তব।

arti-evo-4

[154 বার পঠিত]