প্রত্যেকটি জীবকুল পৃথিবীতে বেঁচে থাকার লক্ষ্য একটাই নিজেকে রক্ষা করা এবং নিজের প্রতিলিপি তৈরি করা। কিন্তু আমরা মানুষ সভ্যতার অগ্রগতিতে আমাদের অন্য কাজগুলি করতে হয় যা মানব সৃষ্ট। তবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় মানুষের মনোজগতের অধিকাংশ অংশ জুড়ে রয়েছে যৌনতা। যা মানুষের প্রতিলিপি তৈরির আদিম প্রবৃত্তির পরিচয় বহন করছে। এই প্রতিলিপি তৈরিতে পুরুষের চেয়ে নারীর দায়িত্ব অনেক বেশী। সাধারণত পুরুষ তার শুক্রাণু ছড়িয়ে তার দায়িত্ব খালাস। আর বাকিটা চলবে নারীর অভ্যন্তরে। দশ মাস দশ দিন গর্ভধারণ থেকে প্রসব পর্যন্ত। প্রক্রিয়াটা তো কষ্টসাধ্য নিঃসন্দেহে তবে অনেক নারীর মতে এই প্রক্রিয়া বিরক্তিকর আবার অনেকের উপভোগ্য। উপভোগ্য হোক আর বিরক্তিকর হোক এটা ঠিক মানুষ জাতি টিকিয়ে রাখতে এই দায়িত্ব নারীকে নিতেই হয়। তাই প্রত্যেকটি ধর্ম এবং প্রত্যেকটি রক্ষণশীল সমাজ ঈশ্বরের ভয় দেখিয়ে নারীকে একটা প্রধান লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে সন্তান ধারণ, জন্মদান এবং লালন পালন। এবং পুরুষ এই ক্ষেত্রে অনেকটাই মুক্ত তাই হয়তো নারীরা সভ্যতার অগ্রগতিতে পিছিয়ে গিয়েছিলেন।
ধর্ম তো চিরকাল বলে এসেছে জন্ম মানুষের হাতে নয়, এটা ঈশ্বরের দান। কিন্তু বিজ্ঞান এই ব্যাখ্যায় বসে থাকে নি সে ব্যর করেছে গর্ভসঞ্চারের আসল রহস্য, ব্যর করেছে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এই পদ্ধতির দৌলতে ঈশ্বর দৌড় দিয়ে পালিয়েছেন। তবে উনি পালালে কি হবে? উনার কিছু বান্ধারা আবার বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারকে বাঁকা চোখে দেখেন আবার কিছুদিন পরে উনারাই চেটে পুটে বিজ্ঞানের লাভকে গ্রহণ করেন। তেমনি জন্ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও তাই। অন্য ধর্মের বান্ধারা একটু জন্ম নিয়ন্ত্রণে সহনশীল হলেও মুমিন বান্ধারা এখনও সহনশীল হন নি।
তেমনি ক্লোনিং পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েও রক্ষণশীলরা বাঁধা সৃষ্টি করেছে । অথচ যদি কোনদিন বৃহত্তর মানব সমাজে যৌন মিলনের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদনে সমস্যা সৃষ্টি হয় তবে ক্লোনিং পদ্ধতিই হয়ত মানুষের উপস্থিতি পৃথিবীতে টিকিয়ে রাখবে।
টেস্ট টিউব বেবিকে বলে দেওয়া হল পাপ জাত সন্তান। আবার বিজ্ঞানের এই সুফলকে নিয়েই দেখা যাচ্ছে একশ্রেণী শুরু করে দিয়েছে অমানবিক কাজ বিলাসী একশ্রেণী এই পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে কোন এক গরীব নারীর গর্ভ ভাড়া করে সন্তানের সাধ নিচ্ছেন। এবং তার সাথে জড়িত রয়েছে ভারতের বিভিন্ন নার্সিং হোম এরা মোটা অংকের টাকা নিয়ে সামান্য একটা অংশ দিয়ে দিচ্ছে গর্ভধারিণীকে। অনেক ক্ষেত্রে এই গর্ভধারিণীরা বছর বছরই গর্ভধারণ করতে বাধ্য হচ্ছেন, মারাও যাচ্ছেন।
তবে আশার ব্যাপার হলও, নকল মাতৃগর্ভ তৈরির কাজে লেগে গেছেন বিজ্ঞানীরা অস্ট্রেলিয়াতে ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম গর্ভ বিজ্ঞানীরা দাবী করছেন এই গর্ভ প্রাকৃতিক মাতৃগর্ভের একদম বিকল্প। এই কৃত্রিম গর্ভটি হলও আসলে একটি পাত্র যা বিশেষ উপায়ে আকার দেওয়া হয়েছে যাতে প্রাকৃতিক গর্ভের মতোই তরল এবং ব্যাকটেরিয়াকে ধারণ করতে পারবে।
এখানে বলে রাখি এই বিস্ময়কর আবিষ্কারে প্রধান ভূমিকা যিনি রাখছেন উনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত জিন তত্ত্ববিদ আরতি প্রসাদ।
শ্রীমতী প্রসাদ তার বই ‘লাইক এ ভার্জিন’ বইতে বিভিন্ন যুক্তির মাধ্যমে রক্ষণশীলদের বিরোধিতা খণ্ডন করেছেন । তার মতে , অদূর ভবিয্যতে এই কৃত্রিম গর্ভকে এমনভাবে উন্নত করা হবে যাতে ইচ্ছা করলে পুরুষরাও গর্ভটিকে ধারণ করতে পারেন। বিজ্ঞান বিরুধিদের নাক সিটকানোর কিছু নেই এতে। কারণ যৌন-ক্রিয়া ছাড়া সন্তান সৃষ্টির অনেক দৃষ্টান্ত নানা ধর্মের দলিলে উল্লেখ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে বর্তমান কর্মচঞ্চল পৃথিবীতে বন্ধ্যত্বের বাড়ছে। অর্থাৎ প্রজনন ক্ষমতার হ্রাস পাচ্ছে। ফলে এমন দিন আসতে পারে যেদিন প্রজননের ফলে প্রজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হবে। জিন তত্ত্ববিদ শ্রীমতী প্রসাদ উল্লেখ করেছেন যে মানুষের ‘y’ ক্রোমোজোম বিবর্তনের ধারাকে ধীর করে দেয়। যা একদিন মানুষের বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। ফলে এই পেক্ষাপটে দাড়িয়ে জন্ম নয় সৃষ্টি এই বিকল্পকে যদি আমরা গ্রহণ করি তাতে দোষের কি?
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন ২০২০ সালে কৃত্রিম প্রাণী গর্ভকে তৈরি সফল হবে এবং ২০৩০ সে মানুষ সৃষ্টি নমুনা তৈরি সম্ভব হবে। সেক্স-লেস রি-প্রোডাকশন সমর্থনে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ ফ্লেচার বলেছেন ‘মাতৃগর্ভ হলও একটি অন্ধকারময় বিপজ্জনক জায়গা এবং পরিবেশ। মায়ের স্বাস্থ্যের উপর এবং আচরণের উপর সন্তানের ভবিষ্যৎ ১০০% নির্ভর করে। মা যদি রোগাক্রান্ত হন বা অপুষ্টিতে ভোগেন তা ভ্রূণকে অস্বাভাবিক অবস্থায় ফেলতে পারে। ফলে কৃত্রিমভাবে যদি মানুষের জন্ম দেওয়া সম্ভব হয় যে সন্তান ১০০% মানুষ হবে তবে আপত্তির কিছু নেই।
তবু নিন্দুকেরা নিন্দা করছেন। তাতে কি হয়তো তারাই একদিন এর সুফল নিতে লাইনের সামনে থাকবেন। আমরা বিজ্ঞানমনস্করা সবসময়ই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাই।
তথ্য সূত্র :-
http://www.dailymail.co.uk/femail/article-2190065/The-woman-wants-abolish-sex-Genetics-expert-urges-embrace-future-virgin-births-women-AND-men-sex-marriage-redundant.html#axzz2JknwXbGE

http://atheism.about.com/library/FAQs/phil/blphil_ethbio_wombs.htm

এবং দেশের কথা পত্রিকা ৩০ জানুয়ারী, ২০১৩

[125 বার পঠিত]