বেহুলা-লখিন্দর

আকাশ মালিক

১ম পর্ব-

‘সুভাস দত্তকে নিয়ে লেখা দেয়ার অনুরুধ করেছিলাম দাওনি’ টেক্সট মেসেইজে পলাশের অভিযোগ। প্রতি মাসেই টেক্সট দেয় আমি কোন উত্তর দেই না। তারপরও গত সপ্তাহে ফোন করে বললো ‘৩০ শে জানুয়ারি কার মৃত্যু দিবস জানো? এখনও কিছুটা জায়গা তোমার জন্যে খালি রেখেছি, আমাদের ‘বিদেশ বার্তা’য় তোমাকে একটা লেখা দিতেই হবে আর তা হবে জহির রায়হানকে নিয়ে’। কে যে তাকে বলেছে, কোথায় যে শুনেছে আমি ব্লগে লেখা-লেখি করি আল্লায়ই জানে। পলাশ ছোটবেলার স্কুল জীবনের বন্ধু, সিনেমা হলে এক সাথে বসে সুভাস দত্ত আর জহির রায়হানের দু-তিনটি ছবি দেখেছি, সে অনেক দিন পূর্বে। বললাম, ‘দাদা ভাই আমাকে ক্ষমা করো, আমি লেখালেখি কমিয়ে দিয়েছি। পুরনো কিছু অসমাপ্ত লেখা আছে সেগুলো হয়তো সমাপ্ত করবো’। পলাশ এক কঠিন আবদার করে বসলো-‘ তোমার ব্লগ প্রোফাইল নামটা দিয়ে দাও, আমি সেখান থেকে তোমার লেখা ক্ষণে ক্ষণে কপি পেষ্ট করে আমার পত্রিকা অনলাইন ভার্সনে ছেপে দিব’। সংক্ষেপে উত্তর দিলাম ‘স্যরি, তা দেয়া যাবেনা’। জানি এক সময়ের সিনেমা পাগল বন্ধু এই পলাশই আমার লেখাগুলো পড়লে টেলিফোন, টেক্সট মেসেইজই শুধু বন্ধ করবেনা, আমার মুখটা চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টাও করতে পারে। তবে তাকে থ্যাঙ্ক ইউ দিলাম দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যে। আমি মনে করি জহির রায়হান ছিলেন বাংলাদেশের সত্যজিৎ রায়। ১৯৬৬ সালে জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ মুক্তি পেয়েছিল। আজ সেই প্রবাদপ্রতিম কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতার মৃত্যু দিবসে আমার ‘বেহুলা লখিন্দর’ লেখাটি তার স্ম্বরণে উৎসর্গ করলাম।

একদিন রাহেলাকে বলেছিলাম বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি শুনাবো। সে আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। তখন রাহেলার কোন সন্তানাদি ছিলনা, যথেষ্ট সময় ছিল কিচ্ছা কাহিনি শুনার, কিন্তু আমার সময় ছিলনা। চল্লিশ বৎসর অতিবাহিত হয়ে গেল বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি আর বলা হলোনা। আজ যখন বলতে চেয়েছি, সেই কাহিনি শুনার মানুষ খুঁজে পাইনা। গ্রামাঞ্চলে সেই ছোটবেলার শুনা কাহিনির একটা পর্বে বেহুলা মশারী টাঙ্গিয়ে তার মৃত স্বামীর সামনে সম্পূর্ন উলঙ্গ হয়ে সাত রাত সাত দিন নৃত্য করেছিলেন। আমরা বিশ্বাস করতাম, সতী নারী আগুনে পুড়েনা আর সতী নারীর স্বামী সাপের কামড়ে মারা যায়না। আরো কিছু কথা লোকমুখে শুনা যেতো যেমন, বাসর রাতের আরেক নাম নাকি ‘কাল রাত’। এর মর্মকথা বুঝার বয়স তখন ছিলনা। আমি মনে করতাম ‘কাল রাত’ অর্থ অমাবশ্যার ঘন কলো অন্ধকার রাত। তা তো হবেই, এ যে চরম গোপনীয় পবিত্র রাত। বড় হয়ে শুনলাম এই কালো রাতের ব্যাপারটা বেশ সিরিয়াস। বাসর রাতে অর্থাৎ বিয়ের প্রথম রজনীতে নতুন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দৈহিক মিলন বা সঙ্গম শাস্ত্রমতে না-যায়েজ। এতে স্বামীর অমঙ্গল হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এখানে যুক্তিও আছে, ঐ রাতে বেহুলা অমনোযোগী না হলে কাল-নাগিনী লখিন্দরকে দংশন করতে পারতো না, আর লখিন্দরও মারা যেতেন না। সুতরাং স্বামীর মঙ্গলার্থে নতুন বউকে একটা নিদ্রাহীন রজনী কাটাতেই হবে। আইন হউক আর প্রথাই হউক, কেউ কোনদিন তা পালন করেছিলেন কি না আমার আর জানা হয়নি। আরেকটি হল যে, হিন্দুদের কেউ সর্প দংশনে মারা গেলে, প্রচলিত প্রথায় তার সৎকার না করে, তাকে কলা গাছের তৈরী ভেলায় কিছু খাদ্য সামগ্রী সহ, ফল-ফুল দিয়ে সাজিয়ে উত্তরমূখী করে শুইয়ে নদীর জলে ভাসিয়ে দেয়া হয়, এই আশায় যে, সে একদিন কোন অলৌ্কিক পদ্ধতিতে জীবিত হয়ে ফিরে আসতেও পারে। আর এই ভাসান সব সময় নদীর স্রোতের উল্টো দিকে আপনা আপনিই চলতে থাকে। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়েই বড় নদী বয়ে গেছে। ছোটবেলায় বন্ধু আবুলকে নিয়ে বহুদিন ভাসান দেখার জন্যে রাত-বিয়ালে নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি, কোনদিন তা দেখার ভাগ্য হয় নি। তবে একবার সাপের কামড়ে মৃত এক ব্যক্তিকে দেখার সুযোগ এসেছিল। গ্রামের উত্তর পাড়ার খুব বড় ধনী একজন আমেরিকা প্রবাসী তার হাওড়ের জমিতে পাকা ধান দেখতে গিয়েছিলেন। জমির আলে বিষাক্ত কোন এক সাপ তাকে দংশন করে। শুনলাম সাপের বিষ নামানোর জন্যে, যে ওঝাকে আনা হয়েছে সে নাকি সাত দিনের মরা জীবিত করতে পারে। কড়ির বীণা বাজিয়ে হিমালয় পর্বত থেকে সর্পদেবী মনসাকে জাগিয়ে তুলতে পারে। এমন সুযোগ হাতছাড়া করার পাত্র আমরা নই। আবুলকে নিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে সেই বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলাম। সমস্ত উঠোন জুড়ে বিরাট প্যান্ডোল, প্যান্ডোলের চারিদিক পর্দায় ঢাকা। দূর থেকে শুনা যাচ্ছে ঢোল-করতালের আওয়াজ আর নারী পুরুষের সম্মিলিত কণ্ঠে গানের সুর।

ও বিষ দৌড়ে নামো-রে, বিষ দৌড়ে নামো-রে
কালিয়া কালনাগের বিষ দৌড়ে নামো-রে।।

কিন্তু আমাদেরকে প্যান্ডোলের ধারে কাছেই যেতে দেয়া হলোনা। কারণ, চব্বিশ ঘন্টা পের হয়ে গেছে বিষ একটুও নড়ছেনা দেখে সাতজন ওঝা মিলে সুরে সুরে নৃত্যের তালে তালে খুবই অকথ্য, অশ্লীল নোংরা ভাষায় সর্পরাণীকে গালাগালি শুরু করেছেন। প্রয়োজনে তারা উলঙ্গ হয়ে নৃত্য করবেন। সুতরাং এখানে ছোটদের প্রবেশ নিষেধ। পরে শুনেছি, শহর থেকে বড় এক ডাক্তার এসে বলে গেছেন, সাপে-কাটা ঐ ব্যক্তি প্রথম দিনেই মারা গিয়েছিলেন। দুইদিন মরা লাশ সামনে নিয়ে ওঝারা খামোখাই গান-বাজনা, নাচানাচি করেছে, যার কারণে গ্রামের আলেম মুনসীরা উনার জানাজায় অংশ গ্রহণ করেন নি। তৃতীয় ব্যাপার ছিল যে, লখিন্দরের নিশ্ছিদ্র লোহার বাসর ঘরে প্রবেশকারিণী সেই কাল-নাগিনীর নাম ছিল সুতানালী নাগিনী। লখাইর (লখিন্দরের) বাবা চাঁদ সওদাগর ছেলের বাসর ঘরটি এমন ভাবে তৈ্রী করেছিলেন যে, সেথায় শুধু শ্বাস নেয়ার প্রয়োজনে বায়ূ প্রবেশের ছোট্ট সুঁচের অগ্রভাগের মত একটি মাত্র ছিদ্র ছিল। সেই ছিদ্র পথেই সুতার আকার ধারন করে নাগরাণী মনসার নির্দেশে কালনাগিনী বেহুলার বাসর ঘরে ঢুকেছিল।

কাহিনি বলার আগে কিছু তথ্য উপাত্ত যোগাড় করার মানসে ‘মনসামঙ্গল’ পড়ার উদ্যোগ নিলাম। দেখলাম আমার শুনা কাহিনিতে অনেক ভুল ছিল। আরো দেখলাম মনসামঙ্গল কাব্যের রচয়ীতা অনেক জন আর কাহিনিতেও ভিন্নতা আছে প্রচুর। কবিদের মধ্যে কানা হরিদত্ত, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই, দ্বিজ বংশীদাস, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ প্রমুখ মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেছেন। কাহিনির যত গভীরে যাই, বিজয় অর্জন ও উদ্দেশ্য সাধনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মনসার তেজস্বীতা, ক্ষিপ্রতা, দৃঢ়তা দেখে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভক্তি বাড়তে থাকে। আমি মনসার পরিচয় খুঁজতে বেড়িয়ে পড়ি। শুনেছিলাম চন্ডীর ( শিবের বউ) বাগানের কোন একটি বৃক্ষের তলে শিবের বীর্যস্খলন থেকে মনসার জন্ম। এখানে দেখি শিব পদ্মপল্লবে বীর্যপাত ঘটিয়ে মনসার জন্ম দিয়েছিলেন যার কারণে মনসার আরেক নাম পদ্মাবতী। যার রূপ দেখে শিবের এমন অবস্থা হলো তাকে তো একবার দেখতে হয়। দেখলাম রূপবতি পার্বতির রূপ আর পড়লাম তার বিষ্ময়কর জন্ম বৃত্তান্ত। দেখা হলো মা দূর্গা ও কালির সাথে। দূর্গার একাধিক হাতের রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে, আর চন্দ্রধর বণিক অর্থাৎ আমাদের চাঁদ সওদাগর ও বেহুলার বংশ পরিচয় জানতে গিয়ে আমি কী ভাবে যে মহাভারতে ঢুকে পড়লাম তা বুঝতেই পারি নি। এখানে দেখি মহাদেব শিব আর তার স্ত্রী দূর্গা (পার্বতি) আর্য না অনার্য তা নিয়ে বেশ ঝগড়া লেগে আছে, বাধ্য হয়ে বেদের স্মরণাপন্ন হলাম। এবার মাথাটা পুরাই আউলা জাউলা হয়ে গেল। বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনিতে যে, এত দেবলীলা আর নরলীলা জড়িয়ে আছে তা তো জানতাম না। মনের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- না-রায়ণ, না-রায়ণ। এত দেব-দেবী, এত চরিত্রের নাম স্মরণ রেখে যারা বেদ, মনু, রামায়ণ আর সব শেষে মহাভারত কাব্যগ্রন্থখানা লিখেছেন, তাদেরকে শতকোটি পেন্নাম জানিয়ে নিজেকে বললাম- অনেক হয়েছে, মোল্লা এবার মসজিদে চলো। নাহ, সে দিকে যেতে আমার মুরুব্বীরা বারণ করেছেন। আর বেহুলার কাহিনি জানতে গিয়ে যে, মহাভারতে (আসলে মহাসাগরে) ও মঙ্গলকাব্যে বা পদ্মপুরাণে সাঁতার কাটলাম, হাবুডুবু খেলাম, সেখান থেকে নুড়ি পেলাম না ঝিনুক পেলাম, সেই অভিজ্ঞতার সবটুকু নিজের সঞ্চয়ের থলেতে লুকিয়ে রাখার মত কৃপণ তো আমি হতে পারিনা।

বেহুলা আর লখিন্দর যে মর্ত্যলোকের সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তা বোধ করি আমি কেন, আমার চৌদ্দগুষ্ঠির কেউ জানতেন না, এমন কি বেহুলা আর লখিন্দরের মা বাবাও না। আরো একটা বিষয় আমি কোনদিন কল্পনা করিনি, এই কাহিনি মর্ত্যলোকের হলেও মূল চরিত্রের নায়ক-নায়িকারা যে প্রায় সকলেই স্বর্গলোকের। বিষয়টার গভীরতা সন্ধানে গুগল মামার দ্বারস্থ হলাম। তিনি তার বোরাক, ইউ টিউবকে তলব করলেন। ইউ টিউব আমাকে চোখের পলকে স্বর্গলোকে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে দেখি এক এলাহী কারবার। শিবলোক, আর ইন্দ্রসভার হাল হকিকত দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। আর সত্যি বলতে কী, বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনির মূল সন্ধান করতে গিয়ে দেবলোকে এসে, হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে আমার জানা-শুনা অতীত ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়। আমার মনে হল, মহাভারত সম্পূর্ণই ভারতসন্তানদের একান্ত লোকাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। দেবী পার্বতির, মনসার প্রতি সতীনসুলভ আর বেহুলার প্রতি দাসী-রাণী আচরণে ফুটে উঠেছে মর্ত্যবাসী মানুষের হিংসে, বিদ্বেষ, ক্ষমতা, আধিপত্য বিস্তারের জীবন্ত চিত্র। মনসা মঙ্গলকাব্য একমাত্র বাঙ্গালীর পক্ষেই রচনা করা সম্ভব, কারণ এ কাব্য রচনা করার উপযুক্ত প্রাকৃতিক উপাদান হয়তো পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। মনসা মঙ্গলকাব্য বাঙ্গালীর আপন সৃষ্টি, তার নিজস্ব সম্পদ। স্বর্গলোকে গিয়ে মহাদেব শিবের মুখ থেকে শুনলাম, বেহুলা আর লখিন্দরের আসল নাম যথাক্রমে ঊষা আর অনিরুদ্ধ। বেহুলা আর লখিন্দর দুই স্বর্গীয় অপ্সরা। কী ভাবে এরা মর্ত্যে এলেন সেটা বুঝতে হলে আগে আমাদেরকে মনসার পরিচয় জানা দরকার।

মনসার পিতার নাম শিব। শিব সর্বভারতীয় প্রধান দেবতা। আর্যদের সাথে অনেক কুস্তি-দুস্তি করে, প্রবল ঘাতপ্রতিঘাতের পর অগ্নি, বরুণ, মিত্র, বৃহস্পতি, পুষন, ব্রহ্মা, রুদ্র, বিষ্ণু-প্রমূখ বৈদিক দেবতাকে অপসারণ করে তিনি সর্বভারতীয় প্রধান দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত হন। এতে বড় বিজয়টা হয়েছে অনার্য ভারতীয় ভুমিপুত্রদের। শিব ভারতমাতার অনার্য দ্রাবিড় জাতির সৃষ্টি, আর্যদের বেদে শিবের নাম উল্লেখ নেই। যদিও তারা রুদ্রকে শিবই মনে করেন। শিবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল তাঁর তৃতীয় নয়ন। মহাভারতে শিবকে ত্রিনয়ন রূপে কল্পনা করা হয়েছে; তাই উক্ত নামটির আক্ষরিক অর্থ করা হয়ে থাকে “তৃতীয় নয়নধারী’’। এই নয়ন দ্বারা শিব কাম-দেবকে ভস্ম করেছিলেন। কাম-দেব শব্দটির অর্থ ‘দিব্য প্রেম’ বা ‘প্রেমের দেবতা’। অর্থাৎ মানুষের মনে কাম দেন যে সত্তা। এখানে আমরা যদি ‘কাম-দেব’ এর জন্ম পরিচয় আর শিবের ‘তৃতীয় নয়ন’ এর শানে নুজুল জানতে চাই, তাহলে বেহুলা লখিন্দর কাহিনির বারোটা বেজে যাবে। ‘স্মার্ত’, “শৈব” ‘শাক্ত্‌ ‘বেদ’, ‘পুরান্‌ ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ এখানে মতের-পথের, কিতাবের সীমা-সংখ্যা নাই। এক শিবকে বহু জায়গায় বহুরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এই যে মনসা, তি্নিও প্রথমে সর্বপ্রধান দেবতা শিবের কন্যা ছিলেন না। হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ্যবাদী মূলধারায় মনসা দেবীরূপে স্বীকৃতিলাভ করতে অনেক কাঠখড় পুড়েছে। তার বাবা ছিলেন কশ্যপ। পুরাণ অনুসারে তিনি ঋষি কশ্যপের কন্যা। একদা সর্প ও সরীসৃপগণ পৃথিবীতে কলহ শুরু করলে কশ্যপ তাঁর মন থেকে মনসার জন্ম দেন। ব্রহ্মা তাঁকে সর্প ও সরীসৃপদের দেবী করে দেন। মনসা মন্ত্রবলে বিশ্বের উপর নিজ কর্তৃত্ব স্থাপন করেন। এরপর মনসা শিবের সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করেন। শিব তাঁকে কৃষ্ণ-আরাধনার উপদেশ দেন। মনসা কৃষ্ণের আরাধনা করলে কৃষ্ণ তুষ্ট হয়ে তাঁকে সিদ্ধি প্রদান করেন এবং প্রথামতে তাঁর পূজা করে মর্ত্যলোকে তাঁর দেবীত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কশ্যপ জরুৎকারুর সঙ্গে মনসার বিবাহ দেন। ‘মনসা তাঁর অবাধ্যতা করলে, তিনি মনসাকে ত্যাগ করবেন’, এই শর্তে জরুৎকারু মনসাকে বিবাহ করেন। একদা মনসা দেরী করে তাঁর নিদ্রাভঙ্গ করলে তাঁর পূজায় বিঘ্ন ঘটে। এই অপরাধে জরুৎকারু মনসাকে ত্যাগ করেন। পরে দেবতাদের অনুরোধে তিনি মনসার কাছে ফিরে আসেন এবং আস্তিক নামে তাঁদের একটি পুত্রসন্তান জন্মায়।

আমরা আমাদের কাহিনি মনসা মঙ্গলেই সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করবো, অন্যতায় মহাসমুদ্রে ধ্রুবতারা বিহীন নাবিক, পথ-হারা পথিক হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এক দিকে বিরক্তির সাথে অবাক হয়েছি, দেব-দেবীগণের জন্ম-সৃষ্টি, উত্থান-পতনের একাধিক ধারার বিচিত্র বর্ণনা পেয়ে। অন্য দিকে এ আমাকে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহনে সাহায্য করেছে যে আমি বলবো, কেউ জীবনে যদি মানব প্রজাতির বা জীববিবর্তনের প্রাথমিক শিক্ষা নিতে চায় তাহলে সে যেন ঋদবেগ থেকে মহাভারত একবার ঘুরে আসে। শিবের যত ছিফতি নাম আছে, সবগুলো উল্লেখ করতে গেলে কাহিনি শেষ হতে সাত দিন সাত রাত লেগে যেতে পারে। কয়েকটা পরিচিত নাম যেমন- বিশ্বেশ্বর, বিষমাক্ষ, বীরেশ্বর, বৃষধ্বজ, ভবানীপতি, ভূতনাথ, ভূতপতি, ভূতভাবন, ভূতেশ, ভৈরব, ভোলা, ভোলানাথ, বাণদেব, বাণেশ্বর, বিরূপাক্ষ, বীরেশ্বর, মহাকাল, মহাদেব, মহানট, রুদ্র, মহেশ, মহেশান, মহেশ্বর, কৈলাসপতি, কৈলাসেশ্বর কাশীনাথ, কাশীশ, কাশীশ্বর, কাশীপতি, কুলেশ্বর, বিষকণ্ঠ, রুদ্র, আশুতোষ, পশুপতি ইত্যাদি। মানুষের অসাধ্য এক একটা অসাধারণ অলৌকিক কর্ম সাধনের সাথে এই গুণবাচক নামগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। যেমন; একই সাথে ইনি যখন ভয়ানক তখন রুদ্র, আর যখন কল্যাণকর তখন শিব। মহাকালরূপী রুদ্র সংহারকারক। প্রলয় শেষে ধ্বংসের মধ্য থেকেই তাঁর উৎপত্তি ঘটে। সে কারণে ইনি শিব, শঙ্কর বা ভৈরব নামে চিহ্নিত। জনন শক্তির পরিচায়ক হিসাবে শিবলিঙ্গ। তিনি ধ্বংস ও সৃষ্টি উভয়েরই কারণ তাই তিনি ঈশ্বর। তিনি অল্পে সন্তুষ্ট হন তাই আরেক নাম আশুতোষ। পশুদের অধিপতি বলে পশুপতি নামে খ্যাত। একবার সমুদ্র মন্থনে উত্থিত অমৃত দেবতারা গ্রহণ করার পর, অসুররা পুনরায় তা মন্থন করে। এই অতিরিক্ত মন্থনজনীত কারণে সমুদ্রে হলাহল নামক বিষ উত্থিত হয়। এর ফলে সমগ্র চরাচরের প্রাণীকূল বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। এই বিষ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেবতারা মহাদেবের শরণাপন্ন হলে, মহাদেব উক্ত বিষ শোষণ করেন। বিষের প্রভাবে তাঁর কণ্ঠ নীল বর্ণ ধারণ করেছিল বলে শিব নীলকণ্ঠ নামে পরিচিত হন। আবার হরিবংশ পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী- ‘বিষ্ণু একবার শিবের গলা টিপে ধরেছিলেন। শিব পলায়নে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ তাতে নীল হয়ে যায়’। বৈষ্ণবরা বললেই হলো, আমরা তা মানবো কেন? শিয়া বা সুফীরা আলীকে নবি বলুক আর ইমাম বলুক তাতে সুন্নীদের কী?

শিব নিরপেক্ষ ন্যায় বিচারকারী। পক্ষপাতিত্ব তার ধর্ম নয়, যদিও তার স্ত্রী পার্বতি আর কন্যা মনসা বরাবরই তার উপর পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ইন্দ্রসভায় সকল দেবতাদের সামনেই উত্থাপন করেছেন। শিব একই সাথে পরম করুণাময় আবার কঠিন শাস্তি দানকারী। অর্থাৎ অন্য ভাষায় বললে শিবই খালিক, মালিক, রাহমান ও কাহহার। মর্ত্যবাসী মানুষের মাঝে একই সাথে এই গুণাবলী থাকা অসম্ভব। শিবের স্ত্রী পার্বতীর অন্যান্য রূপ ও নামগুলো হল- সতী, উমা, গঙ্গা, দুর্গা, ললিতা, মহামায়া, চন্ডী, চামুন্ডা, ভগবতী, আদ্যাশক্তি, গৌরী, শক্তি ও কালী।

বলা হয়, শুধু শিবের বীর্য থেকে মাতৃগর্ভ ছাড়াই মনসার জন্ম। ও মা! আগে জানতাম দুনিয়ায় বাইবেলের মাতা ম্যেরির ছাওয়াল যিশুই একমাত্র বাপ-নাই সন্তান। মহাভারতে দেখি এটা কোন সমস্যাই না। এখানে বাপ ছাড়া সন্তান, মা ছাড়া সন্তানের কোনই অভাব নাই। মা ছাড়াই মনসার জন্ম কেমনে হলো? সেই কথাটা একটু পরে বলি, তার আগে শিব ও তার বউ নিয়ে আরো কিছু কথা জেনে নিই। আমরা সর্বদাই শিবলিঙ্গ ও শিবলিঙ্গ-পূজোর কথা শুনি কিন্তু অনেকেই এর পেছনের ইতিহাসটা জানিনা। মহেশ্বর শিবের মনে বাঙ্গালীর আশা, আকাঙ্ক্ষা, ক্ষোভ, দয়া, আবেগ, অনুভুতি, প্রেম-কাম কোন কিছুরই কমতি ছিলনা আজও নেই। তিনি আজও বাঙ্গালীর-মনে-প্রাণে, অন্তরে-মানসে আগের রুপেই বিরাজিত আছেন। এমন কি বাহিরে বাহাদুর আর গৃহে স্ত্রী’সম্মুখে কাতর-অসহায় বাঙ্গালী চরিত্রও তার মাঝে বিদ্যমান। মাঝে মাঝে ব্যতিক্রম যে হয়নি তা নয়। অনেকে বলেন পার্বতী বিনে শিবের কাম বাসনা মোটেই জাগতোনা। কথাটা আসলে পুরোপুরি সত্য কিনা তা আমরা পরে দেখবো।

পার্বতির পিতার নাম ছিল দক্ষ। তিনি জীব-সৃষ্টা দশ প্রজাপতির একজন। দক্ষের কন্যা সতী অর্থাৎ আমাদের পার্বতির সাথে শিবের বিবাহ হয়। সতীর নাম পার্বতি কী ভাবে হলো এর পেছনেও একটি ঘটনা আছে, তা পরে জানা যাবে। শিব তার শ্বশুর দক্ষকে খুব একটা সম্মান দেখাতেন না। জামাতার হেন কান্ডে, শ্বশুর দক্ষ বিরূপ হয়ে উঠেন। সতীর বিবাহের এক বৎসর পর, দক্ষ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। এই যজ্ঞে দক্ষ তার জামাতা মহাদেব (শিব) ও কন্যা সতীকে দাওয়াত দিলেন না। সতী বিষয়টা জানতে পেরে অযাচিতভাবে যজ্ঞে যাবার উদ্যোগ নেন। মহাদেব তাঁর স্ত্রী সতীকে বাধা দেয়ায় সতী ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর মহামায়ার দশটি রূপ প্রদর্শন করে মহাদেবকে বিভ্রান্ত করেন। এই রূপ দশটি ছিল- কালী, তারা, রাজ-রাজেশ্বরী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলামূখী, মাতঙ্গী ও মহালক্ষ্মী। শেষ পর্যন্ত শিব সতীকে তার পিতার যজ্ঞানুষ্ঠানে যাবার অনুমতি প্রদান করেন। কিন্তু যজ্ঞস্থলে পিতা দক্ষ তার মেয়ের সামনেই শিবের নিন্দা করলে- সতী তা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। সতীর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মহাদেব ক্রুদ্ধ হয়ে নিজের জটা ছিন্ন করে ফেলেন। সেই জটা থেকে বীরভদ্র নামক এক শক্তিশালী পুরুষের আবির্ভাব ঘটে। এরপর এই বীরভদ্র মহাদেবের অন্যান্য অনুচরসহ তার আদেশে দক্ষের যজ্ঞানুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে যজ্ঞানুষ্ঠান পণ্ড করে দেন এবং দক্ষের মুণ্ডুচ্ছেদ করেন। শিবের শ্বশুড়ি বীরিণী তার স্বামী দক্ষের মৃত্যুতে আকুল হয়ে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। এরপর ব্রহ্মার অনুরোধে মহেশ্বর শিব, তার শ্বশুর দক্ষের ঘাড়ে একটি ছাগলের মুণ্ডু স্থাপন করেন।

সতীর দেহত্যাগের পর, স্ত্রী শোকে কাতর ভোলানাথ শিব তাঁর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডবনৃত্য শুরু করেন। এর ফলে সৃষ্টি ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হলে, বিষ্ণু তাঁর চক্র দ্বারা সতীদেহকে একান্নভাগে বিভক্ত করে দেন। এই একান্নটি খণ্ড ভারতের বিভিন্নস্থানে পতিত হয়। পতিত প্রতিটি খণ্ড থেকে এক একটি মহাপীঠ উৎপন্ন হয়। সতীর দেহাংশ যে সকল স্থানে পতিত হয়েছিল, মহাদেব সেখানে লিঙ্গরূপে অধিষ্ঠিত হলেন। বিশেষ করে সতীর মস্তিষ্ক পতিতস্থানে শিব শোকাহত অবস্থায় উপবেশন করেন। এই সময় দেবতারা সেখানে উপস্থিত হলে- শিব লজ্জায় প্রস্তর-লিঙ্গে পরিণত হন। পরে দেবতারা এই লিঙ্গরূপী মহাদেবকে পূজা করতে থাকেন। হিন্দু পুরাণে মহাদেবের এই লিঙ্গপ্রতীক শিবলিঙ্গ নামে পরিচিত। সতীর পূনর্জনম হয় হিমালয়ের গৃহে। এর পর থেকে সতীর বিবর্তনীয় নাম হয় পার্বতি।

শিবের মুখ থেকে শুনলাম, বেহুলা আর লখিন্দরের আসল নাম যথাক্রমে ঊষা আর অনিরুদ্ধ

চলবে-

২য় পর্ব-

[1227 বার পঠিত]