বিবর্তন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। আমাদের দৈনন্দিন পর্যবেক্ষণ থেকে এটুকু আমরা বুঝতে পারি, যেকোনো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াই কম-বেশী এলোমেলো (বিক্ষিপ্ত) এবং নিয়ন্ত্রনহীন। সেকারনে ঝড়ের গতিপথ কথনো সরলরৈখিক হয় না কিংবা নির্দিষ্ট্য জ্যামিতিক আকৃতির কোনো প্রাকৃতিক জলাভূমিও পাওয়া যাবে না। বিবর্তন যেহেতু একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সেহেতু এই প্রক্রিয়াটিও এলোমেলোভাবে বা বিক্ষিপ্তভাবে হবে এটাই স্বাভাবিক এবং বাস্তবতাও সেটাই। বিবর্তন পুরোপুরিই একটি বিক্ষিপ্ত প্রক্রিয়া।

এখানে প্রশ্ন হতে পারে, বিবর্তন যদি বিক্ষিপ্ত বা এলোমেলো প্রক্রিয়া হয় তাহলে আমাদের শরীর এতো নিখুঁত, এতো সুগঠিত হলো কি করে?এর প্রথম উত্তর হল: প্রাকৃতিক নির্বাচন। প্রকৃতিতে কেবল যোগ্যরাই টিকে থাকে এবং অযোগ্যরা বিলুপ্ত হয়ে যায়। আদি এককোষী ব্যক্টেরিয়ার বংশধরদের মধ্যে যাদের শরীর অন্তত এতটুকু নিখুঁত যে সে অন্তত নতুন বংশধর তৈরি হওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবে সে-ই প্রজাতিটিই কিন্তু টিকে যাবে (কারন সে নতুন কয়েকজনকে রেখে মারা গেল; এরাও একইভাবে কয়েকজনকে রেখে মারা যাবে)। নতুন বংশধরের মধ্যে আবার বিবর্তন প্রক্রিয়ায় নতুন বৈশিষ্ট্যের বংশধরের সৃষ্টি হবে এবং এদের মধ্যে যাদের বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবেশের সাপেক্ষে বেশি নিখুঁত হবে তারাই টিকে থাকবে। এই প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি বছরের ক্রমাগত বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের উদ্ভব হয়েছে এবং বলা বাহুল্য মানুষের শরীরও নিখুঁত নয়। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের বিবর্তনঘটিত বিভিন্ন সমস্যার মুল্য দিয়ে চলেছি। তবে এরপরও প্রজাতি হিসেবে আমরা টিকে আছি কারন আমাদের দৈহিত খুঁতগুলো আমাদের টিকে থাকার জন্য এখনো হুমকি হয়ে ওঠে নি। আমাদের দৈহিক খুঁতগুলো যদি এমন কঠোর হতো যে আমারা আমাদের সন্তান জন্মদানের আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি তাহলে আমাদের প্রজাতিটি টিকে থাকতো না। তবে এমন নিশ্চয়ই হয়েছে বিবর্তনের ধারায় কোন প্রাণীর খুঁত অত্যন্ত বেশী হয়ে গেছে ফলে তারা তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারে নি। আজ মানবদেহের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ননা করব যেগুলো বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায় মানুষ পুর্বপুরুষের কাছ থেকে বহন করে চলেছে এবং মানুষ যদি কোনো বুদ্ধিমান সত্ত্বার কাছ থেকে সরাসরি সৃষ্টি হতো তাহলে এই খুঁতগুলো থাকত না।

গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাওয়া: শীতের প্রভাবে, রেগে গেলে কিংবা ভয় পেলে আমাদের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। যেহেতু মানুষের অধিকাংশ লোম বিবর্তনের ধারায় ঝরে পড়েছে তাই মানবদেহে লোম দাঁড়িয়ে যাওয়ার কোনো তাৎপর্য নেই কিন্তু মানুষের পূর্বপুরুষদের এই বৈশিষ্ট্যটি বিশেষ অর্থবহ ছিলো। শীতের সময় গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেলে লোমের ফাঁকে বাতাস আটকে শরীরকে তাপনিরোধক করা সম্ভব ফলে শীতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এছাড়া শিকারের সময় কিংবা শিকারী তাড়া করার সময় গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় এর ফলে প্রাণীটিকে তুলনামূলকভাবে বড় মনে হয় যা তাকে অন্য প্রাণীর সাথে মোকাবেলায় কিছুটা সুবিধা দান করে। আপনারা মোরগের লাড়াই লক্ষ করলে এটা ভালো বুঝতে পারবেন।


হেঁচকি ওঠা:
আমাদের ফুসফুসের নিচে ডায়াফ্রাম নামক একটি অঙ্গ আছে, যার পেশীর নাড়া-চাড়ার মাধ্যমে আমরা শ্বাঁস-প্রশ্বাস নিই। কিছু স্নায়ুর মাধ্যমে এই পেশীর নড়া-চড়া নিয়ন্ত্রিত হয়। হেঁচকি আসলে এই ডায়াফ্রামটিরই অত্যাধিক দ্রুত নড়া-চড়া করার ফসল। খুব দ্রুত খাবার খেতে থাকলে কিংবা অতিরিক্ত পরিমানে খাবার খেলে আমাদের হেঁচকি উঠতে পারে। মানুষের জীবনে হেঁচকি ওঠার খুব বেশী প্রয়োজন নেই। তারপরও হেঁচকি ওঠে এবং একবার হেঁচকি ওঠা শুরু হলে অনেক সময় সহজে থামতে চায় না। হেঁচকি এমনকি বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হতে পারে। হেঁচকির উপরের আমারদের সরাসরি নিয়ন্ত্রন নেই এবং এটা আমাদের জন্য খুব একটা প্রয়োজনীয়ও নয়। তাহলে এই অপ্রয়োজনীয় কাজটি আমাদের কেন করতে হয়? কারনটা বিবর্তন ঘটিত। হেঁচকি অবশ্য এই অংশের প্রধান আলোচ্য বিষয় নয়, আলোচ্য বিষয়টি হলো ডায়াফ্রামের পেশীনিয়ন্ত্রনকারী স্নায়ুগুলো স্পাইনাল কর্ডের যে অংশ থেকে বের হয়েছে সেটা হল গলার কাছাকাছি। এই অংশথেকে বের হয়ে স্নায়ুরজ্জুগুলো বিভিন্ন ভাবে প্যাঁচ দিয়ে তারপরে ডায়াফ্রামে গিয়ে ঢুকেছে। ছবিতে দেখুন, ৩, ৪ এবং ৫ নম্বর কশেরুকার থেকে স্নায়ুগুলো বের হয়েছে।

এটা অত্যন্ত অদক্ষ একটি ব্যবস্থা। কেননা এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার জন্য একে অনেক সেনসেটিভ অংশের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে যা ঝুঁকিপুর্ন তাছাড়া এতে শক্তির অপচয়ও হয়। এই কারনে বুকে আঘাত লাগলে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়। স্নায়ুরজ্জুগুলোর জন্য সবচেয়ে এফিশিয়েন্ট হত যদি এগুলো মেরুদন্ডের মাঝামাঝি থেকে বের হয়ে ডায়াফ্রামের মধ্যে ঢুকত। কিন্তু বিবর্তনের মাধ্যমে এই বৈশিষ্ট্যটিকে ব্যখ্যা করা যায়। এটা বোঝার জন্য আমাদেরকে বিবর্তনের ধারায় পিছিয়ে গিয়ে মাছ পর্যন্ত যেতে হবে। মাছের শরীরে এই স্নায়ুগুলো কানকো নড়াচড়ার জন্য ব্যাবহৃত হয় এবং মাছের কানকো থাকে ঘাড়ের কাছাকাছি। ফলে মাছের জন্য ঘাড়ের কাছ থেকেই এই স্নায়ুগুলো বের হওয়া সবচেয়ে দক্ষ ডিজাইন। ক্রমে মাছের বিবর্তন ঘটে যখন উভচর হল, তখন তাদের ফুসফুস গঠিত হল। কিন্তু যেহেতু তারা উভচর, তাদের জীবনের বেশ বড় একটা অংশ পানিতেই কাটত(এখনো কাটে)। ফলে, পানি যাতে ফুসফুসে ঢুকে না যায়, তার একটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা হল হেঁচকি। উভচরের ক্ষেত্রে হেঁচকি আরো দীর্ঘ সময়ের প্রক্রিয়া এবং এটা তাদেরকে গভীর পানিতেও ফুসফুসে পানি ঢোকার হাত থেকে রক্ষা করে। উভচর যখন হেঁচকির বৈশিষ্ট্য প্রাপ্ত হল তারপরই এদের একাংশ স্তন্যপায়ীতে পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হল। বলা বাহুল্য স্নায়ুগুলো মাছের মধ্যে যখন একবার ঘাড়ের কাছ থেকে বের হয়ে গেছে এরপর এদের আর ভেতরে ঢোকার সুযোগ হয় নি এবং স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রে ডায়াফ্রাম যেহেতু নিচে নেমে গেছে এদেরকে ওখান থেকেই বের হয়ে নিচে নেমে আসতে হয়েছে। এই আসার পথে তারা সরাসরি না এসে ঘুর পথে এগিয়েছে, পাক দিয়ে এগিয়েছে কেননা বিবর্তনে কেউ হাতে ধরে ডিজাইন করে না। এটা একটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া আর যেকোনো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াই এলোমেলোভাবে সম্পাদিত হয়।

কানের অতিরিক্ত পেশি এবং ডারউইন’স পয়েন্ট: বেশকিছু প্রানী কানের বহিরাংশ নাড়াতে পারে। কান নাড়ানোর মাধ্যমে তারা মাথা না নাড়িয়েও শব্দের উৎসের প্রতি আরো বেশী মনোযোগ দিতে পারে। এই কাজে তাদের সাহায্য করে কানের তিন পাশে অবস্থিত বেশ কিছু পেশি। কিন্তু মানুষ যদিও কান নাড়তে পারে না তথাপি কানের এই পেশিগুলো এখনো মানুষের মাঝে বিদ্যমান (ছবিতে দেখুন)।

এছাড়া ডারউইন’স পয়েন্ট নামের আরেকটি অংশ কানের বহির্ভাগে রয়ে গেছে যা অন্যান্য প্রাণীদের শব্দের উৎসের প্রতি মনোযোগ দিতে সাহায্য করে। বলা বাহুল্য এটিও মানুষের কোনো কাজে আসে না।

পুরুষের স্তনের বোঁটা: পুরুষের শরীরে স্তনের বোঁটা কি কাজে আসে বলতে পারেন কি?

অ্যাপেনডিক্স: দীর্ঘদিন ধরে মানুষ শরীরে এপেনডিক্সের কোন কাজ খুঁজে পায় নি (তেমন কোনো কাজ নেই বলেই)। এটা শরীরের জন্য একটা উৎপাত বিশেষ এবং মাঝে মাঝেই আমাদের অ্যাপেন্ডিসাইটিসে ভুগে একে শরীর থেকে বের করে দিতে হয়। কাজ নেই বলে এবং বৃহদান্তের একমাথায় বাড়তি অংশ হিসেবে থাকে বলে একে অ্যাপেনডিক্স বলা হয়।(অ্যাপেনডিক্স হল বাড়তি অংশ, ডিকশনারীতে যেমন বাড়তি অংশ হিসেবে অ্যাপেনডিক্স থাকে)। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় এবং অন্যান্য প্রাণীর উপর গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন, এপেনডিক্স আসলে সেলুলোজ হজমে সহায়তা করে। যেহেতু বিবর্তনের ধারায় মানুষের শরীরে সেলুলোজ হজম করার এনজাইম উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে এবং মানুষ এখন আর সেলুলোজ হজম করে না, তথাপি পুর্বপুরুষের স্মৃতিস্বরুপ এখনো এটি মানুষের শরীরে রয়ে গেছে।


হার্নিয়া সমস্যা:
ব্রিটেনে প্রতি চারজন পুরুষের একজন হার্নিয়ায় আক্রান্ত হয়। হার্নিয়া সাধারণত তলপেটের একটা সমস্যা এবং এতে আক্রান্ত হলে শুক্রাশয়ের বা বৃহদান্তের একটা অংশ স্ফীত হয়ে আবরণের বাইরে চলে যায় এবং তলপেটে সমস্যা সৃষ্টি করে। এটাও একটা বিবর্তন ঘটিত সমস্যা। এই জন্য আবার আমাদের মাছের দিকে ফিরে যেতে হবে। মাছের প্রজননতন্ত্র যকৃতের নিচেই অবস্থান করে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এটা অনেকটা নীচে নেমে এসেছে। ভ্রুনাবস্থায় কিন্তু এই অংশটা যকৃতের কাছাকাছিই থাকে। কিন্তু পুর্নাঙ্গ হওয়ার সময় আস্তে নিচের দিকে নেমে যায় যার ফলে এর সাথে কিছু কিছু টিস্যু জড়িয়ে যায়।

হাঁটু:
মানুষের হাঁটু এখনো শরীরের ভার বহন করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নয় এবং একটু বয়স হয়ে গেলেই হাঁটা-চলায় সমস্যা দেখা দেয়। মানুষ ছাড়াও চতুষ্পদ জন্তুর ক্ষেত্রেও এই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। সাঁতারের উপযোগী অঙ্গের বিবর্তন থেকে পায়ের সৃষ্টি হয়েছে বলেই এই সমস্যা।

তৃতীয় চোখের পাতা বা nictitating membrane: উভচর কিংবা পাখির চোখে nictitating membrane নামক এক ধরনের পাতলা পর্দা থাকে। একটা স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিরল কিন্তু মানুষের চোখে এখনো এর অবশেষ রয়ে গেছে। চোখের দিকে ভালো করে তাকালে তৃতীয় এই পাতা দেখা যায়।

মানব-মস্তিষ্ক: মানব মস্তিষ্ক নিয়ে আমাদের অনেকের মাঝেই একধরনের গর্ববোধ আছে। তবে মানব মস্তিষ্ক যে মোটেই ইন্টেলিজেন্ট কোনো ডিজাইন নয় তার ধারনা পাবেন অভিজিৎ রায়ের এই লেখা থেকে

উপরে আলোচিত বিভিন্ন সমস্যা ছাড়াও, বহু মরাত্মক রোগ যথা: ক্যন্সার, বহুমূত্র, উচ্চরক্তচাপ, হিমোফিলিয়া, সিকলসেল ডিজিজ (এই রোগ হলে মানুষের লোহিত রক্ষা কণিকা স্বাভাবিক আকার ছেড়ে কাস্তের মত সরু হয়ে যায়) সহ আরো অনেক রোগ বিবর্তনের কারনেরই ঘটে।

[496 বার পঠিত]