সায়েন্টিফিক গণনার প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডা বায়রনের জন্ম লন্ডনে। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। অগাস্টা অ্যাডা বায়রন [Ada Byron] ছিলেন রোমান্টিক কবি লর্ড বায়রন ও অ্যানে ইসাবেলে মিলব্যাংকের কন্যা। ১৮১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন পৃথিবীর এই প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে পরিচিত এ নারী গণিতবিদ। কিন্তু অ্যাডার জন্মের ঠিক এক মাস পর এই দম্পতি পৃথক হয়ে যান। আর জন্মের মাত্র চার মাস পর লর্ড বায়রন চিরকালের জন্য ইংল্যান্ড ছেড়ে চলে যান। অ্যাডার কখনও বাবার সঙ্গে দেখা হয়নি। ১৮২৩ সালে অ্যাডার বাবা গ্রিসে মারা যান। তার মা লেডি বায়রনই তাকে বড় করে তোলেন। তার পুরো নাম ছিল অ্যাডা অগাস্টা কিং, আর ডাকা হতো কাউন্টেস অব লাভলেস বা শুধুই অ্যাডা লাভলেস নামে। অ্যাডা মাত্র ৩৬ বছর বেঁচে ছিলেন। ১৮৫২ সালের ২৭ নভেম্বর জরায়ুর ক্যান্সার এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।
তার জীবন আবেগ ও যুক্তি, কবিতা ও গণিতশাস্ত্র এবং অসুস্থ স্বাস্থ্য ও শক্তি ক্ষরণের মধ্যকার সংগ্রামে মহিমান্বিত। মা লেডি বায়রন কোনোভাবেই চাননি তার মেয়ে বাবার মতো কাব্যিক হোক। তিনি চেয়েছিলেন অ্যাডা গণিত ও সঙ্গীত শিক্ষায় বড় হোক, যাতে বিপদজনক কাব্যিক প্রবণতাকে প্রতিরোধ করা যায়। কিন্তু অ্যাডার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সেই ঐতিহ্য ১৮২৮ সালের দিকেই প্রকাশ পায়। সেই সময় তিনিই ফ্লাইং মেশিনের নকশা প্রণয়ন করছিলেন। গণিতশাস্ত্র তার জীবনকে দিয়েছিল উড়ে চলার গতি।
১৭ বছর বয়সে [১৮৩২] তার গাণিতিক প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। ছেলেবেলা থেকেই মা তাকে গণিতে দক্ষ করে তুলতে চাইতেন যাতে বাবার প্রভাব কোনোভাবেই মেয়ের মধ্যে প্রতিফলিত না হয়। ১৮৪১ সালের আগে অ্যাডা জানতেনই না লর্ড বায়রন তার বাবা। গণিতজ্ঞ ও যুক্তিবিদ ডি-মরগান তার শিক্ষক ছিলেন! স্যার চার্লস ডিকেন্স, চার্লস হুইটস্টোন এবং বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডের সঙ্গেও তার জানাশোনা ছিল। ১৮৩৩ সালের ৫ জুন তার সঙ্গে পরিচয় হয় স্যার চার্লস ব্যাবেজের। চার্লস ব্যাবেজের সঙ্গে তার বেশ ঘনিষ্ঠ এবং রোমান্টিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। ব্যাবেজ অ্যাডার অসাধারণ ধীরশক্তি, সাবলীল লেখনি এবং প্রতিভায় মুগ্ধ ছিলেন। ব্যাবেজ অ্যাডা সম্পর্কে নিজের লেখায় অ্যাডাকে ‘সংখ্যার জাদুকর’ উপাধিতে আখ্যা দিয়েছিলেন। পরে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, আধুনিক কম্পিউটারের জনক চার্লস একটি ডিফারেন্সিয়াল যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। যার উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন সংখ্যার ঘাত গণনা করা অর্থাৎ কোনো সংখ্যাকে সেই সংখ্যা দিয়ে একবার, দু’বার, তিনবার, চারবার গুণ করলে যে ফল হয় তা বের করা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই বিয়োগযন্ত্র বানানোর সময় আরেকটি নতুন যন্ত্র বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। এই যন্ত্রই তাকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। এর নাম তিনি দিয়েছিলেন অ্যানালাইটিক্যাল ইঞ্জিন বা বিশ্লেষণী যন্ত্র। স্যার চার্লস উইলিয়াম ব্যাবেজ যখন তার ডিফারেন্স মেশিন বা অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন নামক কম্পিউটার আবিষ্কারের নেশায় মত্ত, তখন অ্যাডা তার গণিতবিষয়ক বিশ্লেষণী ক্ষমতার দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন এই কম্পিউটারগুলোর নাম্বার ক্রাঞ্চিংয়ের অমিত সম্ভাবনা সম্পর্কে। চার্লস ব্যাবেজ তাই লিখে গেছেন তার decline of Science in England বইয়ে। এই অসামান্যা নারীর সম্ভাবনাময় ধারণাগুলো চার্লস ব্যাবেজের কাজকে আরও বেগবান করেছিল। চার্লস ব্যাবেজের কল্পিত এই যন্ত্রে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটারের অনেকগুণই উপস্থিত ছিল। সৌভাগ্যের ব্যাপার, ব্যাবেজের অনেক ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কবি কন্যা অ্যাডা বায়রন। অ্যাডা বায়রন এই যন্ত্রের কর্মসূচি বা প্রোগ্রাম করেছিলেন। তাই তাকে পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামার বলা হয়।
গত ২৭ নভেম্বর ছিল তার ১৬০তম মৃত্যুবার্ষিকী। আর গত ১০ ডিসম্বের ছিল বিশ্বের এই প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামারের ১৯৭ তম জন্মবার্ষিকী। কম্পিউটারের বিবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদান স্মরণ করেই গুগলও একটি বিশেষ ডুডল তৈরি করেছিল। তাই গুগলকে সাধুবাদ। আজ সময়রে ব্যবধানে তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তির এই যুগে আধুনিক কম্পিউটার থেকে ল্যাপটপ এসেছে, এসেছে আরো সহজে ব্যবহারযোগ্য অতি ক্ষুদ্রতম কম্পিউটার। সুদুর প্রসারী এই সুবিধা ও ফলাফল প্রাপ্তিস্বরূপ আসুন আমরাও গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এই প্রতিভাময়ী বিজ্ঞানীকে। এবং লিঙ্গ বৈষম্যের সমস্যা থেকে নিজেরা মুক্ত হই।

রচনা: ২০১০
ডিসকাশন প্রজেক্ট

[210 বার পঠিত]