মীজান রহমান পেশায় গণিতবিদ। শুধু গণিতবিদ বললে ভুল হবে, বাংলাদেশের যে কয়জন একাডেমিয়ার সাথে যুক্ত শিক্ষাবিদ আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন, বাংলাদেশকে পরিচিত করতে পেরেছেন দর্পভরে বিশ্বের অঙ্গনে, তার মধ্যে মীজান রহমান অন্যতম। সেই ১৯৬৫ সালে কানাডার অটোয়াস্থ কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগ দিয়েছিলেন, সেখানে একটানা তেত্রিশ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের গণিতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা শিক্ষকের সম্মান সহ বহু সম্মানেই তিনি ভূষিত হয়েছেন। শুধু শিক্ষক হিসেবে তিনি খ্যাতিমান তা নন, শিক্ষায়তনে সাফল্য পেতে হলে যা যা দরকার, সবই তাঁর ঝুলিতে আছে। গণিতের বিখ্যাত জার্নালগুলোতে খুঁজলেই যে কেউ পাবেন তাঁর অসংখ্য গবেষণাপত্রের হদিস, পাশাপাশি কিছুদিন আগে গণিত শাস্ত্রের পণ্ডিত জর্জ গ্যাসপারের সাথে লিখেছেন মহামূল্যবান একটি পাঠ্যপুস্তক ‘বেসিক হাইপারজিওমেট্রিক সিরিজ’  (১৯৯০) শিরোনামে, যেটা প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়েই গণিতের ছাত্রদের জন্য অবশ্যপঠিত পুস্তক হিসেবে বিবেচিত। তিনি বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অধ্যাপক প্রফেসর আলবার্তো গ্রুনবাম এবং নেদারল্যাণ্ডের গণিতবিদ এরিখ কোয়েলিংক প্রমুখের সাথেও গণিত বিষয়ক বহু গবেষণা করেছেন। গণিতে তার অবদান এতটাই বিস্তৃত যে ১৯৯৮ সালে কানাডার ওই বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার পরেও তাঁকে ‘এমিরিটাস অধ্যাপক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। যারা ‘এমিরিটাস’ শব্দার্থটির সাথে পরিচিত নন, তাদের কানে কানে জানাই – এমিরিটাস অধ্যাপক হবার ব্যাপারটি খুব বিরল সম্মানের, যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্যই। এঁরা অবসর নেবার পরেও যে কোন জায়গায় নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে পরিচিত করতে পারেন, আজীবন ধরেই। গণিত বিষয়ে বাংলাদেশের জীবন্ত কিংবদন্তির তালিকা কেউ কোনদিন বানাতে বসলে  মীজান রহমানকে বাদ দিয়ে সেটা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

মীজান রহমানঅধ্যাপক মীজান রহমান

কিন্তু গণিতের কাঠখোট্টা জগতের বাইরেও তার আরেকটা পরিচিতি আছে। তিনি সুসাহিত্যিক। তার প্রথমদিককার উপন্যাস ‘লাল নদী’ (২০০১) পড়ে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম, আলোড়িত হয়েছিলাম, সহসা আবিষ্কার করেছিলাম এক সমাজ সচেতন প্রগতিশীল সুলেখকের প্রতিচ্ছবিকে। পরে জেনেছি এই নিভৃতচারী লেখকের এই একটি নয়, একগাদা ভাল ভাল বই আছে। তার মধ্যে রয়েছে ‘তীর্থ আমার গ্রাম, ‘প্রসঙ্গ নারী’,  ‘অ্যালবাম’, ‘অনন্যা আমার দেশ’, ‘আনন্দ নিকেতন’, ‘দুর্যোগের পূর্বাভাষ’, ভাবনার আত্মকথন’, ‘শুধু মাটি নয়’ প্রভৃতি। সে সময় লজ্জিতই হয়েছিলাম তার বইয়ের সাথে আগে পরিচিত না হওয়ায়। এর পরে যখনই সুযোগ পেয়েছি মীজান রহমানকে পড়বার চেষ্টা করেছি, নিজ উদ্যোগেই। এক ধরণের দায়িত্ববোধ থেকেই। বলা বাহুল্য, তাঁর লেখা পড়ে কখনোই হতাশ হইনি, বরং আলোকিত হয়েছি নানাভাবে। ভাল লাগা আরো বেড়েছে পরবর্তীতে যখন জানলাম তিনি একজন ধর্মমোহমুক্ত সত্যিকার মুক্তমনা মানুষ, একজন মানবতাবাদী। শুধু তাই নয়, দর্শনের জগতে আমরা যাদের ‘স্কেপ্টিক’ বলি, মীজান রহমান সেই গোত্রভুক্ত। সে অনুভূতি আমার আরো দৃঢ় হয়েছে পরবর্তীতে তার মুক্তমনা ব্লগে প্রকাশিত লেখাগুলো পড়ে। তিনি ধর্মগ্রন্থের বানীগুলোকে কেবল নিনির্মেষ স্তব করেন না, বরং সময় সময় প্রকৃত অনুসন্ধিৎসু বিজ্ঞানীদের মতো ক্রিটিকালি দেখতে চান। তাই তিনি শমশের আলী আর জাকির নায়েকদের মত কোরানের আয়াতে বিগ ব্যাং খুঁজে পাননা, বরং ঈশ্বর নির্দেশিত ধর্মগ্রন্থগুলোতে আবিষ্কার করেন অপবিজ্ঞান, কুসংস্কার, অসাম্য আর নিপীড়নের দীর্ঘদেহী করাল ছায়া।  মুক্তমনা সাইটে রাখা তাঁর ব্লগের  ‘ইনশাল্লাহ’,  ‘কোথায় স্বাধীনতা’, ‘হতবুদ্ধি, হতবাক’ কিংবা ‘আউট অব্ কন্টেক্সট’ শিরোনামের প্রবন্ধগুলো পড়লেই মীজান রহমানের প্রগতিশীল দার্শনিক অভিজ্ঞার সন্ধান পাবেন পাঠকেরা[1]

মীজান রহমান এ বছর (২০১২) একটি বই লিখেছেন, ‘শূন্য’ নামে। বইটি প্রকাশিত হয়েছে শুদ্ধস্বর থেকে। বইটাকে ঘিরে প্রথম থেকেই আমার একটা বাড়তি আকর্ষণ ছিল। বহুদিন পর দেশে বইমেলায় গিয়ে বিভিন্ন স্টল ঘুরে প্রথম যে বইটি কিনেছিলাম সেটি হল মীজান রহমানের শূন্য। এর কারণ ছিল। প্রধানত: তিনি গণিতবিদ হবার পরেও এর আগে গণিতের কোন বিষয় নিয়ে বাংলায় লেখেননি। আমার জানামতে এই বইটিই প্রথম। আর তিনি লিখলেন তো লিখলেন এমন এক বিষয় নিয়ে যেটি  গণিতের সবচাইতে বড় গোলক ধাঁধার একটি – ‘শূন্য’।  এই সেই শূন্য – যার অভিব্যক্তিতে শুধু গণিতবিদেরা নন, যুগে যুগে আপ্লুত হয়েছেন, আচ্ছন্ন হয়েছেন, কখনোবা উন্মাদ হয়ে গেছেন ধার্মিকেরা, দার্শনিকেরা, এবং বিজ্ঞানীরাও। শুধু পুরাতন গবেষকদের ক্ষেত্রে নয়, কোয়ান্টাম জগতের শূন্যতা এখনো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীদের জন্য এক মূর্তিমান রহস্যের আঁধার, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি রহস্য উদঘাটনের স্বপ্নের জীয়নকাঠি।  তাই শূন্য ব্যাপারটা যেন চির-পুরাতন হয়েও যেন চিরনবীন।

দ্বিতীয় কারণটি ব্যক্তিগত।  বলতে দ্বিধা নেই অন্য সবার মত শূন্যতার ব্যাপারটি আমাকেও আচ্ছন্ন করে পুরোদমে। তার বহিঃপ্রকাশ হয়তো পাঠকেরা লক্ষ্য করেছেন আমার বেশকিছু লেখালেখিতে। তবে সেই শূন্যতা ঠিক গণিতবিদের শূন্যতা নয়, আমার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল মূলতঃ পদার্থবিজ্ঞানের শূন্যতা।  এই ব্যাপারটি আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণার সজীব একটি ক্ষেত্র। স্টিফেন হকিং, স্টিফেন ওয়েনবার্গ, অ্যালেন গুথ, আঁদ্রে লিণ্ডে, আলেকজাণ্ডার ভিলেঙ্কিন এবং লরেন্স ক্রাউস সহ মূলধারার প্রায় সকল পদার্থবিজ্ঞানীরা আজ মনে করেন, আধুনিক স্ফীতিতত্ত্ব অনুযায়ী  কোয়ান্টাম স্তরে শূন্যতার মধ্য দিয়ে এক সময় মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল, কিংবা নিদেন পক্ষে ব্যাপারটা অসম্ভব কিছু নয়।  এ নিয়ে আমি বেশ কিছু লেখা লিখেছি বাংলায়। আমার প্রথম বই ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ (২০০৫) বইটিতে শূন্য থেকে কিভাবে জড় কণিকার উৎপত্তি হতে পারে তা নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করেছিলাম। এ সংক্রান্ত আলোচনা আছে রায়হান আবীরের সাথে লেখা অবিশ্বাসের দর্শন (২০১১) এবং সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বিশ্বাস ও বিজ্ঞান’ (২০১২) বইটিতেও। এর বাইরে ব্লগে তো বেশ কিছু লেখা আছেই।   বিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউসের ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ (Universe from Nothing) বইটির[2] রিভিউ করতে গিয়ে  ব্লগে এ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম সম্প্রতি[3]। শূন্যতার ব্যাপারটি উঠে এসেছিল সেখানেও, বিদগ্ধ পাঠক এবং লেখকদের পক্ষে বিপক্ষে প্রাণবন্ত  আলোচনা লেখাটিকে দিয়েছিল ভিন্ন মাত্রা। তবে সে সব আলোচনার বেশিরভাগই ছিল আধুনিক পদার্থবিদ্যার দৃষ্টিকোন থেকে উঠে আসা আলোচনা। একজন গণিতবিদ শূন্য ব্যাপারটাকে ঠিক কিভাবে দেখেন তা নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল সব সময়ই।  বলতে দ্বিধা নেই,  মীজান রহমানের এই বইটি আমার কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করেছে খুব ভাল ভাবেই।

 

শূন্য - মীজান রহমান

শূন্য সংখ্যাটা আমাদের কাছে এখন এতোই স্বাভাবিক যে এখন প্রাইমারি স্কুলের ছেলেপিলেদের শূন্য সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে হেসে গড়িয়ে পড়বে।  একদিন কিন্তু তা এরকম ‘জলবৎ তরলং’ ছিল না। আসলে শূন্য বলে কোন কিছু আমাদের সংখ্যার সাম্রাজ্যে ছিলই না। ব্যাপারটা যে অস্বাভাবিক তাও নয় কিন্তু। এমন তো নয় যে প্রাত্যহিক জীবনে এর বিশাল কোন ব্যবহার আছে। জমি জমা কিংবা সন্তান সন্ততির হিসেব রাখতেই হোক, কিংবা হোক না বিয়ারের ক্যান খালি করতে, কিংবা বাজার থেকে কলা কিনতে – কেউ শূন্যের ঝামেলায় যায় না; যেতে হয় না।   মীজান রহমান ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করছেন তার বইয়ে এভাবে (পৃষ্ঠা ৭) –

প্রাত্যহিক জীবনের ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে-সংখ্যাটির কখনো প্রয়োজন বোধ করেনি কেউ (এবং সাধারণভাবে, এখনও করেনা), সেটা হল ‘শূন্য’। ক্ষেতের চাষীকে কখনো ‘শূন্য’ সংখ্যক বীজ বপন করতে হয়না, ‘শূন্য’ গরুর দুধ দোয়াতে হয়না, ‘শূন্য’ সন্তানের মৃত্যুতে কাতর হতে হয়না। এমনকি ১ এর ডানপাশে একটা শূন্য বসালে যে দস্তুরমত একটা পূর্ণসংখ্যা দাঁড়িয়ে যায় সে বোধটুকু উদয় হতে অনেক, অনেক যুগ অপেক্ষা করতে হয়েছিল মানুষকে।

তাহলে শূন্য সংখ্যাটির প্রয়োজনীয়তা  বুঝল কখন মানুষ? এর কিন্তু খুব সুন্দর একটা নান্দনিক ইতিহাস আছে। আমার বুক শেলফে চার্লস সেইফির একটা চমৎকার ইংরেজিতে লেখা বই আছে নাম ‘Zero: The Biography of a Dangerous Idea’[4]। আমি মাঝে মধ্যেই বইটা উল্টে পাল্টে দেখি। সেইফির বইটিতে শূন্যের একটা ধারাবাহিক ইতিহাস পাওয়া যায়।  কেন শূন্য ব্যাপারটা খুব রহস্যময়, কিভাবে শূন্যের ধারনা নিয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি রীতিমত ভীত থাকত, কিংবা করতো প্রাণপণ বিরোধিতা, এবং শেষ পর্যন্ত কিভাবে শূন্যের ধারণাকে মানুষ মেনে নিতে বাধ্য হল, তার একটা পর্যায়ক্রমিক এবং আকর্ষণীয় বর্ণনা পাওয়া যায় বইটিতে।  শুধু তাই নয় শূন্য এবং অসীম যে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত পরস্পরের সাথে, তাও জানা যায় সেইফির বইটি থেকে। সেইফি লেখেন –

Zero is powerful because it is infinity’s twin. They are equal and opposite, yin and yang. They are equally paradoxical and troubling.

শূন্য এবং অসীমত্ব নিয়ে মীজান রহমানের উপলব্ধিও প্রায় একই রকমের। তাই তিনি বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন –

‘শূন্য ও অসীম – একই সাথে পরস্পরের প্রতিচ্ছবি এবং প্রতিপক্ষ। দুয়েতে মিলে রচনা করেছে সংসারের গূঢ়তম রহস্য’।

শূন্য বইটির ভিতরে ঢুকলেও বিভিন্ন অংশে আমরা একই ধরণের অভিব্যক্তির সন্ধান পাই। যেমন প্রথম পরিচ্ছদের শেষে  (পৃষ্ঠা ৬)  –

‘শূন্য আর অসীম, এরা একে অন্যের যমজ। যেখানে শূন্য সেখানেই সীমাহীনতা। দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভাবলে যেখানে কিছু নেই সেখানেই সবকিছু। শূন্য দ্বারা বৃহত্‌কে পূরণ করুন, বৃহত্‌ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এই একই শূন্য দ্বারা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রকে ভাগ করুন, ক্ষুদ্র অসীমের অঙ্গধারণ করবে। শূন্য সবকিছু শুষে নিয়ে অসীমের দরবারে পাঠিয়ে দেয়’।

ব্যাপারটা মিথ্যে নয়। শূন্য সংখ্যাটি অন্য সব সংখ্যার মত নয় আমরা জানি। যে কোন সংখ্যাকে নিজের সাথে যোগ করলে সংখ্যার মান বাড়ে। যেমন ১ কে ১ এর সাথে যোগ দিলে আমরা পাই ২।  ২ এর সাথে ২  যোগ করলে আমরা পাই ৪ ।  কিন্তু শূন্যকে শূন্যের সাথে যোগ দিলে কেবল শূন্যই পাওয়া যায়।  ব্যাপারটা সংখ্যার সার্বজনীন ধর্মের বিরোধী যেন।  সে নিজে বাড়তে চায়না, এমনকি অন্য সংখ্যাকেও বাড়তে দেয় না।  ২ এর সাথে ০ যোগ করুন। আপনি পাবেন ২। ফলাফল দেখে মনে হবে, কেউ কখনো কোন কিছু যোগ করার চেষ্টাই করেনি যেন। আর পূরণ ভাগের ক্ষেত্রে এই রহস্য যেন আরো ব্যাপক। শূন্য আমাদের তাড়া করে ফেরে অশরীরী সত্ত্বার মতোই। যে কোন সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে গুন করলে কেবল শূন্যই পাওয়া যায়, সেটা যত বড় কিংবা ছোট সংখ্যা যাই হোক না কেন।  আর শূন্য দিয়ে ভাগ করতে গেলে যেন অঙ্কের জানা সব কাঠামোই ভেঙ্গে পড়তে চায়।

শূন্যের এই রহস্যময় ব্যাপার স্যাপারগুলো প্রাচীন কালের দার্শনিকদের ভীত বিহ্বল করে তুলেছিল। তাই আমরা ইতিহাসের একটা বড় সময় জুড়ে শূন্যকে ঠেকানোর প্রচেষ্টা লক্ষ্য করি, অন্তত: পশ্চিমে তো বটেই। গণিতবিদ পিথাগোরাস (মীজান রহমান অবশ্য লিখেছেন ‘পাইথাগরাস’ বানানে) আর তার অনুরক্ত বাহিনী মিলে এক ধরণের ‘কাল্ট’ই গড়ে তুলেছিলেন তথাকথিত শূন্য আর অমূলদ সংখ্যা (irrational numbers) ঠেকাতে।  তাদের ধারণা ছিল প্রকৃতির পবিত্র সুসামঞ্জস্যতা বজায় রাখতে হলে এইটাই করণীয়। কিন্তু প্রকৃতি তো এত সুসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার বহু বৈশিষ্ট্যেই, বহু কাঠামোতেই খুঁজলে অমূলদ সংখ্যা বেরিয়ে আসে। বেচারা হিপসাসকে প্রাণ দিতে হয়েছিল এই গুমোড় ফাঁস করে দেয়ার জন্য। তাই খ্রিষ্টের জন্মেরও বহু আগে ব্যাবিলনে শূন্যের ধারণার উদ্ভব ঘটলেও কিংবা মায়া সভ্যতায় এবং তাদের বিখ্যাত ক্যালেন্ডারে এর নিদর্শন থাকলেও পশ্চিম শূন্যকে গ্রহণ করেনি। পিথাগোরাসের কাল্ট-ধাঁচীয় চিন্তা-ভাবনা আর তারপরে প্লেটো এরিস্টটলদের শূন্য-বিরোধী দর্শনের উপর ভিত্তি করে পাশ্চাত্য দর্শন গড়ে উঠায় শূন্য থেকে দীর্ঘদিন দূরে ছিল পশ্চিম।  এখানে বলে রাখি, পিথাগোরাস যেমন শূন্য সংখ্যাটিকে পছন্দ করতেন না, তেমনি আবার এরিস্টটল মনে করতেন, প্রকৃতিতে শূন্যতা থাকতে পারে না (“Nature abhors a vacuum”)। এমনকি শূন্যতাকে দেখা হত ‘ব্লাসফেমি’ হিসেবে। কিন্তু পরে বিজ্ঞানী টরিসেল্লি তার পারদ নিয়ে ঐতিহাসিক পরীক্ষার সাহায্যে দেখিয়ে দেন যে, শূন্যতা ইচ্ছে করলেই তৈরি করা যায়, এতে ব্লাসফেমিও হয় না, কারো মাথায় আকাশও ভেঙ্গে পরে না। আমার স্কুল কলেজের বিজ্ঞানের বইয়েও সেই টরিসেল্লির ভ্যাকুয়ামের ছবি দেখি হরহামেশাই। বিজ্ঞানী প্যাস্কালও পানি আর পারদ নিয়ে টরিসেল্লির মত পরীক্ষা করেছিলেন। গ্যালিলিও সাকশন পাম্প নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেছিলেন, পাম্প দিয়ে ১০ মিটারের বেশি উচ্চতায় পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না। এর বেশি উচ্চতায় পানি তুলতে গেলে সাকশন টিউবে তৈরি হবে ভ্যাকুয়াম। এগুলো আমরা স্কুলেই পড়েছি। কিন্তু এগুলো অনেক পরের কথা। এরিস্টটলের সময় এগুলো কোনটিই জানা না থাকায়, এবং তার গুণগ্রাহী এবং শিষ্যরা সচেতন ভাবে শূন্যতার ধারনা পরিহার করতে সচেষ্ট হওয়ায় ‘শূন্য-বিহীন পশ্চিম’ যেন স্থবির হয়ে পড়েছিল, গণিত আর বিজ্ঞানে অনেকদিন ধরে এগুতে পারেনি তারা।

তাহলে কথা হচ্ছে শূন্যের উপলব্ধিটা আসলো কোথায়, কখন আর কীভাবে? মীজান রহমানের মতে শূন্যের উপলব্ধিটা ‘পশ্চিমে জন্মায়নি, মধ্যপ্রাচ্যেও নয়, জন্মেছিল দক্ষিণ-প্রাচ্যে – ভারতবর্ষে’।  ভারতদের থেকে শেখে আরবেরা। সেই আরবদের কাছ থেকেই পশ্চিমা জগত প্রথমবারের মতো শূন্যের ব্যবহার শেখে, এবং সেই নতুন সংখ্যাপদ্ধতিকে নামাঙ্কিত করে ‘আরবি নিউমারেল’ হিসেবে। কিন্তু এই নামকরণের মাঝে ভারতীয়দের কৃতিত্বটুকু হারিয়ে গেছে বলে মনে হয়। এ প্রসঙ্গে মীজান রহমানের অভিমত (পৃষ্ঠা ১৯),

‘…আধুনিক সংখ্যার লিখনপদ্ধতি প্রবর্তনের কৃতিত্বটা আরবদের না দিয়ে বরং ভারতীয়দের দেওয়াই বোধ হয় উচিত ছিল, কারণ ঐতিহাসিকভাবে দেখতে গেলে আরবরা শেখে ভারতের কাছ থেকে, রাজ্য জয় করার পর। তারপর পশ্চিম শেখে আরবদের কাছে, ইসলামের যখন স্বর্ণযুগ। পরে পশ্চিমই এর নামকরণ করে আরবি সংখ্যা’।

এখন কথা হচ্ছে, ভারতের লোকেরা কিভাবে শূন্যের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিল, যেখানে পশ্চিমা জগৎ সহ বহু সংস্কৃতি ছিল  শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ? মীজান রহমানের মতে, ভারতীয়দের বিদ্যমান তদানীন্তন সংস্কৃতিই ছিল এর ভিত্তি।  পশ্চিমা বিশ্ব যেখানে শূন্য আর অসীমকে ভয়ের চোখে দেখত, সেখানে ভারতীয় সংস্কৃতিতে শূন্য এবং অসীমত্ব সবসময়ই ছিল যেন উপাসনার আধার। স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মার স্বরূপ কিংবা শিবের প্রলয় নৃত্য সবকিছুর মধ্যেই যেন শূন্য আর অসীমমের মিলনক্ষেত্র। মীজান রহমান হিন্দুদের উপাস্য দেবতা শিবের উদাহরণ হাজির করেছেন – শিবের একহাতে সৃষ্টির দণ্ড, আর আরেক হাতে ধ্বংসের অগ্নিমশাল। মীজান রহমানের মতে “হিন্দুধর্মের মৌলিক বিশ্বাসের মধ্যেই নিহিত রয়েছে শূন্য আর অসীমের দ্বৈত অস্তিত্ব। এ-বিশ্বাস একান্তই ভারতীয় বিশ্বাস। এখানে শূন্য আর অসীম একে অন্যের স্বভাব দোসর, একে অন্যের পরিপূরক। ভারতীয় দর্শনে ‘শূন্য’ হল স্বাগত অতিথি-আত্মার পবিত্র মন্দির”। কাজেই ভারতের মতো জায়গায় শূন্যের ধারণার জন্ম হবে না তো কোথায় হবে? শূন্যের জন্ম হবার আদর্শ  জায়গা হিসবে প্রস্তুত হয়েই ছিল যেন প্রাচীন ভারত।

তবে আমার মনে হয় সংস্কৃতির ব্যাপারটা আসলে মুখ্য নয়। ভারতীয়দের আগে ব্যাবিলনে যে শূন্যের ব্যবহার চালু ছিল সেটা আগেই বলেছি। সংখ্যা হিসেবে না হলেও প্রতীক হিসেবে হলেও।  খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেকজান্ডার তার পারস্য-বাহিনী নিয়ে ব্যাবিলন থেকে ভারতবর্ষ আক্রমণ করার পর সেই জ্ঞান সম্ভবত: ভারতে চলে আসে। ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটির উল্লেখ চার্লস সেফির বইয়ে আছে, রবার্ট কাপলানের ‘The Nothing that Is: A Natural History of Zero’ বইয়েও এর উল্লেখ পাওয়া যায়[5]। মীজান রহমানও তাঁর বইয়ে ব্যাপারটার উল্লেখ করেছেন এর গুরুত্ব বোঝাতে। মনোযোগী পাঠক না হলে হয়তো এড়িয়ে যাবে ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু।

শূন্যের গণিত আবিষ্কারের কৃতিত্ব মীজান রহমান দিয়েছেন সপ্তম শতাব্দীর বিখ্যাত ভারতীয় গণিতজ্ঞ ব্রহ্মগুপ্তকে। তাঁর মতে, ব্রহ্মগুপ্তই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি বুঝেছিলেন কিভাবে ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক সংখ্যা দিয়ে যোগ বিয়োগ পূরণ ভাগ করতে হয়। এখানে এসে একটু হোঁচট খাবেন আমার মতো অল্পবিদ্যার পাঠকেরা। আমরা ছোটবেলা থেকে শূন্যের মূল আবিষ্কারক হিসেবে চিনে এসেছি আর্যভট্টকে। অথচ মীজান রহমানের মূল বইয়ে আর্যভট্টের কোন উল্লেখ নেই। মীজান রহমান তার সারা বই জুড়ে পাইথাগোরাস, জ্জেনো, এরিস্টটল, ব্রহ্মগুপ্ত, আল-খোয়ারিজমি, ওমর খৈয়াম, ফিবোনাচি, ব্রুনেলিসি, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন, রেনে ডেকার্ট, প্যাস্কেল, লিবনিজ, আইনস্টাইন, লোপিতাল, ইউহান বার্নলি, ড্যানিয়েল বার্নলি,  কেলভিন, চন্দ্রশেখর, ফাইনম্যান, হাবল, হকিং সহ এমন কোন গণিতজ্ঞ কিংবা বিজ্ঞানী নেই যার কথা মীজান রহমান বলতে বাকি রেখেছেন; অথচ শূন্যের সূচনা যার হাত দিয়ে হয়েছিল বলে মনে করা হয়, তার কোন উল্লেখ বইটিতে নেই! আর্যভট্টের নামের উল্লেখ না থাকার ব্যাপারটি বিস্ময়কর; তবে এটির একটি কারণ হয়তো এই যে, আর্যভট্টের কাজে পৃথিবীর বার্ষিক গতি, জ্যামিতি শাস্ত্র, ত্রিকোনমিতি, দ্বিঘাত সমীকরণের কিছু সমাধান আছে, এমনকি পাই এর মান নির্ণয় প্রভৃতির উপর আর্যভট্টের অবদানসূচক প্রামাণ্য গ্রন্থের উদাহরণ তার বিখ্যাত ‘আর্যভাটিয়া’ গ্রন্থ থেকে দেয়া যায়, কিন্তু তিনি সত্যই ‘শূন্য’ ব্যাপারটিকে গাণিতিকভাবে ব্যবহার করেছিলেন কিনা এর কোন প্রমাণ নেই।  আর্যভট্টের বইয়ের কিছু বর্ণনামূলক বাক্য থেকে পরবর্তী বিশ্লেষকেরা ভেবে নিয়েছেন যে তিনি শূন্য সম্বন্ধে অবগত ছিলেন। যেমন, প্রাচ্যের ইতিহাসবিদেরা তো বটেই এমনকি গণিতের ইতিহাসবিদ ফ্রান্সের জর্জস ইফ্রাহ সহ অনেকেই মনে করেন যে আর্যভট্টের কাজের মধ্যেই প্রচ্ছন্নভাবে ‘শূন্য’ উপস্থিত ছিল। কিন্তু প্রচ্ছন্নভাবে  থাকলে কী হবে সেটা যে প্রকাশ্যে এসেছিল, তার কোন প্রমাণ কিন্তু নেই।  আর কোন কিছুর বর্ণনা কিন্তু গণিত নয়। লর্ড কেলভিন একটা কথা বলতেন, তা আমি খুবই মানি – ‘যদি আপনি আপনার বর্ণনাকে সংখ্যায় প্রকাশ করতে না পারেন, তাহলে আপনার জ্ঞান অপর্যাপ্ত এবং অসন্তোষজনক বলে বিবেচিত হবে’। এখানেই  আর্যভট্টের চেয়ে ব্রহ্মগুপ্ত অধিকতর সফল। তিনিই বলতে পেরেছিলেন – “ধনাত্মক সংখ্যাকে ঋণাত্মক সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে ফলাফল দাঁড়াবে ঋণাত্মক, এবং ঋণাত্মক সংখ্যাকে আরেকটি ঋণাত্মক সংখ্যা দিয়ে ভাগ বা পূরণ করলে দাঁড়াবে ধনাত্মক”। শুধু তাই নয়, ব্রহ্মগুপ্ত এও বলতে পেরেছিলেন যে, শূন্য দিয়ে যে-কোন সংখ্যাকে পূরণ করলে সেটা শূন্য হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি যা পারেননি তা হল কোন কিছুকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে কি হবে তা বলতে। তিনি ভেবেছিলেন শূন্যের ধর্ম যেহেতু সবকিছু ‘শুষে নেয়া’ তাই কোন সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলেও সেটা শূন্য হবে। সেটা যে সঠিক নয় তা বুঝতে আরো কয়েক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই ভুলটি সংশোধন করেছেন দ্বাদশ শতাব্দীর গণিতজ্ঞ ভাস্কর। তিনিই অবশেষে বুঝতে পেরেছিলেন যে কোন সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে তা শূন্য হয় না, হয় অসীম।  কিন্তু তখনো জানা ছিল না শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে কি হবে।   ০/০ এর মানে কি? আমরা আজ জানি এরও একটা অর্থ আছে, মীজান রহমান যেটাকে বলেছেন ‘ইডিটারমিনেট নাম্বার’ বা অনির্দিষ্ট সংখ্যা। কিন্তু এ ব্যাপারটার গাণিতিক ব্যাখ্যা জানার জন্য সপ্তদশ শতকের ফরাসী গণিতজ্ঞ লোপিতালের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে।

লোপিতালের কথা বললাম বটে, কিন্তু কিন্তু লোপিতালকে নিয়ে আসল গুমোর ফাঁস করে দিয়েছেন মীজান রহমান তার বইয়ে। আমরা যেটাকে ‘লোপিতালের সূত্র’ বলে জানি, সেটা আসলে লোপিতালের আবিষ্কার ছিল না, কাজটা ছিল তার ‘গৃহশিক্ষক’ ইউহান বার্নুলির আবিষ্কার।  অর্থের বিনিময়ে বার্নুলির কাজ কিনে নিয়ে আরে সেই সাথে নিজের আরো কিছু কাজ যোগ টোগ করে একটা বই লিখেছিলেন লোপিতাল – Analyse des infiniment petits নাম দিয়ে। ক্যালকুলাসের উপর সেসময় (১৬৯৬) প্রথম পাঠ্যপুস্তক ছিল সেটি।  এই বইয়ের মারফতে দুনিয়াশুদ্ধ ছাত্র ছাত্রী আর অধ্যাপকদের কাছে লোপিতাল পরিচিত হয়ে উঠেন, এবং তার বিখ্যাত  সূত্রটিকে লোপিতালের সূত্র হিসেবেই জেনে যান। ১৭০৪ সালে লোপিতাল মারা যাওয়ার পর বার্নুলি আসল ঘটনা ফাঁস করে দিলেও কেউ বিশ্বাস করেনি। এখনো অন্তরকলনের বইপত্রে এটাকে ‘লোপিতালের সূত্র’ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়।  ইতিহাস থেকে এ ধরণের অনেক আকর্ষণীয় কাহিনী তুলে নিয়ে মীজান রহমান সাজিয়েছেন  তার ‘শূন্য’ নামের বইটি।

লোপিতাল নামটি নিয়েও আছে বিস্তর মজা । লোপিতালের পুরো নাম ছিল ফ্রাঁসোয়া-আঁতোয়া দ্য লোপিতাল। ইংরেজিতে লেখা হয় এভাবে – L’Hospital। ফরাসী উচ্চারণ না বুঝে আমাদের উপমহাদেশের বইপত্রে লেখা হয় ‘ল’হস্পিটাল’ হিসেবে। আমার মনে আছে যে, নব্বইয়ের দশকে আমি বুয়েটে পড়া শুরুর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এপ্লায়েড ফিজিক্স বিভাগে কয়েকদিন ক্লাস করেছিলাম। সাবসিডিয়ারি  ক্লাসে গণিত নেওয়ায় কয়েকদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিন স্যারের ক্লাস করতে হয়েছিল। মতিন স্যার দুর্দান্ত পড়াতেন। তার ক্যালকুলাসের উপর বইও ছিল বাংলায় – অন্তরকলনবিদ্যা এবং সমাকলনবিদ্যা। কিন্তু আমার মনে পড়ছে যে, সেই অন্তরকলনবিদ্যা বইয়েও লোপিতালের সূত্রকে লেখা হয়েছিল ‘ল’হস্পিটালের সূত্র’ হিসেবে। সম্ভবতঃ বাংলাদেশের গণিতের সব বইয়েই তাই লেখা।  মীজান রহমানের বই থেকেই আমি প্রথমবারের মতো জানলাম যে, ভদ্রলোকের নামের প্রকৃত উচ্চারণটি হবে লোপিতাল।

শুধু লোপিতাল কেন, মীজান রহমানের পুরো বইটিতেই গণিতবিদদের নামের সঠিক উচ্চারণ নিয়ে বিস্তর ধাক্কা খেয়েছি। আমরা ছোটবেলাকার বাংলা বইপুস্তকে চেনা পরিচিত গণিতবিদদের নামের বানান যেভাবে দেখে এসেছি তার চেয়ে মীজান রহমানের বইয়ে সেগুলো একেবারেই ভিন্ন। পিথাগোরাসের কথা আগেই বলেছি, যার নামের উচ্চারণ মীজান রহমান লিখেছেন ‘পাইথাগরাস’ হিসেবে। বাংলা বইগুলোতে ইতালীয় গণিতবিদ – যার হাত দিয়ে আরবি ‘শূন্য’ সংখ্যাটি  সদর্পে পদার্পণ করেছিল ইউরোপের মাটিতে, তার নাম এখনো লেখা হয় ‘ফিবোনাক্কি’ হিসেবে। এটি সঠিক উচ্চারণ নয়।  মীজান রহমান সঠিকভাবেই লিখেছেন ‘ফিবুনাচি’। একইভাবে দেকার্ত কে ‘ডেকার্ট’, কোপার্নিকাসকে ‘কপার্নিকাস’, ব্লেইজ প্যাস্কেলকে ‘ব্লেই পাস্কেল’, লিবনিজকে ‘লাইবনিজ’, বার্নলিকে ‘বার্নুলি’ ইত্যাদি।  খুব বড় সম্ভাবনা আছে যে,  লোপিতালকে আমরা আমাদের বইপত্রগুলো পড়ে যেভাবে ভুলভাবে জেনেছি ‘ল’হস্পিটাল’ হিসেবে, কিংবা ফিবোনাচিকে ফিবোনাক্কি হিসেবে জেনে এসেছি, হয়তো আমাদের চেনা-জানা সবগুলো নামের উচ্চারণই ভুল। গণিতবিদের নামের শুদ্ধ উচ্চারণগুলো হয়তো মীজান রহমানের প্রদর্শিত পথেই, তারপরেও আমি শতভাগ সংশয়মুক্ত নই। সংশয়ের কারণ অবশ্য কিছুক্ষেত্রে মীজান রহমান নিজেই। তিনি তার বইয়ে গ্রীক গণিতবিদ এবং দার্শনিক Zeno কে দুই দুইটি বানানে লিখেছেন। এক জায়গায় ‘জ্জেনো’ (পৃষ্ঠা ১১) অন্য সব জায়গায় ‘যেনো’ (যেমন, পৃষ্ঠা ১৬, ১৭ ইত্যাদি)।

কেবল নাম নয়, কিছু জায়গায় আমার সংশয় আছে ব্যাখ্যা নিয়েও। যেমন ফিবোনাচির যে বিখ্যাত খরগোশের ধাঁধাটার উল্লেখ করেছেন তিনি  বইয়ে (পৃঃ ২৬) , যেখান থেকে ফিবোনাচির বিখ্যাত সিরিজটি বেরিয়ে আসে, সেটিতে একটি ছোট ভুল আছে। তিনি ধাঁধাটি শুরু করেছিলেন এই বলে  – ‘ধরুন এক কৃষক একজোড়া বাচ্চা খরগোশ কিনে এনেছে বাজার থেকে’। কিন্তু সমস্যাটি বলার পর শেষ লাইনে বলেছেন ‘একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক মাস, ধরুন, n অতিক্রম করবার পর,   (n+ 1)তম মাসের প্রথমে তাহলে সর্বমোট কতগুলো খরগোশের মালিক হলেন সেই কৃষক?’।  যদি ‘কতগুলো’ খরগোশ ধরে হিসেব করা হয়, তবে ফিবোনাচি সিরিজ শুরু হবে ২ দিয়ে। বলা বাহুল্য ফিবোনাচির সিরিজটি সেটা দিয়ে শুরু নয়। ১,১,২,৩,৫,৮,১৩ … এই সিরিজটি পেতে হলে কতগুলো নয়, কৃষকটি শেষ পর্যন্ত  কত জোড়া খরগোশের মালিক হলেন সেটা বের করাটাই মুখ্য।

আমার অন্য সংশয়গুলোর কয়েকটি আপেক্ষিকতা নিয়ে; মানে মীজান রহমান আপেক্ষিকতার কিছু বিষয় যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা নিয়ে।  আপেক্ষিকতার তত্ত্ব উদ্ভাবনের পেছনে রয়েছে আইনস্টাইনের অসাধারণ কিছু মানস পরীক্ষা (Thought Experiment) সেটা হয়তো অনেকেই জানেন । সেই সতের বছর বয়সে হঠাৎ করেই একদিন আইনস্টাইনের মাথায় এসেছিলো একটি অদ্ভুতুড়ে প্রশ্ন : ‘আচ্ছা, আমি যদি একটা আয়না নিয়ে আলোর গতিতে সা সা করে ছুটতে থাকি, তবে কি আয়নায় আমার কোন ছায়া পড়বে?’ প্রশ্নটা শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর আবেদন কিন্তু সুদূরপ্রসারী। এই প্রশ্নটি সমাধানের মধ্যেই আসলে লুকিয়ে ছিল আপেক্ষিকতার বিশেষতত্ত্ব (Special Theory of Relativity) সমাধানের বীজ। আলোর গতিতে চললে আয়নায় কি ছায়া পড়ার কথা? মীজান রহমান লিখেছেন, ‘আচ্ছা, আমি যদি একটা আয়না হাতে করে আকাশপথে উড়ে যেতে পারতাম আলোর বেগে তাহলে আমি কি দেখতাম আয়নাতে? আমার চোখ থেকে আলোকরশ্মি যাবে আয়নার দিকে, এবং সেটা আবার ফিরে আসবে আমার কাছে-তাহলেই তো আমার ছবি দেখতে পাব আয়নাতে, তাই না?’ প্রশ্নটা ঠিকই আছে, কারণ, গ্যালিলিও-নিউটনেরা বস্তুর মধ্যকার আপেক্ষিক গতির যে নিয়মকানুন শিখিয়ে দিয়েছিলেন, তা থেকে বুঝতে পারি আলোর সমান সমান বেগে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকলে আইনস্টাইনের সাপেক্ষে আলোকে তো এক্কেবারে গতিহীন মনে হবার কথা। ফলে আলোর তো আইনস্টাইনকে ডিঙ্গিয়ে আয়নায় ঠিকরে পড়ে আবার আইনস্টাইনের চোখে পড়বার কথা নয়। তাহলে ওই পরিস্থিতিতে আইনস্টাইন কিন্তু নিজের ছায়া আয়নায় দেখতে পাবেন না। আরো সোজাসুজি বললে বলা যায়, আয়না মুখের সামনে ধরে যদি আলোর বেগের সমান বেগে দৌড়ুতে থাকেন, তবে আইনস্টাইন দেখবেন যে আয়না থেকে আইনস্টাইনের প্রতিবিম্ব রীতিমত ‘ভ্যানিশ’ হয়ে গেছে। কিন্তু তাই যদি হয় এই ব্যাপারটা জন্ম দিবে আরেক সমস্যার। এতদিন ধরে গ্যালিলিও যে ‘প্রিন্সিপাল অব রিলেটিভিটি’ নামের সার্বজনীন এক নিয়ম আমাদের শিখিয়েছিলেন, সেটা তো আর কাজ করবে না।  আসলে আমরা এখন জানি, আলোর গতিবেগ যে অন্য দশটা বস্তুর গতিবেগের মতোন নয়।  ‘আলোর বেগ তার উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর কখনই নির্ভর করে না; এটি সব সময়ই ধ্রুবক।’ – আইনস্টাইনের এই যুগান্তকারী অনুকল্পই ছিল সমাধানের চাবিকাঠি। মীজান রহমান ব্যাপারটি সঠিকভাবেই বর্ণনা করেছেন, তবে, ‘চোখ থেকে আলোকরশ্মি যাবে আয়নার দিকে’ বলে যেভাবে  বাক্যটি লিখেছেন (পৃঃ ৯২) তাতে মনে হতে পারে যেন আমাদের চোখ হচ্ছে আলোর উৎস।  না, বিজ্ঞানের চোখ দিয়ে দেখলে – আলোকরশ্মি চোখ থেকে কোথাও যায় না, কারণ চোখ কোন আলোর উৎস নয়।  বরং যে কোন আলোর উৎস থেকে আলোর আমাদের  ডিঙ্গিয়ে আয়নায় ঠিকরে পড়ে তা প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পড়লেই আমরা কেবল আয়নায় আমাদের প্রতিবিম্ব দেখি, চোখ থেকে আলোকরশ্মি যাওয়ার কারণে নয়। আমাদের চোখ আলোর উৎস হলে আমরা অন্ধকারেও ঘরেও দিনের আলোর মতো দেখতে পেতাম।

আপেক্ষিকতার ব্যাখ্যা হিসেবে মীজান রহমান আরেকটি জায়গায় বলেছেন – ‘গতির সাথে শুধু যে ঘড়ির কাঁটা ঢিলে হয়ে যায় তাই নয়, দৈর্ঘ্য, ভর, এগুলোও আমূল বদলে যায়’ (পৃঃ ৯৪)।  তারপর বইয়ের একই পৃষ্ঠায় তিনি ব্যাখ্যা করেছেন,  ‘১ পাউন্ড একটা চিনির ঠোঙ্গা আলোর বেগের চার-পঞ্চমাংশ বেগে গতিশীল কোন স্পেসশীপে মাপলে কিভাবে ৫/৩ পাউন্ডে পরিণত হয়। … তারপর যদি সত্যি সত্যি আপনি আলোর গতির সমান মাত্রায় পৌঁছে যেতে পারেন কোনক্রমে, তাহলে দূরত্ব হবে শূন্য, এদিকে আপনার ওজনও হবে অসীম’ (পৃঃ ৯৪)। মীজান রহমান যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন অনেকেই জনপ্রিয় ধারার বিজ্ঞানের বইগুলোতে এভাবে ব্যাখ্যা করেন। আমিও স্বীকার করব যে, আমার আগেকার কিছু বইয়ে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছি। আমি তো কোন ছাড়, জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং এবং ফাইনমেনের বইয়েও এরকমের ইণ্টারপ্রিটেশন রয়ে গেছে[6]। কিন্তু এ ধরনের ব্যাখ্যায় যে ভুলের অবকাশ রয়ে যায়, তা আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক ড. তানভীর হানিফের সাথে ব্লগে কথোপকথনে[7]। তাই আমার মনে হয় মীজান রহমানের ব্যাখ্যাটি একটু পরিবর্তনের দরকার আছে। যদিও বেইজার সহ আগেকার কিছু বইপত্রে আলোর গতির সাথে সাথে বস্তুর ভর বেড়ে যাওয়ার কথা বলা থাকে, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীরা ব্যাপারটিকে আর সেরকমভাবে ব্যাখ্যা করেন না। আসলে ‘রিলেটিভিস্টিক ম্যাস’ বা আপেক্ষিক ভর একটি পুরনো ধারণা। ১৯৩০ সালের আগে পদার্থবিজ্ঞানীরা এটা ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন অধিকাংশ পদার্থবিদেরাই যেটা ব্যবহার করেন তা হল  ‘ইনভ্যারিয়েন্ট ম্যাস’ বা অপরিবর্ত ভর। অপরিবর্ত ভর আলোর বেগের উপর নির্ভর করেনা, এটি মূলতঃ একটি অপরিবর্ত স্কেলার রাশি। কেন আলোর গতিবেগের সাথে সাথে বস্তুর দৈর্ঘ্য কমলেও (length contraction) কিংবা সময় শ্লথ হয়ে গেলেও (time dilation) বস্তুর ভর অপরিবর্তিত থাকে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এখানে, কিংবা এখানে। কেন কোন বস্তুকণা আলোর সমান গতিতে ধাবমান হতে পারবে না, সেটাকে ব্যাখ্যা করা উচিৎ আসলে ভরের মাধ্যমে নয়,বরং শক্তির মাধ্যমে। যত বস্তুর বেগ বাড়তে থাকে তার জড়তা বা ইনারশিয়া বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে বস্তুকণা আলোর বেগের সমান হতে পারবে না, কারণ এর জন্য অসীম শক্তির দরকার হবে।

বইটির আরেকটি সমস্যা আমার কাছে মনে হয়েছে পরিভাষাগত। লেখক দীর্ঘদিন বাইরে থাকার কারণেই বোধ হয় বৈজ্ঞানিক শব্দগুলোর যে বাংলা প্রতিশব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন তা একটু অপরিচিতই শোনায়। বাংলাদেশের মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক গণিত এবং বিজ্ঞান বইয়ের সিলেবাসে যে শব্দগুলোর সাথে পরিচিত হয়ে আমি বড় হয়েছি তার অনেকগুলোই এই বইয়ে অনুপস্থিত, তার বদলে যেন ‘মগজে কারফিউ’ ঘোষণা করেছে অপরিচিত এবং স্বল্প পরিচিত কিছু শব্দ।  যেমন,  ‘ফর্মুলা’র বাংলা করেছেন আর্যা।  উচ্চমাধ্যমিক রসায়ন বইয়ে Pauli’s exclusion principle এর বাংলা পেয়েছিলাম ‘পলির বর্জন নীতি’। মীজান রহমান বাংলা করেছেন – ‘পাওলির বহির্ভূতি সূত্র’। বিখ্যাত Chandrasekhar’s limit কে ‘চন্দ্রশেখরের সীমা’ হিসেবেই এতদিন জেনে এসেছিলাম, কিন্তু মীজান রহমান   একে লিখেছেন ‘চন্দ্রশেখর মাত্রা’। এগুলো তাও না হয় গ্রহণীয়, কিন্তু সেই প্রাইমারী স্কুলের দিনগুলো থেকে আমরা areaকে ‘ক্ষেত্রফল’ এবং volume কে ‘আয়তন’ হিসেবে জেনে এসেছি,   অথচ মীজান রহমান তার শূন্য বইয়ে areaকে ‘আয়তন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, আর volume কে ‘ঘনতা’। আমার মনে হয়েছে এগুলো অযথা সাধারণ পাঠকদের মনে অযাচিত সংশয় তৈরি করবে। এমনকি, তার প্রযুক্ত পরিভাষাগুলোও সর্বত্র সুষমভাবে ব্যবহার করা হয়ে উঠেনি এমনকি তার নিজের পক্ষেও। যেমন area বোঝাতে ‘ক্ষেত্রফল’ বাদ দিয়ে ‘আয়তন’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করলেও  বর্গক্ষেত্রকে কিন্তু বর্গক্ষেত্রই রেখেছেন (পৃঃ ৫২), ‘বর্গায়তন’ নয়। অথচ বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের বেলায় লিখেছেন ‘বৃত্তের আয়তন’।

গণিতের শূন্যতার পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞানের শূন্যতাও মীজান রহমানের বইটির শেষ দিকে উঠে এসেছে, যদিও এ অংশগুলো আরেকটু বিস্তৃত হতে পারত। গণিতের ক্ষেত্রে শূন্যতার ধারণা নির্মাণের পথ-পরিক্রমায় তিনি পিথাগোরাসের জ্যামিতি থেকে শুরু করে, ভারতীয়-আরবিয় সংখ্যা পদ্ধতি, যেনোর ধাঁধা, সুবর্ণ অনুপাত, ফিবোনাচির রাশিমালা, লিমিট, অন্তর্কলন সমাকলনের ব্যবহারিক উদাহরণ সহ অনেক কিছুই বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা করেছেন, কিন্তু যে ‘কোয়ান্টাম শূন্যতা’ এখন জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের  গবেষণার সবচেয়ে সজীব অংশ, সেটি নিয়ে খুব বেশি গভীর আলোচনায় যাননি। এ ব্যাপারটি আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, কারণ, জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীদের দেয়া সর্বাধুনিক তত্ত্ব থেকে আমরা এখন জানতে পারছি যে, আমাদের এই মহাবিশ্ব একটি ‘কোয়ান্টাম ইভেন্ট’ হিসেবেই একসময় আত্মপ্রকাশ করেছিল কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের মাধ্যমে একেবারে ‘শূন্য’ থেকে। বিগত কয়েক বছরে এই ধারণার উপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রিয় ধারার বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো লিখেছেন এ বিষয়টি নিয়ে হাতে কলমে কাজ করা প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীরাই। এর মধ্যে এম আইটির অধ্যাপক অ্যালেন গুথের ‘The Inflationary Universe’, রুশ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ভিলেঙ্কিনের ‘Many Worlds in One’,  হকিং –ম্লোডিনোর ‘The Grand Design’ রয়েছে। বিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউসের ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ (Universe from Nothing) বইটি এ বিষয়ে সর্বশেষ সংযোজন, যেটির কথা এ প্রবন্ধের  প্রথমেই বলেছি। কিন্তু মীজান রহমানের বইটিতে  হকিং এবং ম্লোডিনোর ‘গ্র্যাণ্ড ডিজাইন’ হাল্কাভাবে উল্লেখ করা ছাড়া তেমন কিছু উঠে আসেনি। এ জায়গাটিতে অতৃপ্তির একটা খেদ  রয়েই গেল।  চার্লস সেইফির ‘জিরো’ বইটি যেমন গণিতের শূন্যতাকে জানার জন্য অপরিহার্য (যেটির প্রভাব মীজান রহমানের শূন্যতে বিদ্যমান), ঠিক তেমনি  পদার্থবিজ্ঞানের শূন্যতাকে জানার জন্য কণা পদার্থবিদ ফ্রাঙ্ক ক্লোসের  ‘ভয়েড’[8] কিংবা ‘নাথিং – এ ভেরি শর্ট ইন্ট্রোডাকশন’[9] বইদুটো আকর্ষণীয় সংযোজন হতে পারে।

পাশাপাশি কিছু মুদ্রণ-প্রমাদ আছে বইয়ে। যেমন, পুরো বই জুড়ে ‘বেগুনি’ রঙকে ‘বেগনি’ লেখা হয়েছে একাধিকবার, যা অনেকের কাছেই দৃষ্টিকটু লাগবে। কিছু জায়গায় আছে খানিকটা অসতর্কতার ছোঁয়া।  যেমন, লেখক এক জায়গায় গোল্ডেন রেশিও বা ফাই নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘এই অনুপাতটিকে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘গোল্ডেন রেশিও’-একটু আগে যাকে বললাম সুবর্ণ অনুপাত।’ (পৃষ্ঠা ১৩)। একটু আগে উল্লেখের কথা বললেও আদপে তিনি ঐ লাইনের আগে ‘সুবর্ণ অনুপাত’ শব্দ-যুগল কখনই ব্যবহার করেননি।  কোন কোন ক্ষেত্রে আবার লাইনের মধ্যে শব্দ বাদ পড়ে যাওয়ায় অর্থ বের করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, একটি বাক্য এরকমের – ‘দেখা যাবে যে দুটি সংখ্যা মজার ব্যাপার যে এই একই অনুপাত নিসর্গের আরো অনেক কিছুতে দেখা যায়’ (পৃষ্ঠা ১৩)। এ ধরণের দু’একটি বাক্য বইয়ে রয়ে গেছে যা সংশোধন করা জরুরী।  তবে এসমস্ত ক্ষেত্রে লেখকের চেয়েও বেশি দায়বদ্ধতা প্রকাশকের। বাংলাভাষায় বিজ্ঞানের বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এটা একটা সমস্যাই। দক্ষ প্রুফ-রিডারের অভাবে অনেক সময় ভাল পাণ্ডুলিপির  পর গুরুত্ব হ্রাস পেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই।  লেখক হিসেবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এটুকু বলতে পারি যে, এই বইয়ের প্রকাশক শুদ্ধস্বরের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি একটু বেশিই। একটি কারণ হয়তো,  প্রকাশনার জগতে শুদ্ধস্বর অপেক্ষাকৃত নবীন কাণ্ডারি, সময়ের সাথে সাথে এর অনেক সমস্যাই মিটে যাবে আশা করা যায়। বই নির্বাচন এবং প্রকাশে স্বকীয়তার কারণে প্রকাশনাটি যে ইতোমধ্যেই একটি আলাদা স্থান অধিকার করে এটা অনস্বীকার্য।

আর এটা উল্লেখ করতেই হবে, এই সব ছোট খাট মুদ্রণ-প্রমাদ কিংবা প্রায়-উপেক্ষণীয় ছোট খাট ভাষিক ত্রুটি বইটির আবেদন মোটেও ক্ষুণ্ণ করে না।  এই বইটি পাঠ করলে কেবল শূন্যের ধারনা নয়, গণিত এবং বিজ্ঞানের পর্যায়ক্রমিক উন্নয়নের ইতিহাসের সাথে নিবিড় পরিচয় ঘটবে পাঠকদের।  বিশেষ করে স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রছাত্রী যারা গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করেন, কিংবা এধরণের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে ইচ্ছুক, তাদের জন্য এই বইটি চিন্তার খোরাক যোগাবে। তাদের কথা যে মীজান রহমানের মাথায় প্রথম থেকেই ছিলো তার প্রকাশ ঘটেছে বইয়ের ভূমিকায় তার উপলব্ধিতেই –

‘এ বইটি লিখবার পেছনে একটাই উদ্দেশ্য আমার – বাংলাভাষাভাষী জগতের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকেও আমার নিজের কৌতূহল এবং আগ্রহকে সংক্রমিত করে তোলা। আশা করি শূন্য এবং গণিতকে একটু ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করবে ওরা বইটা পড়ার পর। ‘গণিত’ কোন ভীতিকর জন্তুর নাম নয় – গণিত জীবনের প্রতি আনাচে কানাচে বন্ধুর মতো, প্রিয়জনের মতো, প্রতিক্ষণে উপস্থিত’।

এ ধরণের বইয়ের পূর্বশর্ত হল ভাষার প্রাঞ্জলতা। মীজান রহমানের বই পড়ে আমার মনে হয়েছে তার ভাষা তার চিন্তার মতোই যেন সাবলীল। তিনি ভাষার অনাবশ্যক বাগাড়ম্বর এড়িয়ে চলেন। অধ্যাপকীয় কায়দায় ভাবগম্ভীর এবং নিরর্থক শব্দরাজির কথামালা সাজিয়ে জ্ঞান জাহির করতে থাকেন না, বরং থাকেন যতদূর সম্ভব সাধারণ পাঠকের চিন্তার কাছাকাছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত ‘আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন’ পদার্থবিজ্ঞানীরা যখন পাঠকদের জন্য সাধারণ একটা বিজ্ঞানের লেখা লিখতে গিয়ে অহেতুক ‘অবিমৃশ্যকারী’ কিংবা ‘কুজ্ঝটিকা’র মতো ‘জাড্য বল’, ‘জাড্য কাঠামো’, ‘বিচ্ছুরণ-প্রস্থচ্ছেদ’, ‘পর্যায়ী বস্তুনিচয়’  জাতীয় শব্দরাজির ব্যাপক সমাহার ঘটান, গঠন করেন ‘প্লাংকের কোয়ান্টাম তত্ত্বে বলা হয় যে, মানুষের পক্ষে কোনো বিকিরণ কম্পকের শক্তির পরিমাণ সীমিত নির্ভুলতা ছাড়া চিহ্নিত করা যায় না’ টাইপের  বিরক্তিকর ধরণের একঘেয়ে জটিল বাক্যরাজির, সেখানে মীজান রহমান কোয়ান্টাম জগতের নিয়ম কানুন ব্যাখ্যা করেন অনুপম ছন্দে –

‘ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক এক দুঃসাহসী চিন্তা নিয়ে খেলা করতে লাগলেন মনে মনে – ছোট কণারা বড়দের মত একটানা রাস্তায় গড়িয়ে গড়িয়ে চলে না, তারা চলে অনেকটা লাফিয়ে লাফিয়ে, অনেকটা ব্যাঙ যেমন করে চলে’ (পৃষ্ঠা ৮৩)

২০১২ সালে বই মেলায় প্রকাশিত বিজ্ঞান এবং গণিতের বইগুলোর মধ্যে ‘শূন্য’ বইটিকে অন্যতম  গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে আমি বিবেচনায় রাখব।  ব্যাপারটি আমাদের মুক্তমনার জন্যও অতীব আনন্দের, কারণ বইটির বড় একটা অংশ মুক্তমনাতেই প্রথমে সিরিজ আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর সিরিজটি মুক্তমনা ব্লগে রাখা আছে এখানে। ধারণা করি, মুক্তমনায় প্রকাশিত এই সিরিজিটিই পরিবর্ধিত এবং পরিবর্তিত করে বই আকারে রূপ দিয়েছেন তিনি। মুক্তমনার অবদানের কথা তিনি বইটির ভূমিকায় উল্লেখও করেছেন অকৃপণভাবে।

বইটির নাম শূন্য হলেও বইটির পড়ার পর অনুসন্ধিৎসু পাঠকের ঝাঁপি যে শূন্য থাকবে না, বরং শিক্ষা, জ্ঞান এবং আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আশি বছরের দীর্ঘ মাইলফলক  অতিক্রম করা এই চিরনবীন এ লেখক আমাদের জীবনকে দীপান্বিত করে তুলুন নতুন নতুন জ্ঞানের আলোয় এমনিভাবে আরো অনেক দিন ধরে, এই কামনা করি।

:line:

লেখাটি শেষ করছি একটা ধাঁধা দিয়ে। আমি এই ধাঁধায় প্রমাণ করব  ১ = ০।  এবং সর্বোপরি দেখাতে চেষ্টা করব, আমাদের ব্লগার সংশপ্তক আসলে একটি  লাউ। সন্দেহবাতিকেরা অবশ্য সন্দেহ করবেন, প্রমাণের কোন এক জায়গায় ফাঁকিবাজি আছে নির্ঘাত। সেই ফাঁকিবাজিটাই ধরতে হবে। ধাঁধাটা একারণেই দিলাম যে শূন্যের সাথে এর একটা গভীর সম্পর্ক আছে।

ধরা যাক, a এবং b দুটো রাশি যাদের মান 1 ।

যেহেতু দুটো রাশির মানই সমান (অর্থাৎ ১), সুতরাং আমরা লিখতে পারি,

b^2 = ab …………………. ( সমীকরণ ১)

আবার যেহেতু, আমরা সবাই জানি, a = a ,
উভয় পক্ষকে বর্গ করে –
তাই, a^2 = a^2 …………………. ( সমীকরণ ২)

সমীকরণ ২ থেকে সমীকরণ ১ বিয়োগ করে পাই,
a^2 - b^2 = a^2 - ab …………………. ( সমীকরণ ৩)

যাদের বীজগনিতের বেসিক জ্ঞান আছে, তার জানেন যে, সমীকরণ ৩ কে উৎপাদকে ভেঙে লেখা যায় –
(a+b)(a-b) = a(a-b) …………………. ( সমীকরণ ৪)

সো ফার সো গুড। এবার উপরের সমীকরণের উভয় পক্ষ কে (a-b) দিয়ে ভাগ করে পাই,

a+b = a …………………. ( সমীকরণ ৫)

উভয় পক্ষ থেকে a কেটে দিলে বা বিয়োগ করলে আমরা পাব,

b = 0 …………………. ( সমীকরণ ৬)

কিন্তু উপরে তাকিয়ে দেখুন, ধাঁধা শুরু করার সময় প্রথম লাইনটিতেই আমরা ধরে নিয়েছি a এবং b দুটো রাশির মান ১ ।

তার মানে কি দাঁড়ালো? দাঁড়ালো যে,

1 = 0 …………………. ( সমীকরণ ৭)

অর্থাৎ, ১ = ০
যাহা শূন্য, তাহাই এক।

এখন দেখুন এই সমীকরণ ৭ এর মজা। যে কোন অসম্ভব জিনিস এই সমীকরণে ফেলে সম্ভব করে দেয়া যাবে। ধরুন কেউ বলল, আমাদের ব্লগের দুঁদে গোয়েন্দা সংশপ্তকের ১ টি মাথা। কিন্তু সমীকরণ ৭ অনুযায়ী ১ = ০। মানে সংশপ্তকের কোন মাথা নেই।

তারপর ধরুন আমরা জানি, সংশপ্তকের পা আছে দুইটি।

সমীকরণ ৭ এর উভয়পক্ষকে কে ২ দিয়ে গুণ করুন। পাবেন,
২ =০

অর্থাৎ তার দুইটি পা থাকা মানে আসলে তার কোনই পা নেই।

এভাবে আমি একে একে প্রমাণ করতে পারব যে, সংশপ্তকের কোন মাথা নেই, পা নেই, হাত নেই, তার মাথায় চুলের বদলে আছে সবুজ ডালপালা, আর তার রং হালকা সবুজ। অর্থাৎ সংসপ্তক মানে হচ্ছে আপনার গ্রামের বাড়িতে বাড়ির টিনের চালে ঝুলে থাকা লাউ।

সংশপ্তক = লাউ।

 

সন্দেহ হচ্ছে? উনাকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন। গোয়েন্দা মানুষ, হয়তো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে পাশ কাটাতে চাইবেন। কিন্তু আপনারা ছাড়বেন না। সংশপ্তক যে লাউ, তাতে আমার কোনই সন্দেহ নেই।

কিন্তু সবাই তো আর আমার মতো ‘লাউ’ বিশ্বাসী নন, তারা হয়তো সন্দেহ করবেন, এই হতচ্ছাড়া ‘প্রমাণের’ কোথাও একটু ভুল আছে। সেটাই খুঁজে দেখুন। অনেকে হয়তো এর মধ্যে ধরেও ফেলেছেন।

যারা এখনো পারেননি, তাদের জন্য একটা হিন্ট দেই। শূন্য বইয়ে মীজান রহমানের এই বিখ্যাত উদ্ধৃতিতেই আপনারা পাবেন সমাধানের সূত্র –

‘শূন্য আর অসীম, এরা একে অন্যের যমজ। যেখানে শূন্য সেখানেই সীমাহীনতা। দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভাবলে যেখানে কিছু নেই সেখানেই সবকিছু। শূন্য দ্বারা বৃহৎকে পূরণ করুন, বৃহৎ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এই একই শূন্য দ্বারা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রকে ভাগ করুন, ক্ষুদ্র অসীমের অঙ্গধারণ করবে। শূন্য সবকিছু শুষে নিয়ে অসীমের দরবারে পাঠিয়ে দেয়’।

উদ্ধৃতিটি আবার পড়ুন, এবং চিন্তা করুন – কোন্‌ ভুলটি সংশোধন করেছিলেন দ্বাদশ শতাব্দীর গণিতজ্ঞ ভাস্কর?   এ থেকেই আমার গাঁজাখুড়ি প্রমাণের ভিতর শুভঙ্করের ফাঁকির হদিস পেয়ে যাবেন।

সবাইকে ধন্যবাদ।

তথ্যসূত্র:

[1] ড. মীজান রহমানের ব্লগ, http://mukto-mona.com/bangla_blog/?author=28
[2] Lawrence M. Krauss, A Universe from Nothing: Why There Is Something Rather than Nothing, Free Press, 2012
[3] অভিজিৎ রায়, অস্তিত্বের অন্তিম প্রশ্নের মুখোমুখি: কেন কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?, মুক্তমনা।
[4] Charles Seife, Zero: The Biography of a Dangerous Idea, Penguin Books; Penguin Books, 2000
[5] Robert Kaplan, The Nothing that Is: A Natural History of Zero, Oxford University Press, USA, 2000
[6] এক্ষেত্রে উৎসাহী পাঠকেরা স্টিফেন হকিং-এর  A Brief History of Time কিংবা রিচার্ড ফাইনম্যানের ‘The Character of Physical Law’ দেখে নিতে পারেন।
[7] মুক্তমনায় প্রকাশিত আমার ‘আলোর চেয়ে বেশি বেগে ভ্রমণরত নিউট্রিনো- আইনস্টাইন কি তবে ভুল ছিলেন?’লেখাটির মন্তব্যে তানভীর হানিফ এবং আমার আলোচনা দ্রষ্টব্য।
[8] Frank Close, The Void, Oxford University Press, USA, 2008
[9] Frank Close, Nothing: A Very Short Introduction, Oxford University Press, 2009

[1205 বার পঠিত]