স্বয়ং ঈশ্বর যখন সিসিফাস!

By |2012-11-25T00:23:45+00:00নভেম্বর 25, 2012|Categories: গল্প|8 Comments

অবশেষে সিসিফাসের প্রার্থনা কবুল করলেন ঈশ্বর। বহুবছর ধরে সে এই প্রার্থনা করে আসছে। প্রতিবারই পাথর কাঁধে তুলে ভেবেছে- এইবার বুঝি উঠে যাবে সে তরতর করে। পাষাণ পাথরটা ওপাশে ফেলতে পারলেই সিসিফাসের মুক্তি। প্রতিবারই হতাশ হয়েছে। শেষ মুহূর্তে এসে বদমাশ পাথরটা ফসকে গেছে হাত থেকে। সিসিফাস দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছে তাকে ধরে রাখতে। শক্তিই বা আর কতখানি থাকে! এ পর্যন্ত তুলতেই যে তার সবটুকু উজাড় হয়ে গেছে। পাথরটি ঝড়ের গতিতে গড়তে গড়তে চলে এসেছে পাহাড়ের পাদমূলে। পৃথিবীর কোনো মানুষই এত হতাশ হয়নি কখনও। ঈশ্বরকে গালি দিয়েছে- পৃথিবীর কোনো গালিই বাদ পড়েনি। আবার যখন নতুন করে শুরু করেছে- অনুতপ্ত হয়েছে, কাঁদতে কাঁদতে ভাসিয়ে দিয়েছে শুকনো ভূমি। পৃথিবীর মানুষ আশ্চর্য হয়ে ভেবেছে, পাহাড়ের চোঙ্গা চূড়ায় এত জল ধরে কিভাবে! সিসিফাস এতবার ঈশ্বরের নাম জপেছে যে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মিলেও পারেনি। তবুও ঈশ্বরের মন গলে নি। ওপারে একদল নারী-পুরুষ-শিশু ডুবে মরলো বানের জলে। ঈশ্বর ব্যস্ত ছিলেন শায়েস্তা করতে মেঘ আর সমুদ্রকে। সিসিফাসের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন।

আজ সিসিফাসকে মুক্ত করে দেওয়া হল। কেমন তুলার মতো বাতাসে ভর করে উঠে গেল পাথরটা। সবই হল ঈশ্বরের ইশারায়। আজ থেকে সে তার জীবনের সম্পূর্ণ হকদার। তার কর্মফল এখন থেকে সে ভোগ করবে। ফল পাবে হাতে নাতে যেমনটি আর পাঁচটা মানুষ পায়। ঈশ্বরকে মানা না মানা তার মর্জি। সে ইচ্ছে করলেই কোনও কাজ মাঝপথে রেখেই চলে যেতে পারবে অন্য কোনও কাজে। কাজ যে করতেই হবে তারও কোনও বাধা ধরা নিয়ম নেই। আবার বসে থাকতেই বা কতক্ষণ ভালো লাগে? তবে ঈশ্বরেরও কিছু শর্ত আছে। সিসিফাসকে বলা হলো তাকে মানুষের জীবন যাপন করতে হবে। এবং সে যেহেতু অভিশপ্ত তার কখনও মৃত্যুও হবে না। সিসিফাস তো বিনা-বাক্যে রাজী। বেশ আনন্দের সাথে ঈশ্বরের সব শর্ত মেনে নিলো সে। মানুষের জীবন তো আর কম বহুরূপী নয়! হাজার রকমের জীবন মানুষের- সবগুলো একটার পর একটা যাপন করতে করতেই কেটে যাবে তার মৃত্যুহীন কয়েক জীবন।

সিসিফাস নেমে এলো মানুষের ভিড়ে। এখন তার সবকিছুতেই ভাল লাগছে। যা করছে তাতেই সে খুঁজে পাচ্ছে নতুন নতুন উদ্যম। ঢাকঢোল পিটিয়ে বিয়ে করা, সন্তান বড় করা, সন্তানের বিয়ে দেওয়া, জুম চাষ করা, অফিস আদালতে কাজ করা- কি করল না সে? কয়েক-জীবন সে কাটিয়ে দিলো মহা আনন্দে। কিন্তু এ আনন্দেও ভাটা পড়লো একদিন। চোখের সামনে মানুষগুলো কেমন বড় হয়, বদলায় তারপর একসময় চলেও যায়। আবার আসে নতুন মানুষ। তারাও যায় একদিন। সিসিফাস থেকে যায়। মানুষ বদলায়, সিসিফাস বদলায় না। তার কাজও বদলায় না। সিসিফাস দেখতে পায়, সে পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে মানুষগুলো একটার পর একটা আসছে যাচ্ছে। সিসিফাসও গড়াচ্ছে তাদের সাথে। গড়াচ্ছে তো গড়াচ্ছেই। সব মানুষই বিয়ে করে, কাজ করে মাঠে-ঘাটে, সন্তান হয়, সন্তান আবার সম্পূর্ণ মানুষ হয়, বুড়ো হয়, রোগ-শোক হয়, তারপর মারা যায়। আরও যা করে- খায়, হাগে, ঝগড়া করে, ভালবাসে, নিয়ম করে ঘুমায়, নিয়ম করে জাগে- একই ছকে বাধা সব। দূর থেকে দেখলে সবাই এক একজন সিসিফাস। তবে এরা ঢের বেশি ভাগ্যবান কারণ এদের মৃত্যু আছে, ভোগান্তিরও আছে শেষ। আছে সবকিছু একপেশে হওয়ার আগেই সমাপ্তি। এজন্যেই আছে সবকিছুতে এত ভাল লাগা! সিসিফাসের মৃত্যু নেই কাজেই অনন্তকাল কেবলই তার মানুষ মানুষ অভিনয় করে যাওয়া। মানুষদের দেখে খুব হিংসে হল তার। আহ! কি চমৎকার বেঁচে থাকা।

সিসিফাস আবার ঈশ্বরের কাছে ধরনা দিলো- এবার মৃত্যু চাই তার। হোক সে যত কষ্টের মৃত্যু। মানুষের ভিড়ে থাকায় ঈশ্বরের চোখ এড়াইনি তার আকুতি। ঈশ্বর নিজেও চাচ্ছিলেন সিসিফাস মুক্তি পাক। শুধু তার আকুতির অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। তবে এবারও তিনি একটা শর্ত জুড়ে দিলেন- বিনা শর্তে ঈশ্বর তো কিছু দেন না- এটা তাঁর ধর্মে নেই! তিনি বললেন, সিসিফাসকে মৃত্যুর পর মানুষের সাথেই থাকতে হবে- হয় স্বর্গ নয় নরকে- অনন্তকাল। একবার মৃত্যু হওয়া মানেই দ্বিতীয়বার মৃত্যুর সম্ভাবনা একেবারে নাকচ হয়ে যাওয়া। জীব মাত্রেই একবার জন্মায়, একবার মরে। মৃত্যুর পরের যে জীবন সেটা ঈশ্বরের মতোই মৃত্যুহীন। ঈশ্বর চাইলেও আর মারতে পারবেন না কোনও জীবিত-মৃতকে, কেননা মৃত্যু দিয়েই জয় করা সে জীবন। সব শোনার পর সিসিফাসের সমস্ত সম্ভাবনা নিমিষেই উবে গেল। সে স্বর্গ কিংবা নরক কোথাও যেতে চায় না। যে জীবন অনন্তকাল- একপেশে, যার কোন শেষ নেই, তার আবার স্বর্গ আর নরক কিসের! সিসিফাস শেষ চায়। সে চায় তার অস্তিত্ব শিশির বিন্দুর মতো, ঝরা পাতার মতো, পাখির গানের মতো নেই হয়ে যাক চিরকালের জন্যে। ঈশ্বর সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন- শেষ বলে কিছু তো নেই! থাকলে খোদ ঈশ্বরই কয়েক কোটি বছর আগেই বলেছেন- আর ভাল লাগে না!

সিসিফাস আবার ফিরে গেল হাজার হাজার বছর আগের ফেলে আসা সেই জীবনে। পাথর গড়াতেই থাকে…। এবার আর কোনও প্রার্থনা নেই, নেই কোনো অভিযোগ। তার ভাবনায় ঈশ্বর আর সে সমানে সমান! দুজনেই একই নিয়মে বন্দি।
একটা একটা করে মানুষের মৃত্যু হয় আর সিসিফাস হাসে- করুণার হাসি।

জন্ম সন : ১৯৮৬ জন্মস্থান : মেহেরপুর, বাংলাদেশ। মাতা ও পিতা : মোছাঃ মনোয়ারা বেগম, মোঃ আওলাদ হোসেন। পড়াশুনা : প্রাথমিক, শালিকা সর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং শালিকা মাদ্রাসা। মাধ্যমিক, শালিকা মাধ্য বিদ্যালয় এবং মেহেরপুর জেলা স্কুল। কলেজ, কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন। স্নাতক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরেজি অনার্স, ফাইনাল ইয়ার)। লেখালেখি : গল্প, কবিতা ও নাটক। বই : নৈঃশব্দ ও একটি রাতের গল্প (প্রকাশিতব্য)। সম্পাদক : শাশ্বতিকী। প্রিয় লেখক : শেক্সপিয়ার, হেমিংওয়ে, আলবেয়ার কামু, তলস্তয়, মানিক, তারাশঙ্কর প্রিয় কবি : রবীন্দ্রনাথ, জীবননান্দ দাশ, গ্যেটে, রবার্ট ফ্রস্ট, আয়াপ্পা পানিকর, মাহবুব দারবিশ, এলিয়ট... প্রিয় বই : ডেথ অব ইভান ঈলিচ, মেটামরফোসিস, আউটসাইডার, দি হার্ট অব ডার্কনেস, ম্যাকবেথ, ডলস হাউস, অউডিপাস, ফাউস্ট, লা মিজারেবল, গ্যালিভার ট্রাভেলস, ড. হাইড ও জেকিল, মাদার কারেজ, টেস, এ্যনিমাল ফার্ম, মাদার, মা, লাল সালু, পদ্মা নদীর মাঝি, কবি, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিলে কোঠার সেপাই, ভলগা থেকে গঙ্গা, আরন্যক, শেষের কবিতা, আরো অনেক। অবসর : কবিতা পড়া ও সিনেমা দেখা। যোগাযোগ : 01717513023, [email protected]

মন্তব্যসমূহ

  1. সাগর নভেম্বর 28, 2012 at 6:50 পূর্বাহ্ন - Reply

    অসাম
    (Y)

  2. কাজি মোঃ আশিকুর রহমান নভেম্বর 27, 2012 at 9:01 অপরাহ্ন - Reply

    সরল ভাষায় অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলেছেন। 🙂

  3. হেলাল নভেম্বর 26, 2012 at 8:31 পূর্বাহ্ন - Reply

    @ মোজাফ্ফর হোসেন,
    আমি অপেক্ষায় থাকি কখন আপনার লেখা আসে।
    বরাবরের মতোই জিনিয়াস লেখা।
    যদিও দেশে এতগুলো দুর্ঘটনায় মনটা খারাপ হয়ে আছে।
    ধন্যবাদ

    • মোজাফফর হোসেন নভেম্বর 26, 2012 at 9:02 পূর্বাহ্ন - Reply

      @হেলাল, OLধন্যবাদ। সত্যিই মনটা এতই খারাপ যে সবকিছু কেমন বিস্বাদ লাগে।

  4. কাজি মামুন নভেম্বর 25, 2012 at 9:06 অপরাহ্ন - Reply

    ভাল লেগেছে, মোজাফফর ভাই! (Y)

মন্তব্য করুন