এফ্লুয়েঞ্জা শব্দটার সাথে হয়তো অনেকেই কম-বেশী পরিচিত। দুটো ইংরেজি শব্দ, এফ্লুয়েন্স ও ইনফ্লুয়েঞ্জা-এর সমন্বয়ে ইংরাজী ভাষায় শব্দটির আবির্ভাব হয়েছে। শব্দটির উদ্ভাবক তারাই, যারা এর অন্তর্নিহীত ভাবটাকে আকার দিয়েছেন। কি আছে এই শব্দটার ভিতরে, যা আজকের দিনে ভীষন ভাবে প্রাসঙ্গিক? আরো চাই, আরো চাই করে পাগল হয়ে যাওয়া একটা সামাজিক অবস্থা যা সর্ব ক্ষেত্রে ভারাক্রান্ততা, ঋন, বিষন্নতা এবং অপচয়ের মত উপসর্গ নিয়ে সংক্রমিত করে চলে এক থেকে বহুতে- এফ্লয়েঞ্জার ধারনা অনেকটা এরকমই। ইংরাজী ভাষাভাষী মানুষের ভিতরে একটা খুব চালু প্রবাদ আছে-‘কিপ আপ উইথ জোনসেস’। সামাজিক কৌলিন্য রক্ষার কারনে কোন একজন প্রতিবেশীকে মাপকাঠি ধরে সেভাবে চলার প্রবনতা থেকে প্রবাদটির উদ্ভাবন ঘটেছে। জোন্সের সঙ্গে থাকতে না পারাটা একটা আভিজাত্যের পতন। যেভাবেই হোক বিশেষ মাপকাঠি অনুসারে আভিজাত্যটা ধরে রাখতে হবে- এমন একটা অযৌক্তিক প্রচেষ্টা, বাড়তি মনোচাপ ও কাজ, অপচয় ও ঋন কোন দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে একমাত্র উপায় এমন রাষ্ট্রীয় দর্শনের প্রয়োগ অথবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আত্মবিদ্ধংশী আসক্তি সামাজিক মহামারি হিসাবে এফ্লুয়েঞ্জার প্রাদুর্ভাব ঘটাতে পারে।

এফ্লুয়েঞ্জার প্রবক্তারা মনে করেন- বস্তবাদী উন্নতির সীমাহীন বর্ধন ও ভোগ যদি বেশী বেশী কাঙ্খিত ও পুরস্কৃত হয় তবে একটা সুন্দর ও শান্তিময় জীবনের স্বপ্নের চেয়ে একটা সর্বব্যপি অতৃপ্তি ও অর্থহীনতা বেশী প্রকট হয়ে উঠে। এই ধরনের একটা নেতিবাচক মানষিক অবস্থা এফ্লুয়েঞ্জার মত একটা ব্যাধির জন্ম দিতে পারে। এই রোগের শিকার যারা তারা একটা গোষ্ঠি বা দল যারা এমন একটা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবস্থার ভিতর দিয়ে প্রভুত সম্পদের মালিক হয়, যারা অনেক বস্তুগত ভোগ সামগ্রী পাবার পরেও নিজেদের অতৃপ্ত ও ক্ষুধার্থ হিসাবে আবিস্কার করে শুধুমাত্র আরো বেশী পাবার দুর্ণিবার আকাঙ্খা পোষণ করার কারণে। এভাবে এক সময় দেখা যায়, এই রোগে আক্রান্ত লোকেরা তাদের ভোগ্য সামগ্রী থেকে তৃপ্তি পেতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে তাদের চিন্তা ও সময়কে বস্তু গ্রাস করে ফেলে আগ্রাসী হয়ে। তখন ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা এবং সুখ-শান্তির অনুভূতির গুরুত্ব তদের কাছে ঔজ্জল্য হারায়।

বৃটিশ মনোবিজ্ঞানী অলিভার জেমস মনে করেন- বস্তুগত উন্নতির বৈসাম্যের সাথে এফ্লুয়েঞ্জার আগ্রাসনের একটা অন্তরগত সম্পর্ক রয়েছে। সমাজে যত বেশী অর্থনৈতিক বৈসাম্য থাকবে, সেখানে ততো বেশী সুখ ও শান্তিহীনতা বিরাজ করবে। এই অবস্থাটার ফায়দা লোটে বিজ্ঞাপণী সংস্থাগুলো। তারা তাদের ম্যানিপুলেটিভ বৈশিষ্টের দ্বারা বৈসাম্য জর্জরিত মানুষের ভিতরে কৃত্রিম উপযোগ বা চাহিদা তৈরী করে। সেইসব উপযোগে সাড়া দেয় মানুষ, অনেকটা নিরুপায় হয়ে, অগ্র-পশ্চাত অতকিছু না ভেবে, অনেক সময় সামাজিক একটা স্ট্যাটাস বা কৌলিন্যের মানদন্ড রক্ষার কারনে। এই ভাবে বিজ্ঞাপন ভোক্তার আর্থ-সামাজিক চরিত্র গড়ে তোলে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসাম্যের মাত্রা ও রকমফের ভেদে জেমস পৃথিবীর বড় বড় শহর যেমন- সিডনি, সিঙ্গাপুর, অকল্যান্ড, মস্কো, সাংহাই, কোপেনহেগেন, নিউইয়র্ক প্রভৃতি নগরীর মানুষের সাথে কথা বলে এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছেন- তীব্র ভোগবাদী সমাজে অতি মাত্রায় মানষিক বৈকল্যের একটা অন্যতম কারন তাদের ভোগের পিছনে মাত্রাতিরিক্ত দৌড়ের প্রবণতা। বিভিন্ন উতস থেকে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে জেমস মানষিক অসুস্থ্যতার ব্যপকতার বিপরীতে আয়ের বৈসাম্য বসিয়ে একটা গ্রাফ তৈরী করেন, যেখানে তিনি দেখাতে সক্ষম হন ইউরোপের মূল ভূখন্ডের লোকদের থেকে ইংরেজী ভাষাভাষী লোকদের ভিতরে ইমোশনাল বা আবেগীয় বৈকল্য অনেক বেশী- প্রায় দ্বিগুন। এর কারন অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান ইংরেজী ভাষাভাষী মানুষের ভিতরে অর্থ, সম্পদ, স্থাবর-অস্থাবর, চেহার ও আভিজাত্য, এবং প্রসিদ্ধিকে সবার উপরে রাখা হয় এবং বিশেষভাবে মুল্যায়ন করা হয়। বাজার বিন্যাসে উদার রাজনৈতিক সরকারি নীতি, যা ইংলিশ ভাষাভাষী রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত এবং ‘স্বার্থপর পুজিবাদ’ ব্যবস্থার ধারক ও বাহক। মূলত এমন একটা আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাই ইংরাজী ভাষাভাষী রাষ্ট্র সমূহে এফ্লুয়েঞ্জার ব্যপকতার জন্য দায়ী। অপেক্ষাকৃত কম ‘স্বার্থপর পুজিবাদ’ ব্যবস্থার ইউরোপের মূল ভূখন্ডে এফ্লুয়েঞ্জার আগ্রাসন তুলনামূলক ভাবে তাই অনেক কম।

কিভাবে এফ্লুয়েঞ্জা নামের এই সামাজিক ব্যাধি থেকে বেরিয়ে আসা যায়, কোন উপায়ে? মনোবিজ্ঞানীদের কাছে এর হয়তো কোন ক্লিনিক্যাল সমাধান রয়েছে, কিন্ত এই লেখায় সে বিষয়ে আলোকপাত করার সুযোগ কম। মোটা দাগে আমাদের সাধারন বিচার বুদ্ধিতে যে সমাধান দেয়, তা হলো- নিজেকে প্রশ্ন করার অভ্যাস, অন্য কথায় আত্মজিজ্ঞাসার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সমাজের ঘাড়ের উপর চেপে থাকা ভোগবাদের নেতিবাচক ভুতগুলো ঝেড়ে ফেলা যেতে পারে, যদি কি না মানুষ ভিতর থেকে জেগে উঠা প্রকৃত চাহিদা আর উড়ে এসে জুড়ে বসা কৃত্রিম অভাবের ভিতরে পার্থক্য করতে শিখে ফেলে- যদি কিনা তারা প্রথমটাকে দ্বিতীয়টার উপরে স্থান দেওয়ার সাহস ও ইচ্ছা পোষন করে। আত্মজিজ্ঞসা প্রকল্পে সাহসের কোন বিকল্প নেই।

বলা যত সহজ করা ততো সহজ নয়। একটা গড্ডালিকা প্রবাহে পরিভ্রমনরত মানুষ কিভাবে বুঝবে কোনটা তার প্রকৃত চাহিদা আর কোনটা তার কৃত্রিম অভাব? মনে হয় এখানে একটা বাস্তব উদাহরন দিয়ে বিষয়টাকে পরিস্কার করা যেতে পারে। ধরা যাক, দবির আর খবির দুই প্রতিবেশী। দবির কাজ করে একটা সফটঅয়ার কম্পানীতে। ভীষন ব্যস্ত, কথা বলার সময় পায় না- কাজ করতে হয় বারো থেকে চৌদ্দ ঘন্টা। মাইনে সে ভালই পায়। আর খবিরের অবস্থা একেবারে ভিন্ন। তার বাবা অঢেল অর্থ-সম্পদ রেখে গেছে তার জন্যে। কোন কাজ তাকে করতে হয় না, করেও না সে তেমন কিছু। তাই তার কোন ব্যস্ততাও নেই। ওদিকে রাত জেগে কাজ করাতে প্রতিদিন দবিরের দেরী হয়ে যায় আপিস যেতে। অথচ সকাল বেলায় নাস্তা করে যাওয়া কতটাই না জরুরী। দবির তাই একদিন একটা মাইক্রোওয়েভ ওভেন কিনে ফেললো। এখন সে নিয়মিত সকালের নাস্তাটা করে যেতে পারে। ওভেনটা তার অনেক কাজে আসছে। সে সুখী। খবিরের ব্যপারটা বেশ একটু আলাদা। সকাল বেলায় তার কোন তাড়া নেই- যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন ওঠে সে। ব্যাস্ততা না থাকলে কি হবে, প্রতিবেশীর দেখাদেখি সেও কিনে ফেললো আরো সুন্দর একটা মাইক্রোওয়েভ অভেন। যন্ত্রটাই এখন বিরাট বিরক্তির কারণ হলো খবিরের জন্য। আগে সকালের নাস্তা বানাতে দেরী হতো, তখন বেশ রয়েসয়ে শরীরটাকে নেড়েচেড়ে খেলিয়ে ক্ষুধা লাগিয়ে তারপর প্রাতরাশ সারতো। এখন আর সেই উপায় নেই। এখন ঘুম থেকে উঠতে না উঠতে খাবার তৈরী হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি খেয়ে নেবার তাড়া আসে। যন্ত্রটা কিনে তৃপ্ত হওয়া দূরে থাক, ওটার উপরে তার একটা বিরক্তি এসে যায়। কি আর করা অবশেষে মনটাকে প্রবোধ দেয় এই বলে- জিনিসের একটা ইজ্জত আছে না, তা না হলে জাতে উঠতো সে কিভাবে? খবিরের ব্যাপারটা যে কৃত্রিম অভাব আর দবিরেরটা প্রকৃত চাহিদা এটা বুঝতে মনেহয় রকেট-সাইন্স জানার দরকার হবে না।

বাংলাদেশীয় প্রেক্ষাপটে এফ্লুয়েঞ্জার স্থিতি এবং বিকাশ কোন মার্গে তা একবার বিশ্লষন করে দেখা যেতে পারে। এদেশের সমাজে অর্থনৈতিক বৈসাম্যটা প্রকট এবং বিভতস রূপে দৃশ্যমান। অন্য কথায়, ধনী ও গরীবের ভিতরে অর্থনৈতিক ব্যবধান বিপুল। জীবনের মৌলিক উপাদান সংগ্রহে একজন সর্বোচ্চ ধনী আর একজন সর্বনিন্ম দরীদ্র মানুষের সক্ষমতার যে বিপুল ব্যবধান তার থেকে একটা ধারনা নেয়া যেতে পারে এদেশে এফ্লুয়েঞ্জার প্রকটতার। বাঙালী সমাজে এরোগের বিস্তার জানতে হলে শ্রেনীচরিত্রের ব্যপারটা এসেই যায়। এখানে প্রতিটা মানুষের ভিতরে সুবিধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে অগুনিত শ্রেনীতে বিভাজিত হয়ে এক একটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল উপদল গঠন করে টিকে থাকার প্রবনতা দেখা যায়। মোটা দাগে সম্পদের ভিত্তিতে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্ত এই তিন শ্রেনী থাকলেও পেশাভিত্তিক শ্রেনী অগুনিত। এছাড়াও আছে লিঙ্গ, বর্ণ, ধর্ম, বয়স, ভাষা, শিক্ষা প্রভৃতির ভিত্তিতে বিন্যাস্ত শ্রেনী সমূহ। শ্রেনী থাকলে শ্রেনীসংগ্রামও থাকবে। তাই দেখা যায় এক শ্রেনীর অন্য শ্রেনীর উপরে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রবনতা। অভিজাত-কুলিন কে না হতে চায়! তাই প্রতিটা শ্রেনীর মানসপটে কৌলিন্যের যে মান দন্ড তা প্রায় একরকম হলেও সেসবের একটা ঐতিহাসিক পটভূমিতো আছেই। এক এক আমলে আভিজাত্য রক্ষার উপকরন সমূহ ভিন্ন ভিন্ন হলেও সমাজের কাছে তার আবেদন সব কালে এক ও অভিন্ন। জাতে উঠার জন্য বাঙালী তাই লড়াকু, কুলিন হবার আকুতি তার সারা অন্তর জুড়ে। বিজ্ঞাপন ওলারা তার আকুতি মেটাতে এগিয়ে আসে তাই দরাজ হাতে। গন্তব্যে পৌছানোর পথ বাতলে দেয় বিচিত্র ভঙ্গিতে। পথ বাতলে দেয় সে সবাইকে- সামার্থ্য যার আছে তাকে আবার যার নেই তাকেও। এক্ষেত্রে এফ্লুয়েঞ্জা বাসা বাঁধে দুই শ্রেনীর মানুষেরই মনে। তবে দুই শ্রেনীতে তার প্রতিকৃয়া ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রকাশ পায়। সামর্থ্যবানেরা ভোগে তৃপ্তি খুজে খুজে অতৃপ্ত থেকে যায়, আবার সামার্থ্যহীনেরা ভোগ করার জন্যে হাহাকার করে যায়। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বেসরকারী খাত মোটামুটি চাঙ্গা হওয়ায় শ্রমজীবি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রেনীর হাতে পয়সা এসেছে। ফলে বেশ বড় একটা শ্রেনীর মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তে উত্তোরণ ঘটেছে। এবার তাই বিজ্ঞাপনের স্বর্গে আর তাদের মনের হাহাকার মেটানোয় কোন বাধা নেই। তাই ঠিক মোক্ষম সময়ে দুরারোগ্য মহামারী আক্রমন করে বসে।

হঠাত করে কেউ প্রশ্ন করতে পারে- যার পয়সা আছে সে কিনবে, খাবে তাতে কার কি ক্ষতি? ক্ষতি একজনের না, ক্ষতি সবার, ক্ষতি সারা পৃথিবীর। কম ভোগ পরিবেশ বান্ধব- একথা বোধকরি কাউকে আর ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতে হয় না। খাবার কথাই ধরা যাক- বেশী খাবার খেলে শরীর থেকে কঠিন, তরল, বায়বীয় বর্জও বেশী নির্গত হয়, ঠিক পরিমান মত খেলে যা হতো না। সব ভোগের ব্যপারেও একই কথা প্রযোজ্য। ভোগের সাথে প্রকৃত চাহিদার কোন সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক আছে এফ্লুয়েঞ্জার সাথে। অতিভোগ এফ্লুয়েঞ্জার উপসর্গ যা অসুস্থ্য প্রতিযোগীতা বাড়ায়, বাড়ায় দুর্নীতি, হানাহানি, মানুষের অন্তর্গত সুখের জগতে তোলে মরুভূমির লু হাওয়া। তাই যে পশ্চিমে একদিন এফ্লুয়েঞ্জার জন্ম সেখানেই পরিবেশ বাচানোর স্বার্থে গড়ে উঠেছে এন্টি-কঞ্জিউমেরিস্ট সোসাইটি, সিম্পল লাইফ মুভমেন্ট, এন্টি-গ্লোবাল মুভমেন্ট সহ আরো অনেক কল্যানকর প্রতিষ্ঠান।

আমাদের ইচ্ছার উপরে এফ্লুয়েঞ্জার স্থিতি এবং প্রলয়। আমারা ইচ্ছা করলে একে পুষে রাখতে পারি আবার ইচ্ছে করলে তার করলে তার খতম তারাবীও পড়তে পারি। তাই এটা একটা সখের অসুখ। নীচের প্রামান্য ভিডিওটা অসুখটাকে বুঝতে সহায়ক হতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ
উইকিপেডিয়া
গুগোল সার্চ

[38 বার পঠিত]