ম্যাট রিডলির “Genome- Autobiography of a Species in 23 chapters” এর “ইউজেনিক্স” অধ্যায়টা নিজের মত করে লিখলাম, কিছু নিজস্ব চিন্তা সহ। বিজ্ঞানের ইতিহাসের ইউজেনিক্স অধ্যায়টা মানুষের কাছে অনেকটাই ধোঁয়াটে, মানুষের এই অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সৃষ্টিবাদীরা স্বভাবসুলভ চাপাবাজি করে ফায়দা লুটার চেষ্টা করে। শুধু আইডিওয়ালাদের ঠ্যাঙানোর জন্য না, মানবিক কারণেও এ সম্পর্কে লেখার তাড়না বোধ করেছি। একটি আইডিয়া দুনিয়াকে বদলে দিতে পারে। সেই পরিবর্তনটা যে সবসময় সুখকর হয় না, এই লেখায় সেটাই দেখানোর চেষ্টা করব।

যেহেতু পুরো একটা অধ্যায় ভাবানুবাদ করেছি এবং নিজের কিছু ইন্টারজেকশনও আছে, তাই পোস্টটা বিশাল বড়। বাদামী রঙের শব্দগুলোর টীকা পোষ্টের শেষে দেওয়া আছে।

:line:

সর্বোচ্চ ক্ষমতার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে জনগণের কোন বিকল্প আছে কিনা আমার জানা নেই, আর আমরা যদি জনগণকে সেই ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যথেষ্ঠ পরিমাণে আলোকিত মনে না করি, তবে জনগণের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে না নিয়ে বরং জনগণকে আলোকিত করাটাই সঠিক সমাধান হবে।- থমাস জেফারসন।

মানুষের জিনোমে ২৩টা ক্রোমজোম আছে। এর মধ্যে লিঙ্গ নির্ণায়ক এক্স আর ওয়াই ক্রোমজোম বাদ দিলে আয়তনের উপর ভিত্তি করে ক্রোমজোমগুলোকে ১ থেকে ২২টা নম্বর দেওয়া যায়, যার মধ্যে ২২ নম্বরেরটা সবচেয়ে ছোট। পরে অবশ্য দেখা গিয়েছে যে ২১ নম্বরটাই সবচেয়ে ছোট, কিন্তু এই ক্রোমজোমটা ডাউন’স সিনড্রোম ঘটানোর জন্য “বিখ্যাত” হওয়ার কারণে গবেষকরা আর নাম্বারিং বদলাননি। ২১ নম্বর ক্রোমজোমে জিন সংখ্যা সবচেয়ে কম, একারণেই বোধহয় এই ক্রোমজোমটি একটি সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের জিনোমে দু’টার বদলে তিনটা থাকতে পারে। সাধারণত একটা ক্রোমজোমের দুইয়ের অধিক কপি থাকলে শরীর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে না, কিছু কিছু শিশুর জিনোমে অত্যধিক সংখ্যায় ক্রোমজোম ১৩ কিংবা ১৮ থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে তারা কয়েকদিনের বেশি বাঁচতে পারে না। যেসব শিশু একটা বাড়তি ক্রোমজোম ২১ নিয়ে জন্মে, তারা আপাতঃদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলেও তাদের কিছু ভয়ানক সমস্যা আছে। আমরা কথ্য ভাষায় তাদেরকে “এবনরমাল” বলি, তবে ব্যাধিটির বৈজ্ঞানিক নাম “ডাউন্স সিনড্রোম”(Down’s Syndrome)। বেটে, মোটা, ছোট ছোট চোখ, চেহারার মধ্যে একটু খুশি খুশি ভাব- সবাই তাদেরকে এভাবেই চিনে। এরা মানসিকভাবে অপরিপক্ব, এদের দ্রুত বয়োবৃদ্ধি ঘটে, কারও কারও আলঝেইমারের রোগও হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা তাদের চল্লিশতম বর্ষপূর্তির আগেই মৃত্যবরণ করে।

সাধারণত বয়স্ক মাতার গর্ভে ডাউন সিন্ড্রোমের ভুক্তভোগীদের জন্ম হয়। প্রতি ২৩০০ জন বিশ বছর বয়স্কা মায়ের গর্ভে হয়ত একজন ডাউন্স রোগী পাওয়া যাবে, কিন্তু মা’দের বয়স চল্লিশ হলে প্রতি ১০০ জনে অন্তত একজনের সন্তান এই রোগের ভুক্তভোগী হবে। ঠিক এ কারণেই ডাউনস্‌ সিন্ড্রোম ধারণ করা ভ্রূণগুলোর মা’রা জেনেটিক স্ক্রিনিংয়ের শরণাপন্ন হন। অনেক দেশে তো বয়স্ক মা’দের উপর এমনিওসেন্টেসিস প্রায় চাপিয়েই দেওয়া হয়। যদি ভ্রুণের জিনোমে বাড়তি ক্রোমজোমটি পাওয়া যায়, তবে হয় ভ্রুণটির জননীকে গর্ভপাতের প্রস্তাব দেওয়া হয় নয়ত গর্ভপাতে বাধ্য করা হয়। কেউই একজন ডাউন’স রোগীর অভিভাবক হতে চায় না। এই পুরো ব্যাপারটা নিয়ে দু’রকম অভিমত পাওয়া যায়। এক পক্ষ মনে করে এই জেনেটিক স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে নির্মম সব শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবন যাপন করা থেকে একটি হবু শিশুকে বিনা ব্যাথায় রেহাই দেওয়া হচ্ছে। বাপ-মাও রেহাই পেল, শিশুও রেহাই পেল; যে কখনও জন্মই নেয় নাই, সে কি জীবনের সুখ-দুঃখ বুঝবে? তবে আরেক পক্ষের লোকজনের কাছে এটা সরাসরি শিশুহত্যা, তথাকথিত উৎকর্ষতার নাম করে এবং প্রতিবন্ধীদেরকে কলঙ্কচিহ্নিত করে যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। একটা ভ্রুণকে কোন যুক্তিতে “মানুষ” আখ্যা দেওয়া হবে বা হবে না- সেই জটিল বিতর্ক এই পোস্টের আধেয় না। আমি বরং ইউজেনিক্সের ইতিহাস এবং ডারউইনিয়ান থিওরীর নিহিতার্থ নিয়েই বেশি আগ্রহী।

“ইউজেনিক্স” শব্দটার অর্থ কি? অক্সফোর্ডের বিজ্ঞান অভিধান বলছে জেনেটিক্সের জ্ঞান খাটিয়ে কোন জনগোষ্ঠীকে “উন্নত” করার প্রক্রিয়াকেই ইউজেনিক্স বলে। ইউজেনিক্স দু’ প্রকার- ধনাত্মক ইউজেনিক্স কিছু নির্দিষ্ট জেনোটাইপ বহনকারী মানুষের মধ্যে প্রজনন উৎসাহিত করে। যেমন ধরেন- প্রচুর অভিবাসী আছে এমন একটি বর্ণবাদী রাষ্ট্র ঘোষণা করল যে প্রজননের জন্য শ্বেতাঙ্গদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রণোদনা দেওয়া হবে। এর জন্য রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্যামপেইনিং হতে পারে, যেমন শ্বেতাঙ্গদের কাছ থেকে শুক্র ও ডিম্বকোষ নিয়ে টেস্ট টিউবে নিষেক করানো(ইন ভিট্রো ফারটিলাইজেশন, বা আইভিএফ), ডিম্বকোষ প্রতিস্থাপন, ক্লোনিং ইত্যাদি। ঋণাত্মক ইউজেনিক্স ঠিক উল্টো কাজটা করে, অর্থাৎ, অনাকাঙ্খিত মানুষদেরকে প্রজনন করা হতে নিরুৎসাহিত করে। যেমন, এশীয়/কৃষ্ণাঙ্গ/সমকামী কিংবা শারীরিক-মানসিক প্রতিবন্ধকতার মত “অনাকাঙ্খিত” বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়ার জন্য সরকার যদি আপনাকে বলপূর্বক বীজাণুমুক্ত বা sterilize করে(অর্থাৎ, আপনার প্রজননক্ষমতা কেড়ে নেয়) কিংবা গর্ভপাত করতে বাধ্য করে, তবে সেটি ঋণাত্মক ইউজেনিক্স হবে। ধনাত্মক হোক আর ঋণাত্মকই হোক, দু’টোই কিন্তু জোড় করে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া যেতে পারে। নাৎসি জার্মানিতে সুস্থ নারীদের জন্য গর্ভপাত নিষিদ্ধ ছিল।

ইউজেনিক্সের ধারণাটা প্রবর্তন করেছিলেন চার্লস ডারউইনের কাজিন ফ্রান্সিস গ্যালটন। সৃষ্টিবাদী মুমিনদের কাছে এটা খুবই প্রিয় একটা তথ্য। মুমিন যুক্তি অনুযায়ী- ডারউইনের কাজিন অপরাধ করলে সেটা ডারউইনের দোষ, আর ডারউইন দোষ করলে সেটা হবে ডারউইনের তত্ত্বের দোষ! কিন্তু মুমিনদের জন্য দুঃসংবাদ হল, দুনিয়াটা মুমিন যুক্তি অনুযায়ী চলে না। কোন বিজ্ঞানীর বৈজ্ঞানিক কর্মকে তাঁর ফ্যামিলি ট্রি দিয়ে বিচার করা হয় না, মিথ্যা-প্রতিপাদনযোগ্যতা, গবেষণাগারে গবেষণালদ্ধ ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর যোগ্যতা, এবং সর্বোপরি তাঁর তত্ত্বের স্বপক্ষে প্রমাণের আলোকেই একজন বিজ্ঞানীর কর্মকে মূল্যায়ন করা হয়। ডারউইনের কাজিন ছিলেন মুদ্রার একদম উলটা পিঠ। ডারউইন ছিলেন মেথডিক্যাল, লাজুক এবং ধৈর্য্যশীল। গালটন আবার একটু পাগলাটে টাইপের। ভয়াবহ মেধাবী ছিলেন তিনি, আড়াই বছর বয়সে পড়তে শিখে ৪ বছর বয়সে জীবনের প্রথম চিঠি লিখে ফেলেছিলেন, পঞ্চম জন্মদিনের আগেই তিনি গুণ করা ও সময় বলতে শিখেছিলেন, যেখানে অন্তত ৭ বছর বয়স হওয়ার আগে একটি স্বাভাবিক শিশু এসবের কিছুই করতে পারে না। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা চষে বেড়িয়েছিলেন, যমজদের নিয়ে গবেষণা আর উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলেন, আর স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি ইউটোপিয়ার। ইউটোপিয়ার স্বপ্ন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ইউজেনিক্স নামক দুঃস্বপ্ন প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ডারউইনের তত্ত্ব সবসময়ই রাজনৈতিক অপব্যবহারের ঝুঁকিতে ছিল। দার্শনিক হারবার্ট স্পেন্সার ডারউইনের কর্ম অধ্যায়ন করে উৎফুল্ল হয়েছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন ডারউইনের তত্ত্ব laissez-faire অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তি প্রস্তরের উপর দাঁড়া করিয়ে দিয়েছে, তৎকালীন ভিক্টোরীয় সমাজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে বৈধতা দিয়েছে: তিনি এর নাম দিয়েছিলেন সামাজিক ডারউইনবাদ। গ্যাল্টনের চিন্তাভাবনা ছিল ভিন্ন। আমরা যদি গবাদি পশু ও শস্যের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ধারকদের মধ্যে বারংবার প্রজনন ঘটিয়ে কালের বিবর্তনের সেই প্রজাতিগুলোকে নিজেদের চাহিদামত পরিবর্তন করতে পারি, তবে মানুষের ক্ষেত্রে কেন একই কাজ করতে পারব না? আমরা যদি কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে উন্নত প্রজাতির গবাদি পশু ও উদ্ভিদ শস্য তৈরী করতে পারি, তবে সুনিয়ন্ত্রিত প্রজননের মাধ্যমে উন্নত প্রজাতির মানুষ তৈরী করতে সমস্যা কোথায়? এখানে উল্লেখযোগ্য যে কৃত্রিম নির্বাচনের প্রক্রিয়াটা বেশ প্রাচীন। রোমানরা তো এর চর্চা করতই, ২০০০ বছরের পুরনো নথি এবং আরও প্রাচীন গ্রন্থগুলোতেও এ ব্যাপারে নির্দেশনা আছে। ১৮৮৫ সালে গ্যালটন প্রথম “ইউজেনিক্স” শব্দটি প্রবর্তন করেন।

হারবার্ট স্পেনসার এবং ফ্রানসিস গ্যালটনরা যখন মনুষ্য প্রজাতিকে “উন্নত” করার কথা বলেন, তখন তাঁরা আসলে কি বোঝাচ্ছেন? বিয়ের জন্য পাত্র-পাত্রী বাছাইয়ে খুঁতখুঁতে হওয়া? সেই ব্যাপারে আমরা বহু কাল আগে থেকেই খুঁতখুঁতে! নাহ, স্পেনসার এবং গ্যালটনরা এই “উন্নয়ন” প্রকল্পের ভারটা ব্যক্তির হাতে না দিয়ে রাষ্ট্রের হাতে অর্পণ করতে চেয়েছিলেন। গ্যালটনের সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী অনুসারী ছিলেন কার্ল পিয়ারসন, একজন র‍্যাডিক্যাল সাম্যবাদী ও মেধাবী পরিসংখ্যানবিদ। জার্মানির উদীয়মান অর্থনৈতিক ক্ষমতা দেখে ভয় পেয়ে পিয়ারসন ইউজেনিক্সকে উগ্র দেশপ্রেমে(jingoism) রুপান্তর করে ফেললেন। ব্যক্তিকে না, রাষ্ট্রকেই উগ্র দেশপ্রেমিক হতে হবে। নিজ মহাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে চাইলে ব্রিটেনকে তার নাগরিকের উপর নৈর্বাচনিক প্রজনন(selective breeding) চাপিয়ে দিতে হবে। রাষ্ট্রই বলে দিবে কাকে বিয়ে করব আর কাকে করব না। ইউজেনিক্সের জন্মলগ্নে এটি রাজনীতির ছত্রছায়ায় বিজ্ঞান ছিল না, বরং বিজ্ঞানের ছত্রছায়ায় রাজনীতি ছিল।

ঊনবিংশ শতকের দিকে ইউজেনিক্স ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেল। পরিকল্পিত প্রজননের ব্যাপারে জনগণের মধ্যে একটা মোহ সৃষ্টি হয়েছিল। সমগ্র ব্রিটেন জুড়ে ইউজেনিক্স নিয়ে নানা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে লাগল। ১৯০৭ সালে গ্যালটনকে লেখা এক পত্রে পিয়ারসন লিখেছিলেন, ‘বাচ্চারা শারীরিক-মানসিকভাবে দুর্বল হলে অনেক মধ্যবিত্ত মহিলাকেই বলতে শুনেছি, “ওহ, বিয়েটা তাহলে ইউজেনিক হয়নি!”। Boer যুদ্ধের সময় যেসব সৈন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের দুর্বল অবস্থার জন্য “অনুপযুক্ত” প্রজননকেই দায়ী করা হয়েছিল, যেন অর্থনৈতিক ও জীবনযাপনের মানের বৈষম্যের কোন অবদানই নেই! জার্মানিতেও একই নাটক হচ্ছিল। সেখানে এমনিতেই কর্তৃত্ববাদী দর্শনের দাপটের ফলে জীববিজ্ঞানের সাথে জাতীয়তাবাদের মিলন ঘটতে বেশি সময় লাগেনি। তবে তখনও সেটি স্রেফ মতাদর্শই ছিল, বাস্তবে তখনও প্রয়োগ ঘটেনি।

অবস্থা তখনই বেগতিক হল যখন এক শ্রেণীর প্রজনন উৎসাহিত করার পাশাপাশি আরেক শ্রেণীর প্রজননে বাধা দান করা শুরু হল। কাদেরকে প্রজননের জন্য “অনুপযুক্ত” গণ্য করা হয়েছিল? মাদকাসক্ত, মৃগী রোগী, অপরাধী, সমকামী, মানসিক প্রতিবন্ধী ইত্যাদি। এদের সবাইকে “feeble minded” আখ্যা দিয়ে জোড়পূর্বক বীজাণুমুক্ত করা হয়েছিল। গ্যালটন আর পিয়ারসনের একজন আমেরিকান ভক্ত চার্লস ড্যাভেনপোর্ট ১৯০৪ সালে ইউজেনিক্স নিয়ে গবেষণার জন্য কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাব খুলেছিলেন। রাজনৈতিকভাবে রক্ষণশীল(আমেরিকার ডানপন্থী) ড্যাভেনপোর্ট “যোগ্যতর” মানুষের মধ্যে প্রজনন উৎসাহিত করার চেয়ে “feeble-minded”দের প্রজনন বন্ধেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। ড্যাভেনপোর্টের বিজ্ঞানের জ্ঞান ছিল শিশুতোষ। তাঁর ভাবনা ছিল, “মেন্ডেল যেহেতু প্রমাণ করেছেন যে প্রজন্মান্তরে বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার একটি আণবিক প্রক্রিয়া(তখনও বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্য দায়ী “অণু” বা জিন আবিস্কৃত হয়নি), তাই আমেরিকাকে এখন কোনমতেই একটি বহুজাতিক রাষ্ট্রে পরিণত করা যাবে না”। যাকে তাকে বিয়ে করতে দিলে আমেরিকাতে ইউজেনিসিস্টদের ভাষায় “ফিট” বা সুস্বাস্থ্যবান লোক পাওয়া যাবে না; তিনি আরও মনে করতেন যেসব পরিবারে নাবিকের সংখ্যা বেশি, সেসব পরিবারে থ্যালাসোফিলিয়ার জিন আছে(থ্যালাসোফিলিয়া মানে সমুদ্রপ্রীতি)। তবে রাজনীতিতে তিনি এতটা অর্বাচীন ছিলেন না, বেশ প্রভাবশালীই ছিলেন। একই ব্যক্তির মধ্যে অর্বাচীন বিজ্ঞান আর প্রভাবশালী রাজনীতিকের কম্বো থাকলে সেটা মোটেই সুখকর হয় না। আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী হেনরি গডার্ড Kallikaks নামক একটি প্রতিবন্ধী পরিবার নিয়ে খুব প্রভাবশালী একটি বই লিখেছিলেন, সেখানে তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন “feeble-mindedness” বৈশিষ্ট্যটা জেনেটিক। ধারণা করা হয় তাঁর ওই “feeble-minded” পরিবারটি আসলে একদমই কাল্পনিক। যাই হোক, তাঁর বইটি বগলদাবা করে ড্যাভেনপোর্ট আমেরিকার রাজনীতিবিদদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে আমেরিকা একটি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী রাষ্ট্র হতে চলেছে। থিওডোর রুজভেল্ট বলেছিলেন যে একজন সুনাগরিকের একটি অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব হল সন্তানসন্ততি রেখে যাওয়া। তবে “খারাপ” নাগরিকদের ও পথ মাড়ানোর দরকার নাই, অন্তত ইউজেনিসিস্টরা তাই মনে করতেন।

আমেরিকানদের ইউজেনিক্সপ্রীতির পেছনে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব প্রবল ছিল। পূর্ব আর দক্ষিণ ইউরোপ থেকে যখন দলে দলে অভিবাসীরা আমেরিকায় আসছিল, তখন আমেরিকার বিদ্যমান “অভিজাত” এংলো-স্যাক্সন ইংরেজদের মাঝে আমেরিকার জাতিগত “বিশুদ্ধতা” নিয়ে উন্মাদনা চাগিয়ে তোলাটা কঠিন কিছু ছিল না। আপনি যদি ইংরেজদের ইতিহাস দেখেন, ব্যাপারটা আপনার কাছে খুবই হাস্যকর মনে হবে। পৃথিবীতে কোন জাতিই “বিশুদ্ধ” না, প্রত্যেকটা জাতির রক্তের সাথে অন্য কোন জাতির রক্ত ইতিহাসের কোন না কোন পর্যায়ে মিশেছে। যাদেরকে “বিশুদ্ধ ইংরেজ” বলা হয়, এদের ধমনীতে একাধারে কেলটিক, ভাইকিং আর রোমান রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। ইংরেজদের আরেকটা নাম ছিল এঙলো-স্যাক্সন, কারণ ইংরেজ জাতি প্রধানত জার্মানি থেকে আগত এঙ্গলস আর স্যাক্সন জাতির হাইব্রিড। বস্তুত, “এঙ্গলস” শব্দটা থেকেই “ইংল্যান্ড’ এসেছে, আর “এঙ্গলস” এসেছে জার্মানির “Angeln” অঞ্চল থেকে। যেসব এংলো-স্যাক্সনরা শুরু থেকেই তীব্রভাবে অভিবাসনবিরোধী ছিল, তাদের কাছে ইউজেনিক্স আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। আমেরিকার Immigration restriction Act of 1924 ইউজেনিক্স ক্যামপেইনিংয়ের সরাসরি ফসল ছিল। এই এক্ট পূর্ব ইউরোপিয়ানদের আমেরিকাতে প্রবেশাধিকারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল এবং চল্লিশ বছর ধরে সংবিধানে অসংশোধিত ছিল।

তবে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করা ইউজেনিসিস্টদের একমাত্র সাফল্য ছিল না। ১৯১১ সালের মধ্যে আমেরিকার অন্তত ছয়টি রাজ্য আইন করে প্রতিবন্ধীদের বীজাণুমুক্ত করেছিল। ৬ বছর পর আরও নয়টি রাজ্য তাদের সাথে যুক্ত হল। তাদের যুক্তি ছিল যে রাষ্ট্র যদি একজন অপরাধীর জীবন নিতে পারে, তবে একজন প্রতিবন্ধীর প্রজননের অধিকার কেড়ে নিতে ক্ষতি কি? ইউজেনিসিস্টদের কাছে একজন ধর্ষক আর একজন মানসিক প্রতিবন্ধীর কোন পার্থক্য ছিল না। প্রথম দিকে সুপ্রিম কোর্ট বীজাণুমুক্তকরণ সংক্রান্ত আইনগুলো বাতিল করলেও ১৯২৭ সালের দিকে উলটো দিকে হাটা শুরু করল।বাক বনাম বেইল কেইসে আদালত ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যকে ক্যারি বাক নামক এক কিশোরীকে বীজাণুমুক্ত করার অনুমতি দিলেন। ক্যারি তখন ১৭ বছর বয়সী মৃগী রোগী ছিলেন, লিঞ্চবার্গে মা এমা ও কন্যা ভিভিয়ানের সাথে বসবাস করতেন। তড়িঘড়ি করে কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করে মাত্র সাত মাস বয়সী ভিভিয়ানকে “নির্বোধ”(imbecile) আখ্যা দিয়ে আদালত ক্যারিকে বীজাণুমুক্ত করার নির্দেশ দিলেন! জাস্টিস ওলিভার ওয়েন্ডেল হোলমসের একটা কুখ্যাত উক্তি ছিল, “তিনটা নির্বোধ প্রজন্মই যথেষ্ঠ, আর দরকার নাই”। ভিভিয়ান ছোটবেলাতেই মৃত্যুবরণ করেছিল, আর “নির্বোধ” ক্যারি বুড়ো বয়সে পত্রিকায় ক্রসওয়ার্ড পাজল খেলে সময় কাটাতো। ক্যারির বোন ডরিসকেও তার অজান্তে বীজাণুমুক্ত করা হয়েছিল, সত্যটা জানার আগে বহু বছর ধরে বেচারী সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। ভার্জিনিয়া ১৯৭০ সাল পর্যন্ত্য এভাবে প্রতিবন্ধীদের বীজাণুমুক্তকরণ চালিয়ে গিয়েছে। ১৯১০ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত্য অন্তত এক লাখ তথাকথিত “নির্বোধ” মানুষ বীজাণুমুক্তকরণের শিকার হয়েছে।

আমেরিকা এটা শুরু করার পর অন্য দেশগুলোও একই রাস্তায় হাটা ধরল। সুইডেন ৬০০০০ মানুষকে বীজাণুমুক্ত করেছিল, কানাডা, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া এবং আইসল্যান্ডও বীজাণুমুক্তকরণ সংক্রান্ত আইন পাস করেছিল। জার্মানি প্রথমে ৪ লাখ মানুষকে বীজাণুমুক্ত করেছিল, পরে তাদের অনেককেই খুন করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাসপাতাল শয্যা খালি করার জন্য মাত্র ১৮ মাসে ৭০০০০ বীজাণুমুক্তকৃত জার্মান মানসিক রোগীকে গ্যাস মেরে খুন করা হয়েছিল।

তবে খোদ ব্রিটেনে কখনও এরকম আইন পাস হয়নি। চিকিৎসক এবং হাসপাতালগুলো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই কাজ করলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে কখনও বীজাণুমুক্তকরণকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। প্রোটেস্ট্যান্ট দেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেনই কেবল ব্যতিক্রম ছিল। যেসব দেশে রোমান ক্যাথলিক চার্চের শক্ত প্রভাব ছিল, সেসব দেশে ইউজেনিক্স বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। নেদারল্যান্ডস এরকম আইন পাস করা এড়িয়ে গিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন বুদ্ধিমান মানুষদের শ্রেণী শত্রু আখ্যা দিয়ে খুন করাতে ব্যস্ত ছিল, “নির্বোধ” মানুষদের নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় ছিল না। ইউজেনিক্সের জন্মস্থান ব্রিটেন কেন এরকম কোন আইন পাস করেনি?

নাহ, ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের এক্ষেত্রে কোন অবদান নেই। আধুনিক যুগের বিজ্ঞানীরা যদিও দাবি করেন যে ইউজেনিক্সকে সবসময়ই “ছদ্মবিজ্ঞান” মনে করা হয়েছিল, যে মেন্ডেলের কর্মগুলোকে পুনঃআবিস্কারের পর মূলধারার বিজ্ঞানীরা ইউজেনিক্সকে অস্বীকার করেছিলেন, কিন্তু লিখিত ইতিহাসে বিজ্ঞানীদের এই মতামতের পক্ষে কোন প্রমাণ নেই। এটা সত্য যে ডারউইনিয়ান তত্ত্বের সাথে ইউজেনিক্সের সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। ডারউইনিয়ান তত্ত্বের মূল স্তম্ভ হল, অন্তত আধুনিক ডারউইনিয়ান তত্ত্বের মূল স্তম্ভ হল- প্রাকৃতিক কারণে একটি জনগোষ্ঠীর জিনপুঞ্জে প্রকরণ সৃষ্টি হয়। এই প্রকরণগুলোর উপর বিভিন্ন নির্বাচনী চাপ কাজ করে, যেমন যৌন নির্বাচন, প্রাকৃতিক নির্বাচন, কিন সিলেকশন, গ্রুপ সিলেকশন ইত্যাদি। কোন নির্বাচনী চাপটি কাজ করবে সেটা নির্ভর করে আপনার রেফারেন্স ফ্রেমের উপর। আপনি জিন কিংবা কোন একক প্রাণীকে বিবেচনা করলে প্রাকৃতিক নির্বাচন কিংবা যৌন নির্বাচনের কথা বলা যেতে পারে। পুরো একটি জনপুঞ্জ, প্রজাতি কিংবা ট্যাক্সনকে বিবেচনা করলে গ্রুপ সিলেকশন কিংবা কিন সিলেকশন চলে আসে। নির্বাচনী চাপের কারণে হয় কিছু প্রকরণ বিলুপ্ত হয়, নয়ত সেগুলো জিনপুঞ্জে কিংবা জনপুঞ্জে(আগেই বলেছি, ব্যাপারটা আপনার রেফারেন্স ফ্রেমের উপর নির্ভর করে) সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। দীর্ঘ সময় ধরে জিনপুঞ্জে এরকম পরিবর্তনের ফলে যখন একটি জনপুঞ্জ আরেকটি জনপুঞ্জের সাথে প্রজননে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখনই আমরা বলি যে বিবর্তনের মাধ্যমে একটি নতুন প্রজাতি সৃষ্টি হয়েছে। কে টিকে থাকবে আর কে বিলুপ্ত হবে, সেটা নির্ভর করে যোগ্যতা বা fitness এর উপর। প্রকৃতিতে সেই প্রাণীটিকেই “যোগ্য” বলা হয় যে সর্বোচ্চ সংখ্যাক সন্তান-সন্ততি রেখে যায়। শুধু সন্তান রেখে গেলেই হবে না, সেই সন্তানগুলোকে প্রজননের জন্য সক্ষম করেও যেতে হবে, একটি প্রাণীর জিন প্রজন্মের পর প্রজন্মে তার বংশধরদের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়লে তাকে কোনভাবে “যোগ্য” বলা যাবে না।

যোগ্যতার এই সংজ্ঞা আমাদের মানব সমাজে খাটে না। আমরা কথ্য ভাষায় যোগ্য বলতে সাধারণত “মেধাবী” মানুষদের বুঝিয়ে থাকি। যোগ্যতা নিজেই একটা সাবজেকটিভ বিষয়, তার উপর মেধা তো আরও সাবজেকটিভ! রবীন্দ্রনাথ আর আইনস্টাইন- দু’জনই নিজস্ব ফিল্ডে মেধাবী। আবার কালজয়ী মেটাল ব্যান্ড মেটালিকার গায়ক-গিটারিস্ট জেমস হেটফিল্ডও মেটাল সঙ্গীতের ফিল্ডে একজন মেধাবী ব্যক্তিত্ব, হেটফিল্ডের সাথে আইনস্টাইন-রবীন্দ্রনাথ অথবা আমাদের প্রাচ্যীয় সঙ্গীতের গায়কদের তুলনা চলে না। মানব সমাজে যেখানে মেধা, স্বাস্থ্য নির্বিশেষে সবাই বেশ ভালমতই সন্তান-সন্ততি রেখে যেতে পারছে, সেখানে আপনি কোন যুক্তিতে তথাকথিত “নির্বোধ” ব্যক্তিদের প্রজননের জন্য অক্ষম আখ্যা দিয়ে বীজাণুমুক্ত করবেন? ইউজেনিসিস্টরা জানতেন না যে একটি জেনেটিক বৈশিষ্ট্য ফেনোটাইপে প্রকাশ পেতে হলে তাকে অবশ্যই প্রকট(dominant) হতে হবে। আমাদের প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী জিনগুলোর একটি কপি বাবা থেকে পাই, আরেকটি কপি মা’র কাছ থেকে পাই। কিছু কিছু রোগ আছে যেগুলোর জন্য দায়ী মিউট্যান্ট জিনটির শুধু দু’টো কপি উপস্থিত থাকলেই কেবল প্রকাশ পায়। আবার কিছু কিছু জিন প্রকৃতিগতভাবেই জিনোমের অন্য জিনগুলোকে দাবিয়ে রাখে, যাকে বলে এপিস্ট্যাসিস। আর পিতা-মাতার জিনোমে ক্ষতিকর জিন থাকলেই যে সেটি সন্তানের জিনোমে চলে আসবে এমনটি মনে করার কারণ নেই, কারণ পিতা মাতার জিনোমের জিনগুলো থেকে কেবল অল্প কিছু জিন তাদের জননকোষের ক্রোমজোমে প্রবেশ করে, এবং কোন জিনগুলো জননকোষে যাবে সে ব্যাপারে কোন নির্দেশনা নেই।

এত কিছু বলার কারণ, এসব তথ্য থেকে একটা জিনিস পরিস্কার হওয়ার কথা যে বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার নিয়ে ইউজেনিসিস্টদের ধারণা আসলে অতি সরলীকরণ, এবং এই অতি সরলীকরণের কারণেই ইউজেনিক্স বর্জনীয়। এসব থেকে আরেকটা বিষয় পরিস্কার হওয়া উচিত যে ইউজেনিক্সের সাথে ডারউইনিয়ান তত্ত্বের চেয়ে জেনেটিক্সের সম্পর্কই বেশি। অবশ্য বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানকে জেনেটিক্স থেকে আলাদা করে দেখার কারণ নেই, জিন ছাড়া বিবর্তনের একটি পরিপূর্ণ মডেল দাঁড়া করানো অসম্ভব।

যাই হোক, ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানীরা তখন ইউজেনিক্সের বিরুদ্ধে মাঠে নামেননি। ইউজেনিক্সের কল্যাণে তৎকালীন রাজনীতিতে বিজ্ঞানীদের কদর অনেক বেড়ে গিয়েছিল, বিজ্ঞানীরা স্বাভাবিকভাবেই এই নতুন টেকনোক্রেসিতে নিজেদেরকে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে আবিস্কার করে যথেষ্ঠ উৎফুল্ল হয়েছিলেন, জার্মানিতে অর্ধেকেরও বেশি জীববিজ্ঞানী নাৎসি বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। বিজ্ঞানীরা উলটো ইউজেনিক্স বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারকে গুতিয়েছিলেন। স্যার রোনাল্ড ফিশার এঁদের মধ্যে অন্যতম। মজার বিষয় হল- ফিশার, গ্যালটন, পিয়ারসনরা পরিসংখ্যানবিদ্যার জনক হলেও কেউ ইউজেনিক্সের জন্য পরিসংখ্যানবিদ্যাকে দোষারোপ করে না, মুমিনদের খেদ কেবল বিবর্তন নিয়েই! মুমিনরা মূলত আদম-হাওয়ার গল্পকে রক্ষার করার উদ্দেশ্যেই ইউজেনিক্সকে অস্ত্র বানিয়ে বিবর্তনবিদ্যার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে। তবে আমাদেরকে মানবিকতার খাতিরেই ইউজেনিক্সের প্রকৃত কাহিনী জানতে হবে।

ফিশার একজন সত্যকারের মেন্ডেলিয়ান ছিলেন, কিন্তু একই সাথে তিনি ছিলেন ইউজেনিক্স সোসাইটির সহ-সভাপতি। ধনীদের চেয়ে গরীবদের বেশি পোলাপান থাকে, এই ব্যাপারটা ফিশারকে চিন্তিত করেছিল। প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী জুলিয়ান হাক্সলি এবং জে.বি.এস হ্যালডেন পরবর্তীতে ইউজেনিক্সের সমালোচক রুপে আবর্তিত হলেও ১৯২০ সালের আগে তাঁরা ইউজেনিক্সের সমর্থক ছিলেন; তাছাড়া তাঁরা মূলত ইউজেনিক্সের প্রয়োগ পদ্ধতিরই সমালোচক ছিলেন, ইউজেনিক্সের মূলনীতি নিয়ে তাঁদের কোন আপত্তি ছিল না।

ইউজেনিক্সকে প্রতিহত করার ব্যাপারে সাম্যবাদীদেরও কোন অবদান নেই। তিরিশের দশকে তাঁরা ইউজেনিক্সের বিরোধীতা শুরু করলেও এর আগ পর্যন্ত্য তাঁরা ইউজেনিক্সের পক্ষে যথেষ্ঠ বৌদ্ধিক বারুদ জুগিয়েছিলেন। এইচ জি ওয়েলস, জন মেইনার্ড কিনস, জর্জ বার্নার্ড শ, হ্যাভলক ইলিস, হ্যারল্ড লাসকি, সিডনি এবং বিয়েট্রিস ওয়েব- প্রত্যেকেই “নির্বোধ” লোকজনের প্রজনন বন্ধের পক্ষে কমবেশি মতামত প্রদান করেছিলেন। শ’এর ম্যান এন্ড সুপারম্যান নাটকের একটি চরিত্রের সংলাপ,

“’Being cowards, we defeat natural selection under cover of philanthropy: being sluggards, we neglect artificial selection under cover of delicacy and morality.”

এইচ জি ওয়েলসের কর্মেও এরকম অনেক উক্তি পাওয়া যায়, “লোকজনের মাঝে রোগ-জীবাণু ছড়ানো যেমন একজন অসুস্থ ব্যক্তির ‘ব্যক্তিগত’ ব্যাপার হতে পারে না, পাতলা মেঝের কক্ষে বসে উচ্চস্বরে শব্দ করাটা যেমন তার অধিকার হতে পারে না, তেমনই এই দুনিয়াতে একজন মানুষ যত সন্তান নিয়ে আসে তাদের কেউই সেই ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তি হতে পারে না”। আবার,

It has become apparent that whole masses of human population are, as a whole, inferior in their claim upon the future … to give them equality is to sink to their level, to protect and cherish them is to be swamped in their fecundity

সাম্যবাদীরা যেহেতু সবসময়ই ব্যক্তির উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিল, তাদের কাছে ইউজেনিক্স প্রথম থেকেই আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। প্রজনন প্রক্রিয়াকেও রাষ্ট্রীয়করণ করে ফেলতে হবে! ব্রিটেনের ফেবিয়ান সোসাইটি সবসময়ই ইউজেনিক্স আন্দোলনকে শক্তি প্রদান করার জন্য কুখ্যাত থাকবে।

বামপন্থী, ডানপন্থী নির্বিশেষে সেসময় ব্রিটেনে সবাই ইউজেনিক্সের পক্ষে ছিল। ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী Arthur Balfur ১৯১২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত বিশ্বের প্রথম ইউজেনিক্স সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন, সহ-সভাপতির মধ্যে ছিলেন লর্ড চিফ জাস্টিস এবং উইনস্টন চার্চিল। অক্সফোর্ড ইউনিওন ১৯১১ সালে ইউজেনিক্স নীতি প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছিল। চার্চিলের ভাষায়,

the multiplication of the feeble-minded was a very terrible danger to the race

তবে অল্প কয়েকজন একাকী ইউজেনিক্সের বিরোধীতাও করেছিলেন, যেমন Hilaire Belloc এবং জি.কে. চেস্টারটন। চেস্টারটন লিখেছিলেন,

eugenicists had discovered how to combine hardening of the heart with softening of the head

১৯১৩ এবং ১৯৩৪ সালে ব্রিটেনে ইউজেনিক্সের আইন প্রায় পাসই হয়ে গিয়েছিল। ১৯১৩ সালে অল্প কয়েকজন সাহসী ও নিঃসঙ্গ প্রতিপক্ষ কোনমতে আইনটি ঠেকাতে পেরেছিলেন। ১৯০৪ সালে সরকার র‍্যাডনরের আর্লের তত্ত্বাবধানে “নির্বোধ”দের নিয়ন্ত্রণ ও দেখাশোনা করার জন্য একটি রয়াল কমিশন গঠন করে। কমিশনের বেশিরভাগ সদস্যই ইউজেনিসিস্ট ছিল, তাই স্বভাবতই তাদের বিশ্বাস ছিল যে মানসিক প্রতিবন্ধকতা একটি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত রোগ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের Gerry Anderson এক থিসিসে দেখিয়েছিলেন যে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একটা দীর্ঘ সময় ধরে নানা লবিং গ্রুপ সরকারকে প্রচন্ড চাপে রেখেছিল। সদ্য গঠিত ইউজেনিক্স এডুকেশন সোসাইটি এমপি আর হোম সেক্রেটারির সাথে বারবার সাক্ষাৎ করেছিল আইনটি পাস করার জন্য।

হোম সেক্রেটারি হারবার্ট গ্ল্যাডস্টোন ইউজেনিক্সের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন না। কিন্তু তাঁর জায়গায় ১৯১০ সালে যখন উইনস্টন চার্চিল স্থলাভিষিক্ত হলেন, তখন ইউজেনিক্স আন্দোলনটি যেন নতুন প্রাণ পেল। চার্চিল প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছিলেন,

I feel that the source from which the stream of madness is fed
should be cut off and sealed up before another year has passed

তিনি চেয়েছিলেন মানসিক রোগীদের রোগ যেন তাদের সাথেই মৃত্যুবরণ করে। চার্চিল লুকিয়ে লুকিয়ে মানসিক রোগীদের উপর রঞ্জন রশ্মি প্রয়োগ করে কিংবা অস্ত্রোপচার করে তাদেরকে বীজাণুমুক্ত করার পক্ষে প্রচারণাও চালিয়েছিলেন। ১৯১০ এবং ১৯১১ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চার্চিল বিলটি পাস করতে ব্যর্থ হলেও ১৯১২ সালে নতুন হোম সেক্রেটারি রিজিনল্ড ম্যাককিনা অনেকটা অনিচ্ছা নিয়েই Mental Deficiency Bill পাস করেন। এই বিল “নির্বোধ” ব্যক্তিদের জন্য প্রজনন নিষিদ্ধ করেছিল এবং “নির্বোধ” ব্যক্তিদের বিয়ে করার জন্য শাস্তি প্রদান করেছিল। বিলটিকে ইচ্ছা করলেই সংশোধন করে জোরপূর্বক বীজাণূমুক্তকরণকে বৈধতা দেওয়া যেত।

এই বিলের বিরোধীতা করার জন্য একজন ব্যক্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- লিবার্টারিয়ান এমপি জোশিয়াহ ওয়েজউড। তিনি একটি খুবই প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য ছিলেন, তাঁর পরিবারের অনেক সদস্যের সাথে ডারউইন পরিবার বিবাহসূত্রে আবদ্ধ ছিল; গ্র্যান্ডফাদার-ফাদার ইন ল-ব্রাদার ইন ল- প্রত্যেকের নাম ছিল জোশিয়াহ ওয়েজউড। এখানে যে ওয়েজউডের কথা বলছি, ইনি ন্যাভাল আরকিটেক্ট। ইনি ১৯০৬ সালে সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন, পরে ১৯৪২ সালে হাউজ অব লর্ডসে যোগদান করেন। ডারউইনের সন্তান লিওনার্ড তখন ইউজেনিক্স সোসাইটির সভাপতি ছিলেন।

ওয়েজউড প্রচন্ডভাবে ইউজেনিক্সের বিরোধী ছিলেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল যে ইউজেনিক্স সোসাইটি সাধারণ মানুষকে গবাদি পশুর মত বিচার করছে, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তখনকার বিজ্ঞানীদের বংশগতির জ্ঞান এতই অপ্রতুল যে সেটার উপর ভিত্তি করে আইন প্রণয়ন তো দূরের কথা, কোন মতাদর্শও নির্মাণ করা সম্ভব না। তবে তাঁর উদ্বেগের প্রধান কারণ ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের বৃত্তে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ। যেই বিল রাষ্ট্রকে আপন নীড় থেকে কোন শিশুকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দেয়, স্রেফ জনশ্রুতির উপর ভিত্তি করে কোন কথিত “নির্বোধ” ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশকে ক্ষমতা প্রদান করে, সেই বিল তাঁকে খুবই ভীত করেছিল। জোশিয়াহ ওয়েজউডের পাশাপাশি লর্ড রবার্ট সেসিলের মত লিবারেল রাজনীতিবিদও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ণের বিপরীতে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ওয়েজউডের আক্রমণের ফলে সরকার বিলটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়, কিন্তু পরের বছর বিবাহ ও প্রজননের উপর বিধি-বিধান আরোপকারী আপত্তিকর অংশগুলো রদ করে আবার সংসদে উপস্থাপন করে। ওয়েজউড টানা দু’ রাত বসে বসে বিলটির জন্য আরও ২০০টা সংশোধনী প্রস্তাব করেন, কিন্তু যখন তাঁর সমর্থকের সংখ্যা মোটে চারজনে হ্রাস পেল তখন তিনি রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হলেন, এবং বিলটি অবশেষে পাস হল।

ওয়েজউড হয়ত নিজেকে ব্যর্থ ভেবেছিলেন, তবে তিনি আসলে মানব সভ্যতার জন্য একটা বিশাল উপকার করে গিয়েছেন। এই বিলটি পাসের ফলে মানসিক রোগীদের জন্য প্রজনন আসলেই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল, তবে ওয়েজউড অন্তত দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে এরকম কোন বৈষম্যকারী বিল বিনা প্রতিরোধে পাস হতে দেওয়া হবে না। তিনি ইউজেনিক্সের আরেকটি কেন্দ্রীয় ক্রুটি শণাক্ত করেছিলেন- ইউজেনিক্স মজ্জাগতভাবেই একটি অত্যাচারী ও নিষ্ঠুর মতবাদ, এটি রাষ্ট্রকে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত জীবনে সরাসরি হস্তক্ষেপের অধিকার দেয়। ইউজেনিক্সের পেছনের বিজ্ঞান যদি সঠিকও হয়, তবুও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করার স্বার্থে এই মতবাদকে আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলতে হবে। কোন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হলেই নৈতিকভাবে সঠিক হয় না।

তিরিশের দশকের মন্দার সময় বেকারত্ব যখন তুঙ্গে, তখন হঠাত করেই ইউজেনিক্স আবার পুনরুজ্জীবিত হল। ব্রিটেনে ইউজেনিক্স সোসাইটিগুলোর সদস্য সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেল, জনগণ বেকারত্ব আর দারিদ্র্যের জন্য “জাতিগত আপজাত্য”কে দোষারোপ করতে লাগল, যেমনটা পূর্বের ইউজেনিসিস্টরা ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন। এবার বেশিরভাগ দেশ ইউজেনিক্স আইন পাস করল। সুইডেন আর জার্মানি ১৯৩৪ সালে জোরপূর্বক বীজাণুমুক্তকরণের আইন পাস করেছিল। ব্রিটেনেও ইউজেনিক্স আইন পাস করার জন্য চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছিল, এর পেছনে দায়ী ছিল মানসিক রোগের উপর “উড রিপোর্ট” নামক একটি সরকারি প্রতিবেদন(এই কমিটির সদস্যরা তিন প্রকার মানসিক রোগী সংজ্ঞায়িত করেছিল- ১) idiot ২) imbecile ৩) feeble-minded)। তবে হাউজ অব কমন্সে যখন এরকম একটি বিল ব্লক হল, তখন এই ইউজেনিক্স লবি গ্রুপ আমলাবাহিনীর উপর নজর দিল। তারা ডিপার্টমেন্ট অব হেলথকে স্যার লরেন্স ব্রকের তত্ত্বাবধানে একটি কমিটি গঠণে বাধ্য করেছিল যারা মানসিক রোগীদের বীজাণুমুক্তকরণ নিয়ে কাজ করবে। এই ব্রক কমিটি আমলা দিয়ে গঠিত হলেও অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট ছিল; এক আধুনিক ইতিহাসবিদের মতে, তারা ইউজেনিক্সের দাবিগুলো যাচাই-বাছাই করার চেষ্টাটা পর্যন্ত্য করেনি। এই কমিটির সদস্যরা বিশ্বাস করত যে মানসিক প্রতিবন্ধকতা একটি জেনেটিক রোগ, যে মানসিক রোগীরা সাধারণের চেয়ে দ্রুততর বংশবৃদ্ধি করে; তারা নিজেদের বিশ্বাসের বিপক্ষে সব তথ্য-উপাত্ত এড়িয়ে গিয়ে শুধু স্বপক্ষের উপাত্তগুলোই গ্রহণ করেছিল। মানসিক রোগীদের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার ব্যাপারেও তারা উদাসীন ছিল। ১৯৩১ সালের এক জীববিজ্ঞানের বইয়ের একটি বাক্য দেখুন,

Many of these low types might be bribed or otherwise persuaded to accept voluntary sterilization

ব্রক রিপোর্ট ছিল খাটি প্রোপাগান্ডা। এই কমিটি যেভাবে একটি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছিল, কিছু “বিশেষজ্ঞ”কে পৃষ্ঠপোষণ করেছিল এবং জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ক্যামপেইনিং করেছিল, ঠিক একই কায়দায় পরবর্তী সময়ের আমলাগোষ্ঠী বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সম্পর্কিত সচেতনা দমিয়ে রাখার জন্য ক্যামপেইনিং করেছিল।১০ প্রতিবেদনটির উদ্দেশ্য ছিল বীজাণুমুক্তকরণ বিল পাস করানো, কিন্তু সেই বিল আর পাস হয়নি। এবার এককভাবে অন্য কোন ওয়েজউড থেকে প্রতিরোধ আসেনি, বরং সামগ্রিকভাবেই ব্রিটেনের বুদ্ধিজীবিদের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন এসেছিল। মনোবিজ্ঞানের ফিল্ডে আচরণবাদীদের গবেষণা আর মানব প্রকৃতির উপর পরিবেশের প্রভাব নিয়ে মার্গারেট মিডের নৃতাত্ত্বিক গবেষণা জে.বি.এস হ্যালডেনের মত অসংখ্য ইউজেনিক্সপন্থী বিজ্ঞানীকে নিজের ভুল বুঝতে সহায়তা করেছিল। লেবার পার্টিও ইউজেনিক্স সম্পর্কে মত পালটিয়ে একে প্রলেতারিয়াতের বিরুদ্ধে “শ্রেণী যুদ্ধ” হিসেবে দেখা শুরু করল। ক্যাথলিক চার্চের আপত্তিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাজে এসেছিল।১১

১৯৩৮ সালের পর যখন জার্মানি থেকে খবর আসা শুরু করল, তখনই বীজাণুমুক্তকরণের ভয়াবহত পুরোপুরি পরিস্কার হতে শুরু করল। ১৯৩৪ এর জানুয়ারিতে সক্রিয় হওয়া নাৎসীদের বীজাণুমুক্তকরণের আইনের প্রশংসা করে ব্রক কমিটি বোকামি করেছিল, কিন্তু এরপর আর কোন সন্দেহ বাকি থাকল না যে ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী, নির্যাতনের স্রেফ একটি অযুহাত। ব্রিটিশদের অবশেষে সুমতি হল।১২

ইউজেনিক্সের মূল সমস্যা হল এর দমননীতি। সমাজকল্যাণের অনেক প্রোগ্রামের মত ইউজেনিক্সও ব্যক্তির অধিকারের উপরে সমাজের মঙ্গলকে প্রাধান্য দেয়। ইউজেনিক্স একটি মানবিক অপরাধ, বৈজ্ঞানিক না। কুকুর-বিড়ালের ক্ষেত্রে ইউজেনিক প্রজনন যেরকম সফল মানুষের ক্ষেত্রেও সেরকম সফল হবে- এই দাবি এখন আর কেউ করে না। নৈর্বাচনিক প্রজননের মাধ্যমে মানসিক ব্যাধির প্রকোপের হার হ্রাস করা ও জনস্বাস্থ্যের মান উন্নত করা ঠিকই সম্ভব, কিন্তু এর জন্য মানবিকবোধ বলতে যা বোঝায় তাকে আমাদের সর্বাঙ্গে বিসর্জন দিতে হবে। ওয়েজউডকে কার্ল পিয়ারসন বলেছিলেন, “সমাজের জন্য যা কল্যাণকর সেটাই নৈতিক, এ ছাড়া নৈতিকতার আর কোন সংজ্ঞা নাই”। এই কুৎসিত মন্তব্যটাই হোক ইউজেনিক্সের সমাধিলিপি।

এরপরও আমরা যখন পত্রিকায় বুদ্ধিমত্তার জিন, জার্মলাইন জিন থেরাপি, কিংবা প্রিন্যাটাল ডায়াগনসিস এবং স্ক্রিনিংয়ের কথা পড়ি, কেন যেন মনে হয় ইউজেনিক্স এখনও বেঁচে আছে। মানব প্রকৃতির অনেক কিছুই যে জন্মগত- ফ্রান্সিস গ্যালটনের এই দাবিটির পক্ষে এখন অনেক ভাল প্রমাণ পাওয়া যাবে, যদিও কোনটিই চূড়ান্ত নয়। জেনেটিক স্ক্রিনিংয়ের কারণে আজকাল বাবা-মারা তাদের সন্তানের জিন নির্বাচন করতে পারছেন। দার্শনিক ফিলিপ কিচার জেনেটিক স্ক্রিনিংকে laissez-faire eugenics আখ্যা দিয়েছেন- প্রত্যেকটি মানুষ শুধুমাত্র তার নিজের উপর ইউজেনিসিস্ট হিশেবে কাজ করতে পারবে, পূর্বের ইউজেনিসিস্টদের মত গোটা সমাজের উপর চাপিয়ে দিবে না। প্রত্যেকটি মানুষ প্রাপ্তিসাধ্য জেনেটিক পরীক্ষা ব্যবহার করে স্বীয় বোধবুদ্ধি অনুযায়ী “সঠিক” প্রজননগত সিদ্ধান্তটি নিতে পারবে।১৩

এভাবে চিন্তা করলে দুনিয়াজুড়ে হাসপাতালগুলাতে প্রতিদিনই ইউজেনিক্স চর্চা হচ্ছে, এর প্রধান “ভিক্টিম” হল আল্লাহর অশেষ কৃপায়(!) একটা বাড়তি ক্রোমজোম ২১ নিয়ে জন্মানো কিছু ভ্রুণ যারা ভবিষ্যতে ডাউন’স সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হবে। এই ভ্রুণগুলো যদি বেঁচে থাকত, তাহলে তাদের আয়ুস্কাল অত্যন্ত ছোট হত, বাড়াবাড়ি রকমের ছোট, আমাদের যদি নিজেদের জন্ম-মৃত্যুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকত তবে আমরা এত ক্ষুদ্র আয়ুস্কাল নিয়ে পৃথিবীতে আসার চেয়ে বরং অস্তিত্বহীনতার অতল গহ্বরকেই বেছে নিতাম। ওই ভ্রুণগুলো বেঁচে থাকলে সুখী হত কিনা জানি না, তবে ঝুঁকি নেওয়ার দরকার কি? যার কখনওই জীবন ছিল না, তাকে কিভাবে খুন করে? যার কখনওই কিছু ছিল না, মালিকানার ধারণাটাই যার কাছে অবাস্তব, তার কি বঞ্চনাবোধ থাকতে পারে? যাই হোক, লেখার এই পর্যায়ে আমরা গর্ভপাত বিতর্কের কিনারে পদার্পণ করছি- একজন মায়ের কি ভ্রুণ ধ্বংস করার অধিকার আছে, অথবা রাষ্ট্র কি একজন নারীকে গর্ভধারণে বাধ্য করতে পারে? আপনি হয়ত বলবেন যে ভ্রুণ হত্যা শিশু হত্যারই সামিল, সেক্ষেত্রে আপনাকে ব্যাখ্যা করতে হবে একটি কোষের গোলককে ঠিক কি কারণে আপনি একটি জলজ্যান্ত শিশু আখ্যা দিচ্ছেন। একগাদা কোষের জটলা ঠিক কখন “মনুষ্যত্ব” লাভ করে? একটি মাত্র কোষ থেকে মানুষের মত একটি আবেগ-অনুভূতি-চৈতন্যযুক্ত বহুকোষী ও ভীষণ জটিল প্রাণীতে রুপান্তরের প্রক্রিয়ায় আদৌ কি কোন একক “ধাপ” আছে যেখানে এই বহুকোষী সংগঠন “মনুষ্যত্ব” লাভ করে? এতসব জটিল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ায় ঝামেলায় না গিয়ে আপনি দাবি করতে পারেন, “এই ভ্রুনটা তো ভবিষ্যতে একজন মানুষের রুপান্তরিত হবে, আমরা এই ভ্রুণকে হত্যা করতে পারি না”। এখানে লক্ষণীয় যে আপনি বলছেন ভ্রুণটি ভবিষ্যতে মানুষ হবে, অর্থাৎ, ভ্রুণটি বর্তমানে মানুষ নহে।

চেকমেইট :))

যাই হোক গর্ভপাত বিতর্কের অবসান ঘটানো এই লেখার উদ্দেশ্য না, আমরা আবার ইউজেনিক্সে ফিরে যাই। আমরা কি সরকারী ইউজেনিক্স পলিসি উৎখাত করে বেসরকারী ইউজেনিক্সের ফাঁদে পা দিচ্ছি না? অভিভাবকরা চিকিৎসক, স্বাস্থ্য-বীমা প্রতিষ্ঠান, এমনকি সমাজের কাছ থেকেও গর্ভপাতের জন্য চাপ পেতে পারে। ’৭০ এর দশকে অনেক নারীকে চিকিৎসকরা গর্ভপাত করতে বাধ্য করতেন কারণ তাদের গর্ভের ভ্রুণে জেনেটিক ডিফেক্ট ছিল। এখন সরকার যদি অপপ্রয়োগ ঠেকানোর জন্য জেনেটিক স্ক্রিনিং নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে পৃথিবীতে অনেকগুলো “ডিফেক্টযুক্ত” প্রাণ নিয়ে আসার জন্য সরকারকে দায়ভার নিতে হবে, এই প্রাণীগুলো তাদের ক্ষুদ্র জীবনে যে পরিমাণ শারীরিক ও মানসিক বেদনার শিকার হবে তার দায়ভারও সরকারকে নিতে হবে। সরকারের জন্য এ এক জটিল নৈতিক সমস্যা যেখানে হ্যাঁ বললেও দোষ, না বললেও দোষ। আমরা কোন আদর্শ দুনিয়ায় বাস করি না, এই অনাদর্শ দুনিয়ায় বহু নৈতিক সিদ্ধান্ত শতভাগ ক্ষতিমুক্ত নয়। কিচার মনে করেন এই সিদ্ধান্তটি একটি একান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, “মানুষ কোন কোন বৈশিষ্ট্যকে গ্রহণ কিংবা বর্জন করবে সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার”। ডিএনএর সর্পিল আকৃতির সহ-আবিস্কারক জেমস ওয়াটসনরেও একই কথা, “এইসব কাজকর্ম অতি পন্ডিত লোকজনের হাত থেকে দূরে রাখা উচিত………… এই জেনেটিক প্রযুক্তির ব্যবহারকারীদের হাতেই জেনেটিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ন্যাস্ত দেখতে চাই, সরকারের হাতে না।”১৪

কিছু কিছু প্রান্তিক বিজ্ঞানী এখনও জনপুঞ্জের জেনেটিক অবনতি নিয়ে চিন্তিত১৫, তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানী গোষ্ঠীর কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তির কল্যাণের উপর গুরুত্ব আরোপ করার পক্ষপাতী। জেনেটিক স্ক্রিনিং আর ইউজেনিক্সের মাঝে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে- জেনেটিক স্ক্রিনিং হল ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত মানদন্ডের উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিতে ক্ষমতাযুক্ত করার সাথে সম্পর্কিত, অন্যদিকে ইউজেনিক্স হল প্রজননকে মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থের বদলে রাষ্ট্রের স্বার্থের লক্ষে নির্দিষ্ট করার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। জেনেটিক্সের অগ্রগতির সাথে চাগিয়ে ওঠা নতুন সব বিতর্কে অংশগ্রহণ করার সময় আমরা প্রায়ই এই পার্থক্যটা ভুলে যাই। যখন প্রশ্ন তোলা হয় যে “আমরা” কোন কোন সিদ্ধান্ত অনুমোদন করব, তখন এই “আমরা” বলতে আসলে কাকে বোঝানো হয়- ব্যক্তিসমষ্টিকে, নাকি রাষ্ট্র অথবা গোত্রকে?

দুইটা আধুনিক উদাহরণ পর্যালোচনা করা যাক। যুক্তরাষ্ট্রে Committee for the Prevention of Jewish Genetic Disease স্কুল শিক্ষার্থীদের রক্ত পরীক্ষা করে ভবিষ্যতে বৈবাহিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে উপদেশ প্রদান করে, যাতে কোন বিশেষ রোগের জন্য দায়ী একই মিউট্যান্ট জিন বহনকারী হবু স্বামী ও স্ত্রী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হয়। এটা একটা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক সিদ্ধান্ত। একে “ইউজেনিক” আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে কিন্তু এখানে আদতে কোন জোড়জবরদস্তি নেই, যা কিনা ইউজেনিক্সের সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্য।১৬ অন্যদিকে চীনে এখনও জোড়জবরদস্তি করে বীজাণুমুক্তকরণ ও গর্ভপাত করানো হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী চেন মিং ঝ্যাং মন্তব্য করেছিলেন যে পুরাতন বিপ্লবী গোষ্ঠী, জাতিগত সংখ্যালঘু ও অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে “নিকৃষ্ট” বৈশিষ্ট্যসমূহ মহামারীর রুপ নিয়েছে। ১৯৯৪ সালে পাসকৃত “ম্যাটারনাল এন্ড ইনফ্যান্ট হেলথকেয়ার ল” বাবা-মার বদলে চিকিৎসকের হাতে গর্ভপাতের অধিকার ন্যাস্ত করেছে। আমেরিকার পাঁচ শতভাগের বিপরীতে প্রায় নব্বই শতভাগ চীনা জিনবিজ্ঞানী এর পক্ষে সম্মতি প্রদান করেছিল, অন্যদিকে প্রায় পচাশি শতভাগ আমেরিকান জীববিজ্ঞানীর বিপরীতে মাত্র চৌচল্লিশ শতভাগ চীনা জিনবিজ্ঞানী মায়ের হাতে গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত ন্যাস্ত করার প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করেছিল। এই জরিপের চীনা অংশটির পরিচালনাকারী Xin Mao কার্ল পিয়ারসনকে প্রতিধ্বনিত করে বলেছিলেন, “চীনা সংস্কৃতি অনেকটাই আলাদা। এখানে সমাজের কল্যাণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, ব্যক্তির কল্যাণের উপর নয়”।১৭

ইউজেনিক্সের ইতিহাসের উপর অনেক আধুনিক প্রতিবেদন এই ইতিহাসকে বিজ্ঞান/জেনেটিক্সকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দিলে কি হয় সেটার উদাহরণ হিশেবে উপস্থাপন করে। এখানে একটা বিশাল বড় ভুল হচ্ছে। সরকারের লাগাম ছেড়ে দিলে কি অবস্থা হতে পারে, এই ইতিহাস তারই বিষন্ন গল্প, অন্য কিছু নয়।

টীকা:-
১)আচরণবাদ(Behaviourism)- মনোবিজ্ঞান ও দর্শনে দু’ প্রকার আচরণবাদ আছে, এখানে মনোবিজ্ঞানী বি. এফ. স্কিনারের আচরণবাদটাই প্রাসঙ্গিক। এই মতবাদ অনুসারে মানুষের প্রত্যেকটি ক্রিয়ার পেছনে স্টিমুলাস বা উদ্দীপক এবং রিএনফোর্সমেন্ট(ক্রিয়ার ইতিবাচক বা নেতিবাচক ফলাফল, যা নির্ধারণ করে কর্তা ওই একই কাজ পুনরাবৃত্তি করবে নাকি ভবিষ্যতে সেই কর্ম হতে বিরত থাকবে) থাকে। এই দু’টোকে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের ক্রিয়াকে যেকোন দিকে চালিত করা যায়, মানুষের কার্যক্রমের পেছনে “বিশ্বাস”, “অভিলাষ” কিংবা “উদ্দেশ্য” এর কোন ভূমিকা নেই।

২)আলঝেইমারের রোগ- মস্তিস্কের বিভিন্ন স্নায়ুকোষে প্রোটিনের আস্তরণ ও স্নায়ুকোষের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার কারণে স্নায়ুকলাগুলো সময়ের সাথে তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে। এর ফলে রোগীর বিভিন্ন বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা লোপ পায়- যেমন, স্মৃতিশক্তি, মুড সুইং, বিচারবোধের আকস্মিক পরিবর্তন(যেমন, যেই লোক আগে টাকাপয়সা মেপে মেপে খরচ করত, সেই একই লোক হঠাত করে দু’হাতে খরচ করা শুরু করতে পারে) ইত্যাদি।

http://www.health.com/health/gallery/0,,20416288,00.html

৩) ডাউন’স সিন্ড্রোম- ক্রোমজোম ২১ এর দু’টোর বদলে তিনটা কপি থাকলে এই ডিফেক্ট হয়। ভুক্তভোগীর মুখ ছোট ও চওড়া, চোখ অনেকটা মঙ্গলয়েড গোত্রের মানুষদের মত হয়, আঙ্গুলগুলো ছোট হয় এবং পেশী দুর্বল হয়।

৪) Amniocentesis- গর্ভবতী নারীর জঠরে সূঁচ ঢুকিয়ে এমনিওটিক ফ্লুইড বের করে নেওয়া হয়। ভ্রূণের যেসব কোষ খসে পড়ে এই ফ্লুইডে ভাসমান থাকে, সেই কোষগুলো বিশ্লেষণ করে ক্রোমজোম কিংবা জৈবরাসায়নিক বিকৃতির জন্য পরীক্ষা করা হয়।

৫) Boer war- “Boer” একটি ডাচ শব্দ, এর অর্থ কৃষক। এরা ডাচ সেটলার, আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে বসতি গেড়েছিল। ব্রিটিশ শাসন এড়ানোর জন্য ব্রিটিশদের সাথে ১৮৮০-১৮৮১ এবং ১৮৯৯-১৯০২ ব্যাপি দু’বার যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়।

৬) Fabian Society- প্রথম দিকে এটি একটি সাম্যবাদী আন্দোলন ছিল, ব্রিটেনের লেবার পার্টির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিল, বর্তমানে এটি স্রেফ একটি থিঙ্ক-ট্যাংক।

৭) Genetic screening- ভ্রুণের জিনোমে পরীক্ষা করে বিশেষ বিশেষ রোগের জন্য দায়ী জিনের উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি নির্ণয় করা। সাধারণ মানুষ যেসব কমার্শিয়াল জিন টেস্ট কিট ব্যবহার করে, তা সবসময় নির্ভুলভাবে কাজ করে না। তবে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এই পরীক্ষার বিস্তর গুরুত্ব আছে। যেমন, জেনেটিক স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে যদি দেখা যায় যে কোন ব্যক্তির একটি বিশেষ রোগের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তবে তাকে চড়া দামে স্বাস্থ্যবীমা কিনতে হবে। চাকুরীতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও বৈষম্য হতে পারে।

৮) Immigration Restriction Act of 1924- দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপীয়, বিশেষ করে ইহুদিদের এবং মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশীয় ও ভারতীয়দের অভিবাসন সীমিতকরণের উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট কু’লিজের প্রশাসন দ্বারা পাসকৃত আইন।

৯)Laissez-faire – ফরাসী এই শব্দটার ইংরেজি করলে দাঁড়ায় “let them be”। এটা মূলত এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশকে বোঝায় যেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নূন্যতম, যেটুকু নিয়ন্ত্রণ সম্পত্তির মালিকানার নিরাপত্তা দেয় ঠিক ততটুকু। কোন ট্যারিফ নাই, কোন ভর্তুকিও নাই।

১০) প্রোটেস্ট্যান্ট- ক্যাথলিকদের সাথে খ্রীষ্টানদের এই গোত্রটির পার্থক্য হল এরা বাইবেলের ভাবানুবাদের জন্য গীর্জার উপর নির্ভর করে না। তাদের বিশ্বাস, ঈশ্বর মানুষের সাথে কেতাবের মাধ্যমে সরাসরি কথা বলে, এর জন্য কোন পাদ্রীর প্রয়োজন নেই। সঙ্গত কারণেই প্রোটেস্ট্যান্ট দেশগুলোতে গীর্জার প্রভাব কম।

১১) মেন্ডেলবাদ- ধ্রুপদী জেনেটিক্সের ভিত্তি। গ্রেগর ইয়োহান মেন্ডেল ১৮৬৬ সালে প্রস্তাব করেছিলেন যে জীবের প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্য উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কিছু “ফ্যাক্টর” দ্বারা নির্ধারিত হয়।

১২) ফেনোটাইপ- জিনের কার্যক্রমের বাহ্যিকরুপ, অর্থাৎ, যা আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই। আমাদের গায়ের রঙ, চোখের রঙ, উচ্চতার মত শারীরিক বৈশিষ্ট্য থেকে শুরু করে আমাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্যও আমাদের ফেনোটাইপের অংশ।

তথ্যসূত্র:-
১) Glad, John (2008) (PDF). Future Human Evolution: Eugenics in the Twenty-First Century. Hermitage Publishers. ISBN 1-55779-154-6
২) Lisa Pine (1997). Nazi Family Policy, 1933–1945. Berg. pp. 19–. ISBN 978-1-85973-907-5. Retrieved 11 April 2012
৩) Newman, James R. (1953). “Francis Galton”. Scientific American,INC.
৪) Buffum, Burt C. Arid Agriculture; A Hand-Book for the Western Farmer and Stockman, p. 232. Accessed at [1], June 20, 2010.
৫) Lush, Jay L. Animal Breeding Plans, p. 21. Accessed at [2], June 20, 2010.
৬) Hawkins, M. (1997). Social Darwinism in European and American thought. Cambridge University Press, Cambridge
৭) Kevles, D. (1985). In the name of eugenics. Harvard University Press, Cambridge, Massachusetts.
৮) Anderson, G. (1994). The politics of the mental deficiency act. M.Phil, dissertation, University of Cambridge.
৯) Wells, H. G., Huxley, J. S. and Wells, G. P. (1931). The science of life. Cassell, London.
১০) Lindzen, R. (1996). Science and politics: global warming and eugenics. In Hahn, R. W. (ed.), Risks, costs and lives saved, pp. 85 — 103. Oxford University Press, Oxford
১১) King, D. and Hansen, R. (1999). Experts at work: state autonomy, social learning and eugenic sterilisation in 1930s Britain. British Journal of Political Science 29: 77—107.
১২) Searle, G. R. (1979). Eugenics and politics in Britain in the 1930s. Annals of Political Science 36: 159—69.
১৩) Kitcher, P. (1996). The lives to come. Simon and Schuster, New York.
১৪) সানডে টেলিগ্রাফের ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ সংখ্যার একটি সাক্ষাৎকারে উদ্ধৃত
১৫) Lynn, R. (1996). Dysgenics: genetic deterioration in modern populations. Praeger,
Westport, Connecticut.
১৬) Reported in HMS Beagle: The Biomednet Magazine (www.biomednet.com/hmsbeagle), issue 20, November 1997.
১৭) Morton, N. (1998). Hippocratic or hypocritic: birthpangs of an ethical code. Nature Genetics 18: 18; Coghlan, A. (1998). Perfect people’s republic. New Scientist, 24 October 1998, p. 24.

[405 বার পঠিত]