প্রথমদিন খবরটা দেখে নির্মমতাটা আঁচ করতে পারিনি। খবরে ডিটেইলিংএর অভাব ছিলো যেটা খুব স্বাভাবিক কারণ যে তাণ্ডব ঘটেছে সেটির বিস্তারিত আসতে সময় লাগারই কথা। একদিন পর বোঝা গেল আসলেই ক্ষতির মাত্রা কতখানি। ভয়াবহ ছবিগুলো দেখে শিউরে শিউরে উঠছিলাম। চোখ খুঁজছিল মৃত্যু সংবাদ। এখনো পর্যন্ত পাইনি যদিও, পেলে সেটি এই খবরটির সাথে মোটেই বেমানান লাগতো না।

আমার ফেসবুকে প্রায় সবাই ধর্ম-অন্তপ্রান। ধর্মের পান থেকে চুন খসলেই তাদের স্ট্যাটাস ভারী হতে শুরু করে। মায়ানমার থেকে যখন রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটছিলো তখন রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের ছবি আর আমার বন্ধুদের তাদের ধর্মভাইদের অত্যাচারে সোচ্চার হবার কণ্ঠ। মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। বাংলাদেশের মুসলমান আর প্যালেস্টাইনের মুসলমানের মাঝখানে অদৃশ্য সুতার টান আছে। এই সুতা নাকি পুরো পৃথিবীর মুসলমানদের মধ্যেই বিদ্যমান। যদিও আমার খটকা লাগে যখন দেখি সৌদিআরবের সাথে সুতার টানটা বেশ আলগা।

ইনোসেন্স অফ মুসলিম এর রি-একশনেও দেখলাম আমাদের বন্ধুরা বেশ সোচ্চার। নবীর অবমাননা সইতে পারেনা কেউ। অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার অবমাননাও তারা মেনে নিতে পারে কিন্তু নবীকে নিয়ে কিছুই বলা যাবেনা। এ এক অদ্ভুত ডিলেমা। যাজ্ঞে সেসব। আমার আপত্তিটা ছিলো অন্য ক্ষেত্রে। মানলাম ইনোসেন্স অফ মুসলিম এর প্রতিবাদ করতে হবে কারণ সেটি আমার ধর্মের অবমাননা করেছে। কিন্তু সেই প্রতিবাদ কেন সশস্র হতে হবে ? সেই প্রতিবাদের কারণে খুন কেন, সন্ত্রাস কেন ? যদিও আমি জানি কেন এই সন্ত্রাস, কেন এই খুন তবুও তর্কের খাতিরে তাদের তথাকথিত শান্তির ইসলামের ধুয়াটা উদাহরণ হিসেবে দিলাম। উত্তরটা যথারীতি…এরা নাকি মোটেই প্রকৃত মুসলমান না … আমি মনে মনে হাসি। ” প্রকৃত মুসলমান ” শব্দটা একটা মিথ বই কিছুনা। কেউ কখনও একজন প্রকৃত মুসলমান দেখেনি। কেউ কখনও একটা প্রকৃত মুসলিম সমাজ দেখেনি। কেউ কখনও একটা প্রকৃত মুসলিম দেশ দেখেনি। প্রকৃত ধার্মিক এমনকি কোন গল্প কবিতার বইতেও নাই।

আমি অনেকদিন ধরেই একজন মুসলমান ধার্মিকের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করছি। আমার বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই বেশ যৌক্তিক তাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপে। পড়ালেখায় তারা আমার চাইতে মেধাবী। ব্যক্তিগত জীবনেও অনেকেই সফল। কিন্তু ধর্মের ক্ষেত্রে আমি তাদের বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ একেবারেই দেখিনা। এটা এমন একটা অন্ধকার দিক যেদিকটাতে এমনকি তারাও আলো ফেলতে ভয় পান। অনেকেই ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করলে চেপে যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কেউ কেউ তেড়ে আসেন। দু একজন বোঝাতে আসেন, বলেন আমি যেভাবে ভাবছি সেটি ঠিক না। কোরান পড়ার উপদেশ দেন। এগুলো খুব কমন ব্যাপার। আমার মতো অনেকেরই এইরকম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় প্রায়শই।

সেদিন আমার এক বুয়েট-পাশ বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা তোমার কাছে কোনটা বেশী অপরাধ, ইনোসেন্স অফ মুসলিম যে বানালো সেটা নাকি এর বদলে যে লোকগুলা সন্ত্রাসের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করলো সেটা ? একটি দাঁড়িপাল্লার দুই দিকে দুটি বিষয় রাখলে কোনদিকটা ভারী হবে? প্রশ্নটা নিয়ে সে এর আগে কখনও ভেবেছে বলে মনে হলোনা। কিছুক্ষণ পর তার উত্তর দুটিই সমান অপরাধ। আমার মনে হয় সে এর আগে কখনও বেপারটি ভেবে দেখেনি। তবে এটিও হতে পারে হয়তো এই ধরনের প্রশ্নের সঠিক উত্তর কোনটি হতে পারে সেটি নিয়ে সে খুব একটা ভাবিতও হতে চায়না। অদ্ভুত সাইকোলজি। একমাত্র অন্ধত্ব ছাড়া এই সাইকোলজির অস্তিত্ব বোধয় অন্য কোথাও নাই।

কেউ কেউ আবার আছেন ধরি মাছ না ছুঁই পানি টাইপের। এরা মনে মনে একজন সার্বজনীন স্রষ্টাকে কল্পনা করেন। এদের কাছে হিন্দুদের ভগবান, মুসলমানের আল্লাহ, বৌদ্ধদের ভগবান আর খ্রিস্টান ইহুদীদের গড সব মিলেমিশে একাকার। এই ধরনের মানুষ তাই সবার কাছেই প্রিয়। এরা কোনও কথার, কোনও যুক্তির সোজা সাপটা জবাব দেয়না। অনেক পেঁচিয়ে জগাখিচুড়ি বানিয়ে শেষে এমন একটা সারমর্ম দেয় যেটা অনেকটা লাঠি না ভেঙ্গে সাপ মারার মতই।

এই অন্ধত্ব থেকে পরিত্রাণ কোথায় ? কবে ? আমার মনে হয় মানুষ যত শিক্ষিত হবে, যত বেশী তার এক্সেস থাকবে তথ্য প্রযুক্তিতে তত দ্রুত আমরা এই অন্ধত্ব থেকে মুক্তি পাবো। আমাদের ছোটকালে আমরা অনেক প্রশ্নই চেপে গেছি বা কাউকে জিজ্ঞেস করলেও হয়তো আমাদের উত্তর না দিয়ে অনুৎসাহিত করা হতো। অনেকক্ষেত্রে যাকে জিজ্ঞেস করা হতো হয়তো দেখা যেত তিনিও আসলে সেই প্রশ্নের উত্তরটি জানেননা। এই জন্যই সেইসময়ে একজন আরজ আলির জন্ম আমাদের বিস্মিত করে। এখন একজন স্কুল পড়ুয়া ছেলে যদি ভাবে স্রস্টা কে? এইটা কাউকে জিজ্ঞেস করে উত্তর পেতে হবেনা তার। গুগল বাবাজির চেয়ে ভালো উত্তর তাকে আর কে খুঁজে দিতে পারবে? তাই আজকের যুগে এইরকম আরজ আলি অনেক আছে। ভবিষ্যতে এটি সংখ্যায় অযুত নিযুত ছাড়াবে। এক্সপোনেন্সিয়াল গ্রোথ বেশ মজার একটি ব্যাপার। সবাই এই ব্যাপারটি ধরতে পারেনা। অন্ধরা তো আরও পারেনা ।

তাই আমি আশাবাদী। আর বেশিদিন হয়তো নাই। আমি হয়তো অতটা দেখে যেতে পারবোনা। কিন্তু আমার পরবর্তী প্রজন্ম পারবে, এটা ভেবেই বেশ পুলকিত বোধ হয়।

[41 বার পঠিত]