অনেকক্ষণ  ধরে সংবাদপত্রের পাতার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সৈকত। আমি বললাম,” কি রে কিছুই তো পড়ছিস না শুধু শুধু খবরের কাগজটা আটকে রেখেছিস। দে আমাকে দে, আমি পড়ব। ”  সৈকত আঙুল দিয়ে খবরের কাগজের একটা কলামের দিকে ইশারা দিয়ে বলল, “এটা পড়।”
আমি পড়তে লাগলাম।

সেখানে লিখেছে, “ ঢাকা শহরে সম্প্রতি বিড়ালের উপদ্রব বেড়ে গেছে। বিড়াল গুলো হিংস্র হয়ে উঠেছে। মানুষকে অহরহ কামড়াচ্ছে। বাদ পড়ছে না শিশুরা। এ নিয়ে সিটি মেয়র বলেছেন বিড়াল নিধন কর্মসূচি শুরু করবেন তারা। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ এবং মানব সম্পদের অভাবে তা শুরু করতে পারছেন না।

এ দিকে ঢাকাতে এক নতুন এক রোগের প্রাদুভাব দেখা দিয়েছে। এই রোগে মানুষের জ্বর, কাশি রক্ত সহ, অন্ধত্ব এবং পরিণামে মৃত্যুও হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা ধারনা করছেন বিড়ালের উৎপাতের সাথে এই রোগের সম্পর্ক রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রাথমিক সার্ভেতে দেখা গেছে যে এই নতুন অজানা রোগে আক্রান্তদের বেশীর ভাগই বিড়ালের কামড়ের স্বীকার হয়েছিল এবং তারা জলাতঙ্কের টিকাও নিয়েছিল। নতুন রোগটি যে জলাতঙ্ক নয় তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। ”

আমি আর সৈকত ছোটবেলার বন্ধু। একই স্কুল, একই কলেজ এবং একই ভার্সিটির একই বিষয়ে স্নাতক পাস করেছি। এখন একই প্রফেসরের অধীনে পিএইচডি করছি। আমাদের পড়াশুনা অণুজীববিদ্যার উপর। তাই খবরটার প্রতি আমরা দুজনই আগ্রহী হয়ে উঠলাম।

”এটা নিশ্চিতভাবে কোন অণুজীবের কাজ।“ বলল সৈকত।

” সেটা তো আমিও বুজি রে দোস্ত। ” আমি বললাম, “ কিন্তু কথা হচ্ছে কোন অণুজীব। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া নাকি পরজীবী ?”

এমন সময় প্রফেসর খান ঢুকলেন ল্যাবের ভিতর। আমরা দাঁড়িয়ে গিয়ে তাকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন,” কি হে কাজ ফেলে কি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ”

আমরা খবরটা তাকে দেখাতেই তিনি বললেন,” এটা গতরাতেই জেনেছি। আমার সাথে আন্তর্জাতিক রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা সেন্টার থেকে আমার কাছে ফোন করেছিল। সরকার ওদের বিষয়টা তদন্ত করে রোগের কারণ নির্ণয় করতে দায়িত্ব দিয়েছে। ওরা আমার সাহায্য চেয়েছে। কিছুক্ষণের ভিতরই নমুনা এসে যাবে।  ”

শুনেই কেমন একটা শিহরণবোধ হল মনের ভিতর। জীবনে এই ধরনের সুযোগ খুব কম আসে। সফল হলে সম্মান আর পেশাগত জীবনেও সাফল্য আসবে। কিছুক্ষণের ভিতর নমুনা দিয়ে গেল আন্তর্জাতিক রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা সেন্টারের লোকেরা।

কিন্তু কাজ করতে গিয়ে মনে হল সাগরে পড়েছি। আক্রান্ত মানুষের রক্ত, লালা, কিংবা মৃত মানুষের ব্রেন টিস্যু কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। জীবাণু ডিটেকশনের সকল পদ্ধতি প্রয়োগ করেও আমি আর সৈকত সফল হলাম না। এ দিকে প্রফেসর নিজের মত কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা তাকে ঘাটাতে কম সাহস পাই। মাঝে মাঝে তাকে রিপোর্ট করে আসি। ১৫ দিনের মধ্যে রোগটা মহামারী আকারে দেখা দিল ঢাকাতে। প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকেও কাজ হচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সরকারকে বলল শহর খালি করে দিতে। এদিকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমনকি সীমানা পেরিয়েও ভারতে দেখা যাচ্ছে রোগটি। আতঙ্কে মানুষ পালাতে লাগল। কিন্তু এদিকে জীবাণুই সনাক্ত করা যায় নাই। নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

সেদিন রাতে প্রফেসর আমাদের ডাকলেন তার রুমে। আমরা ভাবলাম কি কাজে তিনি আমাদের ডেকেছেন?

তার রুমে ঢুকলাম। দেখলাম তার প্রিয় চেয়ারে তিনি বসে আছেন। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। গাল ভেঙ্গে গেছে। কয়েকদিনের অক্লান্ত খাটুনির ফল।

তিনি আমাদের দুটো চেয়ার দেখিয়ে বললেন বসতে। আমরা বসলাম। আমরা আগ্রহী চোখে তার দিকে তাকালাম।

তিনি কথা বলা শুরু করলেন, ” তোমাদের হয়ত মনে হতে পারে আমি কেন এত রাতে তোমাদের ডাকলাম। আমি জানি তোমাদের মনে এখন এই প্রশ্ন জাগছে যে আমি কি সমাধান খুজে পেয়েছি? উত্তর হ্যাঁ আমি জীবাণুর সন্ধান পেয়েছি। ”

আমরা চমকে উঠলাম। প্রফেসর সফল হয়েছেন। যা বিশ্বের তাবৎ
বিজ্ঞানীরাও খুঁজে পান নি তিনি সফল হয়েছেন।

সৈকত বলল, “ স্যার, পুরোটা খুলে বলুন প্লিজ। ”

শুরু করলেন প্রফেসর, ” কাহিনীটার শুরু অনেক আগে। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে। ১৯২১ সাল। একদিন ইংল্যান্ডের সেন্ট মেরিজ মেডিকেল স্কুলের ল্যাবরেটরিতে কাজ করেছিলেন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। কয়েকদিন ধরে তিনি সর্দি-কাশিতে ভুগছিলেন। তিনি তখন প্লেটে জীবাণু কালচার নিয়ে কাজ করছিলেন। হঠাৎ হাঁচি এলো। তিনি নিজেকে সামলাতে পারলেন না। প্লেটটা সরাবার আগেই নাক থেকে কিছুটা সর্দি প্লেটের ওপর পড়ে গেল। পুরো জিনিসটা নষ্ট হয়ে গেল দেখে প্লেটটি এক পাশে সরিয়ে রেখে নতুন আরেকটি প্লেট নিয়ে কাজ শুরু করলেন। কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে গেলেন। পরদিন ল্যাবরেটরিতে ঢুকে টেবিলের এক পাশে সরিয়ে রাখা প্লেটটার দিকে নজর পড়ল ভাবলেন প্লেটটি ধুয়ে কাজ করবেন; কিন্তু প্লেটটি তুলে ধরে চমকে উঠলেন। দেখলেন, গতকালের জীবাণুগুলো আর নেই। দেহ নির্গত এই প্রতিষেধক উপাদানটির নাম দিলেন লাইসোজাইম। দীর্ঘ আট বছর পর হঠাৎ একদিন কিছুটা আকস্মিকভাবেই ঝড়ো বাতাসে খোলা জানালা দিয়ে ল্যাবরেটরির বাগান থেকে কিছু পাতা উড়ে এসে পড়ল জীবাণুভর্তি প্লেটের উপর। কিছুক্ষণ পরে কাজ করার জন্য প্লেটগুলো টেনে নিয়ে দেখলেন জীবাণুর কালচারের মধ্যে স্পষ্ট পরিবর্তন ঘটেছে। ছত্রাকগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম ছিল পেনিসিলিয়াম নোটেটাইম। তাই এর নাম দিলেন পেনিসিলিন। এভাবে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন।

রসায়ন সম্বন্ধে জ্ঞান না থাকার কারণে পেনিসিলিন আবিষ্কার করলেও ওষুধ কিভাবে প্রস্তুত করা যায় তা তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। এরপর ডা. ফ্লোরি ও ড. চেইন পেনিসিলিনকে ওষুধে রূপান্তর করেন। ”

এত কিছু বলে চুপ করলেন তিনি হাতের সিগারেট শেষ করতে।

আমি আর সৈকত পরস্পরের মুখের দিকে তাকালাম। কি থেকে কি বলছেন প্রফেসর? তাহলে কি চিন্তা করতে করতে তার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে?

প্রফেসর আবার বলা শুরু করলেন, ” এটাই ছিল পৃথিবীর প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার। ১৯৪১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম পেনিসিলিন মানুষের দেহে প্রয়োগ হয়। অক্সফোর্ডের একজন পুলিশ কর্মকর্তা Staplylococcus দ্বারা আক্রান্ত ছিলেন। পেনিসিলিনের প্রয়োগে তার অবস্থার নাটকীয় উন্নতি ঘটে। কিন্তু পাঁচ দিন পর পেনিসিলিয়ামের সরবরাহ শেষ হয়ে গেলে তিনি আবার আক্রান্ত হয়ে পড়েন, এবং মারা যান। ”

” ১৯৪০-৪১ সালের দিকে বৃটেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পেনিসিলিনের গবেষনার জন্য অর্থ বরাদ্দ কমে যায়। কিন্তু ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার আমেরিকান বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলশ্রুতিতে, রকফেলার ফাউন্ডেশন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হ্যারল্ড ডাব্লিউ ফ্লোরে ও এন.জি. হিটলিকে (আমেরিকায় আমন্ত্রান জানান। ২ জুলাই ১৯৪১ সালে তারা আমেরিকায় পৌছেন এবং বিশ্ববিখ্যাত ছত্রাকবিদ চার্লস থম ও আমেরিকার কৃষি বিভাগের সাথে আলোচনা করেন। খুব দ্রুতই আমেরিকার কৃষি বিভাগের উত্তর অঞ্চলের গবেষণাগারে তাদের কাজ শুরু হয়। গবেষনাগারটি ছিল ইলিনয়ে   পিওরিয়াতে । এই সময় অন্যান্য অনেক আন্টিবায়োটিক আবিস্কার হয়। রেনে ডিউবস গ্রামিসিডিন ও টাইরসিডিন আবিস্কার করেন যা গ্রাম পজিটিভ ব্যাক্টেরিয়ার  উপর কাজ করে। বর্তমানেও অনেক আন্টিবায়োটিক আবিস্কার হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু ক্লোরামফেনিকলের রাসায়নিক সংশ্লেষন সম্ভব হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনীর সৈন্যদের ক্ষত সারাতে প্রথম পেনিসিলিনের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়। ব্রিটেন, আমেরিকার বিজ্ঞানীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, ফ্লেমিং এর সেই ভুলের কারণে পাওয়া ছাতা এক “যাদু ঔষধ” তৈরে করতে থাকে যা অসংখ্য জীবন বাঁচায়। ১৯৪৫ সালে ফ্লেমিং, আর্নেস্ট চেইন, ও ফ্লোরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাদের অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ”

ধৈর্য আর ধরে রাখতে পারলাম না , ” স্যার আসল কথাটা বলুন না তাড়াতাড়ি। এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলার কি মানে হয়? ”

” রেগে গেলে তো হেরে গেলে। ” প্রফেসর হেসে উঠলেন।

” সরি স্যার, আসলে এত উত্তেজিত ছিলাম কখন আপনি আপনার আবিষ্কারের কথা বলবেন। ” মাথা নিচু করে ফেললাম আমি।

” আরে আমি মনে কিছু করিনি। তোমাদের বয়সে আমিও একই কাজ করতাম। ” আবার হেসে উঠলেন প্রফেসর খান।
” তা যা বলছিলাম। “  আবার শুরু করলেন  তিনি, “ বলা যায় অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। আগে সামান্য ইনফেকশনে মানুষ মারা যেত। অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কারের পর ডাক্তাররা রোগীদের বাঁচাতে লাগলেন। বলা চলে মানুষ ভাবল ইনফেকশনের গুষ্টি পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে যাবে! এবং আসলেই তা হল অনেক ক্ষেত্রে। ১৯০০ সালের দিকে যক্ষ্মা আর ইনফ্লুয়েঞ্জাতে সব থেকে বেশি মানুষ মারা যেত। ২০০০ সালের দিকে তা অনেক কমে গেল। দেখা গেল ক্যান্সার আর হৃদরোগে মানুষ মারা যাচ্ছে। এর কারণ হল জীবনযাত্রার রীতি আর খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন। ”

এরপর প্রফেসর উঠে তার ফ্রিজের দিকে হাঁটা শুরু করলেন। ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা কোক বের করে তিনটা গ্লাসে নিলেন। তার পর গ্লাসে কোক নিয়ে আমাদের পরিবেশন করলেন। তিনি আরেকটা সিগারেট ধরালেন। তারপর শুরু করলেন আবার তার কথা, “ তা যা বলছিলাম! অ্যান্টিবায়োটিকের বিপুল ব্যবহার রোগশোককে দূর করলেও ঝামেলা সৃষ্টি হল। কিছু ব্যাক্টেরিয়া কিছু আন্টিবায়োটিকের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে(Antibiotic resistant), অন্য দিকে অন্য কিছু ব্যাক্টেরিয়া ঐ একই আন্টিবায়োটিক দ্বারা আক্রান্ত (Antiobiotic sensitive)হয়। এমনকি কিছু ব্যাক্টেরিয়া যে কিনা একটিআন্টিবায়োটিকের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, সেও পরিব্যাক্তি বা মিউটেশনের মাধ্যমে এমন সব বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে যার ফলে ব্যাক্টেরিয়াটি ঐ আন্টিবায়োটিক রোধী হয়ে পরতে পারে। ২০১১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য কি ছিল মনে আছে?  ”

সৈকত বলে উঠল, “অ্যান্টিমাইক্রোব্যাকটেরিয়াল রেজিসটেন্স: নো অ্যাকশন টুডে, নো কিউর টুমরো।  ”

” হ্যাঁ। তাই। ” বললেন প্রফেসর, “পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এসব হাসপাতালে রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নির্দেশনা দিতে মাত্র ৩৩ শতাংশ গাইড লাইন মানছেন চিকিৎসকরা। ঢাকার ওষুধের বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই এজিথ্রোমাইসিন, লিভফ্লোক্সাসিন, এমোক্সিসিলিন ও সেফ্রাডিনের মতো অতিমাত্রার অ্যান্টিাবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে ভাইরাস জ্বর সারাতে যা অনুচিত।

৮০ দশমিক দুই শতাংশ রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকের সম্পূর্ণ ডোজ গ্রহণ করেন। ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ রোগী নির্ধারিত সময়ের আগেই এটা বন্ধ করে দেন। ফলে রোগীর দেহে অ্যান্টিবায়োটিকে কার্যকারিতা হ্রাস পায়।

এ সবই ২০১১ সালের পরিসংখ্যান। এখন অবস্থার আরও অবনতি ঘটেছে। ” এক নিঃশ্বাসে বলে শেষ করলেন প্রফেসর।

“ তোমরা তো গোল্ড মেডেলিস্ট। তোমরাই বল অ্যান্টিমাইক্রোব্যাকটেরিয়াল রেজিসটেন্স কিভাবে ছড়ায়? ” প্রফেসর আমাদের দিকে যেন ভাইভা বোর্ডের প্রশ্ন করলেন।

আমি বলতে লাগলাম, “যে কোনো ব্যাক্টেরিয়ার পপুলেশনে একটি মাত্র ব্যাক্টেরিয়ার পরিব্যাক্তির বা মিউটেশনের ফলে ঐ ব্যাক্টেরিয়ার আন্টিবায়োটিক-রোধী বৈশিষ্ট্যের আবির্ভাব হতে পারে। এই মিউটেশনের প্রাথমিক হার খুব কম; প্রায় একটি মিউটেশন ঘটে প্রতি কয়েক লক্ষ কোষে। তবে একটি ব্যাক্টেরিয়ার আন্টিবায়োটিক-রোধী হবার সম্ভাব্যতা অনেক অংশে বেড়ে যায় যখন কোনো আন্টিবায়োটিক-রোধী ব্যাক্টেরিয়া থেকে জিন গ্রহণ করে। কিছু কিছু ব্যাক্টেরিয়াতে তার নিজ ক্রোমসোমস্থ ডিএনএর বাইরে আরও কিছু, বংশগতির উপাদান এদের কে বলা হয় প্লাজমিড । সাধারণত, আন্টিবায়োটিক-রোধী জিন গুলো এই সব প্লাজমিড বহন করে। একটি ব্যাক্টেরিয়া এই প্লাজমিড বা প্লাজমিড এর প্রতিলিপি অন্য ব্যাক্টেরিয়ায় স্থানান্তর করতে পারে। যে পদ্ধতিতে ব্যাক্টেরিয়া এই কাজটি করে তাকে বলা হয় কনজুগেশন । তাছাড়া প্রায়ই ব্যাক্টেরিয়ার ক্রোমোসোমে বা প্লাজমিডে ট্রান্সপোসন নামে এক বিশেষ অংশ থাকে, যা কিনা আন্টিবায়টিক-রোধী জিন বহন করে। ট্রান্সপোসন এক ক্রোমোসোম থেকে অন্য ক্রোমোসোমে, ক্রোমোসোম থেকে প্লাজমিডে যেতে পারে। যার ফলে আন্টিবায়োটিক-রোধী জিনের বা তার প্রতিলিপির স্থানান্তর ঘটে। ”

“ গুড বয়। ” হাততালি দিলেন প্রফেসর। “ কিন্তু আন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে আন্টিবায়োটিক-রোধী অণুজীব বেড়েই চলেছে। মনে পরে আজ থেকে ৫ বছর আগে তোমরা যখন সেকেন্ড ইয়ারে ছিলে তখন আমি একটা কথা বলতাম? আমাদের এক সময় হাতে অ্যান্টিবায়োটিক ছিল না তাই আমরা অণুজীবের আক্রমণে মারা পরতাম। এখন অ্যান্টিবায়োটিক আছে কিন্তু রেজিসটেন্স জন্ম নেওয়ার ফলে এমন একদিন আসবে আমরা হাতে  অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে বসে থাকব কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না। দুঃখজনকভাবে আমি এখন ঐ কথা ফিরিয়ে নিতে চাই। কারণ নতুন এই অণুজীব যেটি আসলে একটি ব্যাকটেরিয়া তা মনে হয় বিশ্বের প্রথম ব্যাকটেরিয়া যা প্রচলিত সকল অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিসটেন্স অর্জন করেছে। আমাদের পরিচিত সকল অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিসটেন্স করার জিন এর ভিতর আছে। ”

“ তার মানে এটা একটা সুপার বাগ! ” আমি বলে উঠলাম।

“ Unfortunately ” বললেন প্রফেসর, “ Yes it is! এটা সেই সুপার বাগ যা বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করে আসছিলেন। ২০১৫ সালের পর সপ্তম প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক আসে। কিন্তু মানুষের অজ্ঞানতা সুপার বাগ সৃষ্টির দিকে এগিয়ে নেয়। আমি দেখেছি এই ব্যাকটেরিয়াটি যক্ষ্মার জীবাণু  মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলোসিসের একটি বিশেষ রূপ। ”

“ তাহলে বিড়ালের সাথে এটার কি সম্পর্ক? ”, সৈকত প্রশ্ন করল , “মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস তো বিড়ালের কামড়ে ছড়ায় না। ওটা তো সাধারণ হাঁচি কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। ”

প্রফেসর বললেন, “ এটাও আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। পরে দেখলাম যা ভাবছিলাম তা ঠিক। এই মিউট্যানট ব্যাকটেরিয়া তার স্বাভাবিক পথ হারিয়ে ফেলেছে। এটা আগে সরাসরি আক্রান্ত মানুষ থেকে মানুষে ছড়াত। কিন্তু এখন তাকে বিড়ালকে পোষক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এবং তার সংখ্যা বাড়াতে হলে মানুষের দেহে প্রবেশ করতে হবে। আমি বিড়ালের উপর পরীক্ষা করে দেখেছি এটা বিড়ালের স্বভাবের উপর প্রভাব ফেলে। এতে বিড়াল আক্রমণাত্মক হয়ে যায়। ” আমাদের চোখ বড় বড় হয়ে যেতে দেখেই প্রফেসর বললেন, “ এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটা তো জলাতঙ্কের ভাইরাস Rabies এর ক্ষেত্রেও ঘটে। Rabies ভাইরাস আক্রান্ত পশুর লালাক্ষরণ বেড়ে যায় এবং তা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে। আক্রান্ত পশুর কামড়ে লালা থেকে মানুষে ভাইরাসটি ছড়ায়। কিন্তু মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলোসিসের ক্ষেত্রে যেটা ঘটলো সেটা অবিশ্বাস্য। আমি জীবনে প্রথম দেখলাম কোন জীবাণু তার ছড়ানোর পথ পরিবর্তন করেছে তারপর মিউট্যানট হয়ে উঠেছে। ড্রাগ রেজিসটেন্স ছাড়াও আরও অনেক ব্যপার আছে। পরিবেশ দূষণ, রেডিয়েসনের প্রভাবও আছে এর উপর। ”

“ কিন্তু ব্যপারটা বুঝলাম না প্রফেসর। অন্ধত্ব হয় কেন? ” জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

“ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি রেটিনার কোষের সাথে বিক্রিয়া করছে। অঙ্কোসারকা ভলভুলাস নামক পরজীবীতেও এই কাহিনী ঘটে। ” প্রফেসর বললেন।

“ স্যার, এখন উপায়? এর হাত থেকে পরিত্রানের উপায় কি? শহরে তো মহামারী লেগে গেছে? ”

“ হুম। এর সমাধান আমাদের প্রকৃতির ভিতর আছে। দেখ, আমরা রোগীকে সুস্থ করতে ঔষুধের কথা ভাবি। একবারও কি ভাবি প্রকৃতি আমাদের জন্য কি ছড়িয়ে রেখেছে?

আমার গবেষণায় দেখা গেছে ভিটামিন সি এই মিউট্যানট ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে দিতে পারে। আজকাল তো খাবারের মধ্যেও ভেজাল ঢুকে গেছে। আমি আমার গবেষণায় সাফল্যও পেয়েছি। কিছু রোগীকে উচ্চমাত্রায়  ভিটামিন সি দিয়ে দেখেছি রোগ নিরাময় হয়ে গেছে। এখন গবেষণার ফলাফলটা  আন্তর্জাতিক রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা সেন্টারকে জানাব। আশা করি মানবজাতি এই দুর্ভোগ থেকেও পরিত্রাণ পাবে।  ”

হাসিমুখে ফোনের কাছে চলে গেলেন প্রফেসর।

[184 বার পঠিত]