ট্রিটমেন্ট

By |2012-08-27T09:11:58+00:00আগস্ট 27, 2012|Categories: গল্প, নারীবাদ|24 Comments

ক.
ছয়মন বানুকে মহল্লা ছাড়া করার সাত দিন হতে না হতেই গ্রামের উত্তর দিকের শেষ ঘরটিতে প্রথম কে যেন বলল,
সফেলা বেশ্যা। আমি নিজ কানে শুনে এলাম।
সপ্তাহ খানেকের মধ্যে মহল্লার সকলে বলল,
সফেলা বেশ্যা।
মাসখানেকের মধ্যে গ্রামের সকলে জানলো,
সফেলা বেশ্যা।
গ্রামের প্রতিটা ঘরে ঘরে, মোড়ে মোড়ে, দোকানে দোকানে আলোচনা হচ্ছে,
সফেলা বেশ্যা।
আলোচনার সুবিধার্থে, গ্রামের মোড়ে মোড়ে মাচান বসানো হয়েছে। পুকুরে স্নান করতে গিয়ে মহিলাদের বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে যাচেছ প্রতিদিনই। সদ্য স্কুলে পা দেওয়া ছেলে মেয়েরাও তাদের স্বভাবজাত আড্ডা ছেড়ে মেতে উঠেছে,
সফেলা বেশ্যা।

খ.
গ্রামের মহিলারা দলে দলে জমায়েত হচ্ছে। তাদের এখন নাওয়া-খাওয়া কোন কিছুই ঠিক মতো হচ্ছে না। স্বামীর দিকে নজর রাখতে রাখতে বেশির ভাগই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। পুরুষদের জন্যে বাড়িতে এখন ১৪৪-ধারা জারি করা হয়েছে, সূর্যের আগে ফিরতে হবে ঘরে!
সকলের মধ্যে থেকে প্রথম কথা বলে মাঝবয়সী এক মহিলা,
আমার মরদের ঈদ লাগছে, সবসময় গুনগুনিয়ে সিনেমার গীত গায়।
আরেকজন বলে,
আমার ভাতার কাজের বাহানাতে বাড়িতে ঢুকতিই চায় না।
সব থেকে রুগ্ন গড়নের মহিলাটি বলে,
আমার স্বুয়ামী তো সারা রাত বিছানায় ইশপিশ করে। ঠিক মতো খাওন-দাওন করে না। মনে হয় ঐ মাগির ভুতে ধরছে।
সকলের মধ্যে থেকে স্বাস্থ্যবতী মহিলাটি বলে,
গ্রামের সব পুরুষদেরই এখন একই অবস্থা।
সবথেকে বয়স্কজন বলে ওঠে,
হবে না! মিনসেদের কি দোষ, বল তুরা? হুনছি, ঐ মাগির গতর থেকি রস নাকি চুয়ি চুয়ি পড়ে! মধু যেকিনে থাকবি, মাছি তো সেকিনে ভন ভন করবিই। তাই তোগো মরদগেরে বেশি চাপাচাপি না করি ঐ খানকিরে আগে গ্রাম ছাড়নের ব্যবস্থা কর।
একজন মহিলা তার পাশের জনকে টিটকিরি মেরে বলে,
আমার দেবর বলছিল, তোর ভাতার নাকি আজকাল ঐ মাগির বাড়ির আশেপাশে খুব ঘুর ঘুর করে?
মহিলা ক্ষেপে গিয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
এই, আমার কুদ্দুসের বাপেরে নি’ একটাও আজেবাজে কথা কবিনা কইলাম! কেনে, তুই আর তোর দেবরের ফস্টিনস্টির ঘটনাটা মনে হয় আমরা জানি নে?
বয়স্ক মহিলাটা সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
এই নিজেদের গায়ে কাদা ছুড়াছুড়ি বন্ধ কর তুরা। আগে মাগির স্যাটায় আগুন লাগা, তারপর তুরা যত ইচ্ছা খিস্তি কর।

গ.
গ্রামের সকলে বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মেম্বার বাড়ির বৈঠকখানায় পঞ্চায়েত ডাকা হল। মিটিং শেষে মসজিদের মাইকে ঘোষণা করা হল,
আগামীকাল বাদ-জুম্মা, গ্রামের সকল মুমিন ভাইদের ঈদগার ময়দানে উপস্থিত থাকার জন্যে বলা হচ্ছে। ইমাম সাহেব ইসলামী শরিয়া আইন মোতাবেক বেশ্যা সফেলার, নাউজুবিল্লাহ, আস্তগ্ফিরুল্লাহ, বিচার করবেন।
পরদিন, যথারীতি জুম্মার নামাযের পর গ্রামের সকলে দলে দলে যথাস্থানে জমায়েত হল। এ পর্যন্ত কোনো ঈদে এত মানুষ এ ময়দানে জমায়েত হয়নি। ইমাম সাহেব তার বয়ান শুরু করলেন,
প্রিয় মুমিন ভাইয়েরা আমার, আমরা সকলে পবিত্র জুম্মার পর ওজু সমেত এই ঈদগাহে হাজির হয়েছি একটা নেক মকছেদ পূরণ করার জন্যে। গ্রামে আল্লাহর গজব নাজিল হয়েছে। আপনাদের দান খয়রাতের হাত দিনে দিনে ছোট হয়ে যাচ্ছে, তাই এই গজব। আজ আমরা একত্রিত হয়েছি, এক বেগানা মহিলার বিচার করার জন্যে। ঐ নাপাক মহিলার নাম আজ মুখে নেয়াও পাপ। আল্লাহর পাক কালামে আছে, মহিলারা জ্যান্ত শয়তান, তারা মানব জাতিকে ধ্বংসের দিকে টানে! এজন্যই তাদেরকে টাইটের মধ্যে রাখার নির্দেশ আছে।
এখন বলেন, আপনারা সকলে কি ঐ বেগানা মহিলার পাপ কর্ম সম্পর্কে অবগত আছেন? থাকলে আওয়াজ তোলেন।
সকলে উচ্চস্বরে বলে ওঠে,
হ্যঁা হুজুর, আছি।
হঠাৎ এত জোরে শব্দ হওয়াতে আশেপাশের গাছপালা থেকে পাখিরা সব ঝটপট করে যে যার মতো রুদ্ধশ্বাসে উড়ে যায়।
আপনারা কি আল্লাহর পাক কালাম বুকে নিয়ে সাক্ষি দিতে পারবেন? পারলে আওয়াজ তোলেন।
আবার প্রচন্ড শব্দে কেঁপে উঠল মাটি।
কিছুক্ষণ কি যেন ভেবে নিয়ে হুজুর আবারো বললেন,
এখানে আজ গ্রামের সকলে উপস্থিত আছেন। কারা কারা ঐ বেগানা মহিলার কাছে গিয়ে নাপাক হয়েছেন, আওয়াজ তোলেন।
এবার আর কোন শব্দ হল না। যে কাশছিল, সে তড়িঘড়ি করে কাশি বন্ধ করে ফেলল। যারা ফিসফাস করছিল তারাও মুখ এঁটে রইল। কিছুক্ষণের জন্যে জনশূন্য হয়ে পড়ল সমস্ত মাঠ।
যদি কেউ থেকে থাকেন, আপনারা মসজিদে কিছু টাকা অথবা ফসল দিয়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবেন। ঐ বেগানা মহিলার শাস্তি হওয়ার দরকার। চরম শাস্তি, যা দেখে দ্বিতীয়বার কেউ এ-পথে পা বাড়ানোর সাহস পাবে না। আপনারা কি বলেন?
আবারো ভীষণ শব্দ বিস্ফোরণে ফেটে পড়ল মাঠ।
শরিয়া আইন মোতাবেক, কাল স্কুল ময়দানে ঐ বেগানা মহিলার গায়ে একশবার দোর্রা মারা হবে। আপনারা কি বলেন?
শেষবারের মতন শব্দ বিস্ফোরণে ফেটে পড়ল চারপাশ।

পরদিন, বাদ আছর, স্কুল ময়দানে সমস্ত গ্রামবাসীর সামনে সফেলাকে বেত্রাঘাত করা হল। গ্রামের মেম্বার, হেড মাস্টার, ইমাম, চোর, বাটপার সকলে পালাক্রমে দোর্রা মারলো। মহিলারা ঘেন্নায় স্যান্ডেল ছুড়ে মারলো। মাঝপথে সফেলা নিশ্চুপ হয়ে পড়লো, তবুও ডোজ কমপ্লিট করা হল। সূর্য ওঠার আগেই ভৈরব ঘাটে পুঁতে ফেলা হল সফেলার দেহ।

ঘ.
সফেলার এক মাস যেতে না যেতেই, গ্রামের দক্ষিণ দিকের শেষ বাড়িটাতে কে যেন প্রথম বলল,
আকলির মা বেশ্যা। আমি নিজ কানে শুনেছি।
সপ্তাহ খানেকের মধ্যে মহল্লার সকলে বলল,
আকলির মা বেশ্যা।
মাসখানেকের মধ্যে গ্রামের সকলে জানল,
আকলির মা বেশ্যা।
এখন গ্রামের প্রতিটা ঘরে ঘরে, প্রতিটা মোড়ে মোড়ে, দোকানে দোকানে আলোচনা হচ্ছে,
আকলির মা বেশ্যা।

**গল্পটি কিছুটা এডিট করে আবারও পোস্ট আকারে দিলাম।

জন্ম সন : ১৯৮৬ জন্মস্থান : মেহেরপুর, বাংলাদেশ। মাতা ও পিতা : মোছাঃ মনোয়ারা বেগম, মোঃ আওলাদ হোসেন। পড়াশুনা : প্রাথমিক, শালিকা সর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং শালিকা মাদ্রাসা। মাধ্যমিক, শালিকা মাধ্য বিদ্যালয় এবং মেহেরপুর জেলা স্কুল। কলেজ, কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন। স্নাতক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরেজি অনার্স, ফাইনাল ইয়ার)। লেখালেখি : গল্প, কবিতা ও নাটক। বই : নৈঃশব্দ ও একটি রাতের গল্প (প্রকাশিতব্য)। সম্পাদক : শাশ্বতিকী। প্রিয় লেখক : শেক্সপিয়ার, হেমিংওয়ে, আলবেয়ার কামু, তলস্তয়, মানিক, তারাশঙ্কর প্রিয় কবি : রবীন্দ্রনাথ, জীবননান্দ দাশ, গ্যেটে, রবার্ট ফ্রস্ট, আয়াপ্পা পানিকর, মাহবুব দারবিশ, এলিয়ট... প্রিয় বই : ডেথ অব ইভান ঈলিচ, মেটামরফোসিস, আউটসাইডার, দি হার্ট অব ডার্কনেস, ম্যাকবেথ, ডলস হাউস, অউডিপাস, ফাউস্ট, লা মিজারেবল, গ্যালিভার ট্রাভেলস, ড. হাইড ও জেকিল, মাদার কারেজ, টেস, এ্যনিমাল ফার্ম, মাদার, মা, লাল সালু, পদ্মা নদীর মাঝি, কবি, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিলে কোঠার সেপাই, ভলগা থেকে গঙ্গা, আরন্যক, শেষের কবিতা, আরো অনেক। অবসর : কবিতা পড়া ও সিনেমা দেখা। যোগাযোগ : 01717513023, [email protected]

মন্তব্যসমূহ

  1. শারমিন সেপ্টেম্বর 7, 2012 at 2:22 পূর্বাহ্ন - Reply

    আমাদের সমাজ খালি মেয়েদের দোষ দেখে, অথচ একই দোষে পুরুষও দোষী

  2. সাদিয়া মাশারুফ সেপ্টেম্বর 4, 2012 at 4:01 অপরাহ্ন - Reply

    সমাজের চেনা রূপ।গল্পটা সুন্দর হয়েছে বলতেই হবে।

  3. শনিবারের চিঠি সেপ্টেম্বর 2, 2012 at 2:19 পূর্বাহ্ন - Reply

    দারুণ একটি গল্প পড়লাম। অনেক ধন্যবাদ লেখককে।

    • মোজাফফর হোসেন সেপ্টেম্বর 6, 2012 at 1:25 পূর্বাহ্ন - Reply

      @শনিবারের চিঠি, পড়ার জন্যে ধন্যবাদ আপনাকেও।

    • টগর সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 11:08 অপরাহ্ন - Reply

      @শনিবারের চিঠি,
      ভাইয়া আপনার লেখা আবার কবে পাচ্ছি ? :clap

  4. টগর সেপ্টেম্বর 1, 2012 at 9:58 পূর্বাহ্ন - Reply

    শিরনাম এর মত লেখাটাও সুন্দর হয়েছে। (Y) ইসলামিক শাসন ব্যবস্থাই হোক এর অন্য কোন ধম ব্যবস্থাই হোক, শাস্তি মহিলাদের ই হত। পুরুষরা তো ধোয়া তুলশি পাতা। :lotpot:

  5. আহমদ সায়েম আগস্ট 31, 2012 at 12:07 পূর্বাহ্ন - Reply

    আপনার গল্প পড়লাম, ‘কিছুক্ষণের জন্যে জনশূন্য হয়ে পড়ল সমস্ত মাঠ’ পড়ে মনে হল মাঠ হয়ত খালিই হয়ে গেল । চরম শাস্তির জন্য ইমাম সাহেব যখন ফের আওয়াজ তুললেন, আবারও ভীষণ শব্দে বিস্ফোরণে ফেটে পড়ল মাঠ’ কেমন করে ? আগেই যদি জনশূন্য হয়ে পড়ে মাঠ ? হতে পারে আমারই সমস্যা হচ্ছে।

    একজাগায় আপনার সাথে আমিও সহমত করছি ‘আগে… আগুন লাগা, তারপর তুরা যত ইচ্ছা খিস্তি কর।’

  6. কৌস্তুভ আগস্ট 29, 2012 at 3:31 পূর্বাহ্ন - Reply

    গল্প তো ভালই লাগল। আপনার পরিমিতিবোধ আছে।

  7. আঃ হাকিম চাকলাদার আগস্ট 27, 2012 at 5:51 অপরাহ্ন - Reply

    গলপ টা তো বেশ ভালই লাগল।আরো লিখুন।

    @মুক্তমনা মডারেটর গন,
    পূর্বের ন্যায় উত্তর ই-মেইলে পাঠানোর SEVICE চালু করা যায়না? এ SERVICE টা চালু করলে পাঠকদের জন্য একটু সুবিধা হয়।

    • মোজাফফর হোসেন আগস্ট 28, 2012 at 12:33 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আঃ হাকিম চাকলাদার, গল্পটি পড়ার জন্যে ধন্যবাদ আপনাকে।

  8. আকাশ মালিক আগস্ট 27, 2012 at 5:12 অপরাহ্ন - Reply

    একই আঙ্গীকের আরেকটি গল্প এই মুক্তমনায় পড়েছিলাম, লেখকের নামটা মনে পড়ছেনা। তো এখানে কারা কারা ঐ বেগানা মহিলার কাছে গিয়ে নাপাক হয়েছেন, আওয়াজ তোলেন এই কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্যে জনশূন্য হয়ে পড়ল সমস্ত মাঠ মানে কি মানুষ মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিল?

    সুন্দর গল্প, তয় শেষটা যেন কেমনে কী হলো বুঝলাম না। বহুদিন পর লিখলেন বোধ হয়, গল্প চলুক- (Y)

    • মোজাফফর হোসেন আগস্ট 28, 2012 at 12:30 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আকাশ মালিক, শেষে দেখাতে চেয়েছি, সমস্যা এক জায়গায় ট্রিটমেন্ট অন্য জায়গায় হওয়া কারণে তথাকথিত বেশ্যা সমাজ থেকে বিলীন হয়ে যায় না। ছয়মন যায় সফেলা আসে, সফেলা যায় আকলির মা আসে। গল্পটি পড়ার জন্যে ধন্যবাদ আপনাকে।

  9. পিয়াস চৌধুরী আগস্ট 27, 2012 at 3:36 অপরাহ্ন - Reply

    গল্পটা এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম। সব মিলিয়ে অসাধারণ (Y)

  10. অর্বাচীন আগস্ট 27, 2012 at 2:55 অপরাহ্ন - Reply

    খুব একটা ভাল লাগলো না ..চিরাচরিত গল্প ….আরেকটু গভীর হলে ভাল হত

    • মোজাফফর হোসেন আগস্ট 28, 2012 at 12:26 পূর্বাহ্ন - Reply

      @অর্বাচীন, gcjএকজন পাঠক হিসেবে আমারও তাই মনে হয়। ধন্যবাদ ভাই।

  11. অসীম আগস্ট 27, 2012 at 2:54 অপরাহ্ন - Reply

    দারুণ লেগেছে। (Y)

  12. ভক্ত আগস্ট 27, 2012 at 11:28 পূর্বাহ্ন - Reply

    চমৎকার!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!

মন্তব্য করুন