দুর্বল বলের কথা

মহাবিশ্বের চারটি মৌলিক বলের অন্যতম হল দুর্বল নিউক্লীয় বল বা উইক নিউক্লিয়ার ফোর্স। মহাকর্ষ হল দুর্বলতম বল। দুর্বলতার দিক দিয়ে এর ঠিক আগে হল উইক ফোর্সের অবস্থান। যে তিনটি বলকে স্ট্যান্ডার্ড মডেল অব পার্টিকেল ফিজিক্সের আওতাতে কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্বদ্বারা বর্ণনা করা যায় এটি তার অন্যতম। এই বলটিকে দুর্বল বলবার কারণ হল এটি তড়িৎ-চুম্বকত্ব এবং সবল নিউক্লীয় বলের তুলনায় বেশ দুর্বল। এটির প্রাখর্য্য সবল সবল নিউক্লীয় বলের প্রায় ১০০০০০০০ ভাগের ১ ভাগ। ১ মিটারের ১০০০০০০০০০০০০০০০০০০ ভাগের এক ভাগ দৈর্ঘ্যে এটির প্রাখর্য্য প্রায় তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের সমান অর্থাৎ এই দৈর্ঘ্যে বলদু’টি একীভূত বা ইউনিফাইড কিন্ত ৩X১০^১৭ মিটার দৈর্ঘ্যের মধ্যে এটি তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের চাইতে ১০,০০০ গুণ ছোট। তেজষ্ক্রিয় বিটা ডিকের জন্য দায়ী এই বল। এ ধরণের প্রক্রিয়াতে যা হয় তা হল একটি আনস্ট্যাবল পরমাণুকেন্দ্র আয়োনাইজিং কণিকা নিঃসরণ করে শক্তিক্ষয় করে। বিটা ডিকের ক্ষেত্রে পরমাণুকেন্দ্রে অবস্থানকারী একটি নিউট্রন পরিণত হয় একটি প্রোটন, একটি ইলেকট্রন এবং একটি ইলেকট্রন এ্যান্টি-নিউট্রিনোতে। প্রোটনটি পরমাণু কেন্দ্রে থেকে যায় এবং ইলেকট্রন ও নিউট্রিনো পরমাণু থেকে নিঃসরিত হয়। নিউট্রিনো পদার্থের সাথে খুবই দুর্বলভাবে বিক্রিয়া করে থাকে এবং এটি প্রায় ভরশূণ্য। আর সেজন্য মনে হয় পরমাণু বা পরমাণুকেন্দ্র থেকে নেগেটিভ বিটা কণিকা অর্থাৎ ইলেকট্রনের নিঃসরণ হচ্ছে–আর সেজন্যই এর নাম দেওয়া হয় বিটা ডিকে। এ থেকে প্রাথমিক দিকে অনেক বিজ্ঞানী ভুলভাবে অনুমান করেন যে পরমাণুকেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস ইলেকট্রন ও প্রোটোন দ্বারা গঠিত ( আমরা বর্তমানে জানি যে নিউক্লিয়াস গঠিত ধনাত্মক চার্জধারী প্রোটন এবং চার্জবিহীণ নিউট্রাল কণিকা নিউট্রন দ্বারা)। তবে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রাথমিক ধারণা থেকে অনেক বিজ্ঞানী তখনই বুঝতে পারেন যে একাধিক ইলেকট্রনকে পরামাণুকেন্দ্রের মতন ক্ষুদ্রস্থানে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয় ( এটি হয়ে থাকে পাউলির বর্জননীতির কারণে)। যাই হোক, এনরিকো ফার্মির দুর্বল নিউক্লীয় বলের তত্বে এই ইন্টারাকশন ছিল বিক্রিয়াতে অংশ নেওয়া চারটি কণিকার (একটি নিউট্রন, একটি প্রোটন, একটি ইলেকট্রন এবং একটি ইলেকট্রন এ্যান্টি-নিউট্রিনো) একটি বিন্দুতে ঘটা ইন্টারাকশন এবং মহাকর্ষ, তড়িৎচুম্বকীয় বা সবল বলের মতন এর কোন অসীম বা সসীম রেঞ্জ নেই। অন্য কথায় কোন ফিল্ড বা ক্ষেত্রের প্রয়োজণীয়তা নেই–কারণ দুইটি বিন্দুর ভেতর কোন কিছুর প্রভাব প্রবাহিত হবার দরকার নেই। এটি যদিও ঠিক এ্যাকশন এ্যাট আ ডিসট্যান্স নয় বরং কনটাক্ট ইন্টারাকশন–কিন্ত এটিকে মেনে নেবার ফলাফল একই–ক্ষেত্রের অস্তিত্বের অপ্রয়োজণীয়তা। ফার্মির তত্ব প্যারিটির অসংরক্ষণের জন্য কিছু সংশোধণকে ধর্তব্যে এনে অনেক অনেক বছর বেশ ভালো কাজ দিয়েছে এবং বেশ কয়েক দশক ধরে এর ভুল হবার কোন লক্ষণও দেখা যায়নি। তবে, শেষাবধি এটিকে ভুল হিসেবে বিজ্ঞানীরা রায় দিয়েছেন–মূলত: তত্বটি নান-রিনরমালাইজেবল বলে। এটি নিয়ে অন্যকোন সময় আলোচনা করা যাবে। এখানে “ভুল” বলতে আসলে যা বোঝানো হয়েছে তা হল ফার্মির তত্ব একটি লো এনার্জি এফেক্টিক থিওরী–এটি আরও কোন সাধারণীকৃত তত্বের আসন্নমান যা নিম্ন শক্তিতে ভালোভাবে কাজ করে। এই সাধারণীকৃত তত্বটি হল ফার্মির তত্বের উপযুক্ত উত্তরসূরী ৬০ এর দশকে গ্লাশো, সালাম, ভাইনবার্গকৃত স্ট্যান্ডার্ড মডেল। এই তত্বে তড়িৎ-চুম্বকত্ব এবং দুর্বল নিউক্লীয় বলকে নান-ট্রিভিয়ালি একীভূত করা হয়েছে। উইক ফিল্ডকে কোয়ান্টাইজ করলে দু’ধরণের কোয়ান্টা পাওয়া যায়: উব্লিউ এবং জি বোসোন যাদের ভর প্রোটনের ভরের প্রায় ৮০ গুণ!! সালাম, ভাইনবার্গকৃত তত্বে উইক ফোর্সের সৃষ্টি হয় কণিকাসমূহের মধ্যে এই দু’টি ভরযুক্ত কণিকার বিনিময়ের মাধ্যমে (ঠিক যেভাবে তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের সৃষ্টি হয়ে থাকে ইলেকট্রিক চার্জবাহী কণিকাসমূহের মধ্যে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড কোয়ান্টা শূন্য ভরের ফোটন বা আলোক-কণিকা বিনিময়ের মাধ্যমে এবং এই বলের রেঞ্জ অসীম-কারণ রেঞ্জ হল বিনিময় কণিকার ভরের ইনভার্স বা ব্যস্তানুপাতিক) এবং বিনিময় কণিকাদু’টি ভর‌যুক্ত হওয়া দুর্বল বলের রেঞ্জের ক্ষুদ্রতাকে (৩X১০^-১৭—৩X১০^-১৬ মিটার) ব্যাখ্যা করে থাকে। একেবারে গভীরে গিয়ে দেখা যাক দুর্বল বিক্রিয়াতে ঠিক কি ঘটে থাকে। এখানেও আমরা বিটা ডিকের সাহায্যেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করব। একটি নিউট্রন গঠিত একটি আপ টাইপ কোয়ার্ক এবং দুইটি ডাউন টাইপ কোয়ার্ক দিয়ে। এখন উইক ইন্টরাকশন হল একমাত্র বিক্রিয়া যাকিনা কোয়ার্কের ফ্লেভার বদলাতে সক্ষম অর্থাৎ এটি একটি আপ কোয়ার্ককে একটি ডাউন কোয়ার্কে অথবা একটি কাবিবো রোটেটেড স্টেঞ্জ কোয়ার্কে রূপান্তরিত করতে পারে। বিপরীত প্রক্রিয়াও সম্ভব। বিটা ডিকেতে নিউক্লিয়াসে অবস্থিত একটি নিউট্রনের মধ্যকার একটি ডাউন কোয়ার্ক নেগেটিভ চার্জযুক্ত একটি ডব্লিউ বোসোন নিঃসরণের মাধ্যমে একটি আপ কোয়ার্কে পরিণত হয় এবং নিউট্রনটি পরিণত হয় একটি প্রোটনে। এর কারণ: প্রোটন গঠিত একটি ডাউন কোয়ার্ক এবং দুইটি আপ কোয়ার্ক দিয়ে। এখন নিঃসরিত ডব্লিউ বোসোনটির কি হয়? এটি একটি ইলেকট্রন এবং একটি ইলেকট্রন এ্যান্টি-নিউট্রিনোতে পরিণত হয়। যাইহোক, সালাম-ভাইনবার্গের তত্বে এই বিনিময়ের দরূণ সৃষ্ট বল হল নান-কন্টাক্ট ফোর্স–যেখানে ফার্মির তত্বে এটি কনটাক্ট ফোর্স যা আগেই বলেছি। ইলেকট্রো-উইক থিওরী থেকে উব্লিউ এবং জি বোসোনের সঠিক ভর ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় যা পরীক্ষাগারে কণিকাদু’টি ডিটেকশনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। তদুপরি, নিউট্রাল কারেন্ট রিএ্যাকশন এবং চার্ম কোয়ার্কের তত্বীয় ভবিষ্যদ্বাণীও ঠিক ঠিক ফলে যায়। এসবই সালাম-ভাইনবার্গের তত্বকে উইক ইন্টারাকশনের সঠিক তত্ব হিসেবে প্রমাণিত করে।

চলুন তাহলে উইক ফোর্সের আবিষ্কারের গল্পটি শুরু করা যাক। ১৮৯৬ সালের এক মেঘলা প্যারিসিয়ান দিন। বিখ্যাত ফরাসী বৈজ্ঞানিক আঁরি বেকেরেল ফসফরোসেন্সের পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। তিনি একটি ফটোগ্রাফিক প্লেটকে কালো কাগজের একটি পুরু আস্তরণের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন এবং তারপর এর ওপর একটি ধাতু-নির্মিত মেডেল রাখলেন। এই মেডেলটির আকৃতি অনেকটা মাল্টিজ ক্রুশের মতন। এরপর এসবকিছুর ওপর তিনি পটাশিয়াম ইউরানাইল সালফেটের (এই ইউরেনিয়ামজাত লবন তিনি নিজেই প্রস্তুত করেছিলেন) একটি শিট রাখলেন। পরীক্ষণের প্রথম ধাপ ছিল তার এই সরঞ্জামটির ওপর সূর্যের আলো পরবার ব্যবস্থা করা। কিন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্যারিসের আকাশ আরও বেশ কিছুদিন মেঘাচ্ছন্ন থাকল এবং সূর্যালোকের অভাবে বেকেরেল তাঁর পরীক্ষণকে স্থগিত রাখতে বাধ্য হলেন। এই সময়ে তিনি তাঁর সরঞ্জামটি একটি অন্ধকার কাপবোর্ডের ভেতর তালা মেরে রেখে দিলেন। একদিন হঠাৎ স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে নাকি অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে তিনি ফটোগ্রাফিক প্লেটটিকে ডেভেলোপ করতে মনঃস্থ করলেন–যদিও ফসফরোসেন্ট দ্রব্যটি কখনই সূর্যালোকের সংস্পর্শ পায়নি। এবার শুরু হল তাঁর বিস্ময়ের পালা। তিনি দেখতে পেলেন যে ফটোগ্রাফিক প্লেটটির ওপর মাল্টিজ ক্রুশটির ছবি একেবারে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে!! একদিন হঠাৎ স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে নাকি অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে তিনি ফটোগ্রাফিক প্লেটটিকে ডেভেলোপ করতে মনঃস্থ করলেন–যদিও ফসফরোসেন্ট দ্রব্যটি কখনই সূর্যালোকের সংস্পর্শ পায়নি। এবার শুরু হল তাঁর বিস্ময়ের পালা। তিনি দেখতে পেলেন যে ফটোগ্রাফিক প্লেটটির ওপর মাল্টিজ ক্রুশটির ছবি একেবারে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে!! এর অর্থ কি? ইউরেনিয়ামের লবনটি যা কখনই সূর্যালোকের সংস্পর্শ পায়নি এক ধরণের “অদৃশ্য” আলো বিকিরণ করছে যা কালো কাগজগুলোকে ভেদ করতে সক্ষম। বেকেরেলের ভাষায় এই অদৃশ্য ফসফরোসেন্ট বিকিরণ দৃশ্যমান আলোর বিকিরণের চাইতে সহস্রগুণ তীব্র এবং শক্তিশালী। বেকেরেল নিজের অজান্তে আবিষ্কার করে ফেললেন রেডিওএ্যাকটিভিটি বা তেজষ্ক্রিয়তা।

মজার ব্যাপার হল যে একই মাসে এবং সেই একই বছরে ইংরেজ সাহেব সিলভানাস থম্পসন ইংলিশ শীত এবং ভিক্টোরিয়ান লন্ডনের ধোঁয়ামোড়া কুয়াশার সহায়তায় মোটামুটি একই ধরণের ফলাফল পেলেন। বেকেরেলের মতন থম্পসনের সরঞ্জামাদিও একই ধরণের ছবি দেখালো–যদিও এদের কখনই সূর্যের মুখ দেখতে হয়নি। থম্পসন তাঁর ফলাফল প্রকাশ করতে দেরী করে ফেললেন। শুধু তাই নয়–তিনি এর ভুল ব্যাখ্যা করলেন ফসফরোসেন্সের এফেক্ট হিসেবে।তিনি নতুন ধরণের বিকিরণটিকে ধরতে ব্যর্থ হয়ে ইতিহাসের খাতায় এর আবিষ্কারক হিসেবে নিজের নাম লেখাতে ব্যর্থ হলেন।

পরবর্তীকালে আরও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মোট তিন ধরণের রেডিয়েশন ধরা পরে: আলফা, বিটা এবং গামা। আলফা রেডিয়েশনে নিউক্লিয়াস আলফা-কণিকা নিঃসরণ করে। আলফা কণিকা হল দু’টি প্রোটোন ও দু’টি নিউট্রনের দ্বারা গঠিত ভারী কণিকা।বিটা রেডিয়েশনের কথাতো আগেই বলেছি। বিটা বা আলফা ডিকের পর সাধারণত: উত্তেজিত নিউক্লিয়াস কিছু তড়িৎ-চুম্বকীয় রশ্মি বিকিরণ করে। এটিই গামা রেডিয়েশন নামে পরিচিত। আমাদের গল্পে বেকেরেলের মাল্টিজ ক্রুশের জন্য দায়ী বিকিরণ হল বিটা ডিকে যাকিনা একটি দুর্বল নিউক্লীয় বিক্রিয়া। বিটা তেজষ্ক্রিয়তা বিজ্ঞানীদের জন্য একধরণের ধাঁধা উপস্থিত করল। অন্য সব ধরণের তেজষ্ক্রিয়তাতে নিউক্লিয়াসের হারানো শক্তি তেজষ্ক্রিয় রশ্মি কর্তৃক প্রবাহিত শক্তির সমান। আপনি যখন বাজার করে বাসাতে ফেরত আসেন তখন আপনার খরচ করা টাকার পরিমাণ আপনার পকেট থেকে খালি হয়ে যাওয়া টাকার পরিমাণের সমান হবে। নয়কি? বিটা ডিকের ক্ষেত্রে কিন্ত ঠিক উল্টোটি ঘটে। বিভিন্ন পরীক্ষণে দেখা যায় যে নিউক্লিয়াস থেকে বিটা ডিকে বিভিন্ন পরিমাণ শক্তি বহন করছে। এই ডিকে হল একঝাক ইলেকট্রনের নিঃসরণ এবং প্রতিটি ইলেকট্রন কর্তৃক বাহিত শক্তির পরিমাণ এক নয়। একটু বুঝানোর চেষ্টা করি। ধরুন আপনি একটি বন্দুক থেকে পরপর গুলি ছুড়ছেন আর একটি গুলি আরেটির তুলনায় ১০০০ গুণ কম গতিতে বের হচ্ছে–বিষয়টি অনেকটা এরকম।

বিষয়টি তাত্ত্বিকদের চায়ের টেবিলে রীতিমতন ঝড় তুলল। বিখ্যাত তাত্বিক পদার্থবিদ নীলস্ বোর এবং উলফগ্যাং পাউলির মধ্যকার বিতর্ক এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বোর একটি বৈপ্লবিক প্রস্তাবনার মাধ্যমে পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন । তিনি বললেন যে আণবিক স্তরে শক্তির সংরক্ষণশীলতা শুধুমাত্র গড়ে সত্য কিন্ত আলাদা আলাদা প্রক্রিয়াতে এটি প্রযোজ্য নয়। এজন্যই বিটা ডিকেতে নিউক্লিয়াস থেকে ইলেকট্রনগুলো বিভিন্নমানের শক্তিতে নিঃসরিত হয়ে থাকে। এটা ছিল এমন এক সময় যখন আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম তত্ব চিরায়ত অনেক ধারণাকেই ছুড়ে ফেলে দিচ্ছিল–কোনকিছুকেই আর “পবিত্র” মনে হচ্ছিলনা। এমন একটা আবহে বোর– এমনকি শক্তির সংরক্ষণশীলতার মতন পদার্থবিদ্যার প্রাণপ্রিয় ভিত্তিপ্রস্তরকেও ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলবার পক্ষপাতী ছিলেন।কিন্ত পাউলি তাঁর সাথে একমত ছিলেন না। তাঁর মতে বোর পথভ্রষ্ট হয়েছিলেন। বোর ক্ষান্ত না দিয়ে তাঁর ধারণা নিয়েই থাকলেন। শুধু কি তাই? তিনি কল্পনা করলেন যে বিটা ডিকেতে শক্তির অসংরক্ষণশীলতা নক্ষত্রপুঞ্জের আপাত: চিরস্থায়ী শক্তি উৎপাদনকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। এসম্পর্কে পাউলি যখন শুনতে পেলেন তখন তিনি ভেঙ্গচি কেঁটে মন্তব্য করলেন: ” তারাদের শান্তিতে জ্বলতে দেওয়া হোক।”

পাউলি তাঁর তীক্ষ বুদ্ধি, ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য এবং অট্টহাসির জন্য বিখ্যাত বা কুখ্যাত ছিলেন।কিন্ত একইসাথে অসাধারণ মেধা এবং বিশ্বকোষীয় জ্ঞানের জন্য তাঁর কলিগেরা তাঁর সম্পর্কে খুবই উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন এবং স্পষ্টভাষাতেই তাঁর প্রশংসা করতেন। ভিয়েনার হাইস্কুল থেকে গ্রাজুয়েশনের মাত্র তিন মাস পর তিনি জেনারেল রিলেটিভিটি বিষয়ে তাঁর প্রথম সাইন্টিফিক আর্টিকেল প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সাইন্টিফিক ক্যারিয়ারের বেশীরভাগই তিনি কাটান সুইজারল্যান্ডের জুরিখে যদিও তিনি প্রায়ই অন্যান্য শহর এবং দেশ ঘুড়ে বেরিয়েছেন এবং যেখানেই যখনই সু্যোগ পেয়েছেন পদার্থবিদ্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। জনসমক্ষে বক্তৃতা দেবার সময় তিনি ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে অনবরত উল্টোপাল্টা হেঁটে বেড়াতেন। পদার্থবিদ্যা নিয়ে আলোচনার সময় ওয়েইলিং ওয়ালে ইহুদীদের হাসিদিক প্রার্থনার মতন করে নিজ দেহকে নাড়ানোর অদ্ভুত এক অভ্যাস ছিল তাঁর।

এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিসিস্টরা প্রায়ই তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের যন্ত্রপাতি বা ল্যাবরেটেরি ইন্সট্রুমেন্টের আনাড়ি ব্যবহার নিয়ে হাসাহাসি করে থাকেন। পাউলি সাহেব এবিষয়েও এককাঠি এগিয়ে ছিলেন। তাঁর নামে একধরণের রহস্যজনক এফেক্টের নামকরণ পর্যন্ত করা হয়েছিল :”পাউলি এফেক্ট”। তিনি যখনই কোন ল্যাবরেটরির কাছাকাছি যেতেন তখনই হয় কোন সরঞ্জাম ভাঙ্গতো অথবা অকেজো হয়ে পড়ত। একদিন গটিনজেনে জেমস্ ফ্রাঙ্ক তাঁর ল্যাবে একটি পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। এমনসময় একটা সূক্ষ যন্ত্রাংশ একেবারেই অজানা কোন কারণে বিস্ফোরিত হল।ফ্রাঙ্ক পাউলির কাছে একটি চিঠি লিখে ঘটনাটি জানালেন এবং বললেন যে তিনি এর ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না। যদি পাউলি সে সময় তাঁর ল্যাবের ধারেকাছে থাকতেন তাহলে না হয় তাঁর উপস্থিতিজনিত রহস্যজনক এফেক্টকে দায়ী করা যেত। যাহোক, পাউলি এরপর তাঁর ডায়েরী চেক করলেন এবং বিস্ময়করভাবে তিনি আবিষ্কার করলেন যে ঠিক সে মুহুর্তে তিনি গটিনজেন স্টেশানে জুরিখ এবং কোপেনহ্যাগেনের মধ্যে যাতায়তের জন্য একটি কানেক্টিং ট্রেইনের আপেক্ষায় ছিলেন!!

একদিন একদল পদার্থবিদ পাউলিকে নিয়ে মজা করবার পরিকল্পনা করলেন। তখন একটি কনফারেন্স চলছিল। মিটিং রুমে তাঁরা একটি ঝাড়বাতির সাথে একটি ডিভাইস এমনভাবে কানেক্ট করলেন যে পাউলি রুমে ঢোকা মাত্র মেকানিজমটি শুরু হয়ে যাবে এবং বাতিটি মেঝেতে পড়ে ভেঙ্গে চুড়চুড় হবে। ঠিক সেইমুহুর্তে পরিকল্পনামাফিক তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করে চেঁচিয়ে উঠবেন। ভাবটা হবে এমন যে পাউলির উপস্থিতিতেই ঘটনা বা দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। যথারীতি যড়যন্ত্র সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ পাউলি রুমে প্রবেশ করলেন এবং কিছুই ঘটল না কারণ ডিভাইসটি চুড়ান্ত মুহুর্তে কাজ করেনি। আরও একবার “পাউলি এফেক্ট” তার খেল দেখিয়ে গেল।

সে যাইহোক, পাউলি বিটা রেডিওএ্যাকটিভিটিকে মোকাবেলা করলেন বোরের থেকে একেবারেই ভিন্ন একটি কৌশল প্রয়োগ করে। তিনি বললেন যে বিটা রেডিয়েশনে নিঃসরিত ইলেকট্রনগুলোর শক্তি সবসময়ই একই–ভিন্ন ভিন্ন নয়। ভিন্ন ভিন্ন শক্তি দেখানোর কারণ হল অতিরিক্ত শক্তি একটি নতুন ধরণের কণিকা বহন করে নিয়ে যায়। পরবর্তীকালে ফার্মি এটির নাম দেন “নিউট্রিনো”। কণিকাটির স্পিন ১/২ (কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণশীলতা থেকে), ইলেকট্রিক চার্জ শুণ্য (চার্জের সংরক্ষণশীলতার জন্য এটির চার্জ শুণ্য হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তাছাড়া চার্জহীণ বলে বাবল চেম্বারেও এটি কোন চিণ্হ রাখেনা। মোদ্দাকথা, এটি তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের প্রভাবশুণ্য।) এবং ভরও প্রায় শুণ্য (কারণ ইলেকট্রন আর প্রোটনের ভরের সমষ্টি নিউট্রনের ভরের প্রায় সমান।)। কাজেই পাউলির ব্যাখ্যানুসারে পরীক্ষণের সাহায্যে প্রকৃত শক্তির মাত্র অংশবিশেষ পরিমাপ করা সম্ভব। এটি বিটা ডিকেতে ইলেকট্রনের শক্তির অদ্ভুত পরীক্ষণলব্ধ পর্যবেক্ষণকে পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করে।

এখন আমরা আগের উদাহরণের সাদৃশ্যে পাউলির ব্যাখ্যাকে বুঝবার জন্য একটু চেষ্টা করি। ধরা যাক, একটা বন্দুক থেকে ছোড়া সবক’টি গুলির শক্তি একই। আবার, বন্দুকটি একবারে একটি নয়–দু’টি গুলি একসাথে ছোড়ে। গুলিদু’টির একটি দৃশ্যমান এবং এটি টার্গেটে চিন্থ রেখে যায়। অন্যটি অদৃশ্য এবং কোন রকম চিণ্হ না রেখেই এটি টার্গেট ভেদ করে চলে যায়। এখন প্রতিটি শুটিংয়ের শক্তি (যাকিনা প্রতি শটের ক্ষেত্রে একই) বুলেট দু’টোর ভেতরে আরবিট্রারিলি বন্টিত হয়। আমরা যেহেতু বুলেট দু’টোর একটিকে দেখিনা সেজন্য আমাদের মনে হয় যে কিছু শক্তি হারিয়ে গেছে–শক্তি সংরক্ষিত হচ্ছেনা-যেমনটি বোর সাহেব ভেবেছিলেন।

আমাদের জানা সমস্ত বস্তকণিকা ১২ ধরণের স্পিন-১/২ মৌলিক অবিভাজ্য ফার্মিয়ন কণিকা দিয়ে তৈরী। এদেরকে প্রথমত: ২ টি প্রকারে বিভক্ত করা হয়: লেপটন এবং কোয়ার্ক। কম্পোজিট কণিকা যেমন: ব্যারিয়ন (প্রোটন, নিউট্রন ইত্যাদি) এবং মেসন আসলে বিভিন্ন ধরণের কোয়ার্কের কালারশুণ্য সমন্বয়। এই কণিকাগুলো আসে ৩ টি জেনারেশনে যাদের প্রথমটির সদস্যদের স্ট্যাবিলিটি সবচেয়ে বেশী (অর্থাৎ এরা সহজে ডিকে করেনা এবং এদের আয়ুষ্কাল সর্বাপেক্ষা বেশী) এবং শেষেরটি সবচেয়ে কম। প্রথম জেনারেশনের সদস্যরা হল: ইলেকট্রন, ইলেকট্রন-নিউট্রিনো, আপ-কোয়ার্ক এবং ডাউন-কোয়ার্ক। দ্বিতীয় জেনারেশনে আছে মিউয়ন, মিউয়ন-নিউট্রিনো, চার্ম-কোয়ার্ক এবং স্রেঞ্জ-কোয়ার্ক এবং তৃতীয় জেনারেশনে আছে টাউ, টাউ- নিউট্রিনো, টপ-কোয়ার্ক এবং বটম-কোয়ার্ক। দুইটি জেনারেশনের মধ্যে কণিকাগুলোর পার্থক্য শুধুমাত্র তাদের ভরের জন্য হয়–তাদের কোয়ান্টাম নম্বর এবং তাদের মধ্যেকার ইন্টারাকশনের প্রকৃতি অনুরুপই থাকে। দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বেশীরভাগ বা আমাদের চারপাশের বেশীরভাগ বস্তু প্রথম জেনারেশনের তড়িৎ-চার্জযুক্ত কণিকাগুলো তথা ইলেকট্রন, আপ-কোয়ার্ক এবং ডাউন-কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত যেগুলো আবার কিনা সমস্ত মৌল কণিকার মধ্যে সর্বাপেক্ষা হালকা (কম ভরের)। এখানে অবশ্য বলে রাখা ভালো যে সমস্ত জেনারেশনের নিউট্রিনোগুলোই কিন্ত স্ট্যাবল। তারা সহজে অন্যান্য বস্তুর সাথে বিক্রিয়া করে না এবং ডিকেও করেনা। নিউট্রিনো কেবল দুর্বল বলের মাধ্যমে বিক্রিয়া করে থাকে (উদাহরণ: বিটা ডিকে)।

সবল নিউক্লীয় বল শুধুমাত্র কালার চার্জবাহী কোয়ার্ক ও গ্লুওনের মধ্যে কাজ করে। কিন্ত ১২ প্রকার মৌল কণিকার প্রত্যেকটি দুর্বল বলের সাহায্যে বিক্রিয়া করে থাকে। আর এজন্যই সব ধরণের বস্তুকণিকা শেষ পর্যন্ত দুর্বল বিক্রিয়ার মাধ্যমে আপেক্ষাকৃত বেশী স্ট্যাবল প্রথম জেনারেশনভুক্ত লেপ্টন (ইলেকট্রন, নিউট্রিনো) এবং হ্যাড্রনে (প্রোটন) পরিণত হয়। এ ধরণের বিক্রিয়ার একটি বৈশিষ্ট্য হল পরিবর্তিত বা উৎপন্ন কণিকার ইলেকট্রিক চার্জের পরিবর্তণ (এর কারণ হল দুর্বল বলবাহী ইন্টারমেডিয়েট ভেক্টর বোসোন বা উব্লিউ বোসোনের নিজেই ইলেকট্রিক চার্জ আছে)। অন্যান্য বলের ক্রিয়ায় বিভিন্ন বাউন্ড স্টেটের সৃষ্টি হয়। যেমন: সবল বলের ক্রিয়াতে নিউট্রন এবং প্রোটনসমূহ একতাবদ্ধ হয়ে পরমাণুকেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস গঠন করে, তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের ক্রিয়াতে অণু-পরামাণু এবং কনডেন্সড ম্যাটার গঠিত হয়, মহাকর্ষ বা গ্রাভিটির ক্রিয়ায় গঠিত হয় গ্রহ-নক্ষত্র নীহারিকাপুঞ্জ। কিন্ত উইক ফোর্সের ক্রিয়ায় এমন কিছুই তৈরী হয়না। এর কারণ কি? এর কারণ হল এর অস্বাভাবিকভাবে ক্ষুদ্র রেঞ্জ বা যে দুরত্বের ভেতর এই বল ক্রিয়াশীল। এই রেঞ্জ কতটুকু? প্রায় ১০^-১৮ মিটার। এত ছোট দূরত্বতো আমাদের বোধগম্যতার বাইরে। আর সেজন্যই আমরা উইক ইন্টারাকশনের প্রভাবকে সরাসরি বুঝতে পারিনা।

উইক ইন্টারাকশনের আরেকটি বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য হল যে এটিকে বহনকারী গেজ-বোসোন কণিকা বেশ ভারী যা আগেই বলেছি। অন্য তিনটি বলবাহী কণিকার (তড়িৎ-চুম্বকীয় বল বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সের ক্ষেত্রে ফোটন, স্ট্রং নিউক্লীয়ার ফোর্স বা সবল বলের ক্ষেত্রে গ্লুওন এবং মহাকর্ষ বা গ্রাভিটির ক্ষেত্রে গ্রাভিটন) প্রত্যেকটি ভরশুণ্য এবং আলোর গতিতে চলে। এখানে একটি কথা বলাটা জরুরী মনে করি। উইক ইন্টারাকশন কোয়ার্কের বা লেপটনের ফ্লেভার পরিবর্তণ করে। কিন্ত সেটি হয় কেবল চার্জড্ কারেন্ট ইন্টারাকশনের ক্ষেত্রে যেটি মেডিয়েট কটে ডব্লিউ বোসোন। নিউট্রাল কারেন্ট ইন্টারাকশনে কণিকার ফ্লেভার পরিবর্তিত হয়না। মজার বিষয় হল দুইটি সাধারণ ইলেকট্রনও উইকলি ইন্টারাক্ট করতে পারে। কারণ তাদের সাথে নিউট্রাল জি বোসোন কাপল করে থাকে, অন্যকথায় ফোটনের সাথে সাথে এদের মধ্যে জি বোসোনের বিনিময়ও ঘটে থাকে। এর ফলাফলস্বরূপ কুলম্বের সূত্রে খুবই ছোট একটি কারেকশন করতে হবে। কিন্ত এটি এত বেশী ছোট এবং উপরোক্ত বিক্রিয়াতে তড়িৎ-চুম্বকীয় প্রক্রিয়ার প্রভাব তুলনামূলকভাবে এতই বেশী যে আমরা সেটিকে অগ্রাহ্য করতে বাধ্য হই। হামবুর্গের ডেসিতে উচ্চশক্তির ইলেকট্রন-পজিট্রনের বিক্রিয়াতে মিউয়ন ও এ্যান্টি-মিউনের সৃষ্টি হয় এবং এই পরীক্ষণে জি বোসোনের অবদান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এখন তড়িৎ-চুম্বকীয় বিক্রিয়ার প্রভাবশূণ্য একটি বিশুদ্ধ নিউট্রাল উইক ইন্টারাকশন পেতে হলে আমাদের দরকার পড়বে নিউট্রিনোর স্ক্যাটারিং। কিন্ত আগেই বলেছি: নিউট্রিনোকে ডিটেক্ট করা খুবই কঠিন এবং এটি সহজে কোন কিছুর সাথে বিক্রিয়া করেনা আর সেজন্যই যেকোন ধরণের নিউট্রিনো এক্সপেরিমেন্ট করা খুবই কঠিন একটি ব্যাপার। আমরা দুর্বল বলের জন্য ফার্মির তত্বের কথা বলেছি। ফার্মির তত্ব থেকে কিন্ত উইক নিউট্রাল প্রক্রিয়াগুলো পাওয়া যায়না। এইটা সেই তত্বের একটি বড় সীমাবদ্ধতা।

যাই হোক, আবার পাউলির কথায় ফিরে আসি। বর্তমানকালে পদার্থবিদেরা নতুন নতুন কণিকার আবিষ্কারে মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গেছেন (ফোটিনো, সিলেকট্রন, টাকিয়ন, এক্সিয়ন, গ্রাভিটন আরও কত কি)। পাউলির সময় কিন্ত পরিস্থিতি এমটি ছিলনা–তাঁর হাইপোথেসিসকে অনেকেই অতিরিক্তমাত্রায় বৈপ্লবিক বলে মনে করতেন। পাউলি নিজেও তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে কোন সাইন্টিফিক জার্নালে প্রকাশ করতে সাহস পাননি। জার্মানীর টুবিংগেনে রেডিওএ্যাকটিভিটির ওপর একটি মিটিংয়ে তিনি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। কিন্ত একই সময় জুরিখের এক হোটেলে তাঁর কিছু ইতালিয়ান বান্ধবীর সাথে তাঁর নাচানাচি এবং মদ্যপানের পার্টিও ছিল। জটিল তাত্ত্বিক কাজে তাঁর মাথা এমনিতেই বেশ কিছুদিন যাবৎ গরম ছিল। তিনি টুবিংগেনে তাঁর কলিগদের একটি চিঠি লিখে সেখানকার মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। চিঠি তিনি শুরূ করলেন এই বলে:”আমার প্রিয় তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়গণ”। এরপর তিনি ব্যাখ্যা করলেন যে তাঁর হাইপোথেসিস আসলে বিটা ডিকের সমস্যা থেকে মুক্তির একটা প্রাণপণ চেষ্টামাত্র—কোন সিরিয়াস সমাধান নয়।

পাউলির নিজের কাছেই এ বিষয়ে তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে উন্মত্ত মনে হয়েছিল। ১৯৩১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি রোমে একটি কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বলেছিলেন সেসময়ের দু’টি “দুর্বিষহ” স্মৃতির কথা :প্রথমটি হল বেনিতো মুসোলিনির সাথে করমর্দন এবং দ্বিতীয়টি হল তাঁর কলিগদের জোড়াজুড়ির কাছে আত্মসমর্পন করে তাঁর নিউট্রিনো হাইপোথেসিস ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হওয়া।

পরবর্তীকালে পাউলি নিউট্রিনো হাইপোথেসিসকে তাঁর জীবনের নির্বোধ জটিলতার ততোধিক উৎকট গর্ভস্রাব হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কি কারণে তিনি এমন মন্তব্য করেন তা কিছুটা ব্যাখ্যার দাবী রাখে। বিটা ডিকে নিয়ে ভাবনার সেইসবদিনগুলো তাঁর জন্য খুব একটা সহজ ছিলনা: বিশেষ করে মায়ের আত্মহত্যা এবং স্ত্রী জার্মান নর্তকী ক্যাথে ড্যাপনারের পরপুরুষের সাথে ভেগে যাওয়া–এসব কিছুই এই তীক্ষধী পদার্থবিদকে হতাশার অতল গহ্বরে গভীরভাবে নিমজ্জিত করেছিল। এজন্য তিনি বিখ্যাত সাইকোএ্যানালিস্ট জাং (সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ছাত্র) এর শরণাপন্ন হন এবং সুদীর্ঘ চার বৎসরকাল চিকিৎসাধীণ থাকেন। অনেকটাই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন পাউলি। পরবর্তীকালে জাংয়ের বিখ্যাত ট্রিটিজ “সাইকোলজি এ্যান্ড আলকেমি”তে পাউলির শত শত স্বপ্নের ব্যাখ্যা স্থান পায়।

টুবিংগেনের চিঠিতে পাউলি তাঁর হাইপোথেটিক্যাল কণিকার নাম লিখেছিলেন “নিউট্রন”। সেসময় জেমস্ চ্যাডউইক আমাদের পরিচিত নিউট্রন আবিষ্কার করেননি। প্রকৃতপক্ষে “নিউট্রিনো” নামটি এনরিকো ফার্মির দেওয়া। রোমের এক সেমিনারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কণিকাদুইটি (নিউট্রন ও নিউট্রিনো) এক কিনা? ফার্মি জবাব দিলেন “না”–চ্যাডউইকের নিউট্রনগুলো বড় আর ভারী; পাউলিরগুলো ছোট আর হালকা–কাজেই সেগুলোকে বলা উচিৎ নিউট্রিনো (ইতালিয়ানে এর অর্থ হল ছোট বা বাচ্চা নিউট্রন)। আসলে নাম নিয়েই যে বিভ্রান্তি ছিল তা কিন্ত নয়-কণিকাগুলোর কার্যকলাপও এতে কিছুটা অবদান রেখেছে। বিটা ডিকেতে পরমাণুকেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস থেকে যদি ইলেকট্রন ও নিউট্রিনো নিঃসরিত হয় তাহলে নিউট্রন আর প্রোটনের মতন এরাও কি এর গঠনকারী উপাদান নয়? নিঃসরিত হবার আগে এই ইলেকট্রন আর নিউট্রিনো ছিলটা কোথায়?

পাউলি প্রথমাবস্থায় ভেবেছিলেন যে নিউট্রিনোগুলো ছোট ছোট চুম্বকের মতন কাজ করে এবং তড়িৎচুম্বকীয় বলের ক্রিয়ায় তারা নিউক্লিয়াসে বন্দী থাকে। কিন্ত তাঁর ধারণা সঠিক ছিলনা। শেষাবধি ফার্মি এর একটি নিশ্চিৎ ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি এর অনুপ্রেরণা পেলেন কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ব থেকে যা নিউক্লিয়াস কর্তৃক ফোটন শোষণ ও নিঃসরণকে ব্যাখ্যা করবার জন্য একটি নতুন ধারণা হিসেবে সেসময় সবেমাত্র বিকাশলাভ শুরু করেছে । কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরীতে বলের চিরায়ত বিবরণকে কণিকাসমূহের ইন্টারাকশন প্রতিস্থাপন করে যেটি আমি আগেও বলেছি। স্থানের বিভিন্ন বিন্দুতে প্রতিনিয়ত কণিকাসমূহের সৃষ্টি এবং ধ্বংস হচ্ছে এবং তা হচ্ছে এদের মধ্যকার ইন্টারাকশনের জন্য। বল মূলত কণিকাবিনিময়ের এবং সেজন্য চুড়ান্তভাবে কণিকাসমূহের মধ্যকার ইন্টারাকশন বা বিক্রিয়ার ফসল। উদাহরণস্বরূপ, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইন্টারাকশনের জন্য পরমাণু বা পরমাণুকেন্দ্র ফোটন শোষণ এবং নিঃসরণ করে থাকে, তথাপি ফোটন কিন্ত নিউক্লিয়াসের উপাদান নয়।

ফার্মি যুক্তি দিলেন যে বিটা ডিকেকে অনেকটাই তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের মতন (পরমাণুকেন্দ্র কর্তৃক ফোটন শোষণ এবং নিঃসরণ) করে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তিনি প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন এবং নিউট্রিনো এই চারটি কণিকার মধ্যে একটি নতুন ধরণের ইন্টারাকশন হাইপোথেসাইজ করলেন যা আগেও বলেছি। এই ইন্টারাকশনের জন্য একটি ইলেকট্রন ও একটি নিউট্রিনো নিঃসরণের মাধ্যমে নিউক্লিয়াসে অবস্থানকারী একটি নিউট্রন পরিণত হয় একটি প্রোটনে। লক্ষ্য করুন, বিষয়টিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। স্থানের একটি বিন্দুতে একটি কণিকা (নিউট্রন) ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং সেই একই বিন্দু থেকে তিনটি নতুন কণিকার (প্রোটন, ইলেকট্রন এবং নিউট্রিনো) জন্ম হয়। ঠিক এভাবে ফার্মি একটি নতুন বল আবিষ্কার করেন যেটি বিটা ডিকের জন্য দায়ী।

ফার্মি তাঁর তত্ব নিয়ে বেশ খুশীই ছিলেন ।এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করবার কিছুদিনের ভেতরই তিনি তাঁর বন্ধু ও কলিগদের নিজ এ্যাপার্টমেন্টে নিমন্ত্রণ করলেন: এদের মধ্যে ছিলেন এমিলিও সেগরে, এদোয়ার্দো আমাল্দি এবং ফ্রাংকো রাসেত্তি। বিছানাতে আয়েশ করে বসে তিনি কবিতা পাঠের মতন করে তাঁদেরকে তাঁর তত্বকথা শোনালেন। তাঁরাও ফার্মির উদ্দেশ্যে তাঁদের উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য এবং প্রশ্নমালা ছুড়ে দিলেন। বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে তিনি তাঁর ম্যানুস্ক্রিপ্টটি বিখ্যাত “ন্যাচার” জার্নালে প্রকাশের উদ্দেশ্যে পাঠালেন। দুর্ভাগ্যবশত: সেটি প্রত্যাখ্যাত হল। বলা হল যে আর্টিকেলটি “ভৌতবাস্তবতা থেকে অনেকবেশী দুরে অবস্থানকারী অনুমান দ্বারা পরিপূর্ণ”। সে যাই হোক, ফার্মির তত্ব অন্য আরেকটি জার্নালে প্রকাশিত হল এবং বিজ্ঞানীমহলে দ্রুততার সাথে পরিপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করল। প্রকৃতপক্ষে আর্টিকেলটি দু’টি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল যাদের একটি ছিল ইতালীয় ভাষায়–অন্যটি জার্মানে। এর কারণ ছিল মুসোলিনির উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট আইনানুসারে ইতালীয় বিজ্ঞানীরা ইতালীয় ভাষাতে তাঁদের গবেষণাপত্র/সন্দর্ভ প্রকাশ করতে বাধ্য ছিলেন। ইতালীয় ভাষাতে প্রকাশিত একটি আর্টিকেলের আন্তর্জাতিক সাইন্টিফিক কমিউনিটির দৃষ্টির অগোচরে চলে যাবার সমূহ সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করেই ফার্মি এই দ্বৈত-প্রকাশণার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

আগেই বলেছি যে ফার্মি তড়িৎ-চুম্বকীয় এবং দুর্বল-নিউক্লীয় বলের মধ্যে একটি যোগসূত্র লক্ষ্য করেছিলেন। তাসত্বেও কিন্ত এই দুই প্রকার বলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তড়িৎচুম্বকীয় বলের ক্রিয়াতে কোন কণিকা পরিবর্তিত হয়ে আরেকটিতে রুপান্তরিত হয়না: ইলেকট্রন অন্যান্য চার্জধারী কণিকার ওপর ফোটন কণিকা বিনিময়ের মাধ্যমে ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক বল প্রয়োগ করে থাকে কিন্ত এই ফোটন কণিকার নিঃসরণ ইলেকট্রনটিকে অপরিবর্তিত রাখে। অন্যদিকে দুর্বল বলের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে এক ধরণের কণিকাকে আরেক ধরণের কণিকাতে রুপান্তরিত করা। দুর্বল বল দ্বারা বিক্রিয়া করতে গিয়ে একটি কণিকা নিজেই পরিবর্তিত হয়ে আরেকটি কণিকাতে রুপান্তরিত হয়।বিটা ডিকের ক্ষেত্রে একটি নিউট্রন – একটি ইলেকট্রন ও নিউট্রিনোর জোড়া নিঃসরণ করে নিজের স্বত্বাকে পরিবর্তিত করে একটি প্রোটনে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় পার্থক্য আসে এর রেঞ্জের অর্থাৎ যে দূরত্বে এই বল ক্রিয়াশীল তার মাধ্যমে। ইলেকট্রিক চার্জ অনেক অনেক দুরের চার্জবাহী কণিকার ওপর বল প্রয়োগ করে থাকে। আর সেজন্য তড়িৎ-চুম্বকত্ব দৃশ্যমান বৃহৎ-বস্তুর জগতের অনেক ভৌত-প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী। অন্যদিকে দুর্বল বলের কার্যসীমা খুবই খুবই অল্প দূরত্বের মধ্যে। একটু বুঝানোর চেষ্টা করি। দুর্বল বলের ক্রিয়া উপলব্ধি করতে হলে দুইটি কণিকাকে ১০^-১৮ মিটারেরও কম দূরত্বের মধ্যে থাকতে হবে। নিশ্চিৎভাবেই এটি আমাদের যেকোন ধরণের ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য উপলব্ধির জন্য খুবই ক্ষুদ্র একটি দূরত্ব।

এরপরও বলতেই হয় যে দুর্বল বল কিন্ত কেবলমাত্র কণিকাদের মধ্যকার ছেলেখেলা নয়। এই বল আমাদের জগতে দৃশ্যমান অনেককিছুর জন্যই দায়ী। প্রশ্ন করা যায়: কতটুকুন দৃশ্যমান? উইক ফোর্সের জন্যই কিন্ত প্রোটন এবং নিউট্রনের ফিউশন ঘটে ভারী হাইড্রোজেন ডিউটেরিয়াম তৈরী হয় আর এই ফিউশন বিক্রিয়ার অতিরিক্ত শক্তিই সূর্যের তাপ ও আলোক শক্তির উৎস। উইক ফোর্স ছাড়া প্রাণের অস্তিত্বই কিন্ত বিপন্ন হয়ে পড়ত। একদিক দিয়ে বোরের কথা ঠিক: উইক ফোর্স তারকারাজির উজ্জ্বলতার জন্য দায়ী; যদিও এই ব্যাখ্যার সাথে শক্তির সংরক্ষণশীলতা ভঙ্গের কোনই সম্পর্ক নেই (যেটি বোর মনে করেছিলেন এবং যেজন্য পাউলি বোরকে ব্যঙ্গ করেছিলেন)।

তৃতীয় পার্থক্যটা হল বলদু’টির প্রাখর্যের মধ্যে। পাউলির প্রথমদিককার ভাবনার বীপরিতে নিউট্রিনো বস্তুর সাথে কেবলমাত্র দুর্বল বলের মাধ্যমেই ক্রিয়া করে থাকে। আর সেকারণেই নিউট্রিনোকে ডিটেক্ট করা খুবই দুরুহ একটি কাজ। একটি নিউট্রিনো কণিকার জন্য পুরো পৃথিবীটিই হল স্বচ্ছ এক মাধ্যম। প্রকৃতপক্ষে, পৃথিবী থেকে আলফা সেনচুয়ারী পর্যন্ত দূরত্বের সমপরিমাণ পুরুত্বের একটি লোহার ব্লক বিটা রেডিওএ্যাকটিভিতে নিঃসরিত একটি নিউট্রিনো কণিকাকে থামাতে অক্ষম–সেটি ভেদ করে এটি চলে যাবে!!! দুর্বল কি আর এমনি এমনি বলা হয়?

এরপরও কিন্ত পরীক্ষণের মাধ্যমে নিউট্রিনোদের পর্যবেক্ষণ করা খুবই সম্ভবপর একটি বিষয়। একটি একক কণিকাকে ডিটেক্ট করবার সম্ভাবনাকে খুবই ক্ষীণ ধরে এক্সপেরিমেন্টালিস্টগণ নিউট্রিনো কণিকাগুচ্ছের খুবই তীব্র প্রবাহ ব্যবহার করে থাকেন যাতে আগত কণিকাগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ডিটেকশন প্রোবাবিলিটিও বেড়ে যায়। ১৯৫৬ সালে ক্লাইড কোওয়ান এবং ফ্রেডেরিক রাইনেস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যস্থ সাভান্নাহ নদীর অববাহিকাস্থ পারমাণবিক চুল্লীতে সর্বপ্রথম নিউট্রিনোর অস্তিত্বের পরীক্ষণলব্ধ প্রমাণ পান। তাঁদের এই আবিষ্কারের পরপরই এই দুই মার্কিন বিজ্ঞানী পাউলিকে টেলিগ্রাম পাঠানোর জন্য ছুটে যান। পাউলি এক বোতল শ্যাম্পেন দিয়ে বন্ধুদের সাথে সেলিব্রেট করেন এবং কোওয়ান ও রাইনেসকে ছোট্ট একটি টেলিগ্রাম বার্তা পাঠান: “খবরের জন্য ধন্যবাদ। তাঁর জন্য সবই আসে যে জানে কিভাবে অপেক্ষা করতে হয়–পাউলি।”

পদার্থবিজ্ঞানের পবিত্র সংরক্ষণের নিয়মগুলোর ভিত হল প্রতিসাম্য বা সিমেট্রি। রৈখিক ও কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণশীলতা এবং শক্তির সংরক্ষণশীলতার নিয়মগুলো এসেছে অধিকতর মৌলিক একটি নীতি থেকে: “পদার্থবিজ্ঞানের আইনগুলো সরণ এবং ঘূর্ণনের অধীনে অপরিবর্তিত থাকে।” মহাবিশ্বের সমস্ত বিক্রিয়াকে সফলভাবে বর্ণনাকারী এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসে পরীক্ষণের সাথে সর্বাপেক্ষা সামঞ্জস্যপূর্ণ তত্ত্বও অন্তর্নিহিত প্রতিসাম্যের একটিমাত্র মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে: কণাপদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল সমাহারতত্বের SU(3)_{C}XSU(2)_{L}XU(1)_{Y} গেজ গ্রুপের অধীণে লোকালি ইনভ্যারিয়্যান্ট। এখানে সামান্য একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজণ আছে বলে মনে করি। প্রোটন এবং নিউট্রন কণিকাদু’টোর মধ্যকার পার্থক্য খুবই সামান্য। তাদের ভর বা ওজনও কাছাকাছি। শুধুমাত্র প্রোটনের ইলেকট্রিক চার্জ আছে এবং নিউট্রন ইলেকট্রিক্যালি নিউট্রাল। কাজেই নিউক্লিয়াসে অবস্থিত একটি প্রোটন এবং একটি নিউট্রনের বা তাদের যেকোন সমাহারের (প্রোটন-প্রোটন, নিউট্রন-নিউট্রন) মধ্যকার সবল নিউক্লীয় বলের তুলনায় ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক বল অতিসামান্য বিবেচনায় বাদ দিলে–কণিকাদু’টিকে এক ধরা যায়। এটি বাস্তব জগতের খুবই ভালো একটি এ্যাপ্রক্সিমেশন।

কোন একটি ভৌত প্রক্রিয়ার ফলাফল একই থাকবে যদি সেই প্রক্রিয়াতে অংশগ্রহণকারী সবগুলো প্রোটন কণিকাকে নিউট্রন কণিকা দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়। আরও সুন্দরভাবে বলতে পারি: প্রোটন ও নিউট্রনের বিনিময়– এই ক্রিয়ার অধীনে সবল নিউক্লীয় বল প্রাতিসাম্যিক। আপাত:দৃষ্টিতে প্রোটোন ও নিউট্রনের এই পারস্পরিক পরিবর্তণ কিন্ত ছেদহীণ কোন প্রক্রিয়া নয়। একটি লাল রঙের বলকে আমি একটি নীল বল দিয়ে বদলিয়ে ফেললাম–এটি একটি হঠাৎ বা ছেদযুক্ত বা ডিসক্রিট পরিবর্তণ। লাল বলটি ধীরে ধীরে ছেদহীণভাবে তার বর্ণ পরিবর্তণ করল–এটি একটি ছেদহীণ প্রক্রিয়া।প্রোটোন ও নিউট্রনের এই পারস্পরিক পরিবর্তণ কিভাবে কন্টিনিউয়াস বা ছেদহীণ প্রতিসাম্য নির্দেশ করে? আবারও আমাদের ইন্টুইশন বা কমনসেন্স কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অদ্ভুত জগতের দ্বারা পরাজিত হয়। স্ট্রং ইন্টারাকশনের আপাত: ডিসক্রিট এই প্রতিসাম্য আসলে কন্টিনিউয়াস। কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুসারে কণিকাগুলো অনেকটা হাঁসজারু বা বকচ্ছপের মতন– প্রোটোন বা নিউট্রন–শুধুমাত্র প্রোটোন না নিউট্রনরুপে নয় বরং এদের অসীমসংখ্যক বিভিন্ন মিশ্রণ হিসেবে অবস্থান করে। এই মিশ্রিত দশাগুলোকে আমরা কোন গাণিতিক স্পেসে বিভিন্ন সদিকরাশির মতন কল্পনা করতে পারি। এই সদিকরাশিগুলো বিশুদ্ধ প্রোটন ও বিশুদ্ধ নিউট্রনের দশাদ্বয়ের রৈখিক সমন্বয় বা লিনিয়ার কম্বিনেশন এবং এটিকে আমরা ঐ গাণিতিক স্পেসে ঘোড়াতে পারি। প্রোটোন এবং নিউট্রনের এই অসীম সংখ্যক মিশ্রিত দশাগুলোর একপ্রান্তে থাকে বিশুদ্ধ প্রোটোন–আরেকপ্রান্তে বিশুদ্ধ নিউট্রন।স্ট্রং ইন্টারাকশনের প্রতিসাম্য কণিকার এই দশাগুলোর কন্টিনিউয়াস রোটেশনের ফলে এর অপরিবর্তণশীলতা নির্দেশক। আর এই রোটেশন বা ঘূর্ণন আমাদের জানা স্থান-কালে নয় বরং বিমুর্ত গাণিতিক স্হানে ঘটে থাকে। এটির সাথে সংযুক্ত প্রতিসাম্যকে আমরা বলে থাকি ইন্টারনাল সিমেট্রি।

এতকিছু বলবার কারণ হল লোকাল সিমেট্রির ধারণা পরিষ্কার করা। উদাহরণে প্রোটন ও নিউট্রনের যে পরিবর্তণের কথা বলেছি তা কণিকাগুলোর মধ্যে সর্বত্র একই সময় ঘটবে। ভৌত প্রক্রিয়াগুলো অপরিবর্তিত তখনই হবে যখন স্থানের সমস্ত বিন্দুতে একই সময় প্রোটন-নিউট্রনের প্রতিস্থাপন ঘটবে। এধরণের সিমেট্রিকে বলা হয় গ্লোবাল এবং সঙ্গতকারণেই আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিক তত্বের সাথে এটি সাঙ্ঘর্ষিক। একইসাথে স্থানের সববিন্দুতে পরিবর্তন অসম্ভব–একটি বিন্দু থেকে আরেকটি বিন্দুতে লাইট সিগন্যাল তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছায় না–আলোর বেগ খুবই বেশী–কিন্ত অসীম নয়–আর এটির চেয়ে দ্রুত কিছুই ছুটতে পারেনা। লোকাল গেজ ইনভ্যারিয়েন্স বস্ত এবং এর মধ্যকার বিভিন্ন বিক্রিয়া বা বলকে (যার অন্তর্গত হল উইক ফোর্স) ব্যাখ্যা করবার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

আজকে আমি একটি সম্পূর্ণ নতুন ধরণের সিমেট্রির কথা বলব–কারণ এটি উইক ইন্টারাকশনের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। এটির নাম হল “প্যারিটি”। ১৮৪৮ সালে লুইস পাস্তুর অনেকটা ভাগ্যের জোড়েই অপটিকাল আইসোমারিজম আবিষ্কার করে ফেললেন। একই রাসায়নিক যৌগের দুইটি ভিন্নরূপ –পোলারায়িত আলোকে দুইটি ভিন্ন দিকে ঘোরায়–ডানে এবং বামে। আইসোমাররা কিন্ত হুবুহু একই রাসায়নিক যৌগ। তাদের আণবিক সংগঠনের মধ্যে কোন পার্থক্যই নেই। এরপরও একটি বিশেষ পার্থক্য আছে। তাদের একটি আরেকটির মিরর ইমেজ (যেমন আমাদের ডান হাতের অবিকল মিরর ইমেজ বা আয়নার প্রতিচ্ছবি হল আমাদের বাম হাত–এছাড়া এদের মধ্যে আর কোন পার্থক্য নেই)। পাস্তুর লক্ষ্য করলেন যে বিভিন্ন প্রাণী এই আইসোমারদু’টির একটিকে গ্রহণ ও ব্যবহার করতে সক্ষম–অন্যটিকে কখনই নয়। মজার কথা হল যে প্রকৃতি কিন্ত এদের কোনটির প্রতিই বিশেষ পক্ষপাত দেখায়না। কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় দু’টিই সমপরিমাণে উৎপন্ন হয়। অন্যকথায় প্রকৃতি সম্পূর্ণভাবেই ডান-বামের মধ্যকার প্রতিসাম্য প্রদর্শণ করে–মেনে চলে। ১৯৫৭ সাল অবধি পদার্থবিদরা বিশ্বাস করতেন যে সমস্ত ভৌত প্রক্রিয়াই এ ধরণের লেফ্ট-রাইট সিমেট্রি কঠোরভাবে মেনে চলে। অন্যকথায় একটি বিক্রিয়ার মিরর ইমেজ বা আয়নায় এর প্রতিবিম্বের সাথে সবদিক দিয়েই মূল বিক্রিয়াটি সমতূল্য। এখন কি হবে যদি প্রকৃতি সবসময় এটি মেনে না চলে–ডানকে বামের ওপর বা বামকে ডানের ওপর প্রাধাণ্য দেয়? কি হবে যদি কোন ভৌত প্রক্রিয়ায় ডান-বামের এই প্রতিসাম্য ভেঙ্গে পরে? তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের কাছে এই প্রশ্নটি ছিল খুবই অন্তর্দৃষ্টিমূলক।

ডান-বামের প্রতিসাম্যকে আরও সূক্ষভাবে ব্যাখ্যা করবার জন্য পদার্থবিদগণ প্যারিটির ধারণা নিয়ে আসেন। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তাত্বিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে প্যারিটি ধারণার জন্ম। ১৯২৪ সালে বিজ্ঞানী ও.ল্যাপোর্ট ওয়েভফাংশনের সিমেট্রির ওপর ভিত্তি করে এদেরকে অড এবং ইভেন হিসেবে ক্ল্যাসিফাই করেন। ল্যাপোর্ট আবিষ্কার করেন যে এক কোয়ান্টাম স্টেট থেকে আরেক স্টেটে এ্যাটমিক ট্রানজিশনের সময় ফোটন নিঃসরিত হয় এবং পরমাণুর ওয়েভফাংশন পরিবর্তিত হয় ইভেন থেকে অডে এবং বিপরীতক্রমে, কিন্ত কখনই একই (প্যারিটির) থাকেনা। সংজ্ঞানুসারে ইভেন ফাংশনের প্যারিটি হল +১ এবং অড ফাংশনের -১ । তদুপরি, নিঃসরিত ফোটনের প্যারিটির সংজ্ঞায়িত মান ধরা হয় -১ । ল্যাপোর্টের নিয়মকে তাহলে একটি সংরক্ষণের আইন হিসেবে ব্যক্ত করা যায়–প্যারিটি সংরক্ষণের আইন। গাণিতিক কারণে একটি সিস্টেমের প্যারিটি এর গঠনকারী উপাদানসমূহের প্যারিটির গূণফল। এ্যাটমিক ট্রানজিশনে প্যারিটি সংরক্ষিত হয়। যদি এ্যাটমিক ট্রানজিশনের আগে ওয়েভফাংশনের প্যারিটি -১ থাকে তাহলে ট্রানজিশনের পরে ল্যাপোর্টের নিয়মানুসারে এর প্যারিটি হবে +১ । যেহেতু পারমাণবিক সিস্টেমটির প্রাথমিক প্যারিটি হয় -১ তাহলে ট্রানজিশনের পরবর্তী ওয়েভফাংশন এবং নিঃসরিত ফোটনের প্যারিটির গূণফল হবে -১x১=-১ ; ট্রানজিশনে প্যারিটি সংরক্ষিত হয়। ট্রানজিশনের আগের এবং পরের ওয়েভফাংশনের প্যারিটি বিনিময় করা হলেও এই সংরক্ষণের আইন বজায় থাকে।

১৯২৭ সালে হাঙ্গেরীয় পদার্থবিদ ইউজিন উইগনার প্যারিটি সংরক্ষণের প্রয়োজণীয়তা এবং এর মৌলিক প্রকৃতি আবিষ্কার করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে ল্যাপোর্টের নিয়ম আসলে তড়িৎ-চুম্বকত্বের ডান-বাম প্রতিসাম্য ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যকথায় তড়িৎ-চুম্বকীয় প্রক্রিয়াসমূহে প্যারিটি সংরক্ষিত হয়। চিরায়ত তড়িৎ-চুম্বকত্বের ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলো প্যারিটি ট্রান্সফর্মেশনের অধীণে অপরিবর্তিত থাকে। তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রকে কোয়ান্টাইজ করলেও এর কোন ব্যাত্যয় হয়না। কাজেই, ১৯৪৭ সালে কতক কণিকার বিভাজন বিক্রিয়াকে (উদাহরণস্বরুপ:বিটা ডিকে) ব্যাখ্যা করবার জন্য যখন দুর্বল নিউক্লীয় বল অনুমান করা হল তখন এই বিক্রিয়াগুলোতে যে প্যারিটি সংরক্ষিত হয়না এমন কোন ধারণা পদার্থবিদদের চিন্তার বাইরে ছিল । মহাবিশ্বের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ বলের ক্ষেত্রে প্যারিটির সংরক্ষণশীলতাকে যে বিস্তৃত করা সম্ভব নয় সেটি খুব অল্পের জন্য হয়ত সবার দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল। যাইহোক, সাত বছর পর তাঁরা সম্মিলিতভাবে তাঁদের এতদিনকার বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এগিয়ে এলেন।

দুর্বল নিউক্লীয় বিক্রিয়াতে প্যারিটি সংরক্ষিত হয়না–১৯৫৭ সালে এর পরীক্ষণলব্ধ প্রমাণ কণা-পদার্থবিজ্ঞানের জগৎকে মিনি-বোম্বশেলের মতন আঘাত করল। এর আগে অনুমান বা বিশ্বাস করা হত যে সমস্ত ভৌতপ্রক্রিয়াতেই প্যারিটি সংরক্ষিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, এই অনুমানের খুবই সূক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ দেখালো যে এটির কোন শক্ত ভিত্তিই নেই এবং প্রকৃতি যথারীতি এই ফাঁক-ফোকড়ের সুযোগ নিল। অদ্যবধি প্যারিটির অসংরক্ষণের কিছু ফলাফল গভীর পর্যায়ে বোঝা সম্ভব হয়নি যদিও স্ট্যান্ডার্ড মডেলে এটিকে সফলতার সাথে একীভূত করা হয়েছে। গাণিতিকভাবে, স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ল্যাগ্রাঞ্জিয়ান কারকে উইক ইন্টারাকশন বর্ণনাকারী অংশগুলো প্যারিটি রুপান্তরের অধীণে ইনভ্যারিয়ান্ট নয়।

১৯৪৭ সালে সেসিল পাওয়েল এবং ব্রিস্টলে তাঁর সহযোগীরা মহাশূণ্য থেকে আন্দিজ পর্বতমালার চুড়ায় পতিত ইলেকট্রিক চার্জবাহী কণিকাসমূহের ক্লাউড চেম্বার ট্র্যাকের ফটোগ্রাফ নেন। এজন্য পর্বতের চুড়ায় তাঁদেরকে তাঁদের ফটোগ্রাফিক ইমালশনকে এক্সপোজ করতে হয়েছিল। এই ফটোগ্রাফে পাওয়েল পাই-মেসন কণিকাকে সনাক্ত করেন যেটিকে সবল বলের বাহক হিসেবে ১২ বছর আগে জাপানিজ তাত্ত্বিক হিদেকি ইউকাওয়া হাইপোথেসাইজ করেছিলেন। এই মেসনের ভর ছিল ইলেকট্রনের ভরের ৩০০ গুণ এবং প্রোটনের ভরের এক-ষষ্ঠাংশ। যেহেতু এর ভর ইলেকট্রন ও প্রোটনের মধ্যবর্তী–সেজন্য এর নাম দেওয়া হল মেসন (গ্রীক শব্দ “মেসোস” এর অর্থ মধ্যম)। এখন ইউকাওয়া জানতেন যে ল্যাবরেটরীতে এমন কোন কণিকা পাওয়া যায়নি–সেজন্য তিনি ভাবলেন যে তাঁর তত্ব ভুল। ঠিক সেসময় মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে খুবই নিয়মতান্ত্রিকভাবে পর্যবেক্ষণমূলক কাজ চলছিল এবং ১৯৩৭ সাল নাগাদ দুইটি পৃথক বৈজ্ঞানিক দল ইউকাওয়ার বিবরণের সাথে মিলে যায় এরকম কণিকাসমমুহ চিন্থিত করলেন। আপনি ঠিক যে মূহুর্তে আমার লেখাটি পড়ছেন ঠিক সেইমূহুর্তে এ ধরণের মহাজাগতিক কণিকা-রশ্মি আপনাকে আঘাত করছে।

কিছু সময়ের জন্য সবকিছু আবার ঠিকঠাক বলে মনে হল। কিন্ত মহাজাগতিক রশ্মির আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণ কিছু বড় ধরণের সমস্যার দিকে ইঙ্গিত প্রদাণ করল। কণিকাগুলোর জীবনকাল (অর্থাৎ যে সময়ের মধ্যে তারা ডিকে করে) ইউকাওয়ার মেসনের সাথে মিলে না এবং এর চাইতে এরা বেশ হালকা। ১৯৪৬ সালে রোমে এ বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদাণকারী পরীক্ষণ পরিচালনা করা হল এবং তাতে দেখা গেল যে মহাজাগতিক সেই রশ্মিগুলো পরমাণুকেন্দ্রের সাথে খুবই দুর্বলভাবে বিক্রিয়া করে (অর্থাৎ এরা পরমাণুকেন্দ্রস্থ নিউক্লিয়নগুলোর মধ্যকার বলের বাহক হতে পারেনা)। এরপরের ঘটনা হল পাওয়েলের দলের পর্যবেক্ষণ। পাওয়েলের দল আবিষ্কার করলেন যে মহাজাগতিক রশ্মিতে আসলে দুই ধরণের মধ্যম ভরের কণিকা রয়েছে। তাঁরা এদের নাম দিলেন পাই-মেসন এবং মিউয়ন। ইউকাওয়ার কণিকাটি হল আসলে পাই-মেসন যাকিনা প্রচুর পরিমাণে বায়ুমন্ডলের উপরিভাগে সৃষ্টি হয়েছে কিন্ত ভূমিতে পতিত হবার অনেক আগেই ডিকে করেছে। আর এই ডিকের উপজাত কণিকাসমূহের একটি হল হালকা (এবং অপেক্ষাকৃত দীর্ঘায়ু) মিউয়ন। সি-লেভেলে মূলত: এই মিউয়নই পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।

এখন মহাজাগতিক যেই রশ্মিতে পাওয়েল ও তাঁর দল ইউকাওয়ার মেসন আবিষ্কার করেছিলেন সেটিতে অন্য ধরণের কণিকাও ছিল। ১৯৪৯ সালে পাওয়েল এমন একটি মহাজাগতিক কণিকার সন্ধান পেলেন যেটি ৩ টি পাই-মেসনে ডিকে করে। তিনি এটির নাম দিলেন টাউ মেসন। থিটা মেসন নামে আরও একটি কণিকা আবিষ্কৃত হল যেটি কিনা আবার ২ টি পাই-মেসনে ডিকে করে। উভয় কণিকাই (টাউ এবং থিটা) দুর্বল বিক্রিয়ার মাধ্যমে ডিকে করে (যেটি তাদের লাইফ-টাইম থেকে বোঝা সম্ভব)। এখন এই দু’টি কণিকার ভর এবং জীবনকালকে বিবেচনা করলে একটি বড় ধরণের সমস্যার উদ্ভব হয়: তাদের একটি থেকে আরেকটিকে পৃথক করা সম্ভব নয়। কেবলমাত্র একটি ৩ টি পাই-মেসনে ডিকে করে–অন্যটি ২ টি পাই-মেসনে। তাহলে তারা কি একই কণিকা? দেখা যাক এর উত্তর কি হতে পারে।

১৯৫৩ সালে পদার্থবিদ দালিতজ্ যুক্তি দিলেন যে পাই-মেসনের প্যারিটি হল -১ । যদি তাই হয় তাহলে দুইটি পাই-মেসনের প্যারিটি হবে -১x-১=১ এবং ৩ টির হবে -১x-১x-১=-১ । এর অর্থ তাহলে কি দাড়াল? প্যারিটি যদি সংরক্ষিত হয় তাহলে টাউ-মেসনের প্যারিটি -১ এবং থিটা মেসনের +১। কাজে কাজেই তারা একই কণিকা হতে পারেনা। অন্য বিকল্পটি হল যে এদের স্পিন,ভর, লাইফ-টাইম এবং প্যারিটি একই–অর্থাৎ এরা এক এবং অভিন্ন কণিকা এবং দুইটি ডিকের একটিতে প্যারিটি সংরক্ষিত হয়নি। এভাবে বিখ্যাত টাউ-থিটা পাজলের জন্ম যার সমাধান তখনকার বেশীরভাগ পদার্থবিদের কাছেই দুষ্পাচ্য ছিল।

বিখ্যাত চাইনিজ পদার্থবিজ্ঞানী লি এবং ইয়াং তাঁদের প্যারিটির অসংরক্ষণের ওপর কাজের জন্য ১৯৫৭ সালে যৌথভাবে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। মজার ব্যাপার হল প্রতিসাম্য রক্ষা নয় বরং ভঙ্গের দায়ে তাঁদের এই প্রাপ্তি। একটি বস্তকে যদি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একই রকম দেখায় তাহলে বস্তুটির প্রতিসাম্য আছে বলা হয়। একটি কিউবের কথা চিন্তা করুন। এটির ৬ টি তল। আপনি উপর, নীচ এবং চারপাশের যেকোন পাশ থেকে দেখলে এটিকে একই মনে হবে। একটি গোলকের প্রতিসাম্য আরও অনেক অনেক বেশী–যেকোন দিক থেকেই এটিকে এক দেখাবে। এখন এই যে প্রতিসাম্যগুলো–এগুলো শুধুমাত্র বিভিন্ন বস্তর সাথে–এদের স্থানিক আকৃতি এবং জ্যামিতির সাথে যুক্ত স্ট্যাটিক বা জড় প্রতিসাম্য। এদের তাৎপর্য খুব বেশী গভীর নয়। যে ধরণের প্রতিসাম্য সম্পর্কে পদার্থবিদরা আগ্রহী তারা হল বৈজ্ঞানিক নিয়মসমূহের প্রতিসাম্য। এর অর্থ: পদার্থবিজ্ঞানের কোন আইন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একইরকম দেখাবে। আর এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো বিভিন্ন প্রকারের প্রতিসাম্য নির্দেশক। উদাহরণস্বরুপ, আমি আমার পরীক্ষাগারটিকে ঢাকা থেকে সরিয়ে লন্ডনে নিয়ে গেলেও সেখানে পদার্থবিজ্ঞানের একই আইন পরীক্ষণে প্রতিষ্ঠিত হবে। যদিও সেখানকার আবহাওয়া হয়ত ঢাকার চেয়ে বেশ ঠান্ডা, সেখানকার পরিবেশ, প্রতিবেশ একেবারেই অন্যরকম–কিন্ত সেখানেও বিজ্ঞানের আইন একই-“ফিজিক্স ইজ নট এ্যাট অল এ্যান এনভিরোনমেন্টাল সায়েন্স।” এখানে প্রতিসাম্যটি কি? স্হানিক সরণের অধীনে পদার্থবিজ্ঞানের আইনগুলোর কোন পরিবর্তণ হয়না। সময়ের সরণ ও স্হানিক ঘূর্ণনেও পদার্থবিজ্ঞানের আইনগুলো অপরিবর্তিত থাকে। পদার্থবিজ্ঞানের আইনসমূহের প্রতিসাম্য এরকম স্থান-কাল সংক্রান্ত না হয়ে অন্যরকমও হতে পারে। যেমন, স্থানের প্রতিটি বিন্দুতে এক ধরণের কণিকাকে আরেক ধরণের কণিকা দিয়ে প্রতিস্থাপনের প্রতিসাম্য। আবার স্থান-কাল সংক্রান্ত কিন্ত একটু ভিন্ন প্রকৃতির প্রতিসাম্য: যেমন টাইম রিভার্সাল ( যেমন একটি বিলিয়ার্ড টেবিলে ত্রিভুজাকারে সাজানো বলগুলো কে স্টিক দিয়ে গুতো দিলে সেগুলো চারিদিকে গড়িয়ে গড়িয়ে ছড়িয়ে পড়বে; উল্টো প্রক্রিয়াটি চিন্তা করুন–সময়কে উল্টোদিকে প্রবাহিত হতে দিন–বলগুলো তাদের বিক্ষিপ্ত অবস্থান থেকে আপনা-আপনি একটি ত্রিভূজ গঠন করবে–কিন্ত সেটি কি বাস্তবে ঘটে? এখন পর্যন্ত আমরা সেরকম ঘটতে দেখিনি–কিন্ত ঘটতে দেখবনা বা ঘটতে পারবেনা তাঁর কোন প্রমাণ নেই–পদার্থবিজ্ঞানের জানা আইনগুলোয় t–>-t বসালে সেগুলো অপরিবর্তিত থাকে) এবং প্যারিটি (x–>-x, y–>-y, z–>-z) । আমি আগেই বলেছি ১৯৫৭ সালের পূর্বে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে পদার্থবিজ্ঞানের আইনগুলো প্যারিটি ইনভ্যারিয়্যান্ট। অপটিকাল আইসোমারগুলো তৈরী হয় যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তা তড়িৎ-চৌম্বকীয় প্রক্রিয়া। বিক্রিয়ায় দু’টিই সমপরিমাণে উৎপন্ন হয় য়দিও তাদের প্যারিটি ভিন্ন ভিন্ন। অন্যকথায় তড়িৎ-চুম্বকত্ব সম্পূর্ণভাবেই ডান-বামের মধ্যকার প্রতিসাম্য প্রদর্শণ করে–মেনে চলে। এ্যাটমিক ট্রানজিশনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। টাউ-থিটা পাজলের পর –এই ডান-বামের প্রতিসাম্য কি দূর্বল বিক্রিয়াও মেনে চলে কিনা তা নিয়ে সর্বপ্রথম প্রশ্নের উদ্ভব হয়।

লি এবং ইয়াং এর ঐতিহাসিক সন্দর্ভ: “দূর্বল বিক্রিয়ায় প্যারিটি সংরক্ষণের প্রশ্নে” প্রকাশণার পেছনের ঘটনার সূত্রপাত ১৯৫৬ সালে রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হাই এনার্জি ফিজিক্সের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। টাউ-থিটা পাজলের পরিসমাপ্তির একটি প্রস্তাবনা নিয়ে এই দুই মহারথী বিজ্ঞানী সম্মেলনে হাজির হন। তাঁদের ধারণাটি ছিল মোটামুটি এরকম: কিছু নির্দিষ্ট প্রকৃতির মৌলিক কণিকা ভিন্ন ভিন্ন প্যারিটির দুইটি পৃথক দশায় দেখা দেয়। এই ধারণাটিকে বলা হয়েছিল “প্যারিটি ডাব্লিং”। এই একই সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্স খ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান। সম্মেলনে ফাইনম্যানের রূমমেট ছিলেন পরীক্ষণবিদ মার্টিন ব্লক। সম্মেলনের প্রথম রাত্রেই ব্লক সাহেব ফাইনম্যানকে বলেন যে কিছু কিছু বিক্রিয়াতে হয়ত প্যারিটি সংরক্ষিত হয়না। পরদিন যখন ইয়াং প্যারিটি ডাব্লিং সম্পর্কে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন তখন ফাইনম্যান এই অসংরক্ষণশীলতার বিষয়টি নিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে ফাইনম্যান নিজেই বলেছিলেন যে তিনি প্যারিটি ভায়োলেশনের ধারণাটিকে শক্তিশালী বলে মনে করেননি কিন্ত এর সম্ভাবনাকেও তিনি উড়িয়ে দেননি। এটি তাঁর কাছে বেশ উত্তেজক এবং আকর্ষণীয় একটি ধারণা ছিল। শুধু কি তাই? ফাইনম্যান তাঁর এক বন্ধুর সাথে প্যারিটি সংরক্ষিত হবে বলে ৫০ ডলারের একটি বাজিও রেখেছিলেন। যাই হোক, ইয়াং এর উত্তর ছিল এই যে তিনি এবং লি ধারণাটিকে (প্যারিটি ভায়োলেশনের) বিবেচনা করেছিলেন কিন্ত তখন পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি। এই নিয়ে আলোচনা চলাকালে উইগনার (যিনি সর্বপ্রথম প্যারিটি সংরক্ষণের নিয়মটিকে সূত্রবদ্ধ করেছিলেন) মতামত দেন যে হয়তবা প্যারিটি সংরক্ষণের নিয়মটি উইক ইন্টারাকশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

কনফারেন্সটি শেষ হবার পরও প্রশ্নটি নিয়ে লি এবং ইয়াং ভাবতে থাকেন। মে মাসের প্রথমভাগে এই দুই বিজ্ঞানী কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্নিকটে ব্রডওয়ে এবং ১২৫ স্ট্রিটের কোণায় ওয়াইট রোজ ক্যাফেতে বসে বিয়ার টানছেন; এমনসময় তাঁদের মাথায় হঠাৎ একটি বুদ্ধি আসল। উইক ইন্টারাকশনের মাধ্যমে ঘটে এরকম বিক্রিয়াগুলো সম্পর্কিত এক্সপেরিমেন্টগুলোর ফলাফল খুবই সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করে দেখলে কেমন হয়? কয়েক সপ্তাহ ধরে এসংক্রান্ত পরীক্ষণগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করে তাঁরা দু’টি সিদ্ধান্তে আসলেন:
(১) দূর্বল বল সংক্রান্ত পূর্ববর্তী সমস্ত পরীক্ষণে প্যারিটি সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়নি।
(২) সবল বিক্রিয়াতে খুবই উচ্চ পর্যায়ের সূক্ষতার সাথে প্যারিটি সংরক্ষণের বিষয়টি বহু পরীক্ষণেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইয়াং তাঁর নোবেল লেকচারে বলেছিলেন:” দূর্বল বিক্রিয়াতে প্যারিটি সংরক্ষণ হয় এটি কোন প্রকার পরীক্ষণলব্ধ প্রমাণ ছাড়া যে এত দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বাস করা হয়েছিল সেটি খুবই আশ্চর্যজনক। কিন্ত এর চাইতেও আশ্চর্যজনক ছিল সেই সম্ভাবনাটি যে স্থান-কালের প্রতিসাম্যের একটি নিয়ম যা পদার্থবিজ্ঞানীরা এত ভালোভাবে আয়ত্ব করেছিলেন–তা ভেঙ্গে পড়বে। এই সম্ভানাটিকে যাচাই করার বিষয়টি কারও কাছে আকর্ষণীয় বলে মনে হয়নি ।”

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং হিটলারের এ্যাটম বোম্ব বানিয়ে ফেলবার ভীতি মার্কিনীদের পার্টিকেল এ্যাকসেলেরেটর তৈরীর জন্য প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দিতে বাধ্য করে। এই একই যুদ্ধ দুই তরুণ মেধাবী চাইনিজ ছাত্রকে একত্রিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৩ সালে সুং দাও লি চীনদেশের কুচোও প্রদেশের এক অখ্যাত ছাত্র ছিলেন। এ সময় চীনে জাপানী সৈন্যরা আগ্রাসন চালিয়েছিল। মেইনল্যান্ড চায়না যখন তারা দখল করতে থাকে সে সময় লি কুনমিংয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। সেখানে ন্যশনাল সাউথ-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে তিনি চেন নিং ইয়াংয়ের সাথে পরিচিত হন। তখনও তাদের সম্পর্ক শুধুমাত্র শুভাশীষ বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৪৬ সালে দুই ছাত্রই যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করবার জন্য বৃত্তিলাভ করেন। ইয়াং কলম্বিয়া থেকে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে এনরিকো ফার্মিকে অনুসরণ করেন এবং পরবর্তীতে উভয়ের যোগাযোগ
বেশ ঘনিষ্ট হয়। অন্যদিকে লি এর খুব একটা বেশী বিকল্প ছিলনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটিমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় একজন আন্ডার-গ্রাজুয়েট ছাত্রকে সরাসরি পি.এইচ.ডি শুরু করবার সু্যোগ দিত–সেটি হল শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়। এই দুই নতুন গ্রাজুয়েট ছাত্র দ্রুত ঘনিষ্ট বন্ধুতে পরিণত হলেন।

কিছু সময়ের জন্য ইয়াং এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্সে কাজ করবার চেষ্টা করলেন–কিন্ত তাতো হবার নয়। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক হবার রাজ-কপাল নিয়ে যিনি জন্মেছেন তিনি কি ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়ে যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করবার মতন মামুলী কাজ করতে পারেন (পরীক্ষণবিদদের খাটো করবার জন্য উক্তিটি করা হয়নি–তবে উনার মনোভাব সেরকম থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়)? অন্য গ্রাজুয়েট ছাত্ররা তাকে নিয়ে রীতিমতন হাসি-ঠাট্টা করত:”যেখানেই ব্যাং (যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়ার শব্দ)—সেখানেই ইয়াং।” তিনি উপলব্ধি করলেন যে পদার্থবিদদের মধ্যে মানগত ,জ্ঞানগত, পদার্থবিজ্ঞানে যুগান্তকারী বিপ্লব আনয়নের দিক থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের ধারে-কাছেও কেউ নেই–আইনস্টাইন,ম্যাক্সওয়েল, শ্রডিঞ্জার, ডিরাক, হাইসেনবার্গ, পাউলি এদের প্রত্যেকে বিশুদ্ধ তাত্ত্বিক। শেষাবধি, তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেন এবং এডওয়ার্ড টেলারের সুপারভিশনে তাঁর পি.এইচ.ডি সন্দর্ভ লিখলেন। অন্যদিকে লি প্রথম থেকেই একজন পুরোদম তাত্ত্বিক ছিলেন। তিনি ফার্মির সুপারভিশনে তাঁর ডক্টরাল থিসিস করেন। তিনি তাঁর ক্যারিয়ার বিষয়ে ফার্মির উপদেশ এখনও স্বরণ করেন:” একজন তরুণ ছাত্র হিসেবে প্রায়োগিক সমস্যাগুলো নিয়ে ভাব, মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে পরেও চিন্তা করতে পারবে।” গুরূর প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা থাকা স্বত্তেও তিনি তাঁর সেই উপদেশ অনেকখানিই অগ্রাহ্য করেছিলেন। লি এবং ইয়াং উভয়েই তাঁদের গ্রাজুয়েশনের পর প্রিন্সটনের ইন্সটিটিউট অব এ্যাডভান্সড্ স্টাডিজে স্টাফ মেম্বার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। একসময় যাকে সহপাঠীরা ব্যঙ্গ করত সেই লি কালক্রমে পরিণত হলেন এক মহারথী তাত্ত্বিকে–যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ওপেনহাইমার বলেছিলেন”সেসময়ের জানা সবচাইতে প্রতিভাবান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ”। এভাবেই ব্যক্তি লি এবং ইয়াং ১৯৫৭ সালের মধ্যে স্বতন্ত্রভাবেই খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন যখন তাঁদের সম্মিলিত গবেষণা টাউ-থিটা পাজলের রহস্য ভেদ করতে এবং পদার্থবিজ্ঞানের একটি অন্যতম সংরক্ষণের নিয়মকে শিকড়সমেত উপড়ে ফেলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।

লি এবং ইয়াং ১৯৬২ সাল পর্যন্ত একসাথে কাজ করেন, যখন তাঁরা তাঁদের নিজস্ব কোন অজানা কারণে আলাদা হয়ে যান। তাঁদের স্বাতন্ত্র‌ থেকে একতাবদ্ধতা ছিল অনেক বেশী কার্যকরী–সিনার্জির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সেসময় তাঁরা সবেমাত্র ভেক্টর বোসোন (ডব্লিউ ও জি বোসোন) নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন এবং একসাথে কাজ অব্যহত রাখলে তাঁরা স্ট্যান্ডার্ড মডেল গঠনে কতদূর অগ্রসর হতেন তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। ফাইনম্যান ডায়াগ্রামে লি খুবই দক্ষ ছিলেন, অন্যদিকে ইয়াং মার্কিন তাত্ত্বিক রবার্ট মিলস্ এর সাথে যুগপৎভাবে নান-আবেলিয়ান গেজ তত্ত্বের (ইয়াং-মিলস্ তত্ত্ব নামে খ্যাত) উদ্ভাবক ছিলেন যাকিনা স্ট্যান্ডার্ড মডেলের একটি অপরিহার্য উপকরণ।

“দ্য ফিজিক্যাল রিভিউ” জার্নালের পহেলা অক্টোবর ১৯৫৬ সালের ইস্যুতে যখন লি এবং ইয়াং এর “দূর্বল বিক্রিয়ায় প্যারিটি সংরক্ষণের প্রশ্নে” শির্ষক সন্দর্ভটি প্রকাশিত হল তখন বেশীরভাগ পদার্থবিদের ভেতরই তেমন কোন সাড়া পাওয়া গেলনা। প্যারিটির অসংরক্ষণশীলতাকে পষ্ট করে কেউ উড়িয়ে না দিলেও এর সম্ভাবনা সবার কাছে এতটাই ক্ষীণ মনে হল যে পরীক্ষণলব্ধ প্রমাণের সম্ভাবনার কোন প্রস্তাব সেই সময় কারও তাৎক্ষণিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। বিখ্যাত পদার্থবিদ ফ্রিম্যান ডাইসন সন্দর্ভটির ব্যাপারে তাঁর তখনকার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলেন:” এর একটি কপি আমার কাছে পাঠানো হল এবং আমি দুই দুইবার সেটি পড়লাম। আমি বললাম ‘এটি খুবই কৌতুহলউদ্দীপক’। কিন্ত দু:খজনকভাবে আমার কল্পনাশক্তির ঘাটতির কারণেই হয়ত আমি বলতে পারলাম না ‘ও মাগো!!! এটি যদি সত্য হয় তাহলে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সম্পূর্ণ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে’। আর আমার কি মনে হয় জানেন? তখনকার পদার্থবিজ্ঞানীদের বেশীরভাগেরই আমার মতনই কল্পনাশক্তির ঘাটতি ছিল।” কাজেই বোঝাই যাচ্ছে, নামমাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া এবিষয়ে বেশীরভাগ পদার্থবিদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া খুব একটা উৎসাহব্যঞ্জক ছিলনা।

তাঁদের সন্দর্ভে লি এবং ইয়াং লিখলেন:” দুর্বল বিক্রিয়াতে প্যারিটি অসংরক্ষিত হয় কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিৎভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এমন একটি পরীক্ষণ সম্পাদন করতে হবে যাকিনা এই বিক্রিয়া ডান-বামের মধ্যে পার্থক্য কতে পারে কিনা তা দেখাতে সক্ষম।” এজন্য তাঁরা বেশকিছু পরীক্ষণ প্রস্তাব করলেন। এর মধ্যে বোঝার জন্য মোটামুটি সহজ একটি পরীক্ষণ ছিল তেজষ্ক্রিয় কোবাল্ট-৬০ এর বিটা ডিকে সংক্রান্ত পরিমাপ সম্পর্কিত। এই পরীক্ষণে নিঃসরিত ইলেকট্রনগুলোর দিক পরিমাপ করা হয়। দেখা যায় যে নমুনা থেকে নিঃসরিত বেশীরভাগ ইলেকট্রনই “উত্তরমুখী” অর্থাৎ নিউক্লীয় স্পিনের দিক বরাবর এরা নিঃসরিত হয়। এটুকুই কিন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। কিন্ত এই সোজাসাপ্টা বিষয়টির তাৎপর্য ছিল চুড়ান্তভাবে বিস্ময়কর। বিষয়টি একটু বোঝবার চেষ্টা করা যাক। আমরা একটি প্রক্রিয়া এবং আয়নাতে তার প্রতিবিম্ব বিশ্লেষণ করি। প্রক্রিয়াটি আর কিছুই না– তেজষ্ক্রিয় কোবাল্ট-৬০ এর বিটা ডিকে। কোবাল্ট নিউক্লিয়াসসমূহে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগের মাধ্যমে এদের স্পিনসমূহকে একমুখী করা হয়। ধরা যাক ইলেকট্রনসমূহের স্পিন উর্ব্ধমুখী। আয়নাতে একটি ইলেকট্রনের (প্রতিবিম্বের) নিজ অক্ষ বরাবর ঘূর্ণন হবে বিপরীত দিকে–কাজেই এর স্পিনটি হবে নিম্নমুখী। তথাপি আমরা দেখতে পাব যে এরা একই দিকে (উর্ব্ধমুখে) নিঃসরিত হচ্ছে। অন্যভাবে বলতে গেলে আয়নাতে ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়ার স্পিনের বিপরীত দিকে নিঃসরিত হচ্ছে এবং বাস্তব জগতে সেগুলো নিউক্লিয়ার স্পিনের একই দিকে নিঃসরিত হচ্ছে। তাহলে আমরা কি পাচ্ছি? আমরা এমন একটি ভৌত প্রক্রিয়া পাচ্ছি যার প্রতিবিম্ব প্রক্রিয়ার অস্তিত্ব বাস্তব জগতে নেই এবং যা ডান-বামের প্রতিসাম্য ভঙ্গ করে–প্যারিটি উইক ইন্টারাকশনের প্রতিসাম্য নয়। যদি এটি তাই হত তাহলে কোবাল্ট-৬০ এর বিটা ডিকেতে নিঃসরিত ইলেকট্রনগুলোর ৫০% উর্ব্ধমুখে এবং ৫০% ভাগ নিম্নমুখে নিঃসরিত হত। উইক ইন্টারাকশনে প্যারিটি অসংরক্ষণ হয় কিনা সেটি নির্ধারণ করবার জন্য তাহলে এই পর্যবেক্ষণটিই (নিঃসরিত ইলেকট্রন বা বিটা রশ্মির একমুখীতা) জরুরী।

প্যারিটির অসংরক্ষণ ছোট-খাটো বা তাৎপর্যহীণ কোন প্রক্রিয়া নয়। বরং এটি ম্যাক্সিমালি বা চূড়ান্তভাবে ভঙ্গ হয়। একটু ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করি। পদার্থবিজ্ঞানে প্যারিটি একটি ফাংশন এবং এর স্হানাংকসমূহের উল্টো বিন্যাসের (x–>-x, y–>-y, z–>-z) দিকে ইঙ্গিত প্রদাণ করে থাকে (এই উল্টো বিন্যাসটি পাওয়া যাবে যদি কোন বস্তুর প্রথমে আয়নায় প্রতিবিম্ব নেওয়া হয় এবং এরপর এটিকে (প্রতিবিম্বটিকে) ১৮০ ডিগ্রী ঘোরানো হয়। সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে বলা হবে বস্তটির স্থানিক অবস্থানের ওপর সরাসরিভাবে নির্ভরশীল কোন ফাংশনের প্যারিটি ট্রান্সফর্মেশন)। উদাহরণস্বরূপ, কৌণিক বেগের প্যারিটি +১ কারণ এটি গ্রাডিয়েন্ট অপারেটর এবং রৈখিক বেগের ক্রস প্রোডাক্ট আর এই দুইটি রাশির প্রত্যেকটি স্পেশিয়াল ইনভার্শন বা স্থানাংক উল্টীকরণ প্রক্রিয়াতে চিন্থ পরিবর্তণ করে থাকে। প্যারিটির সংরক্ষণ মানে একটি ভৌত প্রক্রিয়া এবং এর আয়নাতে প্রতিবিম্ব প্রক্রিয়া উভয়ই প্রকৃতিতে সমানভাবে ঘটে থাকে (অপটিকাল আইসোমারিজম)। আর প্যারিটির অসংরক্ষণ তাহলে এর ঠিক উল্টোটি বোঝায়। এটিকে সাধারণভাবে ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা বলে যায় দায় সারানো যায়। আসলেই কিন্ত এধরণের দুর্ঘটনার অস্তিত্ব আছে–যার আপাত:ভাবে রাসায়নিক কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি–সমস্ত ডি.এন.এ ই রাইট-হ্যান্ডেড অথবা ডান-হাতী।

এখন তাহলে “ম্যাক্সিমাল প্যারিটি ভায়োলেশন” কথাটির অর্থ বোঝার চেষ্টা করা যাক। এর সোজাসুজি অর্থ করলে দাড়ায় কোন ভৌত প্রক্রিয়ার মিরর ইমেজ প্রক্রিয়া “কখনই” ঘটেনা । এটিকেও হয়ত কোন ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা বলা যেতে পারে ।কিন্ত পদার্থবিজ্ঞানের কোন নিয়মের প্রতিসাম্য ভঙ্গের মাধ্যমেও এর ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তাহলে মোদ্দাকথা এই দাড়াল যে প্যারিটির অসংরক্ষণ ছোট-খাট কোন বিষয় নয়। এটি অনেকক্ষেত্রেই শুধুমাত্র ভায়োলেটেড হয়না—ম্যাক্সিমালি ভায়োলেটেড হয় (যদি আমরা একটি নিউট্রিনোর মিরর ইমেজ কল্পনা করি তাহলে দেখব সমস্ত নিউট্রিনোই বামহাতী–ডান-হাতী নিউট্রিনো অস্তিত্বহীণ)। আর এটি (প্যারিটির অসংরক্ষণ) শুধুমাত্র কোবাল্ট-৬০ এর বিটা ডিকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি হল যেকোন উইক ইন্টারাকশন বা দুর্বল বিক্রিয়ার স্বাক্ষর।

পদার্থবিজ্ঞানের বিবেচ্য বিষয় হল প্রতিবিম্ব প্রক্রিয়ার সম্ভাব্যতা বা অসম্ভাব্যতা–ঐতিহাসিক দুর্ঘটনাসমূহ নয়। কাজেই পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে ” ইলেকট্রন এবং এর প্রতিবিম্ব কণিকাসমূহ কি একই পরিমাণে প্রকৃতিতে পাওয়া যায়?” প্রশ্নটির চাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল “একটি ইলেকট্রনের প্রতিবিম্ব কণিকাটি কি?”যদি ইলেকট্রনের প্রতিবিম্ব কণিকাসমূহ ইলেকট্রনের চাইতে কম পরিমাণে হলেও প্রকৃতিতে পাওয়া যেত তাহলে আমরা বলতে পারতাম যে প্যারিটি অসংরক্ষিত হয় কিন্ত প্রকৃতি মিরর-সিমেট্রিক। এবং আসলে ঘটনা ঠিক তাই। কাজেই “ম্যাক্সিমাল প্যারিটি ভায়োলেশন”কে (ইলেকট্রনের প্রতিবিম্ব কণিকাসমূহের অনস্তিত্বকে) আমরা বলতে পারি “মিরর এ্যাসিমেট্রি এবং এর অভাবকে বলতে পারি “মিরর সিমেট্রি”। বিটা ডিকেতে প্যারিটি ভায়োলেটেড হয় কিন্ত এটি একটি মিরর সিমেট্রিক প্রক্রিয়া–অর্থাৎ আপাত:দৃষ্টিতে বিটা ডিকেতে প্যারিটি ম্যাক্সিমালি ভায়োলেটেড হয়না (পজিট্রন সমন্বিত অনুরুপ পরীক্ষণানুসারে এবং সি.পি. কনজার্ভেশনের ধারণাকে আবাহন না করে)। যদি কোবাল্ট-৬০ এর পরীক্ষণটি এ্যান্টি-ম্যাটার (পজিট্রন) দিয়ে করা হত (যা নীতিগতভাবে সম্ভবপর) তাহলে সেটি হত পুরোপুরিভাবে মূল এক্সপেরিমেন্টের (যেটিতে ইলেকট্রন নিঃসরিত হয়েছিল) মিরর ইমেজ। এর সবচাইতে সরল ব্যাখ্যা হবে যে পার্টিকেল এবং এ্যান্টি-পার্টিকেল একে অপরের মিরর ইমেজ এবং মিরর সিমেট্রির সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ কিন্ত এক্ষেত্রে প্যারিটি সংরক্ষণের কোন ব্যাপার নেই, কারণ প্রকৃতিতে এদের সমপরিমাণে পাওয়া যায়না।

বিষয়টিকে আমরা এভাবেও বলতে পারি: দুর্বল বিক্রিয়ার সাথে যুক্ত ভৌত প্রক্রিয়াসমূহের প্রতিবিম্ব প্রক্রিয়াসমূহের অস্তিত্ব আছে- প্রকৃতিতে যাদের সাদৃশ্য কল্পনা শুধুমাত্র কণিকা এবং প্রতি-কণিকাসমূহের পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমেই সম্ভব। এখন এধরণের সরলীকৃত ব্যাখ্যাতে না গিয়ে তাত্ত্বিকগণ বিষয়টিকে ঠিক কিভাবে ব্যখ্যা করেন সেটি বলছি। এতক্ষণ যেটিকে ম্যাটার এবং এ্যান্টি-ম্যাটারের মিরর সিমেট্রি বলেছি সেটিকে তাঁরা ব্যাখ্যা করেন ম্যাক্সিমাল প্যারিটি ভায়োলেশন বলে (মিরর এ্যাসিমেট্রি)। এর সাথে শুধু আরেকটি বিষয়কে তাঁরা যুক্ত করেন: এক্ষেত্রে ম্যাক্সিমাল প্যারিটি ভায়োলেশন হলেও এটি চার্জ কনজুগেশন এবং প্যারিটির সমন্বিত পরিবর্তণের (সি.পি) অধীণে সংরক্ষণ নির্দেশক (চার্জ কনজুগেশন অর্থ ম্যাটার এবং এ্যান্টি-ম্যাটারের বিনিময় প্রক্রিয়া)। এখন আমরা এভাবে প্রশ্নটি করি যে “স্পেস ইনভার্শন কি ম্যাটার থেকে এ্যান্টি-ম্যাটার দেয়”? এর পরীক্ষণলব্ধ উত্তর ইতিবাচক হবে–কারণ বিটা ডিকের মূল পরীক্ষণটির মিরর ইমেজ হল পজিট্রন সম্বলিত অনুরুপ পরীক্ষণ। কিন্ত এর কনভেনশনাল উত্তরটি হবে নেতিবাচক।বিটা ডিকেতে “কনভেনশনাল” প্যারিটি অপারেটরের প্রয়োগ নির্দেশ করে যে কোবাল্ট-৬০ নিউক্লীয় স্পিনের দিক বরাবর এবং উল্টো দিকে নিঃসরিত বিটা কণিকা (ঋণাত্মক চার্জবাহী ইলেকট্রন- ধনাত্মক চার্জবাহী পজিট্রন নয়) সমপরিমাণে পাওয়া যাবে– -সেটিকে ( “কনভেনশনাল” প্যারিটি অপারেটর) সেভাবেই সংজ্ঞায়িত এবং ডিজাইন করা হয়েছে। ভবিষ্যদ্বানীটি ভুল ছিল যা আমরা আগেই দেখেছি এবং এটির উৎস যেই তত্ব (প্যারিটি সংরক্ষণের তত্ব) সেটির খুব দ্রুততার সাথেই বিলুপ্ত হবার কথা ছিল। কিন্ত তা না হয়ে ম্যাটার-এ্যান্টিম্যাটারের মিরর সিমেট্রির (কম পরিমাণে হলেও পজিট্রনের অস্তিত্ব আছে) সাথে সাজু্য্য রাখতে গিয়ে– সেই মিরর ইমেজকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নতুন নতুন আরও অনেক কণিকার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়– পরীক্ষাগারে যাদের অদ্যবধি পাওয়া যায়নি। এই না পাওয়াকে আরেকটি না পাওয়া কণিকার অস্তিত্বে বিশ্বাস দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। কণিকাটি হল বিখ্যাত হিগস্ বোসোন। এটি “মিতব্যয়িতা”র সূত্র বা অক্কামের ক্ষুরের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ। এই যে অতিরিক্ত না-দেখা না পাওয়া কণিকাগুলো–এদের দুর করবার জন্য অক্কামের ক্ষুরকে আবাহন করা হয় আর এটি করা হয় সরলতর তত্বটির সমর্থনে যাকিনা জানা কণিকাসমূহের মাধ্যমেই সমস্ত পরীক্ষণলব্ধ ফলাফলকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। আর সেটি কি? উইক ইন্টারাকশনে প্যারিটির ম্যাক্সিমাল ভায়োলেশন।

এবার আরেকজন অভিবাসীর কথা বলব যিনি পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করেছিলেন। মাদাম চিয়েন শিয়েং ওয়ু ১৯৩৭ সালে সুদুর চীনদেশের সাংহাই থেকে বার্কলিতে পড়াশোনা করতে আসেন। সেসময় পশ্চিমা ক্যাম্পাসে মেয়েমানুষ তথা ছাত্রীর আকাল ছিল। আর সেজন্য তাঁর উপস্থিতি সবাইকে আকর্ষণ করত। তিনি কিন্ত কঠোর পরিশ্রমী এক ব্যাক্তিত্ব ছিলেন–মার্কিন বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠায় নারীর দৃষ্টিকটু অনুপস্থিতি যাকে গভীরভাবে পীড়া দিত। তিনি এসম্পর্কে বলেছিলেন ” বিজ্ঞানে এত কম সংখ্যক নারীর উপস্থিতি সত্যই লজ্জাজনক। চীনদেশে পদার্থবিজ্ঞানে তুলনামূলকভাবে অনেক অনেক বেশী নারী কাজ করছে।মার্কিন সমাজে বহুল প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হল নারী বৈজ্ঞানিক অর্থই অনাকর্ষণীয় এবং অবিন্যস্ত পোষাক পরিহিত আঁইবুড়ো মহিলা। এর জন্য পুরুষেরা দায়ী। চীনা সমাজে একজন নারীকে সে যা তার জন্যই সম্মান করা হয়ে থাকে এবং পুরুষেরা তাকে সাফল্য অর্জনের জন্য প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে থাকে। কিন্ত এরপরেও সে একজন শ্বাশ্বত নারীই থাকে।” এখানে চাইনিজ এবং মার্কিন সংস্কৃতির মধ্যকার সুস্পষ্ট পার্থক্যটি ফুঁটে উঠেছে।

ইয়াংকেও কিন্ত এই দুই সংস্কৃতির মধ্যকার পার্থক্যের সাথে আপোষ-রফা করতে হয়েছিল। তাঁর নোবেল বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন ” আমি চাইনিজ এবং মার্কিন এই দুই সংস্কৃতির মিলন এবং বিরোধ এ দু’য়ের সম্মিলিত ফসল। আর এই সত্য সম্পর্কে সচেতনতা আমাকে মাঝে মাঝেই ভারাক্রান্ত করে। আমি আমার চাইনিজ উত্তরাধিকার এবং উৎস নিয়ে ততটাই গর্বিত যতটা মানবসভ্যতার পশ্চীমা উৎসোদ্ভূত আধুনিক বিজ্ঞানের একজন অনুরাগী চর্চাকারী হিসেবে।” যাইহোক, এবার আবার মাদাম ওয়ু এর কথাতে ফিরে আসা যাক। তাঁর একজন শিক্ষক খ্যাতনামা পদার্থবিদ এমিলিও সেগরে বলেছিলেন ” সে একজন “স্লেভ ড্রাইভার”। চিরায়ত চৈনিক সাহিত্যের বহুল আলোচিত যুদ্ধংদেহী নারীর প্রতিচ্ছবি সে (যারা সাধারণত: সম্রাজ্ঞী বা মায়ের ভূমিকাতে থাকে)।” কিন্ত তাঁর বিটা ডিকের কাজের জন্য ১৯৫৬ সালের মধ্যে তাঁর খ্যাতি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল । তাঁর সরল এবং চমকপ্রদ পরীক্ষণসমূহ খুবই উচ্চমানের বলে বিবেচিত হয়েছিল এবং এখনও হচ্ছে । লি এবং ইয়াং যখন প্যারিটি বিষয়ক প্রশ্নগুলো বিবেচনা করা শুরু করেন ঠিক সেসময় তাঁদের দীর্ঘদিনের পুরোণো বান্ধবী মাদাম ওয়ু (এবং উভয় পুরুষের ভেতরকার গোপন শীতল সম্পর্কের ও সাধারণ অতৃপ্ত কামনার উৎস –সম্ভবত: উভয়ের মধ্যকার পুঞ্জিভূত ও চরমভাবে অবদমিত পারস্পরিক ঘৃণাবোধের হঠাৎ উদগীরণের কারণে তাঁরা পরবর্তীকালে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।) কলম্বিয়াতে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম তাঁদের প্রস্তাবিত পরীক্ষণটি (কোবাল্ট-৬০ এর বিটা ডিকে) সম্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

লি এবং ইয়াং তাঁদের সন্দর্ভটি “দ্য ফিজিক্যাল রিভিউ” তে জমা দেবার অনেক আগে থেকেই তাঁরা তাঁদের প্রস্তাবিত পরীক্ষণটি নিয়ে মাদাম ওয়ুর সাথে আলোচনা করেন। সে সময় ওয়ু এবং তাঁর স্বামী প্রথমে ইউরোপ এবং পরবর্তীতে দূর-প্রাচ্য ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন কিন্ত তিনি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। অন্য পদার্থবিদেরা এর গুরুত্ব বুঝে ফেলবার আগেই তিনি পরীক্ষণটি দ্রুত সম্পাদনের পরিকল্পনা করেন ।তিনি এরকম সু্যোগকে হাতছাড়া করবার মোটেও পক্ষপাতী ছিলেন না। কিন্ত পরীক্ষণটি শুধুমাত্র তাঁর একক দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে করাটা সম্ভবপর ছিলনা। কোবাল্ট-৬০ এর নিউক্লিয়াসসমূহকে একমুখী করবার জন্য দরকার খুবই নিম্ন তাপমাত্রা আর সেজন্য প্রয়োজণীয় সরঞ্জাম কেবলমাত্র গুটিকয়েক পরীক্ষাগারে ছিল। সৌভাগ্যক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সে ধরণের একটি পরীক্ষাগার ছিল–ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যান্ডার্রডস্ এ অবস্থিত ক্রায়োজেনিকস্ ফিজিক্স ল্যাবরেটরী। ১৯৫৬ সালের জুন মাসের প্রথমভাগে ওয়ু এন.বি.এস এর আর্নেস্ট এ্যাম্বলারের সাহায্য চাইলেন। এ্যাম্বলার সোৎসাহে রাজী হলেন। অবশ্য এই অতি উৎসাহের পেছনে তাঁর নারী-লোলুপ স্বভাব কতখানি কাজ করেছিল তা নিয়ে তাঁর শত্রুরা নিয়ত কানা-ঘুষো করত। তাছাড়া তাঁর ডক্টরাল থিসিসের বিষয়বস্তও ছিল কোবাল্ট নিউক্লিয়াসের স্পিনের ওরিয়েন্টেশন সংক্রান্ত। এছাড়াও তাঁদের টিমে যোগ দিলেন ক্রায়োজেনিকস্ (নিম্ন তাপমাত্রা উৎপাদন এবং এধরণের তাপমাত্রাতে পদার্থের আচরণ বিশ্লেষণ সংক্রান্ত বিদ্যা) বিশেষজ্ঞ রেমন্ড হেওয়ার্ড এবং তেজষ্ক্রিয়তা ডিটেকশনের বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ডেল হোপস্ ।অক্টোবরের প্রথমভাগের ভেতর তাঁরা যন্ত্রপাতি একত্রিত করে সেগুলো পরীক্ষা করবার প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন। সে মাসেই লি এবং ইয়াং এর সন্দর্ভটি প্রকাশিত হল।

কণিকাসমূহকে ঠিক কিভাবে ডান-হাতী বা বাম-হাতী হিসেবে চিণ্হিত করা হয় তা কিছুটা বিশদ ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে। একটি ডান-হাতী কণিকার গতি এর স্পিনের দিক বরাবর হয় এবং একটি বাম-হাতী কণিকার এর স্পিনের বিপরীত দিক বরাবর। গাণিতিকভাবে কোন কণিকার হেলিসিটি হল এর লিনিয়ার মোমেন্টাম ভেক্টরের ওপর স্পিন এ্যাংগুলার মোমেন্টাম ভেক্টরের প্রোজেকশনের চিণ্হ: ডান হল ধনাত্মক (+১) এবং বাম ঋণাত্মক (-১)।আমরা বলে থাকি যে একটি ডান-হাতী কণিকার “হেলিসিটি” +১ এবং একটি বাম-হাতী কণিকার “হেলিসিটি” -১ । একটি রাইট-হ্যান্ডেড বা ডান-হাতী স্ক্রুর কথা চিন্তা করুন। এটি এমনভাবে তৈরী করা হয়েছে যে এটিকে কোন কাঠের তক্তার ওপর রেখে ঈষৎ বাড়ি মেরে ঘড়ির কাঁটার দিক বরাবর ঘোড়াতে থাকলে এটি তক্তাটির ভেতর বরাবর একটি ছিদ্র তৈরী করে ঢুকতে থাকবে। আয়নাতে দেখা যাবে যে আপনি স্ক্রুটিকে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিক বরাবর ঘোড়াচ্ছেন এবং সেটি ঠিক একইভাবে তক্তাটির ভেতর ছিদ্র করে ঢুকছে (অর্থাৎ আয়নাতে আপনি একটি বাম-হাতী স্ক্রু দেখবেন)। হেলিসিটির ক্ষেত্রে কণিকাসমূহের স্পিনের সাথে এর ভরবেগের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। এখন ডান-হাতী এবং বাম-হাতী স্ক্রুর সাহায্যে এটিকে কিভাবে বোঝা সম্ভব তা দেখা যাক। একটি ডান-হাতী কণিকার গতির দিক বরাবর যদি আপনি আপনার বুড়ো আঙ্গুলটি স্থাপন করে অবশিষ্ট আঙ্গুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করেন তাহলে সেগুলো একই দিক বরাবর কণিকাটির স্পিনের দিক নির্দেশ করবে। অন্যভাবে বলতে গেলে একটি ডান-হাতী স্ক্রুকে এমনভাবে ঘোড়াবেন যাতে এটি কণিকাটির গতির দিক বরাবর হয়। সেক্ষেত্রে স্ক্রুটির ঘূর্ণন এমন হবে যে সেটি কণিকাটির ভরবেগের একই দিকে এর স্পিন এ্যাংগুলার মোমেন্টামের দিক নির্দেশক হবে। তাহলে একটি ডান-হাতী স্ক্রুর মিরর ইমেজ যেভাবে একটি বাম-হাতী স্ক্রু–ঠিক সেভাবে একটি ধনাত্মক হেলিসিটির কণিকার মিরর ইমেজ হল ঋণাত্মক হেলিসিটির একই কণিকা।

হেলিসিটির ভিত্তিতে কণিকাগুলোকে এভাবে পার্থক্য করাটা কিন্ত ঠিক সুস্পষ্ট না। কারণ এইভাবে তাদেরকে আলাদা করাটা লরেঞ্জ ইনভ্যারিয়্যান্ট নয়। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ধরুন: একটি ডান-হাতী ইলেকট্রন ডান দিকে ছুটে চলেছে । একজন দর্শক সেটিকে এমন একটি ইনার্শিয়াল রেফারেন্স ফ্রেম থেকে দেখছে যেটি ইলেকট্রনটির চাইতে অধিক গতিতে ডানদিকেই ছুটে চলছে। সে দেখবে যে ইলেকট্রনটি তার সাপেক্ষে বাম দিকে ছুটে চলেছে কিন্ত একইভাবে স্পিন করছে। মোদ্দাকথা সে বলবে যে সে একটি বাম-হাতী ইলেকট্রন দেখেছে। অন্যভাবে বললে দাড়ায়, একটি ডান-হাতী কণিকাকে শুধুমাত্র রেফারেন্স ফ্রেম বদলিয়ে বাম-হাতী কণিকাতে রুপান্তর করা সম্ভব–পার্থক্যটি লরেঞ্জ ইনভ্যারিয়্যান্ট নয়। অন্যদিকে একটি কণিকার “কাইরালিটি” অনেক বেশী সুসংজ্ঞায়িত কিন্ত কিছুটা বিমূর্ত। এতক্ষণ আমি যেই যুক্তি ইলেকট্রনের মতন ভর‌যুক্ত কণিকার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলাম সেটি নিউট্রিনোর মতন ভরহীণ কণিকার ওপর প্রয়োগ করা যাক। নিউট্রিনো ভরহীণ আর সেজন্য এটি আলোর বেগে ভ্রমণ করে। এটির গতির দিক পরিবর্তণ করতে হলে দর্শকটিকে এর চাইতে বেশী গতিতে অর্থাৎ আলোর বেগের চাইতে বেশী বেগে চলমান কোন রেফারেন্স ফ্রেমে থাকতে হবে যা অসম্ভব। কাজেই নিউট্রিনোর মতন ভরহীণ কোন কণিকার হেলিসিটি বা কাইরালিটি লরেঞ্জ ইনভ্যারিয়্যান্ট এবং এটি তাদের একটি মৌলিক ও নির্দিষ্টকৃত ধর্ম: দর্শকের প্রসঙ্গ কাঠামোর বা প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভরশীল নয়।

এখন নিউট্রিনোর কাইরালিটি পরীক্ষণের মাধ্যমে ঠিক কিভাবে বের করা যাবে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি অবধি সবার ধারণা ছিল যে জগতের সমস্ত নিউট্রিনোর অর্ধেক হল ডান-হাতী এবং বাকী অর্ধেক বাম-হাতী। শেষপর্যন্ত দেখা গেল সমস্ত নিউট্রিনো হল বাম-হাতী এবং সমস্ত এ্যান্টি-নিউট্রিনো ডান-হাতী। অবশ্যই, নিউট্রিনোর কাইরালিটিকে সরাসরি বের করাটা সহজসাধ্য কোন বিষয় ছিলনা। তবে এটি বের করবার একটি আপেক্ষাকৃত সহজ কিন্ত পরোক্ষ পদ্ধতি আছে: পাইয়ন ডিকে। পাইয়নটির রেস্ট ফ্রেমে সেটি ডিকের পর মিউয়ন এবং এ্যান্টি-নিউট্রিনো পরস্পরের বিপরীতদিক বরাবর নিঃসরিত হয়। তদুপরি যেহেতু পাইয়ন একটি শূণ্য স্পিনের কণিকা সেহেতু কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণশীলতার জন্য নিঃসরিত কণিকাদ্বয়ের স্পিনগুলো বিপরীতমুখী হবে এবং এ্যান্টি-নিউট্রিনো ডান-হাতী হলে মিউয়ন কণিকাকে অবশ্য অবশ্যই ডান-হাতী হতে হবে। কাজেই, পাইয়ন ডিকেতে মিউয়নের হেলিসিটি পরিমাপের মাধ্যমে এ্যান্টি-নিউট্রিনোর কাইরালিটি জানা সম্ভব। একইভাবে ধনাত্মক তড়িৎ-চার্জবাহী পাইয়নের ডিকেতে নিঃসরিত এ্যান্টি-মিউয়নের হেলিসিটি সর্বদাই ঋণাত্মক। কাজে কাজেই নিউট্রিনোর কাইরালিটিও ঋণাত্মক: এটি একটি বামহাতী কণিকা।

এখন এর সাথে নিউট্রাল পাইয়নের ডিকেকে তুলনা করা যাক। এটি দু’টি ফোটনে ডিকে করে। আবারও, ফোটনদু’টির কাইরালিটি সমান। কিন্ত এই বিক্রিয়াটি কিন্ত আগের দু’টি উদাহরণের মতন দুর্বল বিক্রিয়ার উদাহরণ না–এটি একটি বিশুদ্ধ তড়িৎ-চুম্বকীয় প্রক্রিয়া। কাজেই পরীক্ষণটিতে গড়ে আমরা সমান পরিমাণ ডান-হাতী এবং বাম-হাতী ফোটন পাব। নিউট্রিনোর ক্ষেত্রে কিন্ত সেটি ঘটবে না-তারা শুধুমাত্র দুর্বল বলের মাধ্যমে ক্রিয়া করে থাকে এবং তাদের প্রত্যেকে বাম-হাতী। নিউট্রিনোর মিরর ইমেজের কোন অস্তিত্ব বাস্তব জগতে নাই। প্যারিটির সবচাইতে উলঙ্গ ভায়োলেশনের একটি উদাহরণ হতে পারে এটি।

এবার আমরা দেখব কিভাবে গাণিতিকভাবে দুর্বল বলকে তত্বে সংশ্লিষ্ট করা সম্ভব। আমি আগেই বলেছি: প্যারিটি অপারেটর বা কারক P একটি ফাংশনের ওপর কাজ করলে এর স্হানাংকসমূহের উল্টো বিন্যাস (x–>-x, y–>-y, z–>-z) হয়ে থাকে। তাতে ফাংশনটি নিজেই উল্টে যেতে পারে (চিণ্হ পরিবর্তণ করতে পারে) অথবা এটি অপরিবর্তিত থাকতে পারে (আইডেনটিটি অপারেশন)। কাজেই প্যারিটি অপারেটরের আইগেনভ্যালু হল +১ এবং -১। এখন P-কে যদি একটি সদিকরাশি বা ভেক্টরের ওপর প্রয়োগ করা হয় তাহলে কি হবে? আমরা বিপরীতদিকে মুখ করা আরেকটি ভেক্টর পাব। দুইটি ভেক্টরের ক্রস-প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে কিন্ত খুবই আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা ঘটবে। P আলাদা আলাদাভাবে সদিকরাশিদু’টির দিক পরিবর্তন করলেও এদের ক্রস-প্রোডাক্টের দিক অপরিবর্তিত থাকবে। আপাত:দৃষ্টিতে, তাহলে দেখা যাচ্ছে যে দু’ধরণের ভেক্টর আছে: “সাধারণ” বা পোলার ভেক্টর যারা প্যারিটি অপারেশনের অধীণে চিণ্হ পরিবর্তণ করে এবং স্যুডো বা এক্সিয়াল ভেক্টর যারা করেনা (দুইটি ভেক্টরের ক্রস-প্রোডাক্ট যেটির সবচেয়ে সুণ্দর উদাহরণ)। আমরা কিন্ত অনেক স্যুডোভেক্টরের সাথেই সুপরিচিত যদিও আমরা আগে ঠিক এভাবে তাদের কথা চিন্তা করিনি। উদাহরণস্বরুপ কৌণিক ভরবেগ এবং চৌম্বকক্ষেত্রের কথা বলা যেতে পারে। প্যারিটি সংরক্ষিত হয় এমন কোন তত্ত্বে আপনি কখনই একটি স্যুডো ভেক্টরের সাথে একটি পোলার ভেক্টর যোগ করতে পারবেননা যেমনিভাবে ঘূর্ণন প্রতিসাম্য আছে এমন কোন তত্ত্বে আপনি অদিক রাশির সাথে সদিক রাশি যোগ করতে পারবেন না। আর সেজন্যই কিন্ত দুর্বল বিক্রিয়াকে বর্ণনা করে এমন একটি ল্যাগ্রাঞ্জিয়ান কারকে একটি পোলার ভেক্টরের সাথে একটি স্যুডো বা এক্সিয়াল ভেক্টর যোগ করা হয়। তড়িৎ-চুম্বকীয় তত্ত্বের ক্ষেত্রে কিন্ত তেমনটি করা অবৈধ।

উদাহরণস্বরুপ, আমরা তড়িৎ-চুম্বকক্ষেত্রে একটি চার্জবাহী কণিকার ওপর কার্যরত বল বা লরেঞ্জ ফোর্সের কথা চিন্তা করতে পারি। এটিকে F=q(E+v/cXB) সমীকরণটির সাহায্যে প্রকাশ করা হয়। এখানে F হল কণিকাটির ওপর কার্যরত তড়িৎ-চুম্বকীয় বল, q কণিকাটির তড়িৎ-চুম্বকীয় চার্জ বা আধান, E হল তড়িৎক্ষেত্র, B হল চৌম্বকক্ষেত্র, v হল কণিকাটির গতিবেগ এবং c হল আলোর বেগ। খেয়াল করে দেখুন, ব্রাকেটের ভেতর E এর সাথে সরাসরি B কে যোগ করা হয়নি–কারণ E হল একটি পোলার ভেক্টর এবং B একটি এক্সিয়াল ভেক্টর। এর সাথে যোগ করা হয়েছে v/cXB যেটি আরেকটি পোলার ভেক্টর কারণ v একটি পোলার ভেক্টর এবং B একটি এক্সিয়াল ভেক্টর আর একটি পোলার ভেক্টরের সাথে একটি স্যুডো ভেক্টরের ক্রস-প্রোডাক্ট নিলে আমরা আরেকটি পোলার ভেক্টর পাই।

লেখাটিতে দুর্বল বল বা উইক ইন্টারাকশনের উৎস ও প্রকৃতি, এর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উদ্ভব এবং এসম্পর্কিত পরীক্ষণের ইতিহাস ইত্যাদি সবিস্তারে বর্ণনা এবং অনেকক্ষেত্রেই ব্যাখ্যা করবার প্রয়াস পেয়েছি।গাণিতিক সমীকরণের অনুপস্থিতি রচনাটিতে উল্লেখযোগ্য এবং এটি এর একটি অন্যতম কিন্ত ইচ্ছাকৃত সীমাবদ্ধতা। তবে, সালাম-ভাইনবার্গের তত্ত্ব যাকিনা উইক ইন্টারাকশনের (এবং তড়িৎ-চুম্বকত্বের) সঠিক তত্ব সেটি আরেকটি স্বতন্ত্র রচনার উপযোগী।

তথ্যসূত্র:
( I ) Stephen Weinberg, The Quantum Theory of Fields
(II) Greiner & Muller, Gauge Theory of Weak Interactions
(III) Burgess & Moore, Standard Model: A Modern Primer
(IV)Giudice, A Zeptospace Odyssey; A Journey into the Physics of LHC
(V) Griffiths, Introduction To Elementary Particles
(VI) Pais, The Genius of Science
(VII) Coleman, Aspects of Symmetry
(VIII)Feinberg (1986). Selected Papers, Vols 13. Boston; Basel; Stuttgart: Birkhauser.
(IX)Yang, C.N. (1983) [1983]. Selected papers 1945-1980, with commentary.
(X)Aitchison & Hey, Gauge Theories in Particle Physics

মুক্তমনা ব্লগার

মন্তব্যসমূহ

  1. ড্যামরাইট আগস্ট 25, 2012 at 12:47 পূর্বাহ্ন - Reply

    মাথায় কিছু ডুকলো না ।

  2. সংশপ্তক আগস্ট 22, 2012 at 11:56 অপরাহ্ন - Reply

    এতদিনে আপনার এই চমৎকার লেখাটা পড়ার সময় পেলাম। দূর্বল বল তথা পদার্থবিদ্যার ওপর এমন ‘মেদমুক্ত’ প্রবন্ধ সহসা চোখে পড়ে না বাংলা ভাষার প্রকাশনায়। অনেক দিন থেকেই একটা প্রশ্ন আমার মনে খুত খুত করছে । আপনি পদার্থবিদ্যার মানুষ বিধায় আপনাকেই করি। রাতের আকাশ কেন কালো দেখায় ? এর পেছনে দূর্বল বলের ভূমিকা কতটুকু ? ধন্যবাদ।

    • তানভীর হানিফ আগস্ট 23, 2012 at 12:47 পূর্বাহ্ন - Reply

      @সংশপ্তক,
      সূর্যালোকের অভাবে। পৃথিবীর ২৪ ঘন্টায় নিজ অক্ষ বরাবর একটি পূর্ণ ঘূর্ণণ ঘটে এবং দিন-রাতের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তণ ঘটে। রাতের আকাশ কালো দেখানোর পেছনে সরাসরি দূর্বল বলের কোন ভূমিকা নাই। পরোক্ষ নেতিবাচক ভূমিকা অবশ্য আছে।উইক ফোর্সের জন্যই কিন্ত প্রোটন এবং নিউট্রনের ফিউশন ঘটে ভারী হাইড্রোজেন ডিউটেরিয়াম তৈরী হয় আর এই ফিউশন বিক্রিয়ার অতিরিক্ত শক্তিই সূর্যের তাপ ও আলোক শক্তির উৎস। উইক ফোর্স ছাড়া প্রাণের অস্তিত্বই কিন্ত বিপন্ন হয়ে পড়ত।

      • সংশপ্তক আগস্ট 23, 2012 at 1:04 পূর্বাহ্ন - Reply

        @তানভীর হানিফ,

        সূর্যালোকের অভাবে। পৃথিবীর ২৪ ঘন্টায় নিজ অক্ষ বরাবর একটি পূর্ণ ঘূর্ণণ ঘটে এবং দিন-রাতের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তণ ঘটে। রাতের আকাশ কালো দেখানোর পেছনে সরাসরি দূর্বল বলের কোন ভূমিকা নাই। পরোক্ষ নেতিবাচক ভূমিকা অবশ্য আছে।উইক ফোর্সের জন্যই কিন্ত প্রোটন এবং নিউট্রনের ফিউশন ঘটে ভারী হাইড্রোজেন ডিউটেরিয়াম তৈরী হয় আর এই ফিউশন বিক্রিয়ার অতিরিক্ত শক্তিই সূর্যের তাপ ও আলোক শক্তির উৎস। উইক ফোর্স ছাড়া প্রাণের অস্তিত্বই কিন্ত বিপন্ন হয়ে পড়ত।

        হুম , তাহলে ওলবারের প্যারাডোক্স কিংবা রেডশিফ্টের ব্যাখ্যাগুলো ঠিক নয় ? আমি তো এতদিন জানতাম যে রাতের আকাশ কালো দেখানোর সাথে সূর্যালোকের কোন সম্পর্কই নেই। বিষয়টা নাকি আরো জটিল !

        • তানভীর হানিফ আগস্ট 23, 2012 at 2:25 পূর্বাহ্ন - Reply

          @সংশপ্তক,

          যেকোন নক্ষত্রের আলোর উৎস হল দুর্বল বল। রাতের আকাশ কালো দেখায় ঠিক যেকারণে দিনের আকাশ উজ্জ্বল দেখায় সেই কারণটির অভাবে অর্থাৎ সূর্যালোকের অভাবে। কারণ দিনের আকাশও অজস্র নক্ষত্রের আলোকে আলোকিত হয় এমনটিতো নয়। মহাবিশ্ব যদি স্থির এবং অপরিবর্তণশীল হত তাহলে পৃথিবীর যেকোন স্থান থেকে আমাদের দৃষ্টি কোন না কোন নক্ষত্রের উজ্জ্বল (যেই উজ্জ্বলতার জন্যও দুর্বল বল দায়ী)পৃষ্ঠে গিয়ে শেষ হত এবং সেজন্য আকাশ ২৪ ঘন্টাই আলোকিত থাকত (এক্ষেত্রে শুধু সূর্যালোকের জন্য নয়)।কাজেই রাতের কালো আকাশ আসলে মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং এর একটি প্রমাণস্বরূপ। পৃথিবীর আকাশসীমায় দুরবর্তী নক্ষত্রসমূহ থেকে আসা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায় কারণ মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে (অর্থাৎ স্হান স্বয়ং স্ফীত হচ্ছে)। ঠিক যেমন একটি রবারের শিটের উপর দুইটি স্হির বিন্দুর দূরত্ব বেড়ে যায় যদি শিটটিকে প্রসারিত করা হয়। বিন্দুদ্বয়ের মাঝে যদি একটি স্থির তরঙ্গ থাকে তাহলে এর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যও বেড়ে যাবে। তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য বাড়লে কম্পাঙ্ক কমে আর কম্পাঙ্ক কমলে শক্তি কমে এবং এটি আর আমাদের ভিসিবল রেঞ্জের তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ থাকেনা অর্থাৎ এটির সিংহভাগ আলো থেকে পরিবর্তিত হয়ে মহাজাগতিক রশ্মি এবং অন্যান্য তড়িৎ-চুম্বকীয় রশ্মিতে পরিণত হয়–যেগুলোকে আমরা দেখতে পাইনা। সেজন্য রাতের আকাশ নক্ষত্রপুঞ্জের আলোকে আলোকিত হয় না–দিনের আকাশও নয়।সূর্যালোকের উপস্হিতি আর অনুপস্হিতিই দিনের উজ্জ্বলতা আর রাতের অন্ধকারকে নির্ধারণে মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।

          • সংশপ্তক আগস্ট 23, 2012 at 2:44 পূর্বাহ্ন - Reply

            @তানভীর হানিফ,

            চমৎকার ব্যাখ্যার জন্য ধন্যবাদ। অন্যভাবে দেখলে, আসলে আমাদের জীবজগতও গভীরতম পর্যায়ে দূর্বল বল দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে যা কি না মহাবিশ্বেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। পার্থক্য শুধু এটাই যে, জটিলতার কারনে বর্তমান জীববিজ্ঞানের গবেষণা আনবিক পর্যায়ের পেছনে এখনও অতদূরে যেতে পারেনি যেভাবে জড় বিজ্ঞান এগিয়েছে। আপনার লেখা আমার পছন্দ হয়েছে।

  3. আল্লাচালাইনা আগস্ট 18, 2012 at 6:44 অপরাহ্ন - Reply

    আমি আপনার লেখার একজন একনিষ্ঠ ভক্ত, পড়েছি মোটামুটি আপনার সব লেখাই। এই লেখাটা আগে পড়েছিলাম খন্ডে খন্ডে, এইখানে পুরোটা একবারে পেয়ে গোগ্রাসে পড়ে নিলাম আবার। ফিজিক্সের চমতকার চমতকার বিষয়গুলো সম্পর্কে এওভাবেই লিখুন। আর গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করতে পারেন, বস্তুত একদম কর্ণারস্টোন কিছু গণিত ছাড়া পদার্থবিজ্ঞানকে প্রকাশ করা অনুচিতই একপ্রকারের! যাই হোক আপনার আলোকিত এইরকম প্রবন্ধ আরও পাবো এই আশায় থাকলাম। গভীর বাস্তবতা বিষয়ক লেখাগুলোকে সহজ করে অপেশাদারদের জন্য লেখা কঠিন, আপনার খাটা-খাটুনীর প্রতি জ্ঞাপন করছি কৃতজ্ঞতা।

    • তানভীর হানিফ আগস্ট 20, 2012 at 12:08 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আল্লাচালাইনা,
      লেখা পড়ে আপনার ভালো লেগেছে। এতেই আমার লেখা সার্থক। লক্ষ্য করেছি অন্যান্য জায়গার চাইতে মুক্তমনাতে বোদ্ধা এবং উৎসাহী পাঠকের সংখ্যা অনেক বেশী। সেজন্য এখানে শেখার মতন অনেক কিছুই আছে। আমি অবশ্যই ফিজিক্সের চমৎকার বিষয়গুলো নিয়ে লিখব। আশা করি আপনারাও আমাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবেন।

  4. অপার্থিব আগস্ট 18, 2012 at 10:28 পূর্বাহ্ন - Reply

    ধন্যবাদ ডঃ তানভির হানিফের এই লেখার জন্য। আর সবার মত আমিও খুবই আনন্দিত ও উৎসাহিত বোধ করছি গবেষণায় নিয়োজিত একজন তাত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীকে এই ফোরামের সদস্য হিসেবে পেয়ে। এখানে মাঝে মাঝে পদার্থবিজ্ঞান বা পদার্থবিজ্ঞানের দর্শন নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হয়। এই সব আলোচনা / বিতর্কে আপনার মত বিশেষজ্ঞেরা মূল্যবান অবদান রাখতে পারেন। কিছুদিন আগে হিগস বোসন নিয়ে ঝড় উঠার সময়ে অনেক পাঠক এটা নিয়ে জানতে খুব আগ্রহী হয়ে বিভিন্ন ফোরামে ঢুঁ দিয়ে এখানেই কিছুটা আগ্রহ মিটাতে পেরেছিলেন আমারঅভিজিতের এই দুটো লেখায়। ওই সময় আপনার মত এক্স্পার্টের লেখা পেলে ভাল হত। ইংরেজীতে যাকে বলে আমারা ঘোড়ার মুখ থেকে জানতে পারতাম হিগস কণা সম্পর্কে। যাই হোক আশা করছি এখন থেকে আপনার কাছ থেকে লেখা ও মন্তব্য পাব নিয়মিত। আপনি মুক্তমনার রেসিডেন্ট এক্সপার্ট অন ফিজিক্স হতে পারেন। আপনার এই লেখা বাংলায় লেখাতে অনেক প্রশংসার প্রাপ্য। এটা দুরূহ এক বিষয়। আপনি আকাশ চৌধুরীকে প্রতিমন্তব্যে যথার্থই বলেছেন যে জনপ্রিয় বিজ্ঞান অর্ধসত্য। কারণ বিজ্ঞানের অনেক জটিল বিষয়ের প্রকৃত অন্তর্জ্ঞান লাভ সেই বিষয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ধারণাসমূহের শৃংখলকে ধাপে ধাপে গাণিতিক ভাবে জানার মধ্যে নিহিত, যেটা এখানে সম্ভব নয়। হিগস বোসন বা দুর্বল বল এরকম একটি ধারণা। আপনার লেখা দীর্ঘ ঠিকই, তবে অনেক কিছু জানার আছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত গুলির আলোচনা একে আরো সমৃদ্ধ করেছে। আমি মনে করি মূল বিষয়ের সাথে প্রাসংগিক না হলেও এধরনের পার্শ আলোচনা লেখাকে আরো আগ্রহোদ্দীপক করে তোলে। অনেক জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বই বা প্রবন্ধে এটা করতে দেখা যায়। কাজেই আমি এ ব্যাপারে আকাশ চৌধুরীর সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। তবে আমিও মনে করি কিছু কিছু ধারণা বা শব্দের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দিলে ভাল হত। যেমন ক্যাবিবো রোটেশন। আর ফাইনম্যান চিত্র ব্যবহার করলেও বিষয়গুলো বুঝতে বা ভিজুয়ালাইজ করতে কিছুটা সুবিধা হত। আরেকটা কথা দুর্বল বল বা সবল বল না বলে ক্ষীণ বল বা তীব্র/সতেজ বল লিখলে ভাল শোনাত আমার মতে, তাতে “বল”এর দ্বিরুক্তি এড়ান যেত। আবারো ধন্যবাদ।

    • তানভীর হানিফ আগস্ট 18, 2012 at 2:57 অপরাহ্ন - Reply

      @অপার্থিব,

      আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। হিগস্ নিয়ে বিস্তৃত একটি লেখা অবশ্যই দেব–তবে, সেটি সমাপ্ত হবার পরেই। ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম এবং ক্যাবিবো রোটেশনের ব্যাখ্যা নিয়ে হয়ত দু’টি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ লেখা সম্ভব। সেটিও আমার পরিকল্পনার ভেতর আছে। প্রতিসাম্য এবং মহাকর্ষ নিয়ে আমার দু’টি সমাপ্ত লেখা আছে যদিও আমি সে বিষয়ে (মহাকর্ষ) এক্সপার্ট নই। পরবর্তী লেখা হিসেবে সেগুলো দেওয়া যায়।

      তবে আরেকটি বিষয় নিয়ে এই মুহুর্তে আমার আগ্রহ আছে। সেটি আপনার সাথে শেয়ার করছি। পুরো মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান এবং সে অর্থে সমস্ত বিজ্ঞানের (প্রাকৃতিক এবং জৈব উভয়ই) ভিত্তি সে সমস্ত মূলনীতি (ইউনিটারিটি, ক্লাস্টার ডিকম্পোজিশান, কজালিটি, স্ট্যাবিলিটি, পঁয়কারে ইনভ্যারিয়্যান্স ইত্যাদি) এবং বিশ্বাসের (মহাবিশ্ব ব্যাখ্যার যোগ্য–আইনস্টাইনের মতে যেটি একমাত্র অলৌকিক ঘটনা এবং যার ব্যাত্যয় অদ্যাবধি আমরা দেখিনি) ওপর দাড়িয়ে আছে সেগুলো নিয়ে কিছু লেখা যায় কিনা–সেটি নিয়ে ভাবছি।

  5. পৃথ্বী আগস্ট 17, 2012 at 8:37 অপরাহ্ন - Reply

    ফেসবুকে আপনার বিজ্ঞানের দর্শন নিয়ে নোটগুলো মুক্তমনায় বাংলায় দিতে পারেন। বিজ্ঞানের দর্শন ও প্রকৃতি নিয়ে অনেক ভুল-বিভ্রান্তি আছে, একজন বিজ্ঞান অনুশীলনকারী বিষয়গুলো খোলসা করলে খুব ভাল হবে।

  6. আকাশ চৌধুরী আগস্ট 17, 2012 at 8:03 অপরাহ্ন - Reply

    অত্যন্ত উঁচু মানের লেখা। কিছু সমালোচনা করছি, দয়া করে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

    লেখাটির টার্গেট গ্রুপ মনে হল পদার্থবিজ্ঞানীরা, সাধারণ পাঠকদের স্কেলে সুপাঠ্য নয়। লেখাটিকে আরো ভেঙে ভেঙে কয়েকবারে প্রকাশ করা যেত, সেক্ষেত্রে সাধারণ পাঠকদের সুবিধা হত। আর প্রথম প্যারাটিসহ কিছু কিছু প্যারার দৈর্ঘ্য ভীতি উদ্রেককারী। মূল বিষয়ের সাথে সাথে কিছু বিক্ষিপ্ত আলোচনা এসেছে যা ঠিক প্রাসঙ্গিক নয় (যেমন-পাউলির ব্যক্তিগত জীবন,চীনা এবং মার্কিন সংস্কৃতির পার্থক্য ইত্যাদি), লেখার গুরুগাম্ভীর্যও কমায় নি, বরংচ লেখাটিকে আরো দীর্ঘায়িত করেছে মাত্র। সামগ্রিকভাবে মনে হয়েছে, লেখাটি খসড়া পর্যায়েই ব্লগে চলে এসেছে, আরো পরিমার্জন এবং সরলীকরণের প্রয়োজন ছিল, যে কারণে কোন সুস্পষ্ট structure ধরা পড়ল না। দয়া করে মুক্তমনার বিবর্তন বিষয়ক লেখাগুলো একটু দেখতে পারেন (বিশেষত বন্যা আহমেদের), অনেক জটিল বিষয়কেও সাধারণ পাঠকের কাছে কীভাবে তুলে ধরতে হয় লেখাগুলো পড়লে বুঝবেন।

    আশা করি ভবিষ্যতেও আপনার লেখা পাব মুক্তমনায়, এবং নিজেকে সমৃদ্ধতর করতে পারবো।

    • তানভীর হানিফ আগস্ট 18, 2012 at 12:42 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আকাশ চৌধুরী,
      আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। একই লেখা নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকবর্গের বিভিন্নমাত্রিক আকাঙ্খা থাকে—সেটিকে সার্বিকভাবে পূর্ণ করা দুরূহ ব্যাপার। বিজ্ঞানের ভাষা গণিত। খুবই সূক্ষ্মভাবে বলতে গেলে পপুলার সাইন্সের একটা বিরাট অংশই অর্ধসত্য বা মিথ্যা–কারণ যে ভাষায় এটি কনভে করা হয়েছে–তা এর প্রকৃত অর্থ অনেকখানিই পরিবর্তণ করে দিয়েছে (এটি আমার লেখার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য) অথবা এর ভাষা যে না জানে তার কাছে এটি পৌঁছানো সোজাকথায় অসম্ভব–এটি আসলেই তার অক্ষমতা নয় বরং লেখকের সীমাবদ্ধতা। আর এই সীমাবদ্ধতাকে এড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয় কিন্ত এটি স্বপ্রণোদিতও নয়। আমি এখানে মূলত: ফিজিক্সের মতন ন্যাচারাল সাইন্সের কথাই বলেছি। আর সেজন্য গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার না করলেও বিষয়বস্তুর জটিলতা একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বাইরে কমানো আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। লেখাটি একটি বইয়ের স্কেলেটন বলতে পারেন যেটিকে উচ্চশক্তির পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ক টেক্সট-বুক সাপ্লিমেন্টারি হিসেবে প্রকাশের পরিকল্পনা আমার আছে।

      • আকাশ চৌধুরী আগস্ট 18, 2012 at 10:24 পূর্বাহ্ন - Reply

        @তানভীর হানিফ, পুরোপুরি একমত আপনার সাথে। আধুনিক বিজ্ঞান পুরোপুরিই উচ্চতর গণিতের উপরে দাঁড়িয়ে, তাই সাধারণ ভাষায় কোন গাণিতিক সত্যকে প্রকাশ করা কেবল কঠিনই নয়, বরংচ ক্ষেত্রবিশেষে misleading ও বটে।

        আর সেজন্য গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার না করলেও বিষয়বস্তুর জটিলতা একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বাইরে কমানো আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

        এর কারণ, আপনি প্রচলিত পপুলার সায়েন্সের মত analogy-based-explanation এ যান নি, চেষ্টা করেছেন মূল তত্ত্বের কাছাকাছি থাকতে। নি:সন্দেহে আপনার দৃষ্টিকোণ ব্যতিক্রমী এবং প্রশংসনীয়।

        আমার মনে হয়, আসুক না কিছু গাণিতিক সমীকরণ, লেখাটির জটিলতা বা বাড়লই কিছুটা, কিন্তু স্বচ্ছতা বাড়বে অনেকগুণ।

        আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

  7. রামগড়ুড়ের ছানা আগস্ট 17, 2012 at 1:24 অপরাহ্ন - Reply

    মুক্তমনায় আরেকজন ভালো মানের বিজ্ঞান লেখক পাওয়া গেলো মনে হচ্ছে। স্বাগতম (F) ।

  8. প্রদীপ দেব আগস্ট 17, 2012 at 6:26 পূর্বাহ্ন - Reply

    খুবই উঁচুমানের বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ। গাণিতিক সমীকরণ না থাকলেও আলোচ্য বিষয় স্বাভাবিক ভাবেই জটিল। এরকম একগুচ্ছ জটিল বিষয়কে এতটা সহজ করে লেখার ক্ষমতা লেখকের জ্ঞানের গভীরতারই পরিচয়। পাউলি, ফার্মির অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ খুবই জুৎসই। আমি খুবই আনন্দ ও চিন্তার খোরাক পেয়েছি প্রবন্ধটি পড়ে। তবে নন-ফিজিক্স ব্যাকগ্রাউন্ডের পাঠকদের কিছুটা সমস্যা হতে পারে।

    একদিন হঠাৎ স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে নাকি অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে তিনি ফটোগ্রাফিক প্লেটটিকে ডেভেলোপ করতে মনঃস্থ করলেন–যদিও ফসফরোসেন্ট দ্রব্যটি কখনই সূর্যালোকের সংস্পর্শ পায়নি। এবার শুরু হল তাঁর বিস্ময়ের পালা। তিনি দেখতে পেলেন যে ফটোগ্রাফিক প্লেটটির ওপর মাল্টিজ ক্রুশটির ছবি একেবারে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে!! একদিন হঠাৎ স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে নাকি অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে তিনি ফটোগ্রাফিক প্লেটটিকে ডেভেলোপ করতে মনঃস্থ করলেন–যদিও ফসফরোসেন্ট দ্রব্যটি কখনই সূর্যালোকের সংস্পর্শ পায়নি। এবার শুরু হল তাঁর বিস্ময়ের পালা। তিনি দেখতে পেলেন যে ফটোগ্রাফিক প্লেটটির ওপর মাল্টিজ ক্রুশটির ছবি একেবারে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে!!

    লাইনগুলো দু’বার এসেছে।

    • কাজী আহমদ পারভেজ আগস্ট 18, 2012 at 3:00 পূর্বাহ্ন - Reply

      @প্রদীপ দেব, ” নন-ফিজিক্স ব্যাকগ্রাউন্ডের পাঠকদের কিছুটা সমস্যা হতে পারে”
      হ্যাঁ ভাই, তা তো হয়েছেই। তবে যে কারনে এজাতীয় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ পড়ি, মুগ্ধ ও বিস্মিত হতে, তাতে কিন্তু বড় কোন সমস্যা হয়নি। লেখক ড. তানভীর হানিফ, আমার মত বিজ্ঞানের আম-পাঠককে এরকম একটা কঠিন বিষয় সাবলীল উপস্থাপনার মাধ্যমে কিছুটা হলেও বোঝালেন এবং মুগ্ধ ও বিস্মিত করলেন, এজন্য তাঁকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

  9. সৈকত চৌধুরী আগস্ট 16, 2012 at 10:29 অপরাহ্ন - Reply

    মুক্তমনায় স্বাগতম।

    দারুন লেখেছেন। (F)

  10. অভিজিৎ আগস্ট 16, 2012 at 9:44 অপরাহ্ন - Reply

    মুক্তমনায় স্বাগতম ড. তানভীর হানিফ। আপনার কাছ থেকে পদার্থবিজ্ঞানের উপর আরো অনেক লেখা আশা করছি। মুক্তমনায় বিবর্তন এবং জীববিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে খুব ভাল প্রবন্ধ আসে। সে তুলনায় পদার্থবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের উপর লেখা তেমন নয়। আপনার সক্রিয় অংশগ্রহণ আমাদের প্রত্যাশা বাড়াবে নিঃসন্দেহে।

    লেখার ব্যাপারে একটা পরামর্শ হল… এধরনের বড় বড় লেখার মাঝে ছবি দিতে পারেন। এতে লেখার সৌকর্য এবং গতিশীলতা বাড়ে। আর জটিল সমীকরণ ব্যাবহারের জন্য ল্যাটেক্স ব্যবহার করতে পারেন। আমাদের সাইট ল্যাটেক্স-এনাবল্ড। বেসিক টিউটোরিয়ালের জন্য এখানে দেখতে পারেন –

    http://quasirandomideas.wordpress.com/latex-into-wordpress/
    http://en.blog.wordpress.com/2007/02/17/math-for-the-masses/

    আপনার ‘জ্যোতিষশাস্ত্র যে অপবিজ্ঞান’ সেই লেখাটিও পরে কোন এক সময় প্রকাশ করে দিতে পারেন। মুক্তমনায় এ ধরণের লেখার চাহিদা আছে এমনিতেই।

    • তানভীর হানিফ আগস্ট 17, 2012 at 2:41 অপরাহ্ন - Reply

      @অভিজিৎ,

      আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। হিগস্ ক্ষেত্র নিয়ে একটা লেখা লিখছি। লেখাটা পুরোপুরি শেষ হবার পরই দেব। আমার খারাপ অভ্যাস হল বেশীরভাগ লেখাই অসমাপ্ত এবং এর অনেকগুলো একইসাথে সমান্তরালে লেখা। এর সাথে নিজস্ব গবেষণা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তবে সেটি হিগস্ সম্পর্কিত বিধায় অনেক ফ্রেশ আইডিয়া পপুলার লেখাতেও হয়ত সংযুক্ত করা যাবে।

      বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে আমি ল্যাটেক্সই ব্যবহার করি। স্বাভাবিকভাবেই পপুলার লেখাতে অদ্যাবধি তেমন গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করিনি। তবে যেকোন লেখাতেই চিত্র সংযোজন করা জরুরী।

মন্তব্য করুন