প্যারিডোলিয়া এবং প্রকৃতিতে ধর্মীয় নিদর্শন

By |2012-08-04T20:25:20+00:00আগস্ট 4, 2012|Categories: মনোবিজ্ঞান, যুক্তিবাদ|14 Comments

এই লেখাটি যারা পড়ছেন তাদের মধ্যে বোধকরি এমন একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি কোনো পুরোনো দেয়ালের মধ্যে মানুষের মুখাবয়ব আবিষ্কার করেন নি, কিংবা মেঘের দলার মাঝে ঘোড়ার ছবি দেখেন নি অথবা আধো অন্ধকারে কোনো অবয়ব দেখে ভুত দেখেছেন বলে চমকে ওঠেন নি। অনেকেই হয়তো নির্জন ঘরে ফিসফাস শব্দ শুনেছেন (সেখান থেকে বিশেষ বিশেষ শব্দার্থও বের করে ফেলেছেন) এবং ভয়ে আধমরা হয়ে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন সেটা বাতাসের শব্দ। কখনো কখনো টেলিফোনের রিংও শুনে থাকবেন যদিও ঘরে হয়তো কোনো টেলিফোনই নেই। সম্পুর্ণ বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত বিষয় থেকে অর্থপূর্ণ কোনো ইঙ্গিত খুঁজে নেয়ার এই প্রবণতার নামই হল প্যারিডোলিয়া (Pareidolia)।

Pareidolia শব্দটি দুটি গ্রীক শব্দ para (পরিবর্তিত, পাশাপাশি) এবং eidolon (ছবি, আকৃতি) নিয়ে গঠিত। এই বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে সাধারণ প্রভাব হচ্ছে বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত নকশার মধ্যে মানুষের মুখাবয়ব খুঁজে পাওয়া। নিচে কয়েকটি উদাহরন দেয়া হল:

উপরের প্রত্যেকটি জিনিসের মধ্যে মানব মুখের অবয়ব পাওয়া যায়

প্যারিডোলিয়া আত্মরক্ষার একটি কৌশল যা বিবর্তনের ধারায় মানুষের মধ্যে উৎসাহিত হয়েছে। মূলত জন্মলগ্ন থেকেই মানুষের মধ্যে অপর মানুষের মুখাবয়ব চিনে নেয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। একটি শিশুর জন্মের দুদিনের মধ্যেই সে অন্যান্য মানুষের বিভিন্ন মুখভঙ্গি শনাক্ত করা এবং সেগুলো অনুকরন করা শিখে ফেলে। শিশুর বয়স যখন সাতমাস হয় তখন সে একটি ভীতিপূর্ণ মুখভঙ্গী এবং একটি হাসিখুশী মুখভঙ্গীর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে এবং ভীতিপূর্ণ মুখভঙ্গীর প্রতি বেশী মনোযোগ দেয় যা তাকে বিপদ-আপদ থেকে সতর্ক থাকার অভ্যাস তৈরি করে দেয়। ধীরে ধীরে শিশুর সামাজিকীকরন ঘটে এবং শুধু মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু বুঝে ফেলার ক্ষমতা তৈরি হয়। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করার জন্য এটা অত্যন্ত জরুরী একটি বৈশিষ্ট্য। চেহারা সনাক্তকরন যথেষ্ট জটিল একটি প্রক্রিয়া এবং এই কাজে মস্তিষ্কের বিরাট একটি অংশ ব্যবহৃত হয়। ২০০৯ এর এক গবেষণা থেকে দেখা যায় মুখমন্ডলের সাথে মিল পাওয়া যায় এমন যে কোনো বস্তু মস্তিষ্কের কর্টেক্সে অত্যন্ত দ্রুত উদ্দীপনা তৈরি করে এবং বস্তুটিকে দ্রুত(অন্য অনুভূতি আসার আগেই ) মুখমন্ডল হিসেবে সনাক্ত করতে সহায়তা করে। এই কারনেই কয়েকটি বৃত্ত ও রেখায় সমন্বয়কে আমরা মানুষের চেহারা হিসেবে ধরে নিই। শুধু তাই নয়, কয়েকটি রেখার সমন্ধয়ে মানুষের অনেক রকম অভিব্যক্তি প্রকাশ করা সম্ভব যদিও বাস্তব চেহারার সাথে সেই সব রেখা সমষ্টির কোনো মিলই থাকে না। নিচের ছবি দুটি লক্ষনীয়।

তিনটি বৃত্ত ও একটি সরলরেখা দ্বারা মানুব মুখাবয়ব বোঝা যাচ্ছে।

কয়েকটি রেখা, বৃত্ত ও বিন্দুর সমন্বয়ে বিভিন্ন রকম মৌখিক অভিব্যক্তি প্রকাশ পাচ্ছে।

ধর্মে ব্যাবহার:
প্রায় প্রত্যেকটি বড় ধর্মই প্যারাডোলিয়ার মাধ্যম্যে অলৌকিকত্ব(!) প্রদর্শন করে থাকে। সাধারণ মানুষ প্রকৃত ব্যপারটি ধরতে না পেরে সেগুলোকে মিরাকল মনে করে থাকে। অথচ একটু সচেতন হলে দেখতে পেত প্রত্যেকটি ধর্মেরই এ ধরনের নিদর্শন রয়েছে। নিচে কিছু উদাহরণ দেয়া হল:

১. ইসলাম ধর্ম: আজকাল প্রায়শ:ই ফেসবুক বা ব্লগে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বস্তুর আরবীতে আল্লাহ (الله) লেখা দেখানো হয় এবং সেগুলোকে মিরাকল বলে প্রচার করা হয়। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, আরবী বর্ণগুলো বেশ সরল প্রকৃতির এবং আরবী ক্যালিগ্রাফী অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। যার ফলে একই বর্ণ বিভিন্ন আকৃতিতে লেখা যায়। এই কারনে কয়েকটি লাইন এবং লুপের মাধ্যমেই কোনো লেখা ফুটিয়ে তোলা যায়। নিচে কয়েকটি উদাহরন দেয়া হল:


মাঝে মধ্যে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়। যেমন নীচের ছবিটিকে জার্মানির একটি খামারের ছবি হিসেবে প্রচার করা হয় (যদিও সেই খামারের ঠিকানা কোথাও দেয়া হয় না) যেখানে আরবীতে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” লেখা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটি একজন মিশরীয় চিত্রশিল্পীর আঁকা একটি তৈলচিত্র।

২. খ্রীষ্ট ধর্ম: খ্রীষ্ট ধর্মে মীরাকল হিসেবে প্রায়ই কুমারী মেরি কিংবা যীশুর ক্রুশবিদ্ধ ছবি দেখানো হয়ে থাকে। নিচের কয়েকটি নমুনা দেখুন:

হিন্দু ধর্ম: হিন্দু ধর্মের ও’ম প্রতীকটি বিভিন্ন সময় সনাক্ত করা হয়েছে। যেমন:

২০০৭ সালে সিঙ্গাপুরে monkey tree phenomenon নামের একটি ঘটনা আলোচিত হয়ে যায়। হিন্দুধর্মাবলম্বীরা গাছের মধ্যে হনুমানসদৃশ অবয়ব আবিস্কার করেন এবং পরবর্তীকালে গাছটিকে পুঁজো করা শুরু হয়।

কিছু বিশেষ ঘটনা:

১৯৫৪ সালে কানাডিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাণী এলিজাবেথের ছবি সংবলিত একটি পাঁচ ডলারের নোট প্রকাশ করে। কিন্তু নোটটি বাজারে আসার পর থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অভিযোগ আসতে থাকে যে নোটটিতে রানীর চুলের একটা অংশে শয়তানের অবয়ব ফুটে আছে। আপত্তির মুখে এক পর্যায়ে ব্যাংকটি পাঁচ ডলারের বিলটির সবগুলো নোট নষ্ট করে ফেলে এবং নতুন ডিজাইনের নোট বাজারে ছাড়ে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিমান হামলায় সৃষ্ট ধোঁয়ায় অনেকেই শয়তানের অবয়ব খুঁজে পেয়েছিলেন।

এসব ছাড়াও প্রকৃতিতে প্যারিডোলিয়ার নানাবিধ উপকরন ছড়িয়ে আছে। পোস্ট আর ভারী না করে google image search এর লিংকটি দিয়ে দিচ্ছি। সবাই দেখে নিন।

তথ্যসূত্র:

A.L Bouhuys et al, Journal of Affective Disorders, 43, 1997, 213–223
http://en.wikipedia.org/wiki/Pareidolia
http://www.weird-encyclopedia.com/pareidolia.php

http://en.wikipedia.org/wiki/Face_perception
http://www.planetperplex.com/en/item/canada-5-dollars/
http://www.september11news.com/Mysteries1.htm
http://www.faithfreedom.org/Articles/sina/miracles_of_allah.htm

'সবার জন্য বিজ্ঞান' এই মটো মনে ধারন করে লিখি।

মন্তব্যসমূহ

  1. উড়ালচন্ডী আগস্ট 20, 2016 at 1:05 পূর্বাহ্ন - Reply

    Mango people এসব বুঝতে পারেনা এটা মেনে নেয়া যায় কিন্তু একজন ph d ধারী মানুষ যখন এসব কুসংস্কারের জালে বন্দী হয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমায় তখন তা ভাবলেই মেজাজটা গরম হয়ে যায় আর নাকে টয়লেটের গন্ধ লাগে , ওয়াক , ওয়াক , ছি – – – – –

  2. আসাদ আগস্ট 16, 2016 at 6:13 অপরাহ্ন - Reply

    হু বুঝলাম

  3. ছন্নছাড়া আগস্ট 5, 2012 at 11:29 পূর্বাহ্ন - Reply

    চমৎকার লেখা (Y) । কিন্তু ধর্মকারী দের বোঝায় কার সাধ্য আছে বলেন?কিন্তু তাই বলে আশা ছাড়বোনা……অনেকটা যুদ্ধ বাকী, কিন্তু সত্যের জয় একদিন হবেই……।

    এখনো আমার অনেকটা রাস্তা বাকী,
    তোমাকে বলছি সঙ্গে আসবে নাকি?

    • বেঙ্গলেনসিস জানুয়ারী 11, 2013 at 9:00 পূর্বাহ্ন - Reply

      @ছন্নছাড়া,
      সেই আশাতেই স্বপ্ন দেখে চলেছি।

  4. নিগ্রো আগস্ট 5, 2012 at 2:34 পূর্বাহ্ন - Reply

    pareidolia নিয়া অনেক কাহিনি শুনেছি আসলে এটি মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিফলন বৈ আর কিছুই নয় ।একটা কিছুর প্রতি দীর্ঘক্ষণ তাকালে ঐ প্রতিভম্বকে সে যে রুপ দিতে চাইবে সেই রুপুই প্রকাশ পাবে ।এবং তার সেই রুপুকার টিকে যাকে বুজিয়ে বলবে সেও একি রুপ দেকবে ।অনেক আঁকা বাঁকার পাশে আরও আঁকা বাঁকা থাকে যাকে বাদ দিয়ে সে নিজ মতো একটা ছিত্র অঙ্কন করে , কিন্তু বাস্তবে পুরু অঙ্কনটা একসাতে দেখলে কিছুই বুজা যাবেনা ।

    • বেঙ্গলেনসিস আগস্ট 5, 2012 at 9:12 পূর্বাহ্ন - Reply

      @নিগ্রো,
      আপনি যা বেশি বেশি ভাববেন, তাই দেখতে পাবেন।

  5. সৈকত চৌধুরী আগস্ট 5, 2012 at 12:16 পূর্বাহ্ন - Reply

    দারুন লেখেছেন। প্রয়োজন ছিল লেখাটার। Pareidolia নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ লেখার অভাব বোধ করছিলাম।

  6. জটিল বাক্য আগস্ট 5, 2012 at 12:00 পূর্বাহ্ন - Reply

    সম্পুর্ণ বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত বিষয় থেকে অর্থপূর্ণ কোনো ইঙ্গিত খুঁজে নেয়ার এই প্রবণতার নামই হল প্যারিডোলিয়া (Pareidolia)।

    এই টার্ম টা জানা ছিল না। চমতকার লেগেছে বিশ্লেষণ। এই সব চিত্রে মানুষ শুধু যা ভালবাসে সেই চিত্রেরই বর্ণনা দেন নানা রঙে। কিন্তু এর বাইরেও পরিচিত অনেক কিছুর চিত্রও দেখা যায়। আমি অনেক লাউ দেখেছি যেগুলো মানবদেহের বিভিন্ন অরগ্যান এর মতো। অনেকে আবার লাউ এর ভেতর স্রস্টার নাম লেখাও দেখেন। আমি কি দেখতে চাই এটার উপরই মনে হয় বিষয়টি নির্ভরশীল।
    ——————————————————————–

    • বেঙ্গলেনসিস আগস্ট 5, 2012 at 9:10 পূর্বাহ্ন - Reply

      @জটিল বাক্য,
      আপনি যা বেশি বেশি চিন্তা করবেন, তাই চোখের সামনে দেখার এবং কানে শোনার প্রবণতা বেড়ে যাবে। মূল লেখায় একটা প্যারা বাদ পড়ে গেছে।
      “যদিও জন্মলগ্ন থেকেই মৌখিক অভিব্যক্তি চিনে নেয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়, পরবর্তিতে এই বৈশিষ্ট্যটি অন্যান্য পরিচিত বস্তুর জন্যও প্রযোজ্য হয়। আমাদের দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনা এই বৈশিষ্ট্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে। যেসব বিষয়ে আমরা বেশি চিন্তা করি সেগুলো চোখে পড়ার হার বেড়ে যায়। যদিও প্যারাডোলিয়া প্রত্যেক মানুষের একটি স্বাভাবিক বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য তখাপি এই বৈশিষ্ট্য কখনো কখনো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বিশেষ করে কারো যদি ভুত, অতিপ্রাকৃত বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বাস থেকে থাকে। এসব থেকে তৈরি হতে পারে মানসিক সমস্যা।”

  7. শনিবারের চিঠি আগস্ট 4, 2012 at 10:50 অপরাহ্ন - Reply

    মানুষ বিজ্ঞানটা বোঝে না বলেই অজ্ঞানতাকে পুঁজি করে লাফালাফি করে। এদের বোধ করি বোধদয়ও হবে না কোনোকালে। তবে লেখাটা দুর্দান্ত- অসাধারণ, বিশ্লেষণে এবঙ উপস্থাপনায়।

    • বেঙ্গলেনসিস আগস্ট 5, 2012 at 9:08 পূর্বাহ্ন - Reply

      @শনিবারের চিঠি,
      আপনাকেও ধন্যবাদ। একটা প্যারা বাদ পড়ে গেছে। এডিট করার কোনো ব্যবস্থা দেখতে পাচ্ছি না। এখানে দিয়ে দিলাম।
      “যদিও জন্মলগ্ন থেকেই মৌখিক অভিব্যক্তি চিনে নেয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়, পরবর্তিতে এই বৈশিষ্ট্যটি অন্যান্য পরিচিত বস্তুর জন্যও প্রযোজ্য হয়। আমাদের দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনা এই বৈশিষ্ট্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে। যেসব বিষয়ে আমরা বেশি চিন্তা করি সেগুলো চোখে পড়ার হার বেড়ে যায়। যদিও প্যারাডোলিয়া প্রত্যেক মানুষের একটি স্বাভাবিক বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য তখাপি এই বৈশিষ্ট্য কখনো কখনো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বিশেষ করে কারো যদি ভুত, অতিপ্রাকৃত বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বাস থেকে থাকে। এসব থেকে তৈরি হতে পারে মানসিক সমস্যা।”

  8. সাদাচোখ আগস্ট 4, 2012 at 8:57 অপরাহ্ন - Reply

    লেখা চমৎকার হয়েছে।
    তবে এইটা নিয়ে চিৎকার করে কেন যেন কোন লাভ হয়না। আম পাবলিক গাছ, মেঘ, আর মাংসের মধ্যে সৃষ্টিকর্তারে খুঁজে আনন্দ পায়। ফেসবুকে এই ধরনের উৎপাত কবে যে বন্ধ হবে কে জানে? সচলায়তনে একটা মজার লেখা ছিল এটা নিয়ে। পড়ে দেখতে পারেন।

    লিংক– এসো নিজে করি ০২ – কিভাবে কুদরত এর প্রচার করবেন / How to advertise miracle

    • বেঙ্গলেনসিস আগস্ট 5, 2012 at 9:06 পূর্বাহ্ন - Reply

      @সাদাচোখ,

      সেইরকম একটা লেখা। শেয়ারের জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন