এক। উমা মেয়েটি কথাবার্তায় খুব চৌকশ, দেখতে সুন্দর ও হাসিখুশী। যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, সে সময় উমা একটি লিটল ম্যাগাজিন চালাতেন। সেই সুবাদে পরিচয়, বন্ধুত্ব। এখন লিটল ম্যাগটির নাম আর মনে নেই।

একদিন ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দূর্গা পুজার মেলায় উমাকে দেখা যায় এক যুবকের হাত ধরে ঘুরতে। সে যুবকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, আমার বন্ধু, পেশায় লেখক।

উমার লেখক বন্ধু চাপ দাড়িতে সুদর্শন। মনে হয়, দুজনেরই যখন লেখালেখির প্রতি এতো ঝোঁক, তাহলে ওদের হয়তো ভালোই মানাবে।

আটের দশকে ছাত্রাবস্থায় শাহবাগের পিজি হাসপাতাল (এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল) ঘেঁষে ‘সিনোরিটা’ নামক ডুপ্লেক্স দোকানে
চায়ের নিয়মিত আড্ডা ছিলো। পেশাগত জীবনে সেই স্মৃতি রোমন্থনে এক পড়ন্ত বিকালে সিনোরিটায় ঢুকতেই উমা আর তার লেখক বন্ধুর সঙ্গে আবারো দেখা। দুজনকেই খুব বিষন্ন, ঝড়ো বিদ্ধস্ত মনে হয়।

কথা না বাড়িয়ে দ্রুত চা শেষ করে উঠে পড়া হয়। এখন ওদের বোধহয় একান্ত কিছু সময় চাই।

উমার লিটল ম্যাগ-এরই কেউ হয়তো বলে থাকবেন পুরনো ঢাকায় একটি কলেজে বাংলার শিক্ষক হিসেবে যোগ হিসেবে ওর যোগদানের খবর। পরিবারের অমতে সেই লেখক বন্ধুকে বিয়ে করে ভাড়া বাসায় উঠে যাওয়ার খবরও জানা হয়। এবং নিশ্চিতভাবেই ওর লিটল ম্যাগটি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে, সে খবরও মিলে যায়।

দুই। এর কয়েক বছর পরে বসুন্ধরা সিটির শপিং মলের সামনে হঠাৎ আবার উমার সঙ্গে দেখা। ওকে কেমন যেন ম্লান আর বিষন্ন বলে মনে হয়। মনে পড়ে যায়, একটি বাসি গোলাপের উপমা। কোনো এক গল্পকথায় উপমাটি উমাই একসময় ব্যবহার করেছিলেন। কুশল জিজ্ঞাসায় ওর চোখের কোনে বুঝি জ্বলে ওঠে এক বিন্দু অশ্রু কণা।

কিছুটা অনুনয়ের পর অল্প সময়ের জন্য উমা বসুন্ধরা সিটির টপ ফ্লোরের কফি শপে বসতে রাজি হয়। ধূমায়িত কাপ শীতল থেকে শীতলতর হতে থাকে। উমা একদম নিশ্চুপ। তার মুখে বাক্য সরে না। …

এক সময় নিরবতা ভেঙে নিজেই অনর্গল বলতে শুরু করেন তার প্রেম, বিয়ে, সংসারের কথা। আরেক কাপ হট কফির অর্ডার দিলে উমা বলে চলেন, বাবা – মার অমতে বিয়ে করে নিজের সংসারে এসে বুঝলাম, আমার লেখক স্বামীর নির্দিষ্ট আয় নেই। পত্র – পত্রিকায় লেখালেখি করে দু’চার হাজার টাকার অনিয়মিত রোজগারই ওর ভরসা। অথচ বিয়ের আগে আমাকে বলেছিলো, সে নাকি একটি বিখ্যাত দৈনিকে চাকরী করে! চক্ষুলজ্জায় সে সময় আমি ওর বেতনও জানতে চাই নি। এখন সব জেনেও আমি সব কিছু মেনে নিয়েছি, কারণ আমার তো একটি চাকরী আছে। বেতনও খুব খারাপ নয়। … কিন্তু বিয়ের পর পরই শুরু হয় লেখক স্বামীর নির্যাতন। ও কোনো রকম নিরোধক ছাড়াই আমাকে আদর করতো। গর্ভবতী হলে আমার বাচ্চাকে নষ্ট করতে চাপ দিতে শুরু করে। খুব মানসিক চাপের মধ্যে প্রথম বাচ্চাটিকে নষ্ট করে ফেলতে বাধ্য হই। পরের বার আবারো একই রকম চাপ আসলে আমি রুখে দাঁড়াই। আর নয়, এবার আমি বাচ্চাটাকে বাঁচাবোই।…

তো এর পর আমার লেখক স্বামী শুরু করে আরেক অত্যাচার। কথায় কথায় যখন তখন আমাকে শুনিয়ে দেয়, তোমাকে বিয়ে করে কী পেলাম বলতো? পারিবারিকভাবে বিয়ে হলে আমি কতো টাকা যৌতুক পেতাম! আর কিছু না হোক, কিছু না কিছু সম্পত্তি তো পেতামই। …

অত্যাচারের মাত্রা আরো বাড়াতেই যেনো আমাকে গর্ভবতী অবস্থায় একা বাসায় ফেলে রেখে ও বাইরে রাত কাটাতে শুরু করলো। প্রায়ই মোবাইলে ফোন করলে দেখি ফোন বন্ধ। আবার হঠাৎ হঠাৎ নিজেই ফোন করে হয়তো বলবে, এই শোনো, আমি এখন ফরিদপুর। হঠাৎ একটা সাহিত্য সম্মেলনে চলে এসেছি। এরা আমায় এমন করে ধরেছে যে…। আমার ফিরতে একটু দেরী হতে পারে।…

তিন। বসুন্ধরা সিটি পশ কফি শপ, চারপাশের ঝাঁ চকচকে পরিবেশ, সব কিছু ভুলে গিয়ে উমা এসব কথা বলতে বলতে চাপা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এক সময় ওড়না চাপা দিয়ে নিজেই কান্না সামলে নেন।

খানিক বিরতির পর ‌’বাবা-মার কাছে ফিরলে হয় না?’ এমন প্রশ্নে উমা বলেন, এখন পুরনো ঢাকায় বাবা-মা’র বাড়িতেই উঠেছি। কারণ বাচ্চাটার জন্যই আমাকে বেঁচে থাকতে হবে; এ সময় আমারও বেশ খানিকটা বাড়তি যত্ন প্রয়োজন।

বাড়ির সবাই সবকিছু মেনে নিয়েছে কি না জানতে চাইলে উমার অকপট জবাব, দেখুন বিপ্লব, বাবা-মা আসলে কখনোই ছেলেমেয়েদের ফেলে দেন না। আমি মা হতে চলেছি, তাই এখন আমি এই সব খুব ভাল বুঝি। শুধু আমার সব কথা শুনে বুড়ি ঠাকুমা একটাই কথা বলেছেন, উমা রে, তুই দেহি অখন গর্তে পড়ছোস!….

চার। আরো বেশ কিছুদিন পরে সাবেক কর্মস্থল শীর্ষ স্থানীয় দৈনিকটির অফিস লাগোয়া ঝুপড়ি দোকানে চা খেতে খেতে আলাপ হয় পত্রিকাটির সাহিত্য পাতার কয়েকজন সাংবাদিক-লেখকের সঙ্গে। এক সময় তাদের আলাপচারিতায় নিছকই শ্রোতার ভূমিকা নিতে হয়। কারণ বিষয়টি একান্তই তাদেরই।

একজন বললেন, তার সদ্যজাত শিশুর নাম রাখবেন, চর্যা। আরেকজন বলে উঠলেন, আরে! এই নাম তো রাখা হয়ে গেছে। অমুক লেখক (উমার স্বামী) তার মেয়ের নাম রেখেছে, চর্যা।

এইভাবে অকস্মাৎ জানা হয়ে যায় উমার কন্যা সন্তানের কাহিনী। এমনকি শিশুটির নামও।

পাঁচ। এরপর অনেকদিন উমার আর কোনো খবর নেই। এখনো যেন চোখ বুজলেই দেখা যায়, লিটল ম্যাগ করা আগের সেই হাসিখুশী মেয়েটির মুখ। এখনই হয়তো কাছে এসে বেশ খানিকটা অধিকার নিয়েই বলে বসবেন, এই বিপ্লব, এই…চটপট কিছু চাঁদা ছাড়ুন তো! আমাদের পত্রিকা বেরুবে শিগগিরই।…

লেখাটির ইতি এখানেই শেষ করা যেতো। কারণ উমা কাহিনীর মোদ্দা অংশ বলা হয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ আবারো একদিন বাসের ভেতর উমার সঙ্গে দেখা। এক সকালে ধানমণ্ডিগামী বাসে উঠতেই একেবারে পেছনের সারি থেকে উমা সব বাস যাত্রীর মনোযোগ কেড়ে, সব কিছু উপেক্ষা করে আমাকে ডেকে বসেন, বিপ্লব, এই বিপ্লব, এই যে, এ দিকে…।

ওর পাশের ফাঁকা সিটে বসে পড়ে মনে মনে চমকে যেতে হয়। একি চেহারা হয়েছে ওর! হাড্ডিসার, গর্তের কোটরে ঢুকে যাওয়া চোখ। চোখের দৃষ্টি প্রায় নিভন্ত ও ম্লান। পরনের সস্তা সালোয়ার-কামিজটিও ইস্ত্রি করা হয়নি বহুকাল। সব মিলিয়ে ঠিক যেনো একটি ঝরা গোলাপ। এর শুকিয়ে যাওয়া ফিকে সবুজ পাপড়ি বিহীন কুসুমটি এখন জানান দিচ্ছে, একদা সত্যিই অস্তিত্ব ছিলো হে সৌরভমাখা একটি ঐশ্বর্যময় ফুল।

ভীরু গলায় এক নিঃশ্বাসে উমা নিজের খবর জানিয়ে বলেন, বিপ্লব, আমি এখনো মা – বাবার সঙ্গে আছি। আমার মেয়ের বয়স এবার তিন বছর হলো। সামনের বছর ওকে স্কুলের প্লে গ্রুপে দেবো ভাবছি। আমার মা-ই ওর সব দেখাশোনা করেন। আমি মন দিয়ে কলেজ মাস্টারি করছি। আমার বন্ধু – বান্ধবের সম্পাদনায় এবার বই মেলায় একটি সম্পাদিত ছোটগল্পের বই বেরুচ্ছে। সেখানে তারা আমার একটি গল্পও রেখেছে। বইটি হাতে পেলে আপনাকে এক কপি পাঠাবো। অবশ্যই আমার লেখাটি পড়ে মতামত জানাবেন কিন্তু। …

উমা তার মোবাইল ফোন থেকে বেছে বেছে চর্যা নামের কন্যা শিশুটির নানান ভঙ্গিমার আদুরে সব ছবি দেখান।

‘আর লেখক স্বামী প্রবর?’ আকস্মিক এই বেয়াড়া প্রশ্নেও উমা বিব্রত হন না। ‘ও আগের মতোই আছে, লিখে প্রচুর নাম কামাচ্ছে; বোধহয় ভালোই আছে’ এইটুকু বলে সে পাল্টা প্রশ্ন করেন, কেনো, আপনার সঙ্গে দেখা হয় না? একই তো অফিস!

স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, মাঝে মাঝে সুদর্শন লেখকের সঙ্গে দেখা হয় বৈকি, কথা বলার আগ্রহ না থাকলেও এটা-সেটা কুশল জানতে হয়, সমাজ বলে কথা।…দাড়ি-গোঁফে তার যীশু খ্রিষ্টের মতো নিস্পাপ, জ্যোতির্ময় চেহারা ও সেই ভুবন ভোলানো বিখ্যাত হাসি প্রতিবারই একটি প্রেম, একটি ভ্রুণ এবং একটি নারী মনের নীরব খুনের উপাখ্যান মনে করিয়ে দেয়। …লেখকের সামনে সহজে সহজ হওয়া যায় না। তখন এটা-সেটা বলে সামনে থেকে সরে পড়তে হয়।
_____

পুনশ্চ: ক। এই লেখার সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র বাস্তব। বোধগম্য কারণে বন্ধু মেয়েটির আসল নামের বদলে ‘উমা’ ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে। খ।
এটি একটি পুনর্লিখিত লেখা; এর আগে খসড়া লেখাটি অনত্র প্রকাশিত হয়েছিলো। গ। বছর দশেক আগে শাহবাগের স্মৃতিময় ‘সিনোরিটা’ নামক ডুপ্লেক্স চায়ের দোকানটি উঠে গেছে। এখন সেখানে আলো ঝলমলে একটি বিশালাকৃতির ফার্মেসী।
______
ছবি: মডেল ফটো, প্রনব ঘোষ, ফ্লিকার।