লিখেছেন: তাপস শর্মা

সতর্কীকরণ:
এই পোস্টের যাবতীয় বিষয় একান্তই ব্যাক্তিগত অনুভূতির ফসল!ধর্ম কিংবা যাবতীয় প্রথার বিরুদ্ধাচারণ থাকলেও এটাকে সরলীকরণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা আমার ব্যক্তিগত অনুভূতির বাইরে যারা ধর্ম এবং তাঁর সার্থকতা নিয়ে চর্চা করেন এদের প্রতি বিন্দুমাত্রও বিদ্বেষ এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। ব্যাক্তিগত ভাবে যাদের প্রসঙ্গ এসেছে সেগুলি যেভাবে অনুভব করেছি তাই এই লেখায় বর্ণিত হয়েছে….
————————–

শাশ্বত সত্য বলে একটা কথা আছে। সত্যের পরাকাষ্ঠা হিসেবে অনেক সময় এঁকে সুন্দরভাবে এঁকে দেওয়া হয় ভুয়া এবং জাল জিনিষের উপরে। ধর্ম, জাত প্রথা ইত্যাদির প্রসঙ্গে যত চুপ থাকা যায় ততই মঙ্গল, কেননা একে নিয়ে কথা বলাই মানে হল কোন অশনি সংকেত, অনেকটা ছেলেবেলায় আপত্তিকর কোনকিছু করে ফেলার মত। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচিত্রসব মানুষ এর সঙ্গে সাক্ষাত এর ফলে আমার ধর্মাভিজ্ঞতাও বিচিত্র ধরণের। এমন একটা সোসাইটি গড়ে উঠেছে যেখানে জাত তো পরে আসবে আগে মানুষের খাবার দেখেও মানুষকে ঘৃণা করা হয়। যেখানে একটা হিন্দু শিশুকে শুনতে হয় – ছিঃ ওরা মুসলমান, ওরা গরু খায়, ওদের সাথে মিশবি তুই, জঘন্য? আবার একটা মুসলিম সন্তানকে শুনতে হয় – ওরা কাফের এর জাত। শুয়োর খায় ওরা, ওদের সাথে মেশা হারাম! এগুলি যারযার ধর্মের কাছে শাশ্বত সত্য!

অনেক কথা আছে যেগুলি আদতে বলতে গেলেও না বলাই থেকে যায়। কখনো কখনো ভাবি আসলেই আমি কতটুকু সভ্য? কারণ ঐ সভ্যতার আড়ালে আমার সত্যটা ঢাকা পড়ে গেছে হয়তো। গুজরাট দাঙ্গা হয়ে যাওয়ার পর তাই হয়তো এইসব সত্যবাদী সত্তাধারীদের বলতে শুনি – দোষ তো আর কারও একার নয়? তখন পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এইসব স্বঘোষিত এবং সমাজপালিত সভ্যতার দোসরদের বলতে পারিনা যে, একটা ধারালো ব্লেড গলায় নিয়ে খেলা করেন তো দেখি?

আস্তিকতা কিংবা নাস্তিকতা – এই দুইটা জিনিষ না হয় পরে আসবে। জীবনে চলার ক্ষেত্রে সামান্য বোধ এবং জ্ঞানটুকু যখন লোপ পায় ধর্মের খপ্পরে তখন আর বলার মতো কিছুই থাকেনা। চরম ধার্মিক এবং জাতপাতে বিশ্বাসী মানুষগুলিই সমাজের হায়নাদের আরও বেশী করে মদত দিয়ে যাচ্ছে সেই অনাদিকাল থাকেই, সেটা প্রত্যক্ষ না হোক পরোক্ষভাবে তো বটেই। মন্দির মসজিদে গিয়ে সকাল না হতেই হা’ঈশ্বর বলে মাথা লুটায় অথচ ভ্রান্তি বিলাসে এদের তুলনা নেই! আসলে একটা বিশাল সংখ্যক সাধারণ মানুষ এর কাধে দোষ চাপিয়ে লাভ নেই যদিও। ব্যাপারটা অনেকটাই ধাঁচে আইসক্রিম বানানোর মতো। একটা রুটিন এর জীবনে অভ্যস্ত ম্যাঙ্গো পিপল নিজের বোধশক্তি নিয়ে বেশী নাড়াচাড়া করতে পছন্দ করেন না, কিংবা বলা চলে সেই ধাঁচ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাও করেন না। এবং এদের কারণেই ধর্ম ব্যবসার অনেক রমরমা। গঙ্গার মৃত আবর্জনার স্তুপে ভেসে যাওয়া জল এরা পান করে নেয় ঈশ্বরের ভক্তিবলে কিংবা কোন পীর এর দরগার তেলে ভেজা ধাগা বেধে রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করেন। সবটাই চালিয়ে দেওয়া হয় পরম্পরা ও বিশ্বাসের নামে। আর সেই আস্থার রক্ষক হলেন দ্বীন এর পথে চলা হাজারো ম্যাঙ্গো পিপল। আসলে কারো বিশ্বাস এর উপর কথা বলার অভিপ্রায় আমার নেই। ব্যাপারটা হল অন্ধত্বের এবং সেই অন্ধত্বের হাত ধরেই জন্ম নেয় সংকীর্ণতা। এবং সেই সংকীর্ণতাকেই আমার ভয়!

ঈশ্বরের সত্তায় বিশ্বাসীদের একটা বিশাল ব্যাধির নাম হল – মুক্তধারায় ঈশ্বর স্মরণ। সামান্য শিক্ষার অধিকারী কোন মানুষ, কিংবা তথাকথিত ইলিটারেট মানুষ তো দূরের কথা অনেক বড় বড় পদাধিকারী ব্যাক্তিকেও ‘যুক্তি’ নামে কোন কিছুকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে দেখেছি। একটা উদাহারণ দিচ্ছিঃ ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই ঈশ্বরের অপার মহিমায় নাকি এই দুনিয়া চলে, ইনফেক্ট ঐ শক্তিমান বস্তুটির ( ইয়ে মানে ঈশ্বর ) অনুমতি এবং ইচ্ছে ব্যাতিরেক নাকি এই দুনিয়ায় কিছুই হচ্ছেনা বা হতে পারেনা, তার জন্যই সব চলছে। এমন কি পৃথিবীও ঘুরছে, আমরা ঘুরছি। — এই বিশ্বাসটা প্রায় সব ধর্মের ব্যাখ্যাতেই প্রায় একই রকম। সব পান্ডারা তাদের ধর্মের প্রভুকে ঐ চালকের আসনে বসিয়ে থাকেন। গ্যালিলিও ব্যাটাকেও শেষ পর্যন্ত বলতে হয়েছিল – হ, পিথিমীর চারদিকে সূর্যিমামা ঘুরে! অনেক সময় কথা বলতে না চাইলেও বৃথা তর্কে জড়িয়ে যাই। এমনই এক উচ্চপদস্থ কর্তার সাথে কথা হচ্ছিল, উনি আবার ইন্টেলেকচুয়ালও বটে। আমাদের এখানে একটা সংস্থা আছে – ‘প্রজাপতি ব্রম্মকুমারী’ বলে, সেখানে ঈশ্বরের পায়ের তলায় গিয়ে জ্ঞানচর্চার স্বরূপ এবং আধ্যাত্মিক্তার পথে উত্তরণ শেখানো হয়। উনি সেখানকার কত্তাব্যাক্তি। ভয়ানকভাবে ‘হিন্দু’ তিনি। তিনি আমাকে একবার বাগে পেয়ে বেদ থেকে শুরু করে ভগাবান মণু অবধি আধ্যাত্মজ্ঞান বাটলেন। সবশেষে ঐ একই বিলাপ – সবার উপর ঈশ্বর সইত্য, তাঁহার উপর নাই।
শুনেছিলাম খুব মনযোগ দিয়ে উনার কথা। পেট ফেটে হাসি আসছিল, তবুও কোন রকমে আটকে রেখে শেষে উনাকে প্রশ্ন করলাম – আপনি চার্লস ডারউইন এর নাম শুনেছেন?
উনি মহাবিরক্ত হয়ে বললেন – এটা কেমন শিশু সুলভ প্রশ্ন। উনাকে কে না জানেন।
আমি বললাম – তাহলে ন্যাচারাল সিলেকশন নিয়েও আপনার ভালো আইডিয়া আছে নিশ্চয়ই।
জবাবে উনি – ডারউইন দাদুর পীর ( ইয়ে মানে উনি যাজক ছিলেন তো ) বাবার ইতিহাস থেকে শুরু করে বাপ কক্তৃক বিতাড়িত ডারউইন এর ইতিহাস এবং ন্যাচালাল সিলেকশন নিয়ে উনার গবেষণার একটা লম্বা ফিরিস্তি দিলেন। – সত্যি কথা বলতে আমিও এত ভালো জানতাম না। উনাকে বললাম – তাহলে আমি তা মানেন ডারউইন যা বলেছেন?
উনার উত্তর অনেকটা এই রকম – হে ছোকরা, বিজ্ঞান বিজ্ঞানের জায়গায় ঠিক আছে। ডারউইন ভালোই বলেছেন কিন্তু শেষ কথা এক কথা, ঈশ্বরের বিশ্বাস হল সর্ব সত্য। যদি ঈশ্বরই না থাকতেন তাহলে তুমি আর আমি কোত্থেকে আসতাম? আর ডারউইনইবা কোথায় থেকে জন্ম নিতেন।

-লে হালুয়া! আমি আর উনাকে কিছুই বলি নাই। কিছু বলার ভাষা আমার কাছে ছিল না। কেননা কি করে মানুষ জন্ম নেয়, আমি আর উনি যে কি করে জন্ম নিয়েছি আর ডারউইন এর জন্ম যে কি করে হয়েছে, তার পেছনে ‘কি কি করা’ হয় – এগুলি আর উনাকে বলার কোন ইচ্ছে আমার ছিল না।

আস্তিকদের প্রতি আমার কোন বিদ্বেষ নেই। ততক্ষণ নেই যতক্ষণনা সেটা আমার মাথা ব্যাথার কারণ হয় কিংবা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়। যখন আমার মাথা ব্যাথার কারণ হয় তখন আমি সামান্য জঙ্গিপনা করে থাকি। এবার সে যেই হোক না কেন, আমার বাপ হলেও উনার নিস্তার নাই। এই রকমই ঘটনা হল ঐ ঈশ্বর স্মরণ এর ব্যাপার। মন্দিরে কিংবা মহল্লায় অথবা মসজিদে ইয়া সাইজের শব্দ যন্ত্র লাগিয়ে ঈশ্বরকে ডাকা, কীর্তন করা কিংবা ওয়াজ – মেজেফিল এর আয়োজন করা আমার কাছে মহাবিরক্তির বিষয়। কারোর পড়ার ডিস্টার্ব করা, কারোর স্বাস্থের ক্ষতি করা, কারোর দৈনিক জীবন যাপনের পথে আঘাত হানা – ঈশ্বর স্মরণ করতে গিয়ে এই অধিকার তাদের কে দিয়েছে?
… এমন কিছু আমার মাথা ব্যাথার কারণ হলে আমি নিজের পন্থা ইউজ করি। হালের একটা ঘটনা বলছি –

সারাদিন ৩৫-৩৮ ডিগ্রী টেম্পারেচারে থাকলে মানুষের টেম্পার কতটা গরম হয়? সেদিন আমার মেজাজ ভয়ানক খিটখিটে হয়ে ছিল। আর এর উপর যদি কোন মাছি মাথার উপর ভ্যান ভ্যান করে তো? – সেটাই হয়েছে। আমার পাড়ায় আজ শ্রীমান পুলিন বিহারীর বাড়িতে হরিনাম সংকীর্তন। আর যায় কই! উনি দুইটা ইয়া সাইজের মাইক লাগাইয়া জনগণকে ভগবানের লেজের তলে টানার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। বিকট শব্দে বাজছে – তুমি মা জগতের উদ্ধারিনী মা, ইত্যাদি… মেজাজ এর পুরাই ফালুদা। কি করব ভাবছিলাম। এরপর আমার সাউন্ড সিস্টেমের ফুল ভলিউম বাড়িয়ে গান চালিয়ে দিলাম – ‘ক্রিপ্টিক ফেইট’ এর : “রক্ত গরম। ইচ্ছে করে তোরে ধরে ঠান্ডা মাথায় হাসি মুখে গলা টিপে হত্যা করি” : পুরাই ধাতব….. এইবার আমার আশেপাশের সবাই শুনছিল ভয়ানক জ্যামিং … আহ! কি শান্তি। আর আমি এক গেলাস কফি নিয়া দুলতেই থাকলাম…

একটা ব্যাপার আমি খুব লক্ষ্য করেছি যে, আস্তিকরা নাস্তিকদের সেই অর্থে সহ্য করতে পারেনা। একবারে সত্যি কথা বললে আমার মাকেও যদি আমি খাঁটি আস্তিক বলে ধরে থাকি, তাহলে বলতে হয় এক অর্থে তিনিও তাঁর সন্তানকে সহ্য করতে পারেন না। আমার গরুর মাংস খাওয়ার কিসসা শুনে উনি আমার সাথে কথা বলেননি বহুদিন। কেন? একটা খাবারইতো খেয়েছি, জাত গেল কোত্থেকে আমার? কি করে আমার ধর্ম বিনাশ হল? ঘটনা হল, দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা পরম্পরাকে এঁরা এমনভাবে আঁকড়ে ধরে আছেন যে অন্য কোন কিছুই এঁদের কাছে ধোঁয়াশায় পরিপূর্ণ হয়। কিন্তু সভ্যতা বিবর্তিত হতে হতে আজ এখানে এসে পৌঁছেছে, সব কিছুই সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। সুতরাং পরম্পরাও পরিবর্তিত হতে বাধ্য! কিন্তু তা ঠিক সেই মাত্রায় হচ্ছেনা, এটাই ত্রুটি। যেমন আমার গ্রামের বাড়িতে এখনো কোন শুভ অনুষ্ঠানের দিনে পাড়ার বুড়ো মুরুব্বি মানুষেরা পর্যন্ত আমাকে ছোট কর্তা বলে ( ব্রাহ্মণ বলে কথা ! ) গড় হয়ে প্রণাম করতে আসেন। ভীষণ লজ্জা ও সংকোচ হয়! এটা কিসের পরম্পরা?

আমার অভিজ্ঞতায় নাস্তিকদের আমি দেখিনি যে কোন আস্তিককে ঘৃণা করতে কিংবা বিনা কারণে তার সাথে কোন বিবাদে যেতে। কিন্তু নাস্তিকদের প্রতি আস্তিদের অনেক ধরণের মনোভাব আমি দেখেছি। এঁরা ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’ মতে বিশ্বাসী হলেও নাস্তিকদের কথায় তাদের চালচলনে বিশেষ ক্ষিপ্তও হয়ে থাকেন। কেন ভাই নাস্তিকদের ওদের মতো থাকতে দিন না, সমস্যা কোথায়? আবার অনেক সময় আস্তিকরা নাস্তিকদের লাইনে আসুন বলে, দ্বীনের পথে আনার চেষ্টাও দিয়ে থাকেন। … আবার অনেক সময় যা জানেনা যা বুঝেনা যা নিয়ে মানুষের বিন্দুমাত্রও আইডিয়া নাই তা নিয়া যখন মানুষ খোঁচা মারে তখনও বিরক্ত লাগে। ঈশ্বরতত্ব প্রচার ইত্যাদি… কিন্তু তাঁর জানাটাও স্পষ্ট হওয়া চাই। তা না করে ঠ্যাংর ট্যাংর করলে মাথা আউলা হয় না…!! এভাবেও ধর্ম বিপ্লব সংগঠিত হয়।
মহান চন্দ্রবিন্দু লিখে গেছেন – “খোঁচা মারো ঠেলা দাও এই জরদগবে, পাঁজিতে লেখা আছে আজ বিপ্লব হবে।”

সমস্যা কখনোই ঈশ্বরে বিশ্বাস বা আস্তিকতা নিয়ে হয়না। সমস্যাটা হয় অন্ধভক্তি ও নিরাসক্তি নিয়ে। ধর্ম,জাত – কেন্দ্রিক যত বিপর্যয় হয়ে গেছে এর মূলে ধর্মীয় মৌলবাদ দায়ী হলেও মূল ভিত্তি কিন্তু ধর্মাচার! এর মানে আমি এই সরলীকরণ করছি না যে ধার্মিক মাত্রই ধর্মীয় মৌলবাদী। কিন্তু সব ঘটনার একটা সাধারণ সম্পৃক্ততা হল – ধার্মিকরা ধর্মের নামে যেকোন কিছু করেই প্রায়ই পার পেয়ে যান। অনেক ক্ষেত্রেই ধার্মিকরা প্রচুর ভুল এবং বিশ্রী কাজে সায় দিয়ে থাকেন, সেটা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ দুই প্রকারই হতে পারে। আমার জাত ভাইরেরা অমুকদিন ঐ ইয়েদের ক্ষতি করে এলো, আর আমি ভালো মুমিন সেজে চুপ মেরে গেলাম এবং তাদের কাজে গর্ববোধ করলাম – এটাই এক ধরণের সমর্থন।

যদিও বিচিত্র ধর্মের বিচিত্রগুণ আমি দেখেছি। একান্তই ব্যাক্তিগত অবজারবেশন – পুরুষের ধর্মাচার অনেকটা উন্মুক্ত হয়ে থাকে। কিন্তু নারীরা পুরুষদের চেয়ে অতিমাত্রায় ধার্মিক হয়ে থাকেন। ওদের প্রকাশটা নীরব, কিন্তু তীক্ষ্ণ। একটা ঘটনা শেয়ার করছি-

একদিন সন্ধ্যার পর দেখি বাড়িতে কিসের সব তোড়ঝোড় চলছে। ঘটনা কি আমার কাকিমা’কে জিজ্ঞাসা করতেই চোখ কপালে তুলে বলল – কি’রে তুই? আজ বাড়িতে সন্ধ্যার পর ‘নন্দ নারায়ণ’ (ইয়ে মানে উনি দেবতা বিশেষ) এর কাছে ভোগ চড়ানো হবে তাও জানিস না। আমার কাকিমণি আমার ভগবানের প্রতি অজ্ঞতা নিয়ে আমাকে উঠতে বসতে নানা জ্ঞান ও তিরস্কার করে থাকেন। তাই আমি কথা না বাড়িয়ে কাচুমাচু হয়ে কেটে পড়লাম। এসে দেখি আমার মা’ও বিজি। এরপর আর কি সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হল ভগবানের লেজ টানাটানির আসর, ভাগ্যিস মাইক সিস্টেম নেই, নইলে……। তবুও মোটামোটি মাথায় যন্ত্রণা ধরানোর মতো চিক্কুর দিয়ে বাড়ির সব মহিলাকূল ( মা, জ্যাঠিমা, কাকিমা’রা) ভগবানেরে এই ধরতিতে নামিয়ে আনল বলে কথা। এমনিতে এরা কেউ আমাকে ঘাটায় না, হিন্দু বাড়িতে এই ম্লেচ্ছ কি করে জন্মালো এই নিয়ে বাড়ির মহিলাদের চিন্তার শেষ নেই!! … যাই হোক কি করি এই অবস্থায় গান চালালে নিজ বাসায় মহিলাকুলের রোষানলে পড়ার মত অবস্থা। … কিন্তু হঠাতই পরিত্রাতার ভূমিকায় ফোন এল আমার এক বান্ধবীর। আমিও আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে বলতে বলতে কিত্তনের শোক ভুলে লুল ফেলতে চলে গেলাম।

… সে কীর্তন এর আওয়াজ পাইয়া জিজ্ঞাসা করল – ইহা কি বস্তু?

আমি কইলাম – আরে কিছুনা। ওসব আজাইরা ক্যাচাল।

ও বলল – আজ তো আমাদেরও প্রেয়ার চলছে।

আমি প্রমাদ গুনলাম। এখানে বলে রাখি আমার এই বান্ধবি অবাঙ্গাল হৈলেও একজন খাঁটি মুসলিম মুমিনা। ওরে কইলাম – আইচ্ছা। ভালা কথা, তয় আমার লাইগ্যা কি প্রেয়ার কল্লা?

জবাবে সে আইটেম বুম ফাটাইল, অংরেজীতে যা কইল তার সারমর্ম এই – আমি মহান আল্লার কাছে তুমার লাইগ্যা দুয়া করছি তুমি যাতে দ্বীনের পথে আসো ( আজ্ঞে সেও জানে আমি বজ্জাত, বাস্টার্ড ), আমি চাইছি তুমি যাতে আল্লাহর রহমতে বিশ্বাস কর এবং তার লাইগ্যা আল্লা তুমারে হেল্পাইব, তুমি শুধু আল্লাহ’রে মানবা এবং একজন খাডি মুসলিম হৈবা। আল্লা তুমারে সব খুশি আর জন্নত দিব। … এই কইয়া মুমিনা তাড়াতাড়ি কইল প্রেয়ারে দেরী হৈতেছে। খুদাপেজ। আমিও কইলাম – খুদাপেজ।

এরপর কিছুক্ষন দম নিলাম। এতকিছু একসাথে ঘটে গেলে দম নেওয়া লাগে। এরপর যা করলাম তার সারসংক্ষেপ এমনঃ

কীর্তন তখন মাঝামাঝি অবস্থায়। বিরতি চলছে। এই সময়টা মনে হয় দেওয়া হয় ভগবানকে খাওদা দাওয়াগুলি টেস্ট করার জন্য। আমি সটান গিয়ে নাট মন্দিরের সামনে দাঁড়ালাম। ওরা ভাবল পুলার বোধ-উদয় হৈছে। এরপর আমি আমার প্রিয় মুমিনার সাথে যা কথা হল তা উগরাইয়া দিলাম। সাথে ইছলাম ধর্মের নানা উপকারিতা এবং আজকের দিনে ( শবে-মেরাজ ) আল্লা কি করে তার বান্দাদের নামাজ এর অনুমতি দিলেন তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিয়ে ওদের মুখগুলির দিকে তাকিয়ে পিছার বারি খাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে কেটে পড়লাম সুরসুর করে। আমার মা মোটামোটি জানে আমার স্বভাব, তুবুও তাঁর মুখটা ভয়ানক কঠিন দেখাল, কাকিমা এবং জ্যাঠিমা প্রায় মূর্ছা যাবার মতো অবস্থা, আর আমার মাসিমণি এবং উপস্থিত অন্যান্য পারিষদরা অলমোস্ট হায় হায় ধ্বনি তুলল। এরপর আর কীর্তনের আওয়াজ পাওয়া গেলনা ভালো করে, তা হ্রস্ব থেকে হ্রস্বতর হয়ে গেলো।
………
এবং তারপর রাতের খাবার আমাকে নিজে একাএকা খেতে হয়েছে, কেউ আমাকে খাবার দেয় নি। কেউ আমার সঙ্গেকথা কয় নাই। …

[127 বার পঠিত]