মার্লন জর্ডান, সময়ের কিছু আগেই এসে বসেছে আমার সামনে। দুরত্ব শুধু সামনের টেবিলটা। খানিকটা পেছনে হেলানো মাথাটা , উৎসুক চোখ – যেমন টা হয়। মার্লন ঘরে ঢোকবার সাথে সাথেই কেমন যেনো সোঁদা মাটির গন্ধ পেলাম।
আমি ব্যাস্ত হাতে টেবিলটা খানিক গুছিয়ে ভুরুতে ভাঁজ এনে জানতে চাইলাম, so what brought you here today” . দেখলাম মার্লন কেঁপে উঠলো, বার বার মাথাটা ঠুকলো ওর হুইল চেয়ারে, হাতের আঙ্গুল গুলো খামচে ধরেছে চেয়ারের হাতল। ঠোঁটের কোনা বেয়ে কিছু গড়িয়ে পড়লো কি? আমায় চমকে দিয়ে গম্ভীর একটা স্বর বলে উঠলো “ I need money” . আমার নিজেকে সামলাতে কয়েক পল লাগলো। ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বললাম “ Don’t we all? “ মার্লন বসে আছে পাওয়ার হুইল চেয়ারে, লিফট আছে চেয়ারটায় তাই আমার চোখ বরাবর ওর চোখ। চেয়ারের হাতলে কী প্যাড, ভয়েস এ্যক্টিভেট হোল উইল চেয়ারের পেছনে লাগানো ডিভাইস থেকে।

যাহোক আলোচনা বেশী দূর এগুলো না, মার্লন ঘাস কাটার ব্যাবসা করতে আর্থিক অনুদান চাইছে , আমি রাজী হলাম না। জানিয়ে দিলাম ওর ব্যাবসার ধরণের সাথে আমি একমত নই। মার্লন বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো, যাবার সময়ে ওর নিজস্ব ব্লগের ঠিকানা দিয়ে গেলো, বলে গেলো ইচ্ছে হলে দেখতে। আমি খানিকটা অবসর পেয়ে ব্লগ টা খোলবার চেষ্টা করলাম, সরকারী অফিস তাই বোধ হয় বার বার এ্যক্সেস ডিনাইড হোল। বাসায় এসে ভাবছিলাম মার্লন কে বললে কেমন হয় ইন্টারনেট কেন্দ্রিক কোন ব্যাবসা করতে। ভাবতে ভাবতেই ওর ব্লগে ক্লিক করতেই আমার সকল আগ্রহে জল ঢেলে ব্লগ টা ভেসে উঠলো যা দেখে চোখে জ্বালা ধরার জোগাড়। নিজেকে বোঝালাম, এই চিন্তাও তো ঠিক নয় যে মার্লনের শারীরিক সীমাবদ্ধতা আছে বলেই আমি ধরে নেবো আর যে কারো মতন রগরগে ব্লগ লিখতে ও সক্ষম নয়। শারীরিক মানসিক সীমাবদ্ধতা থাকলেই তাকে সীমাবদ্ধ ইচ্ছেয় জীবন যাপন করতে হবে –তাই ই বা কেনো হবে।

ভুলটা আমার ই। এমনি কত ছোট ছোট ভুল জেনেছি, ছোট ছোট ভুল করেছি, ঠেকে শিখেছি। তার ই কিছু আজ সহভাগীতা করছি। মানতেই হবে এমন কথা নয়-ভাবনার খোড়াক হলেই যথেষ্ট জানবো ।

আমি শিখেছি হুইল চেয়ারে কেউ বসে থাকলে সম্ভব হলে নিজেও বসে কথা বলা শ্রেয় যাতে করে চোখ বরাবর চোখ রাখা যায়। লিফট আছে যে সব হুইল চেয়ারে তার কথা আলাদা। দাঁড়িয়ে কথা বলতে হলে কিছুটা দূরে দাঁড়ানো উচিৎ যাতে হুইল চেয়ারে যিনি বসে আছেন তাকে আপনার চোখের দিকে তাকাতে মাথা পেছনে অনেক খানি হেলিয়ে দিতে না হয়। বিনা অনুমতি তে কখনোই অন্যের চেয়ারে হাত দেয়া বা ধাক্কা দেয়া উচিত নয়, প্রথমে সাহায্য করার প্রস্তাব দেয়া যায় এবং শুধু মাত্র অনুমতি পেলেই সাহায্য করা উচিত। এই চেয়ারটি চলৎশক্তিহীন ব্যাক্তির নিজস্ব প্রতঙ্গ স্বরূপ।
মনে রাখতে হবে হুইল চেয়ার টি বহু নোংরা পথ ঘাট এর ওপর দিয়ে চলেছে, চাকায় উঠে আসতে পারে আবর্জনা , বয়ে আনতে পারে কটু গন্ধ, যেমন করে মার্লনের হুইল চেয়ার বয়ে এনেছিলো মাটির সোঁদা গন্ধ।
যারা লাঠি নিয়ে হাঁটেন তারা ভারসাম্য রক্ষার জন্যে নিজস্ব একটি উপায় বার করে নেন। অর্তকিতে তাদের লাঠি বা ওয়াকারে হাত দিলে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। যারা লাঠি নিয়ে হাঁটেন তারা দরজা খোলবার সময়ে সাধারণত দরজায় কিছুটা ভর দেন। লক্ষ্য রাখতে হবে, এ সময়ে তার পেছন থেকে দরজা খুলে দিলে তার সুবিধের চেয়ে অসুবিধেই হয় বেশী।
অনেকেই হয়তো হুইল চেয়ার ব্যাবহার করেন না কিন্তু হৃদরোগ অথবা ফুসফুসের এর রোগের কারনে দ্রুত লয়ে হাঁটতে পারেন না। এদের সঙ্গে হাঁটতে গেলে নিজের গতি টা কিছু কমালে ক্ষতি নেই।

ব্যাক্তিগত কথা বলি, আমার মায়ের ওপেন হার্ট সার্জারীর পর স্বাভাবিক গতি ছিল স্লথ, বাবা সাথে হাঁটতে গিয়ে অভিযোগ করতেন যে গল্প করা যায় না এবং খানিকটা সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতেন বিজয়ের হাসি ঠোঁটে লটকে। সময় বয়ে গেছে ,বাবা র এখন পারকিন্স। তিনি মায়ের সাহায্য ছাড়া অনেক কাজ ই করতে পারেন না। ঘড়ি কেমন ঘটি উলটে দেয়।

আমার অফিসের অন্ধ সহকারীর কথা বলেছিলাম আরেক লেখায়-আশ্চর্য্য হলেও সত্য যে অন্ধ ব্যাক্তি সাদা ছড়ি নিয়ে হাঁটছে বলেই আমরা ধরে নেই আমাদের সাহায্য তার প্রয়োজন। তবে সাহায্য চান কিনা এটা জিজ্ঞেশ করা শোভন। অপরিচীত অন্ধ ব্যাক্তির সংস্পর্শে এলে পরিষ্কার করে নিজের নাম বলা প্রয়োজন সাথে আসবার কারনটাও বলা জরুরী। অনেকে একসাথে থাকলে প্রত্যকের সাথে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেয়া প্রয়োজন। অন্ধ ব্যাক্তি কে পথনির্দেশনা দিলে তার কনুই ধরে হাঁটা শ্রেয় ভারসাম্যের কথা মাথায় রেখে। হাতের কবজি, হাতের পাতায় বা চেটোয় হাত রেখে নয়।
অন্ধ ব্যাক্তিকে খুব নির্দিষ্ট নির্দেশ দেয়া সমিচীন । সামনের হল ঘরটার বাঁদিকে যাও নয়, বরং বলা উচিত সোজা ১৫ হাত হাঁটলে যে হল ঘরটা পাওয়া যাবে সেই ঘরে প্রবেশ করে শেষ মাথা অব্দি গিয়ে বাঁদিকের পিলারটার পাশ দিয়ে বাঁ দিকে ঘুরতে হবে।

আমরা কথা বলতে বলতে অনেক সময় হাতের ইশারা করে চলে যাই অথবা ফোন বাজলে কিছু না বলেই একটা আঙ্গুল উঁচিয়ে ফোন ধরতে দৌড়াই। অন্ধ ব্যাক্তি র সামনে থেকে বিদায় নেবার সময় বলে যাওয়া প্রয়োজন ফোন এসেছে আমি কলটা নিতে যাচ্ছি, পরে অন্য সময়ে কথা হবে।
অন্ধ ব্যাক্তি তার সাদা ছড়ি রেখে কোথাও গেলে ওটি সরানো ঠিক হবে না, অন্ধ ব্যাক্তির রেখে যাওয়া কলম , বই , ছড়ি এগুলো তাদের কিছু চিহ্ন হিসেবে ব্যাবহার হয়, ফিরে এসে যাতে হাতের কাছে পায়, অন্যের ওপর নির্ভর করতে না হয়।
কোন অন্ধ ব্যাক্তির সঙ্গে বাইরে খেতে গেলে, কোন সাহায্য লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করে তাকে বলে দিতেন পারেন থালার কোন অংশে কি খাওয়া দেয়া হয়েছে। এটি সাধারণত ঘড়ির কাঁটার সাথে মিলিয়ে অবস্থান বলা হয় যেমন ১২ টায় মাংশ ৩ টেয় সালাদ।, মাঝে ভাত ইত্যাদি।

যাদের দৃষ্টি ক্ষীণ তাদের জন্যে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা লেখা দৃষ্টি গোচর হয়। তার দৃষ্টি থেকে চকচকে জিনিস সরিয়ে রাখা ভালো। হেলেন কেলার ফাউন্ডেশনের একজনে সাথে পরিচয় হল যিনি জানতেন না তার সিলিন্ডার ভিশন আর পেরিফিরাল ভিশন এ সমস্যা আছে। বড় একটা ডিনার পার্টি তে বার বার পাশের অতিথি তাকে বলছিলেন, দয়া করে আমার গ্লাস থেকে পান করবেন না , আপনার গ্লাস আর একটু ওপাশে । ভদ্রমহিলা পর দিন ছুটলেন চোখ দেখাতে।

যাদের শ্রবণ শক্তি নেই তাদের সাথে কথা বলতে গেলে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয় তাদের সামনে হাত নাড়িয়ে, বাতি জ্বালিয়ে নিভিয়ে। দরজায় মেরে অথবা টেবিলে আঙ্গুল ঠুকে কখনো নয়।
যারা স্পীচ ডিস্ক্রিমিনেট করতে পারেন না তারা কিছু উচ্চারন শুনলেও পার্থক্য ধরতে পারেন না। এনারা যদি আপনাকে বলে কোন কথা বুঝতে পারেন নি , আবারো বলতে – তাহলে ভিন্ন শব্দ ব্যাবহার করে কথা বলতে হবে। একেবার এক ই শব্দ ব্যাবহার করলে তিনি দ্বিতীয়বার ও ওই এক ই শব্দ গুলো বুঝতে পারবেন না, ফলত যোগাযোগ স্থাপন হবে দুস্কর।

খেয়াল রাখা দরকার যাতে আমাদের ঠোঁট শ্রবনশক্তিহীন ব্যক্তি দেখতে পারেন , তারা এর নাড়া চাড়া থেকে শব্দ বোঝার চেষ্টা করেন। চুইংগাম চিবোতে চিবোতে বা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে কথা বলা বা মুখের ওপর হাত দিয়ে কথা বলা শ্রবণ শক্তি হীন ব্যাক্তির জন্যে বাড়তি ঝামেলা বয়ে আনে।
যারা হিয়ারিং এইড ব্যাবহার করেন তাদের সামনে চীৎকার করে কথা বলা প্রয়োজন নেই বরং এতে করে শব্দ গুলো বিকৃত উচ্চারন হয়ে ধরা পড়ে হিয়ারিং এইড ব্যাবহারকারী ব্যাক্তির কাছে।

অনেকের স্ট্রোকের কারণে কথা বলায় জড়তা থাকে, অথবা তুতলিয়ে কথা বলেন, এদের সাথে হাতে সময় নিয়ে কথা বলুন। এদের বাক্যের মাঝে থামিয়ে দিয়ে নয় বরং অপেক্ষা করতে হবে কথা শেষ হবার জন্যে। তাদের কথা বোধগম্য না হলে হাসাহাসি না করে একখানা কাগজ এগিয়ে দেয়া যায় লিখে দেবার জন্যে।

আরো কত কি শিখেছি। এলেক্সা করমিক ওর গাড়ির সীট উঁচু করে দেবার জন্যে অনুদান চাইতে এসেছিল। ও খর্বাকৃতি র মানুষ, ওর কাছেই শোনা কেমন অদ্ভুত ব্যাবহার সে পেয়ে থাকে । লোকজন ওকে ডাকতে হলে ওর কাঁধে হাত না রেখে, রাখে মাথার ওপর। ওর বয়স ২৩ কিন্তু ওর সাথে অনেকেই ঠিক যেমন বাচ্চাদের সাথে কথা বলে আদো আদো ভাসায় তেমন বলার চেষ্টা করে,ধরনটা এমন “এই যে আমাল থোনাল বালা থ্যাক্লা দিলো গলে”( এই যে আমার সোনার বালা স্যাকড়া দিলো গড়ে)।

সেরিব্রাল পালসি বা আটেক্সিয়া আক্রান্ত ব্যাক্তির কথা জড়ানো , হাঁটা টালমাটাল , প্রথমটায় মদ্যপ মনে হওয়া বিচিত্র নয়। এদের সঙ্গে প্রচুর ধৈর্য্য নিয়ে কথা বলতে হবে, চলতে হবে।
টু্য়রেট সিন্ড্রমের ব্যাক্তিরা চোখে মুখে খিচুনি সহ কথা বলেন, অনেকে কথা বলার মাঝখানে দু চারটে অদ্ভুত অর্থহীন আওয়াজ করেন। এধরনের ব্যাক্তিকে কথা শেষ করতে দিন । কেননা শব্দ গুলো বিলম্বিত হয়ে আসছে ,তাকে যতোই বাধা দেয়া হবে ততোই তার শব্দ গুলো জমতে থাকবে , একটার ওপর একটা জড়ো হতে থাকবে।

আমরা শারীরিক মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে রসিকতা করি । রগড় করে বলি-কানা খোঁড়া এক কাঠি বাড়া, বলি কানা কন্যার নানান রোগ চোক্ষে ছানি পায়ে গোদ, চোখের মনি সামঞ্জস্যহীন হলে বলি – ট্যাঁরা -“looking Tokyo going London” । ঠোঁট কাটা (cleft lip)ব্যাক্তি, শারীরিক বিকলাঙ্গ ব্যাক্তি দেখলে আমরা চোখের পলক ফেলি না কিন্তু ভুল যাই ওনারাও আমাদের দেখছেন ,আমাদের কথা শুনছেন।

কারো কোন সীমাবদ্ধতা থাকলেই তা নিয়ে আলাপ করতেই হবে এটি আরেকটি অদ্ভুত ইচ্ছে, এই ইচ্ছে পরিহার করা উচিত। অথবা অনেকে প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিটিকে অযথাই মহিমান্বিত করতে চান, অকারনে আপনি সাহসী, আপনি একজন হার না মানা ব্যাক্তি এসব বলে আর কিছুই নয় শুধু বিড়ম্বনার জন্ম দেন। অনেক প্রতিবন্ধকতা চোখে দেখা যায় না। যাদের ফাইব্রোমায়ালজিয়া আছে অথবা ক্যান্সারের কারনে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন তাদের ক্লান্ত থাকা অস্বাভাবিক নয়। জানা থাকলে নিজের চেয়ারটা এগিয়ে দেয়া যেতে পারে, তাদের হাতের ভারী ব্যাগ টা নিজে বহন করা যেতে পারে।

মৃগী রোগীদের যখন খিচুনি শুরু হয় তখন মাঝ পথে থামাবার চেষ্টা বৃথা, এর নিজস্ব গতি আছে, এর নিজের সময়ে থেমে যায়, শুধু খেয়াল রাখা দরকার যাতে খিঁচুনির কারণে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত প্রাপ্ত না হয়। উজ্জ্বল আলো অথবা উচ্চকিত শব্দ প্রতিকুলতা কে বাড়িয়ে দেয়।
যাদের ফুসফুসজনিত সমস্যা আছে-নাই বা তাদের সামনে ঘরে এয়ার ফ্রেশনার ব্যাবহার করলাম, নাই বা তাদের সামনে ধুমপান করলেন।

নিজের ফ্লু হলে অথবা সংক্রামক কোন অসুখ হলে সাবধান থাকুন , আপনার পাশের এইচ আই ভি এইডস আক্রান্ত ব্যাক্তি কিন্তু সহজেই আক্রান্ত হয়ে পড়বেন আপনার কারণে। তার রয়েছে দুর্বল ইম্যুইন শক্তি।

আমাদের ভুল ধারনা রয়েছে যে যাদের মানসিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তারা সবাই আক্রমনাত্বক হয়ে থাকে, বরং তারাই কেউ কেউ নিজের অস্তিত্ব নিয়ে পালিয়ে বেড়ান। যেহেতু এটি দৃশ্যমান প্রতিবন্ধকতা নয় তাই বুঝতে সময় লাগে কিন্তু একবার বুঝলে এদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এমন কিছু বলা বা করা ঠিক নয়।
মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যাক্তি দেখলেই পাগল পাগল বলে ইঁট ছুঁড়তে হবে বা শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হবে এগুলো পাল্টাবার সময় এসেছে।
যে কোন মানুষ একদিন দুদিন হতাশায় ভুগতেই পারেন তাকে ডিপ্রেশনের রোগী বলা ভুল , আমাদের হিসেবে না মিললেই “মেন্টাল” “আউলা” এসব শব্দ পরিহারের সময় এসেছে।

স্কিজোফ্রেনিক ব্যাক্তি রিয়ালিটির সঙ্গে সম্পর্কহীন , তিনি যা ঘটছে না তাকেই ভাবছেন ঘটছে বলে , তিনি হ্যালুসিনেট করছেন । কি্ন্তু তাকে মিথ্যেবাদী ভাবার কোন কারণ নেই। তিনি যা বিশ্বাস করছেন তার হয়তো কোন বাস্তব ভিত্তি নেই কিন্তু তিনি কিছু পাবার লক্ষ্যে মিথ্যাচার করছেন না।

যাদের মানসিক বিকাশ দেরীতে ঘটছে তাদের সঙ্গে রুপক ব্যাবহার করে কথা বলা ঠিক নয়, বরং সহজ ছোট ছোট বাক্য ব্যাবহার শ্রেয়। আবারো নিজের একটা গল্প বলি, খুব গেঁথে আছে ঘটনা টা তাই। আমার শিক্ষক বোরহানঊদ্দিন খান জাহাঙ্গীর খোঁজ করছেন আমায়, মেঘনা গুহঠাকুরতার সাথে একসঙ্গে বাঙ্গলা নাটকের মারজিনালিটির ওপর একটা লেখা লেখাতে চাইছিলেন। আমি যখন তাঁকে তার অফিসে খুঁজি, তিনি থাকেন না, তিনি যখন আমায় খোঁজেন আমি তখন টিএস সি তে আবৃত্তি করে জগত সংসার উদ্ধার করছি।
যাহোক মাস খানেক পর ধানমন্ডি পাঁচ নম্বরে ঢুকতেই স্যারের সাথে মুখো মুখি দেখা।। খানিক ক্ষন তাকিয়ে বললেন” এমন ও হয়?” আমি বললাম “ এমন ই হয়”। ব্যাস তার পর আর তার সঙ্গে কথা হয় নি।

না, এজাতীয় রুপক কথা বলা সমিচীন নয় যাদের মানসিক বৃদ্ধি দেরীতে হচ্ছে তাদের সঙ্গে। বরং সহজ ছোট বাক্য যোগাযোগ স্থাপনে সাহায্য করবে।
যাদের লার্নিং ডিসাবিলিটি আছে, আপনার কথা শুনছেন কিন্তু প্রসেস করতে পারছেন না, পড়ছেন কিন্তু মুখে বলে না দিলে অন্তঃস্থ করতে পারছেন না।
আমরা সহজেই বলে ফেলি” কথা কানে যায় না? মাথায় ঢোকে না? গবেট নাকি”
কিন্তু এটা ভাবি না যে কথা কানে যাচ্ছে ঠিক ই কিন্তু ওটা প্রসেস হচ্ছে না।
ভাবছেন কারো এই সীমাবদ্ধতা আছে বুঝবেন কিভাবে?- একটু সচেতন হলেই আলাপের কিছুক্ষণ পর বোঝা সম্ভব ব্যাক্তিটি কোথায় ভিন্ন।

এবারে একটা কঠিন কথা বলি আমরা শারীরিক মানসিক প্রতিবন্ধকতা আছে এমন ব্যাক্তির সাথে কেমন ব্যাবহার করব তা বললাম, এনাদের সাথে আমাদের দেখা হতেও পারে নাও হতে পারে, হলেও বড়জোড় খানিকটা সময় কিন্তু যিনি সবচাইতে কাছে থাকেন অর্থাৎ যিনি ২৪ ঘন্টা এদের সঙ্গে যুক্ত তাদের কথা আমরা কতটা ভাবি।
যার স্বামী বা স্ত্রীর, সন্তানের বা নিকটজনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং তিনি কেয়ার গিভার, তার যত্ন কে নেন? হ্যাঁ, কেয়ার গিভারের যত্ন নিজেকেই নিতে হবে।
স্কিজোফ্রেনিক স্ত্রীর দেখা শুনো করতে গিয়ে নিজে ডিপ্রেশনের ওষুধ খাওয়া কাঙ্খিত নয়। সেরিব্রাল পালসি স্বামীকে ওঠানো নামানো করতে গিয়ে নিজে রোজ ব্যাথা উপশমের ওষুধ খাওয়াও কাঙ্খিত নয়।
নিজের সময় বের করে নিতে হবে, যাতে নিজের আনন্দ হয় এমন কিছু খুঁজে বার করতে হবে। এটি স্বার্থপরতা নয় বরং নিজেকে সজীব রাখা যাতে প্রিয়জন যার শারীরিক মানসিক প্রতিবন্ধকতা আছে তাকে আগামীতেও সহযোগীতা করা যায়।

কষ্ট করে এই পর্যন্ত কেউ এ লেখাটা যদি পড়ে থাকেন হয়ত ভাবছেন-পড়লাম-কিন্তু লেখাটায় যা বলা হয়েছে তা যদি না করি? তবে?
না করলে কি হবে –এর উত্তর ? নাই বা দিলাম। শুধু করলে কি হবে তাই বলি। শারীরিক মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যাক্তির সঙ্গে সচেতন ব্যাবহার করলে আমাদের সামগ্রিক জীবন কিছুটা হলেও স্বস্তির হবে এইটুকু বুঝি।

পূর্বের পর্ব : শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে

[100 বার পঠিত]