মুক্তমনায় আমার প্রথম লেখা আমি কিভাবে লিখব কত ভালো লিখব জানি না। শেষ পর্যন্ত যে বিষয়টা কয়দিন ধরে চিন্তা করছিলাম লিখে ফেললাম।

ধর্মের সাথে পরিচয় আমার ক্লাস থ্রিতে যখন সরকারী ধর্ম বই স্কুলে পড়ানো হত তখন। বাবা-মা তেমন ধার্মিক না, একেবারে উদাসিন। ধর্মের সংস্পর্শে আসতে সময় লেগেছে। আগে নানার নাড়িতে গেলেই শুধু ধর্ম নামের কিছুর সাথে দেখা হত। ক্লাস থ্রিতে ধর্ম আজব লাগতো। সত্যি এমন ঘটনা হতে পারে। এভাবে থ্রি ফোর পড়লাম। হিন্দু বন্ধুদের কাছে হিন্দু ধর্মের আর ইসলামেরটা জানতাম মুসলিম বন্ধুদের কাছ থেকে। সব কল্পকাহিনি লাগতো। আজব লাগতো, মজা লাগতো। পড়তাম এসব মনোযোগ দিয়ে। ক্লাস ফাইভে একটু বেশি চালু হয়ে গেলাম, মন্ত্রগুলো আর সুরাগুলো নিয়ে শেষ বেঞ্চে আমরা তিন বন্ধু প্যারডি করে হাসতে থাকতাম। ধর্ম ব্যাপারটা জঘন্য লাগে ক্লাস ফোরে। বিএনপি আসার সাথে সাথে ঝামেলা করে আমাকে স্কুল ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়। সাম্প্রদায়িকতার শিকার হতে হল তখন। বাবাকে বললাম এমন হল কেন? বাবা বলে এটা সাম্প্রদায়িকতা, দেখো না গুজরাটে কি হল? পরে ফাইভে অন্য স্কুলে চলে যাই। আগের স্কুলে আমার সহপাঠিরা বলত আসল মুসলমান যারা না তারা নাকি লোহার তৈরী, আসল মুসলমান মাটির তৈরী। এদের সাথে তো এক মুহূর্ত কাটানো আমার কাছে কষ্টের কারন ছিল।

এভাবে ক্লাস সিক্স থেকে ধর্ম নিয়ে পড়া শুরু করি, কল্পকাহিনি পড়ে হাসতে হাসতে জীবন শেষ হয়ে যেত। এভাবে এসএসসি দেয়া হয়ে গেল। আমি চাইছিলাম আমি এসএসসিতে ধর্ম নিয়ে পড়ব না। উপায় কোথায়? সরকার ধর্ম ছাড়া সার্টিফিকেট কিভাবে দিবে? এবার কলেজে ভর্তির সময় ধর্ম নাই লিখব বললাম আমাদের কলেজের অঙ্কের স্যারকে। স্যার বলে ধর্ম ছাড়া ভর্তি হওয়া যাবে, সমস্যা হবে। কলেজে যতবার ধর্ম আমি পুরণ করতাম মাথা দেয়ালে বাড়ি দিতে ইচ্ছে করত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় ধর্ম নাই ফিল আপ করেছিলাম। সেখানে বসে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্টার আমাকে বললেন ধর্ম না থাকলে সমস্যা, ডীন গ্র্যান্ট করবেন না। আমি বলি আমার ধর্ম নেই, পালন করি না। তিনি বলেন বাবার ধর্ম লিখে দাও। বাবাকে ফোন দিলেন। বাবার সাথে অনেকক্ষণ কথা হবার পর ধর্ম লিখলাম। ইচ্ছে হচ্ছিল পড়ালেখা ছেড়ে দেই ঝামেলাই শেষ। শেষ মানে? তখন শুরু, কোচিং এ ক্লাস নেয়ার জন্য সিভি চাইলো, দিলাম ধর্ম ছাড়া। বলে ধর্ম নাই কেন আবার দাও। এমন মনে হচ্ছে ধর্ম দেখে আমাকে চাকরি দিবে। সেমিস্টার পরিক্ষায় ফর্ম ফিল আপ করতে গিয়ে দেখি ধর্ম লিখতে হবে। আমি না লিখে জমা দিলাম। পরদিন আমাকে ডেকে পাঠালেন ডিপার্টমেন্টের অফিসার, ধর্ম লেখেন নাই কেন? লেখেন! আমি বলি ধর্ম নাই আমার। তারা বলে ভর্তির সময় ধর্ম দিয়েছেন না? এখন কেন? আমি মনে মনে বলছিলাম, “জায়গায় জায়গায় ধর্ম লিখে রাখতে হয়, প্রবেশ পত্রেও। প্রবেশপত্রে ধর্ম দেখে আমাকে আমাকে নাম্বার দিবে।”

চাকরির জন্য আমাকে ধর্ম লিখতে হয়, না লিখলে আমাকে ভাইভা বোর্ডে অপমান করে তাড়ানো হবে। বিসিএস এর জন্য ধর্ম লিখতে হয়। স্কুলে না পড়তে চাইলেও ধর্ম পড়তে হয়, ধর্ম নিজের নামের নিচে লিখতে হয়। এই দেশ ধর্ম নিরপেক্ষ। ছোটবেলা থেকে তো সিস্টেম আমাদের ধর্মের প্রতি ঝুকানোর চেষ্টা করছে। এভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে দেশ। আমি কখনো অন্য ধর্মের মেয়েকে বিয়ে করতে পারব না, হয় তাকে না হয় আমাকে ধর্ম পরিবর্তন করতে হবে। আমার ধর্ম নেই পরিবর্তন কি করব? আর আমার ধর্ম গ্রহনেরও ইচ্ছে নেই। প্রেম করার আগে ধর্ম দেখে মানুষ প্রেম করে। কারো সাথে পরিচয় হলে নাম শুনে বলে ধর্ম কি আমার? আমি নাই বললে বলে ঈশ্বর প্রদত্ত ধর্ম কোনটা তোমার? আমার বাবা-মা দুইজন ভিন্ন ধর্মের হলে ঈশ্বর প্রদত্ত ধর্ম আমার কোনটা? আমি লিখব কি? ডিম্বানু আর শুক্রানু দুই ধর্মের মানুষের না? তাহলে আমার ঈশ্বর প্রদত্ত ধর্ম কোনটা?

[105 বার পঠিত]