ওরা দুইজন বন্ধু- সত্যিকারের বন্ধু। ওরা সুখ দুঃখের অনুভূতি গুলো ভাগাভাগী করে নেয়- একের ভার অন্যে লাঘব করে। অনেকটা সহদর ভাইয়ের মত। সহদরদের ভেতরে অনেক সময় প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে- মায়ের দুধ নিয়ে, আদর-আহলাদ নিয়ে, বিষয়-আশয় নিয়ে। ওদের ভেতরে তাও নেই। ওদের সখ্যতা আসলে আকাশ আর সাগরের মত। হাতের কাছের সাগরকে মাথার উপরের নিসীম নীলিমা থেকে যত দূরের অস্তিত্বই মনে হোক, ওরা আসলে মিলে গেছে দিগন্তে। ঠিক তেমনি আকারে গড়নে দুই বন্ধুতে যত অমিলই থাক, কোন এক অদৃশ সম্পর্কে ওরা বাঁধা। বন্ধুত্ব তাই ওদের অমলিন, নিঃশ্বর্ত। ওদের একজনের নাম কামসুদ্ধি, আরেকজনের নাম ত্যাগমান। ওরা এই আদর্শ গ্রামের মানুষ। সহর্ষি গৌতমের অনুগামী বাংলার রাজারা বলেন- এ গ্রাম আদর্শই। ওদের দুটো পরিবার সবদিক দিয়ে প্রায় একই সমতলে। ওরা ধনীও না, দরীদ্রও না- ওরা সচ্ছল। ওরা দুজনেই মধ্য যৌবনে। বিবাহ প্রথায় বিশ্বাসী হয়েও ওরা বিয়ে করেনি এখনও। নিজেদের জীবন নিয়ে ওরা একটা নিরীক্ষা করতে চায়- দুঃসাহসী নিরীক্ষা। ওরা ঝুকি নিতে ভালবাসে। একই গুরুর শিষ্য হয়েও ওরা কোন কোন মৌলিক বিষয়ে ভিন্ন বিশ্বাস পোষন করে। তাতে ওদের নিঃশ্বর্ত বন্ধুত্বে বিন্দুমাত্র ঘাটতি হয় না।

নিজেদের বিশ্বাসকে ওরা কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখতে চায়। ওদের স্বপ্ন, ওদের সাধনা- মোক্ষ লাভ। সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে ওরা বদ্ধপরিকর, কিন্তু সেখানে যাওয়ার পথ ওদের ভিন্ন। তাই ওদের বিশ্বাসও ভিন্ন। ভিন্নপথ ভিন্ন বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। তাতে কিছু যায় আসেনা। কারণ তাদের গন্তব্য এক। কামসুদ্ধি বিশ্বাস করে- নির্দোষ ভোগের ভেতরে দিয়ে, সবকিছু জেনে শুনে বুঝে যে ভ্রমণ তার শেষ প্রান্তে থাকে মোক্ষ। ত্যাগমানের ভিন্ন মত- তার দৃঢ় বিশ্বাস কঠিন কৃচ্ছ্রসাধন ছাড়া মোক্ষ লাভ অসম্ভব। কোন এক শুভদিনে দুই বন্ধু তাদের বুকের ভেতরে বীপরিত মুখী দুই বিশ্বাস বয়ে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে হাটতে হাটতে সরু কাঁচা পথের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছে। তখন সূর্য্য মধ্যগগনে। বাতাসের গায়ে কাশফুলের কোমলতা। আর একটু পরে ওরা একে অন্যের থেকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য আলাদা হয়ে যাবে- আলাদা হবে বিশ্বাসের মূল্যায়নে। আজকের পর থেকে আর ওদের এক সাথে রাতের আকাশে রাশিচক্র সন্ধান করা হবে না। এক সাথে দর্শনের শানিত তর্কে রাত ভোর করা হবে না। এক সাথে মিলে তাপস গুরুর পদসেবা করাও হবেনা। তারপরেও ওরা আলাদা হয়ে যাবে, দুঃসাহসীক অভিযাত্রায় যার যার বিশ্বাসের শক্তি ও সরূপ উন্মোচন করবে। মহান গুরুর আশির্বাদ ওদের শক্তির উৎস।

আদর্শ গ্রাম থেকে পথটা এসে শেষ হয়ে গেছে ঠিক সমূদ্রের শুরুতে। এখান থেকে ক্রোশ দুই তিন দূরের সাগরকে দেখা যায়, শব্দ শোনা যায় আবার চেষ্টা করলে ঘ্রাণও পাওয়া যায়। গ্রামের পথটা এখানে এসে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। ডান দিকের শাখাটা চলে গেছে মাঝারী আকারের এক পাহাড়ে যেখানে আছে ঘন এক অরণ্য। বাম দিকের শাখাটি সোজা চলে গেছে ঝলমলে সুখী এক নগরে, যেখানে আছে ভরা-ভোগের সহস্র উপকরণ। হাটতে হাটতে রাস্তার তেমাথায় এসে দাড়াল দুই বন্ধু- কামসুদ্ধি আর ত্যাগমান। তারা হাতে হাত ধরে দাঁড়ায় মুখোমুখী। হঠাৎ করে আদর্শ গ্রামের দিক থেকে সন্তুষ্টির শান্তি, পাহাড়ের দিক থেকে মৌন সৌম্যতা আর নগরের দিক থেকে সুগন্ধি সুখের বাতাস এসে রাস্তার ত্রিমাথায় একটা হালকা ঘুর্ণির সৃষ্টি করে। দুই বন্ধুর অটল অন্তর তাতে বিন্দুমাত্র নড়লনা। চোখে তাদের মোক্ষের স্বপ্ন, অন্তরেতে অবিচল বিশ্বাস আর হাতে ধরা বন্ধুত্বের আশীষ। একটু পরে তারা পৃথক হয়ে যাবে। আবার কবে মিলবে কেউ জানে না। অন্তরের ভাব-তরঙ্গ শব্দ হয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। সে চাওয়ায় ধরা দেয় তারা। কামসুদ্ধি কথা বলে।
-আমরা যে কোন একজন সত্য প্রমাণ হবো। তাতে আমাদের কারুর কোন পরাজয় নেই।
-না, কোন পরাজয় নেই। গুরুর আশীর্বাদ আমাদের পথ প্রদর্শক। অন্তরে আশা রাখি, আবার কোন একদিন দেখা হবে।
শেষ বাক্যটা উচ্চরণ করতে গিয়ে কণ্ঠ একটুখানি কেঁপে ওঠে ত্যাগমানের।
-হ্যাঁ, আবার দেখা হবে। মহান গুরু আমাদের সহায়।
কথাশেষে বন্ধুর হাত ছেড়ে দেয় কামশুদ্ধি। শেষবারের মত তারা গাঢ় আলিঙ্গনে বাধা পড়ে। দুই ক্রোশ দূর থেকে সমূদ্রের গুরুগম্ভীর গর্জন বাতাসে ভেসে ভেসে দুই বন্ধুর শ্রবণে ধরা দেয়। সে গর্জনে তারা বিরহের মলিনতা নয়- উদ্ধত শক্তিশেল আবিস্কার করে। অন্তরে সেই শক্তি ধারণ করে তারা দুই দিকের দুই রাস্তায় পৃথক হয়ে যায়। অদৃশ্য হয়ে যায় ধীরে ধীরে পড়ন্ত দুপুরের উজ্জ্বল আলোর ভেতরেও।

হাটতে হাটতে কামশুদ্ধি নগরীর প্রান্তে একটা মন্দিরের কাছে এসে থামে। এই মন্দির মানুষের জন্যে- মানুষের হিতার্থে। ওটাকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান একটা জনপদ, যেখানে অবশেষে কামশুদ্ধির আশ্রয় মেলে। এখানকার মানুষগুলো বেশ ধনবান, প্রাচুর্যময়। তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ভোগ করতে ভালবাসে। ভোগ করে তারা দেখিয়ে দেখিয়ে প্রতিযোগিতায়। মানুষগুলো বেশ আত্মকেন্দ্রীক, স্বার্থপর। এরকম না হলে যেন মানায় না এখানে। মোটেই আদর্শ গ্রামটার মত না। এ নগরীর তুলনায় কামশুদ্ধির গ্রামটা অনেক সাদামাটা, নিরামিশ- একেবারে অন্যরকম। প্রথম প্রথম মানিয়ে চলতে অসুবিধা হলেও আস্তে ধীরে সবকিছু গা সওয়া হয়ে যায় তার। দিন যায়, দিন আসে কামশুদ্ধি ভোক্তাদের সারিতে ভিড়ে যায়, অনেকটা নিজের অজান্তে। একটা চক্রে বাধা পড়ে যায় তার জীবন- কর্ম-অর্থ-ভোগ যেন নিত্যদিনের পরিচিত চাকার ঘূর্ণন। সন্ধার আলো আধারীতে রসিক সহচরদের নিয়ে নৃত্যগীতের মজলিশ গুলজার করা তার প্রত্যহিক নগর জীবনের অংশ হয়ে যায়। নর্তকীর নূপুর নিক্কনে শ্রবণ সার্থক হয়- আরও হতে চায়। রহস্যময় সুন্দরীদের চোখের স্পন্দনে জীবনের আরেক অর্থ আবিস্কৃত হয়। কামশুদ্ধি মদিরার নেশার মর্মবাণীটা ধরার চেষ্টা করে যায়। জীবনের বহুমাত্রায় যদি অন্ততঃ একটি বার বিচরণ করা না যায়, তাহলে জীবনের উপলোব্ধি কিভাবে আসবে, কিভাবে মিলবে মোক্ষ? আশাবাদী হয় তার অন্তর। যোগী হতে হলে ভোগী হতে হয়- এটা হয়তো একটা চরম সত্য কথন। বন্ধুরা তার মদের পেয়ালায় আরও নেশা ঢেলে দেয়। স্তুতি, প্রশংসায় তারা ভোগে নেশা ধরিয়ে দেয়। বন্ধুরা বলে- “কয়দিনের দুনিয়া। মরে গেলে সব শেষ। শুধুই অন্ধকার।” কেউবা নেশার দরবারী আমেজে কাব্য চর্চায় মেতে উঠে- “বিশ্ব কেবল শূন্য ফাকা, পান করে নে নিত্য আমোদ করে”।
বাকীরা সবাই আহা আহা বলে কবির সাথে তাল মেলায়। জীবনের যে অর্থ অন্বেষনে, যে সত্য উন্মোচনে কামশুদ্ধির এই বহুমাত্রিক নগর জীবনের সংস্পর্শে আসা, তা ভুলে যায় সে। নগর জীবনের তীব্র উজ্জলতা তার দৃষ্টি অন্ধ করে দেয়। এমনি করে দিনের পর দিন গড়িয়ে যায়। কামশুদ্ধি পৌছে যায় প্রৌঢ়ত্বের মধ্যগগনে। পৌনঃপুণিক কাজের ভেতরে একঘেয়েমি বাসা বাঁধে প্রাকৃতিক নিয়মে। ভোগে আর তৃপ্ত হয় না মন। অন্তরে তার হাহাকার থেকে যায়। একা হয়ে যেতে থাকে সে। মনে মনে ত্যাগমানের সান্নিধ্য কামনা করে, কিন্তু কোথায় সে?

এই মুহুর্তে ত্যাগমান আছে পূর্ব পাহাড়ে। যে পাহাড়ে মনুষ্য পদচারণা পড়ে নাই বলা চলে। সেখানে অরণ্য বনানী ঘেরা তপোবনে তার দিন কাটে, রাত কাটে কঠিন কৃচ্ছ্রসাধনে। শ্মশ্রু-চুলে একাকার জটাধারী তাপস গভীর ধ্যানমগ্নতায় আত্নসন্ধানে দেহমন উজাড় করে দেয়। সাগরের ক্রদ্ধ গর্জন অথবা অরণ্যের নিঃসঙ্গ মৌনতা তাকে তার পথ থেকে একচুল সরাতে পারেনা। এক এক করে অনেকগুলো দিন, অনেক সময় কেটে যায়। ধ্যান, যোগের ফাঁকে ফাঁকে উৎকট নিঃসঙ্গতা হানা দেয় অন্তরে তার। মোক্ষবিনা মানুষের সঙ্গতে তার আস্থা নেই। তারপরেও অন্তরের চঞ্চলতা দূর করতে পাহাড়ের ঢালু বেয়ে অনেকটা পথ হেটে হেটে পৌছাতে হয়েছে তাকে উপজাতি পল্লীতে। সেখানে সে সাধুবেশে মানুষের শ্রদ্ধা পেয়েছে, উপেক্ষা পেয়েছে, ঘৃণাও পেয়েছে কম না। অবিশ্বাসীরা নাসিকা কুঞ্চিত করে বলেছে- এই ভরা ভোগের বয়সে তুমি বাবা কেন সংসার বিবাগী হলে? ভন্ডামী ত্যাগ কর। খেটে কাও।

মানুষের উপেক্ষার সে ভাষা তাকে আহত করেছে, করেছে বিস্মিতও। সে তো কারও কাছে কিছু চায় না, তাহলে এইসব বাণী তার জন্য কেন? তারপরেও মানুষের সাথে মিশেছে। তাদের শ্রীহীন স্বার্থপরতার চেহারা দেখে বিমুখ হয়ে ফিরে এসেছে আবার তপোবনে। আবার ধ্যানমগ্ন হয়েছে, যোগ সাধনে আত্ননিবেদন করেছে। প্রবৃত্তিকে বেধে ফেলতে সাধ্য সাধন করেছে, কিন্তু পারেনি। কেন পারেনি, তা জানে না ত্যগমান। তবে পারেনি এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। মানব জীবন যে বহুমাত্রীক, এই সত্যটা সে আবিষ্কার করতে পেরেছে। দিনের পর দিন বহুমাত্রার বিচিত্র সব চাহিদা, ক্ষুধা তাকে ব্যাতিব্যাস্ত করেছে। করে দিয়েছে অন্য রকম এক উপসী। সাহারা মরু দেখে নাই ত্যাগমান কিন্তু তার হাহাকারের দীর্ঘ্যশ্বাস সে শুনেছে নিজের অন্তরে, দেহে। এক দুই করে অনেকগুলো বছর গড়িয়ে গেছে। ত্যাগমান এখন মধ্য পৌঢ়ত্বে। কৃচ্ছ্রসাধনে সে এখন বেশ ক্লান্ত। বান্ধবহীন এই পরিবেশে কামশুদ্ধির কথা মনে পড়ে তার। বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে মন্দ হতো না। কিন্তু কোথায় এখন কামশুদ্ধি?

বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর। কাজের অবসরে ঘরের দাওয়ায় বসে আছে কামশুদ্ধি, লক্ষ্যহীন বিশ্রামে ধুমপান করে চলেছে। হঠাৎ করে বাড়ীর সামনের নির্জন পায়ে-চলা পথে কে যেন এক নারী দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। কয়েক মুহুর্ত পর তার পিছে পিছে আরও জনাদুই পুরুষ দৌড়ে গেল। ব্যাপার কি? কৌতুহলী হয়ে কামশুদ্ধি রাস্তায় এলো দ্রুত পায়ে, দেখলো একজন ঙ্খলিত বসনা নারীর পশ্চাতধাবন করেছে দুই তস্কর। নিশ্চয় মেয়েটা বিপন্ন। তস্করের হাত থেকে মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে। মুহুর্ত বিলম্ব না করে কামশুদ্ধি পিছু ধাওয়া করে লোকগুলোর। কিন্তু ওরা ওদিকে দৌড়াচ্ছে কেন? ওদিকে নগরীতো শেষ হয়ে গেছে। ওদিকে তো পাহাড়ে শেষ হয়েছে সব পথ। ওদিকেই তো পথের সেই ত্রিশাখা, যেখানে তার বন্ধু ত্যাগমান তাকে বিদায় জানিয়েছিল অনেকগুলো বছর আগে। কামশুদ্ধি দৌড়াচ্ছে পথের সেই সংযোগের দিকে। ওদিকে দুপুরের আগে এই সময়টাতে ত্যাগমান পাহাড়ে তার তপোবনে বসে নিস্পলক সাগর দেখে। আজ হঠাৎ করে রাস্তার দিকে দৃষ্টি যায় তার। একজন নারী ও দুই তিনজন লোকের ছাটাছুটি তার নজরে আসে। সুন্দরী মেয়েটা নিশ্চয় বিপন্ন। তস্করদের হাত থেকে নারীকে বাচাতে হবে। সূর্য্যের তীব্র আলোতে স্খলিত বসনা নারীর দেহের সব ভাজ রেখা যেন ত্যাগমান সুমার করে ফেলে। তার ভেতরে জানি কি এক ব্যাপার ঘটে যায়। হাতে ত্রিশুল নিয়ে সে দ্রুত পায়ে নেমে আসে রাস্তায়। ঠিক পথের সেই তেমাথায় চলে আসে সে। জটাধারী সন্যাসীর হাতে ত্রিশুল দেখে পালিয়ে যায় তস্কর। মুগ্ধ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ত্যাগমান স্খলিত বসনার দিকে। কিছুসময় পরে সেখানে দৌড়ে এসে হাজির হয় কামশুদ্ধি। কিন্তু কেউ কাউকে চিনতে পারে না। তার দিকে চমকে তাকায় ত্যাগমান। হাতে উদ্যত ত্রিশুল, মুখে তার আগুন ঝরে।
-জান বাঁচাতে চাইলে পালা। নইলে এই ত্রিশুল দিয়ে এফাড় ওফোড় করে দেব। দূর হ তস্কর।
ত্রিশুল নিয়ে তেড়ে আসে ত্যাগমান। তার চোখ দুটো জ্বলতে থাকে ইটের ভাটার মত।
-আমি তস্কর নই, আমি ওকে বাঁচাতে এসেছি। ওকে আমি নিয়ে যাব নগরের পুণর্বাসন কেন্দ্রে।
ঘটনার আকষ্মিকতায় ভয় পেয়েছে কামশুদ্ধি। কথা বলতে তার কণ্ঠ কেঁপে যায়।
-তবেরে ভন্ড প্রতারক। আবার ফিরে এসেছিস ভাল মানুষের ছুল ধরে? এই নে…..
কামশুদ্ধির পেটের গভীরে ত্রিশুল এফোড় ওফোড় ঢুকিয়ে দেয় সন্ন্যাসী। মেয়েটার হাত ধরে পাহাড়ের দিকে চলে যাবার প্রস্তুতি নেয় সে। তীব্র একটা চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকে কামশুদ্ধি।
-এ তুমি কি করলে ত্যাগমান?
যুবতি নারীর হাত ছেড়ে দেয় জটাধারী সন্ন্যাসী। চমকে তাকায় পিছনে। দৌড়ে ছুটে আসে সে আহতের কাছে। কামশুদ্ধির মাথাটা কোলে নিয়ে মাটিতে বসে পড়ে। বিলাপ করতে থাকে উচ্চস্বরে।
-আমি তোমাকে চিনতে পারিনি বন্ধু। আমি মহাপাতক। আমার মরণ হোক।
-আমি তোমাকে চিনেছিলাম, ত্যাগমান- ঠিকই চিনেছিলাম।
-কিন্তু কেন একবার নিজেকে প্রকাশ করনি? কেন একবার আমার নাম ধরে ডাক দিলে না, কামশুদ্ধি?
-তুমি কি কর, তাই দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। এমন কিছু ঘটবে কে জানতো। আহ্‌ আহ্‌ । আমার সময় প্রায় শেষ, বন্ধু।
-খুব কষ্ট হচ্ছে, কামশুদ্ধি? বেশি কথা বলো না। তোমার ভীষণ বেদনা হচ্ছে। আমি পাপী, মহাপাপী।
-ওকথা বলো না, ত্যাগমান। শেষ বারের মত আমাকে কিছু বলে যেতে দাও। যত কষ্টই হোক আমাকে বলতে দাও।
-বলো, বলো।
চোখের জলের ধারায় ত্যাগমানের জটা-দাড়ি সিক্ত হয়। পাপ বোধে তার অন্তর গলে পানি হতে চায়।
-দেখ বন্ধু, আমরা কেউই মোক্ষ লাভের সেই সত্যটাকে প্রমাণ করতে পারিনি। সব দেখে বুঝে মনে হচ্ছে- আমার পথও ভুল, তোমার পথও ভুল।
-সেটা কেমন করে, কামশুদ্ধি।
-দেখ বন্ধু, কঠিন কৃচ্ছ্রসাধন তোমাকে দিয়ে তিনটি পাপ করিয়েছে- নরহত্যা করিয়েছে, কামপ্রবৃত্তির কাছে আত্মসর্ম্পন করিয়েছে, অন্ধ করেছে তোমাকে- যার জন্য তুমি বন্ধুকে চিনতে পারনি। কৃচ্ছ্রতা তোমার এমন একটা চরিত্র গড়ে দিয়েছে। বিদায় বেলায় তোমাকে আঘাত দিয়ে গেলাম না তো?
-না, না কামশুদ্ধি আঘাততো আমি তোমাকে দিয়েছি। তুমি বলে যাও, যতক্ষণ পার বলে যাও।
-দেখ বন্ধু ত্যাগমান, প্রত্যেক মানুষের ভেতরে একটা সত্য মানব থাকে। ভেতরের সেই সত্য মানুষটাকে সবসময় বাইরের মানুষের সংস্পর্শে রাখতে হয়। তুমি তা রাখতে পারনি তাই এত কিছু ঘটে গেল। আমি রেখেছিলাম। তাই হয়তো ভয়াবহ কিছু হয়নি আমার দ্বারা। তবে একথা ঠিক- আমরা কেউই মোক্ষ লাভ করতে পারিনি। আমাদের কারও পথই সত্য প্রমানিত হয়নি। মানুষই শেষ কথা- তাকে নিয়ে ভেবো বন্ধু, একটু ভেবো। আহ্‌ আহ্‌, আর পারছি না ত্যাগমান। আমার সময় শেষ। পারলে আমায় ক্ষমা করো। আহ্‌ আহ্‌।

কামশুদ্ধির শ্বাস ওঠে। মুখ দিয়ে হড়হড়িয়ে বেরিয়ে আসে এক তাল রক্ত, যে রক্তে লাল হয়ে ভিজে থাকে রাস্তার তিনমাথা। তার বুকে হাত চাপা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে ত্যাগমান। এই মুহুর্তে তার কিছু একটা সাহায্য চাই এবং তা আসতে পারে ঐ ঊর্ধ্বলোক থেকে। এটা তার বিশ্বাস- হাজার বছরের সংস্কার। কিন্তু কোন সংস্কারে শেষ রক্ষা আর হয় না। চোখের জলে ভিজিয়ে শেষ বিদায় জানাতে হয় বন্ধু কামশুদ্ধিকে।

বন্ধুর সৎকার শেষ হয়েছে। এবার যেতে হবে। প্রস্থানের প্রস্তুতি নেয় ত্যাগমান। হঠাৎ করে মেয়েটার কথা মনে পড়ে যায়। তাইতো একেবারে ভুলেই গিয়েছিল বিপন্ন নারীর কথা সে। ঐতো অদূরে বেলাভূমে বড় পাথরটার গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে নারী। টালমাটাল পায়ে তার কাছে পৌছালো ত্যাগমান। মন তার বন্ধু শোকে ভারাক্রান্ত। গলা খাকারী দিল সে, কিছু একটা বলতে চায় মেয়েটিকে।
-তোমার পরিচিত কোন আবাস যদি থাকে চলো সেখানে তোমায় পৌঁছে দিয়ে আসি, নারী।
-সন্যাসী প্রবর, আমি পুরনারী- সম্ভ্রান্ত গৃহস্ত ঘরের কন্যা। এই অবস্থায় আমাকে সমাজ গ্রহণ করবে না।
-এখন আমি কি করতে পারি নারী, তোমার জন্যে? বলো, আমার সাধ্য থাকলে তাই করবো আমি।
-আমি বিপন্ন, আমি পতিত। কি করতে হবে কোন মেয়ে কি তা মুখ ফুটে বলতে পারে? যদি সম্ভব হয়, নারীত্বের মর্যাদায় ঐ সন্ন্যাসী চরণে যেন একটুখানি আশ্রয় মেলে এই হতভাগিনীর।
-মন্দ বলোনি। তবে চলো নারী, হাত ধরো। এস পাশাপাশি হেটে হেটে চলি।
-কোথায় যাবে তবে। তপোবনে? নগরে?
এক মুহুর্তে না ভেবে সন্ন্যাসী বলে- না, চলো আদর্শ গ্রামে। অতঃপর দ্রুত পায়ে ত্যাগমান পুরনারীর হাত ধরে আদর্শ গ্রামের পথে অদৃশ্য হয়ে যায়। পিছে পরিত্যক্ত পড়ে থাকে আরাধ্য সন্ন্যাস। বামপাশের তপোবন, আর ডান পাশের সুগন্ধ নগরী বিদ্রুপের বাকা অট্রহাসির ঝড় তোলে ওদের পেছনে। সেদিকে ওরা আর ফিরেও তাকায় না।

[54 বার পঠিত]