স্টেশনে লোক গিজ গিজ করছে। সকাল বেলার এই সময়টাতে একসঙ্গে কয়েকটি আপ এবং ডাউন ট্রেনের যাত্রী এ স্টেশনে ওঠানামা করে। ফলে এ সময় উচ্চশ্রেণীর পাশাপাশি প্রচুর শ্রেনীহীন ছিন্নমূল যাত্রীদেরও আনাগোনা দেখা যায়। এতে ভদ্রলোকেরা বিরক্তিতে নাক কুঁচকালেও শ্রেনীহীন মানুষগুলো পরোয়া করে না। গন্তব্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এরা কেবল ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড়ায়। এমন কি ধাক্কা দিয়ে কাউকে ফেলে দিলেও এরা ফিরে তাকায় না।
আজ সকালে প্রায় সবকটি ট্রেনই লেট। মে মাসের মাঝামাঝির সূর্য চারদিকে গনগনে রোদ ঢালছে। সকাল আটটা বেজেছে কি বাজেনি কিন্তু রোদের তাপে মনে হচ্ছে ভর দুপুর। সূর্যটা তির্যক ভাবে প্লাটফর্মে রোদ ঢালছে। কোথাও ছায়া নেই। এরই মাঝে একটা থামের আড়ালে বসে আছে শাবানী আর তার মা আলেখা বানু।
শাবানীর গায়ে কালো বোরকা, কোলে চৌদ্দদিনের শিশু। শিশুটি কন্যা। গরমের তাপে শিশুটি কাঁদছে কিন্তু তার কান্নার শব্দ এতই ক্ষীণ যে হট্টগোলকারী জনতার শব্দ ছাপিয়ে সেই শব্দ তার মায়ের কানেও যাচ্ছে কিনা সন্দেহ। আলেখা বানু নিজের বোরকা খুলে কাপড়ের আঁচল দিয়ে কন্যা এবং নাতনিকে বাঁচাতে চেষ্টা করছেন। বাচ্চাটা যে কাঁদছে শাবানীর সেদিকেও খেয়াল নেই। এমনভাবে বসে আছে যেন কোলের মেয়েটি তার নয়। আলেখা বানু ডাক দিলেন, শাবানী, অ শাবানী, মাইয়াডারে একটু শক্ত কইরা ধর। অর খিদা লাগসে। একটু বুকে নে। দ্যাখ একটু দুধ পায় কিনা। শাবানী নড়ে চড়ে বাচ্চাটার দিকে তাকায় তারপর আনাড়ী হাতে বোরকার বোতাম খুলে মেয়েকে বুকে নেয়ার চেষ্টা করে। প্রথম বাচ্চার মা, এমনিতে আনাড়ী তারপর বাচ্চা হওয়ার পর থেকে মায়ের পেটেও কি একবেলা ভালো করে ভাত পড়েছে যে দুধ আসবে? পেট থেকে পড়ার পর থেকে দিন দিন তাই চিমসে যাচ্ছে বাচ্চাটা। হয়তো মারাই যাবে – কথাটা মনে আসতেই মনে মনে তওবা কাটেন আলেখা বানু, আল্লাহ্‌, আল্লাহ্‌ মরব ক্যান। মাফ কইরো আল্লাহ্‌। কত আদরের মেয়ে তার শাবানী। কতই বা বয়স হইছে মাইয়ার। পনেরোয় পা দিতে না দিতে তো বিয়া অইল আর এখন ষোল বছর সাত মাস। ওরেই তো এখনো দুধের শিশু মনে হয় তার। একথা ভাবতেই চকিত স্মৃতি উঁকি মেরে যায় মনে। মনে হয় এই সেদিন বিয়ের পরে শাবানীর বাপের সাথে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। ভৈরবের সেই সিনেমা হলে বসে সিনেমা দেখতে দেখতেই নতুন বউয়ের কানে কানে রহমত মিয়া বলেছিলেন, সিনেমার এই সুন্দর মাইয়াডার নাম কি জানো?
– কি? অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন আলেখা।
– শাবানা। শাবানা। এরে কয় নায়িকা। আমাগো একটা মাইয়া অইলে হের নাম রাখুম শাবানা।
– যাহ, বলে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়েছিলেন স্বামীর গায়ে।
আর যখন মেয়েটা হল তখন সত্যি সত্যিই রহমত মিয়া তার নাম রাখল শাবানা। কিন্তু পাড়ার মানুষের মুখে মুখে শেষ পর্যন্ত নাম হয়ে গ্যালো শাবানী। তবে এটা ঠিক যে মেয়েটা কিন্তু হয়েছিল বেশ ফুটফুটে।
– মা ও মা কি এতো ভাবো? মাইয়াটারে ধরো। আমি আর পারি না, পানির পিপাসায় আমার ছাতি ফাইট্যা যাইতাছে। আমি পানি খামু।
– পানি? অসহায় চোখে আশেপাশে তাকালেন আলেখা বানু।
– পানি কই পাবি? এইখানেতো কোন কল নাই।
– ওই যে বোতলে পানি বেচতাছে। দ্যাখনা ঠান্ডা পানি। মাগো আমারে একটু ঠান্ডা পানি খাওয়াও না, কইলজাটা ফাইট্যা গ্যাল গো মা।
অনেক দরাদরি করে এক বোতল পানি কিনল মা মেয়ে। এক বোতল পানি দুই গ্লাসও হবেনা, বলে দশ টাকা। কী আজব কথা? পানির এত দাম! আঞ্চলের খুঁটে বাঁধা আশিটি টাকা থেকে গুনে গুনে দশটি টাকা দিতে বুকটা ভেঙে যেতে চায় তার। মেয়ের বাচ্চা হওয়ার খবর পেয়ে এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে তিনশটি টাকা ধার করে ঢাকা এসেছিলেন আলেখা বানু।
পানি খেয়ে শাবানীর শরীরে যেন একটু প্রান আসে। সেই সকালে না খেয়েই পথে বেরিয়েছে মা-মেয়ে।পথে বেরিয়েছে না বলে বলা উচিত বের করে দিয়েছে! শাবানীর বুকটা হু হু করে উঠে। চলে আসার সময় শোয়া থেকে একবার উঠলনা লোকটা! কাল সারারাত কতো কেঁদেছে, কত হাতে পায়ে ধরেছে – আমারে বিদায় দিওনা। আব্বায় মইরা যাওনের পর থেইকা মায় কত কষ্ট কইরা চলে। আমারে কে দেখব, কে খাওয়াইব? কিন্তু লোকটা যেন পাথর! একবার খালি কইল- তুই মাইয়া হওয়াইলি ক্যান?
শাবানীর পর পর আর চারটা ভাই বোন হলেও একটাও বাঁচেনি। এজন্য শাবানী ছিল বাপ মায়ের চোখের মনি!বাবা মানুষের খেতে মুনিষ খাটলেও শাবানীর কখনও ভাত পানির কষ্ট হয় নি। বরং মেলা থেকে চুড়িটা – ক্লিপটা, মাটির পুতুলটা বাবা ঠিকই এনে দিত। সেই বাপই সুখের আশায় শাবানীকে বিয়ে দিল ঢাকা শহরে থাকা ছেলের সাথে। ঘটক মজু যখন সম্বন্ধ এনেছিল তখন বলেছিল ছেলে ঢাকায় কারখানায় চাকরি করে। একটাই ছেলে বাপ মায়ের। দুই বোন ছিল, বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা খুব খুশী হয়েছিলেন। ধার দেনা করে করে জামাইকে ঘড়ি, আংটি আর দশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। মেয়ের সুখ হবে, ঢাকা শহরে থাকবে এই ছিল তার স্বপ্ন!
হায়রে, বিয়ের দুই সপ্তাহ পর ঢাকায় এসে শাবানীর কলজেটা চুরমার হয়ে গেল। যেখানে এসে উঠল, সেটাকে বলে নাকি বস্তি! একটা ঘরের মধ্যে কাপড় দিয়ে আব্রু টেনে একপাশে শ্বশুর-শাশুড়ি আর একপাশে ছেলে-বউ। পায়খানা, কলঘর, এমন কি চুলাটা পর্যন্ত আর দশটা গেরস্তের সঙ্গে ভাগাভাগির। প্রথম প্রথম স্বামীর সঙ্গে ঘুমাতে গেলে লজ্জায় মরে যেত শাবানী। স্বামীকে বলত আমার শরম করে ওনাগো লগে একঘরে শুইতে। আরেকখান ঘর লওনা অন্তত মাইঝখানে একখান বেড়া দেওয়া। “হ, ঢাকা শহরে ঘর এত সস্তা?” তার স্বামী বলত, তুই জানস এখানে থাইকবার গেলে কত বাসা ভাড়া দিতে অয়? চুপ যা, থাইকবার পারলে থাক, নাইলে বারিত যা।
শাশুড়ি বাসা বাড়িতে কাজ করে আর শ্বশুর রিক্সা চালায়। রান্না-বান্না, কাপর ধোয়া সব কাজ শাবানীকে একা করতে হয় এবং অবাক হয়ে শাবানী দেখে তার স্বামী আসলে কিছুই করেনা। বস্তির মুখে বসে সারাদিন আড্ডা দেয় আর জুয়া খেলে। সুযোগ পেলেই মা বাপের পয়সা চুরি করে। এই চুরি করা নিয়ে মা ছেলে আর বাপ মিলে এক একদিন এমন ঝগড়া শুরু হত যে তার মনে হত আজকে মনে হয় একজন খুন হয়ে যাবে। তারপর ঝগড়া থামলে আবার যে কে সেই! বাপ মা কাজে চলে গেলে ছেলে খেয়ে দেয়ে তার মত বের হয়ে যেত। একদিন শাবানী বলেওছিল – তুমি কাম কর না ক্যান? ওনারা না বুড়া অইছে? ওনাগো খাওয়ানোর কামতো এখন তোমার। শুনে ধেয়ে এসেছিল লোকটা! শাসিয়ে বলেছিল…
– আর কোনদিন যদি এমুন কতা কইবি তো তোরে লাত্থি মাইরা বাইর কইরা দিমু। কি আমার দরদী আইছেরে, যা যা…

– অ শাবানী মাইয়া কান্দেতো, এমুন আলগা কইরা রাখছস ক্যান? একটু জরাইয়া মরাইয়া ল।
তাড়াতাড়ি মেয়েকে বুকে নেয় শাবানী। আশ্চর্য জন্মের পর থেকে এতো কষ্টের পরও মাইয়াডা বাইচ্যা আছে। শুকিয়ে যাওয়া চোখ থেকে দু’ ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে তার।
প্রচন্ড গরমে মানুষের থিকথিকে ভিড়ে বাচ্চাটা তবুও চিঁ চিঁ করে কাঁদতে থাকে।
– অর গলা শুকায়া গ্যাছে লাগে যেমুন, এট্টু পানি দিবা মুখে?
– কি কস? এত ছোড মাইনসেরে কি পানি খাওয়ান যায়?
– দাও না মা।
বোতলের অবশিষ্ট পানিটুকু ঢাকনাতে নিয়ে আস্তে আস্তে খাওয়াতে থাকেন আলেখা বানু। আর ভাবেন, আহারে, মায়ের বুকে দুধ নাই, আসলেই তো গলা শুকাইয়া কাঠ। বুভুক্ষু শিশুটি পানির ফোঁটাগুলো চেটে চেটে খায় আর মা-মেয়ে সব কষ্ট ভুলে তা চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে।
– আরে খালা? তোমরা এইহানে কোত্থেইকা?
মা মেয়ে একসঙ্গে চোখ তুলে তাকাতেই অবাক হয়ে গ্যালো!
– দুলাল – তুমি কোইত্থেইকা আইলা?
– আমি তো ঢাকায় থাকি খালা। এখানে গারমেন্টে চাকরী করি।
– শাবানী, তুমারে এমুন লাগতাছে ক্যান?
শাবানির ভাল লাগেনা দুলালের দরদমাখা কথা। সে তাড়াতাড়ি ঘোমটা টেনে দেয়।
– অ খালা দ্যাহ দ্যাহ, শাবানী আমারে দেইখা ঘোমটা টানে! তা কোলে কি ছাওয়াল না মাইয়া?
– মাইয়া। আলেখা বানু বলেন।
– তা তুমি কই যাও বাপ? বাড়িত যাইবা?
– হ খালা বাড়িত যামু।
কথা বলতে বলতে দুলাল তাদের পাশে বসে, কাঁধের ব্যাগ আর হাতে ঝোলান লাল বস্তুটি পাশে রাখে।
সব ভুলে আলেখা বানু বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করেন
– লাল মতো ওইডা কি বাপ?
পাতলা সাদা নেটে বাঁধা জিনিসটার দিকে তাকিয়ে হাসি ফুটে উঠল দুলালের মুখে – এইডা পটি।
– পটি? পটি কি?- আলেখা বানু জানতে চান।
সঙ্গে সঙ্গে উৎকর্ণ হয় শাবানী।
– পটি হইল গিয়া বাচ্চাগো পাইখানা। ছোড বাচ্চারা এইটাতে বইস্যা পাইখানা করলে সাফ করতেও সুবিদা আর এইডা নাকি স্বাস্থ্যের জইন্য ভালা। শহরের বড়লোকেরা তাগো ছাওয়াল-পাওয়ালের জইন্য ব্যাভার করে। তো এখন প্যালাস্টিকের বাইর অইছে। তাই তোমার নাতির লাইগ্যা একটা কিন্যা নিলাম।
– ও তোমার ছাওয়াল অইছে? শাবানী এতক্ষণ পরে একটা কথা বলে।
– হ, পাঁচমাসে পড়ছে।
– অ, বলে চুপ করে যায় শাবানী।
তার মনের ভিতর জমে থাকা কান্না কষ্ট বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়। কোনমতে নিজেকে সামলে মেয়েকে বুকে নিয়ে পাষাণ প্রতিমার মত বসে থাকে।
আলেখা বানু লাল পটিটার দিকে বার বার তাকান। আহহারে কপাল। ভাগ্যের ফের! নাহলে আজকে এই পটিটা শাবানীর ছেলের হতে পারত। দুলাল হতে পারতো তার ঘর আলো করা জামাই। তার মনে পড়ে ননদের ভাগ্নে দুলাল ছোটবেলা থেকে তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতো মামীর সাথে। তারপর একটু বড় হতে আরো বেশি আসত এবং সেটা যে শাবানীর টানে তা বুঝতে বাকী ছিল না কারও। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ে ছেলেটা যাত্রাদলে ঢুকল। তার শখ যাত্রাপালা করবে। নায়ক হবে। বাঁশি বাজাত, গানের গলাও ছিল ভাল। একবার দুবার তাদের গাঁয়েও পার্ট করতে এসেছিল। তারপর যখন শাবানীকে বিয়ের প্রস্তাব দিল তখন রহমত মিয়া সাথে সাথে ফিরিয়ে দিলেন। রাগ করে বলেছিলেন- কাম কাইজ নাই, খালি যাত্রা কইরা গেরামে গেরামে ঘুরব, আর আমার মাইয়া খালি ঘরে বইয়া কানবো। আমি বিয়া দিমুনা এইহানে। মেয়েরো পছন্দ ছিল দুলালকে কিন্তু বাপের ভয়ে রা কাড়েনি।
– খালা, চল চা খাই, ঘোষণা দিছে গাড়ি লেইটে আইব।
– নারে বাপ আমি চা খাইনা। বমি বমি লাগে।
– তাইলে ঠান্ডা খাও, ডিরিংস আছে, কিছু খাও। শাবানি ছোড মানুষ অর তো কষ্ট হইতাছে! আবার কোলে ছোড মাইয়া, এসময় না খাইয়া কতক্ষন থাকবার পারে?
দুলালের কথা শুনে শাবানীর ইচ্ছা করে কোন খোলা প্রান্তরে গিয়ে বিলাপ করে কাঁদতে। হায় যার মেয়ে তার যদি সামান্য মায়াও থাকতো বাচ্চাটার জন্য!
তবু সে শক্ত হয়ে থাকে। তার মনে হয় দুলালের সাথে তার দেখা না হলেই ভাল ছিল। এমন দুঃখের দিনে দুলালের সুখ দেখে তার ভিতরটা ভেঙে চুরে যাচ্ছে! নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। যে একদিন তাকে চেয়েছিল আজ তার সামনে দুর্দশাগ্রস্ত শাবানীর মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করছে।
তবুও মাথা তুলে প্রশ্ন করে- তুমি এখন যাত্রা করনা দুলাল ভাই?
– নাহ, অইসব কবেই ছাইরা দিছি।
– ক্যান ছারলা ক্যান? তুমি না নায়ক হইবার স্বপ্ন দেখতা, যাত্রাদলের নায়ক!
দুলাল অবাক হয়ে দ্যাখে – এত দুর্বল শরীরের মেয়েটার কথা এত শক্ত শোনাচ্ছে কেন? সে কি পুরানো কথা ভোলেনি? এখনো মনে রেখেছে দুলালকে?
– হ শাবানী, স্বপ্ন আর জীবন কি এক? আব্বায় মারা গ্যালে সংসারের ভার পড়ল। আমি বড় ছাওয়াল। গেরামের কাম শিখি নাই, যাত্রা কইরা বেড়াইছি, তাই শহরে গিয়া গারমেন্টে কাম নিলাম।
– হ, তয় আগে নিলা না ক্যান?
দুলাল অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। একি প্রশ্ন শাবানীর। আর কথার মধ্যে কেমন রাগ ঝরে পড়ছে।
– আইচ্ছা, পুরানা কতা লইয়া প্যাচাল পাইড়া লাভ নাই, বও দুলাল বও, আলেখা বানু বলে ওঠেন।
দুলাল ম্লান হাসে। সে তো জানতো না যে শাবানীও তাকে চাইত। তাহলে তো সেদিন সব বাধা ডিঙিয়ে শাবানীকে ঘরে তুলত। ভীষণ মায়া হলো দুলালের। আজকের এই শাবানীর সঙ্গে সেই কিশোরীর মিল কোথায়? এতো একটা নারী কঙ্কাল! তবু বুকের মধ্যে এই শাবানীর জন্য গভীর মমতা বোধ করে।
– মা চল, বলেই হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় শাবানী। আর দাঁড়াতে পা দুটো টলে যায়, মা তাড়াতাড়ি ধরে ফেলে। বাচ্চাটা ঘুমে না জাগরণে কোঁকিয়ে ওঠে।
– কই যাবি? এহনতো গাড়ি আহে নাই।
ধপ করে আবার বসে পড়ে শাবানী। ওদের অবস্থা দেখে বিচলিত হয় দুলাল। বলে তোমরা ঠাণ্ডা কিছু খাও, আমি নিয়া আসি।
– না খামু না, আমাগো কিছু খাওয়ানো লাগবোনা।
দুলাল অবাক হয় কথা বলতে গিয়ে শাবানীর দু চোখে যেন আগুন ঝরছে।
– আমার কতা হুন, আমি এক দৌড়ে যামু আর আমু। বলতে বলতে স্টেশনের খাবারের দোকানের দিকে হনহন করে হাঁটতে থাকে।
– মা ওড।
– ক্যান দুলাল আইব তো।
– না আওন লাগবোনা। তুমি থাক, আমি এহানে আর এক দণ্ডও থাকুম না। দরদ দেখাইতে আইছে, দরদ! বিদ্রূপ ঝরে পরে শাবানীর কন্ঠে।
মেয়ে হাঁটতে শুরু করেছে দেখে আলেখা বানুও উঠে দাঁড়ান। মেয়েকে মায়ের কোলে দেয় শাবানী। তারপর বলে, চল।
– কোনদিকে যামু? আলেখা বানু জানতে চান।
– উই যে উই দিকে যেখানে মানুষ থিকথিক করতাছে, সেই দিকে চল।
– দুলালের ব্যাগ, ছাওয়ালের পটি এইগুলান তো চুরি হইয়া যাইব।
– হোউক, অয় কি আমাগো চকিদার ঠাউরাইছে?
কিছুদূর হাঁটার পর থমকে দাঁড়ায় শাবানী। পিছন ফিরে তাকায়। তারপর মাকে দাঁড়াতে বলে ফিরে যায় আগের জায়গায়। একটু ভেবে পটিটা তুলে নেয়। তারপর শরীরের সব শক্তি দিয়ে পটিটা ছুঁড়ে দেয় প্লাটফর্মের বাইরের ঝোপের ভিতর।
তারপর বিড়বিড় করে বলে ওঠে – সুখ, সুখ শুধু তোমার আর যত দুখ শাবানীর। তাই সুখ দেখাইতে আইছ!
কান্না আসে চোখ ছাপিয়ে। বোরকার আড়ালে সে কান্না চেপে ভিড়ের মাঝে মিশে যায় শাবানী।

[213 বার পঠিত]