কলেজ ছাত্র লিমনকে ড়্যাব [পড়ুন: রক্ষী বাহিনী এগেইন ব্যকড] যখন পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে, তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়, তখন একজন তরুণ সাংবাদিক সহকর্মী রাগে ক্ষোভে দুঃখে ফেসবুকে লিখেছিলেন, আগামীবার ভোট দেওয়ার সময় মনে করবো, আমার একটি পা হাঁটুর নীচ থেকে নেই!

[হ্যাঁ। সাংবাদিকও ভোট দেন, কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলকে নিরবে সমর্থন করেন; তবে সংবাদ লেখার সময় সাংবাদিককে অবশ্যই হতে হয় বস্তুনিষ্ট, দলমত নিরপে। ব্যক্তিজীবনেও তার দলবাজী করার উপায় নেই; সেটি কাম্যও নয়। তবে তিনি কর্মেেত্রর বাইরে ফেসবুক টুইটার ব্লগ বা উপসম্পাদকীয় এবং অবশ্যই টকশোতে নিজস্ব মত প্রকাশ করতে পারেন।]

আমরা তথ্য সাংবাদিকরা তখন ধরেই নিয়েছিলাম, মারাত্নক খুনে কালো পোষাকধারী বাহিনীটিই বুঝি ক্রসফায়ার/এনকাউন্টার ইত্যাদি গালভরা বিনাবিচারে হত্যাযজ্ঞের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক-শয়তান-শিরোমনি। অন্যদিকে চেঙ্গিস বাহিনীর দাপুটে আস্ফালনেও বুঝি ম্লান হতে বসেছিলো পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে অন্তত চার দশক ধরে চালানো সেনা-বাঙালি সেটেলার পাকিপনার কাছে।

মাঝে বিডিআর বিদ্রোহ, সেনা বাহিনীর ব্যর্থ প্রায় অভ্যুত্থান আমাদের সাময়িক দিকভ্রান্ত করেছিলো। গভীর ভাবনায় ফেলেছিলো, এই সব বর্বরতা বনাম চেঙ্গিস-হালাকু-কুবালাই-তুগ্রিল কোং এর মধ্যে কে বেশী বর্বর-শ্রেষ্ঠ? ব্রিটিশের স্বদেশী বিপ্লবী ঠেঙানো পুলিশরাজ? ৫২-র ভাষা আন্দোলন ও ৬২-র শিক্ষা আন্দোলনে গুলি চালানো পুলিশ গং? কিন্তু ৭১ এর ২৫ মার্চ স্বাধীনতার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলা রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বীর সেনানীরা তো ছিলেন! তাহলে? এই পুলিশই কী আবার কৃষকের সন্তান হয়ে, স্বাধীন দেশের প্রথম সরকারের লেঠেল বাহিনী হয়ে কৃষক বিপ্লব/ সর্বহারারাজ প্রতিষ্ঠায় মত্ত সিরাজ সিকদারকে বিনা বিচারে খুন করে ক্রসফায়ার/এনকাউন্টার/বন্দুকযুদ্ধের রূপকথার জন্ম দেয়নি? তাহলে?

আমরা খানিকটা বিস্মৃত হয়েছিলাম, সাভারের লাল মাটি এবং দিনাজপুরে ধর্ষনের পর খুন হয়ে যাওয়া ইয়াসমিনের [২৪ আগস্ট, ১৯৯৫]প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য গ্রহণ করতে। তারা প্রত্যেকেই আমাদের বার বার নিঃশব্দ চিৎকারে বলেছে, শেখ মুজিব, ইত্যাদি, জিয়া, এরশাদ, খালেদা, হাসিনা, খালেদা, মইন-ফখরুদ্দীন এবং হাসিনার সরকারে তুমি ব্যবহৃত হও, বরাবর তুমি ব্যবহৃত হও। প্রতিবার সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে দলবাজীর বন্দুকবাজ হিসেবে তুমি ব্যবহৃত হতে হতে রাজনৈতিক বেশ্যার খাতায় পোষাকি বাহিনী হিসেবে নাম লেখাও।

‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ বা ‘ট্রাফিক আইন মেনে চলুন’ ফাঁকা বুলির আড়ালে সাবেক খাকি ও নীল/সবুজ, বর্তমান ফিকে সবুজ বাহিনীর পুলিশ তুমি ভেতরে ভেতরে থেকে যাও একই রকম রক্ত লোপুপ জান্তব। রাজনৈতিক দলের বেশ্যাগিরি করতে করতে তুমি নিজেই প্রাতিষ্ঠানিক পুরুষ/না-পুরুষ বেশ্যায় পরিনত হও।

তাই তোমাকে যায়. আজ্ঞাবহ লেঠেল রূপে লে. জে. এরশাদ সরকার বিরোধী ছাত্র মিছিলে ট্রাক চাপায় খুন করা সেলিম-দোলোয়ার, গুলিতে আয়ুব, জাফর, দীপালীসহ প্রায় ৫০ জন [১৯৮৩], আরো পরে নূর হোসেন [১০ নভেম্বর, ১৯৮৭] হয়ে প্রায় ২০০ ছাত্র-জনতা [১৯৮২-১৯৯০]।

ব্যাজের নৌকা খসে পড়ে, ধান এবং প্রায় বিলুপ্ত পাট যুক্ত হয়। তোমার খাইখাই কমে না, লোভ/পাপ কিছুরই কমতি হয় না। যে ঘুষ দিয়ে তুমি চাকরি/পদন্নোতি/বদলী/নিয়োগ/পোষ্টিং ইত্যাদি পাও [এই ঘুষ চক্র রেল ও জেল পুলিশকেও ছেড়ে দেয় না, পড়ুন — কালো বিড়াল কিচ্ছা, সুরঞ্জিত], এই বিনিয়োগের ঘুষ তুলে নিতে তুমি আবারো ঘুষ [পুলিশী ভাষায় — সামারি] বাণিজ্যে ডুবে যাও, [নামমাত্র বেতন এবং দশাসই উপরিতে তফাৎ যাও পুলিশ সংস্কার, সব ঝুট হ্যায়] তোমার ভুঁড়ি বাড়ে, বিলাস বাড়ে, অর্থ-বিত্ত জমে, বন্দুক ও দলের জোরে মতা আকাশচুম্বী হয়, কনস্টেবল থেকে স্বরাষ্ট্র-সাহারা পর্যন্ত ’ধরাকে সরা জ্ঞান’ করার চর্চা বাড়ে।

আমরা সাংবাদিকরাও মানুষ বটে; হাড়ভাঙা পেশাগত খাটুনির বাইরে, আমাদের তো মেলাতে হয় চাল-ডাল-নুনের হিসেব, বাচ্চার দুধ-ডিম-পেন্সিল-স্কুলের খরচ জোগাতে আমাদেরও ওঠে নাভিশ্বাস! নানান তথ্য-সন্ত্রাসে আমরা নিজেরাও বিভ্রান্ত হই…অনেকই ভুলে যাই, টাকা পেলেই পুলিশ যে হাসে, আর ওই হাসিতে লাক্স-মেরিল ফটো সুন্দরীও কি ম্লান, সে কথা।

ভুলে যাই, বছর পনেরো আগে ডিবি পুলিশের পানির ট্যাংকিতে পাওয়া ড্রাইভার জালালের গলিত লাশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র রুবেলকে ডিবি পুলিশের হত্যা, এই সেদিন খিলগাঁ থানায় ঢাবি’র আরেক ছাত্র কাদেরকে চাপাতি দিয়ে কোপানো, বেগমগঞ্জ ও সাভারে আসামীকে উন্মত্ত জনতা/সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দিয়ে ‘গণপিটুনি’তে মেরে ফেলা…ইত্যাদি ইত্যাদি [চলবে অথবা যে গল্পের শেষ নেই]।

এবং অতি অবশ্যই পুলিশের তাবৎ মামলাবাজীর তেলেসমাতির কথাও প্রায়শই আমরা প্রায়শই বিস্তৃত হই, বিস্তৃত হই ‘আকাশের যতো তাঁরা/পুলিশের ততো ধারা’ অথবা ‘আ টু স্টার সাব-ইন্সপেক্টর/ ইজ পাওয়ারফুল মোর দেন আ মিনিস্টার’ ইত্যাদি প্রবচনে।

মাঝে সাগর-রুণি হত্যায় স্বরাষ্ট্র সাহারার ‘ঘন্টার’ চাপাবাজী এবং ‘প্রধানমন্ত্রীর বেড রুমের নিরাপত্তা’ দিতে অপারগতা প্রকাশ আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে। আমরা পথে নামি, বিচার চাই! বিচার চাই!

আমাদের এক লহমায় মনে পড়ে যায়, গুম খুন, ইলিয়াস এমপি নিখোঁজ নাটকসহ আদ্যপান্ত তাবৎ পুলিশী কীর্তি। বেতন ভাতার দাবিতে পুলিশের জলকামান/লাঠিপেটায় ঢাকার রাজপথে ভবলীলা সাঙ্গ হয় এক শিক্ষকের। আমাদের খানিকটা চেতনা জাগ্রত হয়। পলিটেকনিক কলেজ ছাত্রী মিছিলে ছবি তুলতে গিয়ে ফটো-সাংবাদিক বেদম প্রহারের শিকার হলে আমরা নড়েচড়ে বসি [আগের চেয়ে পুলিশ ভালো হয়েছে: স্বরাষ্ট্র সাহারা]আদালত পাড়ায় বিচার চাইতে এসে পুলিশ কাবে তরুণীর লাঞ্ছিনার ঘটনায় আমরা ক্ষোভে ফেটে পড়ি। টেকনাফের আদিবাসী পল্লীতে পুলিশ হানা দেওয়ার খবরে আমরা হয়ে পড়ি কিংকর্তব্যবিমুঢ়।

সবশেষ আমারা সাংবাদিকরা অনেকেই লজ্জায়, আন্তর্জালের প্রতিবাদে ফেসবুকে ফেস লুকাই কালো ‘জে’ অক্ষরের আড়ালে। আমরা সাংবাদিক সমাজ অনেকেই অনুশোচনায় ভূগতে বসি, নতুন করে হিসেব কষি, ভোট দিয়ে, যুদ্ধাপরাধী বিচারে মহজোটকে সরকার গঠনে গণমাধ্যমের সমর্থন দিয়ে আমরা কী তাহলে ভুল করেছি? এই পুলিশী রাস্ট্রই কী আমরা চেয়েছিলাম? আমরা হিসেব কষি, হিসেব কষতে থাকি…

[19 বার পঠিত]