নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানের জীবনকাহিনি।

[আপন আলোয় ফাইনম্যান ১ম পর্ব] [২য় পর্ব]

০৩

ছোটবেলা থেকেই বাবার উৎসাহে বিজ্ঞানের প্রতি গভীর ভালবাসা তৈরি হয়ে গেছে রিচার্ড ফাইনম্যান ওরফে রিটির। বাবা মেলভিল ফাইনম্যান দিনরাত পরিশ্রম করেন তাঁর ইউনিফরম সরবরাহের ব্যবসায়। এত পরিশ্রমের পরেও দুর্মূল্যের বাজারে তাঁর বাৎসরিক আয় মাত্র পাঁচ হাজার ডলারের মত। সংসারের অবস্থা বুঝার মত বয়স রিটির হয়নি তখনো। রিটির তেমন কোন চাহিদা নেই। তাই কোনকিছুর অভাব সে বুঝতেও পারে না। কিন্তু মেলভিল চাইতেন রিটি বুঝতে পারুক তার বাবার আয় কত এবং সেই আয়ে সংসার কীভাবে চলছে। তিনি ব্যাংকে যাওয়ার সময় রিটিকেও সাথে নিয়ে যেতেন। কাউন্টারে চেক জমা দেয়ার জন্য রিটিকেই পাঠাতেন। এভাবে প্রাইমারি স্কুলে থাকতেই রিটি শিখে গেলো ব্যাংকের হিসাব-নিকাশ। বছর খানেকের মধ্যেই রিটি জেনে গেল তার বাবার বার্ষিক আয় পাঁচ হাজার ডলারের মত। তখন তার মনে হতো বছরে পাঁচ হাজার ডলার তো কম নয়। ছোট্ট রিটি তার জীবনের লক্ষ্য স্থির করলো এরকম যে সেও যদি বছরে পাঁচ হাজার ডলার উপার্জন করতে পারে তাহলেই যথেষ্ট।

প্রাইমারি স্কুলের পড়াশোনা খুবই সহজ মনে হয় রিটির। বিশেষ করে বিজ্ঞান আর গণিতে সে অনেক বেশি এগিয়ে গেছে। বাড়িতে ল্যাবোরেটরি আছে তার। নিজের মত করে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা থেকে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় পড়তে পড়তে তাঁর মনে অনেক রকম প্রশ্ন জাগে। বাবাকে জিজ্ঞেস করলে যে উত্তর পায় তাতে সে সন্তুষ্ট হতে পারে না। রিটি বুঝতে পারে তার বাবাও সবজান্তা নন। মাসতুতো দাদা রবার্টকে বীজগণিত করতে দেখে সেও বীজগণিতের দিকে আকৃষ্ট হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলো – “বীজগণিত কী?”
“বীজগণিত হলো এমন গণিত যা তুমি পাটিগণিতের নিয়মে করতে পারবে না”
“যেমন?”
“যেমন – ধরো গ্যারেজসহ একটা বাড়ি পনের হাজার ডলারে ভাড়া দেয়া হলো। এখন বাড়ি বাদে শুধু গ্যারেজটার ভাড়া কত?”

রিটির কাছে এরকম সমস্যা নতুন – তাই খুব আকর্ষণীয়। তীব্র আকর্ষণ অনুভব করলো বীজগণিতের প্রতি। কিন্তু স্কুলের ক্লাসে বীজগণিত পড়াতে এখনো তিন বছর বাকি। এদিকে রবার্টকে বীজগণিত শেখানোর জন্য বাড়িতে টিউটর রাখা হলো। রিটির আগ্রহ দেখে টিউটর মিস্টার এলবার্ট মাসকেট রিটিকে রবার্টের সাথে বসতে অনুমতি দিলেন। রিটি দেখলো রবার্ট ও মিস্টার মাসকেট কিছু সমীকরণ থেকে অজানা রাশি ‘x’ এর মান বের করার চেষ্টা করছে। রিটি কোন নির্দিষ্ট নিয়ম ছাড়াই ‘x’ এর মান কত তা বলে দিতে পারে। কিন্তু মিস্টার মাসকেট বললেন বীজগণিতের নিয়ম না মেনে করলে তা হবে না। রিটির আগ্রহে মাসকেট রিটিকেও বীজগণিতের নিয়ম শিখিয়ে দিলেন। রিটি বুঝতে পারলো বীজগণিত সম্পর্কে তার বাবা যা বলেছিলেন তার সবটুকু সঠিক ছিল না। গ্যারেজের ভাড়া কত তা বের করার জন্য আরো কিছু তথ্য সেখানে দরকার ছিল। রিটি বীজগণিত শুধু শিখলোই না – নিজে নিজে সমীকরণ তৈরি করতেও শুরু করলো। একটা কিংবা দুটো অজানা রাশির বদলে তিনটা বা চারটা অজানা রাশির মান বের করার জন্যও সমীকরণ তৈরি করে তার সমাধান করতে লাগলো রিটি। একদিন এরকম অনেকগুলো সমীকরণ তৈরি করে ক্লাসের অংকের ম্যাডামকে দেখালো। ম্যাডাম তো অবাক। তিনি শুধু যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ করতে জানেন – এরকম সমীকরণের সমাধান তিনি কখনো করেন নি। তিনি খুশি হয়ে হেডমাস্টারের কাছে নিয়ে গেলেন রিটিকে। হেডমাস্টার খুশি হয়ে রিটিকে একটা সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন। ক্লাসে রিটির সম্মান আরো বেড়ে গেল।

মৌলিক বিজ্ঞানের ব্যাপারেও রিটির তৃষ্ণা বেড়েই চলেছে। প্রাইমারি স্কুলের কোন শিক্ষকই তার প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেন না। লাইব্রেরিতেও ছোটদের জন্য লেখা কোন বিজ্ঞানের বই নেই। তাই রিটি কাউকে বিজ্ঞান সম্পর্কিত কাজ করতে দেখলেই নানারকম প্রশ্ন করার জন্য উশখুস করে। মা লুসিল যখন রিটিকে নিয়ে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যেতেন তখন ডেন্টিস্ট ডক্টর মার্ক্সকে দেখে রিটির বিজ্ঞানী বলে মনে হতো। রিটির সাথে তিনি দাঁত কীভাবে ওঠে – কীভাবে কাজ করে এসব বিষয়ে আলোচনা করতেন। রিটির ভালো লাগতো এরকম বৈজ্ঞানিক আলোচনা। ডক্টর মার্ক্স রিটির জানার আগ্রহ দেখে খুশি হয়ে তাঁর এক রোগীর সাথে রিটির পরিচয় করিয়ে দিলেন।
“রিচার্ড, মিট মিস্টার উইলিয়াম লেজেউর – ফার রকওয়ে হাইস্কুলে কেমিস্ট্রি পড়ান। তোমার সব প্রশ্নের উত্তর ইনি দিতে পারবেন”।
“হ্যালো রিচার্ড”
“হ্যালো মিস্টার লেজেউর”
“ডক্টর মার্ক্স বললেন তুমি বিজ্ঞান ভালবাস। ইচ্ছে করলে আমার কেমিস্ট্রি ল্যাবে এসে দেখতে পারো কত মজার মজার ব্যাপার আছে কেমিস্ট্রিতে”।

রিটি তো মহাখুশি। সপ্তাহে একদিন ফার রকওয়ে হাইস্কুলের কেমিস্ট্রি ল্যাবে গিয়ে দেখতে লাগলো মিস্টার লেজেউর কী কী করেন। কয়েক দিনের মধ্যেই রিটি আবিষ্কার করলো যে মিস্টার লেজেউর কেমিস্ট্রি খুব একটা জানেন না অথচ কেমিস্ট্রি পড়ান। তাঁর মূল বিষয় ছিল ইংরেজি। জোসেফ জনসন নামে আরো একজন কেমিস্ট্রির টিচার ছিলেন সেখানে। মিস্টার জনসন কেমিস্ট্রি ল্যাবে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিলেন বালক রিচার্ডকে। রিচার্ড নানারকম প্রশ্ন করে জনসন ও লেজেউরকে। বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ডক্টর এডউইন বার্নিসের সাথেও পরিচয় হলো রিচার্ডের। ডক্টর বার্নিস ছিলেন সিরিয়াস টাইপের শিক্ষক। সত্যিকারের প্রতিভা চিনতে তাঁর ভুল হয় না। রিচার্ডের ভেতর যে বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা তিনি দেখলেন তাকে অবাধে বাড়তে দিলেন তিনি। রিচার্ড ল্যাবের যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়া করতে করতে প্রশ্ন করে জনসন ও লেজেউরকে- “সব পদার্থই পরমাণুর দ্বারা গঠিত। পরমাণুগুলো সবসময় নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরছে। যদি তাই হয় তাহলে অনেকদিনের পুরনো মরিচা ধরা পেরেকও এত ধারালো থাকে কীভাবে? পরমাণুগুলো সরে যায় না কেন?” উত্তরে জনসন ও লেজেউর যা বলেছিলেন তাতে রিচার্ড সন্তুষ্ট হতে পারে নি। নিজের মত করে বুঝতে না পারা অবধি রিচার্ড কোন কিছু বিশ্বাস করতো না।
এভাবে হাইস্কুলে যাবার আগেই হাইস্কুলের বিজ্ঞান অনেকটুকু শেখা হয়ে গেল রিচার্ডের। পরিচয় হলো অনেক শিক্ষকের সাথেও।

ধরতে গেলে রিচার্ডের সবটুকু সময় কাটে বিজ্ঞানের পেছনে; বিজ্ঞানের বই পড়ে বা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নিয়ে। খেলাধূলা বা অন্য কোন বিষয়ের প্রতি কোন আকর্ষণ নেই তার। স্কুলে লিটারেচার ক্লাসে টিচার কবিতার গুণগান শুরু করলে রিচার্ডের সরাসরি মন্তব্যঃ “কবিতা হলো অহেতুক ন্যাকামি”। আর যায় কোথায়। কাব্য-প্রেমিক শিক্ষক রিচার্ডকে বাধ্য করেন কবিতা লিখতে। রিচার্ড বিজ্ঞানের শক্তি ও উপকারিতা বর্ণনা করে কোনরকমে একটা কবিতা লিখলো। বলাবাহুল্য কাব্য-শিক্ষক খুব একটা খুশি হলেন না।

যুক্তিবাদী হওয়া সত্ত্বেও অনেকটা সামাজিক কারণে মেলভিল ও লুসিল সিনেগগে যেতেন। সেখানে ইহুদি ছেলেমেয়েদের মনে ধর্মীয় বিশ্বাস জাগানোর জন্য প্রতি রবিবারে ধর্মীয় স্কুল বসতো। বাধ্য হয়ে রিচার্ডকেও যেতে হতো সেই সানডে স্কুলে। হিব্রু ভাষাও শিখতে হয়েছিল কিছুদিন। রিচার্ড তার বাবার বিজ্ঞানমনস্কতা আর ধর্মীয়ভাব দেখে মনে করেছিল ধর্মও প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুনই ব্যাখ্যা করে। তাই সানডে স্কুলে রাবাই যখন নানারকম অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা দিতেন রিচার্ড সেসব ঘটনাকে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে বুঝতে চেষ্টা করতো। যেমন নবী এলাইজার ক্ষমতা বর্ণনা করতে গিয়ে রাবাই বলতেন- “একফোঁটাও বাতাস নেই কোথাও। অথচ থরথর করে কাঁপছে একটা গাছ, গাছের সবগুলো পাতা। কে কাঁপাচ্ছে এই গাছ? কার অলৌকিক অঙ্গুলি হেলনে কাঁপছে এই গাছ? এখনো কি তোমরা অবিশ্বাস করবে? সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ইচ্ছায় বাতাস ছাড়াও গাছের পাতা নড়তে পারে”।

রিচার্ড ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করলো। বাতাসের কোন প্রবাহ নেই – অথচ গাছের পাতা কাঁপছে বেশ জোরে। বাতাস নেই – অথচ ঝড়ো বাতাসের মত শব্দও হচ্ছে। ব্যাপারটা আসলে কী? ঈশ্বরের ইচ্ছা মানে কী? প্রশ্নগুলো তার মনের ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তার পাশের গাছের নিচ দিয়ে আসার সময় রিচার্ড খেয়াল করলো বাঁশির মত তীক্ষ্ম শব্দ হচ্ছে। অথচ টের পাওয়ার মত ঝড়ো বাতাস বা একটানা বাতাসের প্রবাহ নেই। রিচার্ডের মনে পড়লো এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে পড়া রেজোনেন্স বা অনুরণনের কথা। গাছটি বাতাসের তরঙ্গের এমন জায়গায় অবস্থিত যেখানে শব্দ তরঙ্গের সাথে অনুরণন সৃষ্টি হচ্ছে। রিচার্ড বুঝতে পারলো এই অনুরণনের মাত্রা বাড়লে বাতাস টের পাওয়া না গেলেও গাছ কাঁপতে থাকবে তার সমস্ত পাতাসহ। তাহলে এই অনুরণনই হলো নবী এলাইজার অলৌকিক বৃক্ষ-কম্পনের লৌকিক ব্যাখ্যা।

সানডে স্কুলে বৃদ্ধ রাবাই যে সমস্ত অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা দেন – রিচার্ড তাদের লৌকিক ব্যাখ্যা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। কিন্তু মোজেসের ছুড়ে দেয়া লাঠির সাপ হয়ে যাওয়ার কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পেলো না রিচার্ড। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল যে বা যারা ঘটনাটা দেখেছে তারা জেনেশুনে মিথ্যা কথা বলছে – বা ভুল দেখেছে। যেই দেখুক বা যেভাবেই শপথ করে বলুক একটা লাঠি যে কখনো জীবন্ত সাপ হয়ে যেতে পারে না তা বোঝার মত বুদ্ধি রিচার্ডের ততদিনে হয়ে গেছে।

তাদের বাড়িতে খ্রিস্টমাস ট্রি সাজানো হতো, সেখানে সান্টা ক্লজের নাম করে সবার জন্য উপহার রাখা হতো। রিচার্ড তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল সান্টা ক্লজের ব্যাপারটা ঠিক কিনা। মেলভিল সান্টাক্লজের সামাজিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন সান্টাক্লজের প্রকৃত অস্তিত্ব না থাকলেও সান্টাক্লজের নাম করে সারা পৃথিবীর অসংখ্য ছেলেমেয়ে একই রাতে একই সাথে তাদের পছন্দমত উপহার পাচ্ছে – এটা তো কম আনন্দের বিষয় নয়। কিন্তু বিজ্ঞানের কোন নিয়মের মাধ্যমে সান্টাক্লজকে ব্যাখ্যা করতে না পেরে মন খারাপ হয়ে যায় রিচার্ডের। তার মন খারাপ হওয়া আরো বেড়ে যেতে থাকে যখন সানডে স্কুলের রাবাই একটার পর একটা অলৌকিক ঘটনা বর্ণনা করেন আর বলেন কোন প্রশ্ন না করে ওসব ঘটনা সত্যি বলে বিশ্বাস করতে। বিশ্বাস করতে রিচার্ডের আপত্তি ছিল না। কিন্তু সমস্যা হলো নিজের মত করে যুক্তি দিয়ে বুঝতে না পারলে কোন কিছুই বিশ্বাস করতে পারে না সে। যখন সে কোন ঘটনা শোনে তখন মনে মনে ঘটনাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও গ্রহণযোগ্যতা বিচার করে দেখে। এরকম করতে গিয়ে রাবাইয়ের বলা অলৌকিক ঘটনাগুলোর মধ্যে অনেক গোঁজামিল খুঁজে পায় সে। মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় তার।

একদিন সানডে স্কুলে রাবাই অনেক আবেগ দিয়ে স্প্যানিশ ক্যাথলিকদের দ্বারা ইহুদিরা কীভাবে অত্যাচারিত হয়েছিলেন তার সকরুণ বর্ণনা দিচ্ছিলেন। শত শত ইহুদিকে ধরে বেঁধে প্রহসনমূলক বিচারে জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বছরের পর বছর। রাবাই এরকম একজন ইহুদির ঘটনা বর্ণনা করলেন দীর্ঘক্ষণ ধরে। তিনি বললেন রুথ নামক একজন ইহুদি মহিলাকে কীভাবে স্প্যানিশ ক্যাথলিকরা আদালতে জেরা করেছিল। মিথ্যে ঘটনা সাজিয়ে কীভাবে রুথকে জেলে দেয়া হলো। রাবাইয়ের ধারাবিবরণী শুনে বালক রিচার্ডের মনে হচ্ছিল রাবাই যা বলছেন সব সত্যি। ঘটনা যখন ঘটে রাবাই হয়তো উপস্থিত ছিলেন সেই আদালতে। রিচার্ড সব বিশ্বাস করলো- কারণ এরকম হতেই পারে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রাবাই যখন কারাগারে রুথের মৃত্যু দৃশ্যের বর্ণনা দিচ্ছিলেন – তখন হঠাৎ খটকা লাগলো।

রাবাই বলছিলেন “কারাগারের হিমশীতল কক্ষে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শুয়ে রুথ ভাবছিলো ঈশ্বর কোন্‌ পাপে তাকে এই শাস্তি দিচ্ছেন। ঈশ্বর নিশ্চয় স্বর্গে তার জন্য কোন বড় পুরষ্কারের ব্যবস্থা করে রেখেছেন” – ইত্যাদি ইত্যাদি। রিচার্ড আর মেলাতে পারে না। রাবাইয়ের বক্তৃতা শেষ হবার পর সে সোজা রাবাইয়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো- “রুথ মৃত্যুর সময় কী ভেবেছিলেন তা আপনারা জানলেন কীভাবে? তিনি কি মৃত্যুর আগে ডায়েরিতে সব লিখে গিয়েছিলেন কী কী ভেবেছিলেন মৃত্যুর আগে?”
“না, ঠিক ধরেছো তুমি। আসলে ব্যাপারটা হলো ইহুদিরা কীভাবে অত্যাচারিত হয়েছে তা বিশদভাবে বর্ণনা করার জন্য, প্রচার করার জন্য আমরা কিছু কিছু ঘটনা বানাই। রুথের ঘটনাটা তেমনি বানানো”।

রিচার্ডের মুষড়ে পড়ার জন্য ওটুকুই যথেষ্ট ছিল। এতদিন সে এজাতীয় সব লৌকিক ঘটনা বিশ্বাস করে এসেছে। এখন বলা হচ্ছে এরা কিছু কিছু ঘটনা বানায়। এরকম কিছুতো সে চায়নি। সে শুধু সত্যি কথা জানতে চেয়েছিল। নিজেকে বড় বেশি প্রতারিত মনে হচ্ছিল তার। বড়দের সাথে ঝগড়া করার মত মানসিক অবস্থা তখনো হয়নি তার। অপমানে তার চোখে পানি এসে গেল। রিচার্ডের অবস্থা দেখে রাবাই জানতে চাইলেন “কী হয়েছে?”
“আমি আপনার কথাগুলো এতদিন ধরে শুনে আসছি এবং সব সত্যি বলে বিশ্বাস করেছি। কিন্তু এখন দেখছি সব সত্যি নয়, কিছু কিছু বানানো। এখন আমি বুঝতে পারছি না বা বিশ্বাস করতে পারছি না কোন্‌টা বানানো আর কোন্‌টা সত্যি”।

রিচার্ডের কান্না আর যুক্তি দেখে রাবাই খুব বিরক্ত হলেন। বললেন, “এসব যদি তোমার জন্য এতটাই দুঃখজনক হয়ে থাকে তবে আসো কেন এখানে?”
“আমি আসি না। আমার মা-বাবা পাঠায় আমাকে”।
বাড়ি ফিরে মা-বাবাকে এ ব্যাপারে কিছুই বললো না রিচার্ড। কিন্তু রাবাই রিচার্ডের ব্যাপারে সতর্ক করে দিলেন মেলভিলকে। ফল হলো উল্টো। মেলভিল আর কখনো রিচার্ডকে সানডে স্কুলে যেতে বলেন নি।

রিচার্ড মনে মনে যুক্তির সাহায্যে মানসিক দুরবস্থা কাটিয়ে উঠলো। সে বুঝতে পারলো যে দুর্বল মনের ধর্মবিশ্বাসী মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করার জন্য অলৌকিক গল্প বানানো হয় এবং ধর্মের মোড়কে তা পরিবেশন করা হয় যাতে ভক্তিভাবটা থাকে। গল্পগুলোর দুর্বল দিক হলো বানানোর সময় ঘটনাগুলো প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যাচ্ছে কিনা তা ভেবে দেখা হয়নি বা তা ভাবার মত জ্ঞান তাদের ছিল না। কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মগুলো খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যায় এগুলো এত সুন্দর এবং গোছানো যে এর মধ্যে ধর্মকে টেনে আনতে হয় না। প্রকৃতি এবং তার নিয়ম দেখতে দেখতে ধর্ম ও ঈশ্বরের ব্যাপারটা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেল রিচার্ডের কাছে।

ক্রমশঃ_____

[225 বার পঠিত]