ডোভার স্কুকের এক ছাত্রের বিবর্তন নিয়ে আঁকা ছবি

সৃষ্টিবাদীদের সাথে বিবর্তনবাদীদের আদালতে দেখা সাক্ষাত হচ্ছে প্রায় গত ১০০ বছর ধরে। ১৯২৫ সালে আমেরিকার টেনেসিতে একজন স্কুলের জীববিজ্ঞান শিক্ষক ক্লাসে বিবর্তন থিওরি পড়ানোর দায়ে আদালতে দোষী সাবস্ত হন। ১৯৬৮ সালে আরকান্সাসের আরেক মামলা জিতেন বিবর্তনবাদীরা এবং পাবলিক স্কুলের ক্লাসে মানব বিবর্তন পড়ানোর উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া হয়। এরপর ক্লাসে সৃষ্টিবাদ-এর পাশাপাশি আবারো বিবর্তন পড়ানো শুরু হয়। ১৯৭৫ সালে ক্লাসে বিবর্তন থিওরি ও সৃষ্টিবাদকে সমান সময় ও গুরুত্ব দিয়ে পড়ানোর নিয়মকে আমেরিকার সংবিধান পরিপন্থি ঘোষণা করা হয়। সৃষ্টিবাদীরা আমেরিকার প্রথম সংশোধনীর ঘোরপ্যাঁচে এমনই জড়িয়ে গেল যে, বেচারাদের বারবার নানান অধার্মিক কিন্তু বিবর্তনের বিকল্প বৈজ্ঞানিক মতবাদ বেশে আসতে হলো। নানান বইয়ে ধর্মীয় তথ্য আকারে ইঙ্গিতে রাখার কারণে নিষেধাজ্ঞা পেল। আমেরিকায় সোজা কথা, ধর্মীয় উপাসনালয় আর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আলাদা থাকতে হবে। ক্লাসে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া যাবে না, অন্তত রাষ্ট্রীয় অনুদানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিছুতেই না। ১৯৮৭ সালে লুইজিয়ানাতে এক মামলায় ৭২ জন নোবেল বিজয়ী স্বেচ্ছায় আদালতে বাদীর পক্ষ নিয়ে লড়তে যান সৃষ্টিবাদীদের বিরুদ্ধে কারণ একটি বিশেষ ধর্মীয় এজেন্ডা আছে এই সৃষ্টিবাদীদের। কবছর আগে আমেরিকার পেনসিলভিনিয়াতে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের নামে সৃষ্টিবাদরা আবারো শিক্ষা ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় ডোভার নামের এক স্কুলের শিক্ষক ও অভিভাবকরা এবং স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির বিরুদ্ধে নেমে যায় আইনী লড়াইয়ে। কিটজ্‌মিলার বনাম ডোভার কেইস, ২০০৫ সালের এই মামলায় বিবর্তন থিওরি এর পক্ষে স্বাক্ষ্য দেন আট বিবর্তনবাদী বিশেষজ্ঞ। বিবর্তনের বিভিন্ন বিষয়ের উপর তাদের মন্তব্য নিয়ে আজকের এই লেখা।

বারবারা ফরেস্ট সাউথ ইস্টার্ন লুইয়িজিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও পলিটিক্যাল সায়েন্স এর দর্শন বিষয়ের অধ্যাপক। তিনি “সৃষ্টিবাদীদের ট্রোজেন হর্সঃ ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের সুকৌশল আগমণ ” বইয়ের রচয়িতা। ঐতিহাসিক সেই মামলা চলার সময় বারবারা তার বহু বছরের গবেষণার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য জনগনের সামনে নিয়ে আসেন। তিনি অনেক বছর সৃষ্টিবাদীদের সাথে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন মতবাদীদের সম্পর্ক নিয়ে নানান দলিলপত্র খুঁজছিলেন। এসব তথ্য খুঁজতে গিয়ে দেখেন বাইবেলের উপর ভিত্তি করে যে সকল “বিজ্ঞানীরা” সৃষ্টিবাদকে সকল প্রাণের উৎস হিসেবে ধরেন, তাদের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক দলিল ও ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের প্রথম দিকের দলিলের ড্রাফট হুবহু এক। অনেক ক্ষেত্রে শুধু স্রষ্টার জায়গায় ইন্টেলিজেন্ট এজেন্ট শব্দটি বসানো হয়েছে। তিনি জনসম্মুক্ষে এসব তথ্য ফাঁস করেছেন এবং দেখিয়েছেন ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন ও ক্রিয়েশনিজম বা সৃষ্টিবাদ একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। এ সম্পর্কে তার একটি মন্তব্য ছিল, “বর্তমানের বিবর্তন বনাম সৃষ্টিবাদ বিতর্কটা এমন অবস্থায় দাড়িয়েছে যেন একদিকে আছে আমেরিকান জনগোষ্ঠীর কিছু অংশ, যারা তাদের ধর্মীয় মতাদর্শের কারণে কখনোই আধুনিক বিজ্ঞানকে সহজে মেনে নিতে পারে নি, এমনকি অনেক সময় তারা আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার অনেক কিছু অপছন্দ করেছে, এবং বিশেষ করে বিবর্তনের মতবাদকে সরাসরি অস্বীকার করে চলেছে। এরা উঠে পড়ে লেগেছে দেশকে পিছিয়ে নিয়ে যেতে। তারা সেই সময়ে ফেরত যেতে চায় যেই সময়টাকে তারা মনে করে তাদের ধর্মীয় আদর্শের উপর ভিত্তি করে এই দেশ চলতো। এই লক্ষ্যে পৌছাতে তারা ব্যবহার করছে সকল প্রকার রাজনৈতিক উপায়, এবং তাদের লক্ষ্যটা আসলে একটি ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছাড়া আর কিছু না। এটাই আজকের বিবর্তন বনাম সৃষ্টিবাদ ইস্যুর প্রধান কারণ”।

ডেভিড ডিমার নাসা-এর অনুদানে প্রাণের আবির্ভাব বিষয়ক গবেষণা করছেন ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোরনিয়া অ্যাট সান্টা ক্রুজ-এ। তিনি ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমোলিকিউলার ইঞ্জিনিয়ারিং এর অধ্যাপক। তিনি বিবর্তনের মাঝে বিভিন্ন মতবিরোধ আসলে কি ধরণের তা বলতে গিয়ে বলেছেন, “হ্যাঁ, একটা বিতর্ক তো আছেই। মিডিয়া-এর কারণে জনগনের সামনে এটা এখন বলতে গেলে দেশের প্রধান সংবাদ। আর সাথে করে এ কথাটাও আসছে যে বিবর্তন আসলে খুব খারাপ জিনিস, বরং এখন থেকে বিবর্তন বাদ দিয়ে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন নামক জিনিসটাকে বিশ্বাস করতে হবে। আমি আপনাদের বলতে চাই যে, জীববিজ্ঞানী ও যারা বিবর্তন থিওরি নিয়ে কাজ করেন তাদের মাঝে বিবর্তন নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। তারা সকলেই কাজ করে যাচ্ছেন যেন নিখুঁত ভাবে জানতে পারেন বিবর্তন আসলে কিভাবে কাজ করছে। বিজ্ঞানের আর সকল ক্ষেত্রের মতই এই ক্ষেত্রেও কোনো কোনো বিষয়ে ঐক্য বা অনৈক্য-এর ঘটনা ঘটে, কিন্তু সার্বিকভাবে বিবর্তন সঠিক নাকি ভুল এই বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোনোই বিরোধ নেই”।

ইউজিন সি. স্কট আমেরিকান ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্স এডুকেশান এর একজন ডিরেক্টর। তিনি কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পাঠ্যবই লিখেছেন, “বিবর্তনবাদ বনাম সৃষ্টিবাদ”। প্রায়ই ধর্মীয় ভাবে পক্ষপাতদুষ্ট মানুষ একটা অদ্ভুত কথা বলে, বিবর্তন শুধুই তো এক থিওরি। এই নিয়ে

ইউজিন হাসতে হাসতে বলেন, “বেশিরভাগ মানুষ যারা ধর্মীয় অনুশাসনের নিচে থাকেন, তারা এই কথাটা বারবার বলেন, থিওরি হলো এমন একটা ব্যাপার যা হয়তো এসেছে কোন ভিত্তিহীণ ধারণা থেকে; বা কাকতালীয় ভাবে এবং এসব থিওরিকে গুরুত্ব সহকারে নেবার কিছুই নাই। এমন একটা ভাব যেন এটা কোনো গণ্য করার মত ব্যাপারই না। অথচ বিজ্ঞানে থিওরি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা পোষণ করে। দুঃখজনক ভাবে অনেক পাঠ্যপুস্তক পড়ে মানুষের এটাই ধারণা হয় যে, একটা খুব ভাল থিওরি সময়ের সাথে সাথে একটা সূত্র বা ল’ তে পরিণত হয়। যেন সকল ভালো থিওরিই পরিশুদ্ধ হয়ে সূত্রতে পরিণত হয়, আর সূত্র তো যেকোন থিওরি থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ন। এটাই অনেক সময় সন্দেহ ও বিতর্কের সূত্রপাত ঘটায়। যখন বিজ্ঞানীরা কোন বৈজ্ঞানিকভাবে বাস্তবতা বা প্রমাণিত সত্য নিয়ে কথা বলেন তখন তারা আসলে অবশ্যম্ভাবী কোন পর্যবেক্ষণ নিয়ে কথা বলেন। আর এরকম প্রমাণিত সত্যগুলো অবশ্যই ইন্টারেস্টিং; কিন্তু, সত্যি বলতে এগুলো তেমন একটা এক্সসাইটিং না। প্রমাণিত সত্যগুলো তেমন একটা আগ্রহ জাগায় না, এরকম সত্য চারপাশে তো বহু আছে। কিন্তু থিওরি, থিওরি হল বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন বিজ্ঞানীর কাছে একটি থিওরি মানে হলো একটি নতুন ব্যাখ্যা। আর এক একটা বৈজ্ঞানিক থিওরি হলো অনেক প্রমাণিত সত্য, অনেক অনেক পরীক্ষিত হাইপোথিসিস এবং অন্য অনেক প্রাসংগিক তথ্য এর সমন্বয়ে যৌক্তিকভাবে পরিবেশিত একটি মতবাদ যা আমাদের কোন প্রাকৃতিক ব্যাপারকে আরো কাছ থেকে বুঝতে সহায়তা করে”।

কেনিথ মিলার “ডারউইনের স্রষ্টার সন্ধানে” এবং “শুধুই মাত্র একটি থিওরি” দুটি বই রচনা করেছেন এবং এর পাশাপাশি কলেজ ও হাইস্কুল লেভেল শিক্ষার্থীদের জন্য তিনটি পাঠ্যবই লিখেছেন। তিনি ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক, এবং কোষ জীববিজ্ঞানের একজন বিশারদ। তার রচিত এক নবম শ্রেণীর পাঠ্যবই নিয়েই শুরু হয় সৃষ্টিবাদী তথা ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনবাদীদের মাথা ব্যাথা। তাদের ভাষ্যমতে, কেনিথ এর বইয়ে শুধুই ডারউইনিজম বিবর্তনবাদের কথা। অন্য কোন “বৈজ্ঞানিক” মতাদর্শও থাকতে হবে যেন কোমলমতী শিক্ষার্থীরা বিবর্তন সম্পর্কে সকল দিকের মতামত জানতে পারে। তা না হলে এই কোমলমতী শিক্ষার্থীদের সাথে ন্যায়সংগত আচরণ হবে না। তো এই ন্যায়সংগত দাবীর বিপক্ষে মিলার বলেন, “ইন্টেলিজ্যান্ট ডিজাইন তথা সৃষ্টিবাদী পক্ষের লোকেদের দাবী হলো, পাঠ্যপুস্তকে তাদের মতাদর্শ থাকাটাই হবে ন্যায়সংগত। অথচ এদের ন্যায় নীতি সম্পর্কে ধারণাটাই হাস্যকর। কার্ণ এরা এতটুকু আগ্রহী না তাদের পক্ষে কোন নতুন প্রমান দাঁড় করাতে, এদের বৈজ্ঞানিক জার্নাল পড়ার বা রিভিউ করার কোন আগ্রহ নাই, এমনকি তাদের নিজেদের কাজ বৈজ্ঞানিক পেপারের আকারে গ্রহণযোগ্য জার্নালে প্রকাশ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাটুকু নাই। তারা কোনো বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে গিয়ে সকল বিজ্ঞানীদের সামনে তাদের বক্তব্য পেশ করে কোনো বিতর্কে জিতে গিয়ে গ্রহনযোগ্য বৈজ্ঞানিক মতবাদ হিসেবে তাদের মতবাদ স্বীকৃতি পাক তার জন্য কিছু করে না। তারা যেটা করতে চায় তা হলো একটি বিকল্প বৈজ্ঞানিক মতবাদ হিসেবে সরাসরি স্বীকৃতি পেতে, রীতিগত সকল বৈজ্ঞানিক নিয়ম কানুন ভংগ করে শিক্ষা কমিটির কাছে সরাসরি আবেদন করতে চায় যেন তাদের মতাদর্শ একটি বৈজ্ঞানিক থিওরি হিসেবে পাঠ্যপুস্তকে আসে, শিক্ষার্থীদের কাছে পৌছে যায় তাদের বৈজ্ঞানিক বার্তা। যদিও তারা এখনো পর্যন্ত একজনও বিজ্ঞানীর কাছে এতটুকু সমর্থন পায় নি। আপনাকেই নিজের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে, এই প্রক্রিয়াতে কোন জিনিসটা ন্যায়সম্মত! বিজ্ঞানের আর সকল থিওরি ও মতামতকে সর্বদা বৈজ্ঞাণিক পদ্ধতির মাঝে যুদ্ধ করে টিকে থেকে এগিয়ে যেতে হয়, আর এরা কিনা দাবী করে এসব প্রক্রিয়া ছাড়াই ন্যায়সংগত কারনে তাদের মতাদর্শ পাঠ্যপুস্তকে থাকতে দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে আসলে ন্যায়নীতি এর কথা বলে তারা যা করছে তা হলো, মানুষকে প্ররোচিত করছে যেন মানুষ ঠকবাজী উপায়ে এদের মতাদর্শ শ্রেণীকক্ষে পৌছে দিতে সহায়তা করে। এ শুধু খারাপ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিই নয়, খারাপ শিক্ষানীতিও বটে”।

কেভিন পাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোরনিয়া অ্যাট বার্কলি এর পেইলিওন্টলজি জাদুঘরের একজন কিউরেটর। তিনি একজন বিবর্তন বিশারদ এবং ইন্টিগ্রেটিভ বায়োলজির একজন অধ্যাপক। কিটজ্‌মিলার বনাম ডোভার মামলায় তিনি ছিলেন একমাত্র ফসিল বিশারদ। তিনি আদলতের সামনে পেশ করেন ফসিল নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক তথ্য। তার কাছে প্রতিটি ফসিল যেন আমাদের অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করার জন্য একটি খোলা জানালা। সেই আদালতের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাস্তবের এই ইন্ডিয়ানা জোন্স বলেন, “সৃষ্টিবাদীদের তথাকথিত প্রমাণগুলো একটাও আসল প্রমাণ নয়, বরং সব জঞ্জাল। ২০০৫ সালের এই ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন মতবাদীরা সেই একই জিনিস দেখাচ্ছে যা দক্ষিণ ক্যালিফোরনিয়ার সৃষ্টিবাদীদের গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা ষাট ও সত্তুরের দশকে দেখিয়েছে। তার আগে বাইবেল-বিজ্ঞানের লোকেরা পঞ্চাশের দশকে এই একই জিনিস দেখিয়েছে। আমি মামলা চলাকালীন সময়ে দেখাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে তাদের এই সকল তথাকথিত প্রমাণাদির একটি দীর্ঘ যোগসাজশ আছে। সেই একই বাক্য, একই আইডিয়া, একই জঞ্জাল ঘুরেফিরে আসে। এবং তাদের এই প্রক্রিয়া কখনোই পালটায় না। এই একি বক্তব্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে বারংবার। তাই শিক্ষার্থীদের কাছে যদি এটা বলতে যাওয়া হয় যে এখানে আসলে একটা সত্যিকারের বিতর্কিত ব্যাপার আছে, তা হবে তাদের ভুল তথ্য দেওয়া। এই সকলকিছুর পিছে একটাই কারন, মানুষ যেন বিবর্তন থিওরি শেখাতে ভয় পায়। এবং এটাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।”

জেমস হফ্‌ম্যান ইতিহাস ও বিবর্তন বিজ্ঞানের একজন বিশারদ। তিনি ফুলারটনের ক্যালিফোরনিয়া স্টেইট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ইতিহাস ও দর্শন এর অধ্যাপক। তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়, কি এমন ক্ষতি হবে যদি স্কুল লেভেলের শিক্ষার্থীদের বিবর্তন না পড়ানো হয়। তিনি তার উত্তরে বলেন, “যদি কোন শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বিবর্তন থিওরি সম্পূর্ণ উঠিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াবে এমন, যেন ইচ্ছা করে কারো স্মৃতিভ্রম করা হলো। এ প্রশ্নটা এমন ধরণের, যেন কাউকে প্রশ্ন করা হলো কি এমন ক্ষতি হবে যদি তুমি পাঁচ মিনিট আগে কি হয়েছে তা মনে করতে না পারো আর অনেক আগে কি হয়েছে তাও মনে করতে না পারো। আমার মনে হয় আপনি এতে রাজি হবেন না। বিবর্তন আমাদের অতীতে কি হয়েছে তা জানায়। ইচ্ছে করে এই অতীতের কাহিণী আমাদের নৈতিকশিক্ষা থেকে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে উঠিয়ে দেওয়া হবে যেন ইচ্ছে করে খুবই মারাত্মক স্মৃতিভ্রম আমাদের সন্তানদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।”

ফ্রানচেস্‌কো আয়ালা ২০০১ সালে আমেরিকার বিজ্ঞান গবেষণায় অবদানের জন্য স্বর্ণ পদক পান। তিনি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোরনিয়া অ্যাট আরভিন এর ইকোলজি এবং ইভোলিউশনারি বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক। অনেকেই বিবর্তনবাদীদের সাথে নাস্তিকতা মিলিয়ে একে ধর্ম বিরোধী শিক্ষা হিসেবে চালিয়ে দিতে চান। বিবর্তন এর সমর্থন করা মানেই যেন কোন স্রষ্টাকে কাঁচকলা দেখানো। এরকম ভ্রান্তিময় ধারণা অনেক বিবর্তনবাদী কিন্তু আস্তিক মানুষদের প্রতিনিয়ত অস্বস্থিকর পরিস্থিতিতে ফেলে। ফ্রানচেস্‌কো যেন এরকমই একটা ভুল ভ্রান্তি দূর করতে মন্তব্য করেন, “ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন যেটা বলতে চায় তা হলো, স্রষ্টা একজন খুবই খারাপ ডিজাইনার। ঐ ডিজাইনারকে তো চাকুরিচ্যুত করা হবে যে কিনা মানুষের চোখকে এমনভাবে ডিজাইন করেছে যে অপটিক নার্ভকে বাধ্য করেছে রেটিনাকে ক্রস করতে। একজন ইঞ্জিনিয়ার যে কিনা মানুষের চোয়াল ডিজাইন করেছে তাকেও চাকুরিচ্যুত করা হবে। আমাদের চোয়াল সবগুলো দাঁত আটানোর মত যথেস্ট বড় নয়! স্রষ্টা ডিজাইন করার সময় এমন মৌলিক, অবশ্যম্ভাবী ভুল করবে! হয়তো ইন্টেলিজেন্টওয়ালাদের স্রষ্টা এমন ভুল করে, কিন্তু আমার স্রষ্টা এমন ভুল করতে পারে না। আমি এমন কোন স্রষ্টার উপাসনা করতে চাই না, যে কিনা এক সাধারণ মানব ইঞ্জিনিয়ারের থেকে খারাপ ডিজাইন করে”।

জেমস এল. পাওয়েল একজন জিওলজিস্ট, যিনি বিশেষ করে জিওক্রনোলজি এর বিশারদ। তিনি আমেরিকান ন্যাশনাল ফিজিক্যাল সায়েন্স কনসরটিয়ামের একজন ডিরেক্টর। তার আগে তিনি এল.এ. কাউন্টি এর ন্যাচেরাল ইতিহাস জাদুঘরের সাবেক ডিরেক্টর ও প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বিজ্ঞান, বিবর্তন ও সাধারণ জনমানুষের সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় এখনকার মত শক্তিশালী অবস্থানে বিজ্ঞান এর আগে কখনোই ছিল না। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে এটাই মনে হচ্ছে যে বিজ্ঞানের শক্ত অবস্থান থাকা স্বত্তেও আসলে কোন প্রভাব ফেলতে পারছে না। জাতীয় বিজ্ঞান অনুষদ থেকে আমি গত ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে সাধারণ মানুষের উপর বিভিন্ন জরিপ চালাচ্ছি। আজকের যুগেও প্রায় অর্ধেক জনগোষ্টী মনে করে আদিম মানুষ ও ডাইনোসর এক সাথে এক সময়ে বাস করতো। আধা জনগোষ্টী সরাসরি বিবর্তন থিওরিকেই চ্যালেঞ্জ করে, আর সৃষ্টিবাদকেই যৌক্তিক হিসেবে মেনে নেয়। অথচ বিজ্ঞান দিনকে দিন উন্নত থেকে উন্নত হচ্ছে, আর রাস্তার সাধারণ মানুষ দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞানীরা যে উপসংহারে আসছে তা স্বীকারই করছে না। বিজ্ঞান ও সাধারণ মানুষের মাঝে একটি বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে, আর এই ব্যবধান দিনকে দিন বেড়েই চলছে। এটি অনেক ভীতিকর। আমি মনে করি, যেকোন সমাজ, যা যুক্তি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং বেকুবতা বেছে নেয়, তারা ইরানের মত একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়”।

*কিটজ্‌মিলার বলাম ডোভার এর মামলায় শেষে কার জয়লাভ হয়! এই মামলা নিয়ে অসাধারণ দুই ঘন্টার এক ডকুমেন্টারি আছে যা মিশন ইমপসিবল মুভি দেখার মত টানটান উত্তেজনাকর। “জাজমেন্ট ড্যা; ইনট্যালিজেন্ট ডিজাইন অন ট্রায়াল” নামের এই ডকুমেন্টারিটা দেখার মত। ভালো না লাগলে কি আর করা! টাকা ফেরত!

সূত্রঃ

১। http://en.wikipedia.org/wiki/Kitzmiller_v._Dover_Area_School_District
২। http://www.youtube.com/watch?v=AKVNWwk7LIg&feature=plcp
৩। http://www.youtube.com/watch?v=x2xyrel-2vI&feature=youtu.be
৪। http://ncse.com/creationism/legal/padians-expert-testimony

[115 বার পঠিত]