ইসলামে বর্বরতা (দাসত্ব-অধ্যায়—১৫)

আবুল কাশেম

প্রথম পর্ব

২য় পর্ব

৩য় পর্ব

৪র্থ পর্ব

৫ম পর্ব

৬ষ্ঠ পর্ব

৭ম পর্ব

৮ম পর্ব

৯ম পর্ব

১০ পর্ব

১১ পর্ব

১২ পর্ব

১৩ পর্ব

১৪ পর্ব

নানা কারণে এই ধারাবাহিক রচনাটি কিছুদিনের জন্য স্থগিত ছিল। বাকী অংশ এখন নিয়মিত প্রকাশের আশা রাখছি।

[রচনাটি এম, এ, খানের ইংরেজি বই থেকে অনুবাদিত “জিহাদঃ জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণ, সাম্রাজ্যবাদ ও ক্রীতদাসত্বের উত্তরাধিকার” গ্রন্থের ‘ইসলামি ক্রীতদাসত্ব’ অধ্যায়ের অংশ এবং লেখক ও ব-দ্বীপ প্রকাশনের অনুমতিক্রমে প্রকাশিত হলো।]

ইসলামি ক্রীতদাসত্ব, খণ্ড ২৩

লেখক: এম, এ, খান

ইসলামি দাসপ্রথার বিশেষ নিষ্ঠুরতা

ইসলামি দাসপ্রথার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নির্মম দিকটি ছিল পুরুষ বন্দিদেরকে খোজাকরণ। আফ্রিকায় বন্দিকৃত অধিকাংশ ক্রীতদাসকে মুসলিম বিশ্বে বিক্রির আগে পুরুষত্বহীন করা হতো। ভারতেও মুসলিম শাসনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরুষ বন্দিদেরকে ব্যাপকহারে খোজা করা হয়েছিল, যার উল্লেখ ইতিপূর্বে করা হয়েছে। এমনকি শীর্ষ জেনারেল বা সেনাপতি, যেমন মালিক কাফুর এবং খসরু খানও ছিলেন খোজা। এটা প্রমাণ করে যে, ভারতেও খোজাকরণ ঘটতো ব্যাপক মাত্রায়। ইউরোপীয় ক্রীতদাসদেরকেও ব্যাপকহারে খোজা করা হতো।

স্পষ্টত খোজাকরণের সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিকটি ছিল পুরুষের সবচেয়ে মৌলিক পরিচয় ও সম্পদ − অর্থাৎ তার পুরুষত্ব − হরণ করা, যা নিয়ে সে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিল। অথচ খোজাকরণ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় নির্মমতা ছিল, অপারেশনের সময় ব্যাপক সংখ্যায় ক্রীতদাসদের মৃত্যু। কোয়েনরাড এলস্ট জানান: ‘বাস্তবিকপক্ষে ইসলামি সভ্যতা নজিরবিহীন মাত্রায় খোজাকরণ চর্চা করেছিল। আফ্রিকার বেশ কয়েকটি নগরী ছিল খোজাকরণের কারখানা। তারা ছিল খুব দামি পণ্য, কেননা অপারেশনের পর শতকরা মাত্র ২৫ জন বেঁচে থাকতো।’[২৩৬] অধিকন্তু মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে, কখনো কখনো হাজার মাইল দূরত্বে, স্থানান্তরের সময় পথিমধ্যে প্রাণ হারায় বিপুল সংখ্যক ক্রীতদাস। এটা নিঃসন্দেহে ছিল ইসলামি ক্রীতদাসপ্রথা চর্চার আরেকটি বড় নির্মমতা। ক্রীতদাস ধরা বা শিকারের সময়ও বহু লোক প্রাণ হারাতো বা আহত হতো। কমান্ডার ভি. এল. ক্যামেরন লিখেছেন, মধ্য আফ্রিকায় ইসলামি ক্রীতদাস-শিকারিরা পিছে ফেলে রেখে যেত:

ভস্মীভূত গ্রাম, মানুষের লাশ ও শস্যের ধ্বংসচিত্র। এসব হামলায় জীবনহানি হতো অগণ্য, যদিও কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রদান করা অসম্ভব। ব্রিটিশ অনুসন্ধানী বার্টন হিসাব করেছেন যে, তার দেখা এক বহরের পঞ্চান্ন জন নারীকে ধরার জন্য ব্যবসায়ীরা কমপক্ষে দশটি গ্রাম ধ্বংস করে দিয়েছিল, যার প্রত্যক গ্রামের লোকসংখ্যা ছিল একশ’ থেকে দুইশ’। তাদের অধিকাংশই আক্রমণে ধ্বংস হয়, অথবা দুর্ভিক্ষে মারা যায়।[২৩৭]

ক্রীতদাসদের মৃত্যুর ব্যাপকতা সম্বন্ধে সিগল লিখেছেন:

ইসলামি কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস-বাণিজ্যের গাণিতিক হিসাব সংগ্রহ, গুদামজাত ও স্থানান্তরকালে নিধনকৃত বা হারানো সেসব নারী-পুরুষ ও শিশুদের জীবনকে উপেক্ষা করতে পারবে না। উনবিংশ শতকের শেষ দিকের এক লেখক মনে করেন যে, দাসত্বের জন্য একজন বন্দির পিছনে জনসংখ্যার দশটি জীবনের হানি হয়ে থাকতে পারে − যার মধ্যে ছিল গ্রামগুলোতে হামলায় প্রতিরোধকারীদের মৃত্যু, তৎসম্পৃক্ত দুর্ভিক্ষে নারী-শিশুদের মৃত্যু, এবং শিশু, বৃদ্ধ ও দুস্থদের আটককারীদের সাথে সমতালে চলতে অক্ষমতার কারণে মৃত্যু, অথবা বৈরী অবস্থার মুখে পথিমধ্যে মৃত্যু, কিংবা চরমতম দুর্দশায় পতিত হয়ে মৃত্যু।[২৩৮]

সিগল ক্রীতদাসদের স্থানান্তরকালে ব্যাপক প্রাণহানির বেশ কিছু ঘটনা সংগ্রহ করেছেন:[২৩৯] অনুসন্ধানী হেনরিখ বার্থ লিখেছেন, তার বন্ধু বরনুর উজির বশিরের এক ক্রীতদাস-বহর হজ্ব মৌসুমে মক্কায় যাবার পথে পর্বতের ভয়ানক ঠাণ্ডায় পতিত হলে এক রাতেই বহরটির চল্লিশ জন প্রাণ হারায়; জনৈক ব্রিটিশ অনুসন্ধানী ১০০টি মানব কঙ্কাল দেখতে পান যারা ত্রিপোলি যাওয়ার পথে একটা ক্রীতদাস-বহর থেকে মারা গিয়েছিল। ব্রিটিশ অনুসন্ধানী রিচার্ড ল্যান্ডার পশ্চিম আফ্রিকায় ৩০ জনের একদল ক্রীতদাসকে দেখতে পান, যারা সবাই গুটি-বসন্তে আক্রান্ত এবং গরুর চামড়া-পাকানো ফিতায় তাদের সবার গলা একে অপরের সঙ্গে বাঁধা; পূর্ব-আফ্রিকা উপকূলের একটি ক্রীতদাসবাহী বহরের ৩,০০০ ক্রীতদাসের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই মরে যায় দুর্ভিক্ষে, রোগে ও খুন হয়ে; নুবিয়ার মরুভূমিতে ২,০০০ ক্রীতাদাসবাহী একটি বহরের সবাই মৃত্যুবরণ করে।

বিভিন্ন হিসাব মতে মুসলিমরা আফ্রিকায় ১ কোটি ১০ লক্ষ থেকে ৩ কোটি ২০ লক্ষ কৃষ্ণাঙ্গ নারী-পুরুষ-শিশুকে ক্রীতদাস করেছিল। ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্রীতদাস যেহেতু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই প্রাণ হারায়, সুতরাং এটা কল্পনা করা কঠিন নয় যে, বর্বর ইসলামি দাসপ্রথা চর্চার কারণে কী বিপুল সংখ্যক নিষ্পাপ মানবজীবনকে আত্মাহুতি দিতে হয়েছিল। রোনাল্ড সিগল ইসলামের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল হওয়া সত্ত্বেও ক্রীতদাসকৃত কৃষ্ণাঙ্গদের সংখ্যা প্রায় ১১ মিলিয়ন বলে উল্লেখ করেন এবং সেই সাথে মোট ৩০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মুসলিম ক্রীতদাস-শিকারি ও ব্যবসায়ীদের হাতে মৃত্যুবরণ করে, বা মুসলিম বিশ্বে ক্রীতদাসরূপে জীবনপাত করে। উপস্থাপিত এ তথ্য অনুযায়ী, নিঃসন্দেহে ইসলামি দাসপ্রথার চর্চা মানবজাতির উপর নেমে আসা বৃহত্তম ট্রাজেডি বা নির্মম ঘটনাগুলোর একটি।

[আগামী পর্বে আলোচিত হবেঃ দাসপ্রথা বিলুপ্তকরণ ও ইসলামি প্রতিরোধ]

সূত্রঃ

236. Elst K (1993) Indigenous Indians: Agastya to Ambedkar, Voice of India, New Delhi, p. 375

237. Cameron CVL (1877) Accross Africa, Dalty, Isbister & Co., London, Vol. II, p. 137-38

238. Segal, p. 62

239. Ibid, p. 63-64
————–

ইসলামি ক্রীতদাসত্ব, খণ্ড ২৪

দাসপ্রথা বিলুপ্তকরণ ও ইসলামি প্রতিরোধ

ইসলামে দাসপ্রথা স্পষ্টতই স্বর্গীয়ভাবে অনুমোদিত একটি রীতি বা প্রতিষ্ঠান। সর্বকালে এর চর্চা মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর তাত্ত্বিকভাবে ন্যস্ত। সুতরাং এটা সহজেই অনুমেয় যে, দাসপ্রথা বিলুপ্তকরণের প্রচারণা স্বাভাবিক কারণেই মুসলিম বিশ্বে প্রবল বাঁধার সম্মুখীন হয়; এমনকি আজ অবধি মুসলিম বিশ্বে দাসপ্রথা উচ্ছেদ-অভিযান পুরোপুরি সফল হয়নি। দাসপ্রথা এখনো কোনো না কোনো আকারে মৌরিতানিয়া, সুদান ও সৌদি আরবে চলমান।

ইউরোপীয় জাতিগুলো ১৮১৫ সালে দাস-বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছে। ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশরা দাসপ্রথা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে সমস্ত ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দেয়। অথচ একই শতাব্দীতে ইসলামি বিশ্ব এ পেশাকে অব্যাহত রেখে আফ্রিকায় প্রায় ২০ লাখ কৃষ্ণাঙ্গকে ক্রীতদাস করে এবং সে প্রক্রিয়ায় সম্ভবত ৮০ লাখ জীবন ধ্বংস হয়। মুসলিম বিশ্বে দাসপ্রথা বন্ধ করণে পশ্চিমা দেশগুলোর সক্রিয় প্রচেষ্টা সত্ত্বে সেটা ঘটে। ১৭৫৭ সাল থেকে ভারত যখন ধীরে ধীরে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, তখন মুসলিমদের দ্বারা ভারতীয় বিধর্মীদেরকে ক্রীতদাসকরণ প্রক্রিয়ার সমাপ্তি শুরু হয়। ১৮৪৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করতঃ ‘ইন্ডিয়ান শ্লেইভারি অ্যাক্ট ৫’ পাস করলে ভারতে দাসপ্রথা পরিশেষে বিলুপ্ত হয়। এ বিলটি পাসের প্রাক্কালের এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, বাংলা, মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ে মালিকরা ২,০০০ করে ক্রীতদাস রাখছিল।২৪০

পশ্চিমা শাসনের আওতার বাইরে থাকা আফগানিস্তানে তখনো বিধর্মীদেরকে ব্যাপকহারে ক্রীতদাসকরণ চলছিল। আলেক্সান্ডার গার্ডনার, যিনি ১৮১৯ সাল থেকে ১৮২৩ সাল পর্যন্ত মধ্য-এশিয়ার সর্বত্র ভ্রমণ করেন, তিনি আফগানিস্তানের ‘কাফিরিস্তান’ প্রদেশে তখনো চলমান ক্রীতদাস-শিকার ও দাস-ব্যবসার এক প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ রেখে গেছেন। তিনি দেখেন: কুন্দুজের সুলতান বল্খ ও বোখারার বাজারগুলোতে ক্রীতদাস সরবরাহের জন্য অবিরাম হামলা, লুটতরাজ ও ক্রীতদাস আটক কর্মকাণ্ড চালিয়ে কাফিরিস্তানকে ‘দারিদ্র্য ও দুর্দশার চরমে নিয়ে ঠেকিয়েছেন।’ গার্ডনার আরো লিখেন: ‘সেখানে এ চরম দুর্দশার মূলে ছিলেন কুন্দুজ-প্রধান, যিনি তার বিপর্যস্ত প্রজাদের লুণ্ঠন করেই সন্তুষ্ট ছিলেন না; প্রতিবছর দেশটিতে অক্সাসের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালাতেন এবং ‘চাপ্পাও’ বা রাত্রিকালীন হামলায় তার সেনারা যাদেরকেই পারতো ধরে নিয়ে আসতো। ধৃতদের মধ্যে থেকে সুলতান ও তার আমাত্যবর্গ সবচেয়ে ভালগুলোকে বেছে নেওয়ার পর বাকিদেরকে তুর্কিস্তানের বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রয় করা হতো।’২৪১

উনবিংশ শতাব্দে ইসলামের কেন্দ্রস্থল মক্কায় এমন কোনো পরিবার ছিল না, যারা উপপত্নীসহ ক্রীতদাসের মালিক ছিল না। আগেই বলা হয়েছে যে, ১৮৭০-৮০’র দশকে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মুসলিম-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে জনসংখ্যার ৬ শতাংশ থেকে দুই-তৃতীয়াংশ ছিল ক্রীতদাস।

[আগামী পর্বে আলোচিত হবেঃ উত্তর আফ্রিকায় ইসলামি দাসত্বের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় সংগ্রাম]

সূত্রঃ

240. Moreland, p. 90

241. Lal (1994), p. 8

————–

ইসলামি ক্রীতদাসত্ব, খণ্ড ২৫

উত্তর আফ্রিকায় ইসলামি দাসত্বের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় সংগ্রাম

১৫৩০-এর দশক থেকে শুরু করে ১৮৩০-এর দশক পর্যন্ত বার্বারি উত্তর আফ্রিকার জলদস্যুরা ইউরোপীয় জাহাজ এবং দ্বীপ ও উপকূলের গ্রামগুলো থেকে শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাস ধরা অব্যাহত রাখে। তাদের দ্বারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর মার্কিন জাহাজ এবং তাদের কর্মচারীরাও বার্বারি জলদস্যুদের শিকার হয়ে ক্রীতদাসত্ব বরণ করতে বাধ্য হয়। এ পর্বে উত্তর আফ্রিকায় মার্কিন ও ব্রিটিশ নাগরিকদেরকে ক্রীতদাসকরণের বিরুদ্ধে দেশ দু’টির সংগ্রামের উপর আলোকপাত করা হবে।

ব্রিটিশ সংগ্রাম

১৬২০ সালের দিকে উত্তর আফ্রিকায় ক্রীতদাস হিসেবে ধৃত ব্রিটিশ নাবিকদের প্রায় ২,০০০ স্ত্রী সেখানে তাদের স্বামীদের দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম দুর্দশা এবং নিষ্ঠুরতম বন্দি ও দাসত্বের জীবন থেকে মুক্ত করতে সরকারকে চাপ দেওয়ার জন্য হাতে হাত মিলিয়ে এক জোরালো সংগ্রাম শুরু করে। তারা সরকারকে জানায়, তাদের স্বামীদের অনুপস্থিতির কারণে তাদেরকে এমন দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে জীবন কাটাতে হচ্ছে যে, তাদের নিরীহ গরিব শিশুরা খাদ্যাভাবে ও বাঁচার অন্যান্য উপকরণের অভাবে নিশ্চিত মৃত্যু ও ধ্বংসের মুখোমুখি হচ্ছে।২৪২

প্রায় এক শতাব্দী যাবত তাদের জাহাজ, বন্দর ও গ্রামগুলো উত্তর আফ্রিকার বার্বার জলদস্যুদের হাতে বিধ্বস্ত ও লুণ্ঠিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের রাজা প্রথম চার্লস ১৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই এ বিষয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি তরুণ পর্যটক জন হ্যারিসনকে উত্তর আফ্রিকায় প্রেরণ করেন ব্রিটিশ বন্দিদেরকে মুক্ত ও ব্রিটিশ বাণিজ্য-জাহাজ আক্রমণের বিরুদ্ধে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করতে। রাজা কুটিল, চতুর ও ধূর্ত সুলতান মৌলে জিদানকে সম্বোধন করে একটা চিঠিও দেন। কিন্তু মৌলে জিদানের সাথে আলোচনায় কোনো ফল না পাওয়ার সম্ভাবনায় তিনি হ্যারিসনকে এ পরামর্শও দেন যে, তিনি জলদস্যু বন্দর ‘সালে’র দস্যু-নেতা, যিনি মাঝে মাঝে সুলতানকে অগ্রাহ্য করতেন, তার সাথে সরাসরি আলোচনা করলে ভাল ফল পেতে পারেন।

জন হ্যারিসন সালে’র জলদস্যুদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৬২৫ সালের গ্রীষ্মে খালি পায়ে এক মুসলিম তাপসের ছদ্মবেশে তীর্থযাত্রীর পোশাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও দুঃসাধ্য যাত্রায় নেমে পড়েন। সালে’তে পৌঁছানোর পর তিনি শহরের ক্রীতদাস-শিকারিদের ধর্মীয় নেতা সিদি মোহাম্মদ এল-আইয়াকির সঙ্গে যোগাযাগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। সিদি মোহাম্মদ ছিলেন এক কৌশলী আধ্যাত্ম্যসাধক (মারাবোত বা সুফি সাধক), যিনি নিজে ৭,৬০০ খ্রিষ্টান হত্যার কারণ ছিলেন বলে গর্ব করতেন। তিনি ক্রীতদাসদেরকে মুক্ত করে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, যদি স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে হামলায় ব্রিটেন তাকে সহযোগিতা করতে রাজী হয়। তিনি ভারী অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহেরও দাবি করেন, যার মধ্যে ছিল ১৪টি কামান এবং প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক ও গোলার দাবি। তিনি তার কিছু অকেজো কামান ইংল্যান্ডে নিয়ে মেরামত করে দেওয়ার কথাও বলেন। হ্যারিসন ব্রিটেনের রাজা ও তার গুপ্ত কাউন্সিলের সাথে এসব শর্ত নিয়ে আলোচনার জন্য লন্ডনে ফিরে আসেন। হ্যারিসন সিদি মোহাম্মদের দাবির চেয়ে কিছু কম অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পুনরায় সালেতে ফিরে স্পেনীয়দের উপর আক্রমণে তাকে সহযোগিতার অঙ্গীকার করেন। ফলে সিদি মোহাম্মদ তার গোপন কুঠুরি থেকে ১৯০ জন ব্রিটিশ বন্দিকে মুক্ত করে দেন, যদিও হ্যারিসন তার কাছ থেকে ২,০০০ বন্দির মুক্তি আশা করছিলেন। পরে হ্যারিসন বুঝতে পারেন যে, সেখানে বন্দিকৃতদের অনেকেই প্লেগে মারা গেছে এবং বাকিদেরকে সুলতানের নিকট কিংবা উত্তর আফ্রিকার অন্যত্র বিক্রি করা হয়েছে।২৪৩

১৬২৭ সালের গ্রীষ্মে জন হ্যারিসন মুক্ত বন্দিদের নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। উত্তর আফ্রিকায় কূটনৈতিক উদ্দেশ্যে তিনি মোট আটবার সুলতান মৌলে আব্দুল্লাহ মালেকের (রা. ১৬২৭-৩১) দরবারে যান, কিন্তু সুলতানের প্রাসাদে আটককৃত ব্রিটিশ ক্রীতদাসদেরকে মুক্ত করতে ব্যর্থ হন। ওদিকে সিদি মোহাম্মদ অবশ্য কিছুদিন পরই চুক্তি ভেঙ্গে ফেলেন, কেননা ক্রীতদাস শিকারের উপর চরমভাবে নির্ভরশীল তার দস্যুরা বুঝায় যে, ব্রিটিশ সরকার তাদের চাহিদার চেয়ে কম অস্ত্রশস্ত্র দিয়েছে এবং স্পেনীয়দের উপর আক্রমণে এগিয়ে আসছে না। তারা পুনরায় ব্রিটিশ জাহাজের উপর বেশ জোরেশোরে হামলা চালায় এবং শীঘ্রই ২৭ জন নারীসহ ১,২০০ ব্রিটিশ নাবিককে আটক করে।

ব্রিটিশ রাজা এতে ধৈর্যহীন হয়ে পড়েন। ১৬৩৭ সালে তিনি ক্যাপ্টেন উইলিয়াম রেইন্সবারার নেতৃত্বে ছয়টি যুদ্ধ জাহাজের একটি বহর প্রেরণ করেন জলদস্যুদের ঘাঁটি সালে’কে কামান দেগে ধুলিস্মাৎ করে দিতে। এক মাসের সমুদ্র যাত্রার পর তিনি সালে’তে পৌঁছেন, যখন জলদস্যুরা ইংল্যান্ডের উপকূলে দস্যুতা-অভিযান চালানোর জন্য তাদের জাহাজগুলোকে কেবলমাত্র প্রস্তুত করেছে। জলদস্যুদের অধীনে বিপুল সংখ্যক জাহাজের বিশাল বহর দেখে ইংরেজ বহর হতবাক হয়ে যায়। সালে’র নতুন শাসক জলদস্যু জাহাজগুলোকে ‘ইংল্যান্ডের উপকূল থেকে নারী-পুরুষ-শিশুকে বিছানা থেকে তুলে আনার’ নির্দেশ দিয়েছিল।২৪৪

সামনে ভয়াবহ এক যুদ্ধ অপেক্ষমান দেখে রেইন্সবারা সালে’র আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আঁচ করার চেষ্টা করেন এবং জানতে পান যে, সেখানে দু’টো দলের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছে। এক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিদি মোহাম্মদ এবং অপরটির নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুল্লাহ বেন আলী এল-কাস্রি, যিনি সালে’র একটা অংশের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন এবং ৩২৮ জন ব্রিটিশ নাগরিককে বন্দি করে রেখেছেন। সম্ভাব্য ভয়াবহ যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে রেইন্সবারা সালে’র দুই প্রতিদ্বন্দ্বির পারস্পারিক শত্রুতাকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আব্দুল্লাহর হাতে আটক সকল ব্রিটিশ বন্দিদের মুক্তি ও সিদি মোহাম্মদের সঙ্গে একটি শান্তি-চুক্তি স্বাক্ষরের প্রত্যাশায় সিদি মোহাম্মদের কাছে এল-কাস্রির বিরুদ্ধে যৌথ-আক্রমণের প্রস্তাব করেন। বিদ্রোহী এল-কাস্রির ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য উন্মুখ সিদি মোহাম্মদ এ প্রস্তাবে রাজি হন। রেইন্সবারা এল-কাস্রির ঘাঁটিতে ঝর্ণার মতো ভারী কামান নিক্ষেপ শুরু করেন। ফলে কাস্রির প্রায় সবকিছু ধ্বংস হয় ও বহুলোক হতাহত হয়। অতঃপর রেইন্সবারা তার কামান জলদস্যুদের জাহাজগুলোর দিকে তাক করে কাস্রির অনেকগুলো জাহাজ ডুবিয়ে দেন। ইতিমধ্যে সিদি মোহাম্মদ তার ২০,০০০ হাজার যোদ্ধা নিয়ে কাস্রির ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়ে ভয়ঙ্কর ক্ষতিসাধন করে। তিন সপ্তাহ কামান-গোলা বর্ষণের পর এল-কাস্রিসহ বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করে এবং ব্রিটিশ বন্দিদেরকে মুক্ত করতে বাধ্য হয়। এভাবে এল-কাস্রির বিদ্রোহ-ঘাঁটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে এবং সিদি মোহাম্মদের নিকট থেকে ইংলিশ জাহাজ ও গ্রামগুলোতে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার পেয়ে রেইন্সবারা ১৬৩৭ সালের শুরুতে মুক্ত করা ২৩০ জন ব্রিটিশ ক্রীতদাসকে সঙ্গে নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন।

ইংল্যান্ডে ফিরে গেলে রেইন্সবারাকে বীরসুলভ সম্বর্ধনা জানানো হয়। সালে’র জলদস্যুদের ভীতি চিরতরে অবসান হয়েছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয় ইংল্যান্ডে। এ বিশ্বাসটা শক্ত হয় একই সময়ে মরক্কোর সুলতান মোহাম্মেদ এস-শেখ এস-শেগীরের (রা. ১৬৩৬-৫৫) সঙ্গে একটা চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে, যিনি তার প্রজাদেরকে ব্রিটিশ নাগরিকদেরকে আটক, ক্রয় ও ক্রীতদাসরূপে রাখা নিষিদ্ধ করতে সম্মত হন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই ব্রিটিশদের এ মোহ ভেঙ্গে যায় যখন সুলতান এ অজুহাতে চুক্তিটি ছুঁড়ে ফেলে দেন যে, ব্রিটিশ সরকার মরক্কোর বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইংরেজ বণিকদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সালে’র জলদস্যুরাও তাদের আক্রমণ পুনরায় শুরু করে দেয়। ১৬৪৩ সালের মধ্যে বহু ব্রিটিশ জাহাজ লুণ্ঠিত ও তাদের কর্মচারীরা বন্দি হয়। ১৬৪০-এর দশকের মধ্যে ৩,০০০ ব্রিটিশ নাগরিক বার্বার ক্রীতদাস শিকারিদের হাতে আটক হয়।২৪৫

১৬৪৬ সালে ব্রিটিশ ক্রীতদাসদেরকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থসহ বণিক এডমুন্ড কেইসনকে পাঠানো হয় আলজিয়ার্সে। তিনি সেখানে ৭৫০ জন ব্রিটিশ বন্দিকে খুঁজে বের করতে সমর্থ হন, যদিও এর চেয়ে বেশি সংখ্যক ব্রিটিশ বন্দিকে ইতিমধ্যে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল (যারা কখনোই মুক্তি পায়নি; ধর্মত্যাগের কারণে ব্রিটিশ সরকার তাদেরকে মুক্ত করার ইচ্ছাও পোষণ করেনি)। কেইসন প্রত্যেক পুরুষ বন্দির জন্য ৩৮ পাউন্ড ও মাত্র তিনজন নারী বন্দির জন্য ৮০০, ১১০০ ও ১৩৯২ পাউন্ড প্রদান করেন। তার হাতের নগদ অর্থ ফুরিয়ে গেলে অনেক বন্দিকে পিছনে ফেলে রেখে মাত্র ২৪৪ জনকে নিয়ে দেশে ফিরেন।

এরপর থেকে বার্বারি জলদস্যুরা সাগরে তাদের ক্রীতদাস-শিকার আরো জোরদার করে। তারা সুদূর নরওয়ে ও নিউফাউল্যান্ডের জাহাজ আক্রমণের মাধ্যমে তাদের আক্রমণ কার্যক্রমের পরিসীমা বাড়িয়ে দেয়। তারা ক্রীতদাস হিসেবে রাশিয়া ও গ্রিসের নাগরিক এবং সে সাথে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদেরকেও বন্দি করতো। স্পেন ও ইতালি ছিল তাদের আক্রমণের সবচেয়ে জঘন্য শিকার, যার সাথে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও পর্তুগাল হতে থাকে বড় শিকার। ১৬৭২ সালে খ্যাতনামা সুলতান মৌলে ইসমাইল ক্ষমতা সংহত করার পর তিনি ক্রীতদাস শিকারের কার্যক্রম প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত নেন ইউরোপীয় শাসকদেরকে অবদমিত রাখা ও তাদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষ্যে।

রাজা দ্বিতীয় চার্লস পর্তুগালের রাজকন্যা ক্যাথারিনকে বিয়ের পর ১৬৬১ সালে পর্তুগাল ব্রিটেনের কাছে তাঞ্জিয়ার ঘাঁটিটি হস্তান্তর করে। ব্রিটিশ সরকার জিব্রাল্টার প্রণালি বরাবর অবস্থিত তাঞ্জিয়ারকে বার্বারি জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত ও নির্মূল করার জন্য ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করে। ১৬৭৭ সালে সুলতান মৌলে ইসমাইল তার ক্রীতদাস শিকারের পথ পরিষ্কার করতে তাঞ্জিয়ার ঘাঁটিটি দখলের নির্দেশ দেন। সুলতানের সেনাপতি কাইদ ওমর পাঁচ বছর ধরে ২,০০০ ব্রিটিশ সেনা অধিকৃত সে গ্যারিসন-নগরীটি অবরোধ করে রাখে কিন্তু দখল করতে ব্যর্থ হন। ১৬৭৭ সালে আরেক দফা আক্রমণে কাইদ ওমর আটজন ব্রিটিশ প্রতিরোধকারী ও পরবর্তী এক হামলায় ৫৭ জনকে আটক করতে সমর্থ হন। ১৬৮০ সালে কাইদ ওমরের বাহিনী ব্রিটিশ গ্যারিসনটি দখলের অভিপ্রায় নিয়ে আবারো জোর আক্রমণ করলে যথাসময়ে একটি ব্রিটিশ সহায্যকারী বাহিনী এসে কাইদ ওমরের বাহিনীকে চরম মার দিয়ে অবরোধ তুলে পালাতে বাধ্য করে।২৪৬

এর পরপরই (ডিসেম্বর ১৬৮০) রাজা দ্বিতীয় চার্লস স্যার জেইম্স লেস্লির নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন তাঞ্জিয়ার অবরোধে আটককৃত ব্রিটিশ সেনাদেরকে মুক্ত করে আনতে। লন্ডন থেকে সুলতানকে পাঠানো উপহার পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছিল দেখে, সুলতানের কাছে সে বিলম্বের খবর পৌঁছে দিতে স্যার লেস্লি কর্নেল পার্সি কার্ক’কে প্রেরণ করেন। কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাহীন ভীরু ও মদ্যপ কর্নেল কার্ক ভীতিকর সুলতানের দর্শন পেয়ে অভিভূত হয়ে যান। কুটিল মৌলে ইসমাইল কর্তৃক প্রদর্শিত অভিনন্দন, আতিথেয়তা ও ছলনায় মুগ্ধ কর্নেল কার্ক নিজের আসল ভূমিকার কথা ভুলে গিয়ে নিজেই আলোচনা শুরু করে দেন। শান্তিচুক্তির কথা উপস্থাপন করলে সুলতান চার বছরের চুক্তির প্রস্তাব দেন, কিন্তু তিনি পরিবর্তে দশটি বড় কামান দাবি করেন। সাদাসিদা কর্নেল তার শর্ত শুধু মেনেই নেননি, বরং ‘প্রতিশ্রুতি দেন তার যা যা ঘাটতি, তা পূরণ করতে সহযোগিতা দেওয়ার।’ বার্তাবাহক হিসেবে এসে কূটনীতিকের কাজে হাত দিয়ে কর্নেল কার্ক শুধু তার ভূমিকাই ভঙ্গ করেননি, তিনি সুলতানের প্রাসাদে আটককৃত প্রায় ৩০০ ব্রিটিশ বন্দির কথা বেমালুম ভুলে যান। অথচ তার সে কূটনৈতিক সফলতায় অতি উৎফুল্ল কার্ক ইংল্যান্ডে লিখে পাঠান: ‘আমি বিশ্বকে জানাতে চাই যে, আমি এক সদয় রাজা ও ন্যায়বান সেনাপতির সাক্ষাত পেয়েছি।’২৪৭

অবশেষে, সুলতানের জন্য প্রেরিত উপঢৌকনসামগ্রী জিব্রাল্টারে এসে পৌঁছুলে স্যার লেস্লি সুলতানের প্রাসাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তিনি যখন ব্রিটিশ বন্দিদেরকে মুক্তির বিষয়টি উত্থাপন করেন, তখন সে বিষয়ে আলোচনায় অনুৎসাহী সুলতান আলোচনা ত্যাগ করে তার সেনাপতি কাইদ ওমরকে একটা অস্ত্র-বিরতি স্বাক্ষরের নির্দেশ দেন। বন্দিদেরকে মুক্ত করতে অনিচ্ছুক সুলতান তাঞ্জিয়ার গ্যারিসন অবরোধকালে আটককৃত সেনাদের মধ্য থেকে ৭০ জনকে নিতান্তই নিস্পৃহভাবে মুক্ত করতে সম্মত হন। কিন্তু বিনিময়ে এমন উচ্চ-মূল্য দাবি করেন যে লেস্লিকে খালি হাতে দেশে ফিরতে হয়।

এরপর সুলতান ইংরেজ বন্দিদেরকে মুক্তির শর্তাবলি আলোচনার পূর্ণ-ক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্রদূত কাইদ মোহাম্মদ বিন হাদ্দু ওত্তার’কে লন্ডনে পাঠান। লন্ডনে সুলতানের দূত-দলকে কয়েক মাস ধরে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ আতিথেয়তায় রাখা হয়। রূদ্ধদ্বার বৈঠকে ব্যাপক আলোচনার পর অবশেষে একটা যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত মোতাবেক প্রত্যেক বন্দির মুক্তির জন্য ২০০ স্পেনীয় ডলার প্রদান করবে ব্রিটিশ সরকার এবং সুলতানের জলদস্যুরা ব্রিটিশ উপকূলের গ্রামগুলোতে হামলা বন্ধ করবে; ব্রিটিশ বাণিজ্য-জাহাজে হামলার ব্যাপারে কোনো শর্তের উল্লেখ ছিল না। কিন্তু খামখেয়ালী সুলতান এ চুক্তিটি অনুমোদন না করে ব্রিটিশ রাজের চিঠির উত্তরে প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি শান্ত হবেন ‘তাঞ্জিয়ার দখল করে মূর’দের দিয়ে ঘাঁটিটি ভরে তোলার পরই’। ব্রিটিশ রাজার চিঠিতে লিখা ব্রিটিশ জাহাজে আক্রমণের ব্যাপারে আলোচনার প্রশ্নে সুলতান লিখেন: ‘তার কোনোই প্রয়োজন নেই আমাদের’ এবং জলদস্যুরা তাদের আক্রমণ অব্যাহত রাখবে। দীর্ঘদিনের আলোচনার এ ব্যর্থতায় হতাশ রাজা শেষ পর্যন্ত তাঞ্জিয়ার গ্যারিসনের ব্যাপারে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। তাঞ্জিয়ার ঘাঁটির মাধ্যমে মুসলিম জলদস্যুদের আক্রমণ-লুণ্ঠন থামাতে ব্যর্থ ব্রিটিশ সরকার পরের বছর গ্যারিসনটি খালি করে দেয়।২৪৮ রাজা দ্বিতীয় চার্লসের বাকি রাজত্বকালব্যাপী আটককৃত ব্রিটিশ নাগরিকরা সুলতান মৌলে ইসমাইলের গোপন কুঠুরিতে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে থাকে। ১৬৮৫ খৃষ্টাব্দে রাজা তৃতীয় চার্লস সিংহাসনে আরোহন করেই বন্দিদের মুক্তির ব্যাপারে চিন্তান্বিত ও উৎসাহী হন। পাঁচ বছরের দীর্ঘসূত্রী আলাপ-আলোচনার পর সুলতান বন্দিদেরকে মুক্তি দিতে সম্মত হন ১৫,০০০ পাউন্ড ও ১,২০০ ব্যারেল গান-পাউডারের বিনিময়ে। মরক্কোতে মুক্তিপণ বহনকারী জাহাজের ক্যাপ্টেন জর্জ ডেলাভাল লিখেন: ‘গান-পাউডার দিয়ে জাহাজ এমন ভর্তি ছিল যে, তা বিস্ফোরিত হয়ে ডুবে মরার অবিরাম ভয়ে থাকতাম আমরা।’ ডেলাভালের পৌঁছানোর পর সুলতান চুক্তির শর্ত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু করলে ডেলাভাল বন্দিদের মুক্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অর্থ হস্তান্তর করতে অস্বীকার করেন। পরিশেষে সুলতান ব্রিটিশ ক্রীতদাসদের ৩০ জনকে নিজের কাছে রেখে ১৯৪ জনকে মুক্ত করেন। পরে ১৭০২ সালে রাণী অ্যান সিংহাসনে আরোহন করে কিউটায় স্পেনীয় ঘাঁটির উপর মরক্কোর আক্রমণে ব্রিটেনের সহযোগিতার আভাস দিলে সুলতান বাকি ব্রিটিশ বন্দিদেরকে হঠাৎ মুক্ত করে দেন। ১৫০ বছরের মধ্যে এই প্রথম ব্রিটিশ বন্দিশূন্য হয় মরক্কোর রাজপ্রাসাদ। এর কিছুকাল পরেই সালে’র জলদস্যুরা আক্রমণে নেমে পড়ে, স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে সুলতানের আক্রমণে যোগ দিতে রাণীর উদাসীনতা প্রদর্শনের কারণে। ফলে ব্রিটিশ বন্দিরা আবার দলে দলে আসতে শুরু করে সুলতানের রাজপ্রাসাদে।২৪৯

বিপুল পরিমাণ উপঢৌকনের প্রতিশ্রুতিতে সুলতান মৌলে ইসমাইল ও রাণী অ্যানের মাঝে আরো একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৭১৪ সালে। ঐ বছরের গ্রীষ্মে রাণীর মৃত্যু হওয়ায় উপঢৌকন প্রেরণে বিলম্ব হলে সুলতান তার ক্রীতদাস শিকারিদেরকে পুনরায় সমুদ্রে পাঠান। নিঃসন্তান রাণী অ্যানের মৃত্যুর পর জার্মান বংশোদ্ভূত হ্যানোভারের শাসক রাজা প্রথম জর্জকে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসানো হয়। তিনি শুরুতে মরক্কোস্থ ব্রিটিশ বন্দিদের চরম দুর্দশার ব্যাপারে একটুও উৎসাহ দেখাননি। ১৭১৭ সালে বন্দিকৃত ব্রিটিশ নাবিকদের স্ত্রী ও বিধবারা রাজার নিকট অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এক আবেদনে তাদের বন্দি স্বামীদের মুক্তির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের আকুতি জানায়। তাতেও রাজা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী যোশেফ এডিশন এ কঠিন দায়িত্বটি নিজ কাঁধে তুলে নেন। মাত্র কয়েক মাস আগেই এডমিরাল চার্লস্ কর্ণওয়াল সুলতানের প্রাসাদ থেকে খালি হাতে ফিরে এসেছিলেন, কারণ সুলতান একটা স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর ও ব্রিটিশ বন্দিদেরকে মুক্ত করতে অনিচ্ছুক ছিলেন।

১৭১৭ সালের মে মাসে এক দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর ক্যাপ্টেন কোনিন্সবি নরবুরি’র নেতৃত্বে উচ্চ-পর্যায়ের এক প্রতিনিধিদলকে পাঠানো হয় মরক্কোতে। ব্রিটিশ নাবিকদেরকে অব্যাহতভাবে আটক করা ও পূর্ব-স্বাক্ষরিত সকল শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করায় ক্রুদ্ধ নরবুরি এ স্পর্শকাতর আলোচনার জন্য ছিলেন খুবই উদ্ধত, এবং সুলতানের প্রতি তিনি এক ধরনের অগ্রাহ্য ও ঘৃণার ভাব দেখান। ইংল্যান্ড থেকে আনা যথেষ্ট পরিমাণ উপঢৌকনের আশায় সুলতান মৌলে ইসমাইল প্রথম সাক্ষাতে অনেকটা বন্ধু-সুলভ মনোভাব প্রদর্শন করেন। কিন্তু নরবুরি সুলতানের কাছে ‘ক্রীতদাসদের মুক্তি দাবি করেন এটা বলে যে, তাদেরকে মুক্ত না করলে তিনি কোনোই শান্তি-চুক্তি স্বাক্ষর করবেন না, তাদের সমস্ত সমুদ্রবন্দর অবরোধ ও বাণিজ্য ধ্বংস করে ফেলবেন, এবং এরূপ আরো হুমকি।’২৫০ বিদেশী প্রতিনিধিদের প্রতি অবজ্ঞামূলক ব্যবহার প্রদর্শনে অভ্যস্ত সুলতান এমন ধামকির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না এবং নরবুরির মিশন ফলপ্রসু হয়নি। কিন্তু সুলতান মরক্কোতে একজন ব্রিটিশ কনসুল গ্রহণে রাজী হন। মার্চেন্ট এ্যান্টনি হ্যাটফিল্ডকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বন্দিদেরকে মুক্তির জন্য কয়েক বছর ধরে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও সফলতা পেতে ব্যর্থ হন।

হ্যাটফিল্ড ১৭১৭ সাল থেকে ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া জলদস্যুদের তৎপরতা সম্পর্কে গুপ্তসংবাদ সংগ্রহ করে সে ব্যাপারে লন্ডনকে নিয়মিত অবহিত করেন। গোয়েন্দাদের দ্বারা বিপদ-সংকেত পেয়ে কমোডর চালর্স স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে আরেকটি কূটনৈতিক মিশন পাঠানো হয় ১৭২০ সালে। মরক্কোর খামখেয়ালী ও উদ্ধত শাসকের সাথে আলোচনার দক্ষতা ও যথার্থ কূটনৈতিক বৈশিষ্ট্য ছিল স্টুয়ার্টের। তিনি প্রথমে উত্তর মরক্কোর তেতোয়ান প্রদেশে সুলতানের গভর্নর পাশা হ্যামেতের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। অতঃপর তিনি সুলতানের দরবারে যান, যেখানে তার প্রতিনিধি দলকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় সুলতানকে বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন প্রদানের বিনিময়ে। ইংল্যান্ড ও উপনিবেশিক আমেরিকার ২৯৩ জন ক্রীতদাস মুক্ত হয়।২৫১

এ চুক্তির পরও সুলতান ও তার দস্যুবাহিনী খুব বেশি দিন তাদের লুণ্ঠন তৎপরতা থেকে বিরত থাকেনি। ১৭২৬ সালের মধ্যে জলদস্যুরা আরো অনেক ব্রিটিশ জাহাজ লুণ্ঠন করে বন্দিদেরকে রাজধানী মেকনেসে সুলতানের প্রাসাদে প্রেরণ করে। পরের বছর (১৭২৭) সুলতান মৌলে ইসমাইল মারা গেলে দেশে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা শুরু হয়। এরূপ বিশৃঙ্খল অবস্থা চলাকালীন গুন্ডাবাহিনীর, বিশেষ করে জলদস্যুদের, তৎপরতা স্বভাবতই বৃদ্ধি পেতো। এর ফলে আলজিয়ার্স, তিউনিস ও মেকনেসের ক্রীতদাস খোয়াড়গুলো বন্দিতে ভরে উঠে। ১৭৪৬ সালে ‘ইনস্পেক্টর’ নামক ব্রিটিশ জাহাজটি জলদস্যুদের দ্বারা লুণ্ঠিত হয় এবং বেঁচে যাওয়া ৮৭ জন কর্মচারিকে বন্দি করা হয়। সে জাহাজের এক বন্দি টমাস ট্রটল লিখেছেন: ‘বিরাট একটা শেকল দিয়ে আমাদের গলার চারদিক বেড় দিয়ে বাঁধা হয়; এক শেকলে কুড়ি জন করে বাঁধা হয়।’ ব্রিটিশ সরকার ১৭৫১ সালে মেকনেসের রাজপ্রাসাদ থেকে কয়েকবার বন্দিদেরকে মুক্ত করতে সমর্থ হয়। কিন্তু মরক্কোর সুলতান ফরাসি, স্পেনীয়, পর্তুগিজ, ইতালীয় ও ডাচ প্রভৃতি জাতীয়তার বন্দিদেরকে কম খুবই মুক্ত করতেন। অবশেষে অনেকটা মানবিক ও কাণ্ডজ্ঞানবিশিষ্ট সিদি মোহাম্মদ সিংহাসন দখল করেন ১৭৫৭ সালে। তিনি ছিলেন এক বিজ্ঞ ব্যক্তি এবং বিশ্বাস করতেন যে, মরক্কোর বিধ্বস্ত অর্থনীতি ভালভাবে সংস্কার জলদস্যুতা ও ক্রীতদাসত্বের উপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে করা সম্ভব। সে মোতাবেক তিনি জলদস্যুদের বিরুদ্দে যুদ্ধ ঘোষণা করে তাদেরকে ধ্বংস করেন। ১৭৫৭ সালে তিনি ডেনমার্কের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল ইউরোপীয় দেশের সাথে শান্তিচুক্তি করেন, যারা ইতিপূর্বে বার্বারি জলদস্যুদের শিকার হয়েছিল।২৫২

বহু বছর ধরে মরক্কোর উপকূলের ভয়ঙ্কর জলদস্যুতা মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল, যদিও আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া ইউরোপ ও আমেরিকার জাহাজ লুণ্ঠন-কার্য অব্যাহত রাখে। ১৭৯০ সালে সুলতান সিদি মোহাম্মদের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরী ও পুত্র মৌলে সোলায়মান পিতার স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো অনুমোদন করা সত্ত্বেও ইউরোপীয় জাহাজ আক্রমণে সালে’র জলদস্যুদেরকে উৎসাহিত করেন। তবে ইতিমধ্যে সালে ও উত্তর আফ্রিকার অন্যত্র বার্বার জলদস্যুদের স্বর্ণযুগের অবসানের দিন ঘনিয়ে আসছিল। ব্রিটেন ও আমেরিকা শতাব্দির পর শতাব্দিব্যাপী নিষ্ক্রিয়তা, শান্ত ও আপোষকরণ এবং মুক্তিপণ প্রদানের পরও যন্ত্রণার অবসান হচ্ছে না দেখে শেষ পর্যন্ত উত্তর আফ্রিকার জলদস্যুতা চিরকালের জন্য অবসানের লক্ষ্যে সামরিক শক্তির দ্বারা পাল্টা আঘাতের সিদ্ধান্ত নেয়।

এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, উপরে বর্ণিত বার্বার জলদস্যুতা ও ক্রীতদাসকরণের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের সংগ্রাম উত্তর আফ্রিকায় তাদেরকে সামগ্রিক সংগ্রামের একটা অংশ মাত্র। ত্রিপোলি ও আলজিয়ার্সেও একই প্রকারের সংগ্রাম করতে হয়েছে তাদেরকে।

[আগামী পর্বে আলোচিত হবেঃ উত্তর আফ্রিকায় মার্কিন সংগ্রাম ও পাল্টা আক্রমণ]

সূত্রঃ
242. Milton, p. 17

243. Ibid, p. 17-20

244. Ibid, p. 22-23

245. Ibid, p. 23-6

246. Ibid, p. 28, 37-28
247. Ibid, p. 39-41

248. Ibid, p. 39-41

249. Ibid, p. 49-50

250. Ibid, p. 116

251. Ibid, p. 172-95

252. Ibid, p. 269-70

————–

চলবে—

About the Author:

আবুল কাশেম, অস্ট্রেলিয়া নিবাসী মুক্তমনা সদস্য। ইসলাম বিষয়ক বইয়ের প্রণেতা।

মন্তব্যসমূহ

  1. সাদা মানুষ জানুয়ারী 11, 2015 at 6:00 অপরাহ্ন - Reply

    পবিত্র গ্রন্থ আল কোরআনের প্রথম আয়াত নাজিল হয় ৬১০ সালে আর শেষ আয়াত নাজিল হয় ৬৩২ সালে। কোরআনের ৯০ নং সুরায় তথা সুরা বালাদে ৮ থেকে ১৮ নং আয়াতে বলা হচ্ছেঃ

    “আমি কি তাকে(মানুষকে) দু’টি চোখ, জিহ্বা ও ঠোঁট দেইনি? আমি কি তাকে (ধর্ম
    ও অধর্মের) দু’টি পথ দেখাইনি? কিন্তু সে ধর্মের দূর্গে প্রবেশ করেনি। তুমি কি জানো ধর্মের দূর্গ কি? ধর্মের দূর্গ (নেক আমল বা সৎকর্মের সুউচ্চ স্তর) হচ্ছে (এক) দাসমুক্তি, (দুই) দুর্ভিক্ষের দিনে অন্ন দান, (তিন) নিকটবর্তী এতিম বা ধূলিমলিন মিসকিন অসহায়কে লালন এবং (চার) বিশ্বাসীদের সাথে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে পরস্পরকে বিশ্বজনীন মমতা ও সবরে উদ্বুদ্ধ করা। এরাই সফলকাম।

    আয়াত ১৯ ও ২০ঃ আর যারা এ নির্দেশ অস্বীকার করে (নিজের খেয়াল খুশীমতো চলে) তারাই ব্যর্থ! গনগনে আগুণ ওদের গ্রাস করবে।”

    উপরের আলোচনা থেকে জানা গেল “ইউরোপীয় জাতিগুলো ১৮১৫ সালে দাস-বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছে। ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশরা দাসপ্রথা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে সমস্ত ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দেয়। ” অথচ মহাগ্রন্হ আল কোরআন ৬৩২ সালের মধ্যেই দাসপ্রথা বিলুপ্তির জন্য নির্দেশ দিয়েছে। ইউরোপীয়দের চেয়ে প্রায় ১২০০ বছর পূর্বে। অথচ সে খবর আপনি রাখলেন না। আর ১২০০ বছর পরে এসে ইউরোপীয়রা যখন নিষিদ্ধ করলো তখন আপনি তার ভুয়সী প্রশংসা করছেন। আমরা অবশ্যই ভালো কাজের প্রশংসা করবো। তবে কেন ১২০০ বছর আগে পদক্ষেপ গ্রহণকারী ইসলামকে বাহবা দিচ্ছি না? লক্ষ্য করুন, কোরআন ৪টি বিষয়কে ধর্মের দূর্গ বলেছে, তার মধ্যে দাসমুক্ত করা অন্যতম।

    বিষয়টি মনে রাখতে হবে দাস প্রথার প্রচলন চলে আসছিল পূর্ব থেকেই। তাই একে বাদ দেয়ার জন্য মুসলমানদের প্রথমে উৎসাহিত করা হয়েছে বিভিন্ন সময়। আর উপরোক্ত সুরায় বলা হয়েছে যারা তা থেকে নিজেদের বিরত না রাখবে তাদেরকে গনগনে আগুণ গ্রাস করবে।

    আপনারা কত অন্ধভাবে তর্ক করে যাচ্ছেন কোন বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না রেখেই। লজ্জা লাগছে আপনাদের অবস্থা দেখে। আবার নিজেদের মুসলমান দাবী করবেন ঈদের সময়, বিয়ের সময় এবং জানাজার সময়।

    এখনও সময় আছে কোরআন পাঠ করুন মনোযোগ দিয়ে, নবীজীর জীবনী জানার চেষ্টা করুন। তবেই উপলব্ধি করতে পারবেন ইসলামকে।

    মুসলমানেরা কারো প্রতি আগ্রাসী নয়, আমিও নই। আমি আপনাদের সকলের হেদায়েতের জন্য দোয়া করছি। ভালোর সাথে থাকবেন সব সময়।

  2. আলমগীর হুসেন এপ্রিল 12, 2012 at 4:20 অপরাহ্ন - Reply

    দেখা যাচ্ছে, এমন কোন জাতি বা গোত্র নাই যে ইসলামি ক্রীতদাসত্ব চর্চার শিকার হয় নি। ইসলামের হাত যতদূর প্রসারিত হয়েছে, ততদূর নিরীহ মানুষ এ বর্বরতার শিকার হয়েছে।

    • আবুল কাশেম এপ্রিল 13, 2012 at 1:19 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আলমগীর হুসেন,

      ইসলামের হাত যতদূর প্রসারিত হয়েছে, ততদূর নিরীহ মানুষ এ বর্বরতার শিকার হয়েছে।

      আহা, শান্তির ধর্ম!

  3. তামান্না ঝুমু এপ্রিল 11, 2012 at 10:16 পূর্বাহ্ন - Reply

    পড়তে পড়তে ভয়ে শিউড়ে উঠি।

    • আবুল কাশেম এপ্রিল 13, 2012 at 1:18 পূর্বাহ্ন - Reply

      @তামান্না ঝুমু,

      পড়তে পড়তে ভয়ে শিউড়ে উঠি।

      তা আর বলতে। স্বয়ং নবীজি বলে গেছেন–ভীতি দ্বারা ইসলাম বিশ্ব জয় করবে। তার বাস্তবতা আজাকের ইসলামি সন্ত্রাশ।

      • নাজমুস সাকিব এপ্রিল 20, 2012 at 4:13 পূর্বাহ্ন - Reply

        @আবুল কাশেম, ইসলামের নামে তো মহান গুনগান করলেন। জানেন কি মহান নবীজী (সাঃ) হযরত বেলাল কে মুক্ত করার মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেন। আর আপনাদের তথাকথিত সভ্য দেশ আমেরিকায় এই জঘন্য প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে গত শতাব্দীতে। আবুল কাশেম নামটিই একটি সুন্দর ইসলামিক নাম। এই নাম রাখার অপরাধে আপনার বাবাকে খোজাকরন করে দিন।

        • আবুল কাশেম এপ্রিল 21, 2012 at 12:56 পূর্বাহ্ন - Reply

          @নাজমুস সাকিব,

          আবুল কাশেম নামটিই একটি সুন্দর ইসলামিক নাম। এই নাম রাখার অপরাধে আপনার বাবাকে খোজাকরন করে দিন।

          আহা! কি সুন্দর ইসলামি বচন! এই না হলে ইসলাম।

          • নাজমুস সাকিব এপ্রিল 21, 2012 at 1:06 পূর্বাহ্ন - Reply

            @আবুল কাশেম, নাস্তিক সাজবেন ঘোষনা দিয়ে। যে, মরে গেলে কবর হবে না চিতা হবে?? খতনা করেছেন নাকি করেননি। আপনার বাবাও নাস্তিক না আস্তিক। ইসলাম মানেন কি মানেন না। আপনি ইসলামের ইদ করেন কিনা। আমি আমার টা জানান দিচ্ছি, আমি আস্তিক। সব ইসলামী নিয়মকানুন মেনে চলার চেষ্টা করি। নাস্তিকতাও একটা বিশ্বাস। সেটা ভালভাবে পালন করুন। আমাদের দেশের নাস্তিকরা তো সেটাও ভালভাবে পালন করে না।

            • ঢাকা ঢাকা এপ্রিল 24, 2012 at 3:57 অপরাহ্ন - Reply

              @নাজমুস সাকিব,

              খতনা করেছেন নাকি করেননি।

              মহানবী কি খতনা করেছিলেন ? (আবার বলিয়েন না যে জন্ম থেকেই উনি খতনা প্রাপ্ত)

              আপনার বাবাও নাস্তিক না আস্তিক। ইসলাম মানেন কি মানেন না।

              নবীর বাবাও কি মুস্লিম ছিল?
              উনার চাচা কি ইসলাম গ্রহন করেছিলেন ?

মন্তব্য করুন