Lamarck
ফরাসি এই জীববিজ্ঞানীর পুরো নাম জ্যাঁ ব্যাপতিস্ত দ্য মনেত লামার্ক। জন্ম ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের বাপায়ুঁ শহরে, ১৭৪৪ সালে। লামার্কের পূর্বপুরুষেরা একসময় জমিদার থাকলেও লামার্কের জন্মের সময় তাঁর পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। লামার্ক তাঁর এগার ভাইবোনদের মধ্যে সর্বকণিষ্ঠ। কলেজের লেখাপড়া চলাকালীন সময়ে মাত্র সতের বছর বয়েসে সেনাবাহিনীতে অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। তারপর তিনি আর প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারেন নি। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন গলায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৭৬৮ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তখন তিনি উদ্ভিদ-অঙ্গসংস্থানবিদ্যায় আগ্রহী হয়ে উঠেন। ফরাসি দেশের প্রখ্যাত মেরুদণ্ডী প্রাণীবিশেষজ্ঞ জর্জ বুফোঁর সহায়তায় ইতালি, হল্যান্ড, জার্মানি, হাঙ্গেরি ভ্রমণ করে উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করতেন। ক্রমে লামার্ক উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাসবিদ হিসেবে ফ্রান্সে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেন। তিনি জগদ্বিখ্যাত শ্রেণীবিন্যাসবিদ ক্যারোলাস লিনিয়াসের (১৭০৭-১৭৭৮) অনুসারী ছিলেন। ১৭৮৮ সালে ফ্রান্সের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী পদে নিযুক্ত হন। প্রায় ত্রিশটি বছর তিনি উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে চর্চা করে গেছেন। এ সম্পর্কে প্রচুর লেখাও রয়েছে তাঁর। উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে লামার্কের বড় কাজ হচ্ছে তিন খণ্ডে প্রকাশিত ‘ফরাসি দেশের উদ্ভিদ’ বইটি। এটি লামার্ককে গোটা ফ্রান্সে ‘প্রখ্যাত’ উদ্ভিদবিদের সম্মান এনে দেয়। অতঃপর ১৭৯৩ সালে লামার্ক তাঁর কর্মস্থলে অমেরুদণ্ডী প্রাণীর অধ্যাপক পদে নিয়োগ লাভ করেন। এই পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিলেন জর্জ বুফোঁ। লামার্ক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই পদেই অধিষ্ঠিত ছিলেন।

ছোটবেলা থেকে ভগ্নস্বাস্থ্যের অধিকারী লামার্ক দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন চারজন। সন্তান সংখ্যাও ছিল অত্যাধিক। (প্রথম স্ত্রীর ঘরে ছয়টি সন্তান)। লামার্কের সন্তানদের অনেকে মানসিক ও শারীরিকভাবে পঙ্গু ছিল। এ অবস্থায় লামার্কের ব্যক্তিগত জীবন বা সংসার জীবন যে খুব একটা সুখের ছিল তা বলা যায় না। ১৮১৮ সালে তিনি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যান এবং প্রায় ১১ বছর পরে মৃত্যুবরণ করেন (১৮২৯ সালে)। এটা সত্যি, বিরোধীরা জীববিবর্তনকে বিকৃত করতে গিয়ে লামার্কের অনেক ভালো ভালো কাজকেও স্মৃতির অতলে হারিয়ে দিয়েছে। আজকের যুগে জীববিজ্ঞানে লামার্কের নাম উচ্চারিত হয় জীববিবর্তন সম্পর্কে প্রায় পরিত্যক্ত এক মতবাদের প্রবক্তা হিসেবে।

ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সে লামার্ক প্রাণীবিদ্যা চর্চা শুরু করেন। জীববিজ্ঞানের এই শাখাতেও তিনি দ্রুত দক্ষতার ছাপ রাখতে সক্ষম হন। ১৮১৫ সাল থেকে ১৮২২ সালের মধ্যে ‘অমেরুদণ্ডী প্রাণীর প্রাকৃতিক ইতিহাস’ নামের সাত খণ্ডে লেখা লামার্কের গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ওই সময় লামার্ক ও জীববিজ্ঞানী কুভিয়ের, এই দুজনই মাত্র ছিলেন গোটা ফ্রান্সের মধ্যে জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক। লামার্কই প্রথম উদ্ভিদবিদ্যা এবং প্রাণীবিদ্যার সমন্বয় করে ‘জীববিজ্ঞান’ শব্দের ব্যবহার শুরু করেন। জীবনের দীর্ঘ সময় লামার্ক প্রজাতির স্থিরতায় আর বিশেষ সৃষ্টিবাদে বিশ্বাস করে গেছেন। প্রৌঢ় বয়সে এসে তাঁর আজন্মলালিত বিশ্বাসে-চিন্তায় পরিবর্তন আসে। তখন তাঁর বয়স ৫৬। ১৮০২ সালে তিনিই প্রথম জীবের বিবর্তন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেবার চেষ্টা চালান। জীববিবর্তন সম্পর্কে তাঁর প্রস্তাবনাকে বলা হয় ‘ট্রান্সমিউটেশন অনুকল্প’। যদিও এগুলি পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বিজ্ঞানের জগতে এই মতবাদ আজ অনেকটাই পরিত্যক্ত। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীতে তিনি ছিলেন সর্বাধিক পরিচিত জীববিবর্তন ধারণার একজন প্রবক্তা। বিশ্বের বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে তাঁর প্রস্তাবনা ব্যাপক প্রচার লাভ করে। আজকের যুগেও অনেকে জীববিবর্তন বলতে লামার্কের সেই ভ্রান্ত প্রস্তাবনাকেই বুঝে থাকে।

১৮০৯ সালে লামার্ক জীববিদ্যার দর্শন গ্রন্থে তাঁর জীবের রূপান্তর অনুকল্প বিস্তৃতভাবে তুলে ধরেন। এই গ্রন্থে লামার্ক গুরুত্ব দেন প্রত্যেক জীবই কেমন করে একে অপরের সাথে আন্তসংযুক্ত হয়ে আছে। এরা সকলেই অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। ‘বিচ্ছিন্ন’, ‘স্থির’, ‘অপরিবর্তনশীল’ প্রজাতি হয়ে ওরা কেউই বিশেষভাবে সৃষ্ট নয়। প্রকৃতি প্রাণীজগতের ক্রমবিন্যাস দেখানোর জন্য ক্যারোলাস লিনিয়াসের মতো লামার্কও একটি সনাতন পদ্ধতির পর্যায়ক্রম তৈরি করেন। লামার্কের ক্রমবিন্যাসের নীচের দিকে অবস্থান করছে আদিম জেলিফিশ ও কোরাল। উপরে অবস্থান হচ্ছে কেঁচোজাতীয় ক্ষুদ্রাকৃতির অমেরুদণ্ডী প্রাণী, এর উপরে শামুক জাতীয় প্রাণী থেকে কীটপতঙ্গ। এরপর উপরে মেরুদণ্ডী প্রাণী এবং সবার উপরে মানুষের অবস্থান। সেই সময়ে অনেকের মতো লামার্কও গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ধারণায় কিছুটা প্রভাবিত ছিলেন। জীবজগতে জীবের অবস্থান সিঁড়ির মত ধাপে ধাপে সাজানো–এমনটা অ্যারিস্টটলীয় চিন্তাধারা। অ্যারিস্টটল আরো মনে করতেন, পৃথিবীতে কোনো এক সময়ে কর্দমাক্ত জলাশয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে। জেলিফিশের মত সরল দৈহিক গঠনের প্রাণীরা সর্বপ্রথম আসে, তারপর জীবনের রূপান্তর ঘটে, ধাপে ধাপে জটিল দৈহিক গঠনের প্রাণীদের উদ্ভব ঘটে। এই সিঁড়ির ধাপের উপর দিকে অবস্থান করে মেরুদণ্ডীপ্রাণীরা, সবার উপরে মানুষ। লামার্কের চিন্তাধারায় প্রাচীনপন্থার সাথে মিশেল থাকলেও তাঁর দেয়া প্রজাতির আন্তঃসংযুক্ততা ও পরিবর্তনশীলতার ধারণা সে-যুগে আসলেই বিপ্লবাত্মক ছিল। অ্যারিস্টটলের মতো লামার্কের দেয়া ‘প্রকৃতির সিঁড়ি’ ধারণাটি পরিত্যাক্ত হয়ে গেছে। আধুনিক জীববিবর্তন তত্ত্ব অনুসারে জীবনবৃরে ধারণা সিড়ির মত ধাপে ধাপে সাজানো নয়। এটি অনেক ডালপালাযুক্ত মত বৃক্ষের দিকে ইঙ্গিত করে।

লামার্কের জীববিদ্যার দর্শন (Philosophie Zoologique) গ্রন্থে জীবের রূপান্তর সম্পর্কে চারটি বিষয়ের কথা বলেছেন। মোটামুটিভাবে এগুলো হচ্ছে : (১) বিবর্তনে জীব যত জটিল হতে থাকে ততই ক্রমাগত তাদের আকার ও দেহের বিভিন্ন অংশের বৃদ্ধি ঘটে। (২) পরিবেশের ‘দাবি’ বা ‘চাহিদা’ পূরণ করতে, কিংবা নতুন ‘প্রয়োজন’ মেটাতে জীবের মধ্যে ‘ইচ্ছা’ উৎপন্ন হয় এবং তা পূরণ করতে কোনো অঙ্গের ব্যবহার অধিকতর হলে তাতে নতুন লণ ফুটে ওঠে। কখনও কখনও নতুন অঙ্গেরও উৎপত্তি ঘটে। এভাবে ক্রমাগত ব্যবহার বা অব্যবহার থেকে অঙ্গের উন্নতি বা বিলুপ্তি ঘটে। (৩) ব্যবহার ও অব্যহার অনুকল্প (Principle of use and disuse) : প্রত্যেক প্রাণীর যেসব অঙ্গ সবসময় খুব বেশি ব্যবহৃত হয়, সেসব অঙ্গ ক্রমে শক্তসামর্থ হয়ে ওঠে, বিকশিত হয়। অঙ্গগুলি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে সময়ের দৈর্ঘ্যরে অনুপাতে এদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। আর যদি কোনো অঙ্গ স্থায়ী অব্যবহৃত থাকে, তবে সেই অঙ্গ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে, অবনতি ঘটে। শেষমেশ সেই অঙ্গের বিলুপ্তিও ঘটে। যে সকল অঙ্গ ব্যবহৃত বা অ্যবহৃত হয়ে নতুন লণার উৎপত্তি হয়, সেগুলো রতি হয়, নয়তো বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। (৪) অর্জিত চরিত্রের বংশানুসৃতি (The Inheritance of Acquired Characters) : কোনো স্বতন্ত্র জীবের জীবনকালে পরিবেশের প্রভাবে অর্জিত বা হারানো বৈশিষ্ট্যাবলী এবং কোনো অঙ্গের ব্যবহার ও অব্যবহারের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশিষ্ট্যবলী বংশানুক্রমিক হয়। অর্থাৎ এই বৈশিষ্ট্যগুলো পরবর্তী প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে একটি প্রজাতি পরিবেশের প্রভাবে নিত্যনতুন বৈশিষ্ট্য লাভ করতে করতে বংশধরদের মধ্যে সেগুলি ছড়িয়ে দেয় এবং একসময় নতুন প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়।

এখানে আমেরিকার মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্ট্রিকবার্গারের ‘Evolution’ বই (পৃ. ২২) থেকে লামার্কের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে :

আমরা অনেক সময় দেখি, …যেসব পাখি পানির আশেপাশে থাকে (যেমন সারস, বক ইত্যাদি–অ.ব.দ.), তারা সাঁতার জানে না এবং তীর ঘেষে নিরাপদ অবস্থান নিয়ে কাদার মধ্য থেকে শিকার করতে যায়। পাখিগুলো এমনভাবে এই কাজ করে যাতে গোটা শরীর যেন পানিতে ডুবে না যায়। এজন্যই সবচেয়ে ভালো হয়েছে যে এদের পাগুলো সরু এবং লম্বা হয়েছে। পানির তীরবর্তী স্থানে থেকে থেকে পাখিগুলো যে শিকার করার কায়দা শিখেছে তা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহৃত হওয়ার ফলে বংশপরম্পরায় ওই পাখির জাতের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। সবারই এখন লম্বা ও সরু পা হয়ে গেছে। পাখির অর্জিত বৈশিষ্ট্যগুলো ক্রমশ তার পাগুলিকে লম্বা করেছে। শরীরের পালকগুলো ঊরুর উপরে থেকে ঝরে গিয়ে এদের পাগুলিকে অনাবৃত করে দিয়েছে।

লামার্ক উদাহরণ হিসেবে আরো বলেছিলেন, গর্তবাসী যেসব প্রাণীর (যেমন সাপ) সামনের ও পিছনের পায়ের বিলুপ্তি ঘটেছে, তাদেরও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর তাগিদ থেকে দেহের গঠন পরিবর্তিত হয়েছে এবং বিবর্তন এভাবেই ঘটেছে। লামার্কের মতবাদ যাঁরা জনপ্রিয় করেছেন তারা একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ দিয়ে থাকেন। বলা হয়, একসময় আফ্রিকার জিরাফের পূর্বপুরুষের গলা এত লম্বা ছিল না। ঘাস ও ছোট ছোট উদ্ভিদের পাতা খেতে পারার মতো লম্বা। কিন্তু সেখানে পরিবেশের বিরাট পরিবর্তন ঘটার কারণে ছোট ছোট উদ্ভিদ বা গুল্ম কমে যেতে থাকে। তখন ‘প্রয়োজন’ দেখা দেয় গলা উঁচু করে বড় গাছের বড় ডালপালা থেকে পাতা খাবার। জিরাফের এ প্রয়োজন পূরণের জন্য তারা লম্বা গলা পেতে ইচ্ছা করে এবং সে জন্য চেষ্টা করতে থাকে। এর ফলে জিরাফের গলা একটু একটু বৃদ্ধি পায়। এ অর্জিত বৈশিষ্ট্য বংশানুসৃত হয়। এক সময় সে গাছপালাগুলো আরও কমতে থাকে। আরো উঁচু গাছ থেকে খাবার সংগ্রহ করার ‘প্রয়োজন’ দেখা দেয় আর ওই প্রয়োজন মেটাতে আবারও অনুরূপভাবে তারা চেষ্টা করতে থাকে এবং গলা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে ক্রমাগত ‘প্রয়োজন’ মেটাতে প্রচেষ্টার মাধ্যমে জিরাফের পূর্বপুরুষদের গলা প্রজন্মের পর প্রজন্ম লম্বা হয়েছে এবং বর্তমানকালের সুদীর্ঘ লম্বাযুক্ত জিরাফের উৎপত্তি হয়েছে। (দ্রষ্টব্য : ম. আখতারুজ্জামান, বিবর্তনবিদ্যা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃ. ৫৮-৬৪)।

লামার্ক সারা জীবন নিজের বক্তব্যকে ‘অকাট্য প্রমাণভিত্তিক’ দাবি করে গেছেন। অবশ্য তিনি জীবিত থাকতেই তাঁর এই ‘সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে অগ্রগামী’ এবং ‘উদ্দেশ্যবাদী’ বিবর্তনের ধারণাদ্বয় সৃষ্টিবাদী এবং বিবর্তনবাদী উভয়ের কাছ থেকে সমালোচনার মুখে পড়ে। জীববিবর্তনের অন্যতম প্রবক্তা চার্লস ডারউইন তাঁর বন্ধু উদ্ভিদবিদ জোসেফ ডালটন হুকারকে লেখা (১৮৫০ সালে) এক চিঠিতে বলেছেন, ‘লামার্ক তাঁর লেখা দ্বারা মূলত জীববিবর্তন ধারণার ক্ষতিই করেছেন।’ ১৮৬৩ সালে লেখা স্যার চার্লস লায়েলকে লেখা চিঠিতে বলেছেন ‘লামার্কের বইটি দুইবার পাঠ করেও ভালো লাগলো না। এখান থেকে কিছুই শেখা গেল না।

১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইন তাঁর বহুল পরিচিত-পঠিত ‘অরিজিন অব স্পিসিজ’ গ্রন্থে জীববিবর্তন সম্পর্কে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ ধারণা তুলে ধরেন। ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন লামার্কের দেয়া ‘উদ্দেশ্যবাদী’ বা ‘সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে অগ্রগামী’ ধারণার প্রক্রিয়া নয়। ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের সঙ্গে লামার্কের বক্তব্যে বিস্তর ফারাক আছে। যদিও ডারউইন একসময়, ‘অরিজিন অব স্পিসিজ’ গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে বংশগতির সঞ্চারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কিছুটা লামার্কের ধারণা গ্রহণ করে ফেলেন। তিনি সেখানে ‘প্যানজিন’ ধারণা হাজির করেন, পরবর্তীতে যা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ডারউইনের দুই খণ্ডে প্রকাশিত (১৮৬৮ সালে) ‘দ্যা ভ্যারিয়েশন অব অ্যানিমেলস্ এন্ড প্লান্টস আন্ডার ডমেস্টিকেশন’ গ্রন্থে ‘অর্জিত লক্ষণগুলি বংশানুসৃত হয়’–এমন লামার্কীয় ভাবধারা তিনি সমর্থন করে বলেন :

‘জীবদেহের সুনির্দিষ্ট অঙ্গগুলির ব্যবহার-অব্যবহারের বংশানুসৃত প্রভাব আমরা কেমন করে ব্যাখ্যা করতে পারি? বন্য হাঁসের তুলনায় গৃহপালিত হাঁসগুলি কম উড়তে পারে, হাঁটতেও পারে কম। বন্য হাঁসের সাথে গৃহপালিত হাঁসের তুলনা করলে দেখা যায়, এদের ডানার হাড় হ্রাস পেয়ে গেছে এবং এই ধরনের সদৃশ আচার-আচরণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একটা ঘোড়া দ্রুত দৌড়াবার জন্যই প্রশিতি হয়েছে এবং অশ্বশাবকও এই বংশানুসৃত বৈশিষ্ট্য লাভ করে …কেমন করে নির্দিষ্ট বাহুর ব্যবহার-অব্যবহার বা মস্তিষ্কের একটা অংশ দূরে অবস্থান করেও পুনরুৎপাদনশীল কোষের (জননকোষ) কিছু অংশে প্রভাব বিস্তার করে থাকে যার ফলে এই বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হয়? এই প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রে একটা অসম্পূর্ণ উত্তর হয়তো সন্তোষজনক হতে পারে।’

ডারউইনের এই অসম্পূর্ণ উত্তরটি হচ্ছে ‘প্যানজিনেসিস’। তাঁর মতে দেহের প্রতিটি অংশে তৈরি হয় ‘জেমিউল’ নামক কণা থেকে। এতে থাকে সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বৈশিষ্ট্যমূলক তথ্য। যৌনসঙ্গমের সময় জেমিউলগুলো জননতন্ত্রে এসে জমা হয়। এগুলো যৌনজনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবের পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। এ জেমিউলগুলো পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়।

জীববিবর্তনের সংশ্লেষণী তত্ত্বানুসারে ‘জীববিবর্তন’ এত সরলরেখায় ঘটে না। যেমনটা লামার্ক বলে গেছেন। জীববিবর্তন সিঁড়ির মত ধাপে ধাপে অগ্রগামী নয়। ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ ক্রিয়াশীল গোটা প্রজাতির উপর অথবা প্রজাতির কোনো এক জনপুঞ্জের উপর, স্বতন্ত্র জীবের উপর নয়। যেমনটা লামার্ক মনে করেছিলেন। ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনে ‘জিনেটিক ভ্যারিয়েশন’ বড় ফ্যাক্টর। জিনেটিক ভ্যারিয়েয়নের উদ্ভব ঘটে মিউটেশনের মাধ্যমে। ভ্যারিয়েশন উদ্ভবের কারণ সম্পর্কে লামার্ক (এমন কি ডারউইনও) অজ্ঞ ছিলেন।

মিয়ানমারের পাদাউনং আদিবাসী নারীর লম্বা গলার ছবি
মিয়ানমারের পাদাউং আদিবাসী নারীর লম্বা গলার ছবি

মালয়েশিয়ার আদিবাসী নারীর লম্বা কানের ছবি
মালয়েশিয়ার আদিবাসী নারীর লম্বা কানের ছবি

অর্জিত বৈশিষ্ট্য, যেমন ব্যায়াম করলে হাতের মাংশপেশী বৃদ্ধি পায়, ছোটবেলা থেকে শক্ত জুতা পরিয়ে রাখলে পায়ের দৈর্ঘ্য ছোট থাকে, চীনে এক সময় মেয়েদের লোহার জুতা পরিয়ে রাখা হত, ইত্যাদি জীবের বিবর্তন প্রক্রিয়ায় কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। এ বৈশিষ্ট্যগুলো জীবের এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত হয় না। যেমন একজন কুস্তিগীরের সন্তান ব্যায়াম, খাদ্যাভ্যাস ঠিক না রাখলে কুস্তিগীরের মত হবে না। মুসলিম, খ্রিস্টান বা ইহুদি পুরুষরা হাজার-হাজার বছর ধরে নিজেদের লিঙ্গমুখের ত্বক্চ্ছেদ (খৎনা) করে আসছে প্রজন্মে থেকে প্রজন্মে। কিন্তু লামার্কীয় মত অনুযায়ী আজ পর্যন্ত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনকালে অর্জিত এই বৈশিষ্ট্য কখনোই বংশানুসৃত হয় নি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারের ‘পাদাউং’ আদিবাসী নারীরা ছোটবেলা থেকে গলায় অনেকগুলো রিং-এর মতো অলঙ্কার পরতে পরতে গলাকে বেশ খানিকটা লম্বা করে ফেলে। আফ্রিকার অনেক আদিবাসীদের মধ্যেও এমন ধরনের অভ্যাস দেখা যায়। বিরাট আকৃতির কানের দুল পরে কানের লতি অনেকখানি লম্বা করে ফেলে তারা। অনেক প্রজন্ম ধরে তারা এই ধরনের অলঙ্কার পরিধানের চর্চা করে আসছে। এটা তাদের সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু এদের কারোরই অর্জিত বৈশিষ্ট্য কখনো বংশানুসৃত হয় নি। মানে প্রজন্মান্তরে সন্তানদের জন্ম থেকেই খৎনা-করা লিঙ্গ, লম্বা কান কিংবা লম্বা গলার অধিকারী হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, এরকম ‘বৈধ প্রমাণ’ কখনো পাওয়া যায় নি।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত বংশগতির বৈশিষ্ট্যগুলোই জীববিবর্তনে ক্রিয়াশীল। কোনো প্রজাতিতে বা জনপুঞ্জে প্রচুর পরিমাণ জিনেটিক ভ্যারিয়েশন থাকে। যদি কোনো প্রজাতি বা কোনো প্রজাতির জনপুঞ্জে প্রচুর পরিমাণ জিনেটিক ভ্যারিয়েশন না থাকে তবে ওই প্রজাতির বা জনপুঞ্জের বিলুপ্তি আসন্ন বলে মনে করা হয়। পরিবর্তিত পরিবেশের সাপেক্ষে উপযুক্ত ভ্যারিয়েশনগুলোই টিকে থাকে, বেশি পরিমাণ বংশবিস্তার করে। বাকিগুলোর ক্রমে বিলুপ্তি ঘটে পৃথিবী থেকে। এভাবে বিবর্তন এগিয়ে চলে।

ডারউইনের ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ শুধু আমাদের জীবজগতের জন্য প্রযোজ্য। প্রকৃতির বিভিন্ন পরিবর্তনশীল উপাদানের প্রভাবে জীবজগতে যে বাছাইকরণ ঘটে তাকে বলে প্রাকৃতিক নির্বাচন। প্রাকৃতিক নির্বাচনের কোনো উদ্দেশ্যবাদী চেতনা নেই। পূর্বপরিকল্পনা নেই। নেই দূরদৃষ্টি। এটি কোনো জীবকে পরিবেশের সাপেে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে না। জীবের বিদ্যমান বৈশিষ্ট্যসমূহের (traits) উপর প্রাকৃতিক নির্বাচন সক্রিয় কিন্তু জীবের নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য অবশ্যই বিবর্তিত হতে পারে। উদ্ভূত হতে পারে। প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রতিটি স্বতন্ত্র জীবের উপর ক্রিয়াশীল থাকলেও ফলাফল প্রকাশ পায় সম্মিলিতভাবে, গোটা প্রজাতিতে বা জনপুঞ্জে। তাই বলা যায় প্রাকৃতিক নির্বাচন ব্যক্তিগত বা স্বতন্ত্র জীবের কোনো প্রক্রিয়া নয়।

মিউটেশন যদিও র‌্যান্ডম বা বা আকস্মিক ঘটনা কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচন মোটেও র‌্যান্ডম বা আকস্মিক, বিপ্তি কিংবা দৈবক্রমে ঘটা কোনো ঘটনা নয়। এটি চূড়ান্ত প্রক্রিয়া। পরিবেশের জন্য উপযুক্ত ভ্যারিয়শনসম্পন্ন জীব অধিক হারে বংশধর রেখে যেতে পারে, আর অনুপযুক্ত ভ্যারিয়েশনসম্পন্ন জীবের পরিবর্তিত পরিবেশে টিকে থাকা দায় হয়ে যায়, বিলুপ্তি ঘটতে থাকে ধীরে ধীরে। জীবজগতে ‘নির্বাচন’ ক্রিয়াশীল নন-র‌্যান্ডম, দৃঢ় ক্রমবর্ধমান পদ্ধতির অনুসারী।

‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ আমাদের চারপাশে সবসময় ঘটে চলছে। যেমন আমরা একটু খেয়াল করলে দেখতে পাই আম গাছে মুকুল ধরে হাজার-হাজার, সেই মুকুলের অনেকাংশ ঝরে পড়ে যায় ঝড়-বৃষ্টির কারণে। তারপর আবার পোকার আক্রমণের কারণে মুকুলের পরিমাণ আরো কমে যায়, যে সংখ্যক মুকুল থেকে আম ধরে, সেগুলির কিছু অংশ আবার ঝড়-বৃষ্টির কারণে বড় হবার আগেই ঝড়ে যায়, পোকার আক্রমণেও মরে যায় অনেকগুলো। আম গাছে যে পরিমাণ মুকুল ধরে, সে তুলনায় গাছে আম হয় অত্যন্ত নগণ্য পরিমাণ; এবং এই নগণ্য পরিমাণ আমের বীজ থেকে নতুন আমের চারা হয় আরো অনেক কম পরিমাণ। মাছের পেটে যে পরিমাণ ডিম থাকে তার বেশিভাগই ডিম ছাড়ার পর শিকারী মাছের খাবারে পরিণত হয়, পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে অনেক ডিম উর্বর হতে পারে না, এমন কী স্রোতেও প্রচুর ডিম নষ্ট হয়ে যায়। যে পরিমাণ ডিম থেকেও মাছের পোনা হয় তারও একটা বড় অংশ আবার বড় মাছের খাদ্যের শিকার হয়, যে পোনাগুলি শেষমেশ বেঁচে থাকতে পারে শত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে, তাদের মধ্যেও বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের সংস্থান করা, শত্রু মাছের নজর এড়িয়ে টিকে থাকা, সঙ্গী নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়ে ‘জীবন সংগ্রাম’ চলতে থাকে। জীবজগতের নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে বেঁচে থাকার প্রতিযোগিতা। জীবের বংশবৃদ্ধির অত্যধিক প্রবণতার কারণে বিপুল সন্তান জন্ম দিলেও প্রত্যেকটি প্রজাতির জীবসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে না। জীবজগতে খাদ্যের জন্য, বাসস্থানের জন্য, সঙ্গী নির্ধারণের জন্য, বংশরার জন্য, শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য কেউবা অতিরিক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে ভ্যারিয়েশন থেকে, কেউবা পায় না। অতিরিক্ত সুবিধা পেলে ওই প্রাণী কঠোর অস্তিত্বের সংগ্রামে উদ্বর্তিত হয়, নতুন বংশধর অধিক পরিমাণে রেখে যেতে পারে। ডারউইন যাকে বলেছিলেন ‘পরিবর্তনযুক্ত উত্তরাধিকার’ (Descent with Modification)। ডারউইনের মতে দীর্ঘসময় ধরে প্রজন্মান্তরে এভাবে চলতে থাকলে একসময় ‘পরিবর্তনযুক্ত উত্তরাধিকার’ থেকে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয়। নতুন প্রজাতির উৎপত্তিসহ জীবের বেঁচে থাকা, বিলুপ্তি, সংগ্রাম ইত্যাদি সামগ্রিক প্রক্রিয়ার নাম ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’।

লামার্কের দৃষ্টিতে কোনো জীবের বিবর্তন তার নিজস্ব ইচ্ছার তাগিদেই ঘটে থাকে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। লামার্কের মতানুসারে জিরাফের প্রথম পূর্বপুরুষরা ছিল বেঁটে। বেঁটে পূর্বপুরুষ জিরাফ উঁচু গাছের পাতা খাওয়ার জন্য ক্রমাগতভাবে তার গলা লম্বা করার চেষ্টা করেছে। এভাবে চেষ্টা করতে করতে এক সময় গলা লম্বা হয়ে যায় এবং পূর্বের লম্বা গলার জিরাফের প্রজন্ম থেকে বর্তমানের লম্বা গলার জিরাফ আমরা দেখতে পাই। আর ডারউইনীয় বিবর্তন অনুসারে আধুনিক জিরাফের পূর্বপুরুষের প্রজাতিতে বা জনপুঞ্জে যথেষ্ট পরিমাণ ভ্যারিয়েশন ছিল। লম্বা, মাঝারি, বেঁটে প্রভৃতি আকৃতির গলার জিরাফ ছিল। ভ্যারিয়েশনসম্পন্ন প্রজাতিতে লম্বা গলার জিরাফেরা অতিরিক্ত সুবিধা লাভ করে। তারা যেমন নিচু ডালের পাতা খেতে পারে তেমনি উঁচু গাছের পাতাও খেতে পারে। ফলে লম্বা গলার জিরাফই পরিবর্তিত পরিবেশে টিকে থাকে, সফলভাবে বংশবিস্তার করে। লম্বা গলার বংশগতির বৈশিষ্ট্যটি জিরাফের জনপুঞ্জের জিনভাণ্ডারে ছড়িয়ে দেয়। তাই একসময় জিরাফের জনপুঞ্জে প্রচুর ভ্যারিয়েশন থাকলেও লম্বা গলার জিরাফের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আর বাকিদের জিরাফের জনপুঞ্জ থেকে ক্রমবিলুপ্তি ঘটে। (দ্রষ্টব্য : ডারউইন : একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবনা, পৃ. ২৩২)।

August Weismann

ডারউইন ছাড়াও লামার্কীয় ধারণার অসঙ্গতিগুলো চাক্ষুষ তুলে ধরেন জার্মান জীববিজ্ঞানী আগস্ট ভাইসমান (১৮৩৪-১৯১৪) যাঁকে ডারউইনের পর ঊনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ‘জীববিবর্তন-তাত্ত্বিক’ অভিধা দিয়েছেন আর্নেস্ট মায়ার তাঁর ‘The Growth of Biological Thought’ গ্রন্থে। ভাইসমান অনেকগুলো ধারাবাহিক পরীা দ্বারা প্রমাণ দেখান, লামার্ক বর্ণিত ‘জীবদেহে পরিবেশের দ্বারা উৎপন্ন প্রভাব’ বংশানুসৃত হয় না। তিনি ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু ডারউইনের প্রস্তাবিত প্যানজিন ধারণাকে সমর্থন করতেন না। জীববিজ্ঞানে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে, বহুকোষী জীবকেন্দ্রিক জার্মপ্লাজম তত্ত্বে। ভাইসমান বলেন বহুকোষী জীব দুই ধরনের কোষ দিয়ে গঠিত। তিনি ‘জার্মপ্লাজম’-‘সোমাটোপ্লাজম’ নাম দিয়ে জননকোষ, দেহকোষ ধারণার প্রবর্তন করেন। জার্মপ্লাজম ধারণ করে বংশগতির তথ্যাবলী যা বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হয়। সোমাটোপ্লাজম দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠন করে। ভাইসমান দেখান পরিবশের প্রভাবে সোমাটোপ্লাজমে (দেহকোষে) পরিবর্তন হলেও তা জার্মপ্লাজমে (জননকোষে) কোনো পরিবর্তন ঘটায় না। আমাদের জিনোমে গিয়ে এটা প্রভাব বিস্তার করে না এবং সোমাটোপ্লাজমের পরিবর্তন বংশানুসৃত হয় না। কিন্তু জার্মলাইন থেকে তথ্যাবলী একমাত্র সোমাটোপ্লাজমে যায়। (পরবর্তীতে জিনেটিক তথ্যাবলীর এই একমুখী গমনের নাম দেয়া হয় ‘ভাইসমান প্রতিবন্ধকতা’, যা জিনেটিক্সের ‘কেন্দ্রীয় মত’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।) অর্থাৎ বাইরের পরিবেশের প্রত্য প্রভাবে বিবর্তন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় না।

ভাইসমান তাঁর মতটি প্রতিষ্ঠার করার জন্য ছোট জাতের ইঁদুর ছানার লেজ কেটে পরীক্ষা চালান। দেখতে চান জীবদেহে পরিবেশের দ্বারা উৎপন্ন প্রভাব বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হয় কিনা। ভাইসমান বাইশ প্রজন্ম ধরে প্রায় পনেরশত ইঁদুরের লেজ কেটে দিয়ে দেখতে চান কোনো লেজহীন-ইঁদুর জন্ম লাভ করে কি-না। লেজের দৈর্ঘ্য হ্রাস পেয়েছে কি-না তাও মেপে দেখেন। কিন্তু দেখা গেল সদ্যভূমিষ্ট ইঁদুর ছানার লেজহীন হয় নি কিংবা লেজের দৈর্ঘ্যও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে নি। ১৮৯৬ সালে আগস্ট ভাইসম্যান ‘দাস কাইন জার্মপ্লাজম’ গ্রন্থে তাঁর এই গবেষণা এবং তত্ত্বের কথা প্রচার করেন। স্বভাবতই ভাইসমানের এ পরীক্ষার ফলাফল লামার্কবাদের ভিত্তি ধসিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ডারউইনের ‘প্যানজিন’ ধারণার বিপর্যয় ঘটে। ১৯০৮ সালে ভাইসমানকে জীববিজ্ঞানে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ লন্ডনের লিনিয়ান সোসাইটি থেকে ‘ডারউইন-ওয়ালেস পদক’ প্রদান করা হয়। ভাইসমানের পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করেছিলেন আরেকজন জীববিজ্ঞানী, বস। তিনি সদ্য-ভূমিষ্ট ধেড়ে ইঁদুর এবং জার্মান শেফার্ডস জাতের কুকুরের কান কেটে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। ভাইসমানের মতো একই ফলাফল তিনিও পেয়েছিলেন।

বংশগতিবিদ্যার উত্তরোত্তর উন্নতির ফলে আমরা জানতে পারি যে, লামার্কের ধারণাগুলো বিজ্ঞানসম্মত নয় মোটেও। জীবের জীবনকালে অর্জিত বৈশিষ্ট্যাবলি বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হয় না। আধুনিক বংশগতিবিদ্যার আলোকে বলা যায়, জীবকোষের প্রতিলিপি উৎপাদন বা রেপ্লিকেশন হয়ে থাকে কোষের অভ্যন্তরস্থ ডিএনএ’র রেপ্লিকেশনের মাধ্যমে। জীবদেহের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান হচ্ছে প্রোটিন। অণুজীববিজ্ঞানী ও প্রাণরসায়ন বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন প্রোটিনের মাধ্যমে জীবের জৈব-ধর্ম প্রকাশযোগ্য হয়ে উঠে। যখন জীবদেহে কোনো নির্দিষ্ট প্রোটিনের প্রয়োজন হয় তখন ডিএনএ কোষের নিউকিয়াসের ভিতর ট্রান্সক্রিপশন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় মেসেঞ্জার (সংবাদবাহক) আরএনএ। মেসেঞ্জার আরএনএ নিউকিয়াস থেকে বের হয়ে চলে আসে কোষের সাইটোপ্লাজমে। সেখানে মেসেঞ্জার আরএনএ রাইবোজোম, কিছু এনজাইম বা উৎসেচক এবং অ্যামিনো অ্যাসিডবাহী ট্রান্সফার আরএনএ’র সাথে মিলে ট্রান্সলেশন প্রক্রিয়ায় তৈরি করে প্রয়োজনীয় ওই প্রোটিন। অর্থাৎ ডিএনএ থেকে তৈরি হয় মেসেঞ্জার আরএনএ, মেসেঞ্জার আরএনএ আরো কিছু উপাদানের সাথে মিলে তৈরি করে প্রোটিন। গোটা বিষয়টিকে মলিকুলার বায়োলজির কেন্দ্রীয় মত বলে ধরা হয়। জীবদেহে উল্টোটা ঘটতে দেখা যায় না, অর্থাৎ প্রোটিন থেকে উল্টোপথে আরএনএ তৈরি, আরএনএ থেকে ডিএনএ তৈরি হয় না।

একটু ব্যতিক্রম অবশ্য আছে। অণুপ্রাণবিজ্ঞানের (মলিকুলার বায়োলজি) ‘কেন্দ্রীয় মত’ বা ‘ভাইসমান প্রতিবন্ধকতা’কে কিছুটা সংশোধন করতে হয়েছে পরবর্তীকালে। ১৯৬৪ সালে আমেরিকার উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বংশগতিবিদ হাওয়ার্ড মার্টিন টেমিন এবং এমআইটি’র জীববিজ্ঞানী ডেভিড বাল্টিমোর স্বতন্ত্রভাবে আবিষ্কার করলেন কিছু (আরএনএ) ভাইরাসের জিন ডিএনএ’র পরিবর্তে আরএনএ’তে রয়েছে। যেমন এইচআইভি, মলোনি মিউরিন লিউকেমিয়া ভাইরাস, অ্যাভিয়ান মাইলোব্লাসটোসিস ভাইরাস ইত্যাদি। এই আরএনএ এক ধরনের এনজাইমের সাথে মিশে ডিএনএ তৈরি করতে পারে, যা ট্রান্সক্রিপশন প্রক্রিয়ার ঠিক উল্টোভাবে কাজ করে গঠিত হয়। তাই এ প্রক্রিয়ার নাম দেয়া হল ‘রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন’ এবং এনজাইমটির নাম রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ এনজাইম। তবে মনে রাখা দরকার কোনো প্রোটিন থেকে কখনো আরএনএ বা ডিএনএ তৈরি হয় না। প্রোটিনকে কোনো ধরনের কোডে পরিণত করার ব্যবস্থা জীবদেহে নেই। জননকোষের ডিএনএ’র গঠন-বিন্যাসের পরিবর্তন ব্যতীত জীবের জৈব-ধর্মের স্থায়ী বংশানুক্রমিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। অর্থাৎ লামার্কবাদ অনুসারে যা বলা হয়ে থাকে, ‘অর্জিত বৈশিষ্ট্যসমূহ বংশানুক্রমিক’–তা হয় না কখনো।

[93 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন: