প্রথম পর্ব

২য় পর্ব

৩য় পর্ব

৪র্থ পর্ব

৫ম পর্ব

৬ষ্ঠ পর্ব

৭ম পর্ব

৮ম পর্ব

৯ম পর্ব

১০ পর্ব

১১ পর্ব

১২ পর্ব

আবুল কাশেম

নানা কারণে এই ধারাবাহিক রচনাটি কিছুদিনের জন্য স্থগিত ছিল। বাকী অংশ এখন নিয়মিত প্রকাশের আশা রাখছি।

[রচনাটি এম, এ, খানের ইংরেজি বই থেকে অনুবাদিত “জিহাদঃ জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণ, সাম্রাজ্যবাদ ও ক্রীতদাসত্বের উত্তরাধিকার” গ্রন্থের ‘ইসলামি ক্রীতদাসত্ব’ অধ্যায়ের অংশ এবং লেখক ও ব-দ্বীপ প্রকাশনের অনুমতিক্রমে প্রকাশিত হলো।]

ইসলামি ক্রীতদাসত্ব, খণ্ড ১৮

লেখক: এম, এ, খান

ইউরোপীয় দাস-ব্যবসায় ইসলামি সহায়তা

ইউরোপীয় দাস-ব্যবসায়ীরা আটলান্টিক পারাপারের দাস-ব্যবসা পরিচালনা করেছিল, যার মাধ্যমে আফ্রিকা থেকে লক্ষ লক্ষ ক্রীতদাস স্থানান্তরিত করা হয়েছিল নতুন বিশ্বে। পশ্চিমারা নিজেরাসহ সর্বত্র মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকলেই এ ইউরোপীয় দাস-ব্যবসার নিন্দায় পঞ্চমুখ হয়েছে। অথচ ইসলামি দাস-বাণিজ্যের বিষয়টি মূলত স্পর্শহীন, অব্যক্ত এবং কিছুটা বিস্মৃতও রয়ে গেছে।

নতুন বিশ্বে ইউরোপীয় দাস সরবরাহ শুরু হয় ১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র রোম সম্রাট পঞ্চম চার্লস কর্তৃক ইউরোপকে ক্রীতদাস ব্যবসায় জড়িত হওয়ার অনুমোদন দেওয়ার পর। ইউরোপীয়দের মধ্যে কুখ্যাত পর্তুগিজ ও স্পেনীয়রা প্রথম এ লাভজনক দাস-ব্যবসার উদ্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ডাচ ও পরে ফরাসিরাও এ ব্যবসায় নেমে পড়ে। ১৬৩১ সালে ব্রিটেনের রাজা প্রথম চার্লস দাস-ব্যবসার অনুমোদন দেন এবং তার পুত্র দ্বিতীয় চার্লস ১৬৭২ সালে রাজকীয় সনদে সে অনুমোদন পুনপ্রবর্তন করেন।

হিসাব করে দেখা গেছে যে, প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ আফ্রিকান ক্রীতদাস নতুন বিশ্বে স্থানান্তরিত হয়েছিল। এর মধ্যে আনুমানিক ৪০ লাখ (৩৫.৪ শতাংশ) ক্রীতদাস যায় পর্তুগিজ-নিয়ন্ত্রিত ব্রাজিলে, ২৫ লাখ (২২.১ শতাংশ) যায় দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার স্পেন-নিয়ন্ত্রিত উপনিবেশগুলোতে, ২০ লাখ (১৭.৭ শতাংশ) যায় ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজে (অধিকাংশই জ্যামাইকায়), ১৬ লাখ (১৪.১ শতাংশ) যায় ফরাসি ওয়েস্ট ইন্ডিজে, ৫ লাখ (৪.৪ শতাংশ) ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজে, এবং বাকি ৫ লাখ যায় উত্তর আমেরিকায়।[২১২]

বিলুপ্তকরণ: মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াইয়ের প্রত্যয়ে ঘটিত ফরাসি বিপ্লবে ক্রীতদাসদের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ কোনো চিন্তা-ভাবনা না থাকলেও পরবর্তীতে তা ফরাসি সাম্রাজ্যের ক্রীতদাসদের আইনগত মুক্তির পথ উন্মোচিত করে ১৭৯৪ সালে। ১৭৯০ সালের দিকে ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ড তাদের নিজস্ব দাস-বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ইতিমধ্যে ব্রিটেনের সংসদ সদস্য উইলিয়াম উইলবারফোর্স ১৭৮৭ সালে ক্রীতদাস-বাণিজ্য অবদমিত করার জন্য প্রচারণা শুরু করেন। তার এ প্রচারণার জের ধরে পরবর্তীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথা বিলুপ্তির জন্য এক প্রচণ্ড আন্দোলন গড়ে উঠে। এর কুড়ি বছর পর ১৮০৭ সালে ব্রিটিশ ‘হাউস অব কমন্স’ দাস-ব্যবসা বিলুপ্ত করে একটা বিল পাস করে ২৮০-১৬ ভোটের বিরাট ব্যবধানে, যা দাসপ্রথার উপর চূড়ান্ত আঘাত হানে। পরে ১৮০৯ সালে ব্রিটিশ সরকার বিদেশী জাহাজসহ সন্দেহভাজন ক্রীতদাসবহনকারী জাহাজগুলোতে অনুসন্ধান চালানোর জন্য তার নৌবাহিনী মোতায়েন করে। ব্রিটিশ সরকার মুসলিম বিশ্বে দাসপ্রথা বন্ধের জন্য পারস্য, তুরস্ক ও অন্যান্য মুসলিম সরকারের সাথে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালায়।

১৮১০ সালে ব্রিটিশ সরকার দাস-ব্যবসায় লিপ্তকারীদের জন্য ১৪ বছরের কঠোর পরিশ্রমের সাজা নির্ধারণ করে। ১৮১৪ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রিটি অব ইউরোপ’-এ ক্রীতদাস-বাণিজ্য বিলুপ্তির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ব্রিটেন আলাপ-আলোচনার সূচনা করে, যার ফলশ্রুতিতে ১৮১৫ সালের ৯ই জুন সমস্ত ইউরোপীয় শক্তি এরূপ একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ১৮২৫ সালে ব্রিটেন দাস-ব্যবসায় সহযোগিতা করাকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধরূপে নির্ধারণ করে। দাস-ব্যবসা বিরোধী আন্দোলনের উজ্জ্বলতম মুহূর্তটি আসে ১৮৩৩ সালে, যখন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট দাসপ্রথা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রায় ৭০০,০০০ ক্রীতদাসের সবাইকে মুক্ত করে দেয়। ফ্রান্স ব্রিটেনের অনুসরণে ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দে ক্রীতদাসদের মুক্ত করে। একই সময় ডাচ উপনিবেশীরাও সে পথ অনুসরণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ক্রীতদাসদের মুক্ত করে ১৮৬৫ সালে।

ইসলামের সহায়তা: মানবতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত অমানবিক ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির এ অপরাধের জন্য ইউরোপীয় দাস-ব্যবসাকে অবশ্যই নিন্দা করতে হবে। মুসলিমরা অতি গর্বভরে নিজেদের গুণকীর্তনে উন্মুখ হয় এটা বলে যে, তাদের ইতিহাস দাসপ্রথাবিহীন, নিখুঁত। বাস্তবে এমনকি ইউরোপীয় দাস-ব্যবসাতেও মুসলিমরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পালন করেছে গুরুত্বপূর্ণ ও আর্থিকভাবে পুরস্কৃত ভূমিকা। কিন্তু মুসলিমদের মাঝে এ ব্যাপারে রয়েছে এক অদ্ভুত নীরবতা। এমনকি পশ্চিমাসহ অমুসলিম পণ্ডিতরাও আটলান্টিক বরাবর দাস-ব্যবসার ব্যাপারে ইসলামের সহযোগিতামূলক ভূমিকা সম্পর্কে প্রায় নীরব।

আটলান্টিক পারাপারের ক্রীতদাস-বাণিজ্যে ইসলামের পরোক্ষ ভূমিকা এ বাস্তবতার উপর অবস্থিত যে, ইউরোপীয়রা এ কাজে লিপ্ত হওয়ার বহু শতাব্দী পূর্বেই বিশাল মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র মুসলিমরা দাস-ব্যবসার একটা স্থায়ী ও উচ্ছল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি হলো: ইসলামি ক্রীতদাসকরণ ও দাস-বাণিজ্যের দীর্ঘস্থায়ী ও নিষ্ঠুর শিকার ছিল ইউরোপীয়রাও। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনের উপর মুসলিম আক্রমণ দিয়ে তা শুরু হয় (প্রকৃতপক্ষে তারও আগে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপগুলোতে আক্রমণের মাধ্যমে) এবং চলতে থাকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্ব পর্যন্ত। মুসলিম বিশ্বের শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাস, বিশেষত উপপত্নী হিসেবে তাদের চাহিদা মেটানোর জন্য হামলার মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ নারী ও শিশুদেরকে অপহরণে ভাইকিংরাও ছিল মুসলিমদের সঙ্গী। সর্বশেষ অটোমান সুলতানের হেরেমেও ছিল এক ব্রিটিশ বন্দিনী, যাকে মুক্ত করে ব্রিটেনে আনা হয় তুরস্ক থেকে সুলতানকে বিতাড়িত করার পর। বহু শতাব্দী ধরে ইউরোপীয়দেরকে ক্রীতদাসকরণ ও বিক্রির এক দীর্ঘস্থায়ী ও নির্মম শিকারে পরিণত করার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকেও খাটো করে দেখার উপায় নেই। এটা তাদের মনে বদ্ধমূল হয়ে উঠেছিল যে, দাসপ্রথা, যা ছিল মুসলিমদের দ্বারা আরোপিত তাদের জীবনের নিষ্ঠুর নিত্য-সঙ্গী, তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইউরোপীয়রা দীর্ঘ নয় শতাব্দব্যাপী ইসলামি ক্রীতদাসকরণ ও দাস-বাণিজ্যের ভয়াবহ শিকার হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত নিজেরাও সে কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

আটলান্টিক পারাপারের দাস-বাণিজ্যে মুসলিমদের সরাসরি ভূমিকা হলো: এতে সবচেয়ে অমানবিক ও নিষ্ঠুর ভূমিকাটি পালন করেছিল প্রধানত মুসলিম হানাদার ও ব্যবসায়ীরা, যারা আফ্রিকায় ক্রীতদাস সংগ্রহে লিপ্ত হতো। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা প্রধানত মুসলিম দাস-শিকারিদের নিকট থেকে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদেরকে ক্রয় করে নতুন বিশ্বে স্থানান্তর করতো। ইউরোপীয়রা যখন দাস-বাণিজ্যে লিপ্ত হয়, সে সময় মুসলিমরা ছিল আফ্রিকায় ক্রীতদাস শিকারে বহু শতাব্দীর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মাস্টার বা প্রভু। তারাই ছিল ইউরোপীয় দাস-ব্যবসায়ীদের জন্য সদা-প্রস্তুত সরবরাহকারী। ইউরোপীয় বণিকরা অবস্থান করতো আফ্রিকার উপকূলভাগের ক্রয়কেন্দ্রগুলোতে, আর মুসলিম দাস-শিকারি ও ফড়িয়ারা দেশের অভ্যন্তরভাগ থেকে কৃষ্ণাঙ্গদেরকে ধরে উপকূলে অবস্থিত ইউরোপীয় বণিকদের ক্রয়-কেন্দ্রে নিয়ে এসে বিক্রি করতো।

ইউরোপীয় বণিকরা মুসলিম ব্যবসায়ীদের হাত এড়িয়ে বড়জোর ২০ শতাংশ ক্রীতদাসকে কিনে থাকতে পারে। তবে এ ক্রীতদাস-সংগ্রহ কোনোরূপ সহিংস হামলা কিংবা অপহরণের মাধ্যমে করতো না তারা, বরং অমুসলিম মালিকদের মাধ্যমে কিংবা পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনের দ্বারা স্বেচ্ছাকৃত বিক্রির মাধ্যমে (তাদের কিছু সংখ্যক অমুসলিম ক্রীতদাস-শিকারী দ্বারা ধৃত হয়ে থাকতে পারে, যারা মুসলিমদের দেখাদেখি এ পেশায় যোগ দিয়েছিল)। সাহারা মরুভূমির ঠিক দক্ষিণে পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল ও অ্যাঙ্গোলা অঞ্চল ছিল অনাবৃষ্টির জন্য কুখ্যাত। মাঝে মাঝেই দুই থেকে তিন বছর লাগাতার বৃষ্টিহীন থাকতো এ অঞ্চলটি। যখন এরূপ ভয়ঙ্কর অনাবৃষ্টির কারণে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি দেখা দিতো, তখন অভুক্ত মৃত্যুর মুখে পতিত জনগণ বেঁচে থাকার তাগিদে সে অঞ্চল থেকে পালিয়ে যেতো এবং ‘নিজেদেরকে বা পরিবারের সদস্যদের বিক্রি করে দিতো বণিকদের কাছে’, জানান কার্টিন। ১৭৪৬ থেকে ১৭৫৪ সাল পর্যন্ত সেনেগাল ধারাবাহিকভাবে অনাবৃষ্টি ও শস্য উৎপাদনহীনতার ভয়ঙ্কর দুর্ভোগের শিকার হয়; ফলে দেশটিতে ক্রীতদাস ব্যবসায়ের মাত্রাও অতিরিক্ত বেড়ে যায়। কার্টিন লিখেছেন: ‘ফরাসিরা ১৭৫৪ সালে সেনেগাল থেকে এযাবতকালের সর্বাধিক সংখ্যক ক্রীতদাস রপ্তানি করেছিল।’[২১৩]

ইউরোপীয় দাস-ব্যবসায়ীরা আফ্রিকায় মুসলিম ক্রীতদাস-শিকারি ও ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ ক্রীতদাস সংগ্রহ করে। মুসলিম যোদ্ধারা ইসলামি বিশ্বে ক্রীতদাসের চাহিদা মেটাতে আফ্রিকাকে একটা ক্রীতদাস শিকার ও প্রজনন ক্ষেত্রে রূপান্তরিত করেছিল, যা পরে ইউরোপীয় বণিকদের জন্য একটা সাপ্লাই-হাউস বা সরবরাহক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। সাঈদ সাইয়িদ নামক ওমানের এক যুবরাজ ছিলেন মাস্কাটস্থ দাস-শিকারের নেতা, যার দাস-ব্যবসায় লালবাতি জ্বালায় ব্রিটিশরা। এরপর তিনি মাস্কাট বন্দরের জলদস্যুদেরকে সাথে নিয়ে পূর্ব-আফ্রিকায় যাত্রা করেন এবং ১৮০৬ সালে জাঞ্জিবার দ্বীপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ক্রীতদাস ধরার জন্য পূর্ব-উপকূলের এ ঘাঁটি থেকে তিনি আরব হানাদারদেরকে নিয়ে স্থলভাগের গভীরে প্রবেশ করে সূদূর উগাণ্ডা ও কংগো পর্যন্ত পৌঁছে যান।[২১৪] এরূপে তিনি তার খ্যাতনামা ‘ক্রীতদাস সাম্রাজ্য’ প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব-আফ্রিকায়। কার্টিন লিখেছেন, আফ্রিকায় ক্রীতদাস-শিকারি দলগুলোর সদস্যসংখ্যা থাকতো চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ জন। তারা দলে দলে ভাগ হয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে প্রবেশ করে ‘গরু চুরি ও মানুষ অপহরণ করতো, চেষ্টা করতো একজন বা ছোট দলকে ধরার, যেমন গ্রামের কূপে পানি আনতে যাওয়ার পথে নারী বা অন্যান্যদেরকে, যারা নিজেদেরকে ঐ মুহূর্তে রক্ষা করতে অপারগ ছিল।’ এসব গুণ্ডাদল যদিও প্রয়োজন হলে লড়াই করতে পারতো, তবে তারা লড়াই এড়াতে চুপিচুপি ক্রীতদাসকে ধরে দ্রুত উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে দূরের বাজারে বিক্রির করে দিতো।[২১৫] নতুন বিশ্বে ক্রীতদাসের নতুন বাজার খুলে গেলে আফ্রিকার সেসব মুসলিম ক্রীতদাস-শিকারি ও দাস-ব্যবসায়ীদের জন্য সেটা খুব লাভজনক আশীর্বাদ হয়ে উঠে।

[আগামী পর্বে আলোচিত হবেঃ ইসলামি দাসপ্রথার অস্বীকৃতি]

সূত্রঃ
212. Hammond P (2004) The Scourge of Slavery, in Christian Action Magazine, Vol. 4

213. Curtin, p. 172-73

214. Gavin, R J (1972) In MA Klein & GW Johnson eds., p. 178

215. Curtin. p. 177-79
————–

ইসলামি ক্রীতদাসত্ব, খণ্ড ১৯

লেখক: এম, এ, খান

ইসলামি দাসপ্রথার অস্বীকৃতি

অধিকাংশ মুসলিমের কাছে কেবলমাত্র আটলান্টিক বরাবর ক্রীতদাস পারাপারই ছিল বিশ্বে একমাত্র দাস-ব্যবসা, যার নিন্দায় তারা খুবই সোচ্চার। মুসলিম বিশ্বে ইসলামের শুরু থেকে বিংশ শতাব্দ পর্যন্ত (বস্তুত অদ্যাবধি) যে ব্যাপক ও বর্বর দাসপ্রথার চর্চা চলে, তাদের ধারণায় তা কখনোই ঘটেনি। তাদের মাঝে এমন উপলব্ধির মূল কারণ নিঃসন্দেহে ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা। কিছু মুসলিম, যারা এ ব্যাপারে অবহিত, তাদের সামনে যখন অনস্বীকার্য তথ্য-প্রমাণ হাজির করা হয়, তারাও চিরাচরিত অস্বীকৃতির পথটি গ্রহণ করে নানা অজুহাতে। তারা মুসলিম বিশ্বের ব্যাপক বিস্তৃত দাসপ্রথা সম্পর্কে অনস্বীকার্য সত্যের মোকাবেলা করতে সাধারণত দু’টো যুক্তি খাড়া করে। প্রথম: ইসলামে দাসপ্রথা আদৌ অনুমোদিত নয়; মুসলিম বিশ্বে ঘটিত তার চর্চা ইসলামের অপব্যবহার ও অমর্যাদার ফল মাত্র। দ্বিতীয় অজুহাতটি আসে অধিক জ্ঞাত মুসলিমদের কাছ থেকে, যারা ইসলামে দাসপ্রথার অনুমোদন ও মুসলিম বিশ্বে তার ব্যাপক চর্চাকে অস্বীকার করতে ব্যর্থ হয়ে মেনে নেয় যে, ইসলামে দাসপ্রথা স্বীকৃত, তবে একটা সীমিত মাত্রায়, কেননা সে সময়ে (অর্থাৎ ইসলামের উদ্ভবকালে) দাসপ্রথা ব্যাপক প্রচলিত ছিল। অতঃপর তারা কোরানের কিছু আয়াত ও হাদিসের বয়ান হাজির করে দাবি করে: ‘ইসলামই দাসপ্রথা উচ্ছেদের প্রথম নজির স্থাপন করে।’

ইসলামে দাসপ্রথা চর্চার অস্বীকৃতিতে উপরোক্ত প্রথম যুক্তিটি অনিবার্যরূপেই আসে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের কাছ থেকে যারা ইসলামে দাসপ্রথার অনুমোদন এবং তাতে নবি মুহাম্মদের লিপ্ত হওয়া, তাঁর দাস-ব্যবসা চর্চা ও উপপত্নী রাখা বিষয়ক ধর্মীয় বিধান ও ইতিহাস সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। দ্বিতীয় যুক্তি প্রদানকারী দলটি অত্যন্ত সুচিন্তিতরূপে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কোরান ও সুন্নতের কিছু যুক্তি তুলে ধরে, যা এক্ষেত্রে আলোচনা করা প্রয়োজন। তারা সাধারণত কোরান থেকে যেসব উদ্ধৃতিগুলো দেয়, তা হলো:

• কোরানের ৪:৩৬ নং আয়াত এতিম, মাতাপিতা, পথচারী ও ক্রীতদাসদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের তাগিদ দিয়েছে মুসলিমদেরকে।

• ৯:৬০ নং আয়াতটি বাধ্যতামূলক দানের, অর্থাৎ যাকাতের, অংশ-বিশেষ হিসেবে দাসমুক্তির নির্দেশ দেয়।

• ২৪:৩৩ নং আয়াতটি মালিকদেরকে উপদেশ দেয় ভাল আচরণকারী ক্রীতদাসের মুক্তির জন্য লিখিত শর্ত নির্ধারণ করে দিতে।

• ৫:৯২ ও ১৮:৩ নং আয়াতে পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ ক্রীতদাস মুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।

• ৫:৯২ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে যে, অনিচ্ছাকৃত মানুষ হত্যার প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ মুসলিমদের উচিত বিশ্বাসী ক্রীতদাসকে মুক্তি দেওয়া।

এসব উদ্ধৃতির উপর ভিত্তি করে ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আহমদ আলওয়াদ সিকাইঞ্জা দাসপ্রথা সম্পর্কে কোরানের অনুমোদনের ব্যাখ্যারূপে বলেন: এটা ‘নৈতিক প্রকৃতির একটা প্রশস্ত ও সাধারণ প্রস্তাবনা মাত্র, কোনো সুনির্দিষ্ট আইনগত বিধান নয়।’[২১৬] একই ভঙ্গিতে বিখ্যাত পাকিস্তানি পণ্ডিত ও কবি মোহাম্মদ ইকবাল (মৃত্যু ১৯৩৮) ইসলামে দাসপ্রথাকে প্রকৃত দাসত্ববিহীন একটি শুভ প্রথারূপে আখ্যা দেন।[২১৭] তিনি লিখেছেন:

‘(নবি মুহাম্মদ) সমতার নীতি ঘোষণা করেন, এবং যদিও প্রত্যেক সংস্কারকের মতোই তিনি পারিপার্শ্বিক সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দাসপ্রথাকে নামে-মাত্র মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু চুপিসারে তিনি দাসপ্রথাকে সম্পূর্ণরূপে বিদুরিত করেন। প্রকৃত সত্য হলো, ইসলামে দাসপ্রথা একটি নাম মাত্র।’

আরো জোরালো কৈফিয়তদাতারা এরূপ উচ্চতর দাবি উপস্থাপন করেন যে, ইসলাম সুস্পষ্টরূপে ও সুনির্দিষ্টভাবে মুক্ত বা স্বাধীন মানুষ ধরা, তাদেরকে ক্রীতদাস করা বা বিক্রি করা নিষিদ্ধ করেছে। নবি মুহাম্মদের নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি দিয়ে তারা তাদের অবস্থান পোক্ত করতে চান: ‘বিচারের দিন তিন ধরনের মানুষের বিরুদ্ধে আমি নিজে ফরিয়াদি হবো। তাদের মধ্যে থাকবে সে ব্যক্তি, যে মুক্ত মানুষকে ক্রীতদাস বানাবে, অতঃপর তাকে বিক্রি করবে ও সে অর্থ খাবে।’[২১৮] সৈয়দ আমির আলী (মৃত্যু ১৯২৮) ছিলেন এক ইসলামি পণ্ডিত, যার লেখা পাশ্চাত্যে বিশেষভাবে অধ্যয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন: ‘মহান নবির উপর আরোপিত (ক্রীতদাসত্ব চর্চার) কলঙ্ক মিথ্যা প্রমাণ করতে’ মুসলিমদের উচিত বিশ্ব থেকে দাসপ্রথার অন্ধকার অধ্যায় মুছে ফেলা, ‘সুস্পষ্ট ভাষায় এ ঘোষণা দিয়ে যে, দাসপ্রথা তাদের ধর্মে নিন্দিত ও তাদের আইনে প্রত্যাখ্যাত’।[২১৯] এসব মুসলিম কৈফিয়ৎদাতাদের সাথে সুর মিলিয়ে বার্নার্ড লুইস যুক্তি দেখান: ‘প্রাথমিক যুগ থেকেই ইসলামি আইন ও চর্চায় স্বাধীন বা মুক্ত মানুষকে ক্রীতদাসকরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। যুদ্ধে বিজিত বা বন্দিদের মাঝেই শুধু এর কার্যকারিতা সীমাবদ্ধ ছিল।’[২২০]

ইসলাম আদিম দাসপ্রথা নির্দিষ্টরূপে নিষিদ্ধ করেছে বলে যেসব পণ্ডিত দাবি করেন, তাদের উচিত কোরানের ১৬:৭১, ১৬:৭৬ ও ৩০:২৮ নং আয়াতে সন্নিবেশিত আল্লাহর বাণীগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া, যাতে আল্লাহ মানবজাতিকে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্টভাবে প্রভু ও ক্রীতদাস শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন তাঁর আশীর্বাদ হিসেবে ও তাঁর স্বর্গীয় পরিকল্পনার অংশরূপে। ইকবাল ও আমির আলীর মতো কপট যুক্তিদানকারীদের এ বাস্তবতার দিকে নজর দেওয়া উচিত যে, ইসলামি নবিত্বের মিশন গ্রহণ করার পূর্বে মুহাম্মদের কোনো ক্রীতদাস ছিল না; অথচ ইসলামের নবি হিসেবে মৃত্যুর সময় তিনি বহু ক্রীতদাস ও কয়েকজন উপপত্নীর মালিক ছিলেন, যাদের অধিকাংশই তিনি কব্জা করেছিলেন নিরীহ জনগোষ্ঠির উপর নিষ্ঠুর ও নির্মম হামলার মাধ্যমে। সিকাইঞ্জার এটা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, ইসলামি চিন্তাধারায় কোরান হলো সকল বিষয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টার চূড়ান্ত বক্তব্য; সুতরাং কোরান যেটা অনুমোদন করে, সেটা ইসলামি সমাজে চিরন্তন আইন। কোরান সম্পর্কে ইসলামের এ মৌলিক অবস্থান সিকাইঞ্জার এ দাবির বিরোধিতা করে যে, দাসপ্রথা ইসলামে কোনো ‘সুনির্দিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন নয়’। বাস্তবে ইসলামে দাসপ্রথা একটি মৌলিক প্রতিষ্ঠান, যা আল্লাহ পুনঃপুনঃ ব্যক্ত করেছেন ও নবি মুহাম্মদ তা ব্যাপকভাবে চর্চা করে গেছেন, এবং যা পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত অপরিবর্তনীয় থাকবে। তবুও মৌলিকভাবে সমান অধিকারের দাবিদার মানুষকে আল্লাহ-কর্তৃক ‘প্রভু ও দাস’ শ্রেণীতে বিভক্ত করাকে সিকাইঞ্জার যুক্তিতে ‘নৈতিক প্রকৃতির’ প্রস্তাবনা আখ্যা দেওয়া বিবেকহীন ও ক্ষমার অযোগ্য। অধিকন্তু নারীদেরকে যৌনদাসীতে পরিণত করার জন্য সহিংসতার মাধ্যমে তাদেরকে ক্রীতদাসকরণের কোরানের পুনঃপুনঃ অনুমোদন আরো গর্হিত।

উপমহাদেশের আরেক পণ্ডিত গোলাম আহমদ পারভেজও (মৃত্যু ১৯৮৩) ইসলামে ক্রীতদাস চর্চার বিষয়ে নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। কোরানের আয়াতে (৪:৩, ৩০:২৮, ১৬:৭১, ৭০:২৯, ২৩:৬) ক্রীতদাসদের লক্ষ্য করে লিখিত ‘যারা তোমার দক্ষিণ হস্তের মালিকানাধীন’ বাক্যটিকে, তিনি বলেন অতীতকাল হিসেবে পড়া উচিত এভাবে: ‘যারা তোমার মালিকানাধীন ছিল’। এভাবে তিনি দেখাতে চান যে, দাসপ্রথার চর্চা আগে বিদ্যমান ছিল এবং ‘কোরান ভবিষ্যতে তা চর্চার পথ বন্ধ করে দিয়েছে’।[২২১]

নবি মুহাম্মদ মক্কা থেকে মদীনায় স্থানান্তরিত হন ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে, যখন তাঁর ধর্মে দীক্ষিত শিষ্যের সংখ্যা ছিল মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ জন − মক্কা ও মদীনার ধর্মান্তরিতদেরকে যোগ করে। এ স্বল্পসংখ্যক অনুসারীর ক্ষুদ্র দলটি নিয়ে তিনি একটি হানাদার রাহাজান দল গঠন করেন, প্রথমত মক্কার বাণিজ্যবহরে হামলা করে সবকিছু লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে। ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তিনি নাগালের মধ্যে আসা পৌত্তলিক, ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপর হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দেন লুটপাট ও ক্রীতদাস আটকের লক্ষ্যে। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে নবির মৃত্যুর পর মুসলিমদের ক্ষমতা উত্তরোত্তর দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিধর্মীদের উপর এ শর্তহীন যুদ্ধ আরো জোরেশোরে চলতে থাকে। তারা ব্যাপক মাত্রায় যুদ্ধাভিযান শুরু করে এবং পরিশেষে বিশ্বের বৃহত্তম শক্তি পারস্য, বাইজেন্টিয়াম ও ভারতকে পদানত করে। তারা তলোয়ারের ডগায় লাখ লাখ মানুষ নিধন করা ছাড়াও এক-একটি যুদ্ধাভিযানে হাজার হাজার, এমনকি লাখ লাখ, বিধর্মীকে ক্রীতদাস বানায়।

ইসলামের আবির্ভাবকালে নবি মুহাম্মদের অধীনে মাত্র কয়েক শ’ যুদ্ধবাজ আরব বেদুইন নিয়ে গঠিত হানাদার জিহাদি দলটি অবশিষ্ট মানবজাতিকে বশীভূত ও ক্রীতদাসকরণের অভিপ্রায়ে নিঃশর্ত ও নিরন্তর যুদ্ধ ঘোষণা করে। বার্নার্ড লুইসের মতো যারা ভাবে যে, ‘ইসলাম স্বাধীন মানুষকে ক্রীতদাসকরণ সুস্পষ্টরূপে নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ’ করেছে, তাদের এটা উপলব্ধি করা উচিত যে, ইসলাম তার জন্মলগ্নে মাত্র কয়েকশ’ বেদুইন আরব লুণ্ঠনকারীর হাতে বিশ্বের সমস্ত নারী-পুরুষকে শর্তহীনভাবে বশীভূতকরণ ও ক্রীতদাসকরণের ঘোষণা দিয়েছিল। সুতরাং ক্রীতদাসকরণ সম্পর্কিত ইসলামি আইন ‘দাসপ্রথাকে সীমাবদ্ধকরণ’ প্রকৃতির নয়, বরং দাসপ্রথাকে যথাসম্ভব উচ্চস্তরে উন্নীত ও প্রসারিত করার স্বর্গীয় বিধান, যা মানব ইতিহাসে নজিরবিহীন। এবং ইসলামের ধর্মযোদ্ধারা এ স্বর্গীয় আদেশ অত্যুচ্চ আত্মবিশ্বাস ও একাগ্রতার সাথে কার্যকর করেছে, যার সাক্ষী ইসলামের ইতিহাস নিজে। যে কোনো পরিমাপেই ইসলামে দাসপ্রথার অনুমোদন ছিল মুক্ত মানুষের আত্মমর্যাদা ও নৈতিকতার উপর চরম আঘাত।

[আগামী পর্বে আলোচিত হবেঃ ইসলামে ক্রীতদাসদের প্রতি মানবিক আচরণ]

216. Islam and slavery, Wikipedia, http://en.wikipedia.org/ wiki/Islam _and_Slavery.

217. Iqbal M (2002) Islam as a Moral and Political Ideal, in Modernist Islam, 1840-1940: A sourcebook, C Kurzman ed., Oxford University Press, London, p. 307-8

218. Muhammad S (2004) Social Justice in Islam, Anmol Publications Pvt Ltd, New Delhi, p. 40

219. Ali SA (1891) The Life and Teachings of Muhammed, WH Allen, London, p. 380

220. Lal (1994), p. 206

221. Parwez GA (1989) Islam, a Challenge to Religion, Islamic Book Service, New Delhi, p. 345-46
————–

চলবে—

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

[460 বার পঠিত]