থাকা না থাকার কাব্যকথা

আমাদের অজ্ঞাতে, অবহেলায় পৃথিবীর বুক থেকে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। আর এভাবে নিজেদের ভুলে ও দোষে আমরা মানুষরাই দিনদিন পরিবেশ-প্রতিবেশকে করে তুলছি এমন আতঙ্কজনক। একদিন হয়তো ডোডরা পাখি কিংবা ডাইনোসরের মতো মানুষদের অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যাবে না পৃথিবীর বুকে।
কার্ল সাগানের The Backbone of night পড়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। কাউকে কাউকে অনেক কাছের লাগে। কিছু বলতে ইচ্ছে হয়। মনে হয় শৈশবের হেটে যাওয়া পথ আর পৃথিবীর ইতিহাসের কথা।
এটা একটা চিঠি সেরকম কাউকে লেখা। ব্যাক্তিগত পরিভ্রমণও বলা যায়
– আসিফ

নিসা,
এ এক অদ্ভুত বিকেল। কী উজ্জ্বল! কী স্বপ্নময় বাতাস যা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে ছেলেবেলার ছাদে বসে কাটানোর দিনগুলোতে। এ যেন হাকফিন, টমসয়্যার আর তিতিরমুখী চৈতার পৃথিবী। প্রতিটি দুপুর তখন একেকটা স্বপ্ন হয়ে উঠত। সামনে বড়ো মাঠ, ইংরেজদের তৈরি বাংলো আর কৃষ্ণচূড়া গাছ; তারও কিছুটা পরে খাড়ির মতো, শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে যুক্ত। পাটের বিশাল বিশাল নৌকা এসে ভিড়ত। অনেক সুন্দর সুন্দর স্পিডবোটও বাঁধা থাকতে দেখেছি ওসব জায়গায়। এ সবই বেলিং কোম্পানির।

আমি এই বিকেলে বসে পড়ছিলাম ‘দ্য ব্যাক বোন অব নাইট’। রাত্রির মেরুদ্বন্ড। জানো নিসা, আয়োনীয় বিজ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অদ্ভুত কথা লেখা আছে। আয়োনিয়া ছিল এক দ্বীপময় জগৎ। এটা অনেকগুলো ভিন্ন ধরনের দ্বীপ নিয়ে গড়ে উঠেছিল_ যেখানে বিরাজ করত ভিন্নধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এমন কোনো একক শক্তি কেন্দ্রীভূত ছিল না_ যা বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাভাবিকতায় বাধা দিতে পারে। বিশাল সমুদ্রবন্দর হওয়াতে আয়োনিয়া পরিণত হয়েছিল আন্তঃসভ্যতার মিলনমেলায়, ক্রস রোড অব সিভিলাইজেশনে_ মিসর, ব্যাবিলন, ফিনিশিয়া, মেসোপটেমিয়া, গ্রিক দ্বীপগুলো, ইউরোপীয় সভ্যতা। এসব একাধিক সংস্কৃতির মিথষ্ক্রিয়ায় বেরিয়ে এসেছিল মহাকালের প্রতিভারা। তারা ছিল কৃষক, নাবিক আর তাঁতিদের সন্তান। তারা বেরিয়ে পড়েছিল পৃথিবীর পথে। সব জাগতিক নিয়মে বেঁধে ফেলবে বলে জন্ম হয়েছিল বিজ্ঞানের; ইজিয়ান সাগরের পূর্বাঞ্চল আয়োনিয়াতে। ২৬শ’ বছর আগের কথা।

এই আয়োনীয়রা কুসংস্কারকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। প্রয়োজনে অর্থ উপার্জন করে তা জীবনের কাজে ব্যবহার করেছিল। তারা জানতে চেয়েছিল মানুষের চিন্তা ও ক্ষমতার বিস্তৃতি কতটুকু? তারা সম্ভবত বুঝতে পেরেছিল আকাশ ও নক্ষত্রের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারলে মানবিকতার পথে আরও খানিকটা পথ এগিয়ে যাওয়া যাবে। সেই স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করা। ওরা বলেছিল, সবকিছুই পরমাণু দিয়ে তৈরি; মানব প্রজাতি বা অন্য কোনো প্রাণীর উদ্ভব ঘটেছে খুবই সরল অবস্থা থেকে; এ কোনো শয়তান বা দেবতাদের কারসাজি নয়। পৃথিবী শুধুই একটি গ্রহ_ যা সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে আর নক্ষত্ররা ঘোরে অনেক দূরে। আলোর গতি অসীম নয়, তারও সীমানা আছে। মন আলাদা কিছু নয়। এটি শরীরবৃত্তীয় নিয়মের ফল। তবুও তারা ধ্বংস হয়েছিল ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি আর দাস অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে।
জানো নিসা, ডেমোক্রিটাস ক্যালকুলাসের দরজায় পেঁৗছে গিয়েছিলেন। যা হয়তো শেষ হতো আর্কিমিডিসের হাতে। নিউটনেরও দুই হাজার বছর আগের কথা_ কী অসাধারণ!
একদিন সমুদ্রের কালো আলোড়নে
উপনিষদের সাদা পাতাগুলো ক্রমে ডুবে যাবে
ল্যাম্পের আলো হাতে সেদিন দাঁড়াবে
অনেক মেধাবী মুখ স্বপ্নের বন্দরের তীরে
যদিও পৃথিবী আজ সৌন্দর্য্যেরে ফেলিতেছে ছিঁড়ে।
_জীবনানন্দ দাশ

বারান্দাটা অন্ধকার হয়ে গেছে। পড়তে পারছি না। পুরো দুপুর কাটাতাম দোতালা বাড়ির ছাদে। একাকী দুপুরের বাতাসে অঙ্ক করতাম, আর ভাবতাম কতটা হলে এই পৃথিবীর সব রহস্য উজ্জ্বল আলোর মতো প্রকাশ হয়ে পড়বে। এ এক অঙ্ক করার পৃথিবী। আয়োনীয় বিজ্ঞানী থেলিস ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন; গিয়েছিলেন মিসর, ব্যাবিলন। অতীশ দীপংকর আলো-আঁধারি ভরা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছিলেন; জ্ঞানের প্রদীপ হাতে নিয়ে ছুটে চলেছিলেন তিব্বতে দিকে। প্রায়ই মনে হয়, ওদের সঙ্গে হাঁটছি আমি। এ এক ধরনের ঘোর। জানো নিসা, যখন ছাদের থেকে বাইরের দিকে তাকাতাম, কখনও কখনও দেখতাম দু’একজন সাদা পোশাক পরা মেয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। চিন্তা করতাম, ওরাও কি আমার মতো ভাবছে? মাঝে মধ্যে মনে হয়, তুমি সেই হেঁটে যাওয়াদের কেউ।

ডোড পাখি, মোয়া পাখিরা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। তাদের সম্পর্কে অদ্ভুত সব কথা লেখা আছে। লুইস ক্যারোলের ‘অ্যালিস ইন দ্য ওয়ান্ডারল্যান্ড’ বইয়ে ছবিও আছে। কি বিশাল ছিল তারা। শান্ত প্রকৃতির উড়তে অক্ষম ডোডরা মানুষের হৃদয়ে আঁচ কেটেছিল। ডোডদের ঠোঁট আর পাথর খাওয়াকে পুঁজি করে ব্যবসা শুরু করে সভ্য মানুষরা। এই বর্বরতার ৩৩০ বছর আগে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তারা। ডোড নামে একটি গাছও আছে। গাছটিও পাখিদের সঙ্গে হারিয়ে যেতে থাকে। আচ্ছা নিসা, ডোডরা কি জানতো এভাবে ওদের পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে হবে?
আমরা আমাদের জলবায়ুকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছি প্রতিবিপরীতভাবে। একদিকে ভূ-ত্বক থেকে কার্বন ডাই-আক্সাইড মুক্ত করে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া জাগিয়ে তুলছি। অন্যদিকে বনজঙ্গল কেটে আমাদের গ্রহপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমিয়ে অ্যালবিডো প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে তুলছি। গ্রিনহাউস, অ্যালবিডো প্রতিক্রিয়ার পরিমাণ যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে মনে হয় আমাদেরও একদিন হারিয়ে যেতে হবে নিজেদের অজান্তে_ অজ্ঞতা, লোভ আর দূষণের কাছে। বিজ্ঞানবোধই পারত এই পরিণতি থেকে বাঁচাতে। সেই আয়োনীয় আবেগের রেশ ধরে মেঘনার কংক্রিটের সৈকতে যে মহাজাগতিক সভ্যতার স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তা হয়তো কখনোই পূর্ণ হবে না!

এখন বৃষ্টি হচ্ছে। হারিকেনের আলোয় কাজ করছি। রাত ১টা। ইত্থিয়ান্ডরের শাঁখ শেষবারের মতো বেজে উঠেছে_ পানামা খাল পেরিয়ে একদিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপে পেঁৗছে যাবে বলে। বালতাজার একাকী বিলাপ করে চলেছে লাপলাতার উপকূলে। আমি প্রায় রেললাইনের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে ভাবি, কখনও কারও কাছে কিছু চাইতে নেই। তবুও পদ্মা-মেঘনার সঙ্গমস্থলের বিস্তৃতি আমাকে বলে_ এই পৃথিবীটা হচ্ছে মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি।
কেমন আছ নিসা?

রচনাকাল ১৯৯৮, রাত

About the Author:

আসিফ, বিজ্ঞানবক্তা। ডিসকাশন প্রজেক্ট এর উদ্যোক্তা। কসমিক ক্যালেণ্ডার, সময়ের প্রহেলিকা, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, প্রাণের উতপত্তি ও বিবর্তন, আন্তঃনাক্ষত্রিক সভ্যতা, জ্যামিতি প্রভৃতি বিষয়ে দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত বক্তৃতা দে্ওয়া। বইয়ের সংখ্যা সাতটি।

মন্তব্যসমূহ

  1. প্রদীপ দেব মার্চ 26, 2012 at 4:01 অপরাহ্ন - Reply

    বিজ্ঞান ভাবনাও যে কবিতার মত হয়ে ওঠে তা বোঝা যায় এই লেখা পড়লে।

    অফট্র্যাক মন্তব্যঃ আসিফ, মহাবৃত্তের দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যা (এপ্রিল-জুন ২০১০) এর পর আর কোন সংখ্যা কি প্রকাশিত হয়েছে? যতদূর মনে পড়ে আমরা সে সময় মুক্তমনার মাধ্যমে অনেকেই মহাবৃত্তের গ্রাহক হয়েছিলাম।

  2. স্বপন মাঝি মার্চ 24, 2012 at 9:58 পূর্বাহ্ন - Reply
  3. স্বপন মাঝি মার্চ 24, 2012 at 9:27 পূর্বাহ্ন - Reply

    আমাদের অজ্ঞাতে, অবহেলায় পৃথিবীর বুক থেকে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। আর এভাবে নিজেদের ভুলে ও দোষে আমরা মানুষরাই দিনদিন পরিবেশ-প্রতিবেশকে করে তুলছি এমন আতঙ্কজনক। একদিন হয়তো ডোডরা পাখি কিংবা ডাইনোসরের মতো মানুষদের অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যাবে না পৃথিবীর বুকে।

    ঠিক তাই! আমরা এমন সব উত্তেজক বিষয় নিয়ে মেতে আছি, শর-শয্যায় শায়িত পৃথিবীর উপর চোখ রাখবার, চোখ আমাদের নেই।

    মন আলাদা কিছু নয়। এটি শরীরবৃত্তীয় নিয়মের ফল। তবুও তারা ধ্বংস হয়েছিল ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি আর দাস অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে।

    তো অর্থনীতির উন্নত (?) স্তরে পৌঁছে, আমরা কোন এক জন-গোষ্ঠি নয়, গোটা মানব সমাজও নয়, গোটা পৃথিবীকেই তুলে দিচ্ছি যমের হাতে ।

    শান্ত প্রকৃতির উড়তে অক্ষম ডোডরা মানুষের হৃদয়ে আঁচ কেটেছিল। ডোডদের ঠোঁট আর পাথর খাওয়াকে পুঁজি করে ব্যবসা শুরু করে সভ্য মানুষরা। এই বর্বরতার ৩৩০ বছর আগে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তারা।

    অতীতে ছিল, এখন নেই; এই যুক্তিতে অনেকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন, মানুষ বেঁচে না থাকলেও রোবট তো থাকবে, তারাই বাঁচাবে – বাজার কিন্তু ক্রেতা?

    বিজ্ঞানবোধই পারত এই পরিণতি থেকে বাঁচাতে।


    ?????????????????????????????????????????????????? বিদায় ঘন্টা বাজবার আগে, আপনারা কি শুনতে পাচ্ছেন??????????????????????????????????????

  4. কাজী রহমান মার্চ 24, 2012 at 7:25 পূর্বাহ্ন - Reply

    বিজ্ঞান নিয়ে লেখাও যে অদ্ভূত কাব্যিক জ্যোৎস্নালোকিত রোমান্টিক সুন্দর হতে পারে আসিফ তা আবার প্রমান করে দেখালো (D)

মন্তব্য করুন