ভাষা দিবসে প্রমিত ভাষা, উপভাষা, পরিভাষা ইত্যাদি নিয়ে কিছু কথা

এই লেখাটা আমার ব্যক্তিগত কিছু মত, পর্যবেক্ষণ আর প্রশ্নের সমাহার। আমার মতের সাথে অনেকের দ্বিমত থাকবে সন্দেহ নেই। আমার সাধারণ বোধ বা যুক্তির উপর ভিত্তি করে এই মত বা পর্যবেক্ষণে উপনীত হয়েছি । লেখাটা অসংলগ্ন, পরিপাটি, পাণ্ডিত্যপূর্ণ কোন লেখার চেষ্টা করিনি। হঠাৎ করেই প্রসঙ্গান্তরে চলে যাব।

ভাষার গুরুত্ব বা উপযোগিতা কিসে? দুটো কথা মনে আসে। এক হল কোন এক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাবের আদান প্রদান বা তথ্য বিনিময় করার জন্য উদ্ভাবিত এক মাধ্যম। এই অর্থে ভাষা একটা সাধনী বা সাধিত্র মাত্র। এখানে আবেগ বা হৃদয়ের কোন ব্যাপার নেই। ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তাটাই মুখ্য। আর দ্বিতীয় যে ব্যাপারটা মনে আসে সেটা হল সেই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, সাহিত্য, সঙ্গীত, প্রকৃতি বা আবহাওয়াকে কাব্যিক ভাবে প্রকাশের একটা মাধ্যম। এখানে আবেগ বা হৃদয়ের ব্যাপার জড়িত।

প্রথম উদ্দেশ্যের জন্য এক প্রমিত ভাষা প্রয়োজন। বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর (বাংলাদেশ ও ভারতে) জন্য সেই প্রমিত ভাষার ব্যবহার আমরা দেখতে পাই সংবাদপত্রে, রেডিও বা টেলিভিশনের সংবাদ পঠনে, স্কুলের পাঠ্য বইএ, সরকারী দলিল দস্তাবেদে, অভিধানে এবং লোকসংস্কৃতিভিত্তিক নয় এরকম সাহিত্য, সঙ্গীত বা নাটকের ভাষায়। আমি এখানে প্রমিত ভাষা আর উপভাষার (যাকে অনেকে আঞ্চলিকতা বলেন) পার্থক্য বোঝাতে চাইছি। অবশ্য প্রমিত ভাষারও দুটো রূপ আছে, সাধু ও চলিত। সাধু ভাষা বিলুপ্তির পথে। এই আলোচনায় প্রমিত বাংলা ভাষা বলতে চলিত বাংলা ভাষাই বোঝাব। শুদ্ধ বাংলা ভাষা বলতেও চলিত প্রমিত বাংলা ভাষাই বোঝাব। উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা হল বাংলাদেশ বা ভারতের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অঞ্চল ভেদে বাংলা ভাষার পরিবর্তিত বা ভ্রংশিত রূপ। প্রমিত ভাষা ও উপভাষা দুটোরই গুরুত্ব আছে, কিন্তু দুটির গুরুত্ব দুই জায়গায়। যখন বাংলাদেশ বা বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর সবাইকে শ্রোতা করে কিছু বলা বা লেখা হয় (যেমন এই ব্লগে) তখন অবশ্যই প্রমিত ভাষা ব্যবহার করা বাঞ্ছণীয়। সাধারণ বোধে তাই বলে। উপভাষা বা আঞ্চলিকতা অঞ্চল ভেদে ভিন্ন, তাই সার্বিক উদ্দেশ্যে লেখা বা বলার সময় কোন বিশেষ অঞ্চলের উপভাষা ব্যবহার করাটা অন্য অঞ্চলের জনগণের জন্য অসুবিধাজনক এবং সেটা তাদের প্রতি অসজৌন্যও বটে। যে দেশ বা সমাজের জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ভাষা বা উপভাষার উপগোষ্ঠীতে বিভক্ত সেখানে সবার জন্য এক প্রমিত ভাষা নির্ধারণ করা জরুরি, বাস্তবসম্মত ও গণতান্ত্রিক। উপভাষার উৎপত্তি বা উদ্ভবের কারণ হল বিশেষ কোন গোষ্ঠীর বা অঞ্চলের জনগণের নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান প্রদান ও সেই অঞ্চলের লোক সাহিত্য বা সংস্কৃতিকে ধারণ করা। প্রত্যেক অঞ্চলের লোক সাহিত্য বা সংস্কৃতিই একটা দেশের জাতীয় সম্পদ বা ঐতিহ্য তাই তা সংরক্ষণ করা আবশ্যক। যেমন রেডিও বা টেলিভিশনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলের লোক সাহিত্য, সঙ্গীত বা নাটককে ভিত্তি করে অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে যে যার নিজের অঞ্চলের বা গোষ্ঠীর উপভাষাকে জাতীয় স্তরে বা সাধারণ শ্রোতার উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করতে চাইলে সেটা সঙ্কীর্ণ আঞ্চলিকতাবাদ বা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ হয়ে যায়, যা পরিহার করা বাঞ্ছণীয়। এখানে প্রমিত ভাষা সবার জন্য এক গণতান্ত্রিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা কাজ করে, কারণ প্রমিত ভাষা কোন বিশেষ অঞ্চলের জন্য নয়, সবার জন্য। অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরে এক উপভাষা ধীরে ধীরে সৃষ্ট হচ্ছে যা সবার জন্য বলে চাপানোর এক সূক্ষ্ণ চেষ্টা করা হচ্ছে, সবার জন্য এক সাধারণ উপভাষা হিসেবে। এটা বিশেষ করে ঢাকা কেন্দ্রিক এক সংস্কৃতি, ঢাকা অঞ্চলের উপভাষাই এতে প্রাধান্য পায়। যদিও এর অনেক শব্দাবলী অনেক আঞ্চলিক ভাষাতেই বিদ্যমান। এটাকে সাধারণভাবে বাঙ্গাল ভাষাও বলে অনেকে। কিন্তু এটাকে প্রমিত ভাষা বা সবার জন্য সাধারণ উপভাষা বলে মেনে নেয়ার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। কারণ প্রমিত বাংলা ভাষা ও উপভাষাসমূহ উভয়ই দীর্ঘদিন ধরে পরিবর্ধিত ও সমৃদ্ধ হয়ে ভালভাবেই প্রতিষ্ঠিত, সেখানে ঢাকা কেন্দ্রিক আলাদা কোন আঞ্চলিক ভাষা বিদ্যমান প্রমিত ভাষাকে সরিয়ে প্রমিত ভাষা বা সবার জন্য এক সাধারণ উপভাষা হিসেবে চালু হবার কোন প্রয়োজন দেখিনা। অবশ্য ঘরে বা বাইরে নিজেদের মধ্যে বা পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের বা একান্তচক্রের(Inner Circle) মধ্যে আড্ডাতে এই উপভাষাতে কথা বলা স্বাভাবিক। যেমন মুক্তমনারই অনেক পরিচিত সদস্যবৃন্দ নিজেদের মধ্যে এই ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু ব্লগটা তো কোন একান্তচক্র নয়। এটা সমগ্র বাংলাভাষীদের একটা ফোরাম। অনেক মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী, বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎকারে, বক্তৃতায় বা সরকারী ভাষ্যে আঞ্চলিকতা ব্যবহার করেন। এটাও দুঃখজনক। আমি বাঙ্গাল ভাষার বিরুদ্ধে নই। শুধু এটাকে প্রমিত ভাষার মর্যাদা দেয়ার বিপক্ষে। ইতিমধ্যে এই আঞ্চলিক ভাষা ঢাকার টিভি চ্যানেল গুলির অনেক নাটকেও ব্যবহৃত হচ্ছে, যদিও নাটকগুলি বাংলাদেশের সব দর্শকদের লক্ষ্য করে প্রচারিত হয়। এর কোন সঙ্গত কারণ দেখি না। আগেই বলেছি বিশেষ অঞ্ছলকে যউদ্দেশ্য বা ফীচার করে সেরকম অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। আমার সঙ্গে দ্বিমত হবেন বা আপত্তি তুলবেন হয়ত অনেকে। কিন্তু এটা আমার মত বা রুচির প্রতিফলন বলে বিতর্কের খুব সুযোগ নেই। যে যার নিজের মত বা যুক্তি দিতে পারেন অবাধে।বিকল্প যুক্তি দেয়া হলে নৈর্ব্যক্তিকভাবে তার গুণাগুণ বিচারের চেষ্টা করব বা সম্মানের সাথে দ্বিমত পোষণ করব। এটাও বলার দরকার যে আমি বিশুদ্ধবাদ (Purism) বা অতিনীতিনিষ্ঠতা (Puritanism) প্রচার করছি না। চিন্তায়,বিচারে বা নীতিতে সামঞ্জস্য ও সাধারণ বুদ্ধি ও যুক্তি প্রয়োগের গুরুত্বের উপর জোর দিতে চাচ্ছি কেবল। আর আমি বলপ্রয়োগের আহবানও জানাচ্ছি না।

এবার আসি বাংলায় ইংরেজী শব্দ বা বাক্যের ব্যবহার নিয়ে। অনেকের মাঝে বাংলায় সামান্যতম ইংরেজী ব্যবহার নিয়েও ঘোর আপত্তি দেখা যায়। এই ব্লগেও সেটা দেখা যায়। বাংলা লেখা বা কথনে ৫০% বা তার বেশিই যদি ইংরেজী হয় তাহলে সেটা অর্থহীন ও হাস্যকর হয়ে যায় ঠিকই। কিন্তু কোন কোন প্রসঙ্গে ইংরেজী ব্যবহারের বিরুদ্ধে মাত্রাহীন খুঁতখুঁতানিরও কোন সঙ্গত কারণ নেই বলে মনে করি। আজকের জগতে ইংরেজী একটি কার্যত আন্তর্জাতিক ভাষা হয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রাক্তন সমাজতন্ত্রী ইউরোপীয় দেশসমূহ ও চীন পশ্চিমা দেশের সাথে রাজনৈতিক, সামাজিক ও আর্থনীতিক বন্ধন জোরদার করায় ইংরেজীর আন্তর্জাতিকীকরণ ও গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। কাজেই সামান্য ইংরেজী ব্যবহারে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়। তাছাড়া বাংলাদেশের সব স্কুলেই ইংরেজী পাঠ কোন না কোন পর্যায়ে বাধ্যতামূলক জানি। কাজেই সামান্য ইংরেজী ব্যবহার করলে বুঝতে অসুবিধা হয় বললে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। শুধু একটি ভাষা জানা আজকের পৃথিবীতে অচল। অপ্রয়োজনে ইংরেজী ব্যবহার করার কথা বলছি না। কিন্তু অনেক সময় কোন ইংরেজী প্রবাদ, বাক্য বা শব্দ যা অনেকের কাছে বহুল পরিচিত সেটা ব্যবহার করলে বক্তব্যের মূল ভাব প্রকাশের সহায়ক হয় বা জোর দেয়ার জন্য সুবিধা হয়। এতে বাংলাকে উপেক্ষা করা হয় না বা বাংলাভাষার কোন ক্ষতি করা হয় না। বরং ভুল বাংলা (বানান বা ব্যকরণগত) পরিহার করার উপর জোর দেয়াটাই বেশি অর্থবহ ও যথার্থ। যদিও ভুল আমরা সবাই কম বেশি করি। কয়েকটি প্রচলিত ভুলের উদাহরণঃ

১। এ্যাম্বুলেন্স, এ্যাটম, ষ্টেশন (অ্যাম্বুলেন্স,অ্যাটম, স্টেশন। “এ্যা” এর ব্যবহার বাংলায় নেই বলেই জানি)
২। উৎকর্ষতা, দারিদ্র্যতা, দৈন্যতা,…
৩। অর্থনৈতিক (সংসদ বাংলা অভিধান অনুযায়ী আর্থনীতিক এর অসংগত কিন্তু বহুল প্রচলিত রূপ)
৪। এই ব্লগে বহুল ব্যবহৃত বাক্য বা শব্দ যেমন, “জাগানিয়া (চিন্তা জাগানিয়া)”, “জানান দিয়েন”, “আপ্নের” ইত্যাদি। এগুলি কি প্রমিত ভাষা ? কবিতায় অনেক সময় (বিশেষ করে বিখ্যাত কবির) ভুল শব্দ বা বাক্যের ব্যবহার আর্ষপ্রয়োগ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু এখানে তো আর্ষপ্রয়োগের কোন সুযোগ দেখছি না। অনেকে সামান্যতম ভুল বানানের জন্য ঘোর আপত্তি তোলেন কিন্তু এই ধরণের ভুল বাংলায় তাদের কোন আপত্তি নেই। এটা অনেকটা পরস্পরবিরোধী অবস্থান আমার মতে। তবে ব্লগে রহস্যচ্ছলে বা রসালাপে লাইকাইলাম (Like বোতাম এ টিপা) বা এধরণের কিছু শব্দের ব্যবহার আর্ষপ্রয়োগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

পরিভাষা নিয়ে কিছু কথা। অনেক ইংরেজী শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ইতিমধ্যে বিদ্যমান। সেগুলোর নতুন করে পারিভাষিক শব্দ বের করার প্রয়োজন দেখি না। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ হলেও বাংলাভাষার ইতিহাস অনেক পুরানো। একশ বছরেরও আগের থেকেই কোলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পরিভাষা নির্মাণ কাজে লাগে। এই কাজে বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজশেখর বসু, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ এবং অবশ্যই আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এবং আরো অনেকে। ১৯৩৪ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজশেখর বসুর সভাপতিত্বে বৈজ্ঞানিক পরিভাষার এক শক্তিশালী সমিতি গঠিত হয়। প্রায় দশ বছর ধরে এই সমিতি বিজ্ঞানের প্রত্যেক শাখায় বিশাল এক পরিভাষা ভান্ডার গড়ে তোলে। পাক-ভারত স্বাধীনতার পর সরকারী স্তরে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বাংলা পরিভাষা প্রণয়নের জন্য পশ্চিম বাংলায় “পরিভাষা সংসদ”(১৯৪৮) ও “পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যভাষা কমিশন”(১৯৬৪) গঠিত হয়। আর সকল ভারতীয় ভাষার বৈজ্ঞানিক পরিভাষা উন্নয়নের জন্য ১৯৬১ সালে ভারতের শিক্ষামন্ত্রক “বৈজ্ঞানিক ও প্রয়োগিক শব্দাবলীর আয়োগ” (Commission for Scientific Terminology) গঠন করে। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) ১৯৫৬ এ বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হবার পর ১৯৫৭ সালে বাংলা অ্যাকাডেমি ও ১৯৬৩ সালে বাংলা উন্নয়ন “বোর্ড” গঠিত হয়। বোর্ড এর বাংলা পর্ষদ থাকা সত্ত্বেও কেন তখন নামে বোর্ড রাখা হয় বোধগম্য নয়। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের এই প্রতিষ্ঠান সমূহ বাংলা পরিভাষা উন্নয়নে অনেক কাজ করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে অনেক ভাষা পন্ডিতদের শ্রমকে উপেক্ষা করে ও সেই শ্রমের সুফলকে সদ্ব্যবহার না করার কোন যৌক্তিক কারণ নেই । নতুন করে বাংলাদেশের জন্য আলাদা পরিভাষা প্রণয়ন করাটা অপ্রয়োজনীয়, কর্মদক্ষতা পরিপন্থী এবং শ্রম ও সময়ের অপচয় বলে মনে করি, অনেকটা চাকা পুনরাবিষ্কারের মত ব্যাপার (এখানে reinventing the wheel বললে ভাবটা আরো পরিস্কার হত)। নতুন শব্দ সৃষ্টি করাটা ভাষার সমৃদ্ধি ঠিকই। কিন্তু বিদ্যমান শব্দকে সরিয়ে যদৃচ্ছাক্রমে নতুন শব্দ চালু করার সঙ্গত কোন উদ্দেশ্য দেখি না। বাংলা এখন জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃত একটা আন্তর্জাতিক ভাষা। তাই বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য দুই বাংলার মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা আরো জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা যদি একক বা একতরফাভাবে বাংলা ভাষার পরিবর্তন করতে থাকি তাহলে একসময় হয়ত প্রশ্ন উঠবে আন্তর্জাতিক বাংলা ভাষা কোনটি, বাংলাদেশে যেটা ব্যবহৃত হয়, সেটি না কি পশ্চিমবঙ্গে? এটা অনাকাঙ্খিত । এটা আশার কথা যে ঢাকায় Bengali International এর প্রথম আন্তর্জাতিক বাঙ্গালী সম্মেলনের সভাপতি শামসুল হক বাংলা ভাষার ভিন্নতার কথা উল্লেখ করে এতে বাংলা ভাষার ক্ষতি হচ্ছে বলে মত দিয়েছেন। Bengali International এ ব্যাপারে আশা করা যায় উদ্যোগী হবে। বাংলায় আগ্রহী অনেক বিদেশী বাংলা ভাষাকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের ভাষা বলে জানে এবং বাংলা শিখতে আগ্রহী হয়ে ঢাকায় বা কোলকাতায় আসে। সেই ধারা যাতে বিপন্ন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অনেকে কোলকাতায় বাংলার সম্ভাব্য বিলুপ্তিতে শ্লাঘা অনুভব করে। এটাও দুর্ভাগ্যজনক। ভাষার পরিসর যত অধিক সংখ্যক জনগোষ্ঠী বা ভৌগলিক সীমানা জুড়ে বিস্তৃত থাকবে ততই সেই ভাষার জন্য মঙ্গল। দুই বাংলাতেই যাতে সাধারণ এক প্রমিত ভাষা ও নিজ নিজ উপভাষার ও উপভাষাভিত্তিক সাহিত্য সংস্কৃতি সংরক্ষিত ও উন্নত হতে থাকে সেটাই সবার কাম্য হওয়া উচিত।

যে সব ব্যবহৃত ইংরেজী শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ এখনও নেই আমার মতে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার বাংলা ভাষার পণ্ডিতদের সমন্বয়ে ও যৌথ উদ্যোগে সেই প্রতিশব্দগুলি সৃষ্টি করা বাঞ্ছনীয় যাতে একই শব্দের দুই ভিন্ন পারিভাষিক শব্দ না চালু হয় দুই বাংলায়। এটা কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয় পরিপন্থী। প্রমিত বাংলা ভাষা যেহেতু সব বাঙ্গালীর মধ্যে যোগাযোগ বা তথ্যের আদান প্রদানের সাধনী তাই এর যত কম বিভক্তি হয় ততই ভাল। এখানে ভৌগলিক সীমান্ত বিবেচ্য হওয়া উচিত নয় বলে মনে করি। সীমান্ত বা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব একটা বাস্তবতা। কিন্তু ভাষায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সীমান্ত টানাটা বাস্তবতা বা বাঞ্ছনীয় নয়। এক ভাষা থেকেও পৃথক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। আমেরিকা ও বৃটেন দুই সার্বভৌম রাষ্ট্র, কিন্তু একই ভাষা দুদেশেরই। যদিও আমেরিকা বিপ্লবের মাধ্যমে বৃটেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল। সামান্য কিছু বানানের হেরফের আছে ঠিকই। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে তাদের মধ্যে সাধারণ সীমান্ত নেই। মহাসাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন। সেখানে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলা এত কাছের প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও বা সাধারণ সীমান্ত থাকা সত্ত্বেও ভাষার কৃত্রিম পার্থক্য তৈরী করাটা অযৌক্তিক।

অনেক বিদেশী বা ইংরেজী শব্দ বাংলায় বহুল প্রচলিত এবং বাংলা অভিধানে স্থান পেয়ে গেছে। সেগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহারের উপর হেতুক জোর দেয়াটা খুঁতখুঁতানি। চেয়ার বা টেবিল ব্যবহার নিয়ে কেউ আপত্তি তোলে না। যে সব বহুল প্রচলিত ইংরেজী শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ সরকারীভাবে (বাংলাদেশ বা পশ্চিম বাংলায়) চালু হয় নি সেগুলোর ব্যক্তিপগত উদ্যোগে যথেচ্ছক্রমে বাংলা প্রতিশব্দ বের করে ব্যবহার করাটাও অপ্রয়োজনীয় এক প্রয়াস বলে মনে হয়। ইন্টার্নেট (বা ইন্টারনেট) এমন এক উদাহরণ। ইদানীং ব্লগে অন্তর্জাল শব্দের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। এটা যেহেতু প্রমিত ভাষার জন্য সরকারীভাবে নির্ধারণ করা হয় নি বলেই জানি তাই বহুল পরিচিত ও প্রচলিত ইন্টার্নেট এর জায়গায় এটা ব্যবহার করার কোন কারণ দেখি না। চেয়ার টেবিল, স্টেশনের মত ইন্টারনেটকেও বাংলা ভাষায় স্থান দেয়াতে আপত্তির কোন কারণ দেখিনা। সব ইংরেজী শব্দেরই আক্ষরিক বাংলা করে প্রতিশব্দ বের করাটা ( যেমন Inter ->অন্তর net–> জাল) আতিশয্য বলে মনে হয় (আমার কাছে)। ইন্টারনেট একটা আন্তর্জাতিক শব্দ, তাই এটাকে বাংলা ভাষায় সম্পৃক্ত করলে বাংলা ভাষারই সমৃদ্ধি হবে। বাংলা ভাষার অনেক পণ্ডিতরাও তাঁদের অনেক লেখায় বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের অন্তর্ভুক্তিকে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাহলে এই ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হবে কেন। এ প্রসঙ্গে বাংলা অ্যাকাডেমির প্রাক্তন সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা প্রণয়ন কমিটির প্রাক্তন সভাপতি ড: এনামুল হক এর একটা উক্তি প্রণিধানযোগ্য : “বিজ্ঞানের পরিভাষার অনেকগুলি এমন শব্দ আছে, যাকে আন্তর্জাতিক শব্দ বলে নির্দিষ্ট করা যায়। অথচ এগুলোকে কোন জাতিবিশেষের শব্দ বলে নির্দিষ্ট করা চলে না। এগুলোকে নিজেদের বাংলাভাষার ধ্বনি ও রূপতাত্ত্বিক প্রকৃতি অনুসারে আত্মস্থ করে ভাষার অঙ্গীভূত করে নিতে হবে”

কতগুলি ইংরেজী শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ নেই (অভিধানে) বলে আমার জানা। এটা কি বাংলার সীমাবদ্ধতা, নাকি বাঙ্গালী জাতির সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতা। যেমন Appreciate করার কোন বাংলা প্রতিশব্দ নেই। যদিও ধন্যবাদ আছে। তাহলে কি বাঙ্গালী মানসে Appreciate করার ধারণা নেই? বাস্তব জীবনে আমি এর ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনেক সময় অনুভব করি, বাংলা না জানায় ইংরেজীতেই বলতে হয়। এটাকে আমার মনে হয় বাংলা ভাষা বা সংস্কৃতির একটা দুর্বলতা হিসেবে দেখতে হবে। আরও কিছু বহুল ব্যবহৃত ইংরেজী শব্দ যার বাংলা প্রতিশব্দ নেই তার উদাহরণঃ
adjust, perfection, intellectual (adjective), oxymoron, academy, overlap, worthwhile

বাংলা একাডেমি (অ্যাকাডেমি) কেমন শোনায়?

ভাষা দিবস ২১শে ফেব্রুয়ারী তে পালিত না হয়ে ৮ই ফাল্গুন পালিত হলে বেশী মানানসই হত না কি? এবার ভাষা দিবস ৯ই ফাল্গুন পালিত হচ্ছে।

আসি ভাষায় টানের (Accent/Tone) প্রসঙ্গে । আমরা দেখি সব উপভাষারই নিজস্ব টান আছে। সিলেটের উপভাষার টান আর রাজশাহী বা চট্টগ্রামের উপভাষার টান ভিন্ন। প্রমিত ভাষার কোন টান নেই বা থাকার কথা না। যদিও অনেক সময় দেখা যায় যারা দীর্ঘদিন উপভাষায় কথা বলে অভ্যস্থ তারা যখন প্রমিত ভাষা বলে তাতে একটা টান বা উচ্চারণ ত্রুটি থেকে যায়। কিন্তু যদি প্রমিত ভাষা শুদ্ধ উচ্চারণ সহ বলা হয় সেটা কোন আঞ্চলিকতাকে প্রতিফলিত করার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা একটা মজার ব্যাপার লক্ষ্য করি। সেটা বলার আগে একটু ভূমিকা দিয়ে নেই। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। ছোটবেলায় ইংরেজী বাংলা উভয় স্কুলেই পাঠ করাতে এবং একই অঞ্চলে বেশিদিন না থাকার কারণে কোন বিশেষ অঞ্চলের টানে কখনো কথা বলিনি বা টান আয়ত্ত করিনি। পৈত্রিক গ্রামেও বড় হইনি অনেকের মত। তাই টানহীন প্রমিত ভাষাই বলতে অভ্যস্থ। আমার টানহীন প্রমিত বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের অনেকে কোলকাতার বাংলা (যা অনেকে ঘটী বলে উল্লেখ করে। যদিও সেরকম কোন অর্থ অভিধানে নেই) হিসেবে ভুল করে। গিয়েছিলাম/করেছিলাম ঘটী বাংলা নয়, গিয়েছিলুম/করেছিনু ঘটী বাংলা। মাংস হিন্দুদের ভাষা বা ঘটী বাংলা নয়, এটা প্রমিত বাংলা শব্দ। আবার যখন কোলকাতা বেড়াতে যাই, সেখানে অনেকে আমার বাংলা শুনে আমাকে বাংলাদেশ থেকে এসেছি বলে ধরে নেয় বা আমার কথায় বাঙ্গাল টান আছে বলে মনে করে। তাহলে দেখা যাচ্ছে টানহীন শুদ্ধ উচ্চারণ সহ প্রমিত বাংলা বললে ঢাকার মানুষ তাকে ঘটী বাংলা মনে করে আর কোলকাতার লোক তাকে বাঙ্গাল ভাষা মনে করে। আসলে এই দুই বাংলারই অধিকাংশ মানুষ টানহীন শুদ্ধ উচ্চারণ সহ প্রমিত বাংলা বলতে অভ্যস্থ নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের (এবং ঢাকার) যেমন নিজস্ব টান আছে তেমন পশ্চিম বাংলারও বিভিন্ন অঞ্চলের (এবং কোলকাতার) নিজস্ব টান আছে। কোলকাতা কেন্দ্রিক উপভাষা বা ঘটী বাংলা মুখ্যত হুগলী-নদীয়া প্রভাবিত। শুধু টানই নয় কিছু উচ্চারণ ভ্রংশও আছে যেমন পূবপারে “ছ” কে ‘স” বলা আবার পশ্চিম পারে sh কে s উচ্চারণ করা ইত্যাদি। মানুষের স্বভাব হল অনেক কিছুকে দ্বৈতভাবে দেখা। সব কিছুকে জানা দুটো ছকের মধ্যে ফেলার প্রবণতা মজ্জাগত। এটা না হলে ওটা। তৃতীয় বা মাঝামাঝির অস্তিত্বের সচেতনতা অনেকের নেই। তাই যখনই যে কোন পারের কোন বাংগালী যখন অপরিচিত বা টানহীন শুদ্ধ বাংলা ভাষা শোনে তখন মনে মনে ধরে নেয় যেহেতু এটা আমার মত শোনাচ্ছে না, বর্ধমানের ভাষার মত নয় বা কুমিল্লার টানের মত নয় তাই এটা নিশ্চয় “ওপার বাংলার” ভাষা। অবশ্য রেডিও টিভির সংবাদ বা ভাষ্য শুনে সেরকম ধরে নেয়না, মনে করে না। কেবল ব্যবহারিক জীবনে দৈনন্দিন কথোপকথনের সময় এই মানসিকতাটা বা চেতনাটা কাজ করে। ঢাকা বা কোলকাতার রেডিও/টিভির সংবাদ পঠনে খুব পার্থক্য দেখা যায় না বিশেষ করে সংবাদ পাঠক যদি নির্ভুল উচ্চারণ সহ বাংলা বলেন। তবুও কথার সুরের মধ্যে কিছু সূক্ষ্ণ লক্ষণীয় পার্থক্য দেখা যেতে পারে কখনো কখনো, বিশেষ করে সেই সংবাদ পাঠক যদি তার ব্যবহারিক জীবনে উপভাষা ব্যবহারে অভ্যস্থ হন (সেটা আঞ্চলিক টানই হোক বা ঢাকা কোলকাতা কেন্দ্রিক টানই হোক)। কিন্তু যারা কখনো উপভাষা বলে না তারা যখন শুদ্ধ প্রমিত ভাষা বলে তাতে বাংলাদেশের বা পশ্চিম বাংলার কোনটারই আঞ্চলিক কোন টান থাকার কথা না। টান থাকলে সেটা সেই ব্যক্তির নিজস্ব এক টান, তার আঙ্গুলের ছাপের মত্য অনন্য এক বৈশিষ্ট্য, কোন বিশেষ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বমূলক টান নয়। কিন্তু অধিকাংশের প্রবণতা হল এই অশ্রেণিভুক্ত টান বা টানহীন বাংলাকে ঢাকা বা কোলকাতার টান বলে শ্রেণীভুক্ত করার, অর্থাৎ অজানা বা অচেনাকে চেনা বা জানা ছকের মধ্যে ফেলার।

এবার আসি প্রমিত বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে লেখা ও বলার গুরুত্ব নিয়ে। প্রখ্যাত বহুভাষাবিদ ড: শহীদুল্লাহ বাংলা শুদ্ধভাবে লেখা ও উচ্চারণের উপর জোর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ভাষা শহীদদের উপযুক্ত সম্মান এভাবেই দেখান যায়। ১৯৪৮ এ প্রমিত বাংলা ভাষার উপরই আক্রমণ করা হয়েছিল। কোন উপভাষার উপর নয়। জিন্নাহ বলেছিলেন পুর্ব পাকিস্তান নিজেদের জন্য যেটা ইচ্ছা সেই ভাষাই বেছে নিতে পারে, কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানের বা বাংলাদেশের উপভাষার উপর কখনো আক্রমণ হয়নি। উপভাষার কোন বিকৃতি হয় নি বা করার চেষ্টাও কেউ করে না। চট্টগ্রাম, সিলেট বা রাজশাহীর উপভাষা অতীতে যেমন ছিল এখনো তেমনই আছে। ১৯৪৮ সালে পশ্চিম অংশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তান সরকার প্রমিত বাংলা ভাষাকেই আক্রমণ করেছিল। আর এখন অনেক বাংলাদেশী নিজেরাই প্রমিত বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার অন্তর্ঘাতমূলক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। প্রমিত বাংলা ভাষা বলা ও লেখাকে অনেকে অভিজাততন্ত্র (Elitism) বা উন্নাসিকতা হিসেবে দেখে, সোজা কথায় এটাকে আঁতেলদের ভাষা বা আঁত্‌লেমোর বৈশিষ্ট্য বলে মনে করে, এবং সেই কারণে এর প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। কিন্তু এরকম ভাবাটা ঠিক নয়। আঁতেল শব্দটা ব্যাঙ্গার্থে বুদ্ধিজীবীদের প্রতি ব্যবহার করা হয়, যারা প্রকৃত বুদ্ধিজীবী নয় বা উন্নাসিক বুদ্ধিজীবী, বা বুদ্ধিজীবীর ভান করে তাদের উদ্দেশ্যে। বুদ্ধিজীবী বা Intellectual হওয়াট দোষের কিছু নয়। ভান করা বা উন্নাসিকতা দেখান চরিত্রের একটা নেতিবাচক দিক হিসেবে দেখা উচিত, বুদ্ধিবৃত্তির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে নয়। আগেই বলেছি প্রমিত বাংলা ভাষার গুরুত্বটা মুখ্যত ব্যবহারিক। বিভিন্ন উপভাষা ভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাধারণ এক ভাষা নির্দিষ্ট করাই এর ব্যবহারিক গুরুত্ব। অতীতে প্রমিত বাংলা ভাষায় “অভিজাত” বাঙ্গালী শ্রেণীর জীবন নিয়ে সাহিত্য লেখা হয়েছে বলে তো সেই ব্যবহারিক গুরুত্ব কমে যায় না বা প্রমিত ভাষা নিজেই অভিজাত হয়ে যায় না। ভাষা কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে সেটা তো ভাষার দোষ নয়। প্রমিত ভাষায় সাধারণ (“মাটির মানুষ”) মানুষদের জীবন নিয়েও তো সাহিত্য লেখা হয়েছে। অনেকে হয়ত বলবে বাঙ্গাল ভাষাকে বাংলাদেশের প্রমিত ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে দোষ কোথায়, সবাই তো এটায় বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে আর বাংলাদেশের নিজস্ব একটা আলাদা ভাষা তো থাকাই দরকার, আমরা কেন বৃটিশ আমলে কোলকাতার বাবুদের সৃষ্ট ভাষাকে গ্রহণ করব জাতীয় ভাষা হিসেবে। এটা বাঙ্গালাদেশী জাতীয়তাবাদী ধারণা। কিন্তু এর গুরুতর এক সমস্যা আছে। পিচ্ছিল ঢালের মত এই যুক্তি। এই যুক্তি আক্ষরিকভাবে অনুসরণ করলে কোথায় আমাদের নিয়ে নামাবে তার নিশ্চয়তা নেই। তাহলে আমাদের অতীতকে সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলতে হয়। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল,জীবনান্দদাশ, মীর মোশাররক হোসেন, কেউ আর আমাদের কবি বলে বিবেচিত হবেন না। বাঙ্গাল ভাষার শিকড়ও তো সংস্কৃতে, তাহলে তো নতুন অক্ষরে নতুন শব্দমালা নিয়ে এক প্রমিত ভাষা সৃষ্টি করতে হয়, যা একান্তই বাংলাদেশের সৃষ্টি। এটা অবাস্তব ও অনাকাঙ্খিত। এরকম জাতীয়তাবাদী চিন্তা অগঠনমূলক ও সঙ্কীর্ণতা। অতীতে কারা বাংলা ভাষা সৃজনে বা তার সমৃদ্ধিতে অগ্রণী ছিল সেটা একান্তই অবান্তর এক বিবেচনা। আর তা ছাড়া কোলকাতার বিদগ্ধ সমাজ অতীতে অগ্রণী হলেও প্রমিত বাংলা ভাষার বিবর্তন ও সমৃদ্ধিতে বিভিন্ন সময়ে হিন্দু, মুসলিম, রাড়ীয়, সমতটীয়, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত সব বাঙ্গালীরাই ঐতিহাসিকভাবে জড়িত ছিল ও ভুমিকা রেখেছে। পৃথিবীর অনেক দেশের (ফিলিপিন, ইথিওপিয়া, ফিজি, পাকিস্তান, ভারত, আরও অনেক) সরকারী ভাষা ইংরেজী, যদিও আধুনিক ইংরেজী ভাষার সৃষ্টি হয়েছিল উন্নাসিক বলে পরিচিত বৃটিশদের দ্বারা। তাছাড়া অনেক দেশের মাতৃভাষাও ল্যাটিন লিপিতে লেখা হয়, যা তাদের ইতিহাসের বা সংস্কৃতি থেকে লব্ধ নয়। যেমন ভিয়েতনাম, সোমালীয়া এবং আরও অনেক দেশে। ভিয়েতনামের ভাষা ফরাসী ভাষার দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিতও বটে। সোমালীয়া মুসলীম প্রধান দেশ এবং তাদের ভাষা পূর্বে আরবী হরফে লেখা হলেও বর্তমানে ল্যাটিন হরফে লেখা হয়। এসব উদাহরণ দেয়ার উদ্দেশ্য এটা বলা নয় যে তারাই সঠিক বা অনুকরণীয়, উদ্দেশ্য হল সরকারী বা রাষ্ট্রভাষা সম্পূর্ণ নিজেদের তৈরী হওয়া উচিত এই যুক্তির যে সার্বজনীনতা নেই সেটা বোঝান। থাকলে এতগুলি ব্যতিক্রম দেখা যেত না। আর সেখানে প্রমিত বাংলা ভাষা তো বাংলাদেশের মাটি ও ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। এটাকে বিজাতীয় ভাষা ভাবার কোন যৌক্তিকতা নেই। দ্বিতীয়ত বর্তমান বাঙ্গাল ভাষায় বিশেষ অঞ্চলের প্রভাব অনেক বেশী। সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা বা রাজশাহীর মানুষের কাছে এটা সহজে গ্রহণযোগ্য কোন ভাষা নয়। কাজেই এটাকে জাতীয় ভাষা বলাটা প্রকৃত গণতান্ত্রিক অর্থে সঠিক নয়। ঢাকা জিলা বা তার আশপাশের জিলার আধিপত্যই এতে পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া সব উপভাষার সমান প্রতিনিধিত্বমূলক জগাখিচুড়ী এক প্রমিত ভাষা সৃষ্টি করা বাস্তব বা বাঞ্ছণীয় নয়। যে কারণে ভারত বা পাকিস্তানে সেটা সম্ভব হয় নি।

অনেকে উপভাষায় দীর্ঘদিন কথা বলতে অভ্যস্থ হওয়ায় প্রমিত ভাষা বলতে বা লিখতে কষ্ট বা আলস্য বোধ করে। নিজের আলস্যকে স্বীকার না করে অনেকে প্রমিত ভাষার দোষ বা অনুপযোগিতা বের করার চেষ্টা করে যাতে কষ্ট না করার এক অজুহাত পাওয়া যায়। কিন্তু মনে রাখা উচিত একটা জাতি হিসেবে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও ভাবের আদান প্রদানকে গণতান্ত্রিক রাখতে হলে ও বিশেষ কোন উপভাষার অন্যগুলির উপর সম্ভাব্য প্রাধান্য বা আধিপত্য বিস্তার রুখতে হলে সামান্য কিছু মূল্য (কষ্ট) দিয়েও প্রমিত বাংলা ভাষা বলা ও লেখার চেষ্টা করাটা কষ্টের যোগ্য মনে করি। আর এটা সম্ভবও। ১৯৭১ এর আগে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু ও বাংলা ছিল কিন্তু উর্দু ও বাংলার ৫০-৫০ মিশ্রণে কোন জগাখিচুড়ী ভাষা তৈরী করা হয় নি। কার্যত ইংরেজীই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা ছিল। তখন অনেক অল্প শিক্ষিতরাও ইংরেজী বলতে ও লিখতে পারত। ভারতেও ইংরেজীই রাষ্ট্র ভাষা। হিন্দি জনপ্রিয় হলেও দক্ষিণ ভারতে এর গ্রহণযোগ্যতা নেই। চেন্নাই এর ট্যাক্সি চালকেরা ইংরেজী বলে কিন্তু হিন্দি বলতে পারেনা বা বলে না। সেখানে প্রমিত বাংলা ভাষা বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা হিসেবে লিখতে ও বলতে অসুবিধা হবে কেন। সিলেট বা চট্টগ্রামের উপভাষা প্রমিত বাংলা ভাষা থেকে অনেক বেশী ভ্রংশিত হলেও এই দুই জিলার নিবাসী অনেকেই সাবলীলভাবে প্রমিত বাংলা বলতে পারেন। অনেক বিদেশীও ভাল প্রমিত বাংলা বলতে পারেন। সচেতন ইচ্ছা থাকাটাই মুখ্য।

ভাষা দিবসে ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করা ছাড়াও প্রমিত বাংলা ভাষার যথাযথ সংরক্ষণ, শুদ্ধ উচ্চারণ ও শুদ্ধ লেখার সচেতনতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি হোক এই আশা ব্যক্ত করেই আমার দীর্ঘ ভাষের ইতি টানছি।

বাংলা ভাষা নিয়ে আমার উত্তরসূরী আর মুক্তমনা ফোরামে আমার দুটো পোস্ট:

http://groups.yahoo.com/group/uttorshuri/message/83
http://groups.yahoo.com/group/mukto-mona/message/32997

এই প্রসঙ্গে ড: সুখময় বাইনের নীচের মন্তব্যও প্রণিধানযোগ্যঃ
http://groups.yahoo.com/group/mukto-mona/message/33022

About the Author:

মুক্তমনার ফোরামের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই অপার্থিব এর সাথে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট। বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প সাহিত্য, যুক্তিবাদ অধিবিদ্যা তাঁর প্রিয় বিষয়। মুক্তান্বেষা সহ বিভিন্ন ম্যাগাজিনে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তার প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মুক্তমনা থেকে প্রকাশিত 'স্বতন্ত্র ভাবনা'তেও।

মন্তব্যসমূহ

  1. দিগন্ত মার্চ 1, 2012 at 2:17 পূর্বাহ্ন - Reply

    ” কোলকাতা কেন্দ্রিক উপভাষা বা ঘটী বাংলা মুখ্যত হুগলী-নদীয়া প্রভাবিত।”
    এইটা কোনও ভাবেই ঠিক না। কোলকাতার ভাষা আর হুগলীর ভাষা আলাদা, সেরকমই নদীয়ার ভাষাও আলাদা। পশ্চিমের লোক যেমন সারা পূর্বের ভাষাকেই বাঙাল ভাষা বলে তেমনই পূর্বের লোকও এর মধ্যে পার্থক্য দেখে না।

  2. নীল রোদ্দুর ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 10:53 পূর্বাহ্ন - Reply

    কিছুদিন আগে বাংলা পত্রিকা ব্লগ জুড়ে একটা বিতর্ক উঠেছিল, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা। সেই বিতর্কের ফলাফল কি জানিনা, বাঙ্গালী সবসময় কাজের চেয়ে কথা বলতে বেশী পছন্দ করে। যাই হোক, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা মানে আমি মনে করিনা বৈজ্ঞানিক শব্দগুলোকেও ধরে ধরে বাঙ্গাল করে ফেলতে হবে। কারণ, বৈজ্ঞানিক শব্দগুলো আসলে কোন ভাষার সম্পত্তি না, ঐগুলো যে ভাষারই হোক না কেন, বিজ্ঞানের জন্য ব্যবহৃত হয়, পৃথীবির সব ভাষার মানুষজন একই শব্দই ব্যবহার করে। এই ক্ষেত্রে আমার মতে দুটো পথ অবলম্বন করা যেতে পারে।

    ১. বিভ্রান্তি এড়াতে মূল শব্দটিই ব্যবহার করা, সেটা ল্যাটিন হোক, ইংরেজী হোক, বা ফ্রেঞ্চ হোক

    ২. বৈজ্ঞানিক শব্দের বাঙলা ব্যবহার করতে হল আগে একটি বাংলা বৈজ্ঞানিক শব্দের অভিধান করা, যাতে সবাই একই বৈজ্ঞানিক শব্দ ব্যবহার করতে এবং শিখতে পারে, অর্থের বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়ে যায়।

    • নিলীম ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 3:34 অপরাহ্ন - Reply

      @নীল রোদ্দুর,100% (Y)

  3. নীল রোদ্দুর ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 10:25 পূর্বাহ্ন - Reply

    প্রবন্ধটি সুন্দর। প্রমিত ভাষার বযবহার নিয়ে আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ সমৃদ্ধ আলোচনা করেছেন। কিন্তু কিছু জায়গায় আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

    ১. আমরা বাঙ্গালীরা যখন বাংলা বলি আমাদের দৈনন্দিন ব্যাপারে, তখন আমাদের কথায় বাংলা, ইংরেজী এবং হিন্দী এর মিশ্রন থাকে।

    ক. আমি যখন স্কুলে পড়তাম, ২০০০ সালে, তখন আমার স্কুলের সহপাঠীদের মাঝে আমার হিন্দী না জানা, না বুঝতে পারা রিতীমত হাসির ব্যাপার ছিল। অনেকটা এমন অবস্থা, বাংলাদেশে থাকি, ঢাকায় একটা ভালো স্কুলে পড়ালেখা করি অথচ হিন্দী জানিনা, তা ভাবাই যায় না। অথচ, আমার পড়ালেখা, কার্যক্রম কোনকিছুতে হিন্দীর কোন প্রয়োজন নেই, ছিল না।

    পাকিস্থান শাসনের অধীনে, স্কুলে উর্দূ পড়া বাধ্যতামূলক ছিল, তখন সেটা চাপিয়ে দেয়া ব্যাপার ছিল। এখনকার ছেলেমেয়েরা উর্দূ পড়ে না স্কুলে, কিন্তু উর্দূ/হিন্দিতে স্বতস্ফূর্ত ভাবে কথা বলতে পছন্দ করে। আমার ধারণা, আমাদের সিলেবাসে যদি আরো কিছুদিন পরে বাংলা ইংরেজী এর পাশাপাশি আবার হিন্দী/উর্দূ চালু করতে চাওয়া হয়, তাহলে আজকের বর্তমান সমাজ তাতে আপত্তি করবে না। ৬০ বছরে ভাষা আন্দোলন তার মূল্য হারিয়ে ফেলল। ভাষা আন্দোলন কেবল একটা গর্ব করার মতন অতীত ঘটনা, পৃথিবীর আর কোনদেশের মানুষ ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি, আমরা দিয়েছি।

    খ. শিক্ষিত বাঙ্গালীরা যখন প্রবাসে আসে, তখন তাদের নিজেদের মধ্যে বলা কথা শুনে অবাঙ্গালীদের ধারণা হয়, এরা ওদের নিজস্ব ভাষা এবং ইংরেজী মিলিয়ে মিশিয়ে কথা বলে। কথাটা খুব বেশী সত্যি। অথচ একই সাথে আমার স্প্যানিশভাষী বন্ধুরা যখন কথা বলছে, তারা স্প্যানিশের সাথে ইংরেজী মিশিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে পরিবেশন করছে না। কোরিয়ান বন্ধুরা যখন কথা বলছে, তখন ইংরেজী মিশিয়ে কথা বলছে না। চীনারা যখন কথা বলছে, তখনও তারা ইংরেজী মিশিয়ে কথা বলছে না। এখান থেকে কি এটাই বোঝা যায় না, বাংলা ভাষা ব্যবহারের চেয়ে আমরা ইংরেজী ব্যবহারে আগ্রহী বেশী। অন্যদের ক্ষেত্রেও ভাষার রূপ বদলাচ্ছে, কিন্তু বদলেও আসলে স্প্যানিশ স্প্যানিসই থাকছে, যেখানে আমাদের বাংলাভাষা বদলে গিয়ে বাংলিশ হচ্ছে।

    গ. অনেকে হয়ত বলতে পারে, আমরা একই সাথে বাংলা হিন্দী ইংরেজী ব্যবহার করি বলে তিনটি ভাষার ব্যবহারেই আমরা সমান পারদর্শী হয়ে উঠছি। এর পালটা যুক্তি হল, একসাথে তিনটি ভাষা ব্যবহার করে আসলে আমরা কোন ভাষাই ভালো করে শিখছি না। আমরা না পারি ভালো করে বাংলা বলতে, শুদ্ধ ইংরেজী বলতে, না পারি হিন্দী/ উর্দূ বলতে। যে বহুভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠতে চায়, তার অন্তত একটি একটি করে ভাষা ভালো করে শেখা উচিত, জগাখিচুড়ি ভাষার বদলএ

    ঘ। বর্তমানে এই জগাখিচুড়ি ভাষাটিই ফেসবুক নির্ভর তরুণ সমাজের কথ্যভাষা হয়ে গেছে।

    ২। প্রত্যেকটা দেশের বিভিন্ন আঞ্চলে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা থাকে। সেইগুলো সেসব অঞ্চলের ঐতিহ্য। আমরা একটি প্রমিত ভাষা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা থেকে তাদের ঐতিহ্য কেড়ে নিতে পারিনা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললে আমি কিছুই বুঝতে পারিনা, কারণ প্রমিত বাংলায় আমার অভ্যস্ততা। কিন্তু চট্টগ্রামবাসী মুখের ভাষা আমার জন্য বদলে ফেলার পক্ষে আমি নই।

    ৩। আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা, একই অঞ্চলের মানুষের মাঝে একধরণের নৈকট্যের বন্ধন, যারা সেই অঞ্চলের না তাদের সাথে স্বাভাবিক ভাবেই সেই নৈকট্য প্রকাশ পায় না। তেমনি, “আপ্নেরে কইছিলাম ঐডা করতে, করছেন আপ্নে?” এইভাবে যারা নিজেদের মধ্যে ব্লগে কথা বলে, তারা আসলে নিজেদের মধ্যকার নৈকট্যই প্রকাশ করতে চান পরষ্পরের কাছে। খেয়াল করে দেখুন এখানে কিন্তু কোন ভিন্ন ভাষা নেই। বাংলা ভাষাকেই আঞ্চলিক টানে বলার চেষ্টা। এখানে আমি অনৌচিত্যের কিছু দেখিনা।

    ৪। বর্তমানে ব্লগে একধরণের ফেসবুকিয় ভাষা চালু হয়েছে, লাইকালাম, পোষ্টাইলাম, পোষ্টামুনে, ধইন্যা ইত্যাদি, যা আসলে প্রমিত বাংলাও নয়, আঞ্চলিক বাংলাও নয়, সরাসরি বিকৃত বাংলা। এটা যারা করছে, তারা বাংলার ক্ষতি করছে, ব্লগকে যেখানে সাহিত্যের অংশ হিসেবে দেখা হয়, সেইখানে, ফেসবুকীয় বিকৃত বাংলায় কথা বলা কতটা স্বাস্থকর?

    ৫। আরেক রকমের বাংলা আছে, এফএম রেডিও বাংলা, যারা বাংলা শব্দকে বিকৃত করে উচ্চারণ করে। তাদের উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে হাইকোর্টের আদেশ এসে গেছে, ভাষাদূষণ বন্ধে।

    • কিশোর ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 12:00 অপরাহ্ন - Reply

      @নীল রোদ্দুর,

      ভালো বলেছেন। আমার মনে হয় আমাদের কাউকে না কাউকে সত্যিকারের বহু-ভাষা পারদর্শী হয়ে, যারা বাংলা, ইংরেজি,হিন্দির মিশেলে (বাংরেজি, বাংদি , বাংহিন্দ্রেজি অথবা ” বাট-ছো-লাইক”) কথা বলে নিজেদের জাহির করতে চায় তাদেরকে প্রচণ্ড ভাবে লজ্জা দেওয়া উচিত। তারা কথা বলার যে মূহুর্তে অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি উচ্চারণ করবে, তখন সাথে সাথেই তাদের সাথে বিশুদ্ধ ইংরাজিতে (কোন একটা ইংরেজি মাতৃভাষা-ভাষীদের টানে (with native american/british/australian etc. accent) )অনর্গল যেকোনো বিষয়ে (রাজনীতি, দর্শন, ধর্ম, সাহিত্য বা বিজ্ঞান…)কথা বল শুরু করুন। আর তাদেরকেও আমন্ত্রণ জানান — বাংলা পছন্দ না হলে আসুন শুধু ইংরেজি বা শুধু হিন্দিতেই কথা বলি। আমার ধারনা অনেকেই এতে ধাক্কা খেয়ে লজ্জিত হবে এবং পরমুহুর্তে যখন আপনার শুদ্ধ, সুন্দর বাংলা শুনবে তখন সে আপনার প্রতি শ্রদ্ধায় হোক, তার নিজের অপারগতার লজ্জাতেই হোক “জগাখিচুড়ি না পাকিয়ে যেকোনো এক ভাষায় ভালো ভাবে কথা বলার গুরুত্ব” হয়ত অনুধাবন করতে পারবে। —আপাত নির্ঝঞ্ঝাট এই ধাক্কাটা আমাদের দিতে শিখতে হবে।

      • অপার্থিব ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 1:00 অপরাহ্ন - Reply

        @কিশোর,

        যে কোন ভাষায় বলা লেখার সময় অন্য ভাষার মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার দৃষ্টিকটু ও অনাবশ্যক, সেটা ইংরেজী বা হিন্দি হোক। আর অন্য ভাষার অল্প ব্যবহার করতে হলে আমি ইংরেজী আর হিন্দিকে একই কাতারে ফেলতে অনিচ্ছুক। প্রথমত ইংরেজী কার্যত (DeFacto) আন্তর্জাতিক ভাষা। হিন্দি নয়। তাই ইংরেজী ভাষার একটা গুরুত্ব আছে। তাই কিছুটা ইংরেজী মেশান (বিশেষ করে যখন প্রয়োজন হয়ে পড়ে) দোষণীয় বলে দেখি না। কিন্তু হিন্দি, উর্দু এগুলিকে বাংলায় অনাবশ্যকভাবে ঢোকান আমার কাছে কুরুচিপূর্ণ লাগে। আর তা ছাড়া উর্দু (যা প্রায় হিন্দির সমান) একসময় তো বাংলাকে সরিয়ে চাপানোর চেষ্টাও হয়েছিল। আগে আমরা আয়া বা ঝি জানতাম গৃহস্থালীর কাজের জন্য নিয়োজিত মহিলাদের উল্লেখ করার জন্য। এখন হিন্দি বা উর্দু শব্দ “বুয়া” ব্যবহৃত হচ্ছে।

    • মোঃ আকরাম হোসেন ডিসেম্বর 22, 2017 at 2:46 অপরাহ্ন - Reply

      ভাল লাগল আপনার বাংল ভাষা নিয়ে ভাবার জন্য আমাদের উচিৎ আমাদের ভাষাটাকে ঠিক করে বলা।

  4. কিশোর ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 1:51 পূর্বাহ্ন - Reply

    @অপার্থিব

    কতগুলি ইংরেজী শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ নেই (অভিধানে) বলে আমার জানা। এটা কি বাংলার সীমাবদ্ধতা, নাকি বাঙ্গালী জাতির সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতা। যেমন Appreciate করার কোন বাংলা প্রতিশব্দ নেই। যদিও ধন্যবাদ আছে। তাহলে কি বাঙ্গালী মানসে Appreciate করার ধারণা নেই? বাস্তব জীবনে আমি এর ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনেক সময় অনুভব করি, বাংলা না জানায় ইংরেজীতেই বলতে হয়। এটাকে আমার মনে হয় বাংলা ভাষা বা সংস্কৃতির একটা দুর্বলতা হিসেবে দেখতে হবে। আরও কিছু বহুল ব্যবহৃত ইংরেজী শব্দ যার বাংলা প্রতিশব্দ নেই তার উদাহরণঃ
    adjust, perfection, intellectual (adjective), oxymoron, academy, overlap, worthwhile

    এক ভাষার সব শব্দের যথার্থ প্রতিশব্দ অন্য ভাষায় থাকার আশা করাটা একটু বেশি চাওয়া। তবে সেসব অনুপস্থিত শব্দের ভাব অন্যভাবে প্রকাশ করা যায়। বাংলার “পরশ্রীকাতর” শব্দটা এক শব্দে ইংরেজিতে বোঝানো না গেলেও একাধিক শব্দবিন্যাসে(a person who’s jealous of other’s fortune) তা সম্ভব বৈ কি? তবে কোন একদিন ইংরেজিতে “ফরসিক্যাথর” ( porshekathor) নামে বাংলা বংশোদ্ভূত কোন শব্দের আবির্ভাব হলে বেশ মজাই পাব ।

    appreciate শব্দটার মানে বা ব্যাখ্যা ইংরেজিতে খুঁজলে একাধিক ক্রিয়াবাচক শব্দ পাওয়া যাবে। যেমনঃ appreciate==to recognize and enjoy; to recognize or show awareness of sb’s good quality. তাই আমার মনে হয় এর বাংলা প্রতিশব্দে একের অধিক শব্দ ব্যাবহার করে মোটামুটি ভালো অনুবাদ করা যায়। যেমন:
    I really appreciate your help == ১) আপনার সাহায্যকে সত্যিই সাধুবাদ/ধন্যবাদ জানাই।
    You can’t fully appreciate foreign literature in translation == অনুবাদ পড়ে বিদেশি সাহিত্যের মর্ম পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় না।
    I really appreciate a good cup of tea == এক কাপ/পেয়ালা ভালো চা-এর মজা আমি সত্যিই উপভোগ করি / ভালো চা আমি খুবই উপভোগ করি।

    adjust এর প্রতিশব্দ হিসাবে “সমন্বয় করা”, “নিয়ন্ত্রণ করা” -র পাশাপাশি “মানানো”, “মানিয়ে নেয়া”, “খাপ খাওয়া”, মিশতে পারা” ইত্যাদি যোগ করা যায়।

    perfection এর আভিধানিক অর্থ “পূর্ণতা”, “নিখুঁত” ইত্যাদি অপ্রতুল মনে হলে “সর্বাঙ্গ সুন্দর” করা যেতে পারে।

    intellectual (adjective) e.g. intellectual deed == বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ ?

    academy –Bangla Academy এর বাংলা কি “বাংলা ভাষা পরিষদ” হতে পারে? academyএর আভিধানিক প্রতিশব্দ “শিক্ষায়তন” ও কিন্তু ফেলে দেওয়ার মত না।

    overlap(verb) == “অধিক্রমণ করা”, overlap(noun) ==” প্রাবরণ” ইত্যাদি যথেষ্ট না হলে “দ্বন্দ্ব পূর্ণ” বা “সাংঘর্ষিক” করা যেতে পারে।

    worthwhile এর আভিধানিক প্রতিশব্দ “সময়োপযোগী” বা “প্রয়োজনীয়” কি সঠিক নয়?

    oxymoron শব্দটা ২০০০ সালের Oxford English to English Dictionary তেও খুঁজে পেলাম না। তবে তার অর্থে “স্ব-বিরোধী” কেমন শোনায়?

    আসলে ব্লগ, ইন্টারনেট, সংবাদপত্রে প্রতিনিয়ত যে নতুন শব্দাবলী (OOV == Out of Vocabulary) সৃষ্টি হচ্ছে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগ্রহ করে অভিধানে রূপ দেওয়ার গবেষণা ও প্রযুক্তি অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। বাংলা ভাষাতেও এই ধরনের গবেষণা ও অভিধান খুব জরুরি।

    • স্বাধীন ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 10:03 পূর্বাহ্ন - Reply

      @কিশোর,

      (Y)

    • অপার্থিব ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 12:30 অপরাহ্ন - Reply

      @কিশোর,

      তবে সেসব অনুপস্থিত শব্দের ভাব অন্যভাবে প্রকাশ করা যায়।

      হ্যাঁ যায়, কিন্তু একাধইক শব্দ দিয়ে। আমার পয়েন্টটা ছিল একশব্দে করা যায় না। আরেকটা পয়েন্ট হল একই শব্দেরই প্রসঙ্গ অনুযায়ী অর্থের হেরফের হয় ইংরেজীতে। Appreciate বিভিন্ন প্রসঙ্গে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সেক্ষেত্রে বাংলায় ওই ভিন্ন প্রসঙ্গের জন্য ভিন্ন বাংলা শব্দ ব্যবহার করতে হচ্ছে। একই কথা বলা যায় Adjust এর বেলায়ও। Adjust শব্দ দিয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গে ভিন অর্থে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু বাংলায় সেই একই ভিন্ন প্রসঙ্গগুলিতে “সমন্বয় করা”, “নিয়ন্ত্রণ করা” , “মানানো”, “মানিয়ে নেয়া”, “খাপ খাওয়া” ইত্যাদি ব্যবহার করতে হচ্ছে।

      পরিষদ Council এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ইতিমধ্য প্রবর্তিত। তাই Academy এর বাংলা হতে পারে না

      আর আমি বলতে চাইছিলাম অভিধানে নেই। নিজেরা তো যা ইচ্ছে তা ব্যবহার করতেই পারি। এটাকে সরকারীভাবে করতে হবে। যেটা প্রমিতকরণের অর্থ। আর আমি দুই বাংলার সমন্বিত প্রমিতকরণের পক্ষে।

      overlap(verb) == “অধিক্রমণ করা”, overlap(noun) ==” প্রাবরণ”

      অধিক্রমণ কোন অভিধানে আছে কি? থাকলেও overlap অর্থে। আর প্রাবরণ মানে ঢেকে দেয়া বা আচ্ছাদন । আমি overlap বলতে দুই সমষ্টির (Set) মধ্যে সাধারণ এক সমষ্টির কথা বোঝাচ্ছিলাম।

      • কিশোর ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 6:24 অপরাহ্ন - Reply

        @অপার্থিব,

        তবে সেসব অনুপস্থিত শব্দের ভাব অন্যভাবে প্রকাশ করা যায়।–

        হ্যাঁ যায়, কিন্তু একাধইক শব্দ দিয়ে। আমার পয়েন্টটা ছিল একশব্দে করা যায় না।

        হ্যাঁ, আপনার পয়েন্টটা হয়ত আমি বুঝেছি। কিন্তু আমার পয়েন্ট অন্য জায়গায়। সেটা হল, বিদেশি কোন একটি শব্দের প্রতিশব্দ অন্যভাষায় এককথায় না থাকা কি সেই ভাষার সীমাবদ্ধতা? ভাষা বা সংস্কৃতির দুর্বলতা ? যেমনটা আপনি বলেছেন?

        কতগুলি ইংরেজী শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ নেই (অভিধানে) বলে আমার জানা। এটা কি বাংলার সীমাবদ্ধতা, নাকি বাঙ্গালী জাতির সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতা। ……এটাকে আমার মনে হয় বাংলা ভাষা বা সংস্কৃতির একটা দুর্বলতা হিসেবে দেখতে হবে।

        “দুর্বলতা” বলার চেয়ে একে আমার কাছে ভাষার “বৈশিষ্ট্য” বলাটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়। তারপরেও যদি এই শব্দহীনতাকে আমরা সীমাবদ্ধতা,দুর্বলতা হিসাবে ধরে নিই তাহলে তা আমার জানামতে সব ভাষাতেই থাকার কথা। তাই বলে কি সব ভাষা-ভাষীরা অন্য সব বিদেশি ভাষা থেকে “নতুন শব্দ” হুবহু আমদানি করা শুরু করবে? ভাষা হিসাবে চীনা অনেক প্রাচীন এবং পৃথিবীর এক বিরাট জনসংখ্যা এই ভাষায় কথা বলে। এখানকার অনেক শব্দ পাওয়া যাবে, যার যথাযথ ইংরেজি প্রতিশব্দ নেই।একই কথা উলটোভাবেও খাটে। তাই বলে এই দুই ভাষায় “নিজেরা শব্দ উৎপাদন করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে বিদেশ থেকে সরাসরি আমদানির নিয়ম” নেই বললেই চলে। সবাই হয়ত জানেন যে , চীনা, জাপানী, কোরিয়ান সহ অনেক ভাষাতেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বিষয়ক নিজস্ব ভাষা আছে। তাতে তাদের অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই বেশি হয়েছে। আমরা কিন্তু প্রথম থেকেই “Computer” কে “বিজলি-গণক” বা “Algorithm” কে “গণন্যোপায় == গণনার উপায়” বানানোর সাহস দেখাতে পারি নি। আমাদের তার প্রয়োজনও পড়ে নি। আমাদের বড় ভাগ্য যে বাংলার ৫০টা বর্ণ দিয়ে পৃথিবীর বেশিরভাগ মনুষ্য উচ্চারণগুলো আমরা লিখে ফেলতে পারি। ইংরেজির মাত্র ২৬ টা বর্ণ বা উচ্চারণ-বানানে অনেক গরমিল থাকার বৈশিষ্ট্য গুলোকে আমাদের কাছে হয়ত “সীমাবদ্ধতা” বা “দুর্বলতা” বলে মনে হয় না।

        আরও একটা ব্যাপার উল্ল্যখযোগ্য তা হল “Appreciate” এর মতো যেসব শব্দ দিয়ে একাধিক অর্থ করা যায় তার ব্যাবহারে সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধাও আছে। “Computer related Natural Language Processing” এ এগুলোকে “ambiguous” বা “দ্ব্যর্থ” শব্দ বলা হয়। স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ (Machine Translation), তথ্য উত্তোলন (Data Minning), স্বয়ংক্রিয় প্রশ্নোত্তর (Automatic Q&A) ইত্যাদিতে ভাষার এই “ambiguous” শব্দগুলো অনেক ঝামেলা করে। যেমন: He went to the bank. বাক্যটির আগে পিছে কিছু না দেখে কম্পিউটার প্রোগ্রামের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন যে এর মানে “সে ব্যাংকে গিয়েছিল” হবে না কি “সে নদীর তীরে গিয়েছিল” হবে। এরকম অনেক উদাহরণ রয়েছে। এখানে কিন্তু প্রতিটি ভাবের জন্য আলাদা আলাদা শব্দের উপস্থিতি কাম্য, এক শব্দ দিয়ে অনেক ভাব প্রকাশ নয়।

        আর আমি বলতে চাইছিলাম অভিধানে নেই। নিজেরা তো যা ইচ্ছে তা ব্যবহার করতেই পারি। এটাকে সরকারীভাবে করতে হবে। যেটা প্রমিতকরণের অর্থ। আর আমি দুই বাংলার সমন্বিত প্রমিতকরণের পক্ষে।

        এখানে আপনার সাথে আমি একমত। ভাষা এবং সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল। তাই মূল ঠিক রেখে, মৌলিকত্ব, স্বকীয়তা বজায় রেখে, ভাষা এবং সংস্কৃতির “প্রয়োজনীয়, নিজেদের সাথে মানানসই এবং যুক্তিযুক্ত” পরিবর্ধন করতে হবে। কোনক্রমেই অন্ধ অনুকরণ নয়।

        অধিক্রমণ কোন অভিধানে আছে কি? থাকলেও overlap অর্থে। আর প্রাবরণ মানে ঢেকে দেয়া বা আচ্ছাদন । আমি overlap বলতে দুই সমষ্টির (Set) মধ্যে সাধারণ এক সমষ্টির কথা বোঝাচ্ছিলাম।

        আমার কাছের অভিধান গুলো অনেক পুরনো। আপনি Samsad English to Bengali Dictionary তেই overlap এর বাংলা “অধিক্রমণ” পাবেন। আপনি গণিতে “set” এর যে ধারনার কথা বলেছেন তা কিন্তু আপনি নিজেই খুব সুন্দর করে বাংলা করেছেন—“সাধারণ-সমষ্টি” । এখন শুধু দরকার আপনার কথামতো এই ধরনের শব্দগুলো সর্বসম্মতিক্রমে ধরে ধরে “অভিধান” কারাগারে পুরে ফেলা।

        overlap শব্দটির দিকে একটু খেয়াল করলে সহজেই বোঝা যায় তা “over==উপরে, অধি” এবং “lap == অবস্থান, অধিস্থাপন” দুটো স্বতন্ত্র শব্দ দিয়ে তৈরি যার সাথে মূল “set == সমষ্টি” এর প্রাথমিক ধারনার কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু ইংরেজি ভাষাবিদরা প্রয়োজন মতো কোন একটি ধারনাকে শব্দে রূপদানের জন্য নিজেদের শব্দ-ভাণ্ডার হাতড়িয়ে নতুন শব্দ তৈরি করেন যা আমাদের কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়। আমার প্রশ্ন হল আমরা কেন ঐসব শব্দের প্রতিশব্দে নিজেদের শব্দ-ভাণ্ডার ব্যাবহারের চেষ্টা করি না?
        overlapped set এর যদি ছবি আঁকেন তাহলে তাকে “অধিক্রমণ==কিছুকে আচ্ছাদিত করে প্রসারিত হওয়া, আংশিক আবরণ” বললে কি খুবই ভুল হয়? আর তা বেশি কঠিন বা অপ্রচলিত ঠেকলে আপনার বলা “সাধারণ-সমষ্টি” ও কি ব্যাবহার করা যায় না?

        • অপার্থিব ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 9:31 অপরাহ্ন - Reply

          @কিশোর,

          “দুর্বলতা” বলার চেয়ে একে আমার কাছে ভাষার “বৈশিষ্ট্য” বলাটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়। তারপরেও যদি এই শব্দহীনতাকে আমরা সীমাবদ্ধতা,দুর্বলতা হিসাবে ধরে নিই তাহলে তা আমার জানামতে সব ভাষাতেই থাকার কথা।

          (১) আমি উপরোক্ত মন্তব্যটা শুধু “Appreciate” এর বেলায় করেছিলাম। কারণ আমি “I appreciate your help” এই বাক্যের বাংলা অনুবাদ করতে পারছি না। কাছাকাছি আছে ঠিকই, আমি আপনার সাহায্যের প্রশংসা করি (Praise/Applaud), ধন্যবাদ দেই (Thank), মূল্য দেই(Value) ইত্যাদি। আমরা সবাই এই ইংরেজী বাক্যের শব্দটির ভাবার্থ বুঝি আশা করি। “Appreciate” এর এই ভাবটির আমি বাংলা কোন প্রতিশব্দ পাচ্ছি না। অথচ এটার ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তাটাও বোধ করি। এটাই বলতে চেয়েছি।
          (২) অন্য ভাষায় যে সীমাবদ্ধতা নেই, সেরকম ইঙ্গিত কখনই করিনি। সেটা সেই ভাষাভাষী মানুষের জন্য বিবেচনা করার ব্যাপার।

          overlap : আমরা অনেক সময় বলতে চাই “There is lot of overlap between these two cases/..” এটার বাংলা কিভাবে করবেন এক কথায়? এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে অনেক “সাধারণ সমষ্টি” আছে উপযুক্ত মনে হচ্ছে না। আর সাধারণ সমষ্টি এক শব্দও নয়। “অধিক্রমণ” আছে বলাও এখানে উপযুক্ত নয় যাহোক ভাষার (সব ভাষার) সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, সেটা মেনে নিয়েই সমস্যা নিরসনের বা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা বাঞ্ছনীয়।

          • কিশোর ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 10:18 অপরাহ্ন - Reply

            @অপার্থিব,

            overlap : আমরা অনেক সময় বলতে চাই “There is lot of overlap between these two cases/..” এটার বাংলা কিভাবে করবেন এক কথায়? এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে অনেক “সাধারণ সমষ্টি” আছে উপযুক্ত মনে হচ্ছে না। আর সাধারণ সমষ্টি এক শব্দও নয়। “অধিক্রমণ” আছে বলাও এখানে উপযুক্ত নয়

            হুম, এরকম অনেক সমস্যা আছে ভাষার অনুবাদে । “There is lot of overlap between these two cases” == এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে অনেক “সাধারণ দিক”আছে/ এই দুই ঘটনার মধ্যে অনেক “সাদৃশ্য” আছে। “এক শব্দ” সাদৃশ্য তে কি কিছুটা সমাধান হয়? যদি না হয়, আপনার সমাধানটা কী? “এই দুই ঘটনার মধ্যে “ওভারল্যাপ” আছে” ? কোনটা আপনার কাছে সবদিক থেকে বেশি যথাযথ মনে হয়? ভাষার সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েও একজন মাত্র মাতৃভাষা শেখা শিশুকে কোন বাক্যটা শেখানো উচিত এবং কেন?

            ১ক) এই দুই ঘটনার মধ্যে অনেক “সাদৃশ্য” আছে। ১খ) এই দুই ঘটনার মধ্যে “ওভারল্যাপ” আছে” ।

            ২ক) আপনার সাহায্যকে সাধুবাদ/ধন্যবাদ/কৃতজ্ঞতা জানাই ২খ) আপনার সাহায্যকে “এপ্রিসিএইট” ।

            (এপ্রিসিএইট নিজেই একটা ক্রিয়াবাচক শব্দ। তাই “এপ্রিসিএইট করা” নিশ্চয় বলা ঠিক হবে না?)

            যাহোক, আপনার সাথে আলোচনা করে ভালো লাগলো। আপনার লেখার অনেক ক্ষেত্রেই আমার সহমত। সময় দিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

  5. কাজি মামুন ফেব্রুয়ারী 21, 2012 at 11:11 অপরাহ্ন - Reply

    @রূপম ভাইয়া,
    আপনার আলোচনা খুব উপভোগ করলাম। আপনার যুক্তিগুলো এত ক্ষুরধার আর শানিত থাকে যে, প্রতি মন্তব্য করা কঠিন হয়ে যায়! আপনার উপরের আলোচনার সাথে আমি দ্বিমত করার মত কোন জায়গা খুঁজে পেলাম না।

  6. আহমেদ সায়েম ফেব্রুয়ারী 21, 2012 at 2:05 অপরাহ্ন - Reply

    @অপার্থিব
    বাঙলা ভাষায় এমনিতেই বিদেশি শব্দ কম নয়। তার পর বলছেন আরো শব্দ প্রবেশ করলে ক্ষতি নেই ।কিংবা কোনো কোনো বাঙলার প্রতিশব্দ নেই, তা ঠিক যথাযথ বহু প্রতিশব্দ বাঙলায় নেই। কিন্তু তৈরি করে চালু করতে ক্ষতি কী! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙলায় বেশ কিছু পরিভাষা চালু করতে সক্ষম হয়েছেন।এ সব শব্দ যে পরিভাষা সেটা আজ আর সাধারণ পাঠক/মানুষের মনেই হয় না।যেমন- আবাসিক, অনাবাসিক, অনীহা, অতিপ্রজ, অপপাঠ, আঙ্গিক, জনপ্রিয়, নাব্য,প্রতিলিপি, যথাযথ,সংলাপ, ইত্যাদি তাঁর তৈরি পরিভাষা। তাই আমরা যদি পরিভাষা তৈরি করে এবং এর যথাযথ ব্যবহার চালু করতে পারি এবং মনের দীন দূরে ঠেলে। তাহলে ক্ষতিটা কোথায়! বর্তমানের আরেকটি নমুনা তুলে ধরছি, অধিকাংশ উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত মেয়ে-ছেলে যেভাবে কথা বলছে-“আমি প্রাকটিক্যালি এ বিষয়ে টোটালি ইগনোরেন্ট। উনি রিকোয়েস্ট করেছেন বলেই ওকে বলেছিলাম , ওকে আই উইল ডু ইট।বাট আমার ফরম দ্য বিগেনিং এ বিষয় হেজিটাশন ছিল…এ ধরনের বাঙলা বলে তাঁরা খুব গর্ববোধ করেন। তাছাড়া অকারণে ‘সো” “বাট’ এর ব্যবহার তো আছেই।এভাবেই বাঙলা ভাষা বর্তমানে জগাখিচুরির অবস্থায় আছে ।বর্তমানের প্রামাণ্য চলিত ভাষাও এক সময় মুখের ভাষাই ছিল। ধন্যবাদ।

  7. রূপম (ধ্রুব) ফেব্রুয়ারী 21, 2012 at 11:34 পূর্বাহ্ন - Reply

    যখন বাংলাদেশ বা বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর সবাইকে শ্রোতা করে কিছু বলা বা লেখা হয় (যেমন এই ব্লগে) তখন অবশ্যই প্রমিত ভাষা ব্যবহার করা উচিত।

    উচিত? এই ঔচিত্য কীসের সাপেক্ষে নির্ধারণ হচ্ছে বলবেন কি? কথা বোঝাটাই তো আসল কথা। যেমন আমি যদি কইরা খাইয়া এই ভাষায় বলি তাহলে বোঝে না এমন কাউকে বাংলা ব্লগে এখনো দেখি নি। ফলে বোঝাবুঝির বাইরে আলাদা

    তাদেরকে অসম্মান করাও বটে

    এতো মান সম্মান দেখা গুরুত্বপূর্ণ কেনো বলবেন কি? মোহাম্মদ বেড়াল বলা মুসলমানদের প্রতি যেরকম অসম্মান করা, সেইরকম কিছু কি? তা সেরকম অসম্মান তো অনেককিছুতেই ঘটে। আমার প্রতিটি বাক্যেও দৈনিক পঞ্চাশজন মানুষের অসম্মান ঘটে বলে জানতে পেরেছি।

    যে দেশ বা সমাজের জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ভাষা বা উপভাষার উপগোষ্ঠীতে বিভক্ত সেখানে সবার জন্য এক প্রমিত ভাষা নির্ধারণ করা জরুরি, বাস্তবসম্মত ও গণতান্ত্রিক।

    এটাতো একটা ডিডাক্টিভ ‍বক্তব্য দিলেন। যেনো না হলেই নয়। কিন্তু এটা না করলে কিন্তু তেমন ক্ষতি নেই। একই দেশে বিভিন্ন ভাষা থাকতে পারে। সেটার উপর একটা চাপানো জরুরি কেনো? লজিকটা অনেকটা জিন্নাহ যেমন সমগ্র পাকিস্তানে কেবল উর্দু থাকা দরকার যেভাবে ভেবেছিলেন, তেমন ধরনের কি? ধরুন কানাডায় কুইবেকে চলে ফ্রেঞ্চ, কিন্তু বাকি জায়গায় ইংরেজি। খুব ক্ষতির কিছু হয় না এতে। সব সরকারি ইংরেজি বক্তব্য কুইবেকে ফ্রেঞ্চে অনুবাদিত হয়ে প্রচার হয়। তেমনই প্রমিতকরণ করে সবার উপর চাপিয়ে না দিয়ে অন্য উপায় নেই? আর সবার জন্যে একই চুলের ছাঁট জাতীয় জিনিস কিন্তু গণতান্ত্রিক নয়, কর্তৃত্ববাদী, একনায়কতান্ত্রিক।

    রেডিও বা টেলিভিশনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলের লোক সাহিত্য, সঙ্গীত বা নাটককে ভিত্তি করে অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে যে যার নিজের অঞ্চলের বা গোষ্ঠীর উপভাষাকে জাতীয় স্তরে বা সাধারণ শ্রোতার উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করতে চাইলে সেটাকে সঙ্কীর্ণ আঞ্চলিকতাবাদ বা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ হিসেবে দেখা উচিত, যা পরিহার করা বাঞ্ছণীয়।

    মানে আপনি ভাবছেন রেডিও টেলিভিশন কোনো সরকার বা গোষ্ঠির একক সম্পত্তি, তারাই নির্ধারণ করবে যে কী প্রচার হবে আর কী হবে না? সাহেব বিবি গোলামের বাক্সের মতো? সেটাকেও আবার গণতান্ত্রিক বলবেন নিশ্চয়ই? যদিও তেমন গণমাধ্যম আচরণে সর্বৈব একনায়কতান্ত্রিক, নিয়ন্ত্রণবাদী, অ-গণতান্ত্রিক। গণতন্ত্রে সরকার নির্ধারণ করে দেয় না কার সংস্কৃতিটা প্রতিফলিত হতে পারে, কতোটুকু হতে পারে। মানুষের সাংস্কৃতিক ইচ্ছাই সরাসরি সেখানে প্রতিফলিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। গণতান্ত্রিক সরকার জনগোষ্ঠিকে, তার ইচ্ছাকে সার্ভ করে, কন্ট্রোল করে না। কারণ জনগণই সেখানে সকল ক্ষমতার উৎস। সরকার সেখানে জনগণের চেয়ে আলাদা কোনো নির্ধারক গোষ্ঠি নয়। সে জনগণের, তাদের ইচ্ছার প্রতিনিধি। মানুষ যেটা চাবে, সেটা প্রতিফলিত হবে গণতান্ত্রিক গণমাধ্যমে। এবং গণমাধ্যম সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকারও সেখানে প্রয়োজন নেই। সবচেয়ে প্রকৃষ্ট গণতন্ত্র হলো যদি জনগণ সরাসরি অংশ নিতে পারে। অর্থাৎ আপনিই আপনার চ্যানেল খুলতে পারেন। সেখানে আপনার এবং আপনার গোষ্ঠির মত প্রচার করতে পারেন।এবং অন্যরাও। এখানে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়া মানে জনগণের ইচ্ছাকে আটকে দেওয়া।

    সঙ্কীর্ণ আঞ্চলিকতাবাদ পরিহার করা কেনো বাঞ্ছনীয়? এতে সমস্যা কোথায়? কার তোষণের জন্য আঞ্চলিকতাবাদ পরিহার করতে হবে?

    অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরে এক উপভাষা ধীরে ধীরে সৃষ্ট হচ্ছে যা সবার জন্য বলে চাপানোর এক সূক্ষ্ণ চেষ্টা করা হচ্ছে, সবার জন্য এক সাধারণ উপভাষা হিসেবে। এটা বিশেষ করে ঢাকা কেন্দ্রিক এক সংস্কৃতি, ঢাকা অঞ্চলের উপভাষাই এতে প্রাধান্য পায়। যদিও এর অনেক শব্দাবলী অনেক আঞ্চলিক ভাষাতেই বিদ্যমান। এটাকে সাধারণভাবে বাঙ্গাল ভাষাও বলে অনেকে। কিন্তু এটাকে প্রমিত ভাষা বা সবার জন্য সাধারণ উপভাষা বলে মেনে নেয়ার কোন যৌক্তিক কারণ নেই।

    যেহেতু প্রমিত ভাষাটা ধর্মগ্রন্থের মতো অবশ্য পালনীয় কিছু না, ফলে ওই উপভাষাটাকে ‘বিজ্ঞজনেরা’ প্রমিত ভাষা হিসেবে মেনে না নিলেও তেমন কিছু আসবে যাবে না। কারো বেহেস্তে যাওয়া নাকচ হবে না।

    ঢাকা কেন্দ্রিক আলাদা কোন আঞ্চলিক ভাষাকে প্রমিত ভাষা বা সবার জন্য এক সাধারণ উপভাষা হিসেবে চালু করার কোন প্রয়োজন দেখিনা।

    এখানে আপনার বয়ানে এটাই আবার উচ্চারিত হলো যে ‘চালু করার’ জন্যে যেনো বিশেষ কোনো গোষ্ঠি দায়িত্বপ্রাপ্ত। ভাষা যেনো কোনো রাজন্যের নির্দেশমতো চলার আজ্ঞা প্রাপ্ত। এছাড়া ভাষা কখনো বহে নি, বইতে পারে না। কিন্তু এভাবে দেখছেন না যে ভাষা কেউ চালু করে না। এটা বেঁচে থাকে মানুষের মুখে। মানুষ সেটাকে ভেবেচিন্তে চালু করে না। ভেবে চিন্তে ভাষা কখনো চালুও হয় না। কারো এখতিয়ারও নেই একটা জনগোষ্ঠির মুখে কোন ভাষা চালু থাকবে সেটা নির্ধারণ করে দেওয়ার। জিন্নাহ ভেবেছিলো তার আছে। ফলে জিন্নাহ আর তার বৃহৎ পাকিস্তানের খুব ভালো হাল হয় নি। ভাষার সাথে চালু অচালু শব্দটা বেমানান। এটা কর্তৃত্ববাদী ভাবনা। ভাষা কারো দখলে নেই যে সে নির্ধারণ করবে এটা চালু করা যায় কি যায় না।

    অনেক মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী, বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎকারে, বক্তৃতায় বা সরকারী ভাষ্যে আঞ্চলিকতা ব্যবহার করেন। এটাও দুঃখজনক।

    কার জন্যে দুঃখজনক? বোঝা গেলে কার সমস্যা কোথায়? নিজের মুখের ভাষা ব্যবহার করলে অন্যের কীসে দুঃখ হয়? না বোঝা গেলে অবশ্য দুঃখ পেতেই পারেন। তবে কেবল অচ্ছুৎভাব থেকে দুঃখ পেলে সেই দুঃখ নিবারণের জন্য প্রমিত ভাষায় কথা বলার কারো বাধ্যবাধকতা নেই। প্রমিত ভাষায় কথা বলাটা একটা আর্ট, সেটা করা গেলো হয়তো চমৎকার ব্যাপার। কিন্তু সেটা করার বাধ্যবাধকতা নেই। সবাইকে যেমন শিল্পী হবার বাধ্যকতা নেই।

    ইতিমধ্যে এই আঞ্চলিক ভাষা ঢাকার টিভি চ্যানেল গুলির অনেক নাটকেও ব্যবহৃত হচ্ছে, যদিও নাটকগুলি বাংলাদেশের সব দর্শকদের লক্ষ্য করে প্রচারিত হয়। এর কোন সঙ্গত কারণ দেখি না।

    আবার সেই একই ভাবনা যে প্রচার করার নিয়ন্ত্রণ যেনো কারও হাতে ন্যস্ত।

    আমার সঙ্গে দ্বিমত হবেন বা আপত্তি তুলবেন হয়ত অনেকে। কিন্তু এটা আমার মত বা রুচির প্রতিফলন বলে বিতর্কের খুব সুযোগ নেই।

    আছে। রুচি হচ্ছে ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনি বলতে পারেন যে ওই ভাষার নাটক আপনি দেখতে পছন্দ করেন না। সেটাকে তখন বলা যায় রুচির প্রতিফলন। কিন্তু তাতে বিতর্কের সুযোগও সত্যিই থাকে না, কারণ যেটা ভালো লাগে না, সেটা না দেখার সুযোগ আপনার আছে। ওগুলো দেখতে আপনি বাধ্য না। আপনি চ্যানেল ঘুরাতে পারেন। সরকারি চ্যানেল তো আছেই, যেখানে সরকার আপনাকে সম্পূর্ণ প্রমিত ভাষায় সব প্রোগ্রাম দেখার ব্যবস্থা করে রেখেছে সরকারি চ্যানেলে। কিন্তু আপনি বলছে যে ” সব দর্শকদের লক্ষ্য করে প্রচারিত হয়। এর কোন সঙ্গত কারণ দেখি না” অর্থাৎ অন্য প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরা যেমন আমি টিভি চ্যানেলগুলোতে কী দেখার অধিকার রাখি, সেটার কোথায় সঙ্গতি কোথায় অসঙ্গতি, সেটা নিয়ে আপনি এখানে মন্তব্য করছেন। অন্যের ব্যাপারে মন্তব্য করছেন। সেটা তো ব্যক্তিগত রুচির বাইরে একটু বেশি কিছুই।

    যতক্ষণ আপনার অধিকার লঙ্ঘিত না হচ্ছে, ততক্ষণ অন্যের ব্যাপারে সঙ্গতি নির্ধারণের আপনার এখতিয়ার কোথায়?

    কোন কোন প্রসঙ্গে ইংরেজী ব্যবহারের বিরুদ্ধে মাত্রাহীন খুঁতখুঁতানিরও কোন সঙ্গত কারণ নেই বলে মনে করি।

    এবার কিন্তু আপনি কন্ট্রাডিক্ট করছেন। আপনি আন্তর্জাতিকতার কারণে ইংরেজিকে পাশমার্ক দিচ্ছেন। আঞ্চলিকতার কারণে বাঙ্গাল ভাষাকে দিচ্ছেন ফেল। এভাবেই বুঝি সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার ঘটে। 🙂

    ১৯৪৮ এ প্রমিত বাংলা ভাষার উপরই আক্রমণ করা হয়েছিল। কোন উপভাষার উপর নয়। জিন্নাহ বলেছিলেন পুর্ব পাকিস্তান নিজেদের জন্য যেটা ইচ্ছা সেই ভাষাই বেছে নিতে পারে, কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানের বা বাংলাদেশের উপভাষার উপর কখনো আক্রমণ হয়নি। উপভাষার কোন বিকৃতি হয় নি বা করার চেষ্টাও কেউ করে না। চট্টগ্রাম, সিলেট বা রাজশাহীর উপভাষা অতীতে যেমন ছিল এখনো তেমনই আছে। ১৯৪৮ সালে পশ্চিম অংশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তান সরকার প্রমিত বাংলা ভাষাকেই আক্রমণ করেছিল।

    মানতে পারছি না। সম্পূর্ণ বাংলাভাষার উপরই আক্রমণটা ছিলো। “চট্টগ্রাম, সিলেট বা রাজশাহীর উপভাষা অতীতে যেমন ছিল এখনো তেমনই আছে”, তেমনি প্রমিত বাংলার ক্ষেত্রেও তো তাই সত্য। এথেকে এই সিদ্ধান্তে কীভাবে আসছেন? যথেষ্ট যুক্তিতর্ক দেন নি। বাঙালির মুখের ভাষা প্রমিত না। ৫২তে কিন্তু আমরা বলেছি, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’। চট্টগ্রাম, সিলেট বা রাজশাহীর উপভাষা কি মুখের ভাষা না? সেই আন্দোলন কেবল প্রমিত ভাষা বলা কোনো এলিট গোষ্ঠির ছিলো না, বরং আপামর জনগোষ্ঠির আন্দোলন ছিলো নিজ নিজ মুখের বাংলা ভাষাটাকে রক্ষা করতে। তার বিপরীতে আপনার এই কথাটা সত্যের অপলাপ। ইতিহাসে ইনোভেশান। প্রতিটা ভাষা যে তার সকল ভ্যারিয়েশান সহ গঠিত, এটা মনে হয় ধরতে পারছেন না। আপনার চোখে বাংলা ভাষা = প্রমিত বাংলা ভাষা। বাকিগুলো ‘উপভাষা’। হীন। অনেকটা যেনো কম বাংলা ভাষা। এই ঐতিহাসিক অপলাপের মাধ্যমে আপনি প্রমিত বাংলা ভাষার পক্ষে রাজনৈতিক শক্তি বর্ধন করার চেষ্টা করলেন, যেটার প্রয়োজন ছিলো না।

    ১৯৭১ এর আগে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু ও বাংলা ছিল কিন্তু উর্দু ও বাংলার ৫০-৫০ মিশ্রণে কোন জগাখিচুড়ী ভাষা তৈরী করা হয় নি।

    পাকিস্তানে কী করা হয়েছে, সেটা কেনো আলোচ্য? এভাবে বলি, যদি পাকিস্তানে জগাখিচুড়ী ভাষা তৈরি করা হতো, তাহলে সে যুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করতেন?

    সেখানে প্রমিত বাংলা ভাষা বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা হিসেবে লিখতে ও বলতে অসুবিধা হবে কেন।

    বাহ্। বাংলাদেশে যাদের মাতৃভাষা বাংলা নয়, তাদের অসুবিধা হবে না? তাদের কথা ভুলেই গেলেন? নাকি আপনি ওদের মুখের ভাষাও কেড়ে নিতে চান। মহান বাংলাদেশ রাষ্ট্র নামক বুজুর্গ ঈশ্বরের দাপ্তরিক সুবিধা ও জাতিগত ঐক্যের জন্যে এটুকু বলি তো করাই যায়, নাকি?

    আপনার সম্পূর্ণ লেখাটাই অবরোহী। ভাষা সম্ভাবনাকে বর্ধন করে। ভাষার সম্ভাবনা অবারিত। আর আপনি করছেন সীমিত। আপনি করছেন নির্ধারণ। সমাজ ও সংস্কৃতিতে অবরোহী চিন্তা বারংবার এভাবে বিপর্যস্ত হয়।

    আমি প্রমিত ভাষার বিপক্ষে না। কিন্তু একটার প্রচারের জন্যে যখন অন্যগুলোকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ে, বিশেষ করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে, তখন সেটার বিরোধিতা জরুরি হয়ে পড়ে। আমি মানুষের যেকোনো স্বতস্ফূর্ত নিরপরাধ প্রকাশেরই পক্ষে। সেটাকে রোধ করে এমন ঢালাও ব্যবস্থার বিপক্ষে। আমি জানি আপনি বলছেন এই সবই আপনার ব্যক্তিগত মত। তো আমারগুলোও কিন্তু তাই। 🙂

    প্রমিত ভাষার প্রয়োজনীয়তা যদি অন্যগুলোকে নিয়ন্ত্রণের আভাস ছাড়া প্রকাশ করা যায় তাহলে উত্তম হয়। লেখায় কোনো কোনো অংশে তেমনটা করেছেনও। প্রমিত ভাষার প্রয়োজনটা রাজনৈতিক নয়। যোগাযোগের জন্য। কিন্তু সেটা একটা উপায় হিসেবে উপস্থাপিত হবে। লোকে একে এর উৎকর্ষ আর সুবিধার কারণে ব্যবহার করবে। বাধ্য করে মানুষের মুখে প্রমিত অপ্রমিত কোনো ভাষাই ঢোকানো যায় না। হিতে বিপরীতই বরং হতে পারে তাতে।

    ভাষা দিবসে ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে – সকল মানুষের নিজ নিজ মুখের ভাষা প্রকাশের অধিকার সমুন্নত থাকুক, তার বিস্তারের সকল সুযোগ অবারিত হোক – সেই আশাই ব্যক্ত করছি।

    • রৌরব ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 5:28 পূর্বাহ্ন - Reply

      @রূপম (ধ্রুব),
      সংবিধান বা আইন রচনায় বা রাষ্ট্র সমর্থিত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রমিত ভাষার ব্যবহার বা বাংলা একাডেমী জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

      • রূপম (ধ্রুব) ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 7:57 পূর্বাহ্ন - Reply

        @রৌরব,

        যতক্ষণ বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার অস্তিত্ব আছে পাশাপাশি, রাষ্ট্র সমর্থিত শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে ঠিক কারো উপর বল তো আরোপ হয় না। বাংলা একাডেমী তো গুরুত্বপূর্ণ। আমি উপরেই বলেছি

        প্রমিত ভাষার প্রয়োজনটা … যোগাযোগের জন্য। … সেটা একটা উপায় হিসেবে উপস্থাপিত হবে। লোকে একে এর উৎকর্ষ আর সুবিধার কারণে ব্যবহার করবে।

        তো সেই প্রস্তাবনাটা তৈরির জন্যেই বাংলা একাডেমীর মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মানুষ তার যোগাযোগের সুবিধার জন্যেই প্রমিত ভাষার দ্বারস্থ হবে। কিন্তু কনসার্নগুলো যদি যোগাযোগ না হয়ে ঐক্য, সঙ্গতি ইত্যাদি হয়, তাহলে সেটা হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকাটা গর্হিত নয়। তবে একটা রাজনৈতিক মত বলপ্রয়োগে সবার উপরে আরোপটা গর্হিত বটেই।

        সংবিধানের ব্যাপারটা তো আমার কাছে আরোপ মনে হচ্ছে না। যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে এখানে, অন্য ভ্যারিয়েশনকে দমন করার জন্যে তো আর প্রমিত ভাষায় সংবিধান লেখা হচ্ছে না।

        আপনার মতামতটা?

    • স্বাধীন ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 10:03 পূর্বাহ্ন - Reply

      @রূপম (ধ্রুব),
      (Y)

    • অপার্থিব ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 11:16 পূর্বাহ্ন - Reply

      @রূপম (ধ্রুব),

      প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া, যার সম্ভাবনা আমি লেখাতেই উল্লেখ করেছি। আমার নিজস্ব মত বা যুক্তি তাতে প্রভাবিত হচ্ছে না। তবে মনোযোগের সাথে পড়েছি। কিছু ব্যাখ্যা তাও প্রয়োজন কারণ একাধিক পাঠক উপরের সমালোচনার সাথে ১০০% একমত। “উচিত” শব্দটা অনেকভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। কেউ এতে সাম্রাজ্যবাদ,কর্তৃত্ববাদ, একনায়কতন্ত্র ইত্যাদির গন্ধ পান, তাই আমি “উচিত” এর স্থান “বাঞ্ছনীয়” প্রতিস্থাপন করে দিয়েছি মূল পোস্টে যাতে ভুল ব্যাখ্যা না করা হয়(যায়) আমার মতকে। সরকারী কর্মচারী, মন্ত্রীদের ভাষ্যে প্রমিত ভাষা ব্যব্যহার না করায় দুঃখ প্রকাশ আমার মত যারা সাধারণ বোধ বা যুক্তি শেয়ার করে তাদের জন্যই। এটা তো উহ্য। এর কারণ হল করদাতাদের টাকায় স্কুলে প্রমিত ভাষা শুদ্ধভাবে উচ্চারণ ও বানানের জন্য সরকারী টাকা, শ্রম ও সময় ব্যয় হচ্ছে। পরীক্ষায় ফেল করছে অনেক ছাত্র ভুলের জন্য। অপ্রমিত ভাষা যদি সব জায়গাতেই গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে এই সবই অর্থহীন অপচয় হয়ে দাড়ায়।

      প্রমিত ভাষার প্রয়োজনীয়তা যদি অন্যগুলোকে নিয়ন্ত্রণের আভাস ছাড়া প্রকাশ করা যায় তাহলে উত্তম হয়

      অন্যগুলো বলতে আর কোন প্রমিত ভাষা বলছেন? সেটা কোনটা? আমিতো উপভাষা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে কোন আভাস তো দেই নি বরং তা সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধকরনের পক্ষেই মত দিয়েছি। শুধু উপভাষার কোনটিকেই বা তাদের সংমিশ্রণে সৃষ্ট নতুন কোন ভাষাকে বিদ্যমান প্রমিত ভাষাকে সরিয়ে নতুন প্রমিত ভাষার সৃষ্টি বা স্থান দেয়ার বিপক্ষে। এটা এত স্পষ্ট করে বলার পরেও ভুল ব্যাখ্যা করায় বিস্মিত হলাম।

      বাংলাদেশে যাদের মাতৃভাষা বাংলা নয়, তাদের অসুবিধা হবে না?

      চাকমাদের কথা বলছেন বোধহয়। সব ভাষাকেই প্রমিত মর্যাদা দিলে বাংলাদেশের সব সরকারী ঘোষণা, কাগজ ও দলিলপত্র বাংলা, চাকমা ইত্যাদি সব ভাষায় করতে হয়। আমি তো চাকমাদের “তোরা বাংগালী হয়ে যা” এর পক্ষপাতী নয়। কিন্তু একটা দেশে একটাই প্রমিতভাষা থাকা বাঞ্ছনীয় ও বাস্তবসম্মত। বিশেষ করে অস্বচ্ছল দেশের জন্য। কানাডায় ইংরেজী ও ফরাসী দুটোই সরকারী ভাষা হওয়াতে দুই ভাষাতেই সব কাজকর্ম চালাতে গিয়ে করদাতাদের উপর একটা আর্থিক চাপ পড়ছে। কানাডা বলেই সেটা পুষিয়ে নিচ্ছে। এটা অনুকরণীয় কোন উদাহরণ নয়। আর কোন দেশ এতটা সম্পূর্ণ অর্থে দ্বিভাষিক কিনা আমার জানা নেই।

      আপনার চোখে বাংলা ভাষা = প্রমিত বাংলা ভাষা। বাকিগুলো ‘উপভাষা’। হীন।

      ভুল ব্যাখ্যা। আমাই বলেছি বাংলা ভাষা = প্রমিত বাংলা ভাষা + উপভাষা
      উপভাষা (নয়) প্রমিত ভাষা

      আপনার মতে উপভাষাও একটা প্রমিত ভাষা । আমাদের মতের পার্থক্যটা স্পষ্ট।

      যতক্ষণ আপনার অধিকার লঙ্ঘিত না হচ্ছে, ততক্ষণ অন্যের ব্যাপারে সঙ্গতি নির্ধারণের আপনার এখতিয়ার কোথায়

      সঙ্গতি নির্ধারণের এখতিয়ার আমার নেই বা দেয়া হয়নি। এটা অনাবশ্যক প্রশ্ন। অতিপ্রতিক্রিয়া। অসঙ্গতিটা আমার সাধারণ বোধ বা যুক্তিতে। সেটা বহুবার বলেছি পোস্টে। যাইহোক আপনার যুক্তি অনুযায়ী স্কুলে কেউ ইউনফর্ম না পরে আসলেও কিছু আসে যায় না, কোথাও বানান ভুল হলেও (পরীক্ষাতেও) কিছু আসে যায় না (কার অধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে?)। আর কত উদাহরণ চান। সেই পিচ্ছিল ঢালের কথা চলে আসে। শেষ পর্যন্ত এটা এনার্কিজমে (বিশৃংখলবাদ) গিয়ে শেষ হয়। সেটা অবশ্য এনার্কিস্টদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বা স্বপ্ন।

      আমি যেকোনো স্বতস্ফূর্ত নিরপরাধ প্রকাশেরই পক্ষে

      অনেক স্বতস্ফূর্ত নিরপরাধ প্রকাশই আমদের দেশেই শুধু নয় অনেক উন্নত দেশেও নিষিদ্ধ বা বাঁকা চোখে দেখা হয়। এত উদাহরণ আছে যে উল্লেখ করার দরকার নেই। আর আমি কোথাও নিষিদ্ধকরণের কথা বলিনি, ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে অসঙ্গত বলে মত দিয়েছি। আপনি জনগনের কথা বলেছেন। যেন আমার অবস্থান তার বিপক্ষে। কোন কিছু নিষিদ্ধকরণ বা অনুমোদন একটা গণতান্ত্রিক দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ্যের ঐক্যমতে এক বিশেষ প্রক্রিয়ার (পার্লামেন্টে বিলে পাশ ইত্যাদি) মাধ্যমে হয়। আমি সেটারই পক্ষপাতী। রাস্তার জনপ্রিয়তা বা ব্যক্তি বিশেষের আদেশে নয়। এই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যা কিছুই নির্ধারিত হয় আমরা তা মেনে নিতে বাধ্য আমার আপনার সেটা পছন্দ হোক বা না হোক, এখানে আপনার আমার কারো কোন বিশেষ প্রিভিলেজ নেই।

      • রূপম (ধ্রুব) ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 1:21 অপরাহ্ন - Reply

        @অপার্থিব,

        অন্যগুলো বলতে আর কোন প্রমিত ভাষা বলছেন?

        অন্যগুলো প্রমিত বলি নি, উপরের বাক্যে তেমনটা বোঝাই নি।

        আপনার মতে উপভাষাও একটা প্রমিত ভাষা ।

        সে কথাও কোথাও বলি নি।

        আপনার যুক্তি অনুযায়ী স্কুলে কেউ ইউনফর্ম না পরে আসলেও কিছু আসে যায় না, কোথাও বানান ভুল হলেও (পরীক্ষাতেও) কিছু আসে যায় না (কার অধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে?)।

        এখানে রাষ্ট্র বনাম প্রতিষ্ঠানের ক্ল্যাসিকাল একটা ভুলটা করছেন। রাষ্ট্র একটা নিয়ম চাপিয়ে দেয়া আর প্রতিষ্ঠান চাপিয়ে দেয়া এক কথা নয়। রাষ্ট্র যদি ধরুন বলে যে স্কুলে টাই পড়া যাবে না, তাহলে টাই কোনো স্কুলেই পড়া যায় না। ফলে এতে সে বস্তুত নাগরিকের পরিধেয় নির্ধারণ করে দিচ্ছে। একটা বিশেষ স্কুল যদি বলে টাই পড়া যাবে না, তাহলে আপনার সুযোগ আছে অন্য স্কুলে গিয়ে টাই পড়ার, যদি চান। অর্থাৎ একটা প্রতিষ্ঠান সাধারণ অর্থে নাগরিকের পরিধেয় নির্ধারণ করে দিচ্ছে না। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তার গণ্ডির ভেতরে অন্যের অমতে শারীরিক বা সম্পত্তিগত ক্ষতিসাধন করে না তেমন নিয়মকানুন করতে পারে। এতে সার্বিক অর্থে সম্ভাবনা সীমিত হয় না। কারণ সেটা সার্বিক আরোপ নয়। স্থানীয়। তাই একটা প্রতিষ্ঠান বিশেষের আরোপ করা নিয়মে আমার সমস্যা নেই। আমার ভালো লাগলে সেই নিয়ম মানবো, না লাগলে ওই প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে অন্যত্র যাবো। কিন্তু রাষ্ট্র একটা বিশেষ নিয়ম আরোপ করে দিলে সমস্যা থাকতে পারে, কারণ সেটা যদি আমার পছন্দনীয় বিষয় হয়, তাহলে সেটা দেশের সর্বত্রই পরিত্যাগ করতে হবে।

        আমার যুক্তি থেকে – “বানান ভুল হলেও (পরীক্ষাতেও) কিছু আসে যায় না” – এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় না। বরং এটা বলা যায় যে, কোনো স্কুলে যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে বানান ভুলের জন্যে তার স্কুল নম্বর কাটবে না, সেটা সে করতে পারে। রাষ্ট্রের বলে দেয়ার কিছু নেই যে এখন থেকে সকল প্রতিষ্ঠানে বানান ভুলের জন্যে নম্বর কাটতে হবে। সরকারের নিয়ন্ত্রনাধীন পরীক্ষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ারে নেই, ফলে সেটার প্রসঙ্গ আসে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে। কিন্তু কোনো বিশেষ স্কুল সিদ্ধান্ত নিতেই পারে যে সে তার অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় নম্বর কাটবে না, বা উপরের ক্লাসে কাটবে না, বা অর্ধেক নম্বর কাটবে, বা প্রতি দশটা ভুলে একটার নম্বর কাটবে। এবং এরকম ভ্যারিয়েশানই ঘটে। আপনার সন্তানকে অমন স্কুলে না পাঠাতে চাইলে কেউ তো বাধ্য করবে না। তবে সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানই বানানের জন্যে নম্বর কাটা থেকে বিরত থাকে না কারণ সেটা না করাটা কমনসেন্স, নম্বর না কাটলে শিক্ষার্থী শেখে না, না শিখলে সেই প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকরা সন্তান পাঠান না। না পাঠালে স্কুল চলে না। খুব স্বাভাবিক নিয়মেই সিস্টেমটা চলে, কোথাও রাষ্ট্রীয় আরোপ ছাড়াই। রাষ্ট্রের এখানে আরোপের প্রয়োজনটা নেই।

        অপ্রমিত ভাষা যদি সব জায়গাতেই গ্রহণযোগ্য হয়

        আমি অপ্রমিত ভাষা সব জায়গায় গ্রহণযোগ্য হতে হবে বলি নি। বরং প্রমিত ভাষা সব জায়গায় বাধ্যতামূলকভাবে বলবৎ হবার বিরুদ্ধে বলেছি। আপনিও হয়তো সেটা বলেন নি। তবে আপনার উদ্বেগগুলো স্থানে স্থানে নির্ণয়মূলক, সীমিতকরণমূলক হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়েছে। কিন্তু সেটার ব্যাপারে আপনি দৃঢ় অবস্থানও নিতে অতোটা রাজি নন মনে হয়েছে। দেখুন, আপনি বলেছেন সবার জন্য প্রচার হওয়া চ্যানেলে আপনার অপছন্দের আঞ্চলিক ভাষার অনুষ্ঠান হবার সঙ্গতি নেই। কিন্তু সরাসরি বলতে চাচ্ছেন না যে সেগুলো প্রচার বন্ধ করে দেয়ার পক্ষে আপনি। কিন্তু বন্ধ না করে আপনার দেখা ‘অসঙ্গতি’টা দূর করবেন কীভাবে তাও বলেন নি। বলেছেন “আমি কোথাও নিষিদ্ধকরণের কথা বলিনি, ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে অসঙ্গত বলে মত দিয়েছি”, কিন্তু নিষিদ্ধকরণের পক্ষে ইঙ্গিতও দিয়েছেন

        অনেক স্বতস্ফূর্ত নিরপরাধ প্রকাশই আমদের দেশেই শুধু নয় অনেক উন্নত দেশেও নিষিদ্ধ বা বাঁকা চোখে দেখা হয়।

        এটা বলে। অর্থাৎ নিষিদ্ধ করা চলেই, শুধু আমি মুখ ফুটে বলছি না। 🙂

        তা আপনি না বলতেই পারেন। তাহলে চলুন নিষিদ্ধকরণ নিয়েই কথা বলি। আপনি বলছেন –

        কোন কিছু নিষিদ্ধকরণ বা অনুমোদন একটা গণতান্ত্রিক দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ্যের ঐক্যমতে এক বিশেষ প্রক্রিয়ার (পার্লামেন্টে বিলে পাশ ইত্যাদি) মাধ্যমে হয়।

        তাই? যেমন অধিকাংশ মানুষ মিলে ঠিক করলাম যে দাসপ্রথা চালু হোক, তাহলে দাস প্রথাও ফিরিয়ে আনা যাবে? বা একমাত্র ইসলাম ছাড়া অন্যান্য ধর্ম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা যাবে, দেশের অধিকাংশ নাগরিক তথা মুসলমানেরা যদি চায়? গণপ্রজাতন্ত্রে (যেমন,যুক্তরাষ্ট্রে বা বাংলাদেশে) সংখ্যাগরিষ্ঠ চাইলেই যেকোনো কিছু ভোট করে চাপিয়ে দিতে পারে না। তার চার্টার আছে, সাংবিধানিক কিছু মূলনীতি আছে। সেটাও হয়তো যুদ্ধ করে, দেশ বা ক্ষমতা দখল করে একসময় পরিবর্তন হয়। তবে সেটা নিয়মতান্ত্রিক কিছু না। কিন্তু আপনার ভাষ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ একমত হলেই যেনো হলো। সংখ্যাগরিষ্ঠ চাইলে তার পছন্দের বিষয় সংখ্যালঘিষ্ঠের উপর চাপিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এমন নয়। ফলে আমি একটা গণপ্রজাতন্ত্রের কথা বলছি, কিন্তু আপনার কাছে সেটা নৈরাজ্যের মতো লাগছে।

        প্রমিত ভাষার যোগাযোগগত প্রয়োজনীয়তাগুলো আরো আরো ক্ষুরধারযুক্ত যুক্তিসহ জানতেই আগ্রহী। রাজনৈতিক প্রয়োজনগুলো আরোপপ্রবণ ও দুরাশাযুক্ত।

        • অপার্থিব ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 3:17 অপরাহ্ন - Reply

          @রূপম (ধ্রুব),

          আমার ভালো লাগলে সেই নিয়ম মানবো, না লাগলে ওই প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে অন্যত্র যাবো।

          কিন্তু আপনার বক্তব্য ছিল “আপনার অধিকার লঙ্ঘিত না হচ্ছে, ততক্ষণ অন্যের ব্যাপারে সঙ্গতি নির্ধারণের আপনার এখতিয়ার কোথায়”। তাহলে আপনার সে যুক্তি অনুযায়ী স্কুলের কোন ছাত্র যদি ইউনিফর্ম পরে না আসে তাহলে ছাত্রটির ঐ নিয়ম লংঘনের কাজে অসঙ্গতি নির্ধারণের এখতিয়ার স্কুলের নেই। কিন্তু আপনি ঘুরিয়ে অন্যদিকে গিয়ে বলছেন সেই ছাত্র যদি নিয়ম না মানতে চায় তাহলে অন্য স্কুলে যেতে পারে। দুটো বক্তব্যের মধ্যে বিরাট তফাৎ। অর্থাৎ কার্যত আপনি ইউনিফর্ম পরার নিয়ম বাধ্য করার স্কুলের এখতিয়ার আছে কিন না সেই প্রশ্ন না তুলে (যেটা আপনার আগের যুক্তি বা মতের সাথে সাংঘর্ষিক) ছাত্রের (বা অভিভাবকের) উপর চাপিয়ে দিলেন কি করণীয় সেটা নির্ধারণ করার।

          আপনি এই ব্লগে প্রমিত বাংলা বলার পক্ষে আমার মতকে সমালোচনা করে এখতিয়ারের প্রশণ তুলেছিলেন। আপনার উপরের যুক্তি অনুসারে তাহলে ব্লগও তো অনেক আছে। প্রমিত ভাষায় বলতে অনিচ্ছুক কেউ অন্য ব্লগে যেতে পারেন বা উপভাষা ভিত্তিক ব্লগ বা ইন্টারনেট গ্রুপ তৈরী করতে পারেন, এবং হয়েছেও এরকম। যদিও এই ব্লগে এখনও তেমন কোন নিয়ম নেই, আমি কেবল আমার মত জানিয়েছিলাম।

          কিন্তু কোনো বিশেষ স্কুল সিদ্ধান্ত নিতেই পারে যে সে তার অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় নম্বর কাটবে না, বা উপরের ক্লাসে কাটবে না, বা অর্ধেক নম্বর কাটবে, বা প্রতি দশটা ভুলে একটার নম্বর কাটবে।

          আবারও সেই ঘুরিয়ে বলা। কোনো বিশেষ স্কুল সিদ্ধান্ত নিতেই পারে সেটা তো ঠিকই এবং অবান্তর আমাদের তর্কে। আপনার বক্তব্য বা যুক্তি ছিল যে যে কেউ বানান ভুল করলেও তাতে স্কুলের আপত্তি করার কথা না (অতয়েব নম্বর কাটাও উচিত না) । কারণ কারও অধিকার তো লংঘন হচ্ছে না। আপনার বেস লাইন (মূল কথা) ছিল কারও অধিকার লংহন হচ্ছে না এরকম যে কোন কাজ করার অধিকার সবার থাকা উচিত। অধিকার থাকলে তো নম্বর কাটা বা জরিমানা করা, প্রতিবাদ করা কোনটাই করা যায় না।

          দেখুন, আপনি বলেছেন সবার জন্য প্রচার হওয়া চ্যানেলে আপনার অপছন্দের আঞ্চলিক ভাষার অনুষ্ঠান হবার সঙ্গতি নেই

          আমি বলেছি “আমার অপছন্দের”? এটা কি সঠিক উদ্ধৃতি হল? উদ্ধৃতি বিকৃত করার প্রয়োজন হল কেন?

          সবার জন্য প্রচারিত হলেও অনুষ্ঠানটা যদি কোন বিশেষ অঞ্চল বা উপভাষা কে ফীচার বা উদ্দেশ্য করে হয় সেটা তো হতে পারেই, সমস্যা নেই। কিন্তু সব শ্রোতাকে উদ্দেশ্য করে প্রচারিত হলে (যার বিষয় বস্ত কোন বিশেষ অঞ্চলের বা গোষ্ঠীর মানুষের জীবন নিয়ে নয়) তাত কোন বিশেষ অঞ্চলের বা উপভাষায় (আমার অপছন্দ কোনটাই নয়, প্রত্যেকের নিজস্ব স্থান আছে) উপর জোর দেয়াটা আমি অসংগত মনে করি। দ্বিরুক্তি করতে হল আপনার বিকৃত উদ্ধৃতির কারণে। আমার পোস্টে একই কথা বলছি।

          যেমন অধিকাংশ মানুষ মিলে ঠিক করলাম যে দাসপ্রথা চালু হোক, তাহলে দাস প্রথাও ফিরিয়ে আনা যাবে? বা একমাত্র ইসলাম ছাড়া অন্যান্য ধর্ম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা যাবে, দেশের অধিকাংশ নাগরিক তথা মুসলমানেরা যদি চায়? গণপ্রজাতন্ত্রে (যেমন,যুক্তরাষ্ট্রে বা বাংলাদেশে) সংখ্যাগরিষ্ঠ চাইলেই যেকোনো কিছু ভোট করে চাপিয়ে দিতে পারে না।

          পারে, সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে, তাত্ত্বিকভাবে। করা হয়নি বা হবে না সেটা অন্য ব্যাপার। পারে মানে আপনার আমার মতে সঠিক সেটা বলা হচ্ছে না। Is vs Ought Fallacy আপনার না বোঝার কারন নেই। গণতন্ত্রেও অনেক পদক্ষেপ আপনার আমার পছন্দ বা অনুমদিত নাও হতে পারে। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে তা মেনে না নেয়া ছাড়া আমাদের গত্যন্ত নেই। প্রকৃত গণতন্ত্রে অনেক কিছু না ঘটতে পারার (যেমন দাসত্ব প্রথা, অন্য ধর্ম নিষিদ্ধ করা) গ্যারান্টি থাকে। কিন্তু অনেক কিছুই আবার ঘটতে পারে। এরকম উদাহরণ আছে আমাদের দেশেই। আমি জনপ্রিয়তার কারণেই শুধু কোন আইন বা নিয়ম চালু করার বিপক্ষে আছি। কিন্তু গণতন্ত্রে জনগনের সংখ্যাগরিষ্ঠ্য প্রতিনিধিরাই যদি একমত হয়ে যদি কোন আইন বা নীতি চালু করেন তাহলে অনিচ্ছাসত্ত্বে তা মেনে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। কারণ প্রতিবাদ সে ক্ষেত্রে কাজ করে না। শুধু গণবিপ্লবের দ্বারাই তা ঠেকান বা বদলান যায়।

          • রূপম (ধ্রুব) ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 4:40 অপরাহ্ন - Reply

            @অপার্থিব,

            সর্বজনপ্রযোজ্য নিয়ম আর একটা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডির মধ্যে নির্ধারিত নিয়মের পার্থক্যকের কথা কিন্তু বোঝানোর চেষ্টা করেছি। টিভি চ্যানেলগুলোতে আপনার বলা “‘এই’ আঞ্চলিক ভাষা”র অসঙ্গতি কিন্তু স্থানীয় অর্থে নিশ্চয়ই বোঝান নি। রাষ্ট্রে সর্বজন প্রযোজ্য হিসেবেই বুঝিয়েছেন। অসঙ্গতির কারণে যদি অমন অনুষ্ঠান প্রচার বারণ করেন, বাংলাদেশের সকল নাগরিক এর ফল পাবেন। তারা ঘরের বাইরে থাকলেও পাবেন, ঘরে থাকলেও পাবেন। অন্যদিকে একটা প্রতিষ্ঠানে যদি টাই পড়তে বারণ করে, সেটা ওই প্রতিষ্ঠানের বাইরে যেহেতু প্রযোজ্য নয়, ফলে সর্বজনপ্রযোজ্যভাবে নিয়মটা আরোপিত নয়। আমি আমার ঘরে বা ওই প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্যত্র কী করছি সেটা তার এখতিয়ারে নেই, তার আদেশ সেটাতে প্রযোজ্যও হচ্ছে না। কিন্তু আমি যখন ওই প্রতিষ্ঠানের সীমানায়, তখন সেখানের ভেতরে নিয়মকানুন সে তৈরি করতে পারে বলেছি। ফলে “স্কুলের কোন ছাত্র যদি ইউনিফর্ম পরে না আসে তাহলে ছাত্রটির ঐ নিয়ম লংঘনের কাজে অসঙ্গতি নির্ধারণের এখতিয়ার স্কুলের ” আছে, কারণ স্কুলের চৌহদ্দির ভেতরে নিয়ম আরোপের এখতিয়ার স্কুলের আছে। এতে অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে না। সেটা আর রাষ্ট্রের সবার উপর একটা নিয়ম আরোপ তো এক বিষয় না। আমি কেবল রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বজন প্রযোজ্য আরোপের বিরুদ্ধেই বলেছি। একই কথা বানানের ক্ষেত্রেও।

            সব শ্রোতাকে উদ্দেশ্য করে প্রচারিত হলে (যার বিষয় বস্ত কোন বিশেষ অঞ্চলের বা গোষ্ঠীর মানুষের জীবন নিয়ে নয়) তাত কোন বিশেষ অঞ্চলের বা উপভাষায় (আমার অপছন্দ কোনটাই নয়, প্রত্যেকের নিজস্ব স্থান আছে) উপর জোর দেয়াটা আমি অসংগত মনে করি।

            এখন ধরুন সারোয়ার ফারুকীর একটা নাটক চলছে। আপনার কি মনে হয় সেটা সব শ্রোতার উদ্দেশ্যে প্রচারিত। টিভি চ্যানেলের একটা প্রোগ্রাম কি সব শ্রোতার উদ্দেশ্যে প্রচার হওয়া বাঞ্ছনীয়? বা ধরুন একটা চ্যানেল থাকতে পারে না যা মূলত নোয়াখালিভাষী কৃষকদের জন্য যেখানে সকল কথা-ই নোয়াখালি ভাষায়? তা সারা বাংলাদেশেই তো সেই চ্যানেল ধরবে। তা চ্যানেলটাতে যদি সরাসরি বলে না দেয় এই চ্যানেলটা কাদের জন্য, তাহলে কি আপনি ধরে নিবেন যে এটা সব শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে? একইভাবে এমন চ্যানেল থাকতে পারে না যেখানে কখনো প্রমিত, কখনো অপ্রমিত ভাষায় অনুষ্ঠান হচ্ছে। যদি না বলে দেয় ওই অনুষ্ঠান কাদের জন্যে, তাহলে কি আপনি সব শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে প্রচারিত ভেবে নিয়ে অসঙ্গত ভাববেন? নাকি নিজে নিজে ধরে নিবেন যে অনুষ্ঠানটা যাদের ভালো লাগে, শুধুই তাদের জন্য? কীভাবে নির্ধারণ করা যাবে যে কোন অনুষ্ঠান সব শ্রোতাদের জন্য?

            পারে, সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে, তাত্ত্বিকভাবে।

            কিন্তু আমি কিন্তু উপরেই বলেছি, গণ”প্রজা”তন্ত্রে (republic) তাত্ত্বিকভাবেই পারে না। Is এর কথাই বলছি, ought নয়। এটা গণপ্রজাতন্ত্র (republic) আর গণতন্ত্র (democracy) এর তাত্ত্বিক পার্থক্য। “এরকম উদাহরণ আছে আমাদের দেশেই”, সেটা করা হয়েছে সংবিধান, তত্ত্ব বহির্ভূত তথা অবৈধভাবে। আমরা তো নিয়মতান্ত্রিকভাবে কী করা সম্ভব সেটার কথাই কেবল বলছি।

            • অপার্থিব ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 5:31 অপরাহ্ন - Reply

              @রূপম (ধ্রুব),

              যদি না বলে দেয় ওই অনুষ্ঠান কাদের জন্যে, তাহলে কি আপনি সব শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে প্রচারিত ভেবে নিয়ে অসঙ্গত ভাববেন? নাকি নিজে নিজে ধরে নিবেন যে অনুষ্ঠানটা যাদের ভালো লাগে, শুধুই তাদের জন্য? কীভাবে নির্ধারণ করা যাবে যে কোন অনুষ্ঠান সব শ্রোতাদের জন্য?

              নাটক বা অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু,চরিত্র,পারিপার্শ্বিকতা (অভিজাত ড্রইং রুম, অফিস কক্ষ ইত্যাদি) স্পষ্টই নির্দেশ করে যে এটা কোন বিশেষ অঞ্চলের জন্য নয়, ঘোষণার প্রয়োজন নেই।

              কীভাবে নির্ধারণ করা যাবে যে কোন অনুষ্ঠান সব শ্রোতাদের জন্য?

              দুভাবে। (১) পূর্ব ঘোষণা দিয়ে। (২) নাটক, গান বা বা অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু, চরিত্র,পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা।

              “এরকম উদাহরণ আছে আমাদের দেশেই”, সেটা করা হয়েছে সংবিধান, তত্ত্ব বহির্ভূত তথা অবৈধভাবে।

              না সবই অবৈধভাবে হয়নি, বৈধভাবে অনেক কিছু করা হয়েছে যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। বাংলাদেশে অতীতে বৈধভাবেই সরকারের সমর্থক ৪ সংবাদপত্র ছাড়া আর সব কাগজই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল যেটা এখনও কাল দিবস বলে পালিত হয়। বৈধভাবে করা সব আইন বা নীতিই কি আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? কিন্তু মেনে নিতে হয়। এটাই বলতে চেয়েছি।

              • রূপম (ধ্রুব) ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 6:00 অপরাহ্ন - Reply

                @অপার্থিব,

                আমার তো মনে হয় যে “অভিজাত ড্রইং রুম, অফিস কক্ষ” এগুলো দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় যে এগুলো এলিট শ্রেণীর জন্যে তৈরি নাটক, সবার জন্যে নয়। কোনো অব্জেক্টিভ মানদণ্ড দিচ্ছি না, দেখাচ্ছি যে এভাবেও দেখা যায়। ফলে ব্যাপারটার অব্জেক্টিভিটির যথেষ্ট অভাব আছে। প্রতিটা নাটক যেটাকে আপনি আপনার বিবেচনায় বা কোনো বিশেষ মানদণ্ডে সব শ্রোতার জন্যে প্রচারিত হিসেবে নির্ণয় করবেন, সেটাকে আরেকজন আরেকটা মানদণ্ডে গোষ্ঠিবিশেষের জন্যে করা অনুষ্ঠান হিসেবে দেখাতে পারবে। আর হাতের পাঁচ তো আছেই যে পরিচালক শেষে এসে আপনার খড়গ থেকে বাঁচার জন্যে বলে দিবে যে আসলে এটা সব শ্রোতার জন্যে ছিলো না। তখন আপনার অস্ত্রশস্ত্র কিন্তু তার বিপরীতে অচল, কারণ সব শ্রোতার জন্যে না হলে আপনার সিস্টেমে সেটা পার পেয়ে যাবে।

                বাংলাদেশে অতীতে বৈধভাবেই সরকারের সমর্থক ৪ সংবাদপত্র ছাড়া আর সব কাগজই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল

                আমার ভাবনা হলো সেটা প্রজাতন্ত্র বিরুদ্ধ এবং ফলত অবৈধ ছিলো। আদালতের কাছে মতামত চাইলে ওই সংশোধনীটা অবৈধ ঘোষিত হবার আশা রাখি। এগুলো তর্কাতীত নয় বলছি না। বাংলাদেশটা নামে বা তত্ত্বে প্রজাতন্ত্র হলেও এখানে প্রজাতান্ত্রিক চর্চার অভাব তো আছেই। ফলে তত্ত্ববহির্ভূত ঘটনা ঘটে। তা, সংবিধানমতে যে মাত্র ৪টা রেখে বাকি সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা যে অবৈধ, সেটাকে যদি মনে করেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বৈধভাবে বা তাত্ত্বিকভাবে লঙ্ঘন করা যায়, একই যুক্তিতে কিন্তু তাহলে বাংলাদেশে ইসলাম বাদে অন্যসকল ধর্মকে নিষিদ্ধ করাও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সম্ভব আপনার মতে। এটাও তো সংবিধানে নিষিদ্ধ করা আছে। এক্ষেত্রে আপনার মতটা জানলে ভালো হয়।

                • অপার্থিব ফেব্রুয়ারী 22, 2012 at 8:36 অপরাহ্ন - Reply

                  @রূপম (ধ্রুব),

                  মার তো মনে হয় যে “অভিজাত ড্রইং রুম, অফিস কক্ষ” এগুলো দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় যে এগুলো এলিট শ্রেণীর জন্যে তৈরি নাটক, সবার জন্যে নয়

                  এলিটের অর্থ বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় অস্পষ্ট। এখন কালো টাকা, ঋণ খেলাপের দ্বারা বানান টাকায়, নিয়ম না মেনে ব্যবসা করে কাঁচা টাকা বানানোর দরুণ অভিজাত ড্রইং রুম অনেক অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত, যারা সাহিত্য সংস্কৃত বিজ্ঞানের কিছুই জানে না বা কদর করে না তাদেরই একচেটিয়া হয়ে গেছে। অতীতে জ্ঞানে গুণে সমাজের শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিদেরই এলিট বলা হত। আর এএখনকার অভিজাতেরা এলিটা হলেও এরা তো কোন বিশেষ অঞ্চলের নয়, সেটাই তো বিবেচ্য এখানে। অভিজাত ড্রইং রুম কোন বিশেষ অঞ্চলের বা উপভাষার লোকদের একচেটিয়া নয়। এখানে সামাজিক শ্রেণীভেদের কথা আলোচ্য নয়। তাছাড়া অফিস কক্ষে তো করণিক ও থাকে। এটাকে এলিটদের প্রতীক কেন বলবেন। আর আমার উদাহরণ সম্পূর্ণও নয়।

                  একই যুক্তিতে কিন্তু তাহলে বাংলাদেশে ইসলাম বাদে অন্যসকল ধর্মকে নিষিদ্ধ করাও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সম্ভব আপনার মতে। এটাও তো সংবিধানে নিষিদ্ধ করা আছে। এক্ষেত্রে আপনার মতটা জানলে ভালো হয়।

                  আমার মত তো আপনই উদ্ধৃত করেছেন। আপনার প্রশ্নটা কি সেটা আরো পরিস্কার করে বললে সুবিধা হয়। যাহোক হ্যাঁ সম্ভব সেরকম উদ্যোগ আইন প্রণেতারা নিলে আর সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যেরা এর পক্ষে ভোট দিলে। সংবিধান সংশোধনী তো এভাবেই আনা হয়। তবে আমি আইন বিশারদ নই। সাংবিধানিক আইনে অভিজ্ঞ কেউ এ ব্যাপারে আলোকপাত করতে পারেন। কিন্তু এটাতে আমি আপনি ও অনেকেই চরম মর্মাহত হব। তবে বাংলাদেশে এটা ঘটার সম্ভাবনা কম। এখানে বেশিরভাব রাজনীতিকেরা সাংবিধানিকভাবে অন্য ধর্মকে স্বীকৃতি দিয়ে সংখ্যালঘুদের শোষণ আর নিপীড়নে করতেই বেশি পছন্দ করে। দুদিকেই সুবিধা তাতে। সহনশীলতার একটা ফ্যাসাড বা চেহারা দেখান যায় আর আড়ালে সুবিধা আদায় করা যায়। এখানে সংখ্যালঘু বা দুর্বল গোষ্ঠীদের কে সহজেই শোষণ করা যায় পরোক্ষভাবে, অন্যদের দ্বারা বা ভাড়া করা মাস্তানদের দ্বারা।

                  • রূপম (ধ্রুব) ফেব্রুয়ারী 23, 2012 at 1:24 পূর্বাহ্ন - Reply

                    @অপার্থিব,

                    তা এমন হতে পারে না যে প্রতিটা অনুষ্ঠানই আসলে ওই গোষ্ঠির জন্যে যারা অনুষ্ঠানটাকে পছন্দ করবে? আগে থেকে বিচার করাও অসম্ভব সেই গোষ্ঠিটা ঠিক কী হবে। কোনো সুসংজ্ঞায়িত গোষ্ঠি হবারও বাধ্যবাধকতা নিশ্চয়ই নেই। আমি নিজেই নানান বিচারে নানান মাত্রার গোষ্ঠিতে পড়ি। সেসব গোষ্ঠি সুসংজ্ঞায়িত নয় বলে এমন নয় যে তাদের অস্তিত্ব থাকাটা গর্হিত। তো সেসব ঢিলেঢালাভাবে গঠিত গোষ্ঠির জন্যে অনুষ্ঠান বানানো কি সম্ভব নয়? এভাবে চিন্তা করা কি সম্ভব নয় যে প্রতিটা অনুষ্ঠানই হচ্ছে যাদের ভালো লাগবে তাদের জন্যে? সেভাবে ধরলে কিন্তু তখন এমন কোনো অনুষ্ঠানই থাকে না যেটাকে আপনার ‘সব শ্রোতার জন্যে প্রচারিত’ ক্যাটাগরিতে ফেলে ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে সে জায়গায় নসিহত করা সম্ভব।

                    তবে বাংলাদেশে এটা ঘটার সম্ভাবনা কম।

                    আমার মনে হয় সেটা ভাষায় শেকল পড়ানো বা নিয়মকানুন চালু করার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সম্ভাবনা অনেক না। সবচেয়ে বড় কথা ব্যক্তিঅধিকারকে শৃঙ্খলিত করতে আমরা কেনো যাবো? ভাষার যে ভ্যারিয়েশানগুলো আমার ভালো লাগে সেগুলো ব্যবহার করতে সেগুলো শুনতে নিশ্চয়ই আমি চাইব। যাদের লাগে না তাদের সেটা এড়ানোর সুযোগ যেহেতু আছে, তাহলে আমার এই সুযোগ বন্ধ করা কেনো প্রয়োজন? হ্যাঁ বানান ভুল করার মতো এগুলোর চর্চাও হয়তো ততোটা আমি স্কুল অফিসের মতো অনেক বদ্ধ প্রতিষ্ঠানে তাদের নিয়মকানুনের মধ্যে থেকে পারবো না। সেটা নিয়ে আমার আপত্তিও নেই। কিন্তু একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তার বিনোদনের জন্য বানানো অনুষ্ঠানে কী ভাষা শুনবে সেটা নির্ধারণ করে দেয়াটা কেমন?

                  • রূপম (ধ্রুব) ফেব্রুয়ারী 23, 2012 at 1:39 পূর্বাহ্ন - Reply

                    @অপার্থিব,

                    যাহোক হ্যাঁ সম্ভব সেরকম উদ্যোগ আইন প্রণেতারা নিলে আর সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যেরা এর পক্ষে ভোট দিলে। সংবিধান সংশোধনী তো এভাবেই আনা হয়।

                    আমি যদিও মনে করি না যে তেমনটা আদৌ বৈধভাবে সম্ভব, তা তেমন যদি ঘটতেই নেয়, বা তেমন ঘটার সম্ভাবনার কথা প্রস্তাবিত হয়, তাতে সংখ্যালঘিষ্ঠরা নিশ্চয়ই বৈধভাবেই বিশেষ করে ওই মুহূর্তে প্রদত্ত সাংবিধানিক অধিকারের বলেই এর প্রতিবাদে শামিল হবে। প্রাপ্তবয়স্কের ভাষা ব্যবহারে সর্বজনপ্রযোজ্যভাবে নিয়মকানুন আরোপটাও আমি সেই পর্যায়ের ব্যাপার মনে করি। তদুপরি সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠ মতও নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতটা কীসের পক্ষে যাবে সেটা বোঝাটাও মুশকিল হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ এভাবে হয়তো মানুষের সঙ্গত পোশাকও নির্ধারণ করে দিতে পারে, বা চুলের ছাঁট। আমার তাতে ঘোর সন্দেহ আছে। ব্যক্তিগতভাবে তেমনটা অনেকে অবশ্য মনে করতেই পারেন। তবে সেটার বাস্তবসম্মত প্রয়োগের সম্ভাব্যতা, এমনকি প্রয়োগের বৈধতা ক্ষীণ বলেই আমার মত। বিষয়ে বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত নিতে গেলে যে বহুত্ব ও বৈচিত্র্য লঙ্ঘিত হবে তা বলাই বাহুল্য। এবং অনেকে ভাবতে পারেন যে বৈচিত্র্যের সুযোগ নষ্ট হওয়াটা বেশ ক্ষতিকর। আর নিয়ন্ত্রিত বৈচিত্র্য ব্যাপারটা স্ববিরোধি একটা ধারণা। বৈচিত্র্য স্বতস্ফূর্ত হওয়াই সম্ভবত কাম্য।

  8. কাজী রহমান ফেব্রুয়ারী 21, 2012 at 8:49 পূর্বাহ্ন - Reply

    বাংলা ভাষা নিয়ে লিখেছেন দেখে খুব ভালো লাগলো।

    কষ্ট করে ভেবেচিন্তে লিখেছেন, ধন্যবাদ সেজন্য (C)

মন্তব্য করুন