কিশোর বয়স থেকেই পারস্যের এক কবিকে ভাল লেগে গিয়েছিল। নিজে নিজে তার কবিতার সাথে, কবির সাথে পরিচয় করার অতখানি ক্ষমতা আমার ছিল না। কবির নাম খৈয়াম- ওমর খৈয়াম। বাবা ফারসি জানতেন। তার কাছে মূল বইটাতো ছিলই, তারপরেও নজরুল, ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লার অনুবাদও তার কাছে ছিল। তাতেও সাধ না মেটায় কলকাতা থেকে অতি যত্নে ও আগ্রহে নরেন দেবের অনুবাদখানি সংগ্রহ করেছিলেন। এই বইখানি তার প্রিয় ছিল খুব- বুক দিয়ে আলগে রাখতেন তা। কারন ঐ সময় এই বইখানি বাংলাদেশে দুষ্প্রাপ্য ছিল। মাঝেমাঝে খুব আগ্রহ নিয়ে মজার সব কবিতা শোনাতেন আর বলতেন- এক হাজার বছর আগের মানুষ হয়েও কতখানি মূক্ত চিন্তার মানূষ ছিলেন খৈয়াম। তখন অতকিছু না বুঝলেও অল্প বুদ্ধিতে যা কুলাতো তা দিয়েই এক ধরনের ভাললাগা তৈরী হয়ে গিয়েছিল তার কবিতা ঘিরে। অবাক হয়ে দেখলাম কিশোর বয়সের সেই কিছুটা অবুঝ ভালবাসা এখনো অটুটই রয়ে গেছে। সত্যিই তাই।

বাবা বলতেন- দেখ, খৈয়াম আসলে মোটামুটি নাস্তিক ছিলেন। তার সময়ে সেটা প্রকাশ করা মোটেও সম্ভব ছিলনা। তাই সে কবি হিসাবে কোন পরিচিতি পায়নি । সংগে সংগে নরেন বাবুর অনুবাদ থেকে একটা প্রমানও হাজির করতেন।

মসজিদের ঐ মিনার থেকে
মোয়াজ্জিনের কন্ঠ শোন বলছে হেকে- ভাই,
মূর্খ তোদের ইপ্সিত ধন
কথাও যেরে নাই।

এই মূক্তচিন্তার মানুষটি পারস্যের নিশাপূরে জন্মগ্রহন করেন ১০৪৮ খৃষ্টাব্দে। অল্প বয়সেই পড়াশুনার জন্য তাকে যেতে হয় সমরখন্দে। পরে ঐ একই উদ্দেশ্যে চলে আসেন বোখারা। সেখানে তিনি মধ্যযুগের অন্যতম গনিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। এলজেবরার বহু সমস্যার সমাধান সম্বলিত একখানি বই তিনি রচনা করেন, যা সেই সময়ের গনিতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসাবে বিবেচিত হয়। একটা ত্রিঘাত (কিউবিক) সমীকরন কিভাবে জ্যামিতির মাধ্যমে, কিভাবে পরস্পর ছেদী একটি হাইপারবোলা ও একটা বৃত্তের মাধ্যমে সমাধান করা যায় তা দেখানো হয়েছে ঐ বইয়ে। জালালী সন, যেটা এখনো ইরান ও আফগানস্তানে প্রচলিত, সেই জালালী পঞ্জিকা সংস্করনও হয়েছিল খৈয়ামের হাতে ১৫ই মার্চ ১০৭৯ খৃষ্টাব্দে সেলজুক সুলতান জালাল উদ্দিন মালিক শাহের শাসন আমলে। এই জালালী পঞ্জিকা অনেক ক্ষেত্রে গ্রেগোরীয়ান ক্যলেন্ডার থেকেও নির্ভুলতার দিক দিয়ে এগিয়ে আছে। সেই সময়কার তিনি একজন উল্লেখযোগ্য দার্শনিক ছিলেন। তবে যত না তাকে বিজ্ঞানি ও কবি হিসাবে দেখা হয়, দার্শনিক হিসাবে ততটা নয়। বহু সুত্রথেকে সমর্থন মেলে, কয়েক দশক ধরে তিনি নিশাপূরে ইবনে সিনার দর্শন শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব পালন করে ছিলেন। দায়িত্বটা ছিল অনেকাংশে স্ব-প্রনোদিত।


গভীর একাগ্রতায় ওমর খৈয়াম।

এমন একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব কিভাবে কবি পরিচিতি লাভ করে ছিলেন তা না বললে অপূর্ন থেকে যাবে তাঁর বিষয়ে লেখা। তার অধিকাংশ লেখায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নিরিশ্বরবাদ প্রকাশ পেয়েছে। অমন এক ধর্মান্ধ সময়ে তার অবকাশ সময়ের সাহিত্য কর্ম প্রকাশের মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশটাকে আরো বেশী বৈরী করে তুলতে তিনি চাননি, যাতে তার মূল কাজ, বিজ্ঞান সাধনা বাধাগ্রস্থ হয়। খৈয়ামের আরো একটা রুবাইয়াতের ভেতর দিয়ে ঘুরে আসা যাক, যাতে রয়েছে বিশ্বজনিনতা ও নিরিশ্বরবাদের পরশ, অনুবাদ অবশ্যই নরেন বাবুর।

সে দিন দেখি পানশালাতে
সুরা পায়ীর পাত্র হাতে
দিউয়ানা এক ফকির এলেন জ্ঞানী।
দেখে নিলেম কৌতুহলে
তখনও তার কুক্ষি তলে
উপাসনার ছোট্ট আসনখানি।
আবাক হয়ে জিজ্ঞাসিলাম প্রভু,
ভুলেও হেথায় আসেন নাতো কভু।
মলিন হেসে শুধান জ্ঞানী কাঁধটি আমার ধরে,
বিশ্ব কেবল শুন্য ফাকা
পান করে নে নিত্য আমোদ করে।

এমন একটা গভীর সত্যকে এত সহজভাবে বলে ফেলাটা সত্যিই বিরল। রসোবোধে ভরা এমন প্রকাশকে লুফে নিতে সময় নিল না পাশ্চাত্যের মানুষ। কবি হিসাবে খোইয়ামকে আবিস্কারও করেছিল সেই ইউরোপের মানুষ। পারস্য ভাষাভাষীদের বাইরে ষোড়ষ শতকে প্রথম টমাস হাইড নামে একজন ব্রিটিশ অরিয়েন্টালিস্টের মাধ্যমে খৈয়াম ইউরোপের বোদ্ধা মহলে জনপ্রিয় হন। তারপরে প্রায় দুই’শ বছর বাদে এডোয়ার্ড ফিডজেরাল্ড নামে একজন ব্রিটিশ সাহিত্যিক প্রথম খৈয়ামের কবিতা সম্ভার ইংরাজিতে অনুবাদ করেন এবং বিখ্যাত সে অনুবাদ কর্মটি রাতারাতি খৈয়ামকে পাশ্চাত্যে প্রাচ্যের সব চেয়ে বড় কবি হিসাবে পরিচিতি দেয়। খৈয়াম অবসরে কবিতা লিখতেন এবং তা ডাইরীতে সংরক্ষন করে রাখতেন। প্রকাশের উদ্দেশ্যে নয় বরং নিজের আনন্দের জন্যে। ১৮৫৭ সালে মিস্টার কাওয়েল নামে ফিটজারাল্ডের এক বন্ধু কলিকাতা এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রন্থাগারে রক্ষিত খৈয়ামের অনেক গুলো রোবাইয়াতের একটা পান্ডুলিপি ইংল্যন্ডে তার কাছে পাঠায়। খৈয়ামের এই রুবাইয়াত ফিটজেরাল্ডকেও রাতারাতি দুনিয়া ব্যাপি পরিচিতি এনে দেয়।

ওমর খৈয়ামের কাব্য রসের যাদু সাহিত্য প্রেমী এউরোপীয়দের মাতাল করে দেয়। দ্রুত যেখানে সেখানে গজিয়ে উঠে খৈয়াম ফ্যান ক্লাব, খৈয়াম বার, থিয়েটার ইত্যাদি। ইউরোপের সমাজ ও সাহিত্যে আনেকখানি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় তার কাব্য-যাদু। খৈয়াম বাংলাতে আসে অনেক পরে। ফিটজেরাল্ডের মূল ইংরাজি অনুবাদ থেকে যারা খৈয়ামকে বাংলায় নিয়ে এসেছেন, তাদের ভেতরে নরেন দেব একজন। তিনি চার লাইনের রুবাইয়াতের ভাবানুবাদ করেছেন। তার জন্যে তাকে ইচ্ছে মতন শব্দ ও লাইনের সংখ্যা বাড়াতে কমাতে হয়েছ। এর ফলে ফারসি সাহিত্যের মূল সুর শ্রবনে না ঢুকলেও দর্শনটাকে স্পর্শ করা যায়। আমার মত সাধারন পাঠকের জন্য এটাইবা কম কি?

খৈয়াম একটা ফারসি শব্দ- যার অর্থ তাবু মেরামতকারি। কবির পূর্ব-পুরুষ তাবু মেরামতির কাজ করতেন বলেই হয়তো এই খেতাব। খৈয়ামের কোন কোন কবিতা পড়লে তার রসোবোধের সুক্ষতাটা ধরা যাবে সহজেই। বাকীর খাতায় পড়ে থাকা স্বর্গের থেকে এই মাটির স্বর্গ তার কাছে আনেক বেশী আকর্ষনীয়। সেটা ঠিক কেমন হবে সেকথাও লিখতে ভুলেননি তিনি কবিতায়।

এই খানে এই তরু তলে
তোমায় আমায় কুতুহলে,
এ জীবনের যে কটা দিন
কাটিয়ে যাব প্রিয়ে।
সংগে রবে সুরার পাত্র,
অল্প কিছু আহার মাত্র,
আর এক খানি ছন্দমধুর
কাব্য হাতে নিয়ে।

কখনোবা কবি অভিমানে দগ্ধ হয়েছেন মরমে- স্রষ্টার প্রতি অভিমানে। সৃষ্টির গন্তব্যহীনতা বা স্রষ্টার খেয়ালিপনায় তিনি হয়েছেন ব্যথিত। কবিতায় উঠে এসেছে সে সুর।

মানুষের হীনচেতা
তুমিই করেছ হেতা।
তোমারই সৃজিত যত কাল-ফণীদল,
আনন্দ নন্দনে আনে তীব্র হলাহল।
জগতের যত কিছু মহাপাপে
কলংকিত মানুষের মুখ-
সে তোমারই চুক।
ক্ষমা চাও মানুষের কাছে।
ক্ষমা করো দোষ তার যত কিছু আছে।

দোষ-গুন, ভাল-মন্দ, পাপ-পুন্য মানুষের সাথে মিশে আছে। এই বৈপরিত্যকে কোনভাবে অস্বিকার করা যাবে না। এটাই এই পৃথিবির নিয়ম। খৈয়ামের রুবাই-এর ভেতরে সে ছন্দও বাজে।

এক হাতে মোর কোরান শরীফ
মদের গেলাস অন্য হাতে।
সত-অসতের, পূণ্য-পাপের
দোস্তী সমান আমার সাথে।
আকাশের ঐ নীল তারকা
আমায় দেখে নির্নীমেখ।
ভাবছি আমি নই মোসলেম,
কাফেরও তো নইকো ঠিক!

মানুষের ভন্ডামী তার কাছে অসহ্য। বিশেষ করে গোড়া মুসলমান সমাজের যুক্তিহীন কর্মকান্ডে বিরক্ত কবি অবশেষে বিদ্রোহ করেন রোবাই-এর শব্দে শব্দে।

মদ্য পানের অন্যায়েতে
যদি আমার শাস্তি ঘটে,
সুরাই তবু চাইবো আমি
যা থাকে মোর ভাগ্য পটে।

খৈয়ামের প্রায় প্রতি রুবাইতে সুরা বা মদের কথা এসেছে অনিবার্যভাবে। সেটা এসেছে রুপক হিসাবে। মদ মানে নেশা গ্রস্থতা। সাধনা, কর্মে নেশা, সৌন্দর্যে, ভালবাসায় নেশা- এসবই সার্বজনিন, প্রত্যাসিত এবং পূন্য। নেশার সে সৌন্দর্য্য তার দৃষ্ট এড়ায়নি কোনভাবে। তাছাড়া শাব্দিক অর্থে নিয়ন্ত্রিত পানে কোন পাপ নেই- এটা তার অভিমত, মনের কথা।

ওমর বলে, আমার বাণী
জগতকে আজ শুনিয়ে দিওঃ
রক্ত-গোলাপ রঙিন সুরা
আমার কাছে সমান প্রিয়।

খৈয়ামের অনেক কবিতায় যদিও অনস্তিত্ববাদের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত রয়েছে, তবুও অনেক লেখায় রয়েছে অস্তিত্ববাদের ইশারা। এতে পরিস্কার বোঝা যায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে তিনি অতো বেশী চিন্তিত নন- যত না ভাবনা-চিন্তা করতেন বিজ্ঞান সাধনায়। এসব নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলতাকে ঘৃনা করতেন অন্তরে ও প্রকাশ্যে।

এই শক্তি এই প্রান
এই সকলই তব দান।
মোর সত্ত্বা আত্মা-মন
এইতো প্রভু তব ধন।

কোন কোন সমালোচকের মতে যত বেশী ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে খৈয়ামকে দেখা হয়েছে, অন্য কোন কবিকে অত ভিন্নতায় বিচার করা হয়নি। তাই তাকে যেমন নাইটক্লাবের সুরা সাকি নিয়ে মত্ত থাকা ভোগবাদী নিরোপদ্রব রসিক চরিত্র বলে মনে হতে পারে, ঠিক তেমনি তাকে প্লাটনিক যুক্তবাদে বিধৌত সুফীবাদী মানুষও মনে হতে পারে।
চিরকুমার এই বিজ্ঞান সাধক ১১৩১ সালে ৮৩ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ইরানের খোরাসান প্রদেশের নিশাপূরে গেলে দেখা যাবে এই মনীষির সমাধিক্ষেত্র, যেখানে রয়েছে প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের এক চরম মিলন মেলা। দেখা যাবে, পারস্যের শ্রেষ্ঠ রক্ত-গোলাপেরা দিবা-রাত্র কবির সমাধি মর্মরে অজস্র পাপড়ি ঝরিয়ে চলেছে শ্রদ্ধা আর ভালবাসায়।


খৈয়ামের সমাধি ক্ষেত্র, নিশাপূর খোরাসান- ইরান।

সুদীর্ঘ জীবনে চরম একাগ্র সাধনায় গনিত, বিজ্ঞান, দর্শন আর সাহিত্যের জগতে অনেক অবদান রেখে গেছেন খৈয়াম। কিন্ত আমরা প্রাচ্যের মানুষেরা সাধারন বোধে কিভাবে জানি তাকে। সেই গল্প দিয়েই শেষ করবো তার সম্পর্কে লেখা। কিশোর বেলা বাইরের জগত সম্পর্কে জানা শোনা শুরু করার সময়। সেই সময়ে অনেকের মুখে গল্প শুনেছি খৈয়াম সম্পর্কে। শুনেছি এমন করে- আনেক দিন আগে পারস্য দেশে এক মহাজ্ঞানী বাস করতেন, তার নাম ছিল ওমর খৈয়াম। অনেক সাধনায়, পরিশ্রমে কোরান হাদীস গবেষনা করে তিনি বিশেষ এক পানীয় আবিস্কার করেন- তার নাম আবে-হায়াত, যা পান করলে মানুষ আর কোন দিন মরে না, অর্থাত অমরত্ত্ব প্রাপ্ত হয়। একদিন তিনি এক পাত্র আবে-হায়াত নিয়ে মূক্ত আকাশের নীচে এসে দাড়ান। পাত্রটাকে আকাশের দিকে উচু করে ধরে পরম প্রভুকে সম্বোধন করে বললেন- হে আল্লাহ, আমি আজ তোমার সৃষ্ট মৃত্যুকে হত্যা করবো। এই কথা বলার সাথে সাথে আকাশ থেকে একটা অগ্নীবাণ এসে পানপাত্রটাকে চুর্ন করে দেয়। আর খাওয়া হলোনা আবে-হায়াত, অমরত্ত্বও পাওয়া হলোনা তার। এই গল্প থেকে তেমন কিছু শেখার না থাকলেও একটা জিনিস বোঝার আছে, আর তা হলো- মুর্খতাকে অলৌকিকতার রহস্যে ঘিরে কিশোর মনের অনুসন্ধিতসাকে চাপা দিয়ে রাখা এবং সার্বজনিন ব্যক্তিদের সংকীর্ন দলে ভেড়াবার চেষ্টা করে চলে এই সব তথাকথিত গল্প সমূহ। বিজ্ঞান মনস্ক মন ও মনন তৈরিতে এসব বড় অন্তরায়।

তথ্যসূত্রঃ
১। রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম নরেন দেব
২। উইকিপেডিয়া অনলাইন

[501 বার পঠিত]