ইউরোপ-আমেরিকার খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর মধ্যেকার জৈববিবর্তন সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারিত-আলোচিত হলেও এ বিষয়ে বিশ্বের বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর অবস্থান সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা ছিল না। ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত অন্তত কোনো প্রায়োগিক তথ্য কারো হাতে ছিল না। গেল বছর (২০০৯) যখন মানুষের পূর্বপুরুষ ‘আর্ডি’র (Ardipithecus ramidus) গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হল, তখন আল-জাজিরা’র মত কথিত ‘নিরপেক্ষ’-‘উদারপন্থী’ সংবাদ সংস্থার (৩ অক্টোবর, ২০০৯) আরবি সংস্করণের ওয়েব সাইটে পরিবেশন করা হল সম্পূর্ণ ভুল বক্তব্য : ‘আর্ডির ফসিল প্রমাণ করেছে ডারউইনের থিওরি ভুল ছিল। আর্ডির ফসিল গবেষকেরা জানিয়েছেন, আর্ডির আবিষ্কার নিশ্চিৎ করেছে শিম্পাঞ্জিসদৃশ কোনো পূর্বপুরুষ থেকে মানুষ বিবর্তিত হয়নি।

বাংলা ভাষায় ডারউইনের অরিজিন অব স্পিসিজ প্রথম অনূদিত হয়েছে ‘প্রজাতির উৎপত্তি’ শিরোনামে। ভাষান্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ম. আখতারুজ্জামান। প্রকাশিত হয়েছে বাংলা একাডেমী থেকে ২০০০ সালে। পশ্চিম বঙ্গ থেকে ২০০১ সালে অরিজিন অব স্পিসিজ বইয়ের ভাষান্তর করা হয়েছে দুই খণ্ডে। অনুবাদ করেছেন শান্তিরঞ্জন ঘোষ, প্রকাশ করেছে দীপায়ন। অর্থাৎ সারাবিশ্বের জ্ঞানের জগতে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টিকারী ডারউইনের বইটি প্রকাশিত হওয়ার ১৪০ বছর পর বাংলা ভাষায় আমরা এর অনূদিত সংস্করণ পেয়েছি। অথচ আমরা হয়তো অনেকেই জানি না আরবি ভাষায় অরিজিন অব স্পিসিজ বইটি অনূদিত হয়েছে ১৯২০ সালের দিকে। যৌথভাবে অনুবাদ করেছেন মিশরের ইয়াকুব সেরুউফ এবং ইসমাইল মাজহার। পশ্চিমা মিডিয়া আর কতিপয় মৌলবাদীগোষ্ঠীর কারণে ইসলাম ধর্মের কঠোর অনুশাসন আর রক্ষণশীলতার যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে চারিদিকে, সে হিসেবে এই খবরটি একটু ব্যতিক্রমই বলা যায়।

২০০৯ সালের ৩০-৩১ মার্চ কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডপাথ অডিটোরিয়ামে ‘ইসলাম এবং জৈববিবর্তন’ শীর্ষক এক সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়। হার্ভার্ড এবং ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ প্রকল্প ‘ইভোলিউশন এডুকেশন রিসার্চ সেন্টারে’র তত্ত্বাবধানে তিন বছর ধরে চলা গবেষণা ও জরিপ কার্যক্রমের রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষে এই সিম্পোজিয়ামের আয়োজন। গবেষণার বিষয় পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়ার মতো মুসলিম দেশগুলিতে জৈববিবর্তন নিয়ে সাধারণ জনগণসহ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি, মতামত, বক্তব্য, প্রতিক্রিয়া কী তা জানা, চিহ্নিত করা। গবেষণায় পাকিস্তানের ২,৫০০ সরকারি হাইস্কুলের নবম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী এবং ইন্দোনেশিয়ার ১,৩০০ মাদ্রাসা এবং হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে পাওয়া গেছে ৮০% পাকিস্তানি শিক্ষার্থী এবং ৪৯% ইন্দোনেশিয়ান শিক্ষার্থী জানিয়েছে, ‘আল্লাহ প্রথম মানবকে বর্তমানরূপেই তৈরি করেছেন। মানুষ কোনো বিবর্তনের ফসল নয়।’ জরিপে একটি প্রশ্ন ছিল, মানুষের উদ্ভব নিয়ে ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত সৃষ্টিবাণীর সাথে জৈববিবর্তন তত্ত্বের কোনো বিরোধ আছে কি? উত্তরে হ্যাঁ বলেছে শতকরা ৬৪ পাকিস্তানি এবং শতকরা ৩৬ জন ইন্দোনেশিয়ান ছাত্র। আর শতকরা মাত্র ১৬ ভাগ ইন্দোনেশিয়ান, ১৪ ভাগ পাকিস্তানি, ৮ ভাগ মিশরীয় সাধারণ জনগণ জৈববিবর্তন তত্ত্বকে ‘বাস্তব’ বলে গ্রহণ করেছেন।

সিম্পোজিয়ামে উপস্থিত গবেষকরা জানিয়েছেন, পাকিস্তানের সরকারি হাইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে জৈববিবর্তন তত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত থাকলেও জীববিজ্ঞানের বইগুলোতে কোরান শরিফের আয়াত লেখা রয়েছে। আবার ইন্দোনেশিয়ার সরকারি হাইস্কুলে জীববিজ্ঞানের ক্লাসে তুরস্কের বিখ্যাত ক্রিয়েশনিস্ট নেতা হারুন ইয়াহিয়ার বই পড়ানো হয়। গবেষক দলের সদস্য জনস্ হপকিন্স স্কুল অব এডুকেশনের সহকারী অধ্যাপক ড. অনিলা আসগর বলেন, ‘মুসলিম বিজ্ঞানীদের অনেকে ইসলামে বর্ণিত সৃষ্টিবাণীর সাথে জৈববিবর্তনের বিরোধ আছে বলে মনে করেন না। ১২ জন পাকিস্তানি জীববিজ্ঞানীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র একজন জৈববিবর্তন তত্ত্বকে অস্বীকার করেছেন।’ তিনি আরো বলেন পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়ার মতো মুসলিম সংগরিষ্ঠ দেশের বিজ্ঞানী, গবেষক, একাডেমিশিয়ানরা (২০০৬ সালে) এক যৌথ ইশতেহারে পৃথিবীতে জীবনের উদ্ভব বিষয়ে বিজ্ঞাসম্মত ব্যাখ্যা পড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। (১)

ইভোলিউশন এডুকেশন রিসার্চ সেন্টারের সহকারী পরিচালক জেসন ওয়াইলস্ জানান, মুসলিম বিজ্ঞানীরা জৈববিবর্তন তত্ত্বকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে মেনে নিলেও বেশিরভাগ হাইস্কুলের বিজ্ঞান-শিক্ষক জৈববিবর্তন তত্ত্বকে এখনও ভ্রান্ত মনে করেন। এমন কী জীবের বিবর্তন প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের জানা ও বোঝার পরিমাণও অত্যন্ত দুর্বল। অনেক শিক্ষকই ক্লাসরুমে জৈববিবর্তন তত্ত্ব না পড়িয়ে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন। যাতে শ্রেনীকক্ষে ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে।

পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ব্রিটেনের হ্যাম্পশায়ার কলেজের সহকারী অধ্যাপক সলমান হামিদ বলেন, পাকিস্তানি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে দেখা গেছে জৈববিবর্তন নিয়ে ভুল ধারণা শুধু হাইস্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে নয়, অনেক ইসলামি পণ্ডিতও জৈববিবর্তন নিয়ে সম্পূর্ণ ভুল ধারণা পোষণ করেন। তাদের কাছে ‘জৈববিবর্তন হচ্ছে পশ্চিমা পণ্য। জৈববিবর্তনকে মেনে নেয়া মানে ইসলামি বিশ্বাস ত্যাগ করে নাস্তিক হয়ে যাওয়া।’ ইসলাম এবং জৈববিবর্তনের মাঝে একটিকে বেছে নেয়ার কথা বললে সবাই একবাক্যে ইসলাম গ্রহণ করতে রাজি। আবার অনেক ইসলামি পণ্ডিত বিশ্বাস করেন কোরানের মধ্যেই বিজ্ঞান লুকায়িত আছে। তাদের বক্তব্য ‘ভূতাত্ত্বিকরা পৃথিবীর বয়স সাড়ে চারশো কোটি বছর বের করলেও কোরান শরিফে প্রাচীন পৃথিবীর দিকে ইঙ্গিত রয়েছে। কোরানে যদিও ছয় দিনে বিশ্ব সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে কিন্তু ঐ দিনগুলির দৈর্ঘ্য সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি।’ (২)

সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠানের কয়েক মাস পর ম্যাকগিল রিপোর্টার পত্রিকার (২৭ জুন, ২০১০) সাথে এক সাক্ষাৎকারে ড. অনিলা আসগর জানান অন্যান্য দেশের মতো মুসলিম দেশগুলোতে জৈববিবর্তন নিয়ে একক কোনো অবস্থান নেই। জৈববিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে লক্ষ করা যায়। গবেষণায় পাওয়া তথ্যানুসারে বেশিরভাগ ব্যক্তি জৈববিবর্তনকে বাস্তব এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব মানতে নারাজ। খুব কম সংখ্যক ব্যক্তি জৈববিবর্তন তত্ত্বকে ‘বাস্তব’ বলে মানেন। এবং এদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে জৈববিবর্তন তত্ত্বকে সমন্বয় করে নিয়েছেন। ড. অনিলা উদাহরণ দিয়েছেন ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় বিকাশমূলক জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. ইহাব আবুহইয়েফের কথা। ড. ইহাবের মত হচ্ছে :

“…my daily scientific activities of performing evolution-centered research do not conflict with my daily spiritual activities as a Muslim…I strongly believe one can practice evolutionary biology without compromising one’s faith as a Muslim.”

মুসলিম দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়া ইসলামি ক্রিয়েশনিজম যে ইহুদি-খ্রিস্টান ক্রিয়েশনিজমেরই ‘মুসলিম ভার্সন’, তার সঙ্গে অনিলা আসগর একমত। একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য হচ্ছে মুসলিম ক্রিয়েশনিস্টরা ইহুদি-খ্রিস্টানদের মত ‘নবীন পৃথিবী’তে (যারা বিশ্বাস করে পৃথিবীর বয়স মাত্র ছয় হাজার বছর) তেমন একটা বিশ্বাসী নয়। মুসলিম ক্রিয়েশনিস্টদের দৃষ্টিতে পৃথিবীর বয়স এর থেকে বেশি বলে মনে করে।

‘ইসলাম এবং জৈববিবর্তন’ শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে তুর্কি বংশোদ্ভূত আমেরিকার ট্রুম্যান স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক টানের ইডিস (An Illusion of Harmony: Science and Religion in Islam এবং Why Intelligent Design fails: A Scientific Critique of the New Creationism বইয়ের লেখক), আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের অধ্যাপক ড. সাওমো বৌজাওদি, ইরানি বংশোদ্ভূত কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মিন্নো দিরায়েহ্, তুর্কি বংশোদ্ভূত ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিসের অধ্যাপক ড. উনার টারগেই-সহ অনেক বক্তাই খ্রিস্টান ক্রিয়েশনিজমের মতো ইসলামি ক্রিয়েশনিজমের উত্থানে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, উত্তর আমেরিকার মত তুরস্ক, লেবানন, মিশর, ইন্দোনেশিয়ায় জৈববিবর্তনের বিরুদ্ধে ইসলামি ক্রিয়েশনিজম ছড়িয়ে পড়ছে। লেবাননের সরকার ১৯৯০ সালের মধ্যভাগে হাইস্কুলের বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম থেকে জৈববিবর্তনকে বাদ দিয়েছে। পাকিস্তান, মিশরের হাইস্কুল পাঠ্যক্রমে যদিও এখনও জৈববিবর্তন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তবু শিক্ষকরা বিষয়টি পড়াতে স্বস্তিবোধ করেন না। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষকই এটি সত্য বলে মানেন না। ছাত্রদের এ বিষয়টি মানতে নিরুৎসাহিত করেন। অথচ পাকিস্তানের হাইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ইসলামি ক্রিয়েশনিজমের উপরে সেমিনার, কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম দেশগুলিতে কট্টর টেলিয়োলজিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা জৈববিবর্তনের ভুল ব্যাখ্যাকেন্দ্রিক বই, ম্যাগাজিন, প্রবন্ধ, সিডি, ভিসিডি সর্বত্র পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বাংলাদেশে মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহিমের লেখা ‘বিবর্তনবাদ ও সৃষ্টিতত্ত্ব’, ‘স্রষ্টা ও সৃষ্টিতত্ত্ব’ এক সময়ের বহুল বিক্রিত ও প্রচারিত বই। ইদানীং ভারতের জাকির নায়েক, তুরস্কের হারুন ইয়াহিয়ার জৈববিবর্তন-বিরোধী ভিডিও, লেকচার, ও তাদের বিভিন্ন বইয়ের বাংলা অনুবাদ বেশ সহজলভ্য।

২০০৬ সালে বিশ্বের ৩৪টি শিল্পায়িত দেশে পরিচালিত এক গণজরিপে দেখা গেছে শতকরা ৮০ ভাগ জনগণের জৈববিবর্তন তত্ত্বে আস্থা রয়েছে, এমন দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফ্রান্স। আমেরিকার অবস্থান নীচের দিক থেকে দ্বিতীয়। সর্বনীচে রয়েছে, তালিকায় অন্তর্ভুক্ত একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র তুরস্ক। বিশ্বের মুসিলম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কই একমাত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে উদার, সেক্যুলার। (যদিও রক্ষণশীল দল ক্ষমতায় এসে তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী ধর্মনিরপেক্ষতা ধ্বংসের নানা পায়তারা করছে)।

সিম্পোজিয়ামে ইসলামি ক্রিয়েশনিজম সংক্রান্ত আলোচনায় তুরস্কের মুসলিম ক্রিয়েশনিস্ট নেতা আদনান অকতারের (‘হারুন ইয়াহিয়া’ নামে বেশি পরিচিত) লেখা রঙচঙা বই ‘The Atlas of Creation’ এর কথা উঠে আসে। জৈববিবর্তনের বিরুদ্ধে ভুলে ভরা তথ্য দিয়ে ঠাসা এই বইটি বিভিন্ন মুসলিম দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সরবরাহের পাশাপাশি ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে দেয়া হয়েছে। আদনান অকতার তার বই বিভিন্ন দেশের দশ হাজার গবেষক, বিজ্ঞানী, শিক্ষার্থী, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে ‘সৌজন্যসংখ্যা’ পাঠিয়েছেন। অকতারের এত টাকার উৎস কোথায় জানা যায়নি। (অক্সফোর্ডের প্রসিদ্ধ জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্সের ওয়েব-ব্লগে Atlas of Creation বইয়ের ভুল তথ্য আর অসঙ্গতির বিভিন্ন হদিস রয়েছে এখানে)। এহেন মুসলিম ক্রিয়েশনিস্ট আদনান অকতারের মতে ‘জৈববিবর্তন তত্ত্ব হচ্ছে ইসলাম ধ্বংসের জন্য পশ্চিমা কাফেরদের ষড়যন্ত্র।’ (৩)

ইসলামি ক্রিয়েশনিস্টরা তাদের থেকে এক কদম আগে চলা সহযাত্রী খ্রিস্টান ক্রিয়েশনিস্ট বা আইডিবাদীদের পথ পুরোপুরি অনুসরণ করেন না। যদিও খ্রিস্টান ক্রিয়েশনিস্টদের দেয়া তথ্যকেই সামান্য নাম পাল্টিয়ে এদিক সেদিক করে ইসলামি ক্রিয়েশনিস্ট বইগুলোয় ব্যবহার করা হয়। ইসলামি ক্রিয়েশনিস্টদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা পৃথিবীর বয়স নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামান না। পৃথিবীর বয়স ছয় হাজার বছর না-কী বিলিয়ন বছর সেটা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়। ডাইনোসর কিভাবে বিলুপ্ত হয়েছিল, পাখির উদ্ভব কিভাবে হল, এক প্রজাতির প্রাণী অন্য প্রজাতিতে রূপান্তরিত কিভাবে হয় এসব বিষয়ে তাদের আগ্রহ অনেক কম। তাদের কাছে জৈববিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ‘মানুষের উদ্ভব’। মানব জাতি হযরত আদমের সন্তান না-কী বানর-শিম্পাঞ্জি জাতীয় প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়েছে, এখানটাতেই তাদের ফোকাস বেশি।

*[‘ডারউইন : একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবনা’ (অবসর প্রকাশনী, ২০১১) বইয়ের অন্তর্ভুক্ত এই লেখকের লেখা ‘জৈববিবর্তন, ডারউইন এবং ঈশ্বর বিশ্বাস’ শীর্ষক প্রবন্ধের অংশবিশেষ]

*বি. দ্র. : ইংরেজি ‘ইভোলিউশন অব অরগানিজম’-এর বাংলা প্রতিশব্দ হবে জীবের বিবর্তন বা সংক্ষেপে জীববিবর্তন। ‘জৈববিবর্তন’ শব্দ এক্ষেত্রের সঠিক অর্থ প্রকাশ করে না। কিন্তু ‘ডারউইন: একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা ও ভাবনা’ বইয়ে জীবের বিবর্তন বুঝাতে ‘জৈববিবর্তন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে বিধায় এই লেখাটিতেও ‘জৈববিবর্তন’ শব্দটি রেখে দেয়া হল।

*** উল্লেখ্য, লেখাটি কিছুদিন পূর্বে ফেসবুকে নোট আকারে প্রকাশিত হয়েছিল
উৎস :
1. Hannah Hoag, Muslim students weigh in on evolution, Nature, 3 April 2009.
2. Shannon Palus, Evo education, McGill Daily, Monday, Apr 12, Volume 99, Issue 43.
3. Drake Bennett, Islam’s Darwin problem: In the Muslim world, creationism is on the rise, Boston.com, October 25, 2009.

[65 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন: