তসলিমা নাসরিন তাঁর দ্বিখণ্ডিত নামের আত্মজীবনীগ্রন্থে বলেছিলেন যে, তরুণ বয়সে তিনি দুজন মানুষের প্রেমে পড়েছিলেন একতরফাভাবে। এদের একজন হচ্ছে টেলিভিশনের প্রিয়মুখ আফজাল হোসেন এবং অন্যজন হচ্ছেন রূপালি পর্দার সুদর্শন নায়ক জাফর ইকবাল।

শুধু তসলিমাই নন, সত্তর এবং আশির দশকের বাংলাদেশের কিশোরী এবং তরুণীদের একটা বিরাট অংশই জাফর ইকবালের প্রেমে পড়েছিল। ওই সময়ের মেয়েদের এই গণহারে প্রেমে পড়াতে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না তাদের। এরকম অরূপ রূপবান, কার্তিকের মত কান্তিময়, কেতাদুরস্ত, পোশাকে আশাকে সুবেশী এবং হালনাগাদ নায়ক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আর দ্বিতীয়টি ছিল না। আমাদের চলচ্চিত্র জগতের প্রথম অত্যাধুনিক, স্মার্ট, গ্লামারাস নায়ক তিনি। শেষও তিনিই। তাঁর সময়ে যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের কারো গা থেকেই গাঁইয়া ক্ষ্যাত ক্ষ্যাত গন্ধ লুকোনো যায় নি। পরে যাঁরা এসেছেন তাঁদের অবস্থাতো আরো করুণ।  না আছে ফ্যাশন, না আছে গ্লামার, না আছে চেহারা, না আছে শরীর। ওদের বদলে আমাকে নায়ক বানালেও বেশি বেশি করে তরুণীরা হলমুখো হতো। এ ব্যাপারে নিশ্চিত আমি। 🙂

শুধু সুদর্শন নায়কই ছিলেন না তিনি, ছিলেন প্রথম সারির একজন অন্যতম জনপ্রিয় গায়কও। গায়ক হিসাবেই তাঁর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রবেশ। সাংস্কৃতিক একটা পরিবারের সদস্য হবার কারণে গায়ক হওয়াটা তাঁর জন্য সহজসাধ্য ছিল। তাঁর বোন শাহনাজ রহমতুল্লাহ তখন অত্যন্ত জনপ্রিয় গায়িকা, ভাই আনোয়ার পারভেজ বিখ্যাত সুরকার। এই সহজ কাজটাই আরো সহজ হয়ে গিয়েছিল জাফর ইকবালের অসাধারণ গানের গলা থাকার কারণে। স্কুলে থাকার সময় থেকেই গিটার বাজাতেন। ষাটের দশকের আরো অসংখ্য তরুণের মত এলভিস প্রিসলিকে ভালবেসে তুলে নিতেন গিটারে। স্কুলে কোনো অনুষ্ঠান হলেই গিটার বাজিয়ে এলভিস প্রিসলির গান গাইতেন। এরকম একটা অনুষ্ঠানেই খান আতার চোখে পড়েন তিনি। তাঁর সুদর্শন চেহারা মনে ধরে যায়। নিজের ঠিকানা হাতে গুঁজে দিয়ে বলেন যে, চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ইচ্ছা থাকলে যোগাযোগ করো। সেই যোগাযোগের ফলে নায়ক হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে জাফর ইকবালের।

চলচ্চিত্র জীবনে অনেক ছবিই করেছেন তিনি, তবে তাঁর মেধা এবং সৌন্দর্যের সঠিক ব্যবহার হয় নি কোনোটাতেই। এর জন্য অবশ্য অন্যদের চেয়ে তাঁর নিজের দোষই বেশি ছিল। অত্যন্ত খামখেয়ালী প্রকৃতির মানুষ ছিলেন তিনি। পোশাকে আশাকে কেতাদুরস্ত হয়ে অত্যন্ত দুরন্ত গতিময় একটা জীবন যাপন করতেন তিনি। পেশার প্রতি একনিষ্ঠতা ছিল না তাঁর। সে কারণেই অত্যন্ত জনপ্রিয় হবার পরেও সঠিক জায়গায় পৌঁছোতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। নায়ক না হয়েও শুধু গায়ক হয়েও থাকলেও হতে পারতেন দেশের সেরা গায়ক। কিন্তু কোনোটাও পূর্ণভাবে হওয়া হয় নি তাঁর। না নায়ক, না গায়ক।  অবশ্য এর জন্য কোনো আক্ষেপ তাঁর মনের মধ্যেও ছিল না বলেই মনে হয়। তাঁর এই খামখেয়ালীপনার কারণেই ববিতার প্রতি তাঁর একতরফা প্রেমটাও পূর্ণতা পায় নি। সত্তুর এবং আশির দশকের সিনে ম্যাগাজিনগুলোর কাছে বেশ উপাদেয় আচার ছিল জাফর ইকবালের এই ববিতার প্রতি একতরফা প্রেমটা।

রূপালি পর্দা এবং ছোটো পর্দার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে দুটোতে সমান জনপ্রিয় হবার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রগন্য। আশির দশকে যখন বাংলাদেশে একটা মাত্র টেলিভিশন ছিল তখন বছরের সেরা অনুষ্ঠান আনন্দমেলাতে অবশ্যম্ভাবীভাবে জাফর ইকবালের গান থাকতো। তাঁর গ্লামারাস উপস্থিতি ছাড়া পূর্ণতাই পেতো না সেই অনুষ্ঠান।

সাত বছর আগে শেষবারের মত দেশে গিয়েছিলাম আমি। হন্যে হয়ে সমস্ত ইস্টার্নপ্লাজা খুঁজে ফিরেছি জাফর ইকবালের গানের সন্ধানে। দোকানিদের মধ্যে কেউ কেউ অবাক হয়ে তাকিয়েছে আমার এরকম আশ্চর্য করা কাণ্ডে। (দেশে কি কেউ আজকাল আর জাফর ইকবালের গান শোনে না নাকি, কে জানে।) আমার এই পাগলামি দেখে আন্নাও একদিন দেখি রেগেমেগে গিয়ে বলছে যে, তোমার রুচির বলিহারি। কী এমন গান যে, এর জন্য সারা বাজার মাথায় তুলতে হবে। আমার রুচির ব্যাপারে ওর শ্রদ্ধাবোধটা একটু কমই সবসময়। 🙁 এই সুযোগে বলে রাখি আমার কষ্টটা বৃথা যায় নি। গুলশানের এক দোকানের মালিকের সাথে খাতির হয়ে গিয়েছিল। তিনি একটা সিডি জোগাড় করে দিয়েছিলেন। এখনও সেটা আমার কাছেই আছে।

চিরতরুণ নায়ক ছিলেন তিনি। অকাল মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল বিয়াল্লিশ বছর। বিয়াল্লিশ বছর বয়সেও সেই বাইশ বছরের তারুণ্য, সৌন্দর্যকে অবিকল ধরে রাখতে পেরেছিলেন তিনি। একসময় যারা তাঁর নায়িকা ছিল তাঁদের ছেলের চরিত্রে দিব্যি অভিনয় করে গেছেন তিনি শেষ জীবনে এসে। তারুণ্যের এমনই একটা প্রতিমুর্তি তিনি ছিলেন যে, তিনি কখনো বুড়ো হতে পারেন, এই ভাবনাটাই কারো মধ্যে কাজ করে নি কখনো। সে কারণে কিনা কে জানে, প্রকৃতি বুড়ো হবার আগেই তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়েছে পৃথিবী থেকে।

অনিন্দ্যসুন্দর রূপলাবন্যের কারণে তাঁকে রাজপুত্তুর বলে ডাকতো কেউ কেউ। মেয়েদের হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দিতেন বলে রোমিও বলেও ডাকতো কেউ কেউ। মৃত্যুর অনেকগুলো বছর পরে তিনি আজ ভুলে যাওয়া একজন। এমনই হয়, সময় বড় নিষ্ঠুর। পিছনের কোনো কীর্তিকে, কীর্তিমানকে কিংবা কান্তিময়কে মনে রাখতে চায় না সহজে। কলার পাতায় ভাসিয়ে দেয় বিস্মৃতির স্রোতস্বিনীর স্রোতে।

ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা বলা হয় নি। অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধও করেছেন তিনি।

httpv://www.youtube.com/watch?v=T8miWyTwqfc

[101 বার পঠিত]