১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের এক স্বাধীন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে।মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল ৯ মাস বলা হলেও আসলে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমাদের এই সংগ্রাম কিন্তু মাত্র ৯ মাসের নয়।ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্রের জন্মে কোথায় পূর্ববাংলার মুসলিমরা একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে,তাতো নয়ই বরং কিছুদিন পর থেকে আবার তাদের নতুন করে ভাবতে শিখতে হয়।

চাকুরি,শিক্ষা,ব্যাবসা,অর্থনীতি,রাজনীতি ইত্যাদি প্রতিটা ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার মত।এগুলো হজম করতে না করতেই ১৯৫২ সালে বাঙ্গালিদের জোর করে উর্দু ভাষা গিলে খাওয়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল জিন্নাহ।বাংলা নাকি হিন্দুদের ভাষা,মালুদের ভাষা।এই ভাষায় কথা বলা যাবেনা।রবীন্দ্র চর্চা করা যাবেনা।আইয়ুব খান অবশ্য অতটা নির্দয় ছিলেননা বাঙ্গালীদের প্রতি।তিনি বললেন,কেন রবীন্দ্র চর্চা করা যাবেনা?নিশ্চই যাবে।কিন্তু একটা শর্ত আছে।অবশ্যই কোন মুসলিমকে রবীন্দ্র সঙ্গীত লিখতে হবে।

মাতৃভাষার দাবিতে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে রফিক,সালাম,বরকতদের  মহান আত্মত্যাগ তো আজ আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত।২১শে ফেব্রুয়ারী আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে আমরাই একমাত্র জাতি যাদের মাতৃভাষার দাবিতে প্রাণ দিতে হয়েছে।আর সাথে এটাও বলে রাখি পাকিস্তানিরাই একমাত্র জাতি যারা নিজেদের ভাষা অন্যের উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে হত্যা করেছিল বাঙালি সন্তানদের।

এরপর ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নিরঙ্কুশ জয়লাভের পরেও ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হলনা পাকিস্তানিরা।২৫শে মার্চ কাল রাত্রিতে নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের উপর ঝাপিয়ে পরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারা দিয়ে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে এদেশের সন্তানেরা।শুরু হয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

অবশেষে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের লাল-সবুজের বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আমাদের প্রতি পাকিস্তানিদের এই  বৈষম্য কিন্তু পাকিস্তানি জনগণের অজানা ছিলনা।২৫শে মার্চে কাল রাত্রিতে যখন হানাদার বাহিনী বাঙালি নিধনে নেমেছিল তখন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে জিন্নাহ তৎকালীন পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সাইদ আহমেদকে বলেন,আলহামদুলিল্লাহ্‌।পাকিস্তানকে আমরা রক্ষা করতে পেরেছি।

আজকে রাজনীতিতে এসে পাকিস্তানের ক্রিকেট নায়ক ইমরান খান ৭১ এর ঘটনায় বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া উচিত মনে করেন।কিন্তু ১৯৭১ সালে কোথায় ছিলেন এই ইমরান খান?নিজ কানে নাকি তিনি বাঙ্গালীদের হত্যা করার নির্দেশ শুনেছিলেন।একজন আন্তর্জাতিক সেলিব্রেটি হয়ে তার কি তখন কিছুই করার ছিলনা?তখনতো এককান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন।তাহলে এখন কেন?বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা করবেন এই আশায়?

ঠিক সেই সময়ে এপ্রিলের দিকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সাবেক এমপি মাইকেল বার্ন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের ব্রিটেনে আসা আটকে দেন।

পরবর্তীতে জুলাইয়ের দিকে পাকিস্তান এই সফর করতে পারে।ব্রিটেন তখনো বাংলাদেশের এই স্বাধীনতা যুদ্ধকে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃতি প্রদান করেনি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ত ৎ কালীন উপাচার্য ও বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তখন লন্ডনে।দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিশ্বজনমত গঠন করতে তিনি তখন অগ্রাণী ভুমিকা পালন করেন।বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও প্রবাসী নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিল, যে দেশের সেনাবাহিনী নির্বিচারে নিজ দেশের মানুষের ওপরই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, সে দেশের কোনো ক্রীড়াদলের বিদেশের মাটিতে নির্বিবাদে খেলাধুলায় অংশ নিতে দেওয়া যেকোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষেই অনুচিত। তারা প্রতিটি ভেন্যুতেই পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের কালো পতাকা প্রদর্শনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেন।সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লন্ডনের বিখ্যাত লর্ডস, ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্র্যাফোর্ড ক্রিকেট গ্রাউন্ড, লন্ডনেরই আরেক বিখ্যাত ক্রিকেট ভেন্যু দ্য ওভাল, বার্মিংহামের ট্রেন্টব্রিজ প্রভৃতি সব জায়গাতেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলেন ব্রিটেন প্রবাসী বাঙালিরা। বিব্রত হলেন পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা। ব্রিটিশরা জানল, পাকিস্তানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি নেই। কোনো হাঙ্গামা নয়, চি ৎ কার করে প্রতিবাদ নয়, হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে টেস্ট ম্যাচগুলোর সময় কেবল বাঙালিরা জানিয়ে দিল, ওরা (পাকিস্তানিরা) আমাদের এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা বাঙালিরা এখন আর পাকিস্তানকে নিজের দেশ হিসেবে কিছুতেই ভাবতে পারি না।

এসব ছাড়াও পাকিস্তানিরা আমাদের মনে করতো ভারতের দালাল।মনে করতো এবং এখনো মনে করে এদেশের মুসলিমরা সাচ্চা মুসলিম নয়।এখনও তাদের ইতিহাসে লেখা আছে ৭১ সালে পূর্বপাকিস্তানের মানুষেরা ভারতের সাথে এক হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল বলে পাকিস্তানিরা নাকি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে ছেড়ে দিয়েছিল!তারা এখনো তাদের ইতিহাস বইতে পড়ছে ৭১ সালের আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নাকি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ!এখনো তাদের শিক্ষার্থীদের পড়ান হচ্ছে  ভুল ইতিহাস।

ঘটনা ১ :

গত ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যৌথ আয়োজক ছিল ভারত এবং শ্রীলংকার সাথে।পাকিস্তানের আয়োজক হবার কথা থাকলেও অন্যান্য দেশগুলোর আপত্তিতে পাকিস্তানের আয়োজক হিসেবে অংশগ্রহণ বাতিল করা হয়।কারন পাকিস্তানের মাটি তালেবানের ঘাটি হিসেবেই পরিচিত সবার কাছে।

২৩শে মার্চ ঢাকার মিরপুরে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কোয়ার্টার ফাইনাল দেখতে যাই আমি।ম্যাচটি ছিল পাকিস্তান ও ওয়েস্টইন্ডিজের।বিশ্বকাপের নিয়মানুসারে শুরুতে দুই দলের জাতীয় সংগীত হবে। জাতীয় সঙ্গীতের সময়ে দাড়িয়ে সম্মান প্রদর্শনের নিয়ম থাকলেও ঠিক করলাম পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের সময় দাড়াবনা।যে জাতি আমাদের অস্তিত্ত চায়নি তাদের জাতীয় সঙ্গীতে সম্মান প্রদর্শন?

আমি বসে থাকলাম।শুধু আমি না,আমাদের গ্যালারির আরও অনেকেই আমার মত বসে আছে।খুব সম্ভব ৯/১০ বছরের একটা ছেলেকে দেখলাম থু ফেলাতে।চোখে মুখে রাজ্যের ঘৃণা!পাক সার জামিন সাদ বাদ শুরু হল।কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে পুরো স্টেডিয়ামের বেশীরভাগ মানুষই দারিয়ে গলা মেলাল পাকিস্তানী খেলোয়াড়দের সাথে!রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে ওদের পাক সার জামিন সাদ বাদ শুনলাম।

পাকিস্তানের পর ওয়েস্টইন্ডিজের পালা।এবার আর কারো হুশ জ্ঞান নেই।বেশীরভাগ দর্শকই বসে পড়েছে।গ্যালারির শোরগোলের মধ্যেই ওয়েস্টইন্ডিজের সঙ্গীত শেষ হল।

খুব ভাল খেলছিল পাকিস্তান।কিন্তু কে জানি চিৎকার করে বলল,পাকিস্তান ভুয়া!মুহূর্তের মধ্যেই পাকিস্তানের এক সমর্থক চিৎকার করে বলে উঠল,ইন্ডিয়া ভুয়া!!টেন্ডূলকার ভুয়া!!তার সাথে গলা মেলাল অনেকেই!বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়ানো উমর গুল বারবার তাকিয়ে ঘটনা বুঝতে চেষ্টা করছিলেন।

ভাল করে খেয়াল করলাম পুরো গ্যালারি।পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে।কারো হাতে কারো মুখে।এক বাচ্চার মুখের এক পাশে পাকিস্তানের পতাকা আঁকা।আরেক পাশে বুম বুম আফ্রিদি।অনেক তরুন-তরুণী পাকিস্তানের জার্সি পড়ে এসেছে খেলা দেখতে।একজন আবার পাকিস্তানের পতাকা হাতে গ্যালারির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত দৌড়াচ্ছিলেন যার পিঠে লেখা প্রজন্ম একাত্তুর!কয়েকদিন পরেই খুব সম্ভব প্রথম আলোতে পড়েছিলাম এই ম্যাচে পাকিস্তানের এতো সমর্থন দেখে পাকিস্তানের বিভিন্ন দৈনিকে লেখা হয়েছে  বাংলাদেশের মুসলিম ভাইয়েরা ৭১ এ তাদের(আমাদের) ভুল বুঝতে পেরে  পাকিস্তানি ভাইদের বুকে টেনে নিয়েছে।তারা আশা করছে অনেকদিন পর হলেও আবার দুই  পাকিস্তান এক হবে!

ঘটনা ২:

গত বছরের ২৪শে নভেম্বরে মিরপুর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম আমার এক বন্ধুর সাথে।যাওয়ার সময় বুঝতে পারছিলাম এখানে আজ কোন ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছে।আগে থেকেই জানতাম আইসিসি মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ম্যাচ গুলো বাংলাদেশে হচ্ছে।কিন্তু আজকে কার ম্যাচ জানা ছিলনা।ম্যাচ দেখতে কোন টিকিট লাগবেনা।শ্রীলংকা দলের অলরাউন্ডার শশীকলা আমার অনেক দিনের বন্ধু।ওর খেলা কখনো সরাসরি দেখা হয়নি।ভাবলাম যদি শ্রীলংকা অথবা সালমাদের ম্যাচ থাকে তাহলে বেশ ভাল হয়।স্টেডিয়ামের ভিতরে ঢুকে বুঝলাম এটা পাকিস্তান-দক্ষিনআফ্রিকার ম্যাচ।কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারলামনা স্টেডিয়ামে এতো পাকিস্তানের সমর্থন কেন?পাকিস্তানের মহিলা টিমের খেলা নিশ্চই উপস্থিত দর্শকদের অদেখা।খুব বেশি হলে অধিনায়ক সানা মিরকে চিনতে পারে।তাহলে তারপরেও এতো সমর্থন কেন?প্রত্যেকটা বলে পাকিস্তানি ব্যাটারদের উৎসাহ দিচ্ছিল উপস্থিত দর্শকেরা।পাকিস্তানের মহিলা টিমে  তো আর শোয়েব-আফ্রিদিরা নেই।তাহলে?

ক্রিকেটে বাংলাদেশিদের পাকিস্তান সমর্থন প্রসঙ্গে:

১.বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচে পাকিস্তান সমর্থন:

এবার আসি বহুদিনের বিতর্কিত একটি প্রসঙ্গে।বাংলাদেশে পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের যে সমর্থন তা যথেষ্টই চোখে পড়ার মত।পৃথিবীতে আর কোন দেশের মানুষই নিজের দেশের দলকে রেখে অন্য  দলকে সমর্থন করেনা।বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচ হচ্ছে অথচ আমাদের দেশের অনেক মানুষ আছেন যারা বাংলাদেশকে সাপোর্ট না করে পাকিস্তানকে সাপোর্ট করে।তাদের বক্তব্য খেলা হচ্ছে খেলা।এর মধ্যে রাজনীতি নিয়ে আসা উচিত নয়। খেলা শুধুমাত্র খেলাই থাকে যখন তা পাড়ার মাঠের খেলা থাকে।কিন্তু যখন তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হয় তখন তা আর শুধুমাত্র খেলা থাকেনা।একটি দেশের জাতীয় দল সেই দেশের প্রতিনিধিত্ত করে।দেশের জাতীয় পতাকা বহন করে।দেশের জাতীয় দল যেখানে যাবে,দেশের পতাকা তুলে ধরবে।এই দলের সাফল্য-ব্যর্থতার সাথে পুরো জাতির হাসি কান্না জড়িয়ে থাকে।এইকারনে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল কোন ম্যাচ জিতলে আমাদের পুরো জাতি জয়ের আনন্দে মেতে ওঠে।হারলে দলের খেলোয়াড়দের মত পুরো জাতি শোকাচ্ছন্ন থাকে।দলের খেলোয়াড়েরাও যখন জাতীয় দলের হয়ে খেলতে নামে তখন আর সে শুধুই একজন খেলোয়াড় থাকেনা,হয়ে যায় নিজ দেশের রাষ্ট্রদূত।নিজের দেশের জাতীয় দলের বিরুদ্ধে,জাতীয় পতাকার বিরদ্ধে,পুরো জাতির বিরদ্ধে যে সমর্থন করে সে কি রাজাকার নয়?

নিজ দেশে খেললে দর্শকরা তাদের দলকে সমর্থন দেবেন এটাই স্বাভাবিক। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আমাদের খেলা হলেও গ্যালারি থেকে আমাদের পতাকা উড়িয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়।‘ এ বক্তব্য পাকিস্তানি ক্রিকেটার আব্দুর রাজ্জাকের।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পাকিস্তান যতবার খেলতে এসেছে (বিশেষ করে ২১শে ফেব্রুয়ারি,২৬শে মার্চ অথবা ১৬ই  ডিসেম্বর)প্রতিবারই পাকিস্তান অধিনায়ক অথবা ম্যানেজারকে ৭১ নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখিন করেছেন এদেশের কিছু সাংবাদিক।আর প্রতিবারই এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন তারা কখনো বা বিরক্তি ভাব নিয়ে,কখনো বা নো কমেন্ট বলে কখনো বা বলেছেন,আমরা এখানে শুধুমাত্র ক্রিকেট খেলতে এসেছি।যেমনটা গতবার এসে বলে গেছেন পাকিস্তানি অধিনায়ক আর তাদের দলীয় ম্যানেজার।

অনেকে আবার বলেন সবকিছুতে ৭১ আনা ঠিক নয়।তাহলে ৭১ কি শুধুই ইতিহাসের পাতায় থাকবে?

২.পাকিস্তান-ভারত ম্যাচে পাকিস্তান সমর্থন:

আমাদের দেশে এই ধরনের মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী।এরা বাংলাদেশ পাকিস্তান ম্যাচে বাংলাদেশ সমর্থন করলেও অন্য দেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ম্যাচ থাকলে পাকিস্তানের সমর্থন করে আর থাকে ভারতের বিরুদ্ধে।

এদেরকে যদি বলি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে পাকিস্তানকে কেন সমর্থন কর?এরা বলবে ক্রিকেটের সাথে রাজনীতি মিলাবেননা।খেলা হছে খেলাই।ভারত আমাদের ৭১ এ সাহায্য করেছিল ঠিক আছে কিন্তু খেলার মদ্ধে রাজনীতি মিলাবেননা প্লিজ।এখন যদি বলি বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচে তাহলে কাকে সাপোর্ট কর?এদের উত্তর দিতে একমুহূর্তও দেরি হয়না।সাথে সাথে বলে বসে,কেন?বাংলাদেশকে সাপোর্ট করি।এটা আমার দেশ।নিজের দেশকে সাপোর্ট করবোনা,আমি কি রাজাকার নাকি?

কিন্তু মশাই,এখনকি আপনি ক্রিকেটের মদ্ধে রাজনীতি আনছেননা!আপনি রাজনীতি আনতে পারলে আমি কেন ৭১,৩০ লাখ,২লাখ এসব সংখ্যা আনতে পারবোনা?এগুলোকি শুধুই সংখ্যা আমাদের জন্য?

আবার অনেকে ভারতীয় বিএসএফের কথা তুলে ধরেন।যে বিএসএফ  সীমান্তে যেভাবে বাংলাদেশী মানুষ হত্যা করছে তাদের দেশকে কিভাবে আমরা সাপোর্ট করি?এখানেও কি রাজনীতি চলে আসেনা?বিএসএফের এই সীমান্ত হত্যা অনেকে পাকিস্তানিদের ৭১ এর গনহত্যার সাথেও তুলনা করে থাকেন।বিএসএফের কোন অধিকার নেই এভাবে সীমান্তে হত্যা করা।কেউ অন্যায় করলে আইন অনুযায়ী তার  বিচার করা উচিত কিন্তু তাই বলে হত্যা-নির্যাতন তারা করতে পারেনা।কিন্তু আমাদেরও নিশ্চই উচিত নয় বেআইনি ভাবে ওদের দেশে প্রবেশ করা।ট্যাক্সের টাকা বাঁচাতে আমাদের দেশের অসহায় মানুষদের ওদের দেশে প্রবেশ করতে হয় আর এর জন্য বিএসএফের গুলিতে তারকাটায় ঝুলে থাকতে হয়।দীর্ঘদিন ধরে এই ঘটনা ঘটলেও আমাদের সরকার কোন ব্যবস্থাই নেয়নি মাঝে মাঝে প্রতিবাদ করা ছাড়া।এই সীমান্ত হত্যার দায় তাহলে কি শুধুই বিএসএফের?আমাদের সরকারের নয়?

কিন্তু বিএসএফের এই সীমান্ত হত্যার জন্য ভারতকে ঘৃণা করা কতটা যুক্তিযুক্ত?৭১সালে ওদের সরকারের থেকে কোন অংশে কম ছিলনা ভারতীয় সাধারণ জনগনের ভুমিকা।যেখানে ভারতেই প্রতি বছর অনেক মানুষ না খেয়ে মারা যায় সেখানে আমাদের ১ কোটি শরণার্থীর খাদ্য-বস্ত্র-চিকিৎসা ইত্যাদি ওরাই দিয়েছিল।আমাদের পাশে ওদের সাধারণ জনগণই দারিয়েছিল।সীমান্তে হত্যার কোথাও ওরা লুকিয়ে রাখেনি  যা পাকিস্তান করেছিল ৭১এ।কিন্তু ৪৭ থেকে ৭১ পর্যন্ত আমাদের প্রতি যে অন্যায় অবিচার পাকিস্তানিরা করেছিল তা কি পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের অজানা ছিল?সারা পৃথিবীর মানুষ যেখানে  জানত সেখানে নিজের দেশের মানুষের কথা ওরা জানতোনা এমন যুক্তি রীতিমত হাস্যকর।২৩ বছরের বৈষম্যের কথা জানতোনা এখনো জানেনা আবার না জেনে ক্ষমা চাওয়ার কথাও বলে!

চীন-ভারত সীমান্তে কম যুদ্ধ হয়নি।কম মানুষ মারা যায়নি।কিন্তু কখনো শুনেছেন ভারতীয়রা চীনাদের ঘৃণা করে অথবা চীনারা ভারতীয়দের ঘৃণা করে?

পকেট খরচ বাঁচাতে ভারতের টাটা-মাহেন্দ্র লোকাল বাসে চড়েই দিন শুরু হয় আমাদের।ভারতীয় পিয়াজ-আদা দিয়ে তৈরি করা হয় খাবার।কুরবানির সময়ে ভারতীয় গরু না আসলে কুরবানি হয়না আমাদের।কসমেটিকস থেকে শুরু করে বিনোদনের জন্য ক্যাবল চ্যানেল ভারতীয়।আমাদের ঘরে শোভা পায় শাহরুখ-সালমানদের পোস্টার।কিন্তু তারপরেও আমরা যেভাবে ভারত শব্দটাকেই  ঘৃণা করি পাকিস্তানিরাও হয়তো করেনা!দৈনন্দিন ভারতীয় জিনিষের উপর আমাদের এলারজি না থাকলেও ভারতীয় ক্রিকেটারদের বিষয়ে আমাদের মারাত্মক এলারজি।এর কারন কি জানেন?এর সবচেয়ে বড় কারন ওরা ভারতীয়।

৩.পাকিস্তান মুসলিম দেশ তাই পাকিস্তান সাপোর্টঃ

পাকিস্তান মুসলিম দেশ তাই পাকিস্তানের সমর্থন করি।এই ডায়ালগটাও যথেষ্ট জনপ্রিয়।কিন্তু আসুন একটু ভালভাবে চিন্তা করে দেখি।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় সারাদেশ আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকায় ছেয়ে যায়।কেন পয়গম্বরের দেশ সৌদি আরব-সেনেগাল কি মুসলিম দেশ না?আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সাথে সৌদি-সেনেগালের ম্যাচে আমাদের দেশের কয়জন মানুষ সৌদি-সেনেগালের পক্ষ নেয়?কয়টা পতাকা উড়ে বাড়ির ছাদে?তখন তো ঐ শূকর খাওয়া মেসি-কাকাদেরই নাম জপা হয়!

অর্থাৎ মুসলিম দেশ বলে পাকিস্তান সমর্থন করি এটা কখনই গ্রহণযোগ্য উত্তর নয়।পাকিস্তান সমর্থন করা হয় কারন তারা পাকিস্তানি।আর এদেশের মানুষেরা এখনো পাকিস্তানের প্রতি টান অনুভব করে।

৪.পাকিস্তান ভাল খেলে তাই পাকিস্তানের সমর্থন:

এই যুক্তিও যথেষ্ট প্রচলিত।কিন্তু ভাল কি শুধু পাকিস্তানই খেলে?ভাল খেলার কথাই যদি ধরা হয় তাহলে সবার আগে আসবে অস্ট্রেলিয়ার নাম।৪ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অসিরা।টেস্ট অথবা ওয়ানডে ক্রিকেট দুই ধরনের ক্রিকেটেই ওদের রেকর্ড যথেষ্ট সমৃদ্ধ।

আর এশিয়ান টিমের কথা বললে আরও আগে আসবে ভারত-শ্রীলংকার নাম।দুই বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতের রয়েছে বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইনআপ।সর্বচ্চ ৫ বার এশিয়া কাপের  চ্যাম্পিয়ন ভারত যেখানে পাকিস্তান এশিয়া কাপ জিতেছে মাত্র ১ বার।এশিয়ার টিম গুলোর মদ্ধে একমাত্র ভারতই টেস্ট ক্রিকেটের গদা হাতে নিতে পেরেছে।শ্রীলংকা পাকিস্তানের মত ১ বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও এশিয়া কাপ জিতেছে ৩ বার।বিশ্বকাপের সর্বশেষ  ৫ আসরে ফাইনাল খেলেছে তিন বার,একবার সেমিফাইনাল।সবচেয়ে বেশি রান সেঞ্চুরি ভারতের শচিন টেন্ডুলকারের,সবচেয়ে বেশি উইকেট শ্রীলংকার অফস্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরনের।

সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় অস্ট্রেলিয়া অথবা এশিয়ার ভারত-শ্রীলংকা পাকিস্তানের থেকে ভাল খেলে।তাহলে কেন পাকিস্তান সমর্থন?এর কারন ওরা পাকিস্তানি।

৫.আমাদের ক্রিকেট সম্পর্কে পাকিস্তান:

অনেকে বলেন ভারত আমাদের চিরশত্রু।ওরা কখনোই চায়না আমরা ক্রিকেট খেলি।ভারতীয় ব্যাটসম্যান বিরেন্দ্র শেওয়াগ তো আমাদের জাতীয় শত্রু।শেওয়াগ বলেছিলেন তিনি মনে করেননা বাংলাদেশের এই বোলিং অ্যাটাক টেস্টে ভারতের ২০ উইকেট তুলে নেবার ক্ষমতা রাখেন।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং বাংলাদেশের টেস্ট খেলার যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন।আমাদের টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার সময় সবচেয়ে বিরোধিতা করেছিল নিউজিল্যান্ড।প্রশ্ন তুলেছিলেন জিওফ বয়কট ও।কিন্তু দোষ হবার সময় শুধু ভারতীয়দেরই হয়।

পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক এবং উইকেট রক্ষক রশিদ লতিফের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায় সেই মুলতান টেস্টে আমাদের অলক কাপালির ক্যাচ ধরে।এরপরে আফগানিস্তানের কোচ হবার পর তিনি মন্তব্য করেন আফগানিস্তান নাকি বাংলাদেশের থেকে ভাল দল।

পাকিস্তানিরা আমাদের ক্রিকেট ও আমাদের সম্পর্কে কি মনে করে তার জন্য এই লেখার সেরা আকর্ষণ নিচের এই ভিডিও।যেখানে তারা স্পষ্ট ভাবে বলেছে তারা আমাদের দেশের বাঙ্গালীদের মুসলিম মনে করেনা।

এমন আরও কিছু ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন

এবং

৬.পাকিস্তানী খেলোয়াড়দের চরিত্র:

পাকিস্তানি খেলোয়াড়েরা আমাদের দেশের অনেকের কাছেই স্বপ্নপুরুষ।তাহলে আসুন দেখে নেই এসব সপ্নপুরুষদের স্বপ্নের চরিত্র।প্রথমেই দেখি ‘ড্যাশিং’ খেলোয়াড় শহিদ আফ্রিদির চরিত্র।

বছর কয়েক আগে এই শহিদ খান আফ্রিদি অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেট মাঠে সবার সামনে আপেলের মত করে বল কামড়ে বলের আকৃতি বিকৃত করে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন কয়েক ম্যাচ।মুখে দাড়ি রেখে বর্তমানে ধার্মিকের বেশ ধরা আফ্রিদি ২০০০ সালে সিঙ্গাপুরে কি যেন করে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে!

এরপরে আসি রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস খ্যাত স্পীড স্টার শোয়েব আক্তারের কথায়।বিতর্ক আর শোয়েব যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।ক্যারিয়ারে যে কতবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন শোয়েব তা হয়তো তার নিজেরও জানা নেই।ইতিহাসের দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে বল টেম্পারিং করে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন ২০০৩ সালে শ্রীলংকাতে অনুষ্ঠিত একটি ট্রায়াঙ্গুলার টুর্নামেন্টে।এছাড়াও সতীর্থ আসিফকে ব্যাট দিয়ে পিটান,ইনজুরির নাম করে অস্ট্রেলিয়ার লিগে ম্যাচ খেলা,ড্রাগ কেলেঙ্কারিতে জড়ানো শোয়েবের বিতর্কের কোন শেষ নেই।

২০০০ সালের দিকে ম্যাচ ফিক্সিং এ ধরা পরে  ফাইন দিয়েছিলেন ওয়াসিম আকরাম,ওয়াকার ইউনুস,মুশতাক আহমেদ এবং বর্তমানে অনেকের আদর্শ সাঈদ আনোয়ার।আজীবন নিষিদ্ধ হয়েছিলেন সেলিম মালিক এবং আতাউর রহমান।

২০১০ সালে ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্তানি কয়েকজন খেলোয়াড় যা করেছে তা ক্রিকেট ইতিহাসেরই সবচেয়ে বড় কলঙ্কের জন্ম দিয়েছে।স্পট ফিক্সিং করে জেল খাটছেন সালমান বাট,মোহাম্মদ আসিফ এবং মোহাম্মাদ আমির।জুয়াড়ি মাজহার মাজিদের ভাষায় দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটার টাকা নারী খাবার ছাড়া কিছুই বোঝেনা।

ঘটনা ৩:

১৭ই ডিসেম্বের,২০১১ ঢাকার মিরপুর স্টেডিয়ামে আমরা তিন বন্ধু(আমি,ব্রাত্য,ফারদিন) খেলা দেখতে গিয়েছিলাম বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার টেস্ট ম্যাচ।মুখের এক পাশে পাকিস্তানের পতাকা আরেক পাশে আফ্রিদি লিখে একছেলে পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের সমর্থন করে যাচ্ছিল।বাংলাদেশি খেলোয়াড় আউট হলেই আনন্দে লাফাচ্ছিল।সাকিব ব্যাটিং এ নামার সময় শিয়ালের ডাক দিচ্ছিল।আমরা তিন বন্ধু ঐ ছেলেকে বুঝাই।পাকিস্তানের পতাকা মুছতে তাকে বাধ্য করি।আমরা যখন তাকে দিয়ে পাকিস্তানের পতাকা মুছাচ্ছিলাম তখন গ্যালারির অন্যান্য দর্শকেরা তার গালের আফ্রিদিও মুছাতে বাধ্য করে।সেই পাকি ভক্তের অবস্থা দেখুন।

দেশ বিরোধী এক ফাকিভক্ত
বাধ্য ছেলের মত পাকিস্তানের পতাকা মুছে ফেলল

পরিশেষেঃ

যে জাতি আমাদের অস্তিত্ত চায়নি সেই জাতির সাফল্যে আনন্দিত হওয়া,ব্যর্থতায় কষ্ট পাবার কোন অধিকার কি আমাদের আছে?স্বাধীনতার ৪০ বছরেও ক্ষমা চায়না,ক্ষমা যদি চেয়েও থাকে ১৪ই ডিসেম্বর,১৯৭১ এ যে আমাদের জাতিগত ভাবে পঙ্গু করে দিয়ে গেল তার কি কোন ক্ষমা আছে?থাকতে পারে?

আজকে অনেকেই বলবেন বাবা অপরাধ করলে তার ঘৃণা তার সন্তান কেন পাবে?অবশ্যই পাবে যদি সে মনে করে তার বাবা যা করেছিল ঠিকই করেছিল।

৭১ সালে যদি আপনার সামনে আপনার বাবাকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলত,আপনার মা-বোনকে ধর্ষণ করত পারতেন কোনভাবে পাকিস্তানকে ভালবাসতে?ওদের সমর্থন করতে?

খেলার মাঠে দেখা যায় আমাদের দেশের মানুষেরা ভারত-পাকিস্তানের জার্সি পড়ছে-পতাকা উরাচ্ছে।এই ভারত-পাকিস্তানের পতাকা কি আমাদের?ওদের জার্সি কি আমাদের?একবার আমাদের পতাকা-জার্সির দিকে তাকিয়ে দেখুনতো।আমাদের লাল-সবুজ কি কম সুন্দর?

[687 বার পঠিত]