দাদায় আদা খায়,না পাইলে হুদাই চাবায়

ছোটবেলায় বরই বিচি মুখে নিয়ে ঘোরাঘুরি ছিল বরইয়ের দিনে প্রাত্যহিক অভ্যাস। আর এখন ছেলে বুড়ো নির্বিশেষে চুইংগাম চিবায়। অনেকে পান চিবায়। বরই বিচির প্রাপ্যতা সব ঋতুতে নেই, কিন্তু চুইংগাম মুখে নিয়ে ঘোরাঘুরি সব সময়। আধুনিকরা এ সুযোগ সব ক্ষেত্রেই পায়। আর বরই বীচি মুখে নিয়ে নাড়াচাড়া ছিল ছোটদের অভ্যাস, আর চুইংগ্রাম নিয়ে জিহ্বা ঘোরানো —- চিবানো — ছোট বড় নির্বিশেষে এখন অনুশীলিত হয়। সেই “দাদায় আদা খায়, না পাইলে হুদাই চাবায়।” হুদাই মানে শুধু শুধু অর্থাৎ খালি মুখই চিবানোর মত। চিবানোই অভ্যাস। অর্থাৎ অভ্যাসবশত জিহ্বা ও দাঁত নাড়েন। ইস্যু নেই তো ইস্যুই বানাই এর মত।

আজকালকে আমাদের অনেকের অবস্থা ঠিক তাই। শুধু শুধু চিবানোর অভ্যেস আছে । আমরা কেউ চিবাই বিশ্বায়ন নিয়ে,কেউ খেলাধুলা,কেউ রাজনীতি, কেউ শিক্ষা, কেউ পরিবেশ, কেউ বা বাজার অর্থনীতি । কেউ নারী উন্নয়ন । এরমধ্যে আমরা অনেকেই যা চিবাই তা কিন্তু গিলি না। অর্থাৎ মুখে বলি বা কলমে লিখি কিন্তু নিজে আবার বিশ্বাস করি না। অর্থাৎ নিজের জীবনবোধের সাথে একাত্ম করি না । এজন্য অনেকের এ চিবানো অক্সিজেনের মত,নিজে জ্বলে না, কিন্তু অন্যকে জ্বলতে সাহায্য করে । আসলে জ্বলতে সাহায্য করে না, পুড়িয়ে মরতে বা মারতে ইন্ধন দেয়। এ বড় ভয়াবহ। আর এ ভয়াবহতার মধ্যেই আমাদের বসবাস।
তবে সবার এ চিবানো সব সময় চুইংগামের মত অন্তঃসারশূন্য স্বাদবিহীন থু করে ফেলে দেওয়ার মত নয়।

তবে আমি চিবাতে পছন্দ করি নারী ইস্যু নিয়ে এবং তা অক্সিজেনের মত নয় । মনে, মননে, প্রাণে,ধ্যানে,জীবনে,জীবিকায় এটা করি নারীমুক্তি আন্দোলনকে গতিশীল রাখতে অন্তত এক ফোঁটা শিশির দেওয়ার মনোভাব থেকে। এটাকে কেউ নেতিবাচকভাবেও দেখে । দুয়েকজন হাসিচ্ছলে আমাকে জেন্ডার মোল্লা নামেও অভিহিত করে।

আজাইরা বউ কি করে? ধানে চালে মিশিয়ে বাছে।ছোটবেলায় বউ ও শাশুড়িদের দেখেছি অবসর সময়ে চাল বেছে রাখতে। চাল থেকে ধান বাছা।এখন চালে ধান দেখি না। ফ্রেস, পরিচ্ছন্ন।বাছা।পোছা। নিষ্কলংক চাল।আমার বাবা কাকারা খেতে বসলে কারও থালায় ভাতের সাথে সিদ্ধ একটা ধান পরলেও রাগারাগি শুরু হত। তখন মা কাকাকীমাদের বিরক্তি নিয়ে মুখ বুঝে থাকতে হত।একটা একটা করে চাল না বেছে ভাত রেঁধে যেন মহা অপরাধ করেছে ফেলেছে। কিন্তু প্রবাদটিতে চাল বাছাকে অকাজের কাজ বলা আছে।

গ্রামে বউদের সারাদিন ব্যস্ত থাকা পারিবারিক চর্চা। বউদের যেন সারাদিন অবসর নেই।বিশ্রাম নেই। সব কাজ শেষ হওয়া,সংসারে বউদের একটু সুস্থির হয়ে বসা মানেই অলক্ষুণের আভাস। সারাক্ষণ বউদের ব্যস্ততা মানেই সংসারে ধনে জনের সমারোহ।তাই অলুক্ষণে লক্ষণকে ঢেকে রাখার একটা ব্যবস্থা হল ধানে চালে মিশিয়ে বাছা। অকাজের কাজ হলেও বউ তো ব্যস্ত।

কাজেই হাতে তেমন কাজ না থাকত তবে ঘরের লক্ষ্মীরা (?) ধানে চালে মিশিয়ে বাছত। আবার বউরা যদি সংসারের গতানুগতিক কাজের বাইরে নিজের মনের সুখে রুমালে ফুল তোলা বা এ ধরণের কোন কাজ করত তবেও বলা হত আজাইরা বউ কি করে? ধানে চালে মিশিয়ে বাছে।
আমিও আজকে আদা চিবাবো বা ধানে চালে মিশিয়ে বাছব।
যাহোক, রাস্তা ঘাটে চলতে গিয়ে বিজ্ঞাপন, আদেশপত্র, দেয়াল লিখন পড়া অন্য অনেকের মত আমারও অভ্যাস। এরই একটি নিয়েই আজ হুদাই চিবাবো আর কি!

স্কুল ও কলেজের পোষাকে পার্কে আপত্তিজনক অবস্থান নিষিদ্ধ

এটি সোহরাওয়ার্দ্দি উদ্যানের সীমানা প্রাচীরে ও গেটে লেখা ।
আদেশটি কি ইতিবাচক না নেতিবাচক আদেশ? ব্যক্তিগতভাবে আমি লেখাপড়া ফাঁকি না দেয়ার জন্য স্কুল ও কলেজ পালানোর বিপক্ষে।তবে সোহরাওয়ার্দ্দি উদ্যানের সীমানা প্রাচীরে ও গেটে এমন একটি আদেশকে আমার কাছে বিসদৃশ্য লেগেছে। ‘স্কুল কলেজের পোষাক’, ‘আপত্তিজনক’, ‘নিষিদ্ধ’ শব্দগুলো আমার মগজে বেশ ঝড় তুলেছে।কাজেই এ নিয়ে একটু জনমত যাচাইয়ের চেষ্টা চালাই।
বাক্যটি বিশ্লেষণ করলে বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকমের অর্থ দাঁড় করিয়েছে।

আলাপ করে জানলাম,কারও কারও মতে — স্কুল ও কলেজে না পড়লে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের আপত্তিজনক অবস্থানে আপত্তি নেই।শুধু পড়ুয়াদের নৈতিক স্খলন(?) নিয়ে আপত্তি। অন্যান্য শিশুদের প্রতি কোন দায়দায়িত্ব নেই!এ কেমন কথা!
দুয়েকজনের জিজ্ঞাস্য,আদেশটির সারমর্ম কি স্কুল কলেজের পোষাকে ঘুরতে পারবে, তবে আপত্তিজনকভাবে নয়। নাকি আপত্তিজনকভাবে অবস্থান নিতে পারবে তবে স্কুল কলেজের পোষাকে নয়।

কেউ কেউ মনে করেন —সমস্যা কি? যার যা ইচ্ছে তা করবে । বিশেষ করে কলেজে পড়ুয়া কারও বয়স যদি ১৮ বছরের বেশি হয় তবে কলেজ ফাঁকি দিয়ে বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরে তবে কার
কি ?
আরেক দল মনে করেন —যার ইচ্ছে সে করুক, শুধু আপত্তিজনক অবস্থান নিয়ে তাদের আপত্তি। তাছাড়া, স্কুল ও কলেজের পোষাক পরে নয়। স্কুল ও কলেজের দুর্নাম। ছাত্র সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় ও তা জেনে অন্যান্য ছাত্রছাত্রীর উদ্ধুদ্ধ হয় এ নেতিবাচক কাজটি করতে।
আপত্তিজনক শব্দটি নিয়েও মুষ্টিমেয় লোকজনের আপত্তি। আপত্তিজনক শব্দের সংজ্ঞা নির্ধারণের দাবি করেন।

স্কুল ফাঁকি দেয়া আমার দাদুর কাল থেকে বাবার আমল হয়ে আমার জীবন ছুঁয়ে আমার ছেলেমেয়ের সময়কে লেপ্টে নিয়ে আজ পর্যন্ত বিরাজমান ।
স্কুল ফাঁকি দেয়া নিয়ে মজার মজার স্মৃতি আমাদের অনেকের জীবনেই রয়েছে । এ নিয়ে অনেক লেখালেখির প্রতিফলন পাই গান, কবিতা, গল্প, সিনেমায় । কিন্তু এ নিয়ে ‘আপত্তিজনক’ শব্দটির অশ্লীল ব্যবহার পাইনি।

‘রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষার্থে রোজার মাসে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ থাকবে।ঈদের দিন হইতে পুনরায় চলিবে।’ আদেশক্রমে হল কর্তৃপক্ষ। চম্পাকলি সিনেমা হল, টঙ্গী, গাজীপুর।সিনেমা প্রদর্শন যদি অপবিত্রই হয় তবে তো তা রমজান মাস না হলেও অপবিত্র। অপবিত্র সিনেমা হল দিয়ে হল কর্তৃপক্ষ সারা বছর বাণিজ্য করেন। আর রমজান মাসে এসে ঘোষণা দিয়ে সিনেমা হল বন্ধ রাখা যে কি পরিমাণ অনৈতিক কথা তা কি ভেবে দেখার বিষয় নয়? নৈতিকতার স্খলন কি রমজান মাসে সিনেমা হল বন্ধ রাখা না খোলা রাখায়!

[40 বার পঠিত]