কিছুক্ষন আগে ফজরের আজানটা হয়ে গেছে, কিন্তু তার সুর বাতাসের গায়ে লেগে আছে এখনও। ঘরের চালে ফোটা ফোটা শিশির ঝরছে টুপ টাপ। এটা সাধুজীর ঘর, বড় আট চালা ঘর। ঘরের চারিদিক দিয়ে মাটির বারান্দা বিছানো। শনি আর মঙ্গল বারে সে বরান্দা ভরে যায়। চ্যালা-শিষ্যে গমগম করে শেষরাত অবধি। মফস্বল শহর থেকে বেশ একটু দূরে নিঝুম পল্লীতে সাধুজীর এই আস্তানা। হাতের খুব কাছে একটা স্রোতস্বীনি খাল, তার পাড়ে একটা মলিন শ্মশান। আধ্যাত্মিক সাধনার যথার্থ স্থান বটে। আজ সপ্তাহের শনিবার দিন। বরাবরের মত সাধুজী ঘুমুতে গেছেন। আজানের ঠিক আগে আগে তিনি প্রস্থান করেন। এই সময়ের ঘুমটা হয় গাঢ় আরামের। শিষ্যেরা বারান্দায়। তাই কথা হচ্ছে একটু বেশি, তবে চাপা গলায়। সাবধানী স্বরে গহর বয়াতী শুক্কুরকে একটা খোঁচা দেয়। অদূরে বসে নিতাই সে কথায় সায় দেয়, মাথা নাড়ে।
-এই শুক্কুর তোর না বউ মারা গেল গত বছর। পাঁচ বছরের পোলাডারে একলা ঘরে থুইয়ে চলে আইছস? কান্নকাটি করবো না? পোলাডার প্যাট পুড়বো না?
গহর বয়াতির কথাশুনে হাটুর ভেতরে মুখ গুজে বসে থাকা গেছো শুক্কুর মাথা উচু করে তাকিয়ে থাকে। রাগও হয়না খুশিও হয় না, শুধু ঠোট দুটোরে নাড়ায়ে উচ্চারণ করে, “পুড়বো, প্যাট পুড়বো।”
-তাইলে কাছিমের মতন বসে আছস ক্যান, এহনই রওনা দে। আলো ফুটতি ফুটতি পৌছে যাবি।
গহরের কথাটা মন দিয়ে শোনে শুক্কুর। কথাটা তার মনে ধরে। মনে মনে ভাবে- বড় অন্যায়ই হয়ে গেছে- অতটুকুন পোলা। বাড়ী যেতে হবে তাকে এক্ষুনি। উঠে দাড়াবার চেষ্টা করে ধপাস করে পড়ে যায়। আজকে একটু বেশিই টেনেছে মনে হয়। মধ্যরাতের পরে গুরু আশির্বাদ দেয়- হাশিশ বা ঐ জাতীয় কোন কিছু- সবাইকে দেয়। মনের ভেতরে ভাল একটা মকসুদ চেপে কল্কেতে আগুন দিয়ে টান দিতে হয় সেই আশির্বাদে। ধোয়ায় ধোয়ায় একসময় সংসারের সব ধোয়াসা কেটে যায় তাতে। আধ্যাত্মিক সাধনায় এ বস্তু অতি আবশ্যিক- গুরু বলেছেন। দ্রব্যগুণে এখন গেছো শুক্কুরের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, জবাফুলের মতন। লাঠিটায় ভর দিয়ে উঠে দাড়ায় আড়াই কুড়ি বছর পেরিয়ে যাওয়া ভক্ত।

সকালের আলো প্রায় ফুটি ফুটি করছে। তার একটা লালচে আভা ছড়িয়ে পড়েছে গাঁয়ের রাস্তায়। শরতের ভিজে সকাল পায়ে হাটা পথটারেও কেমন যেন পিছলা করে দিয়েছে। চৌরাস্তার মোড়ে এসে শুক্কুরের মনটাও পিছলা হয়ে যায়। হাতেম মিঞার চায়ের দোকানের বাশের তৈরী বেঞ্চিতে মনের ভুলে বসে পড়ে সে। দোকানের ঝাপি তখন খোলাখুলি করছিল হাতেম। সাত সকালে খরিদ্দার লক্ষিরে সামনে পেয়ে মজা করতে ভুলে না সে।
-গুরুজী যে? এত সকালে আমার দোকানে পায়ের ধুলো পড়লো! আইজ দিনটা আমার ভাল যাবি।
হাতেমের গুরুজী ডাকে খুশি হয় শুক্কুর। এলোমেলো কাঁচা পাকা চাপ দাড়ি ভরা মুখটা তার সেই খুশিতে ভোরের আকাশের মত ফর্সা হয়ে উঠে যেন।
-অত কতা বাদ দিয়ে ভাল মতন এক কাপ চা খাওয়া দিনি।
একটা মুরুব্বীআনা হাসি হাতেমকে উপহার দেয় শুক্কুর। সকাল বেলায় বেশি কথা বলতে তার ভাল লাগে না। চৌরাস্তার মোড়ের এই হাতেমের চায়ের দোকান যেন চার গ্রামের তাবৎ মানুষকে বেঁধে ফেলেছে। সবাইকে- বিশেষ করে সংসারের চাকায় যারা বাঁধা, দিনের কোন এক সময় এখানে তাদের দেখা দিতেই হবে। কখনও মন কষাকষি নিয়ে শত্রু-মিত্র প্রায় এক সাথে হাজির হয়ে যায় তার দোকানে। এক বেঞ্চিতে একে অপরের দিকে পাছা ফিরে বসে কিছু সময় কাটায় তারা। খুব সাবধানে সামাল দিতে হয় হাতেমকে এসব। যেন আলাদা আলাদা করে তারা হাতেমের কাছে মনটারে খুলে দিয়ে শান্তি পেতে আসে। চায়ের ভেষজ গুণে গেছো শুক্কুরের রাতের নেশাটা কেঁটে যায়। পেয়ালায় শেষ চুমুকটা দিতেই হঠাৎ করে তার মনে পড়ে যায় মা মরা ছেলেটার কথা। দুই ছিনার মাঝখানে পিতা হওয়ার বুনো অবোধ কষ্টটা মোচড় দেয়। আহারে বড় অন্যায় হয়ে গেছে। পেয়ালাটারে বেঞ্চির উপরে ঠক করে রেখে হাতেমকে বলে, “আমার বড় দেরী হয়ে গেলরে হাতেম। পরে পয়সা দিবানে।”
হাতেম হা করে তাকিয়ে থাকে গেছো শুক্কুরের গমন পথের দিকে। ‘বওয়োনী’ তে এমন হলো? পয়লা খরিদ্দার হলো মহালক্ষি, এক পয়সা হলেও তারে দিয়ে যেতে হয়- একথা কি ভুলে গেল মুরুব্বী? যাক, কি আর করা। কপালে হাত ঠেকায়ে বিদায় দেয় লক্ষিরে।

বেলা অনেক হয়েছে। হাতেমের দোকানে না বসলে আরও দুই-এক ঘন্টা আগে ছেলের কাছে পৌছাতে পারতো শুক্কুর। ঘরে ঢুকে যেন আদালতের সামনে দাড়ায়ে যায় সে। বরাবরের মত মোকছেদের মা সামলাচ্ছে তার ছেলেকে। গেছো শুক্কুরকে সামনে পেয়ে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে পাশের ঘরের বৃদ্ধা প্রতিবেশী।
-আমি আর পারবোনা তোমার পোলারে দেখতি। ছাই ফেলতি ভাঙ্গা কুলো। কোন দিন তো দেখলাম না এই বুড়ির খোজখবর করতি। ঘোমেরতে উঠে কাউরে না পাইয়ে পোলার সে কি কান্না! কোন রক্ত মাংশের মানুষ কি তা সতি পারে? তাইতো সেই আমারেই আসতি হয় বার বার। কিছু একটা কর শুক্কুর, তা না হলি আমি কিন্তু —–
কথা মাঝখানে থামায়ে দেয় মোকছেদের মা। ভাল মতন মনের ঝাল ঝেড়ে বেশ হালকা লাগে তার। জোয়ান বউটা মারা যাবার পর কি যে হলো শুক্কুরের- কাজে কামেও মন নেই, ছেলেরটার উপরেও খেয়াল নেই। এখন পেয়েছে এক সাধু। সাধু দিয়ে কি পেট ভরে। কি ছিল, আর কি হয়ে গেল-মনে মনে ভাবে মোকছেদের মা। কয়েক মুহুর্ত নীরব থাকে সে। সেই সুযোগে গেছো শুক্কুর কিছু একটা বলার জন্যে আতিপাতি করে। মনটা তার অপরাধী।
-কিন্তু আমি কি করবো, কওতো চাচী।
-ক্যান, আড়ৎদার কি খারাপ কিছু কইছে? বেচারার বউয়ের পোলাপান হয় না। কতদিন ধরে তোমারে তেলাচ্ছে। খাতা কলমে পোলাডারে লিহে দিলি কি হয়? আল্লা চায়তো আমাগো আহাম্মদ রাজপুত্তুর হবে। ওই তো ব্যাপারীর সব পাবে। তোমার আহাম্মদ লেহাপড়া শেখপে, ব্যবসা শেকপে- এসব তুমি চাও না? এমন এট্টা পোলারে তুমি এইভাবে এই একচালা ছাপড়া ঘরে রাখে মাইরে ফেলাবা? দেহতো, তোমার পোলাডার কেমন রাজপুত্রের মতন চোহারা। এমন ঘরে কি ওরে মানায়? কওতো, বেপারীর লগে কতা কই! কি কও শুক্কুর মিঞা?
মোকছেদের মার কোন কথায় যেন আছর করে না শুকুর মিঞাকে। তার পরেও মন দিয়ে শোনে বৃদ্ধার কথা। কিন্তু কি করবে স্থির করতে পারে না। ছেলে যেন তার কলিজার বোটা। ওটাকে ছিড়ে ফেললে সে বাচবে কি করে? অন্ধ বৃদ্ধদের চলতে গেলে যেমন এক খান লাঠি লাগে, ছেলেকে তার তেমনি ভেসে থাকার একটা বয়া মনে হয়। সেটা হারাতে চমকে ওঠে গেছো শুক্কুর। ডুবে মরার ভয়ে গা কাটা দেয়। মাথা নীচু করে কি যেন ভাবে সে। তাতে অনেকগুলো মুহুর্ত পার হয়ে যায়। নীরব দেখে আবার ধাক্কা দেয় মোখছেদের মা।
-কি? কি অইলো? কতা কওনা ক্যান?
-আমারে কয়ডা দিন ভাববার দেও, চাচী।
শুক্কুর মিঞা ভাবে, আরও ভাবে, কিন্তু চাচীর কথার বাইরে আর কোন উপযুক্ত রাস্তা খুজে পায় না। সে কোন পথও বানাতে পারে না। সে ক্ষ্যমতা তার নেই। কিন্তু পথ তারে ঠিকই বানায়ে ফেলে। শুক্কুর মিঞা এভাবে সারা জনমের তরে অন্যের তৈরী করা পথের সাথে নিজেরে শক্ত করে বেধে ফেলে।

আহম্মদ এখন ব্যাপারীর বেটা- রাজপূত্র, সত্যিকারের রাজপূত্র। কতকি করে, কতকি খায়- যা তার বাপ দাদা চৌদ্দপুরুষ করেনি, খায়নি। আড়তেও বসে- বৈকালে বসে স্কুল ছুটি হলে। আর ওদিকে ছেলে বিক্রি করে তার বাপের হাতে পয়সা আসে, টাকা আসে। যে শুক্কুর মিঞা একশ টাকার নোট কোনদিন হাতে ধরে দেখেনি- পাঁচশ টাকার ছয়খানি কড়কড়ে নোট হাতে পেয়ে তার গা গরম হয়ে যায়। সে গরম এক সময় মাথায় ওঠে। আধ্যাত্মিক পথে আসা যাওয়া বেড়ে যায় তার। সাধুজীর আশির্বাদও বেড়ে যায় সাথে সাথে। হাতে লম্বা সেগুন গাছের শেকড়ের লাঠি নিয়ে গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে বেড়ায়। ‘আধগড়ে’ ছেলে মেয়েরা পিছু নেয়। বুড়োর সাথে তারা একসাথে কথা কয়- অনেক কিছু জানতে চায়। বুড়োকে দাদা ডাকে তারা।
-দাদা, তোমার হাতের ঐ শিকড়টা আমাগো দিয়ে দেও না। আমরা পুড়ায়ে ছালন রান্না করি।
নালায়েক পোলাপানের কথার ছিরি দেখে রেগে যায় গেছো শুক্কুর। পরনের নেংটীটারে শক্ত করে বেঁধে মুখে একটা ভেংচি দেয়। তিরস্কারে হালকা করে রাগ।
-ইহ্‌। পানির মতন মুতে দেও। সাধ কত! ইডা আমার গুরুর লাঠি। এর ভেতরে কি আছে, তা বুঝা তোগো কম্ম না।
ঝাড়ি খেয়ে কেটে পড়ে কৌতুহলী ছেলেমেয়েরা। ক্ষ্যপা বুড়োরে ঘিরে হ্যাংলা পোলাপানের ভীড় কমতে থাকে। যত দিন যায় তত দ্রুত কমতে থাকে শুক্কুর মিঞার পয়সাকড়িও। একটু একটু করে সব কড়ি শুষে নেয় রাক্ষস- হাশিশ রাক্ষস।

সবাই ধরে নেয় শুক্কুর মিঞা বউ হারিয়ে আর ছেলে বিক্রি করে পাগল হয়ে গেছে। সবাই বিশ্বাস করলেও রহিম ব্যাপারী একথা বিশ্বাস করে না। কারণ তার সাথে কথা ছিল ছেলের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবে না শুক্কুর। বাপের পরিচয়ে আর সামনে দাড়াবে না। সেসব কথা সে রাখেনি। ছেলের সাথে লুকিয়ে দেখা করতে গিয়ে ধরা পড়েছে বহুবার, দেখা করেছে আরও অনেক বার। শুক্কুর মিঞা জাতে মাতাল তালে ঠিক। তাকে পাগল বলতে নারাজ রহিম ব্যাপারী। গেছো শুক্কুর আজকে হাতে নাতে ধরা, তাও আবার সয়ং ব্যাপারীর হাতে। পোলার সাথে দেখা করতে গদি ঘরে ঢুকতে চায়- সাহস কত! ব্যাপারী ধমক দিয়ে তারে গদি ঘরের বাইরে বেঞ্চিতে বসায়ে রেখেছে। সেখানে ধরাপড়া চোরের মত মুখ কাচুমাচু করে বসে আছে শুক্কুর। পোষ্য ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়েছে বেপারী ভেতরে দুই নম্বর গদিতে। বড় বাধ্য ছেলে তার-সোনার টুকরো ছেলে। এই ছেলের এই বাপ! ঘেন্না লাগে। হিসাবের টালি খাতাগুলো পাশে রেখে বেপারী চিৎকার পাড়ে বাইরের বেঞ্চিতে বসে থাকা গেছো শুক্কুরের উদ্দেশ্যে।
-শুক্কুর, তোমার সাথে কতা ছেলো কি, আর তুমি করলেটা কি! তোমার তো জবান ঠিক নেই। আবার তুমি জোর করে গদি ঘরে ঢুকবার চাও! তোমার আসপদ্দার শেষ নেই।
-মাফ করে দেন, বেপারী সাব। অন্যায় হইছে। বহুদিন দেহি না পোলাডারে, একবার দেহে চলে যাবো। আর আসপো না।
শব্দ করে কাঁদতে থাকে গেছো শুক্কুর। সেই কান্নার সুরে তেমন রহম তৈরী হয় না রহিম ব্যাপারীর দিলে। দ্বিগুণ বিরক্তি ছিটকে বেরিয়ে আসে তার কণ্ঠ দিয়ে।
-এই চুপ। একদম চুপ। তুমি কানতিছো, কিন্তু তোমার চোখে তো এক ফোটাও পানি নেই। তুমিতো মহাভন্ড দেখতিছি। এই জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তোমার ভন্ডামী।
দারোয়ানদের আদেশ করে রহিম ব্যাপারি চোখের পানির ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে। তারা একজন বাইরে থেকে চেচিয়ে বলে- “না ব্যাপারী সাব, চোহে কোন পানি নাই।”
-চোহে পানি না আসলি কি করবো, ব্যাপারী সাব! গরীব মানষির চোহে পানি থাহে না।
গেছো শুক্কুরের কথা শুনে ক্রোড়পতি ব্যাপারী একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। ঘর ভরা ছোট বড় নানা লোকের মুখের ওপর এত বড় কথা! মুখে তার বিরক্তির রেখাগুলো জেগে ওঠে এক এক করে। মুখটা তেতো হয়ে যায় কুইনাইনের মত। পিতলের পিকদানিতে ভাল করে কুল্লি করে তারপর মুখের স্বাদ ফিরে আসে। রাগে অপমানে শরীর কাপে ঠক ঠক করে। মহা নেমকহারাম এই শুক্কুর। কৃতজ্ঞতা বলতে কিছুই নেই শরীরে। অতগুলো টাকা দিয়েও কোন নাম নেই? তখন কাগজপত্র বুঝে পাবার পর, ছেলে বুঝে পাবার পর গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া উচিত ছিল হারামযাদাকে। তা করেনিতো, তাই এসব হচ্ছে। তখন না করলেও এখন ব্যাপারীকে তাই করতে হবে।
-যা, শুক্কুর হারামযাদারে গলা ধাক্কাতি ধাক্কাতি ষ্টেশনের বাইরে দিয়ে আয়।
রাগে গজগজ করতে করতে দারোয়ানকে হুকুম দিলো রহিম ব্যাপারী। ধাক্কা শুক্কুরের পাওনা, তাতো সে পাবেই। চুক্তির শর্ত ভেঙ্গেছে সে- ধাক্কা তার প্রাপ্যই। কতদিন ছেলেটারে দেখেনা ক্ষ্যপা। ভেতরটা পুড়ছে তুষের আগুনের মত। পুড়ে যাচ্ছে- সব পুড়ে যাচ্ছে তাতে। এর থেকে মরণ ঢের ভালো। বাড়ীর দিকে হাটে শুক্কুর। হাটে আর ভাবে- বউডা তার মরলো, অসময়ে মরলো। তখনও ঠিক এভাবেই ভেতরটা জ্বলেছিল ধিকি ধিকি তুষের আগুনে। কিন্তু এতবড় শোকে তার চোখে এক ফোটাও জল ছিলনা। তার স্পষ্ট মনে পড়ে- চোখে কোন জল ছিল না। এখনও জ্বলে বুকের ভেতরটা বউয়ের জন্যে। কেন জ্বলে জানেনা সে। অবোধ পশুর মত বুনো এক টান শুধু ঠাওর করতে পারে বাম সিনার একটু নীচে ধুক-ধুক মেশিনটার ভেতরে। মনে আছে, ঠিক মনে আছে তার- কতদিন যে গাছ বেয়ে ঘরে এসে ভাত না পেয়ে মনের ঝাল মিটেয়ে বউ ঠেঙ্গিয়েছে। ক্ষিদে লাগলে কোথার পিরিত কোথায় চলে যায়। আবার রাইতের বেলা সব ঠিক- সব কাইজা কোথায় চলে যেত কর্পুর হয়ে। জোড়া শইলের ওমে সব গরল পানি। কথাগুলো মনে হতেই ভেতরের বুনো টানটা আবার ফাল পাড়ে যেন। মনে মনে ভীষণ অভিমান হয় বউয়ের উপর, “রাক্ষুসী গেলিতো গেলি, কলজেটারে এক্কেবারে জ্বালায়ে গেলি- কলজেডারে। এহন তোর ছেলে জ্বালায়। আমি কি সারা জনম জ্বলবো? চোহে পানি থাকলি না হয় কতা ছিলো, তা দিয়ে নেভায়ে ফেলতাম”। একটু চোখের পানির জন্যে এতবড় শাস্তি দিল তারে ব্যাপারী- আহারে চোখের পানি! এর জন্যে ছেলেটার সাথেই দেখা করা হলো না গেছো শুক্কুরের।
কলজের এ জ্বালা জুড়াতে হবে। শুক্কুর মিয়া জানে, কিভাবে তা করা যায়। সাধুজীর আর্শিবাদই পারে তার আগুন নেভাতে। কিন্তু পয়সা তো সব শেষ। হাশিশ মিলবে কিভাবে? গুরুর হাতে পায় ধরে মনের আশা মিটবে ভক্তের। অন্তর্গামী গুরু ক্ক্যপার মনের কথা পড়ে ফেললেন। বাণী দিলেন- “ওরে অবুঝ, হবে হবে সব হবে, গুরুর চরনে ভরসা রাখ- আশির্বাদের দক্ষিণা পরে দিলেও চলবে”। এ অতি সামান্য দেনা- হাশিশের দেনা। গায়ে গতরে খেটে শোধ দিয়ে দেবে শুক্কুর ওসব। জ্বালাতো মিটলো, এটাই তাকে কে দেয়? এবার পেটের জ্বালা চাড়া দিয়ে ওঠে পেটে।

জমাদার বাড়ীতে গাছ পাড়তে হবে- নারকেল পাড়তে হবে। গেছো শুক্কুরের ডাক পড়ে। নারকেল পাড়ায় আর কে আছে তার জুড়ি? গাছ বাওয়ার খুটি নাটি কলা-কানুন সব তার জানা। বাপ দাদা কয়েক পুরুষের হাত ধরে ধরে এ কাজ এখন তার হাতে। শুক্কুর মিঞা ওস্তাদ- মহা ওস্তাদ। অভাব আর হাশীশের দ্বিমুখী ঘায়ে শরীর খানিকটা অপুষ্ট মনে হলেও পেশার গরব তার ষোল আনায় আঠের আনা। সে যে গাছ বাইতে পারে না, তা বাইতে যাবে কে? সতেরটা গাছ বাইতে হবে এবেলা ওবেলা মিলিয়ে একই দিনে। গ্রীষ্মের দিন। দুপুর গড়িয়ে গেছে বেশ খানিকটা। গুরুর আর্শিবাদ মাথায় নিয়ে কাজে লেগে যায় গেছো শুক্কুর। সাধুজীর দেনা শোধ করতে হবে, পেটের জ্বালা মেটাতে হবে। এত কিছুর দায় তাকে শক্তি যোগায় কাজে। মনে সাহস পায়দা করে দেয়। আর মাত্র দুটো গাছ বাকী। সবচে বড় দুটো নারকেল গাছ। গাছে উঠলো শুক্কুর মিঞা। নারকেল পড়লো কাঁদি কাঁদি। হঠাত করে বড় কিছু পতনের শব্দ এবং এক মরণ চিতকার। লোকজন ছুটে এলো- মূলত কৌতুহলে। অনেক লোক দেখতে এলো- দেখতে এলো শেষবারের মত তাদের বহু পুরোন গেছো শুক্কুরকে। কোথা থেকে ছুটে এলো শুক্কুর মিঞার আসল ছেলে- তার কলজে জ্বালান ছেলে। বাধ্যগত ছেলে তার পালক পিতার অনুমতি না নিয়েই ছুটে এসেছে। হয়ত এইই তার প্রথম অবাধ্যতা। গাছের তলায় নিস্তব্ধ পড়ে আছে শুক্কুর মিঞার দেহটা থেতলানো ইদুরের মত। হেলে পড়া দুপুরে হয়তো এই ধুসর দৃশের গন্ধ পেয়ে এক অবোধ ঘুঘু সবচেয়ে বড় নারকেল গাছটার উপরে বসে ডেকে চলেছে একটানা। মানুষের গতাগতি-কোলাহলে তার কোন ভয় নেই, আগ্রহও নেই। অনতি দূরে পূব পাড়ের পেয়ারা ঝোপের ঝি ঝি পোকারাও তাদের বেসুর গীত থামায়নি চকিতে। এমনই ওদের হালচাল। যেন কিছুই হয়নি। ক্ষ্যপা গেছো যেন এখনও সেই আগের মতন আনমনে গাছের মাথায় হানা দিয়ে চলেছে। আর ওদিকে আসল পিতার অসাড় মৃত দেহটার উপরে আছাড়ি বিছাড়ি খেয়ে করুণ কান্নার সুর তুলছে পূত্র। কিন্তু কি আশ্চর্য্য- তার চোখে পানি এলো কোত্থেকে! যে চোখের জলের অভাবে গেছো শুক্কুর সারা জীবন ধিকৃত হয়েছে তার ছেলের চোখে জলের ধারা দেখে সে ওপার থেকে বাহবা দিলো- বারে বা, রাজপুত্তুর বটে, বাপের মান রেখেছে ছেলে। তবে গেছোর ছেলে গেছো হলে চোখের পানির আকাল হতো।

[38 বার পঠিত]