জোনাথন সুইফট
ভূমিকা ও অনুবাদ : মোজাফ্ফর হোসেন

জোনাথন সুইফ্ট আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে ১৬৬৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জন্মগত ভাবে আইরিশ হলেও বাবা মা ছিলেন ব্রিটিশ। সুইফ্ট ১৬৮৯ সালে প্রথম ইংল্যান্ড যান, তারপর থেকে তিনি মাঝে মধ্যেই ইংল্যান্ডে যেতেন। ইংল্যান্ডেই তাঁর লেখালেখির সুত্রপাত ঘটে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. শেষ করে ইংল্যান্ডেই কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। শেষের দিকে আয়ারল্যান্ডে ফিরে ওখানকার রাজনীতি নিয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন। লিখতে থাকেন রাজনৈতিক রচনা। তাঁর বিখ্যাতসব ব্যাঙ্গাত্মক লেখা ওই সময়েই লেখা। তখন আয়ারল্যান্ডের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ খারাপের দিকে। ডাবলিনে ভিখারিদের উৎপাত বেড়েই চলেছে। বেড়ে চলেছে ক্যাথোলিক ও প্রটেস্ট্যান্টদের মধ্যেকার বিরোধ। তিনি এসব দেখে হতাশ হয়ে পড়েন। সুইফট্ তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত স্যাটায়ার ও ফ্যান্টাসি উপন্যাস ‘গ্যালিভার্স ট্রাভেলস’ (১৭২৬) লেখার তিন বছর পর ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে সমালোচনা করে রচনা করলেন প্রবন্ধ (absurd thesis) ‘একটি বিনীত প্রস্তাব’ (A Modest Proposal, 1729)। তিনি স্যাটায়ার করলেন প্রটেস্ট্যান্ট-ক্যাথোলিকস শ্রেণিবিভেদ, চলমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের ভূস্বামীদের। বিশ্ব সাহিত্যে আজ অব্দি এটাকে অগ্রগন্য ব্যাঙ্গ রচনা (the finest examples of satire) হিসেবে গন্য করা হয়। এত ভাল গদ্য (rhetorical brilliance) বিশ্বসাহিত্যে খুব কমই আছে। সমালোচকদের ভাষায়- ‘A Modest Proposal, is deemed a masterpiece and a stunning example of the satirist’s art.’ অথবা ‘This essay is a satire master piece filled with irony.’
সুইফ্ট আয়ারল্যান্ডের চলমান সমস্যাগুলোর সমাধান হিসেবে প্রস্তাব করলেন- গরীব নিঃস্ব পরিবারের সন্তানদের যারা ইতোমধ্যে ভিক্ষাবৃত্তি, চুরি বিদ্যা, খরা, ও বেকারত্বের মাঝে জীবন্ত সমাধিস্ত হয়েছে তাদের সমাজের ধনিক শ্রেণির মানুষদের কাছে খাদ্য হিসেবে বিক্রি করার কথা। ফলে, তিনি বললেন, শুধু মাত্র আয়ারল্যান্ডের জনসংখ্যা বৃদ্ধি জনিত সমস্যারই সমাধান হবে না, সঙ্গে সঙ্গে গরীব নিঃস্ব মানুষরা তাদের সন্তানদের বিক্রি করে কিছু টাকা-পয়সাও কামাতে পারবে। তাঁর এই প্রস্তাবে ভূস্বামী ও শাসকগোষ্ঠীদের অসন্তুষ্ট হবার কোনো কারণ নেই, কেননা তারা নায্য মূল্যে এই সব শিশুদের মাংস আয়েশ করে খেতে পারবে। না, সুইফ্ট কোনো মজা করছেন না। তিনি খুব সতর্কতার সাথে তার প্রস্তাবনার বিভিন্ন দিক ও সম্ভাবনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বর্ণনা করে চলেছেন। শিশুদের বড় করে তোলার খরচ, তাদের মাংসের স্বাদের কথা, শূকর ও হরিণের মাংসের সাথে তাদের মাংসের তুলনা, বাজার দর, জনসংখ্যার আনুপাতিক হার- এসব বিষয়ের বিবরণ তিনি এতটা মনোযোগের সাথে দিয়েছেন যে তাঁকে কেউ কেউ পাগল (psycho) ভেবে থাকতে পারে।
তবে সুইফ্ট সত্যি সত্যি শিশুদের মাংস খাওয়ার জন্যে তাদের অনুপ্রাণিত করছেন না। তিনি ভূস্বামী বা প্রটেস্ট্যান্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। প্রটেস্ট্যান্টরা কিভাবে ক্যাথোলিকদের ব্যবহার করছে, তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত নষ্ট করে দিচ্ছে সেটার মাত্রা বোঝাতেই তিনি এইসব শিশুদের পশুর মতো রান্না করে খাওয়ার কথা বলছেন। সুইফ্ট তার প্রস্তাবে দুটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন- সমস্যা ও তার সমাধান। সমস্যার থেকে এখানে সমাধানটাই মানুষকে আলোড়িত করেছে বেশি। সুইফ্ট এভাবেই হয়ত আঘাত করতে চেয়েছেন তাঁর সমকালীন সমাজ বাস্তবতাকে। তিনি জানতেন সামাজিক-ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, রাজনৈতিক তত্ত্বকথা- এসব আওড়িয়ে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিংশ শতকের আগ পর্যন্ত আলোচ্য প্রবন্ধটি সমালোকদের সেই ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়নি। পূর্বের অধিকাংশ সমালোচক এটাকে প্রশংসার চোখে দেখেছেন বটে তবে তারা এটাকে শুধুমাত্র একরৈখিক দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। আধুনিক সমালোচকরা এটাকে শুধুমাত্র আইরিশ সামাজিক রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে না দেখে বৈশ্বিক পর্যায়ে আলোচনা করছেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, তারা এটাকে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতির উপর সুইফ্ট-এর আক্রমণ হিসেবে না দেখে, যে সব সামাজিক ও রাজনৈতিক মতবাদ ঐসব পরিস্থিতিকে উসকে দিয়েছে সেগুলোকে স্টাডি করার উপলক্ষ হিসেবে এই প্রবন্ধটিকে দেখছেন।

আয়ারল্যান্ডের দীনহীন দরিদ্র সন্তানরা যাতে করে আর তাদের পিতা-মাতা ও দেশের বোঝা না হয়ে কল্যাণ স্বরূপ বিবেচিত হয় তার জন্যে একটি বিনীত প্রস্তাব।

এই শহরের অলিগলি এখন ভিখারিনীতে ভরে গেছে। এদের প্রতিজনের আবার পাঁচ ছয়টা করে বাচ্চাকাচ্চা আছে- তাদের পোশাক আশাকের যে বিছ্রী অবস্থা, তাতে করে একজন ভদ্র ও সভ্য মানুষের জন্য আজকাল রাস্তা-ঘাটে চলাফেরা করাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। সৎভাবে জীবিকা উপার্জন করার কোনো পথ বের করতে না পেরে, এই মায়েরা তাদের অসহায় শিশুদের বাঁচানোর জন্যে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়; এইসব শিশু আবার বড় হয়ে কাজের অভাবে হয় চুরি বিদ্যা আত্মস্থ করে, নয়তো পেটের দায়ে স্বদেশ ছেড়ে স্পেনে চলে যায় বিদ্রোহীদের (কিং জেমস-ii এর পুত্র ১৬৮৮ সালের গ্লোরিয়াস রেভ্যুলেশন সিংহাসন হারালে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন) হয়ে যুদ্ধ করতে কিংবা ভাগ্যের সন্ধানে বারবাডোজে।
আমার ধারণা, আমার সাথে সকলে একমত হবেন যে এই অসংখ্য শিশু যাদের বেশিরভাগই আবার জন্মগতভাবে জারজ তারা বর্তমানে দেশের এই খারাপ অবস্থাকে আরো নাজুক করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে যদি কেউ এই সব শিশুদেরকে দেশের জনসাধারণের কাজে লাগার কোনো সঠিক, সহজ ও কার্যকরী পন্থা বাতলে দিতে পারে, তবে নিঃসন্দেহে এই জাতি আজীবন তাঁকে মাথায় তুলে রাখবে।
তবে আমার আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে শুধুমাত্র ভিক্ষাবৃত্তির সাথে জড়িত শিশুরাই নই বরং সেইসব শিশুরাও আছে যাদেরকে তাদের বাবা-মা ঠিকমত খাওয়াতে ও পরাতে পারে না।
আমি বহু বছর যাবত এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এবং এ পর্যন্ত যত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তার সবগুলো গভীর পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, তাদের হিসেবে বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে। তবে এটা ঠিক যে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য তাদের মায়ের স্তনই যথেষ্ট। একবছর পর্যন্ত যে টুকটাক পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন হয় তার অর্থমূল্য বড়জোর দুই শিলিং হবে যা তাদের মায়েরা খুব সহজেই জোগাড় করতে পারবে। আর আমি ঠিক এই এক বছর পরেই এদেরকে এমন করে তৈরি করতে চাচ্ছি যাতে করে এরা আর তাদের বাকী জীবনের জন্যে পিতা-মাতার কাছে বোঝা স্বরুপ হয়ে না দাঁড়ায়, বরং উল্টো এরাই তাদের বাবা-মায়ের খাবারের ব্যবস্থা করবে এবং হাজার হাজার মানুষের পোষাকের জোগান দেবে।
আমার এই পরিকল্পনায় আরো একটা বড় ধরনের সুবিধা রয়েছে। আমাদের দেশে স্বেচ্ছায় গর্ভপাত ও অবৈধ সন্তানদের হত্যা করা মায়েদের নিত্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্য বর্বরজাতিদেরও বুক ফেটে যাবে যদি তারা জানে এই সব অসহায় নিস্পাপ শিশুদের মেরে ফেলা হচ্ছে ভরণপোষনের ভয়ে, সমাজে হেয় হওয়ার ভয়ে নয়।
পরিসংখ্যান বলে, এ দেশে এখন প্রায় দেড় কোটি মানুষ বসবাস করছে, যার মধ্যে আমি একটা জরিপ চালিয়ে দেখেছি প্রায় দুই লক্ষ দম্পতি আছে যাদের বউয়েরা সন্তান ধারণের ক্ষমতা রাখে; এখান থেকে আমি ত্রিশ হাজার দম্পতিকে বাদ দিচ্ছি যারা তাদের সন্তানদের ভরণপোষনের দায়ভার বহন করতে সক্ষম, (যদিও আমার বিশ্বাস, বর্তমানে দেশের যে বেহাল দশা তাতে করে এই সংখ্যা আরো কম হবে!) তবে এটা হলপ করে বলতে পারি সন্তান জন্মদানে সক্ষম দম্পতির সংখ্যা এক লক্ষ সত্তর হাজারের কম হবে না। আমি এখান থেকে আরো ৫০ হাজার বাদ দিচ্ছি কারণ কিছু মহিলার গর্ভপাত ঘটে এবং কারো কারো সন্তান এক বছরে পেঁŠছানোর আগেই অসুখ কিংবা দুর্ঘটনায় মারা যায়। তাহলে হিসেবে দাঁড়াচ্ছে, বছরে এক লক্ষ বিশ হাজার শিশু অনিশ্চিৎ ভবিষ্যৎ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংখ্যক শিশুকে কিভাবে লালনপালন করা হবে এবং তাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে কি আশা করা যেতে পারে। আমি আগেই বলেছি, এখন পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি ভাবে কোনও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। কেননা এতো কম বয়স্ক শিশুকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করা কিংবা কৃষিকাজে নিয়োগ করা সম্ভব না। খুব কম শিশুই ছয় বছরে পেঁŠছানোর আগে চুরিবিদ্যা আত্মস্থ করতে পারে। হ্যঁা, আমি স্বীকার করছি আরো অনেক আগে থেকেই এরা এই বিদ্যার অনেক কিছু শিখে ফেলে- সময়টা তাদের জন্য শিক্ষানবিস-কাল হিসেবে কাজ করে। আমাকে এক ভদ্রলোক জানিয়েছেন, শহরের যেখানে সবচেয়ে বেশি পকেট মার, ছিচকে চুরি বেশি হয় সেখানেও ছয় বছরের শিশুর অংশগ্রহণের ঘটনা একটি কি দু’টির মতো উনি দেখেছেন।
আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা আমাকে বলেছেন, বার বছরের পূর্বে ছেলে মেয়েরা বিক্রয়যোগ্য হয় না। বিক্রি করলেও তাদের বাজার দর বড় জোর তিন থেকে সাড়ে তিন পাউন্ড হবে, যা তাদের পিতা-মাতা এবং দেশ কোনও পক্ষরেই কাজে আসবে না কেননা তাদেরকে এ পর্যন্ত বড় করে তুলতে এর থেকে কম করে হলেও চারগুণ বেশি খরচ হয়।
এখন আমি আমার প্রস্তাবের ভেতর প্রবেশ করবো, আমার বিশ্বাস এটার বিরুদ্ধে কেউ বিন্দুমাত্র আপত্তি করার হেতু খুঁজে পাবে না। লন্ডনের পরিচিত এক আমেরিকান ভদ্রলোক আমাকে বলেছিলেন- এক বছরের একটা সতেজ, স্বাস্থ্যবান শিশুর মাংস হচ্ছে সব থেকে স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু খাবার- তা সে সিদ্ধ করে, ভাজা করে, বা ঝলসিয়ে যে ভাবেই খাওয়া হোক না কেন। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, এই মাংস চাটনির সাথে কিংবা মসলা দিয়ে কষিয়ে খেলে অসম্ভব ভালো লাগবে।
এখন আমি আমার প্রস্তাবটি আপনাদের বিবেচনার জন্যে বিনীতভাবে পেশ করছি : আমি যে এক লক্ষ বিশ হাজার শিশুর কথা বলেছিলাম তাদের মধ্য থেকে বিশ হাজার শিশু গর্ভধারনের জন্য রেখে দেওয়া যেতে পারে, এদের মধ্যে চারভাগের একভাগ পুরুষ হলেই চলবে- ভেড়া, মহিষ এবং শূকরের দলে আমরা এর থেকেও কম রাখি। আমরা জানি, এসব শিশুদের মধ্যে খুব কম শিশুই পিতা-মাতার বৈধ সম্পর্কের ফসল- বিষয়টি পশুতুল্য ঐ মানুষগুলোর কাছে আহামরি কিছু নয়। ওরা নীতিবোধের মাথা অনেক আগেই খেয়ে ফেলেছে। এ জন্যেই বলছি, চারজন নারীর জন্য একজন পুরুষই যথেষ্ট। বাকী এক লক্ষ শিশু এক বছর বয়সে সমাজের প্রভাবশালী বিত্তবান লোকদের কাছে বিক্রি করা হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচার করা হবে, শিশুদেরকে আরো মেদবহুল ও মোটাসোটা করার জন্য মায়েরা যেনো বছরের শেষ মাসটাতে বেশি করে বুকের দুধ পান করায়। একটা শিশুর মাংস দিয়ে বন্ধুরা দু’ দুইবার আনন্দ ভোজ করতে পারবে, এবং একটি পরিবারের ক্ষেত্রে হাত অথবা পায়ের চারভাগের একভাগ দিয়েই একবারের খাওয়া হয়ে যাবে, মসলা আর লবন দিয়ে হালকা জ্বাল দিয়ে রেখে চারদিন পর্যন্ত আয়েশ করে খাওয়া যাবে আর শীতকালে তো কথাই নেই!
আমি হিসেব কষে দেখেছি, সদ্য জন্ম নেওয়া একটা শিশুর ওজন সাধারণত ১২ পাউন্ড হয়, এবং যদি বেশ যত্ন করে বড় করা হয় তবে এক বছরে তা বেড়ে ২৪ পাউন্ড হয়। আমি মেনে নিচ্ছি, এই খাবারটা বেশ সুস্বাদু হবে এবং ভূস্বামীদের টেবিলে বেশ মানিয়েও যাবে; যেহেতু এইসব ভূস্বামীরা ইতোমধ্যে এদের বেশিরভাগেরই পিতা-মাতাকে সাবাড় করে ফেলেছে, এই সব শিশুদের ওপরও তাদের শতভাগ হক আছে।
শিশুদের মাংস বছরের সব ঋতুতেই পাওয়া যাবে তবে মার্চ মাসজুড়ে আরো সস্তা হবে। এক নামকরা ফরাসী লেখক ও চিকিৎসক বলেছেন, মাছ সহজ-লভ্য হওয়ার কারণে রোমান কাথলিকদের দেশে শিশু জন্মহার তুলনামূলক বেশি। মাংসের চাহিদা সাধারণভাবেই বেড়ে যাবে কারণ এই শিশুদের তিনভাগের একভাগ হচ্ছে পোপিশ (রোমান ক্যাথলিক চার্চ) এবং এর ফলে আরো যে সুবিধা হবে তা হল রাজ্যে প্যাপিস্টদের (রোমান ক্যাথলিক) সংখ্যা কমে যাবে।
আমি ইতোমধ্যে ভিখারিদের একটি সন্তান মানুষ করতে কেমন খরচা হয় তার একটা খসড়া তৈরি করেছি (এই লিস্টে শ্রমিক এবং পাঁচ ভাগের চারভাগ কৃষকও অন্তর্ভুক্ত) : কাপড় চোপড় ধরে বছরে দুই শিলিং। এবং আমার বিশ্বাস কোনও ভদ্রলোকই একটা নাদুস-নুদুস শিশুর জন্যে দশ শিলিং দিতে আপত্তি করবে না। কারণ ইতোপূর্বে বলেছি, একটা শিশু দিয়ে একটা পরিবারের খুব ভালোভাবেই চারবারের খাবার হয়ে যাবে। ফলত, এ দেশের ভূসম্পত্তি বিশিষ্ট ভদ্রলোকেরা দায়িত্বশীল জমিদার হিসেবে গন্য হবে এবং প্রজাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হবে। মায়েরা আট শিলিং নিট লাভ করবে যা তাকে পরবর্তী শিশু বড় করে তোলা পর্যন্ত চালিয়ে নেবে।
যারা খুব মিতব্যয়ী ও ধান্দাবাজ টাইপের (অস্বীকার করার জো নেই বর্তমানে এ জাতীয় মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে) তারা মৃতের খাল ছাড়িয়ে রাখতে পারে যা দিয়ে ভদ্রমহিলাদের জন্যে সৌখিন হাত মোজা ও ভদ্রলোকদের জন্যে গ্রীষ্মকালীন জুতা তৈরি করা যাবে। এ জন্যে আমাদের ডাবলিনের সুবিধা মতো স্থানে কসাইখানা স্থাপন করা যেতে পারে, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি এক্ষেত্রে কসাইয়ের কোনও অভাব হবে না। তবে আমি পরামর্শ দেবো, শিশুদেরকে টাটকা কিনে তাদেরকে সিদ্ধ করে চাকু দিয়ে চামড়াচ্যূত করানোর জন্যে, যেমনটি আমরা শুকরের ক্ষেত্রে করে থাকি।
একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও মর্যাদা সম্পন্ন ব্যাক্তি যার মহৎ গুনের কথা আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি, আমাদের আলাপচারিতাই খুশি হয়ে আমার প্রস্তাবের কিঞ্চিৎ পরিমার্জনা করে বলেছেন যে এই দেশের বহু ভদ্রলোক হরিণের মাংসের স্বাদ বার থেকে চৌদ্দ বছরের তরুণ তরুণীদের মাংসে মেটাতে পারবেন, যেখানে প্রতিটা দেশে এই বয়সী অসংখ্য তরুণ-তরুনী কাজের অভাবে না খেতে পেয়ে মরে যাচ্ছে। যদিও বা বেঁচে থাকে তাহলে তাদের পিতা-মাতা বা নিকট আত্মীয়রা তাদেরকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে। আর তাছাড়া আজকাল হরিণের মাংসেরও বেশ আকাল পড়েছে। কিন্তু আমার বন্ধুকে যথার্থ সম্মান দেখিয়েই বলছি, আমি তার সাথে সম্পূর্ন সহমত হতে পারছি না। কারণ, আমার এক আমেরিকান বন্ধু তার অভিজ্ঞতা থেকে টিন-এজ ছেলেদের শরীর নিয়ে যেমনটি বলেছিলেন, তাদের মাংস সাধারণত শক্ত ও চর্বিহীন হয়- স্কুল-বালকদের কথাই ধরা যাক- প্রতিনিয়ত লাফালাফির ফলে তাদের শরীর শুকিয়ে যায় ফলে মাংসের স্বাদ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। আর এই বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে? আমি বিনয়ের সাথে বলছি, জনগনের লোকসান হবে কেননা তারা খুব শীঘ্রই সন্তান উৎপাদনে সক্ষম হবে। তাছাড়া এটা অসম্ভব নয় যে কিছু বিবেকবান মানুষ এটার নিন্দাও করতে পারে।
কিন্তু আমার বন্ধুকে সঠিক প্রমাণ করতে, সে স্বীকার করেছিল যে এই সুবিধাজনক কৌশলটি ফরমোজা দ্বীপের এক বাসিন্দা তার মাথায় ঢুকিয়েছিল, যে কিনা বাইশ বছর আগে থেন্স থেকে লন্ডনে এসেছিল এবং এক আলাপচারিতাই আমার বন্ধুকে বলেছিল, তার দেশে যদি কখনো কোনো যুবককে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়, জল্লাদ তার মৃতদেহ ভদ্রসমাজে মুখরোচক খাবার হিসেবে বিক্রি করে। এবং তার সময়ে পনের বছরের এক নাদুস-নুদুস মেয়ের মরদেহ, যাকে রাজাকে বিষ খাওয়ানোর অপরাধে ঝুলিয়ে মারা হয়েছিল, মন্ত্রি পরিষদের একজন ও এক আইনজীবী যৌথভাবে চার হাজার ক্রাউন দিয়ে কিনে নিয়েছিল। আমি স্বীকার করছি, যদি আমাদের এই শহরে কতিপয় অসহায়-অন্যের মুখাপেক্ষি নাদুস-নুদুস বালিকাকে একই ভাবে ব্যবহার করা হয় তাহলে এই রাজ্যের কোনো ক্ষতি হবে না।
কিছু ব্যাক্তি আছেন যারা দেশের গরীবদের মধ্যে বৃদ্ধ, রোগাগ্রস্থ বা অক্ষমদের দেখে খুবই হতাশ। এবং আমি আমার চিন্তাকে এমনভাবে প্রসারিত করবো যাতে করে দেশের এই পীড়াদায়ক পরিস্থিতিরও লাঘব ঘটে। তবে আমিও যে ওদের ব্যাপারে কম ব্যথিত তা কিন্তু না। কারণ এটা সবাই জানে যে তারা প্রতিদিনই ঠান্ডায়, ক্ষুধায়, রোগে, শোকে ও দুর্যোগে যত্রতত্র মারা যাচ্ছে- যত দ্রুত সম্ভব। এবং আমাদের দেশের তরুণদের দশা কাজের অভাবে না খেতে পেয়ে এমন হয়ে দাঁড়ায় যে আকস্মিক ভাবে কোনো কাজ পেলেও তা করার সামর্থ তাদের আর থাকে না।
আমি বোধহয় মূল বিষয় থেকে খানিকটা সরে এসেছি, কাজেই এখন আবার আমার প্রস্তাবিত প্রস্তাবে ফিরে যাচ্ছি। আমি মনে করি, আমার প্রস্তাবের কারণ এখন সম্পূর্ন পরিস্কার এবং এর সুবিধা বহুবিধ।
প্রথম সুবিধা হচ্ছে, এটা দেশে প্যাপিস্টদের (ক্যাথোলিকস) সংখ্যা অনেক কমিয়ে দেবে, যাদের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। তারা এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু, কেননা তারা ঘরে বসে এই দেশকে প্রিটেন্ডারদের (বিদ্রোহীদের) হাতে তুলে দেওয়ার ফন্দি আটে এবং এই দেশ ছেড়ে অন্যদেশে চলে যাওয়াটাকেই অনেক গুরুত্ব সহকারে দেখে। খাজনার অর্থ বিবেককে বিসর্জন দিয়ে বিশপ-শাসিত গির্জায় প্রদান করে।
দ্বিতীয় সুবিধা হচ্ছে, সবচেয়ে গরীব প্রজারাও একটা অবলম্বন খুঁজে পাবে। তারা তাদের জমিদারদের খাজনাও প্রদান করতে পারবে, যেহেতু এইসব জমিদাররা ইতোমধ্যেই তাদের গবাদি পশু, জমির ফসল ও আরও অনেক কিছুই ছিনিয়ে নিয়েছে।
তৃতীয়ত, দুই বছর বা তার কিছুটা বড় এক লক্ষ শিশুর ভরণপোষণের জন্যে বছরপ্রতি মাথাপিছু দশ শিলিং এর বেশি খরচ হয়। ফলত, দেখা যাচ্ছে, জাতীয় রাজস্ব খাতে বছরপ্রতি পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড যোগ হবে। আর সেই সাথে সমাজের ভোজনরসিক সভ্য ভদ্রলোকদের কাছে তাদের মাংস বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা আয় হবে যা সম্পূর্ণ আমাদেরই থাকবে।
চতুর্থত, এই সব শিশুর জন্মদাত্রীরা তাদের শিশুকে বিক্রি করে বছরে আট শিলিং করে কামাতে পারবে, এবং এক বছরের পর এই শিশুর ভরণপোষণের দায়িত্ব থেকে তারা মুক্তি পাবে।
পঞ্চমতম, বড় বড় হোটেল-রেস্তোরায় যেখানে দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা আয়েশ করে খেয়ে থাকে সেখানে এই মাংসের বেশ কদর হবে। এছাড়াও, যারা বাসায় বন্ধুদের নিয়ে আয়েশ করে খেতে পছন্দ করে- যারা নিজেদেরকে ভোজন রসিক ও ভাল পাচিকা হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে- যাদের আতিথেয়তার বেশ সুনাম আছে- সকলের জন্যে বিষয়টি বেশ সুখকর হবে।
ষষ্ঠত, এতে করে বিয়ে করাতে এক ধরনের হিড়িক পড়ে যাবে, যেটার জন্যে বেশির ভাগ রাষ্ট্রের আইন তৈরি করা লাগে। এটার ফলে মায়েরা তাদের সন্তানের প্রতি আরও বেশি যত্মবান ও আবেগী হয়ে উঠবে, কেননা আগে যেখানে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হতো, দ্বারে দ্বারে ভিক্ষে করে তাদের পালতে হত, সেখানে তারা (শিশুরা) লাভজনক ব্যবসায়ের মূলধন হিসেবে পরিগণিত হবে। অতি শীঘ্রই আমরা দেখতে পাবো মায়েদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে, কে বেশি স্বাস্থ্যবান সন্তান বাজারে আনতে পারে তা নিয়ে। স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের প্রতি ঢের বেশি যত্মবান হয়ে উঠবে যেমনটি তারা গর্ভবতী ঘোড়া, গাভী, মেষ, ভেড়াদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এ সময় তারা গর্ভপাতের ভয়ে তাদের স্ত্রীদের গায়ে লাথি মারবে না বা আঘাত করবে না (যেটা এখন প্রায় হরহামেশা করা হয়)।
আরও অনেক সুবিধার কথা বলা সম্ভব। তার মধ্যে যেটা না বললেই না- শুকনো মাংসের পাশাপাশি কয়েক হাজার চামড়া বাইরে রপ্তানী করা যাবে। শুকরের মাংস খেতে খেতে আমাদের ভেতরে একঘেয়েমিতা চলে এসেছে, তাছাড়া ওদের সংখ্যা বেশ কমে যাচ্ছে। যাদের শূকরের মাংস খুব প্রিয় তারা আস্বস্ত হবেন জেনে- শূকরের মাংসের থেকে যত্নে পালিত এক বছরের নাদুস নুদুস শিশুর মাংস ঢের বেশি সুস্বাদু ও আভিজাত্যের প্রতীক হবে। একটা শিশুর ঝলসানো মাংসে একটা ছোটখাট সেলিব্রেশন খুব ভালভাবেই সেরে ফেলা যাবে। ধরে নেওয়া যায়, এই শহরের প্রায় এক হাজার পরিবার শিশুদের মাংসের নিয়মিত ক্রেতা হবে। যাদের নিয়মিত ক্রয়ের সামর্থ থাকবে না তারা বিবাহ কিংবা অন্যান্য পারিবারিক অনুষ্ঠানে এই মাংসের স্বাদ উপভোগ করতে চাইবে। আমি একটা হিসেব কষে দেখেছি- শুধুমাত্র ডাবলিনে বছর প্রতি হাজার বিশেক খাল বা চামড়া হবে। আরও আট হাজার পাওয়া যাবে অন্যান্য শহর থেকে। এটা ঠিক এর ফলে দেশে জনসংখ্যা বেশ কমে যাবে। হ্যঁা, আমি স্বীকার করছি, এবং এই কারণেই আমি আমার প্রস্তাবটা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবার কথা ভাবছি। তবে পাঠকরা লক্ষ করে দেখবেন- আমি শুধুমাত্র আয়ারল্যান্ডের একটি রাজ্যের হিসেবে প্রস্তাবটা পেশ করছি। এটাকে অন্য কোথাও পরিচালনা করার লক্ষ্য আমার নেই।
আমি নিজেই বহুদিন থেকে এই বিষয় নিয়ে ভাবছি। অনেক উচ্চবিলাসী, সূদুরপ্রসারী চিন্তা ভাবনা করে অনেক অলস সময় নষ্ট করার পর অবশেষে এই কার্যকরী ভাবনাটা মাথায় এসেছে। চিন্তাটা নতুন হলেও অনেক বাস্তব সম্পন্ন ও ফলপ্রসু বলে আমি মনে করছি। এটাতে তেমন কোনও খরচও হবে না এবং বেশ ঝামেলামুক্ত। আশা করছি ইংল্যান্ডের জন্যে এটা ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হবে না।
তবে বলছি না যে আমার প্রস্তাবটা গ্রহণ করতেই হবে। যদি কেনো বিজ্ঞজন এর থেকেও সহজ, সস্তা ও এতো সুন্দর ত্রুটিহীন-কার্যকরী একটা পন্থা বাতলে দিতে পারেন আমি তাকে স্বাগত জানাবো। তবে তাদেরকে আমি দুটো বিষয়ে খুব নজর দিতে বলবো। এক, দেশের এখন যা অবস্থা- তারা কীভাবে এক লক্ষ কর্মহীন-আশ্রয়হীন মানুষের খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করবে। দুই, আমি বুকে হাত দিয়ে বলছি এই প্রস্তাবের পেছনে সাধারণ জনগনের কল্যাণ, দেশের অর্থনীতির প্রসার, শিশুদের একটা গতি করা, দরিদ্রদের মুক্তি দেওয়া এবং ধনী ও ভদ্রসমাজের কিছু আনন্দ যোগ করা ছাড়া আমার বিন্দুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত নেই। আমার সবচেয়ে ছোট সন্তানের বয়স এখন নয় এবং আমার স্ত্রী সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা অনেক আগেই হারিয়েছে। সুতরাং এ থেকে এক পয়সাও কামানোর সুযোগ আমার আর নেই।

[276 বার পঠিত]