|মনু’র বৈদিক চোখ: নারীরা মানুষ নয় আদৌ|পর্ব-০৮/..|

(সপ্তম পর্বের পর…)

মনুশাস্ত্রে নারীর গুরুত্ব ও ব্যবহার
পুরুষের দৃষ্টিতে যা কিছু নেতি বা নিকৃষ্ট তারই উৎস হিসেবে নারীকে মনুশাস্ত্রে যথেচ্ছভাবে হীন খলচরিত্রে উপস্থাপন ও চিহ্নিত করা হলেও সমাজজীবনে নারীর উপস্থিতির অবশ্যম্ভাবীতার কারণে তাকে গুরুত্ব না-দিয়েও উপায় নেই পুরুষের। কিন্তু তাও হয়েছে পুরুষের অনুকুলে, উদ্দেশ্যমূলক-

‘পতির্ভার্যাং সম্প্রবিশ্য গর্ভো ভূত্বেহ জায়তে।
জায়ায়াস্তদ্ধি জায়াত্বং যদস্যাং জায়তে পুনঃ।।’
পতি শুক্ররূপে ভার্যার গহ্বরমধ্যে প্রবেশ করে এই পৃথিবীতে তার গর্ভ থেকে পুনরায় পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করে। জায়ার (অর্থাৎ ভার্যার) জায়াত্ব এই যে তার মধ্যে পতি পুনর্বার জন্মগ্রহণ করে এবং এই কারণেই ভার্যাকে জায়া বলা হয়। অতএব জায়াকে সর্বতোভাবে রক্ষা করতে হবে। (৯/৮)।

কিন্তু এ কথার আড়ালে মনুর অন্তর্গত পুরুষতান্ত্রিক প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গিটা হচ্ছে একরৈখিক-

‘পৌংশ্চলাচ্চলচিত্তাচ্চ নৈঃস্নেহ্যচ্চ স্বভাবতঃ।
রক্ষিতা যত্নতোহপীহ ভর্তৃষবেতা বিকুর্বতে।।’
যেহেতু স্ত্রীলোক স্বভাবত পুংশ্চলী [যে কোনও পুরুষ মানুষ এদের দৃষ্টি-পথে পড়লে এদের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে- ঐ পুরুষের সাথে কিভাবে সম্ভোগ করবো- এই প্রকার যে চিত্তবিকার, তাই পুংশ্চলীত্ব], চঞ্চলচিত্ত [ধর্মকার্যাদি শুভ-বিষয়ে চিত্তের অস্থিরতা দেখা যায়] এবং স্নেহহীন, সেই কারণে এদের যত্নসহকারে রক্ষা করা হলেও এরা স্বামীর প্রতি বিরূপ হয়ে থাকে। (৯/১৫)।

পিতৃতন্ত্র যে প্রকৃতপক্ষেই নারীর মর্যাদা দিতে জানে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অবশ্য স্ত্রী যেখানে আক্ষরিক অর্থেই শ্রমদাসী বা সেবাদাসী, সেখানে মর্যাদার প্রশ্নও প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। তাই স্ত্রীকে কখনো বন্ধুভাবাপন্ন ভাবা মনুশাস্ত্রের বিধান নয়, বরং কর্তব্যে অবহেলাজনিত অপরাধ করলে স্পষ্ট করে প্রহাররূপ শাসনের কথাই নির্দেশ করা হয়েছে-

‘ভার্যা পুত্রশ্চ দাসশ্চ শিষ্যো ভ্রাতা চ সোদরঃ
প্রাপ্তাপরাধাস্তাড্যাঃ স্যূ রজ্জ্বা বেণুলেন বা।।’
স্ত্রী, পুত্র, ভৃত্য, শিষ্য এবং কনিষ্ঠ সহোদরভ্রাতা অপরাধ করলে সূক্ষ দড়ির দ্বারা কিংবা বেতের দ্বারা শাসনের জন্য প্রহার করবে। (৮/২৯৯)।

এখানে স্ত্রীকে পুত্র, শিষ্য বা ভৃত্যের পর্যায়ে দেখার অর্থই হচ্ছে নারী শেষপর্যন্ত দাসীই। তবে তা সাধারণ দাসী নয়, খুবই গুরুত্বপূর্ণ দাসী। এবং পুরুষ হচ্ছে তার সর্বত্রগামী প্রভু। এই সর্বত্রগামী প্রভুত্ব কায়েম রাখার স্বার্থেই নারীকে একধরনের গুরুত্বও দেয়া হয়েছে বৈ কি-

‘প্রজনার্থং মহাভাগাঃ পূজার্হা গৃহদীপ্তয়ঃ।
স্ত্রিয়ঃ শ্রিয়শ্চ গেহেষু ন বিশেষোহস্তি কশ্চন।।’
স্ত্রীলোকেরা সন্তান প্রসব ও পালন করে বলে [‘প্রজন’ বলতে গর্ভধারণ থেকে সন্তান পালন পর্যন্ত ক্রিয়াকলাপকে বোঝায়] তারা অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী [এ কারণে, তারা বস্ত্রারঙ্কারাদি প্রদানের দ্বারা বহুসম্মানের যোগ্য]; এরা গৃহের দীপ্তি অর্থাৎ প্রকাশস্বরূপ হয় [স্ত্রীলোক বাড়িতে না থাকলে কুটুম্ব বা আত্মীয়বর্গের আদর-আপ্যায়ন কিছুই হয় না। পুরুষের ধনৈশ্বর্য থাকলেও যদি ভার্যা না থাকে, তা হলে বাড়িতে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনেরা উপস্থিত হলে গৃহস্বামী নিজে তাদের প্রত্যেককে পান-ভোজনাদির দ্বারা আপ্যায়িত করতে পারে না] এই কারণে, স্ত্রীলোকদের সকল সময়ে সম্মান-সহকারে রাখা উচিত, বাড়িতে স্ত্রী এবং শ্রী- এদের মধ্যে কোনও ভেদ নেই। (৯/২৬)।

তাই-

‘যত্র নার্য্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ।
যত্রৈতাস্তু ন পূজ্যন্তে সর্বাস্তত্রাফলাঃ ক্রিয়াঃ।।’
যে বংশে স্ত্রীলোকেরা বস্ত্রালঙ্কারাদির দ্বারা পূজা বা সমাদর প্রাপ্ত হন, সেখানে দেবতারা প্রসন্ন থাকেন (আর প্রসন্ন হয়ে তাঁরা পরিবারের সকলকে অভীষ্ট ফল প্রদান করেন), আর যে বংশে স্ত্রীলোকদের সমাদর নেই, সেখানে (যাগ, হোম, দেবতার আরাধনা প্রভৃতি) সমস্ত ক্রিয়াই নিষ্ফল হয়ে যায়। (৩/৫৬)।
.
‘এতাবানেব পুরুষো যজ্জায়াত্মা প্রজেতি হ।
বিপ্রাঃ প্রাহুস্তথা চৈতদ্ যো ভর্তা সা স্মৃতাঙ্গনা।।’
স্ত্রী এবং সন্তানকে নিয়ে পুরুষ পরিপূর্ণস্বরূপ হয়, একথা বেদিবদ ব্রাহ্মণগণ বলেন; কাজেই স্ত্রীও যে পতিও সে অর্থাৎ স্ত্রী হলো পতির আত্মভূত অংশস্বরূপ। (৯/৪৫)।

কিন্তু নারীর এ সমাদর যে স্বার্থহীন নয়, মনুশান্ত্রে তা অস্পষ্ট নয়। কেননা পুরুষের স্বার্থ বিন্দুমাত্র ব্যহত হলে কিভাবে রক্ষিতা স্ত্রীটি নিমেষে পরিত্যাজ্য হয়ে যায় তা আমরা আগেই দেখেছি। পুরুষের এই স্বার্থ হচ্ছে শর্তহীন ভোগ ও সম্পদ রক্ষার নিমিত্তে উত্তরাধিকারী উৎপাদনের স্বার্থ। এগুলো যথাযথ পূর্ণ করার মধ্যেই মূলত নারীর গুরুত্ব নিহিত। এ উভয় স্বার্থেই পুরুষ স্পষ্টতই আপোষহীন, কোথাও ছাড় দিতে নারাজ। একটি মনোদৈহিক সন্তুষ্টি, অন্যটি সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রিকত্ব। তাই ভোগের স্বার্থ পূর্ণ না হলে যেমন নারীর কোন মূল্যই নেই, তেমনি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার উৎস পুত্র জন্ম দিতে না পারলেও সে নারীর আর সমাদর থাকে না। পুত্রের মাধ্যমেই পুরুষের বংশধারা রক্ষিত হয় এবং পুত্রের মাধ্যমে সম্পত্তির মালিকানাও পুরুষের অধীনন্থ থাকে। আর এই পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার ধারা বহাল রাখতে নারীকে তার সর্বস্বের বিনিময়েই পুত্র উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ ব্যস্ত থাকতে হয়। যদিও পুত্রের উপর মাতার কোন অধিকার নাই। তবু এটাই তার অস্তিত্বের প্রশ্ন। এবং অনুধাবনের বিষয় যে, এটা পিতৃতন্ত্রেরও অস্তিত্বের প্রশ্ন। সে কারণেই পতি অক্ষম হলে কিংবা সন্তানহীন অবস্থায় মারা গেলে বংশধারা রাকল্পে সমস্ত মুখোশ ছিঁড়ে ফেলেও পিতৃবংশ উন্মত্ত হয়ে ওঠে স্ত্রী কিংবা বিধবার গর্ভে পুত্র জন্মানোর নিমিত্তে এক ধরনের নিয়োগ-প্রথার মাধ্যমে-

‘দেবরাদ্বা সপিণ্ডাদ্বা স্ত্রিয়া সম্যঙ্ নিযুক্তয়া।
প্রজেপ্সিতাধিগন্তব্যা সন্তানস্য পরিক্ষয়ে।।’
সন্তানের পরিক্ষয়ে অর্থাৎ সন্তান-উৎপত্তি না হওয়ায় বা সন্তান-জন্মানোর পর তার মৃত্যু হওয়ায় বা কন্যার জন্ম হলে তাকে পুত্রিকারূপে গ্রহণ না করায় নারী শ্বশুর-শাশুড়ি-পতি প্রভৃতি গুরুজনদের দ্বারা সম্যকভাবে নিযুক্ত হয়ে দেবর (অর্থাৎ স্বামীর জ্যেষ্ঠ বা কনিষ্ঠ ভ্রাতা) অথবা সপিণ্ডের (স্বামীর বংশের কোনও পুরুষের) সাহায্যে অভিলষিত সন্তান লাভ করবে। (৯/৫৯)।

বৈদিক বিধান এমনই অলৌকিক শাস্ত্র যে সম্পদরক্ষায় পুত্রের প্রয়োজনে মনুসংহিতার ৫/১৫৭ সংখ্যক শ্লোকে (ইতঃপূর্বে উদ্ধৃত) বর্ণিত বিধবার কর্তব্যও সাময়িক রদ হয়ে যায়-

‘সংস্থিতস্যানপত্যস্য সগোত্রাৎ পুত্রমাহরেৎ।
তত্র যদ্ রিক্থজাতং স্যাত্তত্তস্মিন্ প্রতিপাদয়েৎ।।’
কোনও ব্যক্তি যদি অপুত্র অবস্থায় মারা যায়, তাহলে তার স্ত্রী গুরুজনদের দ্বারা নিযুক্ত হয়ে সগোত্র পুরুষের দ্বারা পুত্র উৎপাদন করবে এবং মৃত ব্যক্তির যা কিছু ধনসম্পত্তি তা ঐ পুত্রকে অর্পণ করবে। (৯/১৯০)।

কিভাবে এই নিয়োগ-প্রথাটি কার্যকর করা হবে মনুশাস্ত্রে তাও উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে-

‘বিধবায়াং নিযুক্তস্তু ঘৃতাক্তো বাগ্যতো নিশি।
একমুৎপাদয়েৎ পুত্রং ন দ্বিতীয়ং কথঞ্চন।।’
বিধবা নারীতে অথবা অক্ষম পতি থাকা সত্ত্বেও সধবাতেও পতি-প্রভৃতি গুরুজনের দ্বারা নিযুক্ত দেবর বা কোনও সপিণ্ড ব্যক্তি ঘৃতাক্ত শরীরে মৌনাবলম্বন করে রাত্রিতে একটিমাত্র পুত্র উৎপাদন করবে, কখনো দ্বিতীয় পুত্র উৎপাদন করবে না [নিশি অর্থাৎ রাত্রিতে কথাটি বলার তাৎপর্য হলো, সেখানে প্রদীপ প্রভৃতি আলো থাকবে না]। (৯/৬০)।
.
‘দ্বিতীয়মেকে প্রজনং মন্যন্তে স্ত্রীষু তদ্বিদঃ।
অনিবৃতং নিয়োগার্থং পশ্যন্তো ধর্মতস্তয়োঃ।।’
কোনও কোনও সন্তানোৎপত্তিবিদ আচার্য বলেন, একপুত্র অপুত্রের মধ্যে গণ্য, এইজন্য ঐভাবে দ্বিতীয় পুত্র উৎপাদন করানো যায়। অতএব এক পুত্রের দ্বারা নিয়োগকর্তার নিয়োগোদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না বলে শিষ্টাচার অনুসারে ঐ স্ত্রী এবং পূর্ব-নিযুক্ত ব্যক্তিই দ্বিতীয় পুত্র উৎপাদন করতে পারবে। (৯/৬১)।

অতঃপর-

‘বিধবায়াং নিয়োগার্থে নির্বৃতে তু যথাবিধি।
গুরুবচ্চ স্নুষাবচ্চ বর্তেয়াতাং পরস্পরম্।।’
বিধবা নারীতে যথাবিধি নিয়োগের প্রয়োজন সিদ্ধ হলে [যে কারণে নিয়োগ করা হয়, তা-ই এখানে নিয়োগের বিষয়। তা হলো স্ত্রী-পুরুষের সম্প্রযোগ থেকে ক্রিয়ানিষ্পত্তি অর্থাৎ স্ত্রী-লোকের গর্ভধারণ পর্যন্ত] উভয়ের মধ্যে পূর্ববৎ আচরণই চলতে থাকবে। সেটি হলো গুরুবৎ স্নুষাবৎ; অর্থাৎ পুরুষের পক্ষে ঐ নারী যদি জ্যেষ্ঠভ্রাতার স্ত্রী হয় তা হলে তার প্রতি গুরুর মতো, আর যদি কনিষ্ঠ ভ্রাতার স্ত্রী হয়, তাহলে তার প্রতি পুত্রবধুর মতো আচরণ করবে। (৯/৬২)।
.
‘নিযুক্তৌ যৌ বিধিং হিত্বা বর্তেয়াতান্তু কামতঃ।
তাবুভৌ পতিতৌ স্যাতাং স্নুষাগ-গুরুতল্পগৌ।।’
জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ ভ্রাতা নিয়োগের জন্য নিযুক্ত হয়েও যদি পূর্বোক্ত ঘৃতাক্তাদি নিয়ম লঙ্ঘন করে কামনা চরিতার্থ করার ইচ্ছায় পরস্পরের ভার্যাতে আভিগমন করে, তাহলে জ্যেষ্ঠভ্রাতা পুত্রবধুগমন এবং কনিষ্ঠ ভ্রাতা গুরুপত্নীগমন-রূপ দোষে পতিত হবে। (৯/৬৩)।

বড় অদ্ভুত বিধান ! পরস্পর নিবিড় যৌনসংসর্গে অভিজ্ঞতায় পৌঁছেও কোনরূপ আবেগ বা কামনাহীন এমন যান্ত্রিক আচরণবিধি পালনের নির্দেশ থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, পিতৃতন্ত্রে মানবীয় আবেগ-অনুভূতির কোন স্থান নেই। আর নারী সেখানে আক্ষরিক অর্থেই শস্যক্ষেত্রস্বরূপ। সম্পদ রক্ষার্থে পিতৃতন্ত্রের এই নিয়োগপ্রথার বৈধতা নিরূপণ করেও আবার কূটাভাষের মাধ্যমে তাকে প্রতিষেধ করারও চেষ্টা করা হয়েছে-

‘নান্যস্মিন্ বিধবা নারী নিযোক্তব্যা দ্বিজাতিভিঃ।
অন্যস্মিন্ হি নিযুঞ্জানা ধর্মং হন্যুঃ সনাতনম্।।’
বিধবা নারীকে দ্বিজাতিগণ কখনো অন্য পুরুষে নিযুক্ত করবে না, কারণ, অন্য পুরুষে যারা ঐ ভাবে তাকে নিযুক্ত করে, তারা সনাতন ধর্ম উল্লঙ্ঘন করে। (৯/৬৪)।

কিভাবে উল্লঙ্ঘন হয় ?-

‘নোদ্বাহিকেষু মন্ত্রেষু নিয়োগঃ কীর্ত্যতে ক্বচিৎ।
ন বিবাহবিধাবুক্তং বিধবাবেদনং পুনঃ।।’
বিবাহবিষয়ক যে সব মন্ত্র আছে তার কোথাও নিয়োগের প্রসঙ্গ নেই [অর্থাৎ বিবাহসম্পর্কিত যত সব মন্ত্র আছে সেগুলি প্রত্যেকটিতেই বিবাহকারীর নিজেরই উৎপাদিত সন্তানের কথা বলা আছে] আর বিবাহবিষয়ক-শাস্ত্রতেও বিধবা-আবেদনের অর্থাৎ বিধবা বিধবাবিবাহের বা বিধবা-গমনের কথা নেই। (৯/৬৫)।

অর্থাৎ নিয়োগবিধি উল্লেখ করে ধর্মীয় বিধানে তাকে আবার যতটুকু সম্ভব নিরুৎসাহিত করার কৌশলী বিভ্রম ছড়িয়ে মূলত সম্পদরক্ষায় নারীকে ব্যবহার ও ভোগের ভিন্ন একটি উপায়ের পেছনদরজা দেখিয়ে দেয়া হয়েছে। অতএব, নারীর অবস্থা তথৈবচ। মূলত প্রচলিত সামাজিক প্রথা হিসেবে নিয়োগবিধির আলোকে বিধবা-বিবাহের মাধ্যমে নারীর পুনর্বিবাহ প্রতিরোধকল্পেই এই বিভ্রান্তি পিতৃতন্ত্র কর্তৃক সৃষ্ট বলে মনে হয়। অন্যদিকে পিতৃতন্ত্রে সম্পদরক্ষারও কী অদ্ভুত উপায় !
.
আবার বিবাহের আগে যে বাগদত্তা কন্যার বরের মৃত্যু হয় এবং শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী যেহেতু তাকে অন্যত্র সম্প্রদান করা যায় না (৯/৭১), তার ক্ষেত্রেও ভিন্ন নিয়োগপ্রথার উল্লেখ মনুশাস্ত্রে দেখা যায়-

‘যস্যা ম্রিয়েত কন্যায়া বাচা সত্যে কৃতে পতিঃ।
তামনেন বিধানেন নিজো বিন্দেত দেবরঃ।।’
বিবাহের আগে কোনও বাগদত্তা কন্যার বরের মৃত্যু হলে, নিম্নোক্ত বিধান অনুসারে বরের সহোদর ভ্রাতা তাকে বিবাহ করবে। (৯/৬৯)।
.
‘যথাবিধ্যধিগম্যৈনাং শুকবস্ত্রাং শুচিব্রতাম্।
মিথো ভজেতাপ্রসবাৎ সকৃৎ সকৃদৃতাবৃতৌ।।’
উক্ত দেবর কন্যাটিকে শাস্ত্রোক্ত নিয়ম অনুসারে বিবাহ করে তাকে গমন-কালীন নিয়মানুসারে বৈধব্যচিহ্নসূচক-শুকবস্ত্র পরিয়ে এবং কায়মনোবাক্যে তাকে শুদ্ধাচারিণী রেখে প্রত্যেক ঋতুকালে তাতে এক এক বার গমন করবে যতদিন না সে গর্ভ-ধারণ করে। (৯/৭০)।

ন্যুনতম মানবিক অধিকারও হরণের মাধ্যমে নিরূপায় বানিয়ে নারীনিবর্তনের এমন নির্মম নজির কেবল পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদী সমাজ ও ধর্মশাস্ত্রেই সম্ভব।

(চলবে…)
[১ম পর্ব ] [২য় পর্ব ] [৩য় পর্ব] [৪র্থ পর্ব] [৫ম পর্ব ] [৬ষ্ঠ পর্ব] [৭ম পর্ব] [*] [৯ম পর্ব ]

About the Author:

‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।’ -- প্রাচীন গ্রীক কবি ইউরিপিডিস (৪৮০-৪০৬ খ্রীঃ পূঃ)

মন্তব্যসমূহ

  1. অবর্ণন রাইমস জানুয়ারী 11, 2012 at 2:05 পূর্বাহ্ন - Reply

    দারুণ লেখা। রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখ করার মতো অত্যন্ত মূল্যবান উপাদান এরকম লেখা।
    রণদীপমদাকে তাঁর অনন্য লেখনীর জন্য বিনম্র অভিবাদন।

    • রণদীপম বসু জানুয়ারী 11, 2012 at 8:28 অপরাহ্ন - Reply

      @অবর্ণন রাইমস, ধন্যবাদ আপনাকে। লেখাটা তৈরির সময়ই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টাও মাথায় রেখেছিলাম । যখন এটা লিখি তখনও অনলাইনে কোন রেফারেন্স ছিলো না এটার। তাই সবার কাজে লাগলে পরিশ্রমটা নিশ্চয়ই সার্থক হবে !

  2. আফরোজা আলম জানুয়ারী 10, 2012 at 11:55 পূর্বাহ্ন - Reply

    দাদা লেখাটা তো দারুণ দিছেন। বারবার পড়তে হয়।

    • রণদীপম বসু জানুয়ারী 11, 2012 at 8:23 অপরাহ্ন - Reply

      @আফরোজা আলম, আপু, যখন ইচ্ছে যত খুশি পড়ার জন্যেই তো ব্লগে লেখা ! যাদের বেশি বেশি পড়া দরকার ছিলো, তারা যদি পড়তো !!!

  3. সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড জানুয়ারী 10, 2012 at 1:25 পূর্বাহ্ন - Reply

    লেখাটি পড়ে ভাল লাগলো। বিশেষ করে প্রত্যেকটি অনুবাদের জন্য লেখককে ধন্যবাদ জানাই।প্রত্যেকটি ধর্মেই নারীর দারিদ্রতা চোখে পড়ার মত।

    • নিটোল জানুয়ারী 10, 2012 at 7:20 অপরাহ্ন - Reply

      (Y)

    • রণদীপম বসু জানুয়ারী 11, 2012 at 8:20 অপরাহ্ন - Reply

      @সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড, মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ আপনাকে। তবে তথ্যবিভ্রম সংশোধনের জন্য বলে রাখি, সংস্কৃত থেকে অনুবাদ আমার নয়, ড. মানবেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় শাস্ত্রীর। সিরিজের শেষে তথ্যসূত্রে গ্রন্থসূচি উল্লেখ থাকবে।

মন্তব্য করুন