বিবর্তনের ধারায় লিঙ্গের আবির্ভাব নিয়ে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি আছে। অনেকেই লিঙ্গসৃষ্টির মত জটিল একটি প্রক্রিয়া আত্মস্থ করতে না পেরে বিবর্তনবাদে আস্থা রাখতে পারছেন না। অনেক ধর্মবাদী আবার এই সুযোগে সৃষ্টিতত্ত্ব হাজির করে। তাই বিবর্তনের পথ ধরে লিঙ্গ তথা পুং এবং স্ত্রী প্রজাতির উদ্ভব নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, লিঙ্গসৃষ্টির প্রক্রিয়াটি আসলেই অত্যন্ত জটিল। স্বাভাবিক বিবেচনায় আমাদের কাছে এটা সহজেই বোধগম্য হয় যে যৌণ প্রক্রিয়ার চেয়ে অযৌণ প্রক্রিয়ায় বংশবিস্তার করা অনেক সহজ। যেমন:

১. অযৌন প্রক্রিয়ায় প্রতিবার প্রজননে জন্য যেখানে একটি জীবের প্রয়োজন হয় সেখানে যৌন প্রজণনের ক্ষেত্রে প্রতি প্রজননে দুটি জীবের প্রয়োজন।অর্থাৎ অযৌন প্রজননে বংশধর সৃষ্টির সুযোগ বেশী। নীচের ছবিটি দেখুন।

বাম পাশের ছবিতে যৌণ প্রক্রিয়ায় এবং ডান পাশের ছবিতে অযৌণ প্রক্রিয়ায় বংশবিস্তার দেখানো হল। ছবি থেকে বোঝা যাচ্ছে অযৌণ পদ্ধতিতে প্রতিবারে যৌণ প্রজননের চেয়ে দ্বিগুণ বংশধর পাওয়া যায়।

২. যৌণ প্রজননের রসায়ন অত্যন্ত জটিল। এক্ষেত্রে মাইটোটিক কোষ বিভাজনের পাশাপাশি মায়োটিক কোষ বিভাজন হয় যার মাধ্যমে জননকোষ তৈরি হয়। পুংজনন কোষ এবং স্ত্রী জনন কোষকে পরষ্পর সান্যিধ্যে আসতে হয় যার ফলে জাইগোট তৈরি হয়। এই জাইগোট থেকে নতুন বংশধর তৈরি হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে বেশ কিছু জটিল ধাপে।

৩. যৌণ জননে তথ্যের অপচয় ঘটে। ব্যপারটি হল এমন: মনে করুন আপনি একটি বই পড়বেন। সেজন্য বাজার থেকে দুটি বই কিনে আনতে হল যার একটি আরেকটির পরিপূরক। দুটিতেই সমান সংখ্যাক পৃষ্ঠা আছে। এখন আপনি একটি বইয়ের কিছু পৃষ্ঠা এবং অপর বইয়ের কিছু পৃষ্ঠা জোড়া দিয়ে নিজের মত করে একটি বই তৈরি করলেন। একটি বইয়ের যত নম্বর পৃষ্ঠা নিলেন অপর বইয়ের তত নম্বর পৃষ্ঠা বাদ দিলেন। তাহলে নতুন বইটি তৈরি শেষে উভয় বইয়ের অর্ধেকটা করে অপচয় হয়ে যাবে। যৌন জনন অনেকটা এই রকম। এক্ষেত্রে পুরুষ এবং নারীর মোট বৈশিষ্ট্যের অর্ধেকটার অপচয় ঘটে।

অযৌণ জননের তুলনায় যৌণ জননের এতসব অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও বিবর্তন প্রক্রিয়ায় যৌণ জনন উৎসাহিত হয়েছে। অধিকাংশ জীবেরই একমাত্র যৌন পদ্ধতিতেই জনন হয়। আসলে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় অযৌন জননের তুলনায় যৌণ জননের বেশ কিছু সুবিধা আছে। এগুলো হচ্ছে:

১. উন্নত বৈশিষ্ট্যের বিস্তার: যৌণ জননে পুরুষ জীব এবং স্ত্রী জীব একত্রে মিলিত হয় এবং এর মাধ্যমে উভয়ের বৈশিষ্ট্যগুলো মিশ্রিত হয়। এই মিশ্রনে যা ঘটতে পারে তাহল:

ক. পুরুষ এবং স্ত্রী উভয়ের উন্নত বৈশিষ্ট্যগুলো একই বংশধরে যেতে পারে। (উন্নত বৈশিষ্ট্য বলতে পরিবেশের জন্য অনুকুল বৈশিষ্ট্য বোঝানো হচ্ছে)

খ. পুরুষের উন্নত বৈশিষ্ট্য এবং স্ত্রীর অনুন্নত বৈশিষ্ট্যগুলো একই বংশধরে যেতে পারে।

গ. পুরুষের অনুন্নত বৈশিষ্ট্য এবং স্ত্রীর উন্নত বৈশিষ্ট্যগুলো একই বংশধরের মধ্যে গমন করতে পারে।

ঘ. উভয়েরই অনুন্নত বৈশিষ্ট্যগুলো একই সন্তানের মধ্যে যেতে পারে।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে, যৌণ জননের মাধ্যমে অন্তত ২৫% ক্ষেত্রে পিতা-মাতার ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো একত্রিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে পরবর্তীতে এই ভলো বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীব থেকে ভালো বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবের বংশধর তৈরি হবে এবং এভাবে একপর্যায়ে শুধু ভালো বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবগুলোই প্রতিযোগীতায় টিকে থাকবে। অপরদিকে অযৌণ জননের ক্ষেত্রে ভালো বৈশিষ্ট্যগুলোর এধরনের একত্রীকরনের কোন সুযোগ নেই।

২. নতুন প্রকরণ (variation) সৃষ্টি:
যৌণ প্রজননের মাধ্যমে নতুন নতুন ভ্যরিয়েশন তৈরি হয়। এই কারনেই সহোদর ভাই-বোনের মধ্যে বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য দেখা যায়। অযৌণ প্রজনন হলে নতুন প্রজন্মে উল্লেখ্যযোগ্য পার্থক্য তৈরি হত না। (ক্লোনিংএ যা হয়)। বিবর্তন প্রক্রিয়ায় ভ্যরিয়েশনের গুরুত্ব অপরিসীম। ভ্যারিয়েশনের প্রধান প্রভাবসমূহ হল:

ক. বিভিন্ন প্রকার বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বংশধর সৃষ্টি হয়। ফলে তাদের চাহিদার মধ্যেও পার্থক্য থাকে এবং পরিবেশের উপাদানগুলো আরো সুষমভাবে আত্মীকরন হয়।

খ. নতুন ভ্যারিয়েশনে কিছু কিছু বংশধরের মধ্যে নির্দিষ্ট কোন বৈশিষ্ট্যের আধিক্য দেখা দেয় এবং অন্য কিছু বৈশিষ্ট্যের কমতি দেখা দেয়। এর ফলে কিছু কিছু বংশধরের পরিবর্তিত পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

৩. প্রতিযোগীতা: যৌণ প্রক্রিয়া প্রায়ই হয় প্রতিযোগীতামূলক। যদি পুরুষের মধ্যে প্রতিযোগীতা হয় তাহলে সবচেয়ে যোগ্য পুরুষ জীবটি স্ত্রী জীবটির সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ পায়। অপরদিকে স্ত্রী জীবের মধ্যে প্রতিযোগীতা হলে যোগ্য স্ত্রীটি পুরুষ জীবের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ পায় (অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষের মধ্যেই প্রতিযোগীতা দেখা যায়)। যোগ্যতা নিরূপিত হয় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বৈশিষ্টৈর আলোকে। এর ফলে যোগ্য জীবটির বৈশিষ্ট্য পরবর্তী বংশে গমন নিশ্চিত হয়।

৪. ক্ষতিকর মিউটেশন[১] রহিতকরন: প্রজাতির সকল বংশগতীয় বৈশিষ্ট্য তার ডিএনএ-র মধ্যে সংরক্ষিত থাকে। জীবিত অবস্থায় বিভিন্ন কারনে ডিএনএ-তে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটতে পারে। সবচেয়ে বেশী মিউটেশন ঘটে কোষ বিভাজনের পর্যায়ে ডিএনএ-এর অনুলিপি তৈরি করার সময় দুর্ঘটনা বশতঃ। এছাড়াও তেজষ্ক্রিয় বিকিরন বা পরিবেশগত কারনেও মিউটেশন ঘটে থাকে। এই মিউটেশনের ফলে ডিএনএ-এর তথ্যে পরিবর্তন ঘটে যার ফলে জীবের বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটে। এই মিউট্যান্ট ডিএনএ যদি পরবর্তি বংশে গমন করে তাহলে সেই জীবের পরিবর্তিত বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হতে পারে। সেই বৈশিষ্ট্য কখনো কখনো নতুন বংশধরের জন্য ভালো হয় কিন্তু ভালোর তুলনায় ক্ষতিকর প্রভাবই বেশী হয় । যৌন প্রজননের মাধ্যমে এই ক্ষতিকর মিউটেশনগুলোর প্রভাব দূর হয় (১ম পয়েন্টে উল্লিখিত উন্নত বৈশিষ্ট্যের বিস্তারের মাধ্যমে)।

৫. ক্ষতিকর জীন রহিতকরন: যেহেতু জীবকোষগুলোর মধ্যে প্রতিনিয়ত বিভাজন চলছে সেহেতু এদের মধ্যে প্রায়শঃই দুর্ঘটনাজনিত মিউটেশন দেখা যায়। যেহেতু অধিকাংশ মিউটেশনই ক্ষতিকর ফলে একপ্রজন্ম থেকে আরেকপ্রজন্মে গমন করতে করতে একসময় মোট মিউটেশনের পরিমান এত বেশী হয়ে পড়বে যে সেই জীবটি আদতে বিকল হয়ে যেতে পারে। যৌন প্রজননের মাধ্যমে যেহেতু মিউটেশনের ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে ওঠা যায়। ফলে জীনের বৈশিষ্ট রক্ষা পায়।

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা গেলো যদিও যৌণ প্রজনন অত্যন্ত জটিল তথাপি বিবর্তন প্রক্রিয়ায় এর গুরুত্ব এত বেশী যে অযৌণ প্রক্রিয়াকে হটিয়ে উচ্চশ্রেনীর জীবে যৌন প্রজনন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নাহয় গেল যৌণ প্রজননের সুবিধা। যৌণ প্রজননের আবির্ভাব কিভাবে হল অর্থাৎ লিঙ্গের বিভাজন কিভাবে ঘটল সেটা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে। লিঙ্গ সৃষ্টি বা যৌণ জননের উদ্ভব নিয়ে বেশ কিছু থিওরী আছে। এগুলো সম্বন্ধে নীচে আলোচনা করা হল:

১. যৌণ প্রজননকারী সকল জীবের পূর্বপুরুষ অভিন্ন এবং তা হল একটি আদিপ্রকৃতির এককোষীয় জীব তথা ব্যক্টেরিয়া। আমরা জানি মিউটেশন প্রক্রিয়ায় একপর্যায়ে ডিএনএ যথেষ্ট পরিমান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এমনই ক্ষতিগ্রস্থ অবস্থায় কোন একটি ব্যক্টেরিয়ার ডিএনএ অপর ব্যক্টেরিয়ার ডিএনএ-এর সংস্পর্শে আসে এবং অপরর ব্যক্টেরিয়ার ডিএনএ-এর সংস্পর্শে এসে ডিপ্লয়েড[২] অবস্থায় পরিণত হয়। এই ডিপ্লয়েড অবস্থায় তাদের ডিএনএ-এর মধ্যে মিশ্রন ঘটে এবং উন্নত বৈশিষ্ট্যের বিস্তার প্রক্রিয়ায় মায়োসিস[৩] প্রক্রিয়ায় বিভাজনের মাধ্যমে তাদের বিস্তার ঘটে। যেহেতু এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা বৈশিষ্ট্যগত সুবিধা আছে সেহেতু এই ডিপ্লয়েড কোষের প্রচুর বংশধর পরিবেশের সাথে মানানসই হয়ে যায় এবং ব্যপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এদেরই কোন এক বংশধরের মধ্য এই বৈশিষ্ট্য ক্রমশ জটিল আকার ধারন করে, পরবর্তীতে প্রাধান্য বিস্তার করে ।

২. বংশবৃদ্ধি প্রক্রিয়া প্রথমটির মতই কিন্তু এই ক্ষেত্রে ধারনা করা হয় এক পরজীবী ব্যাক্টেরিয়া যখন তার পোষকে আশ্রয় নেয় তখন তাদের ডিএনএ-র মধ্যে রিকম্বিনেশন ঘটে।

৩. এই মতবাদে বলা হয়, একব্যক্টেরিয়া যখন আরেক ব্যক্টেরিয়াকে ভক্ষন করার চেষ্টা করে তখন সেটা সম্পূর্ণরূপে হজম না হতে পেরে ভক্ষকের ডিএনএ-এর সংষ্পর্শে এসে রেপ্লিকেট হওয়া শুরু করে।

এভাবে রেপ্লিকেট হওয়ায় যেহেতু নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি হয় সেহেতু দেখাগেলো অল্পসময়ের মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অনেকগুলো ব্যক্টেরিয়া তৈরি হল। এবং,

১. একপর্যায় এমন বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ব্যাক্টেরিয়া সৃষ্টি হল যে প্রত্যেকটা কোষ আর একে অপরের সাথে মিলিত হতে পারছে না। বিশেষ কিছু ব্যক্টেরিয়া অন্য বিশেষ কিছু ব্যক্টেরিয়ার সাথে মিলিত হতে পারছে। প্রথম শ্রেণীকে আমরা M এবং দ্বিতীয় শ্রেনীকে F দ্বারা প্রকাশ করলাম।

২. পযায়ক্রমে কোষ আরো জটিলাকার ধারন করল। প্রোকারিয়ট কোষ ইউক্যারিয়ট কোষে পরিণত হল। তখনো M এবং F টাইপের কোষের মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেল না। তবে মিলিত হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে বাছ-বিছার দেখা গেল। অর্থাৎ M টাইপ শুধু F টাইপের সাথেই মিলিত হতে লাগল। এর মধ্যে ব্যতিক্রমও ছিলো কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচনে তারা বাদ পড়ে গেল।

৩. এই পর্যায়ে কোষগুলো নিজেদের মধ্যে চেইন তৈরি করে বাস করতে শুরু করল। কিন্তু যৌনতার ক্ষেত্রে দেখা গেল শুধু M দিয়ে তৈরি চেইন, শুধু F দিয়ে তৈরি চেইনের সাথে সফলভাবে মিলিত হতে পারছে। (যেহেতু মিশ্রিত লিঙ্গের কোষের মধ্যে মিলন খুব সহজ নয়।)

৪. বহুকোষী চেইনের মধ্যে শ্রমবিভাজন শুরু হল। সবকোষের হাতে আর যৌণ ক্ষমতা রইল না। বিশেষ বিশেষ কিছু কোষ যৌণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিবর্তিত কোষব্যবস্থায় সব M ধারী চেইন হয়তো সব F ধারী চেইনের সাথে মিলনে সফল হত না। যারা সফল হত না তাদের ধারা বিলুপ্ত হয়ে গেল আর যার সফল হল তাদের ধারাটি রয়ে গেল।

৫. ক্রমশ M জাতীয় চেইন আরো জটিলাকার ধারন করে Male এবং F জাতীয় চেইন Female এ পরিণত হল। মেইলের মধ্য পুং জননাঙ্গ এবং ফিমেইলে স্ত্রী জননাঙ্গ তৈরি হল। যেসব মেইলের জননাঙ্গ সেসব ফিমেইলের উপযুক্ত কেবল তারাই টিকে রইল বাকিরা বিলুপ্ত হয়ে গেল।

৬. ক্রমশ বেশ কিছু ভ্যারিয়েশনের পুং জননাঙ্গের গ্যামেটগুলো স্ত্রী গ্যামেটের সহচার্যে আসার জন্য লেজ প্রাপ্ত হল। যেসব ভ্যারিয়েশনের লেজ তৈরি হল না তারা প্রতিযোগীয়তায় টিকতে না পেরে বিলুপ্ত হয়ে গেল অথবা পরিমানে কমে গেল।

৭. বিবর্তনের সাথে সাথে আরো অনেক জটিল জটিল যৌণ বৈশিষ্ট্য ও আচরন পরিলক্ষিত হতে লাগল।

এভাবেই এককোষী ব্যক্টেরিয়া থেকে বহুকোষী মানুষ পর্যন্ত যৌনতার বিবর্তন ঘটল।

পরিশিষ্ট:

১. মিউটেশন(Mutation): বহুকোষী জীবে জাইগোট থেকে পূর্ণাঙ্গ দেহ তৈরি হওয়ার পথে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে।একটি দেহকোষের ক্রোমোসোমে অবস্থিত ডিএনএ-তে একটি জীবের যাবতীয় বংশগত বৈশিষ্ট্য কোডের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ থাকে (যদিও সব কোষে সব বৈশিষ্ট্য কাজে লাগে না)। যখনই কোষ বিভাজন শুরু হয় তখন ডিএনএর অনুলিপির মাধ্যমে নতুন কোষেও সেই বৈশিষ্ট্যের কপি তৈরি হয়ে যায়। এই অনুলিপি প্রক্রিয়াটি কিছুটা এক ক্যাসেট থেকে আরেক ক্যাসেটে গান কপি করার মত। প্রতিবার কপি করার সময় গানের কোয়ালিটি কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। এই পরিবর্তনটিকেই মিউটেশন বলা যায়। দীর্ঘদিনের মিউটেশনের মাধ্যমেই একপ্রজাতির জীব থেকে নতুন বৈশিষ্ট্যের ভিন্ন প্রজাতির জীবের উদ্ভব হয়।

2. ডিপ্লয়েড (diploid): বহুকোষী জীবের জননকোষ ব্যতীত অন্যান্য দেহ কোষে একজাতীয় প্রতিটি বংশগতীয় বৈশিষ্ট্যের জন্য একজোড়া জীন থাকে। যেমন ধরি, পিতার কাছ থেকে কালো চুলের বৈশিষ্ট্য এবং মাতার কাছ থেকে সোনালি চুলের বৈশিষ্ট্য সন্তানের মধ্যে প্রবেশ করল। এই দুটি বৈশিষ্ট্য দুটি ভিন্ন ক্রোমোসোমের ডিএনএ-র মধ্যে থাকবে এবং এই ভিন্ন ক্রোমোসোমগুলো জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করবে। মানুষের ক্ষেত্রে ২৩ জোড়া ক্রোমোসোম থাকে। দেহকোষ থেকে যখন জনন কোষ তৈরি হয় তখন এই জোড়া ভেঙ্গে জনন কোষে ২৩টি করে ক্রোমোসোম অবস্থান করে। অর্থাৎ দেহকোষে জননকোষের চেয়ে দ্বিগুণ সংখ্যক ক্রোমোসোম থাকে। এই জোড়ায় আবদ্ধ অবস্থাকে ডিপ্লয়েড দশা এবং একক অবস্থাকে হ্যাপ্লয়েড (Haploid) দশা বলা হয়।

৩. মায়োসিস (meiosis): এটা একধরনের কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া যেখানে ডিপ্লয়েড দশার কোষ থেকে হ্যাপ্লয়েড দশার কোষ তৈরি হয়। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় বিভাজিত কোষে ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের অর্ধেক হয়। উচ্চশ্রেনীর জীবে দেহকোষ থেকে জনন কোষ তৈরি হয় মায়োসিস বিভাজনের মাধ্যমে।

তথ্যসূত্র:
http://www.trueorigin.org/sex01.asp
http://en.wikipedia.org/wiki/Asexual_reproduction
http://library.thinkquest.org/22016/contribute/asex_sex.htm
বিবর্তন সম্পর্কিত উইকিপিডিয়ার কিছু নিবন্ধ।

[366 বার পঠিত]