বিবর্তনের ধারায় লিঙ্গের আবির্ভাব

By |2012-01-17T07:45:15+00:00জানুয়ারী 9, 2012|Categories: জৈব বিবর্তন|24 Comments

বিবর্তনের ধারায় লিঙ্গের আবির্ভাব নিয়ে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি আছে। অনেকেই লিঙ্গসৃষ্টির মত জটিল একটি প্রক্রিয়া আত্মস্থ করতে না পেরে বিবর্তনবাদে আস্থা রাখতে পারছেন না। অনেক ধর্মবাদী আবার এই সুযোগে সৃষ্টিতত্ত্ব হাজির করে। তাই বিবর্তনের পথ ধরে লিঙ্গ তথা পুং এবং স্ত্রী প্রজাতির উদ্ভব নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, লিঙ্গসৃষ্টির প্রক্রিয়াটি আসলেই অত্যন্ত জটিল। স্বাভাবিক বিবেচনায় আমাদের কাছে এটা সহজেই বোধগম্য হয় যে যৌণ প্রক্রিয়ার চেয়ে অযৌণ প্রক্রিয়ায় বংশবিস্তার করা অনেক সহজ। যেমন:

১. অযৌন প্রক্রিয়ায় প্রতিবার প্রজননে জন্য যেখানে একটি জীবের প্রয়োজন হয় সেখানে যৌন প্রজণনের ক্ষেত্রে প্রতি প্রজননে দুটি জীবের প্রয়োজন।অর্থাৎ অযৌন প্রজননে বংশধর সৃষ্টির সুযোগ বেশী। নীচের ছবিটি দেখুন।

বাম পাশের ছবিতে যৌণ প্রক্রিয়ায় এবং ডান পাশের ছবিতে অযৌণ প্রক্রিয়ায় বংশবিস্তার দেখানো হল। ছবি থেকে বোঝা যাচ্ছে অযৌণ পদ্ধতিতে প্রতিবারে যৌণ প্রজননের চেয়ে দ্বিগুণ বংশধর পাওয়া যায়।

২. যৌণ প্রজননের রসায়ন অত্যন্ত জটিল। এক্ষেত্রে মাইটোটিক কোষ বিভাজনের পাশাপাশি মায়োটিক কোষ বিভাজন হয় যার মাধ্যমে জননকোষ তৈরি হয়। পুংজনন কোষ এবং স্ত্রী জনন কোষকে পরষ্পর সান্যিধ্যে আসতে হয় যার ফলে জাইগোট তৈরি হয়। এই জাইগোট থেকে নতুন বংশধর তৈরি হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে বেশ কিছু জটিল ধাপে।

৩. যৌণ জননে তথ্যের অপচয় ঘটে। ব্যপারটি হল এমন: মনে করুন আপনি একটি বই পড়বেন। সেজন্য বাজার থেকে দুটি বই কিনে আনতে হল যার একটি আরেকটির পরিপূরক। দুটিতেই সমান সংখ্যাক পৃষ্ঠা আছে। এখন আপনি একটি বইয়ের কিছু পৃষ্ঠা এবং অপর বইয়ের কিছু পৃষ্ঠা জোড়া দিয়ে নিজের মত করে একটি বই তৈরি করলেন। একটি বইয়ের যত নম্বর পৃষ্ঠা নিলেন অপর বইয়ের তত নম্বর পৃষ্ঠা বাদ দিলেন। তাহলে নতুন বইটি তৈরি শেষে উভয় বইয়ের অর্ধেকটা করে অপচয় হয়ে যাবে। যৌন জনন অনেকটা এই রকম। এক্ষেত্রে পুরুষ এবং নারীর মোট বৈশিষ্ট্যের অর্ধেকটার অপচয় ঘটে।

অযৌণ জননের তুলনায় যৌণ জননের এতসব অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও বিবর্তন প্রক্রিয়ায় যৌণ জনন উৎসাহিত হয়েছে। অধিকাংশ জীবেরই একমাত্র যৌন পদ্ধতিতেই জনন হয়। আসলে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় অযৌন জননের তুলনায় যৌণ জননের বেশ কিছু সুবিধা আছে। এগুলো হচ্ছে:

১. উন্নত বৈশিষ্ট্যের বিস্তার: যৌণ জননে পুরুষ জীব এবং স্ত্রী জীব একত্রে মিলিত হয় এবং এর মাধ্যমে উভয়ের বৈশিষ্ট্যগুলো মিশ্রিত হয়। এই মিশ্রনে যা ঘটতে পারে তাহল:

ক. পুরুষ এবং স্ত্রী উভয়ের উন্নত বৈশিষ্ট্যগুলো একই বংশধরে যেতে পারে। (উন্নত বৈশিষ্ট্য বলতে পরিবেশের জন্য অনুকুল বৈশিষ্ট্য বোঝানো হচ্ছে)

খ. পুরুষের উন্নত বৈশিষ্ট্য এবং স্ত্রীর অনুন্নত বৈশিষ্ট্যগুলো একই বংশধরে যেতে পারে।

গ. পুরুষের অনুন্নত বৈশিষ্ট্য এবং স্ত্রীর উন্নত বৈশিষ্ট্যগুলো একই বংশধরের মধ্যে গমন করতে পারে।

ঘ. উভয়েরই অনুন্নত বৈশিষ্ট্যগুলো একই সন্তানের মধ্যে যেতে পারে।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে, যৌণ জননের মাধ্যমে অন্তত ২৫% ক্ষেত্রে পিতা-মাতার ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো একত্রিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে পরবর্তীতে এই ভলো বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীব থেকে ভালো বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবের বংশধর তৈরি হবে এবং এভাবে একপর্যায়ে শুধু ভালো বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবগুলোই প্রতিযোগীতায় টিকে থাকবে। অপরদিকে অযৌণ জননের ক্ষেত্রে ভালো বৈশিষ্ট্যগুলোর এধরনের একত্রীকরনের কোন সুযোগ নেই।

২. নতুন প্রকরণ (variation) সৃষ্টি:
যৌণ প্রজননের মাধ্যমে নতুন নতুন ভ্যরিয়েশন তৈরি হয়। এই কারনেই সহোদর ভাই-বোনের মধ্যে বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য দেখা যায়। অযৌণ প্রজনন হলে নতুন প্রজন্মে উল্লেখ্যযোগ্য পার্থক্য তৈরি হত না। (ক্লোনিংএ যা হয়)। বিবর্তন প্রক্রিয়ায় ভ্যরিয়েশনের গুরুত্ব অপরিসীম। ভ্যারিয়েশনের প্রধান প্রভাবসমূহ হল:

ক. বিভিন্ন প্রকার বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বংশধর সৃষ্টি হয়। ফলে তাদের চাহিদার মধ্যেও পার্থক্য থাকে এবং পরিবেশের উপাদানগুলো আরো সুষমভাবে আত্মীকরন হয়।

খ. নতুন ভ্যারিয়েশনে কিছু কিছু বংশধরের মধ্যে নির্দিষ্ট কোন বৈশিষ্ট্যের আধিক্য দেখা দেয় এবং অন্য কিছু বৈশিষ্ট্যের কমতি দেখা দেয়। এর ফলে কিছু কিছু বংশধরের পরিবর্তিত পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

৩. প্রতিযোগীতা: যৌণ প্রক্রিয়া প্রায়ই হয় প্রতিযোগীতামূলক। যদি পুরুষের মধ্যে প্রতিযোগীতা হয় তাহলে সবচেয়ে যোগ্য পুরুষ জীবটি স্ত্রী জীবটির সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ পায়। অপরদিকে স্ত্রী জীবের মধ্যে প্রতিযোগীতা হলে যোগ্য স্ত্রীটি পুরুষ জীবের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ পায় (অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষের মধ্যেই প্রতিযোগীতা দেখা যায়)। যোগ্যতা নিরূপিত হয় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বৈশিষ্টৈর আলোকে। এর ফলে যোগ্য জীবটির বৈশিষ্ট্য পরবর্তী বংশে গমন নিশ্চিত হয়।

৪. ক্ষতিকর মিউটেশন[১] রহিতকরন: প্রজাতির সকল বংশগতীয় বৈশিষ্ট্য তার ডিএনএ-র মধ্যে সংরক্ষিত থাকে। জীবিত অবস্থায় বিভিন্ন কারনে ডিএনএ-তে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটতে পারে। সবচেয়ে বেশী মিউটেশন ঘটে কোষ বিভাজনের পর্যায়ে ডিএনএ-এর অনুলিপি তৈরি করার সময় দুর্ঘটনা বশতঃ। এছাড়াও তেজষ্ক্রিয় বিকিরন বা পরিবেশগত কারনেও মিউটেশন ঘটে থাকে। এই মিউটেশনের ফলে ডিএনএ-এর তথ্যে পরিবর্তন ঘটে যার ফলে জীবের বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটে। এই মিউট্যান্ট ডিএনএ যদি পরবর্তি বংশে গমন করে তাহলে সেই জীবের পরিবর্তিত বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হতে পারে। সেই বৈশিষ্ট্য কখনো কখনো নতুন বংশধরের জন্য ভালো হয় কিন্তু ভালোর তুলনায় ক্ষতিকর প্রভাবই বেশী হয় । যৌন প্রজননের মাধ্যমে এই ক্ষতিকর মিউটেশনগুলোর প্রভাব দূর হয় (১ম পয়েন্টে উল্লিখিত উন্নত বৈশিষ্ট্যের বিস্তারের মাধ্যমে)।

৫. ক্ষতিকর জীন রহিতকরন: যেহেতু জীবকোষগুলোর মধ্যে প্রতিনিয়ত বিভাজন চলছে সেহেতু এদের মধ্যে প্রায়শঃই দুর্ঘটনাজনিত মিউটেশন দেখা যায়। যেহেতু অধিকাংশ মিউটেশনই ক্ষতিকর ফলে একপ্রজন্ম থেকে আরেকপ্রজন্মে গমন করতে করতে একসময় মোট মিউটেশনের পরিমান এত বেশী হয়ে পড়বে যে সেই জীবটি আদতে বিকল হয়ে যেতে পারে। যৌন প্রজননের মাধ্যমে যেহেতু মিউটেশনের ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে ওঠা যায়। ফলে জীনের বৈশিষ্ট রক্ষা পায়।

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা গেলো যদিও যৌণ প্রজনন অত্যন্ত জটিল তথাপি বিবর্তন প্রক্রিয়ায় এর গুরুত্ব এত বেশী যে অযৌণ প্রক্রিয়াকে হটিয়ে উচ্চশ্রেনীর জীবে যৌন প্রজনন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নাহয় গেল যৌণ প্রজননের সুবিধা। যৌণ প্রজননের আবির্ভাব কিভাবে হল অর্থাৎ লিঙ্গের বিভাজন কিভাবে ঘটল সেটা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে। লিঙ্গ সৃষ্টি বা যৌণ জননের উদ্ভব নিয়ে বেশ কিছু থিওরী আছে। এগুলো সম্বন্ধে নীচে আলোচনা করা হল:

১. যৌণ প্রজননকারী সকল জীবের পূর্বপুরুষ অভিন্ন এবং তা হল একটি আদিপ্রকৃতির এককোষীয় জীব তথা ব্যক্টেরিয়া। আমরা জানি মিউটেশন প্রক্রিয়ায় একপর্যায়ে ডিএনএ যথেষ্ট পরিমান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এমনই ক্ষতিগ্রস্থ অবস্থায় কোন একটি ব্যক্টেরিয়ার ডিএনএ অপর ব্যক্টেরিয়ার ডিএনএ-এর সংস্পর্শে আসে এবং অপরর ব্যক্টেরিয়ার ডিএনএ-এর সংস্পর্শে এসে ডিপ্লয়েড[২] অবস্থায় পরিণত হয়। এই ডিপ্লয়েড অবস্থায় তাদের ডিএনএ-এর মধ্যে মিশ্রন ঘটে এবং উন্নত বৈশিষ্ট্যের বিস্তার প্রক্রিয়ায় মায়োসিস[৩] প্রক্রিয়ায় বিভাজনের মাধ্যমে তাদের বিস্তার ঘটে। যেহেতু এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা বৈশিষ্ট্যগত সুবিধা আছে সেহেতু এই ডিপ্লয়েড কোষের প্রচুর বংশধর পরিবেশের সাথে মানানসই হয়ে যায় এবং ব্যপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এদেরই কোন এক বংশধরের মধ্য এই বৈশিষ্ট্য ক্রমশ জটিল আকার ধারন করে, পরবর্তীতে প্রাধান্য বিস্তার করে ।

২. বংশবৃদ্ধি প্রক্রিয়া প্রথমটির মতই কিন্তু এই ক্ষেত্রে ধারনা করা হয় এক পরজীবী ব্যাক্টেরিয়া যখন তার পোষকে আশ্রয় নেয় তখন তাদের ডিএনএ-র মধ্যে রিকম্বিনেশন ঘটে।

৩. এই মতবাদে বলা হয়, একব্যক্টেরিয়া যখন আরেক ব্যক্টেরিয়াকে ভক্ষন করার চেষ্টা করে তখন সেটা সম্পূর্ণরূপে হজম না হতে পেরে ভক্ষকের ডিএনএ-এর সংষ্পর্শে এসে রেপ্লিকেট হওয়া শুরু করে।

এভাবে রেপ্লিকেট হওয়ায় যেহেতু নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি হয় সেহেতু দেখাগেলো অল্পসময়ের মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অনেকগুলো ব্যক্টেরিয়া তৈরি হল। এবং,

১. একপর্যায় এমন বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ব্যাক্টেরিয়া সৃষ্টি হল যে প্রত্যেকটা কোষ আর একে অপরের সাথে মিলিত হতে পারছে না। বিশেষ কিছু ব্যক্টেরিয়া অন্য বিশেষ কিছু ব্যক্টেরিয়ার সাথে মিলিত হতে পারছে। প্রথম শ্রেণীকে আমরা M এবং দ্বিতীয় শ্রেনীকে F দ্বারা প্রকাশ করলাম।

২. পযায়ক্রমে কোষ আরো জটিলাকার ধারন করল। প্রোকারিয়ট কোষ ইউক্যারিয়ট কোষে পরিণত হল। তখনো M এবং F টাইপের কোষের মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেল না। তবে মিলিত হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে বাছ-বিছার দেখা গেল। অর্থাৎ M টাইপ শুধু F টাইপের সাথেই মিলিত হতে লাগল। এর মধ্যে ব্যতিক্রমও ছিলো কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচনে তারা বাদ পড়ে গেল।

৩. এই পর্যায়ে কোষগুলো নিজেদের মধ্যে চেইন তৈরি করে বাস করতে শুরু করল। কিন্তু যৌনতার ক্ষেত্রে দেখা গেল শুধু M দিয়ে তৈরি চেইন, শুধু F দিয়ে তৈরি চেইনের সাথে সফলভাবে মিলিত হতে পারছে। (যেহেতু মিশ্রিত লিঙ্গের কোষের মধ্যে মিলন খুব সহজ নয়।)

৪. বহুকোষী চেইনের মধ্যে শ্রমবিভাজন শুরু হল। সবকোষের হাতে আর যৌণ ক্ষমতা রইল না। বিশেষ বিশেষ কিছু কোষ যৌণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিবর্তিত কোষব্যবস্থায় সব M ধারী চেইন হয়তো সব F ধারী চেইনের সাথে মিলনে সফল হত না। যারা সফল হত না তাদের ধারা বিলুপ্ত হয়ে গেল আর যার সফল হল তাদের ধারাটি রয়ে গেল।

৫. ক্রমশ M জাতীয় চেইন আরো জটিলাকার ধারন করে Male এবং F জাতীয় চেইন Female এ পরিণত হল। মেইলের মধ্য পুং জননাঙ্গ এবং ফিমেইলে স্ত্রী জননাঙ্গ তৈরি হল। যেসব মেইলের জননাঙ্গ সেসব ফিমেইলের উপযুক্ত কেবল তারাই টিকে রইল বাকিরা বিলুপ্ত হয়ে গেল।

৬. ক্রমশ বেশ কিছু ভ্যারিয়েশনের পুং জননাঙ্গের গ্যামেটগুলো স্ত্রী গ্যামেটের সহচার্যে আসার জন্য লেজ প্রাপ্ত হল। যেসব ভ্যারিয়েশনের লেজ তৈরি হল না তারা প্রতিযোগীয়তায় টিকতে না পেরে বিলুপ্ত হয়ে গেল অথবা পরিমানে কমে গেল।

৭. বিবর্তনের সাথে সাথে আরো অনেক জটিল জটিল যৌণ বৈশিষ্ট্য ও আচরন পরিলক্ষিত হতে লাগল।

এভাবেই এককোষী ব্যক্টেরিয়া থেকে বহুকোষী মানুষ পর্যন্ত যৌনতার বিবর্তন ঘটল।

পরিশিষ্ট:

১. মিউটেশন(Mutation): বহুকোষী জীবে জাইগোট থেকে পূর্ণাঙ্গ দেহ তৈরি হওয়ার পথে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে।একটি দেহকোষের ক্রোমোসোমে অবস্থিত ডিএনএ-তে একটি জীবের যাবতীয় বংশগত বৈশিষ্ট্য কোডের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ থাকে (যদিও সব কোষে সব বৈশিষ্ট্য কাজে লাগে না)। যখনই কোষ বিভাজন শুরু হয় তখন ডিএনএর অনুলিপির মাধ্যমে নতুন কোষেও সেই বৈশিষ্ট্যের কপি তৈরি হয়ে যায়। এই অনুলিপি প্রক্রিয়াটি কিছুটা এক ক্যাসেট থেকে আরেক ক্যাসেটে গান কপি করার মত। প্রতিবার কপি করার সময় গানের কোয়ালিটি কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। এই পরিবর্তনটিকেই মিউটেশন বলা যায়। দীর্ঘদিনের মিউটেশনের মাধ্যমেই একপ্রজাতির জীব থেকে নতুন বৈশিষ্ট্যের ভিন্ন প্রজাতির জীবের উদ্ভব হয়।

2. ডিপ্লয়েড (diploid): বহুকোষী জীবের জননকোষ ব্যতীত অন্যান্য দেহ কোষে একজাতীয় প্রতিটি বংশগতীয় বৈশিষ্ট্যের জন্য একজোড়া জীন থাকে। যেমন ধরি, পিতার কাছ থেকে কালো চুলের বৈশিষ্ট্য এবং মাতার কাছ থেকে সোনালি চুলের বৈশিষ্ট্য সন্তানের মধ্যে প্রবেশ করল। এই দুটি বৈশিষ্ট্য দুটি ভিন্ন ক্রোমোসোমের ডিএনএ-র মধ্যে থাকবে এবং এই ভিন্ন ক্রোমোসোমগুলো জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করবে। মানুষের ক্ষেত্রে ২৩ জোড়া ক্রোমোসোম থাকে। দেহকোষ থেকে যখন জনন কোষ তৈরি হয় তখন এই জোড়া ভেঙ্গে জনন কোষে ২৩টি করে ক্রোমোসোম অবস্থান করে। অর্থাৎ দেহকোষে জননকোষের চেয়ে দ্বিগুণ সংখ্যক ক্রোমোসোম থাকে। এই জোড়ায় আবদ্ধ অবস্থাকে ডিপ্লয়েড দশা এবং একক অবস্থাকে হ্যাপ্লয়েড (Haploid) দশা বলা হয়।

৩. মায়োসিস (meiosis): এটা একধরনের কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া যেখানে ডিপ্লয়েড দশার কোষ থেকে হ্যাপ্লয়েড দশার কোষ তৈরি হয়। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় বিভাজিত কোষে ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের অর্ধেক হয়। উচ্চশ্রেনীর জীবে দেহকোষ থেকে জনন কোষ তৈরি হয় মায়োসিস বিভাজনের মাধ্যমে।

তথ্যসূত্র:
http://www.trueorigin.org/sex01.asp
http://en.wikipedia.org/wiki/Asexual_reproduction
http://library.thinkquest.org/22016/contribute/asex_sex.htm
বিবর্তন সম্পর্কিত উইকিপিডিয়ার কিছু নিবন্ধ।

'সবার জন্য বিজ্ঞান' এই মটো মনে ধারন করে লিখি।

মন্তব্যসমূহ

  1. asad ফেব্রুয়ারী 22, 2013 at 3:42 পূর্বাহ্ন - Reply

    😕

  2. টিপলু অক্টোবর 31, 2012 at 10:52 পূর্বাহ্ন - Reply

    ভালো লাগল পড়ে।

  3. তারিক সেপ্টেম্বর 29, 2012 at 12:48 অপরাহ্ন - Reply

    আমি কখনো মন্তব্য করিনি্ ভুল ক্ষমা করবেন ্
    ভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার কোষের মিলন কি যৌন নাকি অযৌন প্রজনন?

    • বেঙ্গলেনসিস জানুয়ারী 11, 2013 at 8:53 পূর্বাহ্ন - Reply

      @তারিক,
      এটা একধরনের যৌন প্রজনন। এটাকে bacterial transformation বলা হয়।

  4. প্রদীপ দেব ফেব্রুয়ারী 27, 2012 at 6:20 অপরাহ্ন - Reply

    বাংলায় সহজভাবে বিজ্ঞান আমাদের অনেক বেশি দরকার। আপনি সেই কাজটি শুরু করেছেন। অভিনন্দন আপনাকে।

  5. থাবা জানুয়ারী 11, 2012 at 1:54 অপরাহ্ন - Reply

    আমি মিস্ত্রী মানুষ, আমার জ্ঞান মেন্ডেলের সূত্র পর্যন্ত… তাই মাথা ঘুরছে। এখনো বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছি!

    • বেঙ্গলেনসিস জানুয়ারী 12, 2012 at 9:21 পূর্বাহ্ন - Reply

      @থাবা,
      একবার না পড়ে বুঝতে পারলে একধিকবার পড়ে বোঝার চেষ্টা করতে পারেন, আমার ধারনা এতে কাজ হবে। তবে মুক্তমনার বিবর্তন আর্কাইভটা মনোযোগ দিয়ে পড়ে ফেললে আশা করি পুরো জিনিসটার একটা ধারনা পেয়ে যাবেন।

      • থাবা জানুয়ারী 12, 2012 at 10:55 পূর্বাহ্ন - Reply

        @বেঙ্গলেনসিস,

        একবারে না বুঝিলে পড় শতবার!

        • বেঙ্গলেনসিস জানুয়ারী 12, 2012 at 2:16 অপরাহ্ন - Reply

          @থাবা,
          সেই সাথে বিশেষ কোন লাইনে বিশেষ কোনো সমস্যা থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারেন। 🙂

  6. প্রতিফলন জানুয়ারী 10, 2012 at 10:25 পূর্বাহ্ন - Reply

    চমৎকার… সহজ-সাবলীল-প্রাঞ্জল লেখা। (F)

    একপর্যায় এমন বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ব্যাক্টেরিয়া সৃষ্টি হল যে প্রত্যেকটা কোষ আর একে অপরের সাথে মিলিত হতে পারছে না।

    এই ব্যাপারটা ঠিক পরিষ্কার হলো না। কেন বা কিভাবে এমন ঘটতে পারে সে ব্যাপারে আলোকপাত করলে খুশি হতাম।

    • বেঙ্গলেনসিস জানুয়ারী 10, 2012 at 11:07 পূর্বাহ্ন - Reply

      @প্রতিফলন,
      এই ঘটনাটি ঘটে মিউটেশনের কারনে। যেকোন কোষের বিভাজন যত বেশী হয় মিউটেশনের সম্ভবনাও তত বেশী থাকে। এভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যেতে যেতে মিউটেশনের পরিমান বাড়তে থাকে এবং আদি কোষটি থেকে তার বৈশিষ্ট্য ধীরে ধীরে ভিন্ন হয়ে যেতে থাকে (মিউটেশন যথেষ্ট ধীর প্রক্রিয়া। উল্ল্যেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হতে হাজার হাজার প্রজন্ম লেগে যেতে পারে। অবশ্য পরিবেশগত প্রভাবে দ্রুত মিউটেশন ঘটতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পারমানবিক বোমার তেজষ্ক্রিয়তার কারনে জাপানে দীর্ঘদিন বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়েছে)। যেহেতু মিউটেশন সম্পূর্ণ বিক্ষিপ্ত (random) একটি প্রক্রিয়া কাজেই কোন কোষের মধ্যে কি ধরনের মিউটেশন হবে তা আগে থেকে বোঝার কোন উপায় নেই। এখন উদাহরন হিসেবে মানুষের কথা ধরা যাক। বর্তমান পৃথিবীতে যত মানুষ আছে তাদের পূর্বপুরুষ অভিন্ন। কিন্তু বিবর্তনের ধারায় একসময় দেখা গেল অবাধ মেলা-মেশা না হওয়ায় মিউটেশন প্রক্রিয়ায় মানুষের কিছু শ্রেনী বিভাগ হয়ে গেছে (এশিয়ান, শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ ইত্যাদি)। এভাবে ভাগ হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত এদের একই প্রাজাতি বলবৎ আছে ( উদা: এশিয়ান পুরুষ এবং শ্বেতাঙ্গ নারীর প্রজননে উর্বর সন্তান জন্ম নেয়।) কিন্তু এভাবে যেতে যেতে এমন একটি সময় আসবে যখন এদের দৈহিক পার্থক্য এত বেশী হয়ে যাবে যে এদের মধ্যে আর প্রজনন সম্ভব হবে না। তখন তার প্রজাতি হিসেবে পৃথক হয়ে যাবে।

      • বেঙ্গলেনসিস জানুয়ারী 10, 2012 at 11:08 পূর্বাহ্ন - Reply

        শেষের লাইন: তখন তারা প্রজাতি হিসেবে পৃথক হয়ে যাবে।

  7. সপ্তক জানুয়ারী 10, 2012 at 2:41 পূর্বাহ্ন - Reply

    এসমস্ত শ্রমসাধ্য এবং গবেষণা মূলক লেখাই মুক্ত-মনার আসল অবদান, বাংলা ভাষায় এধরনের লেখা পাওয়া এখনো দুস্কর।লেখকে ধন্যবাদ। ধর্মের পেছনে না লেগে জ্ঞানের পেছনে লাগলে মুক্তমনার সঙ্খ্যা বাড়বে । জ্ঞান ই একমাত্র পথ যার মাধ্যমে মানুষ বদ্ধ – মনা থেকে মুক্ত – মনা হতে পারে।

  8. মাসুদ রানা জানুয়ারী 10, 2012 at 1:35 পূর্বাহ্ন - Reply

    অসম্ভব সুন্দর হয়েছে লেখা টা। তবে আমার মনে হয় আরেকটু সহজ হলে ভাল হত বিশেস করে জীব বিজ্ঞানের পরিভাসা গুল যেমন ডিপ্লয়েড , মিঊটেসন ইত্তাদি।

    • বেঙ্গলেনসিস জানুয়ারী 10, 2012 at 6:48 পূর্বাহ্ন - Reply

      @মাসুদ রানা,
      আমার ব্লগীয় উপলব্ধি হল, ব্লগে দীর্ঘ লেখা সাধারণত পাঠক পড়তে চান না। (অবশ্য মুক্তমনা এদিক থেকে স্বতন্ত্র হতে পারে।) সে কারনে আমি সবসময় পোস্ট ছোট করার চেষ্টা করি। পরিভাষাগুলো নিচে আলাদাভাবে নির্ঘন্ট হিসেবে দিয়ে দিচ্ছি।

  9. আস্তরিন জানুয়ারী 10, 2012 at 12:48 পূর্বাহ্ন - Reply

    জটিল এই বিষয়টি নিয়ে লেখার জন্য আসংখ্য ধন্যবাদ (Y)

  10. সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড জানুয়ারী 9, 2012 at 11:27 অপরাহ্ন - Reply

    দারুন। (Y)

  11. নিটোল জানুয়ারী 9, 2012 at 10:53 অপরাহ্ন - Reply

    (Y)

  12. অভিজিৎ জানুয়ারী 9, 2012 at 9:32 অপরাহ্ন - Reply

    মুক্তমনায় স্বাগতম।

    একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় নিয়ে খুব প্রাঞ্জল ভাষায় লিখেছেন। লেখাটা আমাদের বিবর্তন আর্কাইভের জন্য কাজে লাগবে।

    পৃথ্বী এ নিয়ে কিছু লিখেছিলেন আগে। আমাদের আর্কাইভে এ নিয়ে প্রশ্নোত্তর-ও আছে –

    বিবর্তন যৌনতা বা সেক্সের উদ্ভবকে ব্যাখ্যা করতে পারে না -এই দাবীর উত্তর

    লেখাটার জন্য ধন্যবাদ।

    • বেঙ্গলেনসিস জানুয়ারী 10, 2012 at 6:45 পূর্বাহ্ন - Reply

      @অভিজিৎ,
      মুক্তমনায় লেখার সুযোগ দেয়ার জন্য আপনাদেরও ধন্যবাদ। প্রশ্নোত্তরগুলো আগে দেখেছি।

      • মরুঝড় ফেব্রুয়ারী 22, 2013 at 7:23 পূর্বাহ্ন - Reply

        @বেঙ্গলেনসিস, কোন বিবর্তন বাদী কে প্রশ্ন করেও উত্তর পাচ্ছিনা। আশা করি আপনি দেবেন। ১। পৃথিবীতে প্রথম প্রাণ তৈরি হল কিভাবে? ২। পৃথিবীতে পানি এল কিভাবে/? তারপর বিবর্তন বাদ শুরু করলে ভাল হয়।

        • বেঙ্গলেনসিস মার্চ 20, 2013 at 6:59 পূর্বাহ্ন - Reply

          @মরুঝড়,
          পানির উপস্থিতির অনেকগুলো উৎস আছে:
          ১. উত্তপ্ত পৃথিবী শীতল হওয়ায় অপেক্ষাকৃত হালকা ও গ্যাসীয় বস্তুগুলো পৃথিবীর বহিস্তরে চলে আছে এবং হাইড্রোস্ফীয়ার (hydrosphere) তৈরি করে।
          ২. ধুমকেতু, উল্কা, Trans-neptunial object এবং গ্রহাণুপুঞ্জের সাথে সংঘর্ষের ফলে সেইসব বস্তু থেকে আগত পানি পৃথিবীপৃষ্টে সঞ্চিত হয়।
          ৩. অনেক খনিজ পদার্থ পানি সহযোগে গঠিত হয়। সেগুলে থেকে leaching এর মাধ্যমে পানির অনু বেরিয়ে এসে সঞ্চিত হয়।
          ৪. সৌর রেডিয়েশনের ফলে শীলাস্তরের অণু ভেঙ্গে গিয়ে পানির অণু উন্মুক্ত হয়।

          প্রাণের উদ্ভব:
          প্রাণের উদ্ভব সম্পর্কে অনেকগুলো মতবাদ প্রচলিত আছে।
          এর মধ্যে একটি হল পৃথিবী সৃষ্টির শুরুতে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ বায়ুমন্ডলে মিথেন, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, অ্যামোনিয়া এইসবের বিক্রিয়ায় অ্যামাইনো এসিড তৈরি হয়। অ্যামাইনো এসিড (amino acid) প্রোটিনের মূল ভিত্তি। মোট বিশ ধরনের এমাইনো এসিডের বিভিন্ন কম্বিনেশনে প্রাণ গঠনের অন্যতম উপাদান প্রোটিন তৈরি হয়। কয়েকবছর আগে গবেষকগণ প্রাণের উদ্ভবের প্রাথমিক পরিবেশ সিমুলেশন করে গবেষণাগারে একই পদ্ধতিতে অ্যামাইনো এসিড তৈরি করতে পেরেছেন। এই লিংকে আরো পাবেন:
          http://en.wikipedia.org/wiki/Origin_of_water_on_Earth

          অপর আরেকটি সাম্প্রতিক মতবাদ অণুযায়ী, প্রাণের উদ্ভব হয়েছে এমন কোনো গ্রহ থেকে উল্কা পিন্ডের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। নিচের লিংকটি পড়ে দেখতে পারেন।
          http://en.wikipedia.org/wiki/Origin_of_life

          • মরুঝড় এপ্রিল 29, 2013 at 6:44 অপরাহ্ন - Reply

            @বেঙ্গলেনসিস,

            ২. ধুমকেতু, উল্কা, Trans-neptunial object এবং গ্রহাণুপুঞ্জের সাথে সংঘর্ষের ফলে সেইসব বস্তু থেকে আগত পানি পৃথিবীপৃষ্টে সঞ্চিত হয়।

            মজার ব্যাপার ,এখন প্রশ্ন উঠবে ধুমকেতু,উল্কা কোথায় পানি পেল? আবার ঝামেলা।
            ২।প্রাণের উদ্ভব এর বৈজ্ঞানিক কল্প কাহিনী টি ভালই হয়েছে। তারপর এই এমাইনো এসিড একসময়— হাতি– আর নীল তিমি
            বিজ্ঞানীরা কি করল তা বাদ দিন–ভাবুন এমাইনো একা একা কি না করল? ভাবা যায়…বাব্বাহ

মন্তব্য করুন